পলাশির পরে – ৫৪

৫৪

ইংরেজ আভিজাত্যের বুকে গভীর এক ক্ষতচিহ্ন কলকাতার পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামের ভাঙাচোরা ইমারত। ভেঙে পড়া দেওয়াল, গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বুরুজগুলো ইংরেজদের পরাজয়ের স্মারক, সুবে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার কুদরতির নিশান। ১৭৫৬ সালে কলকাতায় এসে এই কেল্লার উপরে আঘাত হেনে ইংরেজ ঔদ্ধত্যকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিলেন সিরাজ। ইংরেজরা এখন এই খণ্ডহরকে বলে পুরোনো ফোর্ট উইলিয়াম।

দুঃসময়ের স্মৃতিকে উসকে দেয় এই ইমারত। এর অস্তিত্ব পুরোপুরি মুছে দিতে পারলে স্বস্তি পেতেন ক্লাইভ। বজরার গলুইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে তিনি ভাবছিলেন সেই কথা। কিন্তু গোবিন্দপুরে নতুন কেল্লা গড়ে না তোলা পর্যন্ত গোলার আঘাতে জর্জরিত এই পুরোনো কেল্লাটাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া ফেলা যাচ্ছে না। কেননা এর ভিতরের কয়েকটা অক্ষত গুদামঘর মাল মজুত করার কাজে লাগে। তাছাড়া কয়েকটা অফিসঘরও অটুট আছে। এরই মধ্যে একটা ঘরে এখনও নিয়মিত কলকাতা কাউন্সিলের মিটিং বসে। নতুন কেল্লা সম্পূর্ণ গড়ে তুলতে অনেক সময় লাগবে।

ঘাটের দিকে এগোচ্ছে বজরা। পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামের হতশ্রী চেহারাটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্লাইভের চোখে। বিকেলের মরা আলোয় কলকাতা শহরের বুকে ইংরেজদের প্রথম স্থাপত্যকীর্তি অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে, যেন চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রহর গুনে চলেছে।

নৌকোঘাটে এসে ভিড়ল বজরা।

ক্লাইভকে দেখে গভর্নর ড্রেক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। দক্ষিণে ফরাসিদের হাতে ইংরেজদের নাস্তানাবুত হওয়ার খবরটা কলকাতায় আসার পর থেকে আতঙ্কের প্রহর গুনছে গোটা ইংরেজসমাজ। দক্ষিণে কাড্ডালোর দুর্গ হাতছাড়া হয়েছে। ফরাসি জেনারেল মঁসিয়ে লালির সাফল্যে ভয়ের সঞ্চার হয়েছে ফোর্ট সেন্ট জর্জে। গভর্নর পিগট খুবই চিন্তিত। কলকাতার ভয়—চন্দনগরের বদলা নিতে লালি যদি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে আচমকা কলকাতায় এসে হাজির হন তো তখন কী হবে?

রজার ড্রেক দ্রুত এগিয়ে এসে এগিয়ে এসে করমর্দন করে বললেন, ‘উই আর রিলিভ্‌ড দ্যাট ইউ আর ব্যাক টু ক্যালকাটা।’

মুচকি হেসে রসিকতা করে ক্লাইভ বললেন, ‘মিরজাফর যতদিন নবাব আছেন ততদিন নাথিং টু ওয়ারি অ্যাবাউট। সেদিক থেকে সত্যিই আমরা রিলিভ্‌ড।’

ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন ক্লাইভ। তাঁর এক পাশে রজার ড্রেক আরেক পাশে হলওয়েল। পিছনে বীচার, ম্যানিংহাম ও ওয়াটস। কলকাতা কাউন্সিলের হোমরা-চোমরা এই সাহেবেরা ক্লাইভকে প্রায় অর্ধচন্দ্রাকারে ঘিরে রেখেছেন।

ড্রেক বললেন, ‘এখন তো ভাবনা নবাবকে নিয়ে নয়। উই আর থিংকিং অ্যাবাউট দ্য ফ্রেঞ্চ।’

ড্রেকের কথায় গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন ক্লাইভ।

হলওয়েল বললেন, ‘দক্ষিণের খবর পেয়েছেন নিশ্চয়ই।’

সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘হুঁ। দ্য বেস অফ কাড্ডালোর ওয়াজ লস্ট।’

হলওয়েল বললেন, ‘মি. পিগটের চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে লালি ইজ অ্যা বিগ থ্রেট।’

ধোঁয়া ছেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘আমার মনে হয় গোলমালটা আমাদের স্ট্র্যাটেজিতে। দেয়ার ইজ নো রিজন টু ফিয়ার ফ্রেঞ্চ পাওয়ার সো মাচ।’

ড্রেক বললেন, ‘মি. পিগট রাইটস রিপিটেডলি, দ্যাট ইউ শ্যুড সেট আউট স্পিডিলি ফর ম্যাড্রাস। কী করবেন আপনি?’

ক্লাইভ চকিতে একবার ড্রেকের মুখের দিকে চেয়ে বললেন, ‘নবাবের দিক থেকে কোনও থ্রেট না থাকলেও, বেঙ্গল সেটলমেন্ট কিন্তু এখনও পুরোপুরি সেফ নয়। অ্যাট প্রেসেন্ট দ্য সিচুয়েশন ইজ টু মাচ কমপ্লেক্স। নবাব ইজ হোস্টাইল উইথ রামনারায়ণ অ্যান্ড রায়দুর্লভ। ফের ডিসটার্বড হতে পারে মুর্শিদাবাদ। তাছাড়া যে কোনও সময় হানা দিতে পারেন সুজাউদ্দৌলা। মারাঠারাও বিগ থ্রেট। কাড্ডালোরের ঘটনা এখনও নবাবের কানে যায়নি। আজ নয়তো কাল নবাব শুনবেন সবই। মিরনকে বিশ্বাস নেই। ফরাসিদের সাকসেসের কথা শুনলে হি মে ইনফ্লুয়েন্স নবাব টু মেক অ্যান অ্যালায়েন্স উইথ সুজাউদ্দৌলা টু ড্রাইভ আস আউট ফ্রম বেঙ্গল। মঁসিয়ে ল সুজাউদ্দৌলার আশ্রয়ে রয়েছেন। তিনিও রিভেঞ্জ নিতে চাইবেন।’

হলওয়েল শঙ্কিত গলায় বললেন, ‘ইফ ইউ গো টু ম্যাড্রাস দেন হোয়াট উইল হ্যাপেন হিয়ার?’

ক্লাইভ চিন্তিত গলায় বললেন, ‘বাংলার সিচুয়েশনটা বুঝতে পারছে না মাদ্রাজ কাউন্সিল। ইন মাই ওপিনিয়ন বেঙ্গল’স সিচুয়েশন ইজ মোর কমপ্লেক্স দ্যান সাউথ।’

এ সময়ে আপনি না থাকলে—

আমি এখনই ওয়াপস যাচ্ছি না।

ড্রেক খুশি গলায় শুধোলেন, ‘হোয়াট ডু আই রাইট টু মি. পিগট?’

‘আপনাকে কিছু লিখতে হবে না। যা লেখার তা আমি লিখে জানিয়ে দেব। আই উইল সেন্ড লায়নেল ফোর্ড টু ম্যাড্রাস উইথ অ্যা কনটিনজেন্ট।’

ফের একবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ড্রেক, হলওয়েল, বীচার, ম্যানিং হ্যাম, ওয়াটস সকলে। একসময় এদেরই অনেকে মনে করতেন, ক্লাইভ তাদের কাছে এক মস্ত আপদ। ড্রেক, হলওয়েল ভাবতেন, তাদের কর্তৃত্ব ফলানোর পথে ক্লাইভ এক মস্ত বাধা। যত দ্রুত তিনি বাংলা থেকে বিদায় নেন ততই ভালো। আজ তাঁরাই ক্লাইভকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছেন। ক্লাইভই তাঁদের ভরসা।

মে মাসের বিকেল। বড় বেলা। দীর্ঘায়িত হয়েছে লালদিঘির পাড়ে গাছগুলির ছায়া, তবে এখনও বাইরের তাপ যথেষ্ট বেশি। বেলা ফুরোতে এখনও ঢের দেরি আছে। এই গরমে নদীর বুকে এতটা পথ এসেছেন। বেশ ক্লান্তি শরীরে। তবুও লালদিঘির সামনে থেকে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলেন ক্লাইভ। সঙ্গে কাউন্সিলের সব সদস্যেরা। ক্লাইভের ইচ্ছেকে সম্মান জানাতে তাঁরাও চেপে বসলেন ঘোড়ার পিঠে। গোটা কলকাতা কাউন্সিল ঘোড়ার খুরে ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলল গোবিন্দপুর অভিমুখে। নতুন কেল্লা গড়ার কাজ কতটা এগোলো সরেজমিনে দেখে নিতে চান ক্লাইভ। এখনই।

.

হন্তদন্ত হয়ে রাজমহল থেকে মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছলেন মিরজাফর। নবাবকে স্বাগত জানানোর জন্য হিরাঝিল প্যালেসের নৌকোঘাটে দাঁড়িয়েছিল মিরন। নহবতখানায় বাজছে সানাই।

বজরা থেকে নেমেই ব্যস্ত হয়ে মিরনের দিকে এগিয়ে এলেন নবাব। শুধোলেন, ‘কর্নেল আছেন না কলকাতা ওয়াপস গিয়েছেন?’

‘ওয়াপস গিয়েছেন।’ সংক্ষেপে জবাব দেয় মিরন।

‘ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে লড়াই করার জন্য তুমি মোতিঝিলে ঘাঁটি গেড়েছিলে?’

‘জি আব্বাহুজুর।’

বেশ বিরক্তির সঙ্গেই মিরজাফর শুধোলেন, ‘তুম অ্যায়সা কিঁউ কিয়া?’

মিরন ভাঙে, তবু মচকায় না। ‘আমি হুঁশিয়ার ছিলাম। নয়তো ফের ইনকিলাব ঘটে যেত।’

ধন্দে পড়ে গিয়ে হাঁ হয়ে যান মিরজাফর। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাজবল্লভের মুখপানে চেয়ে আন্দাজ পাওয়ার কোশিশ করেন—মিরন যা বলছে তা সচ না ঝুটা? তিনি জানেন ইংরেজরা কৌশলবাজ। ক্লাইভ চিঠিতে একতরফা দোষারোপ করেছেন মিরনের উপরে। তিনি যা লিখেছেন, তা যে বিলকুল সত্যি তারই বা সাবুত কোথায়?

রাজবল্লভকে আগেই শিখিয়ে পড়িয়ে রেখেছিল মিরন।

রাজবল্লভ বললেন, ‘নবাবজাদা সচ বলছেন। ক্লাইভ সাহেবের ভরসায় চুপিসারে মসনদ দখলের মতলবে ছিলেন দেওয়ানজি। নবাবজাদা হুঁশিয়ার থাকায় এই সাজিশি বরবাদ হয়ে গিয়েছে। আমার আন্দাজ তোশাখানা থেকে টাকা সরিয়ে ক্লাইভ সাহেবকে মোটা টাকা সওগাত দিয়েছেন দেওয়ানজি। আপনি তাকে হিসেব দাখিল করতে বলুন।’

সুযোগ পেয়ে নবাবের কানে রায়দুর্লভের নামে বিষ ঢেলে দিলেন রাজবল্লভ। তাঁর নজর সুবে বাংলার দেওয়ান পদটার উপরে। রায়দুর্লভের মুসিবত হলে তাঁর নসিব ফিরতে পারে। তবে তিনি একাই দেওয়ান পদের উমেদার নন। নন্দকুমারও শ্যেন দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন দেওয়ানের কুরসিটার দিকে। নিজামতের অন্দরে পরিবেশ একেবারে বিষিয়ে উঠেছে।

মিরনের প্রতি অন্ধ অপত্য স্নেহ থাকলেও তার বুদ্ধি, বিবেচনার উপর মোটেও ভরসা নেই মিরজাফরের। কিন্তু রাজবল্লভ আকলমন্দ আদমি। অতীতে নিজামতের শাসন ব্যবস্থায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। রাজবল্লভ যে ভাবে প্রত্যয়ের সঙ্গে কথাগুলো বললেন, তাতে নবাবের একিন হল রাজবল্লভ যা বলছেন তা সত্যি। আসলে নবাবের মন রাজবল্লভের জবানে এমন কথা শোনার জন্যেই উন্মুখ হয়েছিল।

ক্লাইভের উপস্থতিতে নবাব ও দেওয়ান কিছুদিন আগে রাজমহলে বসে নিজেদের মধ্যে আখেজ-আদাওতি অন্ত্‌ করার ওয়াদা করেছিলেন। মুর্শিদাবাদে পৌঁছেই ফের বিগড়ে গেলেন নবাব। তাঁর মনে হল, রায়দুর্লভই তাঁর পয়লা নম্বরের দুশমন। তিনিই আড়াল থেকে যাবতীয় ঘোঁট পাকাচ্ছেন। তাঁকে বিনাশ করতে না পারলে স্বস্তি নেই।

.

বেশ কিছুদিন ধরে স্ক্র্যাফটন সাহেবের তবিয়ত মোটেই ভালো যাচ্ছে না। উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। ঘুম আসে না রাতে। চোখের তলায় কালি পড়েছে। সারা দেহ জুড়ে ক্লান্তি। গত দুবছরের তীব্র মানসিক উত্তেজনা শরীরটাকে বেশ ভালোরকম জখম করে দিয়েছে।

ক্লাইভের নির্দেশে দরবার রাজনীতিকে হাতের মুঠোয় রাখার কোশিস-কসরতে এমনিতেই রেসিডেন্ট সাহেব জেরবার। তার উপরে মাঝে মাঝে কাসিদরা গলত খবর নিয়ে আসে—বর্গিরা বর্ধমান পেরিয়ে দ্রুত মুর্শিদাবাদের দিকে এগোচ্ছে। কখনও বা স্ক্র্যাফটনের কাছে খবর আসে সুজাউদ্দৌলা রাজমহল পেরিয়ে গিয়েছেন। দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেন স্ক্র্যাফটন। কাশিমবাজার কুঠিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। খানিক পরেই আবার উলটো খবর আসে। আগের খবরটা ছিল ঝুটা। স্নায়ুর চাপ আর সইতে পারছেন না স্ক্র্যাফটন। আজকাল অল্পতেই বড় বিচলিত হয়ে পড়েন। রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে তিনি অব্যাহতি চাইছেন। ক্লাইভের সঙ্গে আলোচনাক্রমে স্থির হয়েই আছে তাঁর পরে রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন ওয়ারেন হেস্টিংস। তবে এখনই নয়। অগত্যা স্ক্র্যাফটন নিরুপায়। আরও কিছুদিন কাজ চালিয়ে যেতে হবে তাঁকে।

শরীরটা আজ মোটেই ভালো নেই। তবুও কর্তব্যের দায়ে হিরাঝিল প্যালেসে যেতে হচ্ছে স্ক্র্যাফটনকে। ভোরবেলা বেরিয়েছেন কাশিমবাজার থেকে। গ্রীষ্মের দাবদাহ এখনও ততটা অসহ্য নয়। ডাইনে গঙ্গা। বাঁধের উপর দিয়ে দ্রুত গতিতে ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে চলেছেন স্ক্র্যাফটন। সঙ্গে দশজন গোরা পল্টন।

কলকাতা রওনা হওয়ার আগে ক্লাইভ বারবার তাঁকে বলে গিয়েছেন, নবাব রাজধানীতে ফিরলেই তিনি যেন নবাবের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করেন। নবাবকে ভয়ানক কড়া একখানা চিঠি লিখে খানিকটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ক্লাইভ। কর্নেলের আশঙ্কা হল, যে সুতোটা ধরে নবাবকে পুতুলের মতো তিনি নাচাচ্ছেন, ধমক-হুমকি—এসবের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে সেই সুতোটাই না ছিঁড়ে যায়।

চিঠিটা পাঠানোর পরেই ক্লাইভের মনে হয়েছিল এতটা কড়া চিঠি না লিখলেই হত। অহংবোধ সকলেরই থাকে। তার উপরে সুবে বাংলার নবাব বলে কথা। ইংরেজদের উপরে বিরক্ত হয়ে তিনি যদি সুজাউদ্দৌলার হাত পাকড়ে ধরেন, আর জাঁ ল মারফত ফরাসিদের সঙ্গে দোস্তি গড়ে তোলেন, তাহলে ইংরেজদেরই তকলিফ বাড়বে। তাই তাঁর চিঠি পেয়ে নবাবের প্রতিক্রিয়া কী সেটা জানার জন্য ক্লাইভ উদগ্রীব। স্ক্র্যাফটনের মারফত নবাবকে একবার তিনি বাজিয়ে দেখতে চান। তাই এই উদ্দেশেই সাতসকালে স্ক্র্যাফটনের হিরাঝিল-অভিযান।

নবাবের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘ক্লাইভ সাহেব খুব চটে গিয়েছেন।’

গিরদায় ঠেস দিয়ে ফরাসের উপরে কাত হয়ে শুয়েছিলেন নবাব। চোখদুটো বোজা। মুখে গোঁজা ফরসির নল। অম্বুরি তামাকের গন্ধে গোটা ঘর আমোদিত। নিরুত্তর রইলেন তিনি।

স্ক্র্যাফটন ফের বললেন, ‘নবাবজাদার বেওকুফিতে উনি খুবই বিরক্ত হয়েছেন। আমার মনে হয় নবাবজাদার হয়ে চিঠি লিখে আপনি একবার কর্নেলের কাছে মাফি মাঙলে ভালো হয়।’

‘কেন লিখব চিঠি?’ নবাবের জবান শুনে চমকে উঠলেন স্ক্র্যাফটন।

একটু অপ্রস্তুত গলায় স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘পাটনা থেকে মুর্শিদাবাদে পৌঁছে খাতিরদারি আশা করেছিলেন কর্নেল, লেকিন নবাবজাদা খামোখা যে কাণ্ড ঘটালেন তাতে—’

‘খামোখা বলছেন কেন?’ স্ক্র্যফটনকে বাধা দিয়ে প্রশ্ন করলেন নবাব।

‘ক্লাইভ সাহেব আপনার দোস্ত। মুর্শিদাবাদে এসে অহেতুক বেইজ্জত হতে হল তাঁকে।’

‘এতে নবাবজাদার কসুর হল কোথায়?’

স্ক্র্যাফটন হতবাক। কী বলছেন মিরজাফর খাঁ? এমন বেয়াদপির পরেও নবাবজাদাকে তিনি সমর্থন করছেন? মুখে বললেন, ‘কর্নেলকে বেইজ্জত করা বেতমিজি নয়?’

‘আপনারাই তো বেইজ্জত করছেন আমাকে। দোস্তকে ভুলে গিয়েছেন ক্লাইভ সাহেব। ইকরারনামায় বলা ছিল নবাবের যে দুশমন, সে আপনাদেরও দুশমন। কিন্তু রায়দুর্লভ, রাজারাম, রামনারায়ণ আমার সব দুশমনকেই তো মদত দিচ্ছেন ক্লাইভ। দেওয়ানের লালচ আছে মসনদের উপরে। চকবাজারের সামান্য এক আতরের কারবারিও এ কহানি জানে। কাজেই রায়দুর্লভকে সঙ্গে নিয়ে কর্নেল যদি দ্রুত মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে আসেন, আর সে কথা শুনে নবাবজাদা যদি মনে করে ফির ইনকিলাব ঘটতে চলেছে, তার জন্য কি নবাবজাদার নামে ইলজাম আনা যায়? সে নিজেকে সালামত রাখতে চেয়েছিল, হুঁশিয়ার ছিল, লেকিন হামলা তো করেনি।’

খুব ধীরে, থেমে থেমে, এতটুকু উত্তেজিত না হয়ে কথাগুলো বললেন মিরজাফর খাঁ। নবাবের গলায় অন্যরকম সুর শুনে ঘেমে উঠলেন স্ক্র্যাফটন। এ যে অচেনা মিরজাফর খাঁ। তাহলে কি সত্যিই সুতো ছিঁড়ে গেল? ইংরেজদের শিকলি কেটে আজাদ চিড়িয়ার মতো আকাশে উড়তে চাইছেন নবাব?

‘আপনার কথা আমি কর্নেলকে জানাব।’ এই বলে কোনওরকমে নবাবের সঙ্গে আলোচনা সেরে হিরাঝিল প্যালেস থেকে বেরিয়ে এলেন স্ক্র্যাফটন। ফের ঘোড়া হাঁকালেন কাশিমবাজারের উদ্দেশে।

.

১৭৫৮ সালের ২০ জুন। লন্ডন থেকে কলকাতায় এসে নোঙর ফেলল জাহাজ—হার্ডউইক ইন্ডিয়াম্যান। এই জাহাজে এসেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি জন স্যামসন। তিনি নিয়ে এসেছেন কোম্পানির বড় কর্তাদের পাঠানো খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ডেসপ্যাচ।

ফোর্ট উইলিয়ামের নৌকোঘাটে স্যামসনকে স্বাগত জানালেন গভর্নর রজার ড্রেক।

জাহাজ থেকে নেমে ফোর্ট উইলিয়ামের হতশ্রী চেহারা দেখে শিউরে উঠলেন স্যামসন। ১৭৫৬ সালে নবাবের হাতে বেঙ্গল এস্টাবলিশমেন্টের বিপর্যয়ের কথা তাঁর অজানা নয়। কর্নেল ক্লাইভের নেতৃত্বে পলাশির প্রান্তরে ইংরেজদের ঘুরে দাঁড়ানোর কথাও জানেন স্যামসন। কলকাতা থেকে চিঠি লিখে সব জানানো হয়েছিল লন্ডনে। তবে ১৭৫৬ সালে নবাবের আক্রমণের ধাক্কা যে এতটা ভয়ানক ছিল, তা কলকাতা থেকে পাঠানো চিঠি পড়ে আন্দাজ করতে পারেননি লন্ডনের সাহেবদের কেউই। আন্দাজ করতে পারেননি স্যামসনও।

সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে তিনি ভাবছিলেন, সেই ভয়ানক আক্রমণ সামলে ইংরেজরা যে ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে এটা সত্যিই গর্বের বিষয়।

বোর্ডরুমে প্রবেশ করলেন স্যামসন। উপস্থিত কাউন্সিলের সকল সদস্যই। শুধু অনুপস্থিত ক্লাইভ। তিনি কয়েকদিনের জন্য বিশ্রাম নিতে গিয়েছেন দমদমায় তাঁর বাগানবাড়িতে।

মেহগিনি কাঠের গোল টেবিলকে ঘিরে সাজানো কুরসিগুলো দখল করে বসে পড়লেন সবাই।

লন্ডন থেকে কোম্পানির পাঠানো ডেসপ্যাচ গভর্নর ড্রেকের হাতে তুলে দিলেন স্যামসন। তাতে চোখ বুলিয়ে চমকে উঠলেন ড্রেক। তাঁর হাত কাঁপতে লাগল।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *