পলাশির পরে – ৬৫

৬৫

সারা বছরই ফুলে ফুলে ভরে থাকে খোশবাগ। ঠিক যেন এক খণ্ড বেহেস্ত। চারিদিকে শুধু রঙের বাহার। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এই রঙের হাটের মাঝে শায়িত রয়েছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা। লতানো গোলাপের শাখাপ্রশাখা নুয়ে পড়েছে সিরাজের সমাধির উপরে। ঝুঁকে পড়ে সমাধির উপরের প্রস্তরখণ্ডকে যেন চুম্বন করছে অজস্র লাল গোলাপ। এই গাছগুলো লুৎফা নিজের হাতে লাগিয়েছিল। প্রাণশক্তিতে ভরপুর আগ্রাসী গোলাপলতা নিবিষ্ট ভাবে ঘিরে ধরেছে সমাধিকে। লুৎফা মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখে। তার মনে হয় এই গোলাপলতা যেন তারই অন্তরাত্মা। শাখাপ্রশাখার বেষ্টনীতে আগলে রেখেছে মাটিতে ঘুমিয়ে থাকা সিরাজকে। এ ভাবেই তো জিন্দেগিভর সিরাজকে আগলে রাখতে চেয়েছিল সে।

খোশবাগের একপ্রান্তে ছোট্ট একটা কোঠাবাড়ি। লুৎফুন্নেসার আবাসগৃহ। এখানেই সিরাজের কন্যা উম্মেসায়েরাকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। লুৎফার কাছে এই খোশবাগই হল জন্নত। এই স্থান ছেড়ে একদিনের জন্যেও অন্য কোথাও যাওয়ার কথা সে ভাবতে পারে না। যতদিন শ্বাস চলবে, রক্ত ছুটবে ধমনীতে ততদিন সে কেবল সিরাজের সেবা করে যেতে চায়। খোদার বহুত মেহেরবানি। তাই তিনি সিরাজের থেকে তাকে দূরে রাখেননি। কোনও হাবুজখানা লুৎফাকে কয়েদ করে রাখতে পারেনি। মিরন তাকে বন্দি করতে পারেনি জাফরাগঞ্জের হারেমে। কোনও ঘাতকের অস্ত্র তাকে খতম করতে পারেনি। তার শরীরটাকে ভোগ করতে পারেনি মিরন। সর্বশক্তিমান পয়গম্বর যেন সিরাজের সেবার জন্যই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তামাম চকবাজার আলোচনা করে – লুৎফা বেগম এক পাকিজা দিল খুশনসিব জেনানা। সচমুচ জন্নত থেকে এই মাটির দুনিয়ায় নেমে আসা এক ফেরেস্তা।

সিরাজের সমাধিতে লুৎফা রোজ ছড়িয়ে দেয় খোশবাগের বাগানের তরতাজা ফুল। জ্বেলে দেয় ধূপ, সমাধির উপরে রোজ নতুন একটা চাদর চড়িয়ে ঢেলে দেয় আতর। সন্ধেবেলায় সমাধির উপরে জ্বেলে দেয় চিরাগবাতি। বাতিদান হাতে জেয়ারত করে সিরাজের সমাধি। তারপর চুপ করে বসে থাকে সমাধির পাশে। মনের মধ্যে কাল্পনিক সংলাপ রচনা করে সে কথা বলে চলে। কোনও কোনও দিন রাত গভীর হয়ে যায়। নিবিষ্ট মনে বসে থাকে লুৎফা। দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। ‘সরতাজ তুমি আছ, আমাকে ঘিরে তুমি আছ, আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে মিলেমিশে আছে তোমার অস্তিত্ব। তোমার মওত হয়েছে আমি বিশ্বাস করি না।’

সেদিনও সন্ধে নামার পরে সমাধিতে চিরাগ, আগরবাতি জ্বেলে সিরাজের শিয়রে চুপ করে বসেছিল লুৎফা। তার অতীত জীবনের খুশনসিবির তসবির আনাগোনা করছিল চোখের পর্দায়। হঠাৎই পিছন থেকে নারী কণ্ঠের সম্ভাষণ শুনে সে চমকে ওঠে—‘বহেন!’

‘কে?’ চমকে গিয়ে লুৎফা ঘুরে তাকায়। মশালের মৃদু আলোয় সে দেখে অদূরে দাঁড়িয়ে আছে এক রহস্যময়ী নারী। বেশবাস ভৈরবীর মতো। মাথার চুলে জট পড়েছে। জট পাকানো চুল চুড়ো করে বাঁধা। পরনে রক্তাম্বর। শীর্ণ চেহারা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। গায়ে জড়ানো মেটে রঙের মলিদা বহু ব্যবহারে মলিন। হাতে রয়েছে একটা ত্রিশূল। সাপের জিভের মতো লকলক করছে ত্রিশূলের তিনটি ধারালো ফলা।

ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায় লুৎফা। কে এই নারী? মিরনের পাঠানো কোনও আততায়ী নয়তো? লুৎফা ভয়ে দুপা পিছিয়ে গিয়ে বলে, ‘ক-কে আপনি?’

‘ভয় পেয়ো না বহেন। আমি তোমার দুশমন নই।’ স্নেহ ঝরে পড়ে খুশ ইলহান কণ্ঠের আওয়াজে। রহস্যময়ীর মুখে ফুটে ওঠে এক টুকরো হাসির রেখা। লুৎফার মনে হয় সেই মুহূর্তে যেন কলঙ্কহীন চাঁদের উদয় হল এই খোশবাগে। ভৈরবী অতীব সুন্দরী। লুৎফার কৌতূহল বেড়ে যায়। ফের সে চাপা স্বরে শুধোয়, ‘কে আপনি? কী আপনার পরিচয়?’

‘পরিচয় না দিলে বুঝি তাড়িয়ে দেবে বহেন?’ কয়েক পা সামনে এগিয়ে এসে লুৎফার মুখোমুখি দাঁড়ায় রহস্যময়ী। ‘ভালো করে চেয়ে দেখো তো চিনতে পারো কি না?’

একখানা জ্বলন্ত চিরাগ হাতে নিয়ে রহস্যময়ীর মুখমণ্ডল ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে লুৎফা। বুক ধড়ফড় করতে থাকে তার। খুব যেন চেনা মুখ। গলার আওয়াজও যেন খুবই পরিচিত।

‘অত কী দেখছ অমন করে? চিনতে পারছ না বহেন?’

বিস্ফারিত হয়ে ওঠে লুৎফার চোখদুটো। ‘হি-রা-দি-দি!’

কথাটা বলেই মুখে হাতচাপা দেয় লুৎফা। বাতাসেরও কান আছে।

‘সহি আন্দাজ করেছ বহেন। আমি হিরা। দেওয়ান মোহনলালের বহেন।’

‘কোত্থেকে এলে তুমি? তোমাকে যে নিজামতের কাসিদরা এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে।’

‘ভেবো না বহেন। আমাকে ছোঁয়ার হিম্মত তাদের নেই।’

হিরার সঙ্গে সিরাজের সম্পর্কের কথা লুৎফার অজানা নয়। তখন লুৎফা ছিল সিরাজের জারিয়া। সিরাজের সঙ্গে আশনাই চলছে হিরার। মাঝে মাঝে লুৎফার হাত দিয়ে হিরার কাছে বার্তা পাঠাত সিরাজ। সেই সূত্রেই হিরার সঙ্গে লুৎফার আলাপ। তারপর হঠাৎই একদিন যেন কোথা থেকে কী হয়ে গেল। সিরাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হল হিরার। এরপর ফৈজিকে নিয়ে কিছুদিন বিভোর হয়ে থাকল সিরাজ। তারপর সিরাজের জীবনে লুৎফার প্রবেশ। নিজের কোনও কথা লুৎফার কাছে গোপন করেনি সিরাজ। সিরাজ ও হিরার অবৈধ সন্তান শ্রীমন্তলালের কথাও জানে লুৎফা। এ ঘটনা নবাব আলিবর্দি খাঁ মেনে নিতে পারেননি। সেই কারণেই ছিন্ন হয় তাদের সম্পর্ক। তারপর থেকে হিরা গৃহবন্দি। লুৎফা সব জানে। একদা সিরাজের মুখেই এসব শোনা। মনে মনে লুৎফা শ্রদ্ধা করত হিরাকে। বুয়ার পরিচয়ে সে বড় করে তুলেছিল সিরাজের রক্তের উত্তরাধিকারী নিজের সন্তান শ্রীমন্তলালকে। সিরাজকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে কোনওদিনও মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি। আজ সিরাজের সমাধিক্ষেত্রে হিরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে এক খুশনসিব আওরাত বলে মনে হতে লাগল লুৎফার। সে তো অনেক কিছু পেয়েছে এই জীবনে। পেয়েছে পেয়ার, মহব্বত, সিরাজের একান্ত সান্নিধ্য, নবাব-বেগমের ইজ্জত। এমনকি সিরাজের মওতের পরও পেয়েছে তাঁকে সেবা করার অধিকার। অথচ সিরাজের জন্য নিজের অন্তরের সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েও কিছুই তো পায়নি হিরাদিদি। দুঃখ উথলে ওঠে লুৎফার অন্তরে। হিরাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে সে চোখের জলে ভাসে।

হিরা বলে, ‘কেঁদে কি করবে বহেন? জিন্দেগি নসিবের বান্দা। আমরা বদকিসমতির শিকার।’

‘এতকাল কোথায় ছিলে হিরাদিদি?’

‘নবাবের মুসিবতের পর পালিয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে পাহাড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে বেড়াচ্ছি।’

‘শ্রীমন্তলাল কোথায়?’

‘শুনেছি ময়মনসিংহের রাজবাড়িতে ঠাঁই পেয়েছে। এই বন্দোবস্ত করে গিয়েছেন বড়ে ভাইয়া।’

‘কোথায় আছেন দেওয়ানজি?’

‘জানি না বহেন।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হিরা।

‘ঘরে চলো দিদি।’

‘না বহেন। অত সময় হাতে আমার নেই। নিজামতের কাসিদদের হাতে গ্রেফতার হতে চাই না। ভেবেছিলাম, আর কোনওদিন ফিরব না মুর্শিদাবাদে। লেকিন নসিবের কী খেয়াল দেখ, সিরাজই আমাকে টেনে নিয়ে এলো এখানে। হঠাৎ ইচ্ছে হল তাঁর সমাধিকে একবার জেয়ারত করে আসি। চিরাগ জ্বেলে দিয়ে আসি আমার সরতাজের বুকে। তুমি ইজাজত দাও বহেন।’

হিরার হাত ধরে লুৎফা বলে, ‘আমি কী ইজাজত দেব দিদি? এ তো তোমার অধিকার। এসো দিদি। ফুল ছড়িয়ে দাও সমাধিতে। সিরাজের ভালো লাগবে।’

চিরাগ হাতে সিরাজের সমাধি প্রদক্ষিণ করে হিরা। রোজই রেকাবি বোঝাই করে ফুল রেখে যায় মালিরা। সেই ফুলে ভরা রেকাবি হিরার হাতে তুলে দেয় লুৎফা।

সোনা ও রুপোর সুতোর কাজ করা নিজের একখানা উড়নি ঝুলির ভিতর থেকে বের করে সিরাজের সমাধিতে বিছিয়ে দেয় হিরা। তার উপরে ছড়িয়ে দেয় লাল গুলাবের পাপড়ি। নিজের হাতে জ্বেলে দেয় চিরাগবাতি। তারপর পর হাঁটু মুড়ে বসে সমাধির প্রস্তরখণ্ডে মাথা ঠেকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। জলের ধারা নামে লুৎফার দু’চোখেও।

খানিকবাদে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় হিরা। লুৎফার চিবুক ছুঁয়ে বলে, ‘আসি বহেন।’

‘আবার এসো দিদি। বড় একলা লাগে আমার।’

‘যদি জিন্দা থাকি তো নিশ্চয়ই আসব বহেন।’

‘এখন কোথায় যাবে?’

‘ময়মনসিংহের দিকে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। এক ঝলকের জন্যও যদি শ্রীমন্তের দেখা মেলে। আর যদি বড়ে ভাইয়ার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়।’ ক্লান্তি ঝরে পড়ে হিরার গলায়। লুৎফা জল ছলছল চোখে তার মুখপানে চেয়ে থাকে।

ক্ষণিকের বিষাদঘন স্তব্ধতা অন্তে লুৎফা শুধোয়, ‘এখান থেকে যাবে কী ভাবে দিদি? চারিদিকে যে কাসিদদের কড়া নজরদারি।’

‘ভেবো না বহেন। ঠিক চলে যাব আমি। ঘাটে ডিঙি নৌকো বাঁধা আছে। নদীতে ভেসে পড়ব।’

ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে লুৎফা।

দছমালে লুৎফার চোখ মুছিয়ে দিয়ে হিরা বলে, ‘কেঁদো না বহেন। মন শক্ত করো।’

নিমেষে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় হিরা। তার প্রস্থানপথের দিকে নির্নিমেষ চোখে চেয়ে থাকে লুৎফা। তার দৃষ্টিপথে এলোমেলো ছন্দে নেচে বেড়াতে থাকে অজস্র জোনাকি।

‘বেগমসাহেবা।’

‘কে?’ ভয়ানক চমকে উঠে ঘুরে তাকায় লুৎফা। দেখে বাতিদান হাতে দাঁড়িয়ে আছে বাঁদি।

‘ও তুই।’

‘ঘরে চলুন বেগম সাহেবা। রাত অনেক হল।’

সায়েরা ঘুমিয়েছে?

‘জি। বেগম সাহেবা।’

‘চল।’ বাঁদির পিছু পিছু ঘরের পথে পা বাড়ায় লুৎফা।

.

খোশবাগ থেকে বেরিয়ে এসে অন্ধকারে ঘাটের দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকে হিরা।

ঘাটের কাছাকাছি আসতেই অন্ধকার ফুড়ে তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক আততায়ী। ছেলেবেলায় মোহনলালের কাছ থেকে ঘোড়ায় চড়া থেকে শুরু করে লড়াইয়ের হরেক কলাকৌশল হিরা আয়ত্ত করেছিল। ঘাটে আসার পথেই সে টের পেয়েছিল কেউ তার পিছু নিয়েছে। লোকটাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চুপচাপ হাঁটছিল হিরা। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছি ত্রিশূলটা।

আততায়ী ঝাঁপিয়ে পড়তেই চকিতে ঘুরে গিয়ে চোখের নিমেষে ত্রিশূলটা তার বুকে গেঁথে দেয় হিরা। বিকট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল লোকটা।

তিরবেগে ঘাটের দিকে ছুটতে লাগল হিরা, যেখানে তার ছিপনৌকো বাধা রয়েছে।

চোখের নিমেষে নৌকার দড়ি খুলে নদীতে ভেসে পড়ল হিরা। কৃষ্ণপক্ষের রাত।

মোহনলালের বহেন অদৃশ্য হয়ে গেল আঁধারের আড়ালে।

রাতের স্তব্ধতা ভঙ্গকারী মানুষের প্রাণঘাতী আর্তনাদ শুনে মশাল হাতে ছুটে এল খোশবাগের পাহারায় নিযুক্ত কয়েকজন সেপাই। দৃশ্যটা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল তারা।

নদীর চরে বালির উপরে পড়ে রয়েছে মিরনের গুপ্তচর অঙ্গন সিং-এর নিথর দেহ। তার বুকে বিঁধে রয়েছে একটা ত্রিশূল।

.

থানা দুর্গের একটা বুরুজে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ পানে চেয়েছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। চোখে দূরবিন। সকালের রোদ সরাসরি এসে পড়েছে তাঁর মুখের উপরে। বা হাত দিয়ে টুপিটা একটু টেনে রোদ আড়াল করলেন ক্লাইভ। তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন ম্যানিংহাম, নবকৃষ্ণ ও কোম্পানির সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ব্রোহিয়ার। তাঁদের দৃষ্টিও দক্ষিণ পথে। ১৭৫৭ সালের একেবারে গোড়ায় ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে নেওয়ার পর এই থানা দুর্গের দিকে আর মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাননি ক্লাইভ। সাগর থেকে নদী বেয়ে শত্রু ধেয়ে এলে কলকাতা পৌঁছনোর আগে তাদের রুখতে এই দুর্গ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা যেন আজ আবার নতুন করে তিনি অনুভব করলেন। বুরুজে দাঁড়িয়ে তিনি ভাবতে লাগলেন দুশমনের নওয়ারার উপরে জোরদার আক্রমণ হানার জন্য কোথায় কোথায় কামান বসানো জরুরি।

খানিকবাদে দূরবিন থেকে চোখ সরিয়ে ম্যানিংহামের উদ্দেশে বললেন, ‘দিস ইজ অ্যান আইডিয়াল এস্টাবলিসমেন্ট টু প্রোটেক্ট আওয়ার ফোর্ট ইন ক্যালকাটা। বাট ইট নিডস আরজেন্ট রিপেয়ারিং ওয়ার্ক।’

সত্যিই। দীর্ঘ দিনের অযত্নে নড়বড় করছে থানা দুর্গ। ফাটল ধরেছে বুরুজের গায়ে। কামানের ভার বহন করার জন্য বুরুজগুলোকে আরও মজবুত করা দরকার।

ক্লাইভের কথায় সায় দিয়ে ম্যানিংহাম বললেন, ‘দ্যাটস ট্রু স্যার।’

‘দ্য রিপেয়ারিং ওয়ার্ক মাস্ট বি ডান উইদিন অ্যা মান্থ।’ ব্রোহিয়ারের উদ্দেশে বললেন ক্লাইভ।

‘ইয়েস স্যার। আই উড ট্রাই মাই বেস্ট।’

‘নবকিসেন—’

‘হুজুর—’

‘একদল ওস্তাদ কারিগর চাই।’

ক্লাইভের কথার জবাবে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে হুজুর।’

‘বুরুজগুলোকে মজবুত করতে হবে। বড় পাল্লার কামান বসাতে হবে বুরুজে। উই হ্যাভ টু স্ট্রেনদেন দ্য আউটার ওয়াল অলসো।’

নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘হুজুর কি হামলার আশঙ্কা করছেন?’

ক্লাইভ মাথা নেড়ে বললেন, ‘নাউ ডাচ ফোর্স ইজ অ্যা থ্রেট টু আওয়ার বেঙ্গল এস্টাবলিসমেন্ট। এবারে মোহনা থেকে ফিরে গেলেও আমার মন বলছে ফের ডাচ জাহাজ আসবে। উই আর রিয়েলি শর্ট অফ রিসোর্সেস অ্যাট প্রেসেন্ট। আলসো হ্যাভ ভেরি লেস টাইম টু প্রিপেয়ার আওয়ারসেলভস।’

বুরুজ থেকে নেমে এলেন ক্লাইভ। থানা দুর্গ থেকে কোণাকুনি অবস্থানে গঙ্গার ওপারে রয়েছে আরেকটি ছোট কেল্লা। মাটির তৈরি। গাছপালার মাথা টপকে দূর থেকে দেখা যায় এর মাটির বুরুজগুলো। এ থেকে স্থানীয় লোকের মুখে মুখে জায়গাটার নাম হয়ে গিয়েছে মেটিয়াবুরুজ। কোম্পানির রেকর্ডে এর নাম চার্নকস ব্যাটারি।

থানা দুর্গ থেকে বেরিয়ে নৌকোয় চেপে চার্নকস ব্যাটারি পরিদর্শনে চলেলেন ক্লাইভ। এই দুর্গেরও মেরামতি দরকার। ওখানে মোতায়েন করতে হবে কয়েক প্ল্যাটুন গোরা পল্টন। সামান্য প্রস্তুতির অভাবে বিরাট অঘটন ঘটে যায়। এতদিনের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা থেকে একথা ভালোই জানেন ক্লাইভ। তাই নবাব মুর্শিদাবাদের অভিমুখে রওনা হতেই তিনি লেগে পড়েছেন নিজের কাজে।

বিপদ সংকেত খুব দ্রুত পড়তে পারেন রবার্ট ক্লাইভ। কপালে তাঁর চিন্তার ভাঁজ। নবাবের উপরে আস্থা তাঁর নেই। ডাচেদের যুদ্ধজাহাজ সচমুচ যদি কলকাতায় এসে পড়ে, নবাব তখন যে কোন দিকে ঝুঁকবেন, তা বলা কঠিন। এই মুহূর্তে কলকাতায় ক্লাইভের হাতে রয়েছে সীমিত সংখ্যক সৈন্য। দক্ষিণে ফারাসিদের সঙ্গে লড়াইয়ে ইংরেজদের হাল এই মুহূর্তে যে কি, তা ক্লাইভের জানা নেই। আপাতত এই সামান্য সংখ্যক সেনা নিয়েই ডাচদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্ট্র্যাটেজি ছকতে হবে তাঁকে। কাজটা সহজ নয়। লড়াই পরিচালনা করার মতো দক্ষ অফিসার এই মুহূর্তে কলকাতায় খুব বেশি নেই। ভরসা ভাগ্যদেবী। যিনি বরাবর ক্লাইভের পক্ষে থেকে লড়াইয়ের ময়দানে তাকে অজেয় করে তুলেছেন। গলুইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে পাইপ গুঁজে এসব নানা কথা ভাবছিলেন ক্লাইভ।

নৌকা ভিড়ল ঘাটে। ব্রোহিয়ার, ম্যানিংহাম ও নবকৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে মেটিয়াবুরুজের কেল্লার অন্দরে প্রবেশ করলেন ক্লাইভ। অনেকদিন বন্ধ পড়ে রয়েছে এই কেল্লা। দরজা খুলতেই ক্লাইভের প্রায় মাথা ঘেষে উড়ে গেল একটা বাদুড়। মাথা ঝুঁকিয়ে সংঘাত এড়ালেন তিনি।

.

কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরে দু’দণ্ড জিরোতে না জিরোতেই নবাবের হাতে এসে পড়ল রামনারায়ণের চিঠি। চোখে অন্ধকার দেখলেন নবাব। পাটনা থেকে এই চিঠি নিয়ে এসেছেন চরাধিপতি গোবিন্দমল্ল।

রামনারায়ণ লিখেছেন, ‘…ঘোর সংকট হুজুর। শাহজাদা আলি গোহর সুবে বাংলা দখলের মনসুবা নিয়ে বিরাট ফৌজসহ এলাহাবাদ থেকে পাটনার অভিমুখে রওনা হয়েছেন। শাহজাদার সঙ্গে রয়েছেন এলাহাবাদের কেল্লাদার মহম্মদ কুলী খাঁ ও ফরাসি সেনাপতি জাঁ ল। শুনতে পাচ্ছি অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলাও তার ফৌজ নিয়ে যোগ দেবেন শাহজাদার সঙ্গে। আপনি তুরন্ত ফৌজ পাঠান পাটনায়। আমার একার সামর্থ কী যে এই বিরাট ফৌজের মোকাবিলা করি।…’

এই সময় দিল্লির তখতে আসীন মহম্মদ আজীজউদ্দিন। ঔরঙ্গজেব বাদশার নাতি জাহান্দার শার ছেলে। তখতের চাবিকাঠি উজির ঘাজীউদ্দিনের হাতে। তিনি ঔরঙ্গজেবের একেকজন বংশধরকে টেনে নিয়ে দিল্লির তখতে বসান, পছন্দ না হলে তখত থেকে টেনে নামিয়ে দেন। অন্য একজনের উপরে বাজি ধরেন। দিল্লির বাদশা কার্যত উজিরের হাতের পুতুল।

বাদশা আহম্মদ শাকে টেনে নামিয়ে কিছুদিন আগে আজীজউদ্দিনকে তখতে বসিয়েছেন ঘাজীউদ্দিন। তখন আজীজউদ্দীনের বয়স পঞ্চান্ন বছর। পিতা জাহান্দার শার মৃত্যুর পর থেকে দীর্ঘ দিন কয়েদখানায় বন্দি থেকে রক্তের জোশ হারিয়ে বসেছেন। অস্তাচলে যেতে বসা মোগল সাম্রাজ্যের হাল ধরার ক্ষমতা একেবারেই তাঁর নেই। যদিও তখতে বসে তিনি নাম নিয়েছেন আলমগীর শানি। অর্থাৎ দ্বিতীয় আলমগীর।

মহম্মদ আজীজউদ্দীন ওরফে আলমগীর শানি নিতান্তই ভালো মানুষ। লেখাপড়া নিয়ে থাকেন। নিরীহ বাদশাকে হাতের মুঠোয় রেখে দিল্লির রাজ্যপাট দিব্যি চালাচ্ছিলেন ঘাজীউদ্দিন। কিন্তু গোলযোগ বাধল শাহজাদা আলি গোহরকে নিয়ে। উজিরের খবরদারি তাঁর সহ্য হল না। পদে পদে উজিরের বিরোধিতা শুরু করলেন। তাঁকে কয়েদ করার মতলবে ছিলেন ঘাজীউদ্দিন, কিন্তু একদিন লালকেল্লা থেকে পালিয়ে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার রাজত্বে চলে এলেন শাহজাদা। তাঁকে আশ্রয় দিলেন ধূর্ত সুজাউদ্দৌলা। শাহজাদাকে আঁকড়ে ধরে তিনি এখন দিল্লির উজিরের পদ দখলের ভাবনায় মশগুল। সুজাউদ্দৌলা মনে করেন, সে পদ যেন তাঁর হকের পাওনা। কেননা তাঁর আব্বাহুজুর সফদারজঙ্গ মৃত্যুকাল পর্যন্ত মোগল সাম্রাজ্যের উজির ছিলেন।

শাহজাদা আলি গোহর আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন সুবে বাংলা দখল করে ওখানেই আপাতত ঘাঁটি গাড়বেন, যতদিন না দিল্লির তখত তিনি দখল করতে পারছেন। কারণ বাংলা অনেক দূরে। উজির ঘাজীউদ্দিন সহজে তার নাগাল পাবে না। সুজাউদ্দৌলার পরামর্শে অযোধ্যা থেকে এলাহাবাদে এলেন আলি গোহর। বাংলা দখলের মনসুবায় তাঁকে মদত দিচ্ছেন এলাহাবাদের কেল্লাদার মহম্মদ কুলি খাঁ।

এলাহাবাদে পৌঁছেই ছত্রপুর থেকে ফরাসি সেনাপতি জাঁ লকে ডেকে পাঠালেন শাহজাদা আলি গোহর। বাংলা মুলুকের সুলুকসন্ধান জানেন বাহাদুর যোদ্ধা ল সাহেব। ফরাসিরা ইংরেজদের জাত শত্রু। শাহজাদার ডাক পেয়েই ছুটে এলেন ল সাহেব। আলি গোহর শুনেছেন বাংলার সুবাদার মিরজাফর খাঁ ইংরেজ সওদাগরদের হাতের পুতুল। ইংরেজ সওদাগরেরা বাংলায় এখন খুবই শক্তিমান। এদের বাংলা থেকে উচ্ছেদ করতে পারলে তাঁর নামে জয়জয়াকার পড়ে যাবে। এমনই পরিকল্পনা শাহজাদার। এলাহাবাদে বসে বাংলা দখলের নামে তিনি বেশ ভালোই সাড়া পেলেন। লুটপাঠের আশায় অনেকে এসে তাঁর সৈন্যদলে নাম লেখাতে লাগল। এই অভিযানে শাহজাদার সেনাপতি মহম্মদ কুলি খাঁ। সুজাউদ্দৌলা জানিয়েছেন হাতের কয়েকটা কাজ সেরে তিনিও এসে যোগ দেবেন শাহজাদার সঙ্গে।

এলাহাবাদে বসে থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে পড়ছিলেন আলি গোহর। সুজাউদ্দৌলার জন্য অপেক্ষা না করেই একটা শুভ দিন দেখে ফৌজ নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন বাংলার পথে।

কী করা যায় এখন? গোবিন্দমল্লের মুখ থেকে এই কহানি শুনে ভয়ানক বিচলিত বোধ করলেন মিরজাফর খাঁ। শলাপরামর্শের জন্য মিরনকে তলব করলেন নবাব।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *