৫৬
ফরাসের উপরে কাত হয়ে শুয়ে আছেন মিরজাফর। হাতে ফরসির নল। পাশে রয়েছে গড়গড়া। সামনে রাখা রুপোর রেকাবিতে উপচে পড়ছে তেল চপচপে ভাজা মাংসের টুকরো। আরেকটি রেকাবির উপরে রাখা শরাবের বোতল ও কাট গ্লাসের পানপাত্র। মাথার উপরে ঝুলছে অতিকায় সুদৃশ্য ঝাড়বাতি। দুলছে টানা পাখা। জাফরি গলে ঢুকে আসা ভাগীরথীর হাওয়ায় থিরথির করে কাঁপছে বেলোয়ারি ঝাড়ের মোমবাতির শিখা, কুলুঙ্গিতে জ্বলতে থাকা চিরাগবাতি। নবাবের পোষা কাবলি বেড়াল গুটি পাকিয়ে শুয়ে আছে নবাবের পায়ের কাছে। জুলজুলে চোখে চেয়ে আছে একটা দেওয়ালগিরির আলোকে ঘিরে উড়তে থাকা একটি পতঙ্গের দিকে।
নেশার ঘোর নবাবের চোখে, তবে চেতনা অবসন্ন নয়। মন তোলপাড়। তীব্র অশান্তিতে ভুগছেন নবাব। এই অশান্তির কারণ রায়দুর্লভ। নবাবের দুশ্চিন্তা, সত্যিই কি ইংরেজদের মদতে রায়দুর্লভ তাকে মসনদচ্যুত করবেন? ফের ইনকিলাব হবে মুর্শিদাবাদে?
নবাবের সমুখে ফরাসের উপরে হাঁটু মুড়ে বসে আছেন নন্দকুমার। রায়দুর্লভের দেওয়ান। তাঁকে একান্তে ডেকে পাঠিয়েছেন নবাব। তিনি জানেন নন্দকুমারের নজর আছে দেওয়ানের পদের উপরে। পদোন্নতির লোভ দেখিয়ে তাঁকে কাছে টেনেছেন নবাব।
জ্বলজ্বল করছে নন্দকুমারের চোখদুটো। নবাবের কাছ থেকে যে গোপন বার্তা তিনি পেয়েছিলেন, তাতে ছিল তাঁর স্বপ্নপূরণের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। নন্দকুমার খুশিতে ভাসছেন, এবারে নিশ্চয়ই নসিবের চাকা ঘুরবে।
রায়দুর্লভ মনে করেন, তাঁর অতি বিশ্বস্ত কর্মচারী নন্দকুমার। কিন্তু তিনি যে নবাবের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন, দেওয়ান পদটার উপরে তাঁর নজর রয়েছে, এসবের বিন্দুমাত্র আঁচ পাননি রায়দুর্লভ। তিনি নবাবের কাছে নন্দকুমারকে পাঠালেন বিশেষ একটা কাজে। একই সঙ্গে নবাবের গোপন তলব পেলেন নন্দকুমার। দুটি বিষয় কাকতালীয়।
নবাব বললেন, ‘সেপাইরা পাটনা থেকে ফিরে হুজ্জুতি বাধিয়েছে শুনেছেন তো?’
‘জি হুজুর।’ জবাব দেন নন্দকুমার।
‘কারণটা কী জানেন?’
‘জি হুজুর। দেওয়ানখানা থেকে সেপাইদের পাওনাগণ্ডা মেটানো যায়নি।’
‘দেওয়ানখানার জাবেদা খাতা তো আপনার হেফাজতেই থাকে।’
‘জি হুজুর।’
‘সেপাইদের মাহিনা বাকি কেন? সত্যিই কি তোশাখানায় টাকা নেই?’
‘টাকা যথেষ্টই আছে হুজুর। হালে তামাম বাংলার শালিয়ানা জমা পড়েছে।’
‘তাহলে?’ প্রশ্ন করেন নবাব।
‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। দেওয়ানজিকে ডেকে এ বিষয়ে পুছতাছ করলে ভালো হয়।’
ফরসির নলটা ছুড়ে ফেলে শরাবের পাত্র হাতে নিয়ে মিরজাফর বললেন, ‘দেওয়ানজিকে ডেকেই যদি শুধোব তো আপনাকে তলব করলাম কেন?’
সামান্য ইতস্তত করে নন্দকুমার বললেন, ‘রায়দুর্লভজি এখন নিজামতের টাকা সরিয়ে নেওয়ার মতলবে আছেন। কোনও খরচই মঞ্জুর করছেন না। তবে আমি কড়া নজর রেখেছি। দেওয়ানখানার কয়েকজন কর্মচারীকেও হুঁশিয়ার করে রেখেছি। তোশাখানার টাকা যেন তছরুপ না হয়।’
‘তোশাখানায় এখন কত টাকা আছে তার হিসেব আমার চাই। আপনি দিতে পারবেন তো?’
‘বেশক পারব হুজুর।’
‘ইংরেজদের সঙ্গে দেওয়ানজির কী গুফতগু চলছে, সেই পয়গামও আমার চাই।’
‘দেওয়ানজি কলকাতা যেতে চান। আপনার ইজাজত চেয়েছেন।’
এই বলে কোমরবন্ধনী থেকে একটা কাগজ বের করে নবাবের হাতে তুলে দিলেন নন্দকুমার।
‘কভি নেহি। আপনি এই আরজি মঞ্জুর করবেন না আব্বাহুজুর।’
দু’জনের আলোচনার মধ্যে সহসা তৃতীয় মানুষের অনুপ্রবেশে চোখ তুলে তাকালেন মিরজাফর খাঁ। চমকে ঘুরে তাকালেন নন্দকুমার। দু’জনের অজান্তে ঘরে প্রবেশ করেছে মিরন। নবাবজাদার কাঁধে বসে আছে তার পোষা বাজপাখি। কাঁধ থেকে পাখিটাকে হাতে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে মিরন বলল, ‘নিজামতের দৌলত নিয়ে কলকাতা পালানোর ফন্দি করছেন রায়দুর্লভজি।’
মিরজাফর বললেন, ‘সে খেয়াল রাখবেন নন্দকুমার।’
‘দেওয়ানজির আর্জি মঞ্জুর করবেন আপনি?’ বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করে মিরন।
‘চোখের নজর থেকে আপদ বিদায় হওয়াই তো ভালো।’
মিরন বলল, ‘আপনি হুকুমত দিলেও রায়দুর্লভজিকে কলকাতা যেতে দেব না আমি। পহেলে উনি সেপাইদের পাওনা মেটাবেন, তারপরে অন্য কথা। এই আমি সাফ বলে রাখলাম।’
মিরনের কথায় সায় দিয়ে নন্দকুমার বললেন, ‘নবাবজাদা সহি বাত বলছেন।’
‘আনেওয়ালা তিন দিনের মধ্যে দেওয়ানজি যদি সেপাইদের পাওনা না মেটান তো ফির হামলা করব দেওয়ান সাহেবের হাভেলিতে। বেশক কোতল করে ছাড়ব।’
বাপ-বেটার বাতচিতের মধ্যে থাকা কাম্য নয় ভেবে নন্দকুমার বললেন, ‘আমি আসি হুজুর?’
নবাব বললেন, ‘আসুন। হুঁশিয়ার থাকবেন। যা বললাম, ইয়াদ রাখবেন।’
‘জি হুজুর।’ নবাবকে তসলিম জানিয়ে বিদায় নিলেন নন্দকুমার।
মিরন বলল, ‘এক খুশখবর আছে আব্বাহুজুর।’
কাবলি বেড়ালের লোমশ গায়ে হাত বোলাচ্ছিলেন নবাব। চকিতে মুখ তুলে তাকালেন।
‘জাঁ ল-কে একটা চিঠি লিখেছিলাম আমি।’
চমকে উঠলেন নবাব। এ বিষয়ে কিছুই তিনি জানতেন না।
‘আমাকে না জানিয়ে কেন চিঠি দিলে বেটা? রায়দুর্লভ, রামনারায়ণ, রাজারাম সবাই এখন ইংরেজদের ঘুঁটি। চারিদিকে ঘুরছে কাসিদ । তোমার চিঠির কথা ফাঁস হয়ে গেলে ফের চোখ রাঙাবে ইংরেজরা। গুসসা হবে ক্লাইভ সাহেবের।’
ক্লাইভভীতিতে ফের আচ্ছন্ন হলেন নবাব। অদ্ভুত দোলাচল মন তাঁর। কখনও ক্লাইভের মুঠো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা ভাবেন, পরক্ষণেই আবার ভয়ে কুঁকড়ে যান।
নবাবের কথা শুনে হেসে ওঠে মিরন বলে, ‘নসিবের চাকা ঘুরছে আব্বাহুজুর। এবারে ইংরেজদের তাড়াব। লালমুখো ইবলিশদের ভাগীরথীর পানিতে ডুবিয়ে মারব।’
‘কী করে? সেই তাগদ কোথায় আমাদের?’
‘তাগদ জোগাবেন জাঁ ল। তাগদ জোগাবে ফরাসিরা। দক্ষিণের পয়গাম জানেন?’
‘কী পয়গাম?’
‘মুসিবতের মধ্যে পড়েছে ইংরেজ। ফরাসিদের সঙ্গে লড়াইয়ে জেরবার।’
মুসিবত? ইংরেজদের মুসিবত? উৎসাহিত হয়ে ওঠেন নবাব। তাঁর মন নেচে ওঠে ইংরেজদের নাগপাশ ছিন্ন করার আশায়। ক্ষণেক আগে দেহের অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠা সন্ত্রস্ত ভাবটা দূর হয়ে যায়। উত্তেজনায় হাতে ধরা পাত্র থেকে শরাব ছলকে পড়ে নকশাদার গালিচায়। ‘সচ বলছ?’
‘বিলকুল সচ। জাঁ ল লিখে পাঠিয়েছেন। বেনারস থেকে চিঠঠি নিয়ে এসেছে অঙ্গন সিং।’
এই বলে জেবের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে চিঠিটা বের করে মিরজাফরের হাতে তুলে দেয় মিরন।
চিঠি পড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়েন নবাব। মনিবের মনোযোগ হারিয়ে কাবলি বেড়ালটা নবাবের কোল থেকে লাফিয়ে নামে গালিচার উপরে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মিরনের কাঁধে বসে থাকা বাজপাখিটার দিকে। মিরনের ঠোঁটের কোণায় হাসি। সে চেয়ে আছে তার আব্বাহুজুরের মুখপানে। ধীরে ধীরে নবাবের বিমর্ষ মুখটা খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
জাঁ ল লিখেছেন, ‘…ইংরেজদের সম্বন্ধে নবাবের মোহভঙ্গ হয়েছে জেনে খুশি হলাম। আপনি লিখেছেন ইংরেজরা আপনাদের আজাদি কেড়ে নিয়েছে। এমন যে হবে তা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। যাই হোক জনাব, জানবেন, আপনাদের মদত দেওয়ার জন্য ফরাসিরা তৈয়ার আছে। ইংরেজরা কারও দোস্ত হয় না। ফরাসিরা অনেক দিলখোলা মানুষ। দোস্তির কিম্মত বোঝে। ইংরেজদের মতো হরপল কৌশল করে না। আমাদের সঙ্গে দোস্তি হলে তফাৎটা আপনারা বুঝবেন। সিরাজদ্দৌলার আমল পর্যন্ত নিজামতের নিয়মকানুন মেনেই আমরা সওদা করেছি। ইংরেজরা কোনও নিয়মেরই তোয়াক্কা করে না। ইংরেজদের যদি আমরা এদেশ থেকে উৎখাত করতে পারি তো দেখবেন আমরা শুধু সওদাই করব, নিজামতের কোনও বিষয়ে হস্তক্ষেপ করব না।
‘আপনি শুনলে খুশি হবেন, যে দক্ষিণে আমাদের হাতে জোর মার খাচ্ছে ইংরেজরা। ফোর্ট সেন্ট ডেভিড ইংরেজদের হাত থেকে আমরা কেড়ে নিয়েছি। কাউন্ট লালির নেতৃত্বে আমরা ওখানে দারুণ ভাবে এগোচ্ছি। আশা করছি মঁসিয়ে লালি দক্ষিণের সব ঘাঁটি থেকে ইংরেজদের উচ্ছেদ করে ছাড়বেন। তারপরে তিনি বেঙ্গলে আসবেন। আপনারা ইংরেজবিরোধী শক্তিকে মজবুত করতে থাকুন। আশা করছি খুব শিগগিরই আমাদের দু’পক্ষের জন্যই সুদিন ফিরবে বাংলায়…’
চিঠিটা মিরনের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ভাজা মাংস মুখে ফেলে আয়েস করে চিবিয়ে মিরজাফর বললেন, ‘সবই খোদাতালার মেহেরবানি বেটা।’
‘আব্বাহুজুর, এই ওয়াক্তে রাজারাম-রামনারায়ণ-রায়দুর্লভ–ইবলিশের এই তিন আওলাদকে খতম করব। পহেলে দেওয়ান রায়দুর্লভ। ফের মওত নাচাব রাজধানীতে।’ এই বলে হেসে উঠল মিরন। তার চোখমুখ ভয়ানক হিংস্র হয়ে উঠল। কাঁধে বসে থাকা প্রিয় বাজপাখির গায়ে হাত বুলিয়ে পাখির উদ্দেশে শুধোয়, কী রে বেগমজান মওত নাচবে তো?
কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল পাখি। বড় মনহুশ আওয়াজ।
মিরন বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে।
শরাবের বোতলটা হাতে নিয়ে তলানিটুকু একবারে গলায় ঢেলে দিলেন নবাব। টান দিলেন ডোরিতে। ছুটে এল সাকি।
‘শরাব লে আও।’
হঠাৎই যেন নবাবের শরীরে নয়া জোশ এসেছে। ধমনীতে তিরবেগে ছুটছে রক্ত। এই খুনজোশি খুশির। ক্লাইভের মুঠো থেকে বেরিয়ে এসে আজাদ চিড়িয়ার মতো আসমানে ডানা মেলার খোয়াবের। বিপাকে পড়েছে ইংরেজরা। মসিহা মঁসিয়ে লালি। সত্যিই বড় খুশির খবর শুনিয়ে গেল মিরন। দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে নবাবের মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত দীর্ঘদিনের অবসাদ।
নেশা জমাট বাধার পর টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ালেন নবাব। তাঁর বেসামাল অবস্থা দেখে সাহায্যের জন্য ছুটে এল এক দাখিলা। হাতের ইশারায় তাকে সরে যেতে বলেন নবাব। নিজেই এলোমেলো পদক্ষেপে এগিয়ে চললেন।
জেনানামহলের অন্দরে অলিন্দের পাশে দাঁড়িয়ে আসমানে চাঁদের পানে উদাস দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন মণি বেগম। কালো মেঘ এসে ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলছে চাঁদকে। পরক্ষণেই মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে চাঁদ। মণি বেগম ভাবছিলেন ইনসান যেন এই চাঁদের মতো। ইতস্তত উড়ে বেড়ানো কালো মেঘ যেন বদ কিসমতি। থেকে থেকে ইনসানকে গহীন আঁধারে ডুবিয়ে দেয়।
‘মণি!’
নবাবের গলার ঘুরে তাকালেন মণি বেগম। টলমল পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন নবাব।
‘সরতাজ!’ দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে নবাবের হাতটা ধরেন মণি বেগম।
‘আজ বড় খুশির দিন মণি। খবরটা নিজের মুখে শোনাতে এলাম তোমাকে।’
দছমালে নবাবের কপালের ঘাম মুছে মণি বেগম বললেন, ‘বড্ড ঘেমেছেন। হেকিমসাহেব বলেছেন শরাব আপনার জন্য খতরনক। তবুও আপনি শুনবেন না কোনও কথা।’
‘নিষেধ করো না মণি। আজ খুশিকা দিন।’
সিরাজদ্দৌলার বিয়েতে নাচনেওয়ালি মণি বাই মুর্শিদাবাদে মুজরো করতে এসে ধরা পড়েছিল সিপাহসালার মিরজাফরের হাতে। সেদিন বয়সে প্রবীণ মিরজাফরকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি সে। তবু পুরুষের মন ভোলাতে ছলাকলায় দক্ষ ষোড়শী মণি বাই প্রৌঢ় মানুষটার কামনার আগুনে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল সুখ খরিদের নেশায়। তারপর ভাগীরথীর খাত বেয়ে গড়িয়ে গিয়েছে অনেক জল। মণি বাইয়ের নসিব বদলেছে। পশ্চিমদেশের গরিব ঘরের মেয়ে সেই মণি বাই আজ সুবে বাংলার নবাব-বেগম।
ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিপত্তি সবই আজ পেয়েছে মণি। সে সব কিছুই মিরজাফরকে কেন্দ্র করে। মানুষটাকে একটু একটু করে ভালোবেসেছে মণি। সেই ভালোবাসার মধ্যে শরীরী আবেগ নেই, কামনার আগুন নেই, আছে সুখ ও নিরাপত্তা খরিদ করার চিরন্তন আকুতি। মণি চায় আরও অনেক কাল মুর্শিদাবাদের মসনদে বহাল থাকুন মিরজাফর খাঁ। তাহলে সহি সালামত থাকবে সে। সহি সালামাত থাকবে মিরজাফর খাঁর ঔরসজাত তাঁর দুই পুত্র নজম ও সইফ। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠুক নজম ও সইফ, তাগদবাজ হয়ে উঠুক। মিরজাফরের অবর্তমানে তাদের আঁকড়ে ধরে সুখ দরিয়ায় ভাসতে চান মণি বেগম। যে অর্থ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি কোনওদিনও পাওয়ার কথা ছিল না মণির, নসিবের কুদরতিতে সেসব সে পেয়েছে। মণি সুখের কাঙাল। এই পড়ে পাওয়া সুখকে কিছুতেই হারাতে চায় না সে।
মুর্শিদাবাদের রাজনীতি যে খাতে ইদানীং বইছে তা নিয়ে বড় চিন্তিত থাকেন মণি বেগম। রায়দুর্লভ, রামনারায়ণ, রাজারামকে কাছে টেনে নিজামতের শাসনযন্ত্রকে ভাঙন ধরানোর খেলায় মেতেছেন ক্লাইভ। ক্রমশ হতাশায় ডুবছেন মিরজাফর খাঁ। এই হতাশা ভুলতে বড় বেশি করে আজকাল আঁকড়ে ধরছেন শরাবকে। অথচ হেকিমসাহেব বারবার তাঁকে নিষেধ করছেন শরাব ছুঁতে। শরাব নবাবের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।
মণি বেগম শুধোলেন, ‘কীসের খুশি নবাব?’
মণি বেগমের কথার জবাব দিলেন না মিরজাফর খাঁ। প্রবল আবেগে মণি বেগমকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে চুম্বনে চুম্বনে অস্থির করে তুললেন।
শিহরিত হয়ে ওঠেন মণি বেগম। দু’হাতে আঁকড়ে ধরে নবাবকে। এভাবেই সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, তাগদ, জোশ সব কিছুকে নাছোড় জেদে আঁকড়ে ধরতে চায় ইনসান।
.
দুপুরের খরতাপে দগ্ধ পথঘাট। কাশিমবাজার থেকে মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে চলেছে একটা আট বেহারার পালকি। দরদর করে ঘামছে কাহারেরা। তারা ছুটছে দ্রুত। আরোহীকে দ্রুত হিরাঝিলে পৌঁছে দিতে পারলে বাড়তি বখশিস মিলবে। আট কাহারের মুখের হুনহুনা হুনহুনা শব্দে দুপুরের স্তব্ধতা ভেঙে চুরমার।
পালকির সামনে ও পিছনে চলেছে চারজন করে বন্দুকধারী গোরা ঘোড়সওয়ার। এক ঘোড়সওয়ারের হাতে উড্ডীন কোম্পানির পতাকা। পালকির চলার ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীর গতিতে চলেছে ঘোড়সওয়ারেরা। পালকির অন্দরে আধশোয়া উইলিয়াম ওয়াটস। গরমে হাঁসফাঁস করছেন। ক্লাইভের জরুরি বার্তা নিয়ে তিনি চলেছেন নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।
মুর্শিদাবাদ নগরীতে প্রবেশের মুখে পথের পাশে উঁচু একটা ঢিবির উপরে দাঁড়িয়ে পালকি ও ঘোড়সওয়ারদের দেখছিল মাঝবয়সি একটা লোক। পরনে ময়লা জোব্বা। দুকানে হিরের দুল। গলা থেকে ঝুলছে দামি পাথরের একাধিক মালা। মাথার চুল এলোমেলো। মুখে অযত্নে বেড়ে ওঠা খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি। লোকটার উন্মাদ দশা। আপনমনে কী সব বিড়বিড় করে চলেছে সে। ধকধক করে জ্বলছে কোটরে ঢোকা চোখদুটো।
লোকটা অচানকই একটা পাথরের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে পালকি লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে। ‘ঠকাস’ শব্দে পাথরের টুকরোটা এসে পড়ল পালকির ছাতের উপরে। চমকে উঠলেন ওয়াটস। হইহই করে উঠল গোরা পল্টনেরা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কাহারেরা।
উন্মাদ লোকটা এক দৌড়ে ঢিবির উপর থেকে নেমে এসে গোরা পল্টনদের মুখোমুখি দাঁড়াল ও তাদের সঙ্গে মারমুখী মেজাজে তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে দিল।
আচমকা এই উৎপাতে থতমত খেয়ে কাহারেরা পালকি নামিয়ে রাখল মাটিতে। ব্যাপারটা কী বোঝার জন্য পালকি থেকে বেরিয়ে এলেন ওয়াটস। তাঁর মনে হল এই উন্মাদ লোকটা তার খুবই যেন পরিচিত। সহসা সকলকে হতচকিত করে দিয়ে ছুটে এসে ওয়াটসের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটা। শীর্ণ দুই হাতে ওয়াটসের গলা টিপে ধরল। আচমকা এই আক্রমণে বেসামাল হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন ওয়াটস। লোকটি তখন চিৎকার করছে, ‘বেতমিজ শয়তান, তোরা সিরাজকে বরবাদ করেছিস, আমাকে ঠকিয়েছিস, লাল কাগজ! লাল কাগজ! মনে পড়ে? লাল কাগজ!’
হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠে গোরা পল্টনেরা এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার উপরে। টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে আনল তাঁকে। এতক্ষণ চেনা চেনা ঠেকছিল, ‘লাল কাগজ’ কথাটা স্পষ্ট চিনিয়ে দিল লোকটাকে। উমিচাঁদ! ক্লাইভের পরিকল্পনায় প্রতারিত হয়ে টাকার শোকে উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন।
পথের মধ্যে গোলমাল দেখে ছুটে এল কোতোয়ালির সেপাইরা। তাদের হাতে উমিচাঁদকে তুলে দিল গোরা পল্টনেরা। সেপাইদের হাতে বন্দি উমিচাঁদ তখনও চেঁচাচ্ছেন, ‘…এই ইংরেজরা শয়তান—এদের ছলচাতুরীতে ভুলো না কেউ। এই খরিশের বাচ্চারা, সিরাজকে খুন করেছে, এবারে মসনদটা দখল করবে, পাথর ছুড়ে মারো ওদের, মুর্শিদাবাদ থেকে তাড়িয়ে দাও। পাথর ছুড়ে মারো, থেঁতলে দাও, মারো মারো…’
.
