৭১
গভীর রাতে গেরেটির বাগানে ফিরে এল ফোর্ডের দুই প্রতিনিধি।
ক্লাইভের নিজের হাতে পেন্সিলে লেখা মেসেজটি পড়ে সন্তুষ্ট হলেন ফোর্ড ও নকস। আরও অনেকের মতো তাঁদের কাছেও ক্লাইভ মানে কাউন্সিল আর কাউন্সিল মানে ক্লাইভ।
২৫ নভেম্বর। ১৭৫৯ সাল।
চন্দননগর ও চুঁচুড়ার মাঝখানে প্রকাণ্ড এক ডাঙা। বুনো ঝোপঝাড় আগাছায় ভর্তি। এই ডাঙার উপর দিয়ে উত্তর মুখে চলে গিয়েছে চুঁচুড়া যাওয়ার রাস্তা। ডানদিকে রয়েছে বেদারা নামে ছোট্ট একটা গ্রাম। সেই থেকে এই ডাঙা ‘বেদারার ডাঙা’ নামে পরিচিত। এর বাঁ দিকে রয়েছে মস্ত এক আমবাগান। বেদারার ডাঙা পেরোনোর পর চুঁচুড়ার দিকে রয়েছে ঘাস-আগাছায় ঢাকা বেশ চওড়া একটা নালা। প্রায় সাত-আট ফুট গভীর। বর্ষায় জলে টইটম্বুর থাকে। শীতের মরসুমে শুকিয়ে যায়। এই মুহূর্তে জল নেই নালায়। গোটা নালা ভরে আছে জংলি ঘাসে।
ভোরের আলো ফুটতেই এই নালার কিনারা বরাবর কামান বসালেন ফোর্ড। চারটে ফিল্ড পিস কামান। কৌশলগত অবস্থান অনুযায়ী এই নালা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ডাচ সৈন্যরা নালা টপকে চট করে ইংরেজ বাহিনীর ঘাড়ের উপরে হামলা করতে পারবে না।
সকাল দশটা নাগাদ দেখা মিলল ডাচবাহিনীর। ক্যাপটেন রাসেলের নেতৃত্বে তারা এগিয়ে আসছে দ্রুত। উপুড় হয়ে শুয়ে মাটির সঙ্গে প্রায় মিশে রইল ইংরেজ সৈন্যরা। ডাচবাহিনী কামানের পাল্লার মধ্যে আসতেই এক সঙ্গে গর্জন করে উঠল চারটে ফিল্ড পিস কামান।
দুম! দুম! দুম! দুম!
শত্রু যে পথের উপরে ঘাঁটি গেড়ে আছে তা আন্দাজই করতে পারেনি ডাচবাহিনী। তার উপরে অচিন দেশ। পথঘাট অচেনা। দিশেহারা হয়ে পড়ল ডাচ সৈন্যরা। এমনিতেই সাঁকরাইল থেকে দীর্ঘ পথ হেটে আসার ধকলে তারা ক্লান্ত। পথে যে যুদ্ধ করতে হবে তারা মোটেও ভাবেনি। তেমন কোনও সতর্কতাও অবলম্বন করেনি তারা। গোলন্দাজ বাহিনী, পদাতিক সেনা কেউই প্রস্তুত নয়।
ওদিকে তখন একনাগাড়ে তাদের দিকে ছুটে আসছে কামানের গোলা। ছুটে গিয়ে শত্রুপক্ষের ঘাড়ের উপরে লাফিয়ে পড়ে হাতাহাতি লড়ারও উপায় নেই। প্রতিবন্ধক বিরাট চওড়া নালা।
লড়াইয়ের ময়দানে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একবার দিশেহারা হয়ে পড়লে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। কাজেই ইংরেজদের তোপের সামনে ডাচ সৈন্যরা পোকামাকড়ের মতো মরতে লাগল। চারিদিকে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। অনেক চিৎকার চেঁচামেচি করেও নিজের বাহিনীকে সংহত করতে পারছেন না ক্যাপটেন রাসেল।
এরই মধ্যে নালার গর্ভে আশ্রয় নিয়ে লুকিয়ে থাকা ইংরেজ ঘোড়সওয়ার বাহিনী আচমকা যেন মাটি ফুঁড়ে উপরে উঠে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ডাচেদের উপরে। পঞ্চাশজন মাত্র দক্ষ ঘোড়সওয়ার। তাতেই বাজিমাত। লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটতে লাগল ডাচেরা। তাদের পরাজয় নিশ্চিত বুঝে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে এসে যোগ দিল নবাবের পাঠানো একশো ঘোড়সওয়ার। বিদেরার ডাঙায় মাত্র কয়েকঘণ্টার মধ্যেই জিত হাসিল করে নিলেন কর্নেল ফোর্ড ও নকস। ভালো করে গোলাগুলি ছোড়ারই অবকাশ পেল না ডাচেরা। ইংরেজ বাহিনী মোটামুটি অক্ষত। ওদিকে ইংরেজদের ছোড়া গোলায় ও ঘোড়সওয়ারদের হানাদারিতে প্রাণ হারাল প্রায় একশো কুড়ি জন ডাচ সৈন্য ও মালয় থেকে আসা প্রায় তিনশো সেপাই।
রক্তে ভিজল বেদেরার ডাঙা। তাজা লাশের লোভে আকাশে চক্কর কাটতে লাগল শকুনের দল। সাঁকরাইলের পর বেদারা। ইউনিয়ন জ্যাক আকাশে উড়িয়ে ফের উল্লাসে মাতল ইংরেজবাহিনী। সুবে বাংলায় ডাচ-সূর্য অস্তাচলে গেল।
চোদ্দোজন অফিসারসহ ক্যাপটেন রাসেল ও বহু ডাচসেনা বন্দি হলেন ইংরেজদের হাতে। বেদেরার মাঠ থেকে কোনও রকমে পালিয়ে চুঁচুড়ায় পৌঁছতে পেরেছিল মাত্র কুড়ি-পঁচিশজন সৈন্য।
লড়াইটা মোটেই সহজ ছিল না। সাঁকরাইলের যুদ্ধে যদি ইংরেজদের পরাজয় হত আর বেদেরার ফলাফল যদি অন্যরকম কিছু হত, তবে বিফলে যেত ফোর্ট উইলিয়াম পুনর্দখলের সংগ্রাম, হালসিবাগানের লড়াই, পলাশির যুদ্ধ, ক্লাইভের গত দু’বছরের পরিশ্রম। পাঁচ হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়েছিল মিরন। ইংরেজরা বেকায়দায় পড়লে ডাচদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ত কলকাতার উপরে। নিজামতের প্রচ্ছন্ন মদত থাকলেও ডাচদের দুর্ভাগ্য হল এই যে, ক্লাইভের মতো দক্ষ সেনাপতি তাদের ছিল না। সেনা সংখ্যায়, রসদে, যুদ্ধ উপকরণে ইংরেজদের থেকে সামান্য এগিয়ে থাকলেও ক্লাইভের স্ট্র্যাটেজির কাছে একতরফা হার হল তাদের।
ফরাসিরা শেষ হয়েছিল আগেই। বেদেরার প্রান্তরে ডাচ-স্বপ্নের সমাধি ঘটল। সুবে বাংলায় ইংরেজদের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্যোগে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা আর রইল না তাদের। চন্দননগরের ফরাসিদের মতো চুঁচুড়ার চৌহদ্দিতে আবদ্ধ হয়ে সুবে বাংলায় কোনওরকমে টিকে রইল ডাচেরা।
.
চুঁচুড়া থেকে দূত এসেছে। নবকৃষ্ণ ছুটে গিয়ে বেদারার যুদ্ধে জয়লাভের খবরটা দিলেন ক্লাইভকে। সব শুনেও ক্লাইভ অবিচল। তিনি তখন দমদমার হাভেলির পাশের জঙ্গলে পাখি শিকারে ব্যস্ত। কোনও ভাবলেশ নেই। এত বড় যুদ্ধজয়, তবুও নেই উল্লাসের কোনও বহিঃপ্রকাশ। অবাক হলেন নবকৃষ্ণ। দু’বছর ধরে কাছ থেকে দেখছেন তবুও মানুষটাকে এখনও ঠিকমতো চিনে উঠতে পারলেন না মুনশিজি। সাহেবের মনের গতির তল পাওয়া মুশকিল।
আকাশের পানে উদ্যত বন্দুকের নল। উড়ছে একপাল বক। ক্লাইভের নজর সেদিকে। ট্রিগার টিপলেন পরপর দু’বার। অব্যর্থ নিশানা। দুটো বক খসে পড়ল মাটিতে। পাখির সন্ধানে ছুটল কুলি মজুররা। বন্দুকটা দেহরক্ষী স্ট্রনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে পাইপ ধরালেন ক্লাইভ।
নবকৃষ্ণ জোড়হাত হয়ে বললেন, ‘আপনাকে যত দেখছি তত তাজ্জব বনে যাচ্ছি হুজুর। এত বড় একটা লড়াই জিতে নিলেন, অথচ এতটুকু উল্লাস নেই আপনার?’
মুচকি হেসে ক্লাইভ বললেন, ‘লড়াইয়ের ফলাফল কী হবে আমি জানতাম।’
‘জানতেন?’ বিস্ফারিত চোখে ক্লাইভের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন নবকৃষ্ণ।
‘ফোর্ড ও নকসের উপরে আমার একিন ছিল।’
কথাটায় যেন নবকৃষ্ণর ঠিক প্রত্যয় হল না।
ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ফোর্ডের পাঠানো চিঠির ভাষা আমাকে এই ভরসা দিয়েছিল। আসলে সবটাই হল স্ট্র্যাটেজি মুনশি। যুদ্ধ হল একটা অঙ্ক। নিখুঁত হিসেব নিকেশের কারবার। ঠিকঠাক অঙ্ক কষতে পারলে জিত তোমার হবেই। ডাচেরা আমাদের সঙ্গে লড়াই বাধাতে চেয়েছিল, ওদের তাগদ আমাদের থেকে খুব কম কিছু ছিল না, কিন্তু ওরা হোমওয়ার্ক করেনি। লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাই এই হাল হল ওদের।’
‘আপনি তো লন্ডনে ফিরে যাবেন, তখন কী হবে কোম্পানির? তারা কী এখনকার মতো এই তাগদ বজায় রাখতে পারবে?’ শুধোলেন নবকৃষ্ণ।
মুচকি হাসলেন ক্লাইভ। কপালের ঘাম মুছে বললেন, ‘আর তো না পারার মতো কিছু নেই। ফরাসিরা নেই। ডাচেরা শেষ হল। নবাব মিরজাফর খাঁ কোম্পানির হাতের পুতুল। আর কী চাই?’
বুলেট বিদ্ধ বক দুটোকে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে এল এক দাখিলা। শিকারির কামেয়াবির স্মারক।
ক্লাইভ সেদিকে ফিরেও তাকালেন না। যা ঘটে গিয়েছে তা নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকা তাঁর ধাতে নেই। তাঁর মন তোলপাড় করছে ভবিষ্যতের ভাবনা।
ক্লাইভ বললেন, ‘চলো মুনশি ফেরা যাক। একটা চিঠি পাঠাতে হবে নবাবকে।’
জঙ্গলের মধ্যে শুঁড়িপথ ধরে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন ক্লাইভ। বন্দুক হাতে সামনে হেঁটে চলেছে স্ট্রন। পিছনে নবকৃষ্ণ। তাঁর পিছনে লটবহর নিয়ে চলেছে কুলি-মজু্র, গোলাম-দাখিলারা।
হাঁটতে হাঁটতে স্ট্রনের উদ্দেশে শুধোলেন, ‘তুমি কি লন্ডনে ফিরে যেতে চাও?’
‘নো স্যার।’
স্ট্রন ফের বলে, ‘আপনি চলে গেলে আই উইল কুইট দিস জব।’
‘দেন?’
‘এখানেই থেকে যাব। সওদা করব। সাদি করব। ফলেন ইন লাভ উইথ অ্যা কান্ট্রি গার্ল।’
‘কান্ট্রি গার্ল?’ কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করেন ক্লাইভ। হাসছে তাঁর চোখদুটো।
‘হার নেম ইজ বিদ্যা।’
‘ওঃ দ্যাট গার্ল। যাকে তুমি রাজমহলে রেসকিউ করেছিলে।’
‘ইয়েস স্যার।’ লাজুক গলায় জবাব দেয় স্ট্রন।
নবকৃষ্ণ বলে ওঠেন, ‘স্ট্রন সাহেব রসে ফ্লোটিং স্যার। আমাকে সব কথাই বলে।’
স্ট্রনের পিঠে হাত রেখে ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েল। সওদা করবে যে, ক্যাপিটাল কোথায়?’
স্ট্রন নিরুত্তর। চুপচাপ হাঁটতে থাকে।
.
দমদমার বাড়িতে ফিরে মুনশি নবকৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে নবাবের চিঠিটা মুসাবিদা করতে বসলেন ক্লাইভ। লিখলেন, ‘…হুজুর আপনি শুনলে খুশি হবেন যে সুবে বাংলাকে বেচ্যায়েন করার যে মতলব ডাচেরা করেছিল, তা আমি বানচাল করে দিয়েছি। সাঁকরাইল ও বেদারার লড়াইয়ে মুসিবত হয়েছে ডাচেদের। ইয়াদ রাখবেন ইংরেজরা আপনার দোস্ত। আমরা থাকতে কেউ এই সুবে বাংলায় আপনার তকলিফের কারণ হয়ে উঠতে পারবে না।
‘মাস দুয়েক পরে আমি ইংল্যান্ডের পথে রওনা হব। আমার জায়গায় কোম্পানির ফৌজের জিম্মেদারি নেবেন মেজর ক্যাইলোড। আমি রওনা হওয়ার আগেই দক্ষিণ থেকে এসে পড়বে সে। মেজর ক্যাইলোড কাবিল ইনসান। আপনাকে সে সালামত রাখতে পারবে। মেজর ক্যাইলোড কলকাতায় পৌঁছলেই আপনার সঙ্গে মোলাকাত করার জন্য তাঁকে পাঠিয়ে দেব মুর্শিদাবাদে।
‘কলকাতা কাউন্সিলের নতুন গভর্নর হবেন হেনরি ভ্যানসিটার্ট। তিনি এখন দক্ষিণে রয়েছেন। ওদিককার কাজ সেরে কলকাতায় আসতে তাঁর কয়েকমাস সময় লাগবে। আমি লন্ডনের পথে রওনা হওয়ার পর অল্প কিছু দিনের জন্য কলকাতা কাউন্সিলের গভর্নরের দায়িত্ব সামলাবেন মি. হলওয়েল। তাঁর সঙ্গে তো আপনার আলাপ আছে, আর মি. ভ্যানসিটার্টকে চিঠিতে আপনার বিষয়ে সব কথা আমি জানিয়ে যাব। আশা করি আপনার কোনও তকলিফ হবে না। আপনি সহি সালামত খুশ তবিয়ত থাকবেন।…’
ফারসিতে চিঠি মুসাবিদা করে ক্লাইভকে পড়ে শোনালেন নবকৃষ্ণ।
ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েল। চিঠিটা চটপট পাঠিয়ে দাও।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। ইজাজত দেন তো এক বাত গুজারেশ করি।’
‘বলো।’ একটু অবাক হয়ে নবকৃষ্ণর মুখপানে চাইলেন ক্লাইভ।
‘নবাব যে তলায় তলায় ডাচদের মচত দেওয়ার কথা ভাবছিলেন, নবাবজাদা মিরন পাঁচ হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে ডাচেদের মদত দেওয়ার জন্য তৈয়ার ছিলেন, আপনি তো জানতেন।’
‘জানতাম।’
‘এ নিয়ে নবাবের উপরে কোনও ইলজাম আনলেন না তো চিঠিতে?’
মুচকি হাসলেন ক্লাইভ।
‘নবাবের উপরে আপনার গুসসা নেই?’
‘মনের অন্দরের সব কথা খুলে বলতে নেই মুনশি। এও এক কৌশল। চিঠিটা পাঠিয়ে দাও।’
চেয়ারের গায়ে গা এলিয়ে দিলেন ক্লাইভ। বিদায় নিলেন নবকৃষ্ণ।
এরপর স্ট্রনকে তলব করলেন ক্লাইভ।
‘ইয়েস স্যার।’ ঘরে ঢুকে ক্লাইভকে সেলাম জানাল স্ট্রন।
দেরাজ খুলে একটা চামড়ার খেরিয়া বের করে ক্লাইভ বললেন, ‘গোরস্থানে তুমি আমাকে সাপের ছোবল থেকে বাঁচিয়েছিলে, লেকিন কোনও ইনাম দেওয়া হয়নি তোমায়। এই তোমার ইনাম। নাও। টেক ইট।’
স্তম্ভিত হয়ে গেল স্ট্রন। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘নাও। টেক ইট। সওদা কোঁড়ার ক্যাপিটাল।’
ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ক্লাইভের হাত থেকে খেরিয়াটা নেয় স্ট্রন।
ক্লাইভ বললেন, ‘দুশো আশরফি আছে। এ দিয়ে তুমি তোমার কারবার শুরু করতে পার। তারপর নিজের নসিব তোমাকেই গড়ে নিতে হবে।’
স্ট্রনের দু’চোখে জল চিকচিক করে ওঠে।
মুচকি হাসেন ক্লাইভ।
কিছু বলতে যাচ্ছিল স্ট্রন। কিন্তু বাধা পড়ল। হুড়মুড় করে ফের ঘরে ঢুকলেন মুনশি নবকৃষ্ণ। হাতে একটা কাগজ। চামড়ার খেরিয়াটা হাতে নিয়ে নীরবে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল স্ট্রন।
‘কী হল মুনশি?’ শুধোলেন ক্লাইভ। তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল।
‘বিষয় খুবই গুরুতর। চিঠিটা পড়ে দেখুন হুজুর।’
‘কার চিঠি?’
‘ডাচ গভর্নর বিসডাম সাহেব পাঠিয়েছেন।’
চিঠিটা টেবিলের উপরে রেখে ঝুঁকে পড়লেন ক্লাইভ। বিসডাম লিখেছেন, ‘…প্লিজ রেসকিউ আস। ছয় হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে নবাবজাদা মিরন চুঁচুড়ায় এসে হাজির হয়েছেন। জুলুম করছেন আমাদের উপরে। আমি হাতজোড় করে মাফ চেয়েছি, বলেছি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই বাধিয়ে গলত কাজ করেছি আমরা, কিন্তু কোনও কথা শুনতে চাইছেন না নবাবজাদা। সুবে বাংলায় গোলমাল পাকানোর অজুহাতে আমাদের চুঁচুড়া থেকে এক্সপেল করতে চাইছেন। যে যুদ্ধ-বন্দিদের আজাদ করে দিয়েছিলেন আপনারা, তাদের আমরা আপনাদের কথামতো বাটাভিয়ায় ফেরত পাঠাচ্ছি। ওয়ার কমপেনসেশন বাবদ কর্নেল ফোর্ড তিন লাখ টাকা দাবি করেছিলেন, তা আমরা দিতে রাজি আছি। শুধু একটাই অনুরোধ নবাবজাদার জুলুম থেকে আমাদের বাঁচান।…’
চিঠিটা পড়ে ধূর্ত ক্লাইভের চোখদুটো চকচক করে উঠল। এ এক মস্ত সুযোগ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ডাচদের সঙ্গে ইংরেজদের সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, সুবে বাংলায় ডাচদের কোমর ভেঙে দিয়েছেন তিনি। আর কখনও ডাচেরা বাংলায় ইংরেজদের ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারবে না। ওদিকে বিসডাম স্বীকার করে নিয়েছেন গোলমাল পাকানোর দায় তাদের এবং তার খেসারত দিতেও তিনি রাজি। কাজেই ডাচদের সঙ্গে কাজিয়া বাঁধানোর জন্য কলকাতা কাউন্সিল বা তাঁকে দায়ী করতে পারবে না কোম্পানির ডিরেক্টরেরা। এখন যদি তিনি ডাচদের পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তো সুবে বাংলায় দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া তিক্ত সম্পর্কের উপরে একটা মোলায়েম প্রলেপ লাগানো যায়। শুধু তাই নয়, কৃতজ্ঞতাবশত ডাচেরা এদেশে ইংরেজদের তাঁবে থাকবে। সব মিলিয়ে যাকে বলে মধুরেণ সমাপয়েৎ।
কখনোই এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। কর্নেল ফোর্ড তখনও চন্দননগরে রয়েছেন। তার উদ্দেশে জরুরি কিছু নির্দেশ পাঠালেন ক্লাইভ। সেই নির্দেশ পেয়েই চুঁচুড়ায় গিয়ে মিরনকে পেল্লায় এক ধমক লাগালেন ফোর্ড। ভাবখানা এমন—আমরা ইউরোপের দুই দেশ নিজেদের মধ্যে ঝামেলা পাকিয়েছি আবার মিটমাটও করে নিয়েছি। তুমি নবাবজাদা মিরন এর মধ্যে নাক গলানোর কে হে?
ফোর্ডের ধমক খেয়ে ভয়ে গুটিয়ে গেল মিরন। ফৌজ নিয়ে দ্রুত সরে পড়ল চুঁচুড়া থেকে। ক্লাইভের নির্দেশ মতো মিরনের হাত দিয়ে নবাবকে একটা চিঠি পাঠিয়ে দিলেন ফোর্ড। তিনি লিখলেন, ‘…ডাচেরা আগে সুবে বাংলার বাণিজ্যে যে সু্যোগসুবিধা পেত, আগের মতোই সে সব তারা যেন পায়। গভর্নর বিসডাম চান বালেশ্বর, চুঁচুড়া, কাশিমবাজার, পাটনা কুঠির নিরাপত্তার জন্য মোট একশো পঁচিশজন সৈন্য মোতায়েন রাখতে। তার এই আরজি যেন মঞ্জুর করা হয়…’
খুশি হলেন বিসডাম। যুদ্ধের ক্ষতিপুরণ বাবদ ফোর্ডের হাতে তুলে দিলেন তিন লাখ টাকা। বেদারার যুদ্ধের পর যে সমস্ত ডাচ সৈন্যদের মুক্তি দিয়েছিল ইংরেজরা তাদের নিয়ে চুঁচুড়া থেকে একখানা জাহাজ রওনা হয়ে গেল বাটাভিয়ার উদ্দেশে।
হাসিমুখে বিসডামের সঙ্গে করমর্দন সেরে ফোর্ড ফিরে এলেন কলকাতায়। দমদমার বাড়িতে গিয়ে ক্লাইভের সঙ্গে দেখা করে খুলে বললেন সব কথা। ফোর্ডকে বুকে জড়িয়ে ধরে ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েলডান মাই ডিয়ার। নাউ উই বোথ মে সেফলি লিভ ফর লন্ডন।’
শ্যাম্পেনের পাত্র হাতে তুলে নিয়ে ফোর্ড বললেন, ‘চিয়ার্স।’
.
২৫ ফেব্রুয়ারি ১৭৬০ সাল।
পুরোনো কেল্লার নৌকোঘাট থেকে ফোর্ডকে সঙ্গে নিয়ে নৌকোয় উঠলেন রবার্ট ক্লাইভ। মাঝ নদীতে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে জাহাজ রয়্যাল জর্জ। ক্লাইভকে নিয়ে পাড়ি দেবে লন্ডনের উদ্দেশে। ক্লাইভের সঙ্গে কর্নেল ফোর্ডও লন্ডনে ফিরছেন।
রবার্ট ক্লাইভকে বিদায় জানাতে বহু মানুষের সমাগম হয়েছে নৌকোঘাটে। হাজির কলকাতা কাউন্সিলের সমস্ত সদস্য, সাহেবপাড়ার হোমরাচোমরা লোকেরা ও কলকাতার দিশিসমাজের কেষ্টবিষ্টুরা। ভিড় জমিয়েছে আম-আদমিও। ক্লাইভের দেশে ফেরার দিনক্ষণ লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল সুতানুটি-কলকাতা-গোবিন্দপুর জুড়ে।
জল ছলছল করছে নব মুনশির দু’চোখে। কর্নেল রবার্ট ক্লাইভের জন্যই তিনি আজ এ শহরের অন্যতম বিত্তবান মানুষ। টাকার জোরে দিশিসমাজের মাথা। শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। একই দশা একদা কোম্পানির দেওয়ান ষাট টাকা মাস-মাইনের চাকুরে রামচাঁদের। ক্লাইভের খাতিরে তিনিও আজ অঢেল বিত্তের অধিকারী। আন্দুল রাজপরিবারের জনক। রয়্যাল জর্জের দিকে ভেসে চলেছে ক্লাইভের নৌকো। সেদিকে চেয়ে ধুতির খুঁটে চোখ মুছলেন রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ।
থমথম করছে কলকাতা কাউন্সিলের সদস্যদের চোখমুখ। চলে যাচ্ছেন ক্লাইভ। গতকালই কলকাতা শহরে খবর এসেছে যে ফের বাংলা অভিযানের তোড়জোড় করছেন শাহজাদা আলি গোহর। যতদিন ক্লাইভ ছিলেন ততদিন ভাবনা ছিল না। এখন কী আছে নসিবে এ নিয়ে চিন্তিত কাউন্সিলের সব মেম্বারই। তবে খুশি ঝিলিক দিচ্ছে জেফানিয়া হলওয়েলের মুখে। যোগ্যতা তেমন নেই, তবুও এই মানুষটা বরাবরই ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। মনে মনে ভাবতেন, একদিন কলকাতা কাউন্সিলের গভর্নর হবেন। তার সে আশা পূর্ণ হয়েছে। হেনরি ভ্যানসিটার্ট এসে না পৌঁছনো পর্যন্ত আগামী দু’মাসের জন্য তিনি কলকাতার অ্যাকটিং গভর্নর।
নৌকোর গলুইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে আছে ক্লাইভ। কোমরে দুই হাত। ঠোঁটে গোঁজা পাইপ। সেই বহু পরিচিত উদ্ধত দেহভঙ্গিমা। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কর্নেল ফোর্ড। অন্য একটা সুলুপে চড়ে জাহাজের উদ্দেশে চলেছেন ক্লাইভের স্ত্রী মার্গারেট ও পুত্র এডওয়ার্ড।
ঘাটের দিকে তাকালেন ক্লাইভ। ঘাটে জমায়েত লোকজনের উদ্দেশে হাত নাড়লেন।
তারপর ফোর্ডের উদ্দেশে বললেন, ‘দেখো, কয়েক বছর পরে আবার আমি ফিরে আসব এদেশে। কোম্পানি আমাকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হবে।’
ফোর্ড বললেন, ‘সার্টেনলি। আওয়ার নেশন উইল বি ব্লেসড উইথ ইওর প্রেসেন্স ইন বেঙ্গল।’
দড়ির মই বেয়ে জাহাজে উঠলেন ক্লাইভ। এসে দাঁড়ালেন ডেকের উপরে।
কেউ চেঁচিয়ে উঠল, ‘গুড বাই স্যার।’
কথাটা ভেসে এল ক্লাইভের কানে। ঘুরে তাকালেন তিনি। অদূরে ভাসমান বজরার ছাতে দাঁড়িয়ে আছে স্ট্রন। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যা। যুগলে এসেছে ক্লাইভকে বিদায় জানাতে।
স্ট্রনের উদ্দেশে হাত নাড়লেন ক্লাইভ। হাত নাড়ল স্ট্রন ও বিদ্যা।
নোঙর তুলল রয়্যাল জর্জ। চলতে শুরু করল দক্ষিণমুখে।
বিদ্যাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করল স্ট্রন। তার বুকে মাথা রাখল বিদ্যা।
বসন্তের বাতাস ছুঁয়ে গেল দু’জনকে।
.
সমাপ্ত
