পলাশির পরে – ৬৭

৬৭

প্রতিদিন সকালে বেশ কয়েক মাইল ঘোড়া দাবড়ে শরীরটাকে ধাতে রাখেন ওয়ারেন হেস্টিংস। কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে পড়েন। ঘাম ঝরিয়ে ফিরে আসেন সকাল সাতটার মধ্যে। তারপর বাংলোর বাগানে চবুতরার নীচে এসে বসেন। ওখানেই কফি ও ব্রেকফাস্ট দিয়ে যায় আর্দালি। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে মেরি মেমসাহেব এসে যোগ দেন ব্রেকফাস্টের টেবিলে।

এই সময়টুকু খুবই উপভোগ করেন মেরি। এরপরে সারাদিনে ওয়ারেনের টিকিটিরও দেখা মেলে না। রেসিডেন্ট সাহেবের হরেক ব্যস্ততা। অনেক দায়দায়িত্ব। কোনও কোনও দিন কাজ সেরে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়।

মাস তিনেক হতে চলল, প্রথম কন্যা সন্তানের অকালমৃত্যুর পর মেরি ফের গর্ভবতী হয়েছেন। শরীরটা বিশেষ ভালো নেই। রক্তচাপ বেড়েছে। কয়েকদিন অন্তর অন্তর তাকে দেখে যান কাশিমবাজার কুঠির সাহেব ডাক্তার। মাঝে মাঝে স্থানীয় এক কবিরাজকে নিয়ে আসেন কৃষ্ণকান্ত নন্দী। এদেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতির উপরে ওয়ারেন ও মেরি দু’জনেরই বিশেষ আস্থা রয়েছে।

মেরিকে চিন্তামুক্ত থাকতে বলেছেন সাহেব ডাক্তার ও কবিরাজমশায়। স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন ওয়ারেন হেস্টিংস। অবশ্য বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক উত্তাপ নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তাও কম নয়। পাটনা কুঠির প্রধান অ্যামিয়ট সাহেবের কাছ থেকে ঘন ঘন তাগাদা আসছে, ‘… বিরাট ফৌজ নিয়ে এগোচ্ছেন আলি গোহর। মুর্শিদাবাদে বসে কী করছেন আপনি? অবিলম্বে নবাবকে বলে বড়সড় ফৌজ পাঠানোর বন্দোবস্ত করুন। আমরা কি সব পাটনার কুঠি আগলাতে গিয়ে পোকামাকড়ের মতো মরব? ফৌজ না এলে কুঠি ফেলে রেখে পালাতে হবে আমাদের।…’

পাটনায় ফৌজ পাঠানোর জন্য বার বার নবাবের কাছে গিয়ে তদ্বির করছেন হেস্টিংস। কিন্তু নবাব ঠিক কী যে চাইছেন তা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। এখনও নবাবের দিক থেকে পাটনায় সেনা পাঠানোর কোনও উদ্যোগ আয়োজন নেই। ইদানীং তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে কোনও সদর্থক আলোচনা করাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। দিনরাত হয় তিনি নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছেন নয়তো হারেমের অন্দরে জেনানাদের নিয়ে ফূর্তি করছেন। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে নবাবের উদাসীনতা দেখে তাজ্জব বনে যাচ্ছেন হেস্টিংস। চিঠি লিখে ক্লাইভ সাহেবকে জানিয়েছেন সব কথা। কিন্তু কলকাতা থেকে এখনও কোনও জবাব আসেনি।

দরবার রাজনীতির অনেক বিষয় নিয়েই স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর খোলাখুলি আলোচনা হয়। কোন বিষয়ে কী করা উচিত এ নিয়ে মেরির মতামতও শোনেন মন দিয়ে। কিন্তু তিনি বিচলিত হয়ে পড়বেন ভেবে মোগল শাহজাদার বাংলায় আসার খবরটা তাঁর কাছে গোপন রেখেছেন ওয়ারেন। ১৭৫৬ সালের কলকাতা যুদ্ধে বেসাহারা হয়ে পড়ার স্মৃতি হেস্টিংস দম্পতিকে এখনও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায়। শাহজাদাকে ঠেকানোর হিম্মত রামনারায়ণের নেই। পাটনা জয় করে শাহজাদা মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে এলে কী হবে? এমন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার ক্ষমতা নবাবেরও যে নেই, হেস্টিংস তা ভালো করেই জানেন। বিপর্যয়ের আশঙ্কায় তিনি ভুগছেন। ফের কি সুবে বাংলার এই অস্থির রাজনীতির আগুনে ঘর পুড়বে তাঁর?

ডাচদের সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা টানাপোড়েন চলছে। শোনা যাচ্ছে ডাচ নৌবহর হানা দিতে পারে কলকাতায়। ক্লাইভ সাহেবের অধীনস্থ বেশির ভাগ ফৌজিই এখন দক্ষিণে ফরাসিদের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত। এরই মধ্যে শাহজাদার আগমন। ক্লাইভ একা কতদিক সামলাবেন? এসব ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন হেস্টিংস।

‘কী হয়েছে ওয়ারেন?’ শুধোলেন মেরি।

দু’জনে মুখোমুখি বসে আছেন বসেছেন বাংলোর বাগানে চবুতরার নীচে ব্রেকফাস্ট টেবিলে।

হাতে ধরে রাখা কফির কাপে চুমুক দিয়ে মুচকি হেসে হেস্টিংস জবাব দেন, ‘কিছু না।’

‘কী ভাবছ এত? তোমাকে খুব পারটার্বড বলে মনে হচ্ছে।’

‘কিছু না।’ মুচকি হেসে জবাব দেন ওয়ারেন।

‘উঁহু। ইউ আর হাইডিং সামথিং ফ্রম মি।’

‘অহেতুক ভেবো না ডার্লিং। অ্যাংজাইটি ইজ হার্মফুল ফর ইউ।’

‘এনি নিউ ট্রাবল অ্যাট দরবার?’

‘আরে না না ওসব নয়।’

‘তাহলে কী ভাবছ এত?’

‘আমি ভাবছিলাম তার কথা, যে আসছে।’

মুচকি হেসে কফির কাপে চুমুক দিলেন মেরি।

‘তোমাকে একদিন হিরাঝিল প্যালেসে নিয়ে যাব ডার্লিং। বেগম সাহেবা দাওয়াত দিয়েছেন।’

‘আমাকে? বেগম সাহেবা?’ মেরি অবাক হওয়া গলায় প্রশ্ন করেন।

‘ইয়েস। মণি বেগম।’

‘আই হ্যাভ হার্ড শি ইজ অ্যা ভেরি চার্মিং লেডি।’

‘ইন আর্লি লাইফ, শি ওয়াজ অ্যা ‘‘নচ’’ গার্ল। বাইজি ছিলেন।’

ফিক করে দুষ্টুমির হাসি হেসে ফেললেন মেরি। দুগালে টোল পড়ল। খুনসুটি করে হেস্টিংসের গালে বাহাতের তর্জনী দিয়ে ঠোনা মেরে বললেন, ‘তুমি বোধহয় বেগম সাহেবার কথা ভাবছিলে।’

হঠাৎই কাহারদের মুখের ‘হুনহুনা হুনহুনা’ শব্দ শুনে সচকিত হয়ে উঠলেন হেস্টিংস দম্পতি।

সদর দেউড়ি পেরিয়ে হেস্টিংসের বাংলোর অন্দরে এসে ঢুকল একটা পালকি। পালকির সমুখে দণ্ডধারীর হাতে ধরে রাখা দণ্ডের মাথায় উড়ছে নিজামতের নিশান।

হেস্টিংস কুরসি ছেড়ে উঠে ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেলেন।

পালকির অন্দর থেকে বেরিয়ে এলেন উমিদ রায়।

হেস্টিংস উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, ‘ওয়েলকাম দেওয়ানজি। হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ।’

‘একটা জরুরি কাজে হঠাৎই আসতে হল সাহেব।’

‘ইটস ওকে। উই আর অনারড।’

মেরি এসে দাঁড়িয়েছেন ওয়ারেনের পাশে। উমিদ রায় মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘সেলাম ম্যাডাম।’

‘সেলাম দেওয়ানজি।’

রুপোর একটা বাক্সের ডালা খুলে মেরির দিকে এগিয়ে দিয়ে উমিদ রায় বললেন, ‘নবাব বেগম সওগাত পাঠিয়েছেন। আপনার জন্য।’

বাক্সের অন্দরে তাকিয়ে চোখ ঝলসে গেল মেরির। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বললেন, ‘হোয়াট অ্যা বিউটিফুল নেকলেস। বেগম সাহেবাকে আমার তরফ থেকে সুক্রিয়া জানাবেন।’

‘জি ম্যাডাম।’

মেরি চলে গেলেন বাংলোর অন্দরে।

বাংলো লাগোয়া অফিস ঘরে ঢুকে নিজের কুরসিতে বসলেন হেস্টিংস। সামনে মস্ত সেক্রেটারিয়েট টেবিল। উমিদ রায় বসলেন টেবিলের উলটোদিকে। কোমরবন্ধনী থেকে গোটানো একটা কাগজ বের করে দেওয়ানজি বললেন, ‘মণি বেগম পাঠিয়েছেন। তারই হুকুমে এই চিঠি নিয়ে আসতে হল আমাকে। পড়ে দেখুন।’

দেওয়ানের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

‘…আমার সেলাম নেবেন। আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন যে মোগল শাহজাদা পাটনার দিকে আসছেন। গতকাল কাসিদ খবর এনেছে উনি এলাহাবাদ থেকে রওনা দিয়ে বেনারসে ছাউনি ফেলেছেন। পাটনা খুব দূরে নয়। কাজেই বুঝতে পারছেন হাতে সময় খুবই কম।

‘নবাবের তরফ থেকে লড়াইয়ের কোনও আনজাম নেই। তাঁর মনসুবা হল সওগাতে বশ করবেন শাহজাদাকে। মোটা নজরানা পেলে শাহজাদা বাংলা ছেড়ে চলে যাবেন। বেওকুফ নবাবজাদা এমনই বুঝিয়েছে নবাবকে। আমার মনে হয় এই তরিকা খুবই খতরনক। তামাম হিন্দুস্তান বুঝবে নবাব বুজদিল। তখন অযোধ্যার নবাব, মারাঠা, আফগান, পাঠান সকলে একে একে হাজির হবে বাংলায়। তখন কতজনকে নজরানা দেবেন নবাব? টাকা কোথায় তাঁর?

‘তাছাড়া নজরানা দিলেই যে শাহজাদা ফিরে যাবেন হলফ করে কে বলতে পারে? নবাবের বিচার-বুদ্ধি নাশ হয়েছে। এই ওয়াক্তে কোম্পানি ও ক্লাইভ সাহেবই ভরসা। আমি চাই নবাব সালামত থাকুন। সালামত থাকুক কোম্পানি। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি আপনি সব কথা জানিয়ে তুরন্ত চিঠি পাঠান কলকাতায়। ক্লাইভ সাহেব যেন ফৌজ নিয়ে ফওরান পাটনার উদ্দেশে রওনা হন। না হলে নবাবের পক্ষে মসনদ ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়তে পারে। আপনারা কি মনে করেন না যে এতে আপনাদেরও তকলিফ বাড়বে।…’

হেস্টিংসের মুখ গম্ভীর। চিঠিটা গুটিয়ে রাখলেন।

উমিদ রায় শুধোলেন, ‘কী বুঝলেন সাহেব?’

হেস্টিংস বললেন, ‘শি ইজ ইনটেলিজেন্ট। রাইটলি অ্যাসেসড দ্য সিচুয়েশন।’

‘সহি বাত বলেছেন আপনি। আমিও তাই মনে করি।’ বললেন উমিদ রায়।

‘কিন্তু নবাব যে সওগাত দিয়ে শাহজাদাকে ওয়াপস পাঠাতে চাইছেন, এত টাকা কি তার হাতে আছে?’ প্রশ্ন করেন হেস্টিংস।

‘নেই। নবাব ভাবছেন জগৎশেঠজি টাকা দেবেন।’

‘তাঁকে এই ওয়াক্তে পাবেন কোথায় নবাব? তিনি তো এখন রাজধানীতেই নেই।’

‘চিঠি পাঠিয়েছেন নবাব। তুরন্ত ওয়াপস আসার জন্য লিখেছেন শেঠজিকে।’

‘আপনার কি মনে হয় শেঠজি টাকা দেবেন?’

‘শেঠজি চতুর ইনসান। এই কাজিয়ায় নিজেকে জড়াবেন বলে মনে হয় না।’

সবেগে মাথা নেড়ে হেস্টিংস বললেন, ‘রাইট। আমি এই কয়েক বছরে জগৎশেঠজিকে যতটা চিনেছি, তাতে আমিও তাই মনে করি।’

 ‘আপনি কী ভাবছেন সাহেব? এখন কী করা উচিত?’

‘আমার মনে হয় লড়াই করাই একমাত্র পথ। বেগম সাহেবা ঠিকই বুঝেছেন। আমি আগেই একটা চিঠি পাঠিয়েছি কলকাতায়। তার জবাব আসেনি। ক্লাইভ সাহেব কী ভাবছেন জানি না।’

‘ফিরে গিয়ে কী বলব নবাব-বেগমকে?’

‘বেগম সাহেবার চিঠি আমি আজই পাঠিয়ে দেব কলকাতায়। সেই সঙ্গে আমিও ফের না হয় একটা চিঠি লিখে দেব ক্লাইভ সাহেবকে। দেখা যাক, তারপরে কী হয়?’

‘বহুত বহুত সুক্রিয়া।’ এই বলে উমিদ রায় কুরসি ছেড়ে উঠে পড়লেন।

.

জৈন ধর্মাবলম্বীরা বলে সম্মেদ সিখর বা সমাধি শিখর। তাঁরা বিশ্বাস করে সুবে বাংলার এই সুউচ্চ পাহাড়ে চব্বিশজন তীর্থঙ্করের মধ্যে কুড়ি জন সমাধির মাধ্যমে মোক্ষলাভ করেছিলেন। জৈনদের তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের নাম থেকে এই পাহাড়ের নাম হয়েছে পরেশনাথ।—জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র একটি তীর্থস্থান।

সারি সারি তাঁবু পড়েছে পরেশনাথ পাহাড়ের পাদদেশে। পরিবার ও আত্মীয়বর্গসহ তীর্থে এসেছেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ ও তার সহোদর মহারাজ স্বরূপচাঁদ। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে হাজার দুয়েক সেপাই ও হাজিরা-দাখিলা, গোলাম, বাঁদি, মুটে মজু্‌র, বাজনদারের দলসহ বিশাল বাহিনী। আপাতত এই দেবভূমিতে, সবুজে ঘেরা পাহাড়ের কোলে বেশ কিছু দিন কাটানোর পরিকল্পনা নিয়ে এসেছেন শেঠজি। বড় অশান্ত হয়ে রয়েছে তাঁর মন। মনের ইলাজ চান শেঠজি। কোনও কিছুই মনমতো হচ্ছে না। চারপাশে সব কিছু যেন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

শেঠজি আজ যেন নতুন করে অনুভব করছেন, যতদিন সুবে বাংলার নবাব প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন ততদিন কোনও ভাবনা ছিল না। শেঠদের চমকপ্রদ উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে মুর্শিদকুলি ও আলিবর্দি খাঁর মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ নবাবের স্নেহাশিস। তামাম বাংলার জমিদারের খাজনা জমা হয় জগৎশেঠের গদিতে। এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন আলিবর্দি খাঁ। খাজনার টাকা সুদের কারবারে বিনিয়োগ করে জগৎশেঠের বিত্ত অর্জন। সেই সঙ্গে জগৎশেঠ পেয়েছিলেন মুদ্রা ছাপানোর একচেটিয়া অধিকার। রৌপ্যখণ্ড জগৎশেঠের টাঁকশালে জমা দিয়ে, বা দক্ষিণে নিজেদের টাঁকশাল থেকে ছাপিয়ে আনা আর্কট মুদ্রা জগৎশেঠের কুঠি থেকে সিক্কা টাকায় রূপান্তরিত করতে এতদিন বাংলায় কারবার চালাত ইংরেজ কোম্পানি। আর্কট মুদ্রা সিক্কা মুদ্রায় রূপান্তরিত করে বাটা বাবদ প্রচুর লাভ হত জগৎশেঠের।

কিন্তু পলাশির পর থেকে পরিস্থিতিটা বদলে গিয়েছে। সুবে বাংলার খাজনা আদায় ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ ঘটেছে ইংরেজদের। সম্প্রতি কোম্পানির বকেয়া পাওনা টাকা মেটাতে না পেরে বর্ধমান, হুগলি ও নদীয়ার খাজনা ইংরেজদের নামে লিখে দিয়েছিলেন নবাব। সে টাকা মুর্শিদাবাদে জমা না হয়ে সরাসরি জমা পড়েছে কলকাতায়। এতে মহাতপচাঁদের বহুত লোকশান হয়েছে। এতদিন সুবে বাংলায় ইংরেজদের নিজস্ব কোনও টাঁকশাল ছিল না। মহাতপচাঁদের আপত্তি সত্ত্বেও কলকাতায় টাঁকশাল স্থাপনের অনুমতি দিয়েছেন নবাব মিরজাফর খাঁ। ইংরেজরা এখন কলকাতায় বসেই সিক্কা মুদ্রা ছাপিয়ে নিচ্ছে। এও তো জগৎশেঠের বিরাট লোকসান।

মহাতপচাঁদ ভেবেছিলেন পলাশির ইনকিলাবের পর নবাব মিরজাফর খাঁকে হাতের মুঠোয় রেখে খুশি মতো নিজের কারবারের আরও বিস্তার ঘটাবেন। যা ভবেছিলেন, তা হয়নি। বরং দিনে দিনে প্রবল প্রতাপশালী হয়ে উঠছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। নবাব এখন তাদের হাতের পুতুল। আগামী দিনে কী আছে নসিবে তা নিয়ে খুবই চিন্তিত মহাতপচাঁদ। তিনি ছিলেন সিরাজকে মসনদ থেকে সরানোর ষড়যন্ত্রের অন্যতম মূল কারিগর। তিনি না চাইলে ইনকিলাব হত না। কিন্তু ইংরেজদের মদতে সিরাজকে সরানোর পদক্ষেপ কি সঠিক ছিল? এতে তার মুনাফা হল কোথায়? মস্ত ভুল হয়ে গেল কি রাজনীতির চালে? এসব প্রশ্ন ইদানীং তোলপাড় করে মহাতপচাঁদের অন্তরকে। দেবভূমিতে এসেও শান্তি নেই। ঈশ্বরচিন্তায় মনকে সংহত করতে পারছেন না শেঠজি।

অপেক্ষারত ডুলিবাহকেরা। প্রস্তুত হয়ে আছে কাঠের কাঠামোর উপরে নকশাদার হাতির দাঁতের পাতে মোড়া দুটি বাহারি ডুলি। দাঁড়িয়ে আছে গাদা বন্দুকধারী একদল সেপাই। এরা মহাতপচাঁদের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। জঙ্গলে ঘেরা পাকদণ্ডী পথে রয়েছে বুনো জন্তুর ভয়। শেঠজি যাবেন পাহাড়চুড়োয় দেবভূমিতে। সামনে উচ্চৈঃস্বরে বাজনা বাজাতে বাজাতে এগোবে বাদ্যকরেরা। যাতে শব্দের ত্রাসে বুনো জন্তুরা তফাতে যায়। ডুলির সামনে ও পিছনে থাকবে হাতিয়ারবন্ধ সেপাই, গোলাম ও দাখিলারা।

তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন মহাতপচাঁদ ও স্বরূপচাঁদ। দূরের পাহাড় টপকে একদল ঘোড়সওয়ার দ্রুত এগিয়ে আসছে। দূরবিনে চোখ রেখে মহাতপচাঁদ দেখলেন একেবারে সামনে একজন ঘোড়সওয়ারের হাতে ধরা দণ্ডের মাথায় উড়ছে নিজামতের পতাকা। মহাতপচাঁদের হাত থেকে দূরবিনটা নিয়ে তাতে চোখ লাগিয়ে ভালো করে ঠাহর করে স্বরূপচাঁদ বললেন, ‘গোবিন্দমল্ল ও তার দলবল।’

‘গোবিন্দমল্ল? চরাধিপতি?’

‘হুঁ।’

‘হঠাৎ আগমনের হেতু?’

চিন্তিত হয়ে পড়লেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ।

.

দমদমার বাড়িতে নিজের অফিস চেম্বারের ভিতরে উত্তেজিত ভাবে পায়চারি করছিলেন ক্লাইভ। ঠোঁটে গোঁজা জ্বলন্ত পাইপ। ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে নব মুনশি পড়ে শোনাচ্ছিলেন হেস্টিংসের পাঠানো মণি বেগমের চিঠিটা।

চিঠি পড়া শেষ হতেই দু’আঙুলের ফাঁকে পাইপটা গুঁজে উত্তেজিত গলায় ক্লাইভ বললেন, ‘নবাব যা ভাবছেন, সেটা ডেঞ্জারাস ফর হিম। ফর আস অলসো। সহি সমঝবুঝ বেগম সাহেবার। তোমার কী মনে হয় মুনশি?’

‘স্রেফ সওগাত দিয়ে শাহজাদাকে রোখা যাবে? এই মুহূর্তে দিল্লির উজিরের যা দাপট তাতে তাঁর মদত ছাড়া কারও পক্ষে তখতে বসে সম্ভব নয়।’

ক্লাইভ পায়চারি করে চলেছেন। একটু থেমে নবকৃষ্ণ ফের বললেন, ‘কাজেই দিল্লির তখত শাহজাদার কাছে বহুত দূরের চিজ। আসমানের চাঁদের মতো। আমার কি মনে হয় জানেন হুজুর, বাংলা মুলুকে এসে নবাবকে হটিয়ে শাহজাদা নিজেই না মসনদে বসে পড়েন।’

‘রাইট। এতে তকলিফ বাড়বে আমাদের। দুশমনেরা একজোট হয়ে শাহজাদার দিকে ঝুঁকবে।’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘লড়াই ছাড়া কোনও উপায় নেই হুজুর। ওদিকে আবার আপনাকে চোখে না দেখলে পাটনা যাওয়ার সাহসই হবে না নবাবের। ফওরান আপনার বেরিয়ে পড়া উচিত।’

ক্লাইভের চোখ দুটো হঠাৎ যেন দপ করে জ্বলে উঠল। এর নাম জোশ। এতকাল ক্লাইভের সঙ্গে কাটিয়ে তাঁর চোখের ভাষা বিলক্ষণ নবকৃষ্ণ বোঝেন। মুনশিজি বরাবরই দেখে আসছেন লড়াইয়ের নামে তাঁর খুনজোশি উপচে পড়ে হুজুরের শরীরের ভাষায়।

ক্লাইভ পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘ইট ইজ অ্যা গোল্ডেন অপারচুনিটি মুনশি।’

‘অপারচুনিটি?’ নবকৃষ্ণ বিস্মিত। এই দুর্যোগকে জবরদস্ত মওকা বলছেন সাহেব?

‘ইয়েস। যদি মোগল শাহজাদাকে বাংলা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করতে পারি তো এ কথা ছড়িয়ে পড়বে তামাম হিন্দুস্তানে। উই উইল বি বেনিফিটেড। এদেশের বাদশা-নবাব-রাজারা কোম্পানির তাগদকে ভয় পাবে।’

উৎসাহের সঙ্গে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সহি বাত হুজুর। আপনি তো নিজেই বলেন, জুত করে ভয় দেখিয়ে দিতে পারলে অর্ধেক কাজ হাসিল হয়ে যায়।’

পায়চারি থামিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘এসো মুনশি। একটা চিঠির মুসাবিদা করতে হবে।’

ক্লাইভ এসে বললেন তাঁর কুরসিতে। জ্বলজ্বল করছে চোখদুটো।

সেক্রেটারিয়েট টেবিলের উলটো দিকে কাগজ-কলম নিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসলেন নবকৃষ্ণ।

নবাবের উদ্দেশে ক্লাইভ লিখলেন, ‘…শুনলাম আপনি সওগাত দিয়ে শাহজাদাকে রুখতে চাইছেন। মনে রাখবেন, ইট ইজ অ্যা ডেঞ্জারাস প্ল্যান। এই পথ থেকে সরে না আসলে খুব বেশিদিন আর নবাবি করতে হবে না আপনাকে। শেষে হয়তো দেখবেন, আপনাকে হটিয়ে শাহজাদাই মসনদের মালিক হয়ে গিয়েছেন। সওগাত পেলেই যে উনি ফিরে যাবেন, এমন একিন কী করে হল আপনার? আমি চাই আপনি সহি সালামত থাকুন। সহি সালামত থাকুক আপনার মসনদ। কালই আমি ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা হচ্ছি। আপনি আপনার ফৌজ তৈয়ার রাখুন। দ্রুত পাটনার দিকে রওনা হতে হবে আমাদের। লড়াই করেই রুখতে হবে শাহজাদাকে। অন্য কোনও উপায়ের কথা আপনি এই ওয়াক্তে মাথায়ও আনবেন না।…’

সেদিনই ক্লাইভের চিঠি নিয়ে দ্রুতগামী নৌকোয় চড়ে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা হয়ে গেলেন উইলিয়াম ওয়াটস। তাঁর উপরে ক্লাইভের নির্দেশ, ওয়ারেন হেস্টিংসকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে হিরাঝিল প্যালেসে। চিঠিটা নবাবের হাতে ধরিয়ে একটু ধমক-ধামক দিয়ে তাঁকে ধাতে রাখা চাই। তিনি যেন ত্রস্ত হয়ে শাহজাদার কাছে আগাম সন্ধিপ্রস্তাব পাঠিয়ে না দেন।

পাটনা থেকে পাঠানো অ্যামিয়টের চিঠিতে শাহজাদার আগমন সংবাদ আগেই পেয়েছিলেন ক্লাইভ। যুদ্ধই যে একমাত্র পথ তা তিনি আগাম ভেবেও রেখেছিলেন। নবাব নিজের অসহায়তার কথা জানিয়ে তাঁকে চিঠি লিখবেন, এজন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন। সে ক্ষেত্রে দর কষাকষি করে সেনাবাহিনীর খরচ বাবদ মোটা টাকা নবাবের কাছ থেকে আদায় করে নেওয়া সহজ হত।

কিন্তু নবাব যে ইংরেজদের সাহায্য না চেয়ে এবারে অন্য উপায় হাতড়াবেন তা আন্দাজ করতে পারেননি ক্লাইভ। তিনি বুঝতে পারছেন, তাঁর হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে আজাদ হতে চাইছেন মিরজাফর খাঁ। কিন্তু যে পথ তিনি গ্রহণ করতে চাইছেন, তাতে তাঁর মুসিবত অনিবার্য। নবাবের মুসিবত হলে তকলিফ বাড়বে ইংরেজদের। আলি গোহর তো আর ইংরেজদের হুকুম-ইরাদার গোলাম হবেন না, কাজেই তাঁকে অদৃশ্য সুতোয় পুতুলের মতো নাচানো যাবে না।

অতএব চুলোয় যাক টাকাকড়ির হিসেবনিকেশ। আপাতত পলাশি থেকে প্রাপ্ত সুবিধে যাতে ইংরেজদের হাতছাড়া না হয়ে যায় সেটা নিশ্চিত করা দরকার। তাই আর নবাবের অনুরোধের অপেক্ষা না করে একতরফা ভাবে ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদ রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন ক্লাইভ। চাপে রেখে নবাবকে খেলানোর সময় এখন নেই। আলি গোহর বেনারস পার হয়ে এগোচ্ছেন। হাতে সময় সত্যিই খুব কম।

পরের দিনই ফৌজসহ মুর্শিদাবাদের দিকে মার্চ শুরু করলেন ক্লাইভ। বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পায়ের নীচের জমি আরও মজবুত করতে এই অভিযান তাঁর কাছে এক নয়া চ্যালেঞ্জ।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *