৬৮
নবাব মিরজাফর খাঁ স্তম্ভিত। একেবারে হাঁ হয়ে গিয়েছেন। ঝুলে পড়েছে নীচের ঠোঁট। কম্পমান হাতে ধরা ফরসির নল। দু’চোখে শূন্য বিহ্বল দৃষ্টি। এই মাত্র খাস মুনশি যা পড়ে শোনাল, তা যেন ঠিক হজম করে উঠতে পারছেন না।
খাস মুনশি অদূরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। আনুগত্য দেখাতে ঈষৎ ঝুঁকে আছে সামনের দিকে। নবাবের ইজাজত না মিললে স্থান ত্যাগ করার উপায় নেই।
গোবিন্দমল্ল নিয়ে এসেছে চিঠিটা। বাংলা মুলুকে শাহজাদার আগমন সংবাদ জানিয়ে নবাব যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন জগৎশেঠকে, তার জবাবি চিঠি।
তুরন্ত ওয়াপস আসার জন্য জগৎশেঠকে কার্যত হুকুম করেছিলেন নবাব। লিখেছিলেন, তিনি যুদ্ধ চান না। নজরানা দিয়ে বশ করতে চান শাহজাদাকে। অতএব টাকা চাই। লম্বা চিঠিতে নবাব এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, অতীতে যখনই সংকটে পড়েছেন সুবে বাংলার নবাব, টাকা দিয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন জগৎশেঠ। এবারেও যেন তার ব্যতিক্রম না হয়।
জগৎশেঠ জবাবে স্পষ্টই জানিয়েছেন যে, পরিবার নিয়ে তিনি তীর্থে এসেছেন। এখনই মুর্শিদাবাদে ফেরা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া এই মুহূর্তে শাহজাদার নজরানা মেটানোর মতো তহবিল তাঁর কাছে নেই।
খুবই সংক্ষিপ্ত চিঠি। শেঠজির ভাষায় বিনয় নেই। আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ নেই। হতে পারে সত্যিই হয়তো বাড়তি টাকা নেই তাঁর, কিন্তু এ জন্যে নবাব যেন তাঁকে মার্জনা করেন, এ নিয়ে একটি শব্দও খরচ করা হয়নি। এ যে সরাসরি নবাবের হুকুমতকে ইনকার করার সামিল। একধরনের বেয়াড়াপনা, বেতমিজি। বেসহবত কাণ্ড। শেঠজির স্পর্ধা দেখে তাই বাক্যহারা নবাব।
রায়দুর্লভের মতো জগৎশেঠও যে সুরে বাজছেন না, তা মসনদে বসার পর থেকেই একটু একটু করে অনুভব করছিলেন মিরজাফর খাঁ। এবারে স্পষ্ট ইঙ্গিত পেলেন। রায়দুর্লভ বরবাদ হয়ে গিয়েছেন, নিজামতের রাশ নিজের মুঠোয় নেওয়ার আশা ছেড়ে ইংরেজদের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কলকাতায়। তাঁকে মুর্শিদাবাদ থেকে কার্যত পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল মিরন। এবার কি তবে জগৎশেঠের সঙ্গে চূড়ান্ত বোঝাপড়া সেরে নেওয়ার সময় এসেছে?
হঠাৎই পুত্রের জন্য মিরজাফরের মনটা হু-হু করে উঠল। মিরন ছাড়া এই দুশমনে ভরা দুনিয়ায় তাঁর আপনজন বলতে কেউ নেই। মসনদে বসার পর থেকে প্রিয় পুত্রের নামে নানান শিকায়ত শুনে শুনে পরেশান হয়েছেন নবাব। কখনও ইংরেজ রেসিডেন্ট, কখনও রায়দুর্লভ, কখনও জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ ও তাঁর ভাই মহারাজ স্বরূপচাঁদ মিরনের নামে নবাবের কানে বিষ উগরে দিয়েছেন। বিরক্ত হয়েছেন নবাব। তিরস্কার করেছেন পুত্রকে। আজ মনে হচ্ছে মিরনের পথই সঠিক। সব দুশমনকে খতম করতে চায় মিরন। এটাই সহি তরিকা।
এখনই মিরনকে ডেকে পাঠিয়ে জগৎশেঠের জবাবি চিঠির কথা জানাবেন বলে মনস্থ করলেন নবাব কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিলেন নিজেকে। সব শুনলে মিরন নির্ঘাত হামলা চালাবে জগৎশেঠের কুঠিতে। কিন্তু এই সংকট সময়ে অন্তর্কলহ মহাঅনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। শাহজাদার মোকাবিলা করাই এখন প্রধান কাজ। জগৎশেঠের সঙ্গে বোঝাপড়াটা না হয় পরে সারা যাবে। এই বলে নিজের মনকে প্রবোধ দিলেন নবাব। কম্পিত হাতে ধরে রাখা ফরসির প্যাঁচানো নলটার দিকে নজর পড়তে সম্বিৎ ফিরল। তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, শির ঝুঁকিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে খাস মুনশি। হাতের ইশারায় নবাব তাকে চলে যেতে বলে চোখ বুজে ফের ডুব দিলেন গভীর চিন্তায়।
ফরাসের উপরে গিরদায় ঠেস দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে আছেন নবাব। পিছনের দেওয়ালের মস্ত জাফরির ফাঁক দিয়ে গায়ে এসে পড়েছে দুপুরের রোদ। জগৎশেঠের চিঠি ঝাঁঝরা করে দিয়েছে নবাবের অহংবোধকে। অপমানে জ্বলেপুড়ে যেন খাঁক হয়ে যাচ্ছে বুকের ভিতরটা। কিন্তু কী হবে এখন? শাহজাদা আলি গোহর যে প্রায় পাটনার দরজায় এসে হাজির হয়েছেন। তাহলে কি লড়াই অনিবার্য? কিন্তু কোথা থেকে নবাব জোগাড় করবেন লড়াইয়ের খরচ?
নবাব বুঝলেন, এখন যা পরিস্থিতি তাতে এ যাত্রা পরিত্রাণ পেতে ক্লাইভকে ইয়াদ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। এতে আবার হয়তো ইংরেজ-ফাঁস জোরালো হয়ে চেপে বসবে তাঁর গলায় কিন্তু অন্য উপায় তো কিছু নেই। তবুও সাহায্য চেয়ে ক্লাইভকে চিঠি লিখতে কেমন যেন কুণ্ঠাবোধ করতে লাগলেন নবাব। এতদিন তিনি চিঠি লিখে ইংরেজদের মদত চাননি, এই অন্তিম সময়ে কাতর আর্তি জানালে ক্লাইভও যদি মুখ ফিরিয়ে নেন? যদি বলেন, এত অল্প সময়ে লড়াইয়ের আনজাম করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তখন?
ঘেমে উঠলেন মিরজাফর খাঁ। গায়ের উপরে বিছানো সোনার সুতোয় বোনা নকশাদার চাদরটা ছুড়ে ফেললেন পাশে। আনচান করছে শরীর। সোজা হয়ে বসে অস্থির ভাবে ঘন ঘন টান দিতে লাগলেন ফরসিতে।
এমন সময় অচানকই ঝড়ের গতিতে নবাবের খাস দরবারে হাজির হলেন দেওয়ান উমিদ রায়। সঙ্গে উইলিয়াম ওয়াটস ও ওয়ারেন হেস্টিংস।
দরবারের প্রাক্তন ও বর্তমান রেসিডেন্টকে দেখে চমকে উঠলেন নবাব। এদের আগমনের তো কোনও পয়গাম ছিল না। উমিদ রায় এগিয়ে এসে জানালেন, ‘ওয়াটস সাহেব খুশখবর নিয়ে এসেছেন হুজুর।’
কৌতূহলী হয়ে পড়লেন নবাব। ‘খুশখবর? মতলব?’
ওয়াটস ও হেস্টিংস কয়েক পা এগিয়ে এসে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একসঙ্গে তসলিম জানালেন। ওয়াটস বললেন, ‘গভর্নর সাহেব ফৌজ নিয়ে কলকাতা থেকে রওনা হয়েছেন।’
খুশিতে উদ্ভাসিত হল মিরজাফরের মুখচোখ। বুকের উপর চেপে বসা দুশ্চিন্তার পাষাণভার যেন সরে গেল এক লহমায়। তিনি ক্লাইভের মদত চাননি, এই মদতের কিম্মত কত হবে তা নিয়ে দরকষাকষি করেননি ক্লাইভ, তবুও এই আওকাতে নবাবকে সাহায্য করতে তিনি ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসছেন। ক্লাইভের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতায় পানিতে ভিজে উঠল মিরজাফরের দুই চোখ। পলকে ভেসে গেল ইংরেজদের প্রতি তাঁর নফরতি, কেরাহিয়াত। আবেগে ভেসে তিনি ভাবতে লাগলেন, আজ এই দুনিয়ায় ক্লাইভের মতো এমন তাগদবাজ দোস্ত তাঁর আর কে আছে? নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলেন নবাব। তিনি ভুল বুঝছিলেন ক্লাইভ সাহেবকে। আজ যেন ফের নতুন করে তিনি উপলব্ধি করলেন ক্লাইভ কখনোই তাঁর দুশমন নন, বিলকুল সাচ্চা দোস্ত। না হলে এভাবে বিনা পরোয়ানায় মুর্শিদাবাদে আসার তকলিফ কেন ওঠাবেন ক্লাইভ? তিনি সচমুচ তাঁর ভালাই চান। না হয় তিনি নবাবকে বন্দি করেই রাখলেন পিঁজরায়, লেকিন সে পিঁজরা তো সোনার। সেখানে জহমত, জিগরপস্তানি নেই। আছে কেবল ভোগ করার অধিকার। ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট যা কিছু সেসব ক্লাইভ সাহেবই সামলে নেবেন। এ ব্যবস্থা মন্দ কী? মসনদের উপরে তাঁর অধিকারকে সালামত রাখার জন্য এর চেয়ে বেহেতরিন তরিকা আর কী হতে পারে? ক্লাইভের মতো দোস্তকে দুশমন ভাবা তাঁর বদিয়তি। গুনাহের কাজ। ‘আস্তাগফেরুল্লাহ।’
দছমালে চোখ মুছলেন নবাব। তারপরে ওয়াটসের মুখপানে চেয়ে আবেগতাড়িত গলায় মিরজাফর বললেন, ‘কর্নেল আসছেন? সচ বলছেন আপনি? ফৌজ নিয়ে তিনি আসছেন?’
ওয়াটসের মুখে স্মিত হাসি। শির ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘ক্লাইভ সাহেব আপনার দোস্ত। আপনার তকলিফের কথা শুনে তিনি কি চুপ করে বসে থাকতে পারেন?’
‘কর্নেলের আরমান কী?’
‘শাহজাদার সঙ্গে লড়তে চান নবাব। আপনার মসনদকে সালামত রাখতে চান। মুর্শিদাবাদ হয়ে তিনি পাটনায় যাবেন। আপনাকে ফৌজ তৈয়ার রাখতে বলেছেন।’
‘জরুর। নবাবজাদা মিরন ফৌজ নিয়ে যাবে তাঁর সঙ্গে।’
ওয়াটস বললেন, ‘শুনেছি আপনি মোটা নজরানা দিয়ে রুখতে চাইছিলেন নবাবজাদাকে।’
‘ঠিকই শুনেছেন। তবে সে পথ বন্ধ। জগৎশেঠজি টাকা দিতে পারবেন না।’
ওয়াটস বললেন, ‘ভালোই হয়েছে। নজরানার কথা ভুলে যান। ক্লাইভ সাহেব মনে করেন আপনার ও মসনদের সালামতির জন্য লড়াই হল একমাত্র তরিকা। চিঠিতে সব লিখেছেন তিনি। পড়ে দেখুন।’ এই বলে ক্লাইভের চিঠিটা নবাবের হাতে তুলে দিলেন ওয়াটস।
চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরলেন নবাব। ক্লাইভের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাবোধে ফের তাঁর দুচোখে চিকচিক করে উঠল জল। অক্ষরগুলো সব চোখের জলে ঝাপসা হয়ে গেল।
.
পাটনায় ঢুকে পড়েছেন শাহজাদা আলি গোহর। গোটা শহর জুড়ে তাণ্ডব চলছে। আগুনে পুড়ছে শহর। চলছে লুঠতরাজ। ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে পালাচ্ছে আম-আদমি। পালিয়ে গিয়েছেন পাটনার ইংরেজ কুঠির কুঠিয়াল অ্যামিয়ট সাহেব। প্রাণ বাঁচাতে কলিগসদের নিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন গঙ্গার বুকে নৌকায়। নিরাপদ দূরত্ব থেকে পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছেন। এখনও মুর্শিদাবাদ থেকে সাহায্য আসার কোনও খবর তাঁর কাছে নেই।
ওদিকে নায়েব রামনারায়ণ পাটনা দুর্গের দুয়ার এঁটে বসে রয়েছেন। কয়েকদিন আগে তাঁকে তলব করেছিলেন শাহজাদা। শাহি ফৌজের সেনাপতি মহম্মদ কুলি খাঁ অভয় দিলেও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে শাহজাদার তাঁবুতে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন রামনারায়ণ। শাহজাদার মবারকে নজর পেশ করেছিলেন একশো এক আশরফি। এ নিয়ে অবশ্য এখন রামনারায়ণজির কম আফশোস নেই। কেবলই মনে হচ্ছে আশরফিগুলো ফালতু গচ্চা গেল। ও একেবারে অপাত্রে দান।
আসলে শাহজাদার তাঁবুতে গিয়ে সরেজমিনে সব কিছু দেখে চোখ খুলে গিয়েছে রামনারায়ণের। তিনি বুঝেছেন আলি গোহর একজন হতদরিদ্র অসহায় মানুষ। নেহাতই অপগণ্ড তাঁর দলবল। টুটাফাটা, রংচটা তাঁবুর কানাত দেখেই বোঝা যায় শাহজাদার আর্থিক হাল কী। হাতিয়ার, রসদের জোগানও এদের বড় একটা নেই। আর ফৌজ বলতে যা আছে, তা হল লুঠতরাজের নামে এক জায়গায় জড়ো হওয়া হাড়হাভাতে, আনপঢ় আদমির দল। অভুক্ত, হাড়-জিরজিরে চেহারা বেশিরভাগের। ভালো করে হাতিয়ারও ধরতে শেখেনি। কোম্পানির মাত্র কয়েকশো সুশিক্ষিত গোরা পল্টনের সামনে এই ফৌজ যে নিমেষে ছারখার হয়ে যাবে তা নিয়ে রামনারায়ণের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
যাই হোক, মোগল শাহজাদা বলে কথা, তাঁর দরবারে হাজির হয়ে সেলাম ঠুকে নজরানা পেশ করলেন রামনারায়ণ।
শাহজাদা বসেছিলেন একটা তক্তপোশের উপরে বসানো রাংতায় মোড়া কাঠের কুরসিতে।
রামনারায়ণের হয়ে মহম্মদ কুলি গুজারেশ করলেন, ‘জাঁহাপনা রামনারায়ণজি আপনার একান্ত অনুগত। কাজেই পাটনা জয় করার জন্য খুন, পসিনা ঝরানোর কোনও জরুরত নেই। আপনার মবারকে হাজির হয়ে একথাই বলতে এসেছেন তিনি।’
ফের একবার তসলিম জানালেন রামনারায়ণ।
‘শাহজাদা খুশ হুয়া।’ আলি গোহরের গম্ভীর মুখে এক চিলতে হাসি খেলে গেল।
রামনারায়ণের জন্য ইনাম এল। খেলাত এল। ইনাম আর খেলাত দেখে শাহজাদার উপরে রামনারায়ণের ভক্তি টুটে গেল। খেলাত বলতে মোটা দাগের জরির কাজ করা সস্তা দরের একখানা পোশাক। এত সস্তা দরের কাপড় রামনারায়ণের হাজিরা-দাখিলারাও গায়ে ওঠায় না। আর ইনাম হল ঝুটা মোতির মালা ও হাতলে হিরের বদলে পলকাটা কাঁচ বসানো তলোয়ার।
মনের অভক্তি প্রকাশ না করে শির ঝুঁকিয়ে এই খেলাত ও ইনাম গ্রহণ করলেন রামনারায়ণ। তারপর তিনি নিজের পোশাক বদলে খেলাতি পোশাক পরতে পাশের তাঁবুতে ঢুকলেন। দেহের আকারের তুলনায় ছোট খেলাতি পোশাক কোনওরকমে গায়ে চড়িয়ে মাথায় পাগড়ি চাপিয়ে কোমর থেকে তলোয়ার ঝুলিয়ে, ঝুটা মোতির মালা গলায় পরে শাহজাদার সামনে এসে দাঁড়ালেন রামনারায়ণ। মাপে খাটো খেলাতি পোশাক একেবারে এঁটে বসেছে গায়ে। হাঁসফাস অবস্থা স্থূলকায় রামনারায়ণের। তসলিম জানানোর জন্য ঈষৎ সামনে ঝুঁকতেই চাপ খেয়ে পটাং করে ছিড়ে গেল কোমরের দড়ি। কোমর থেকে পোশাক খুলে পড়ার উপক্রম। দুই দাখিলা ছুটে এসে সামাল দিল। বড় রকমের বেইজ্জতির হাত থেকে বাঁচলেন রামনারায়ণ। অতঃপর দ্রুত পোশাক বদলানোর তাঁবুতে ঢুকে নিজের পোশাক পরে ধাতস্থ হলেন।
আলি গোহর সরল মনে ধরেই নিয়েছেন যে পাটনার নায়েব রামনারায়ণ তাঁর আনুগত্য শিকার করে নিয়েছেন, অতএব পাটনা জয় হয়েই গিয়েছে। এক হুকুমনামা জারি করে মহম্মদ কুলির ভাই মির্জা হাসানকে পাটনার ডেপুটি সুবাদার পদে নিযুক্ত করলেন শাহজাদা। ডেপুটি সুবাদারের দেওয়ানের পদে নিযুক্ত হলেন রামনারায়ণ। তিনি এই হুকুমত মাথা পেতে গ্রহণ করে বললেন, ‘জাঁহাপনা এবারে ইজাজত দিন। আমি কেল্লায় ফিরে যাই। পাটনার কুরসিতে মির্জা হাসানকে বসানোর আনজাম করি।’
খুশি মনেই ইজাজত দিলেন আলি গোহর।
কেল্লায় ফিরেই নিজের সেপাইদের ডেকে কেল্লার সব দুয়ার বন্ধ করে দেওয়ার হুকুম দিলেন রামনারায়ণ। কেল্লার বুরুজে বুরুজে মোতায়েন করলেন কামান। কেল্লার চারপাশে মোতায়েন করলেন হাতিয়ারবন্ধ সেপাইদের। আর একখানা চিঠি ঠুকে মহম্মদ কুলিকে জানালেন, ‘…ভেবেছেন কী আপনারা? রাজা রামনারায়ণ আপনাদের হুকুমের গোলাম? শাহজাদা আমার দেশে এসেছেন, তাঁর সম্মানে আমি দরবারে হাজিরা দিয়েছি, নজরানা দিয়েছি—ব্যস সব সবক, সহবত চুকে গিয়েছে। মনে রাখবেন একমাত্র নবাব মিরজাফর খাঁ হলেন আমার মনিব। আমি আর কাউকে মানি না। পাটনার কেল্লা দখল করবেন, এই যদি আপনাদের মনসুবা হয় তো লড়াই করেই আপনাদের তা দখল করতে হবে।…’
এমনিতে রামনারায়ণের মতো ভীতু লোকও গলার শির ফুলিয়ে লড়াইয়ের কথা লিখলেন, তার কারণ দূত মারফত খবর এসেছে গোরা পল্টনদের নিয়ে পাটনার প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছেন ক্লাইভ। তাঁর সঙ্গে রয়েছে নবাবজাদা মিরন ও নিজামতের ফৌজ।
রামনারায়ণের চিঠি পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন মহম্মদ কুলি। পাটনা বিজয়ের মনসুবায় ফৌজ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মুহুর্মুহু গোলা এসে আছড়ে পড়তে লাগল কেল্লার উপরে। কিন্তু কোথায় ক্লাইভ? কোথায় তাঁর বাহিনী? বিচলিত হয়ে পড়লেন রামনারায়ণ। বুঝলেন, আগেভাগে অমন একখানা কড়া চিঠি লেখাটা মস্ত আহাম্মকির কাজ হয়ে গিয়েছে। এতদিন ঘন ঘন পেশকাশ, সওগাত পাঠিয়ে মহম্মদ কুলিকে বশ করে রেখেছিলেন, ক্লাইভ সাহেব না এসে পড়া পর্যন্ত এই কায়দাতেই আর একটু সময় অতিবাহিত করা উচিত ছিল।
শাহজাদার বাহিনীতে রয়েছেন জাঁ ল ও তার অধীনে কয়েকজন দক্ষ ফরাসি গোলন্দাজ। এই সামান্য শক্তি নিয়েই রামনারায়ণকে অতিষ্ট করে তুললেন ল সাহেব। গোলার আঘাতে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হল কেল্লা। রামনারায়ণের গোলন্দাজরা তেমন কোনও প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারল না। পাটনার কেল্লা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে লাগলেন রামনারায়ণ। ঘাটে নৌকো প্রস্তুত রাখার হুকুম দিলেন। যদিও তখনও মনে তাঁর আশা, যে কোনও মুহূর্তে ক্লাইভ এসে পড়বেন।
দু’একটা গোলা দিবার টপকে কেল্লার ভিতরে এসে পড়ল। রামনারায়ণ তড়িঘড়ি কেল্লার ছাতে উঠে দূরবিনে চোখ রাখলেন। আহা এখনও যদি ক্লাইভ এসে পড়েন তো একটা হিল্লে হয়ে যায়। দূরে ধু-ধু করছে আইরান প্রান্তর। পশ্চিম দিক থেকে ভেসে আসছে শাহজাদার সেপাইদের উল্লাসধ্বনি। ভয়ে কাঁপছেন রামনারায়ণ। ফুরিয়ে আসছে বিকেলের আলো। আজ রাতেই হয়তো কেল্লায় ঢুকে পড়বে দুশমনেরা। পালানো ছাড়া আর উপায় নেই। সন্ধের মুখেই পালাতে হবে। কেল্লার ঘাটে প্রস্তুত হয়ে আছে বজরা।
দুম! দুম! দুম!
হঠাৎই পুব দিক থেকে ভেসে এল কামানের গর্জন। চমকে গিয়ে প্রায় উলটে পড়ছিলেন রামনারায়ণ। নিজেকে সামলে নিয়ে শব্দের দিক আন্দাজ করে ফের চোখ রাখলেন দূরবিনে। তাঁর চোখে পড়ল আকাশে উড্ডীন কোম্পানির পতাকা। দূরে ধুলোর ঝড়।
এসে পড়েছেন! এসে পড়েছেন কর্নেল ক্লাইভ! আনন্দের চোটে উদ্বাহু হয়ে দুর্গের ছাতে ধেই ধেই করে নাচতে লাগলেন রামনারায়ণ। জয় বজরংবলী! জয় সিয়ারাম!
‘ভাগো ভাগো! গোরা পল্টন আসছে। আসছেন সাবিৎজঙ্গ। বাঁচতে চাও তো পালাও’—শোরগোল পড়ে গেল আলি গোহরের সেপাইদের মধ্যে। চারিদিকে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। শত্রুপক্ষকে লক্ষ্য করে দূর থেকে তখন উড়ে আসছে কোম্পানির গোলন্দাজদের ছোড়া একের পর এক কামানের গোলা। সে আক্রমণে ঝাঁঝ মারাত্মক।
বিশৃঙ্খল বাহিনীকে সংহত করার জন্য ল সাহেব তখন গলার শির ফুলিয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছেন–‘ডরো মাত! ফাইট! ফাইট! ফাইট এগেইনস্ট দ্য এনিমি…’
কিন্তু কে কার কথা শোনে! পলাশির যুদ্ধের পর থেকে এদেশীয় সেপাইদের কাছে ক্লাইভ ও তাঁর ফৌজ ভয়ানক এক আতঙ্ক। লড়াই ছেড়ে পালাতে লাগল শাহজাদার সেপাইরা। ঘাবড়ে গিয়ে শাহজাদা নিজেও পালালেন। পালালেন মহম্মদ কুলি। জাঁ ল একা একা আর কী করবেন? অগত্যা তাঁকেও পালিয়ে যেতে হল। শাহজাদার গোটা বাহিনি ছত্রখান। মহম্মদ কুলি পালালেন এলাহাবাদের দিকে। শাহজাদা ধরলেন লখনউয়ের পথ। অনুচরদের নিয়ে জাঁ ল ছত্রপুরের দিকে সরে পড়লেন।
ক্লাইভ ঢুকলেন পাটনা শহরে। কিন্তু কার সঙ্গে লড়াই করবেন তিনি? ধারেপাশে শত্রুর কোনও চিহ্ন নেই। গোটা শহর জুড়ে বিরাজ করছে শ্মশানের স্তব্ধতা। জায়গায় জায়গায় পথের উপরে পড়ে রয়েছে শাহজাদার ফৌজের সেপাইদের লাশ। হুড়োহুড়ি করে পালানোর সময় পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছে অনেকে। কেল্লার আশেপাশের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে তাণ্ডব চালিয়েছে শাহি ফৌজ। বাতাসে উড়ছে পোড়া ছাই। কোথাও ধিকিধিকি জ্বলছে আগুন। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে।
প্রশান্তি ক্লাইভের মনে। আর যাই হোক লড়াইয়ের ঝক্কি পোহাতে হল না। সেই চিরাচরিত উদ্ধত ভঙ্গিতে পাটনার কেল্লার সদর দেউড়িতে এসে দাঁড়ালেন ক্লাইভ।
বিশাল বপু নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে ক্লাইভের পায়ে লুটিয়ে পড়ে রামনারায়ণ বললেন, ‘আমি আপনার বান্দা হুজুর। আপনার জন্য ফের একবার নয়া জিন্দেগি লাভ করলাম। হুজুর আমার বজরঙ্গবলী। জয় সিয়ারাম!’
অদূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল নবাবজাদা মিরন। সে আশা করেছিল ক্লাইভের সামনে লড়াইয়ে বাহাদুরি দেখিয়ে নাম কিনবে। লেকিন লড়াই-ই যে হল না। ক্লাইভের নামেই কাজ হাসিল? খোদ মোগল শাহজাদা পালিয়ে গেল পাটনা ছেড়ে?
মিরন স্তম্ভিত। বাক্যহারা।
.
