পলাশির পরে – ৫৫

৫৫

গত সন্ধেয় কালবৈশাখী ঝড়ে তছনছ হয়েছে শহর কলকাতা। উপড়ে গিয়েছে, হেলে পড়েছে বেশ কিছু বড় বড় গাছ। ভাঙা ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পথে। উড়ে গিয়েছে দিশিপাড়ায় বেশ কিছু বাড়ির খোলার চাল। ভেঙে পড়েছে দেওয়াল। চারিদিক একেবারে লণ্ডভণ্ড। ভোরের আলো ফুটতেই ঘরদোর মেরামতির কাজে লেগে পড়েছে অনেকে। কাটারি, কুড়ুল হাতে ভেঙে পড়া গাছের ডালপালা সরিয়ে পথকে মুক্ত করার কাজে জায়গায় জায়গায় ব্যস্ত মানুষজন।

ঘোড়া হাঁকিয়ে যেতে যেতে কলকাতার গভর্নর রজার ড্রেক লক্ষ করছিলেন ঝড়ের তাণ্ডবের চেহারাটা। ঝড়ের সঙ্গে জোর একপশলা বৃষ্টিও হয়েছে কাল। ভোরের হাওয়ায় নাকে ভেসে আসছে মাটির সোঁদা গন্ধ। গাছপালা যেন আজ বড় বেশি রকমের সবুজ। চিৎপুর রোডে ধুলোর উৎপাত নেই। পথ কর্দমাক্ত। খানাখন্দে জমে আছে জল। ঘোড়ার খুরে ছিটকে উঠছে জল-কাদা।

গভর্নর ড্রেক একা নন, তার সঙ্গে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলেছেন হলওয়েল, বীচার, ম্যানিংহ্যাম, ওয়াটস—কলকাতা কাউন্সিলের হোমরা-চোমরা সকলেই। এদের মুখগুলো কালবৈশাখীর পূর্বে আকাশের মতোই থমথমে। কাউন্সিলের সদস্যদের সামনে ও পিছনে ছুটছে দেহরক্ষীর দল। জনাবিশেক গোরা পল্টন। কাঁধে রাইফেল।

উদলা গায়ে দেশি মানুষেরা টালুসমালুস করে চেয়ে দেখছে এই ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে। কোম্পানির নিশানের পাশাপাশি উড্ডীন আরেকটি নিশান জানান দিচ্ছে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলেছেন কলকাতার গভর্নর সাহেব। পথের পাশে জমায়েত দিশি লোকেদের মধ্যে গুঞ্জন, ফিসফাস—হঠাৎ কী হল? সাতসকালে দল বেঁধে কোথায় চলেছে সাহেবেরা? গুরুতর কিছু ঘটল নাকি?

বিষয়টা সত্যিই গুরুতর। কেল্লার কাছে কলকাতার ডেরা ছেড়ে স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে দমদমার বাড়িতে ইদানীং থাকছেন কর্নেল ক্লাইভ। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চলেছেন কলকাতা কাউন্সিলের সদস্যেরা। স্যামসনের হাত দিয়ে কোম্পানির ডিরেক্টরেরা লন্ডন থেকে যে ডেসপ্যাচ পাঠিয়েছেন, তা পড়ে চক্ষুস্থির হয়ে গিয়েছে সকলের। তাঁরা মনে করছেন এই ডেসপ্যাচ কলকাতার বুকে আরেকটা ঝড় ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

মারাঠা ডিচ পেরিয়ে এসে বরানগর থেকে দমদমার রাস্তা ধরল ঘোড়সওয়ার বাহিনী। এদিকটায় জঙ্গল বেশ ঘন। গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে মাঝে মধ্যে উঁকি মারছে নীল আকাশ। দিনের বেলাতেও শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝির ডাক। এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অপ্রশস্ত পথ চলে গিয়েছে ‘ক্লাইভ হাউসে’র দিকে। রাস্তার উপরে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে গাছপালা, ঝোপঝাড়। পথের যা হাল তাতে খুব জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মাঝে মধ্যেই অবরোধ তুলছে বৃক্ষচ্যুত শাখা, উপড়ে যাওয়া গাছ। গতকালের ঝড়ের সাবুত। সাবধানে এগোতে হচ্ছে। এই অঞ্চল বুনোশুয়োরের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। ঝোপের আড়াল ঠেলে অতর্কিতে হানা দেয় এই খতরনক জানোয়ার। আচমকা ঢুঁ মেরে তাগড়াই ওয়েলার ঘোড়াকেও বেসামাল করে দিতে পারে। রাইফেল ও বল্লম হাতে গোরা পল্টনেরা তাই হুঁশিয়ার।

.

জঙ্গল গাছগাছালির মধ্যে উঁচু এক মাটির ঢিবির উপরে দাঁড়িয়ে আছে ‘ক্লাইভ হাউস’। এ বাড়ির মাথায় উড্ডীন কোম্পানির পতাকা অনেক দূর থেকেই দেখা যায়। দিশি লোকেরা বলে ক্লাইভ সাহেবের বাগানবাড়ি। ‘দমদমা’ মানে চাঁদমারির জন্য আদর্শ উঁচু মৃত্তিকা স্তূপ। মাটির ঢিবির উপরে ক্লাইভের বাড়ি। তা থেকেই এই এলাকার নাম হয়েছে দমদমা।

মূল বাড়িটি ছিল একতলা। বরানগরের বাণিজ্যকুঠির সুরক্ষার জন্য সেনাছাউনি হিসেবে ডাচেরা এই বাড়িটি তৈরি করেছিল। পরে তাদের কাছ থেকে বাড়িটি লিজ নেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। এই বাড়ি হয়ে ওঠে নবাবের হান্টিং হাউস। বরানগরে ছাউনি ফেলে অবস্থান করার সময়ই এই বাড়িটি নজরে আসে ক্লাইভের। তিনি দেখেন, বাড়িটি খুবই সুরক্ষিত। অবস্থান উঁচু ঢিবির উপরে। শত্রুপক্ষের গতিবিধির উপরে নজর রাখার জন্য আদর্শ। বাড়ির চারিদিকে রয়েছে ফুলের বাগান, সবুজ ঘাসের লন। সেই বাগানের প্রান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় ঝাঁকড়া গাছ। চারপাশ হরেক রকম পাখির কলকাকলিতে মুখর। শীতের সময়ে পরিযায়ী পাখিরা এসে ভিড় জমায় এ বাড়ির চৌহদ্দিতে। চারিদিক থেকে বাড়িটিকে বেড় দিয়ে রেখেছে বিরাট চওড়া এক পরিখা। সেই পরিখা একটি খালের মাধ্যমে গঙ্গার সঙ্গে যুক্ত। এই পরিখা ও খালে ভেসে পড়ে অবসর সময়ে দিব্যি নৌবিহারের মজা উপভোগ করা যায়।

বাড়িটি খুবই পছন্দ হয় ক্লাইভের। পলাশির যুদ্ধের পর নবাব মিরজাফর খাঁর কাছ থেকে এই বাড়িটি তিনি চেয়ে নিয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদ থেকে একদল দক্ষ কারিগরকে নিয়ে এসে এই বাড়ি সংস্কারের কাজে নিয়োগ করেন ক্লাইভ। কারিগরেরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিত্যক্ত একতলা বাড়িটিকে বসবাসের উপযোগী দোতলা বাড়িতে রূপান্তরিত করে।

বাড়ির সঙ্গে বাড়ির চৌহদ্দি সংস্কারেও মন দেন ক্লাইভ। অযত্নে বাড়ির চারপাশের লন ভরে গিয়েছিল আগাছা ও বুনো ঘাসে। নতুন করে ফের লন তৈরি হয়। লনের চারপাশে রয়েছে নুড়ি বিছানো পায়ে চলার পথ। একদিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে কেয়ারি করা ফুলের বাগান। আরেকদিকে বিশাল গোলাপ বাগিচা। এছাড়াও লনের এক প্রান্তে পরিখার ধারে রয়েছে মোটা শালখুঁটির কাঠামোর উপরে ঠাসবুনোট বেতের ছাউনি দেওয়া চবুতরা। বেতের ছাউনি অবশ্য দেখা যায় না। ঢাকা পড়েছে মাধবীলতায়। ফুল ধরেছে গাছে। সব মিলিয়ে দমদমায় এই জঙ্গলের মধ্যে ‘ক্লাইভ হাউস’ যেন ‘অ্যা পিস অফ হেভেন’।

পলাশির যুদ্ধের পর ক্লাইভের স্ত্রী মার্গারেট, পুত্র এডওয়ার্ড ও কন্যা জেনিকে নিয়ে কলকাতায় আসেন। তারা এসে ওঠে ফোর্ট উইলিয়ামের অদূরে ক্লাইভের জন্য বরাদ্দ কোম্পানির দেওয়া বাড়িতে। ১৭৫৭ সালে দুর্গাপুজোর পরপরই ক্লাইভের পরিবারে ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা। কয়েকদিনের অজানা জ্বরে মারা যায় জেনি। কন্যার মৃত্যুশোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ক্লাইভকে ছুটতে হয় চন্দননগরের সেনা ছাউনিতে। ছেলে এডওয়ার্ডকে নিয়ে মার্গারেট থেকে যান কলকাতায়। এবারে মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরে স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে দমদমার বাড়িতে চলে এসেছেন ক্লাইভ। পরিবারের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটাতে চান এই মনোরম পরিবেশে। দৌড়-ঝাপ মানসিক উত্তেজনা সইতে সইতে ক্লান্ত রবার্ট ক্লাইভ দু’দণ্ড বিশ্রাম চান।

লনের প্রান্তে চবুতরার নীচে স্ত্রী মার্গারেটের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট সারছিলেন ক্লাইভ। শ্বেতপাথরের গার্ডেন টেবিল নানারকম খাবারে ভর্তি। ব্রেড, মাখন, স্ক্র্যাম্বেল্‌ড এগ, সসেজ, শরবত ও নানারকমের মরশুমি ফল। কয়েকজন গোলাম-দাখিলার সঙ্গে এডওয়ার্ড ছুটোছুটি করে খেলে বেড়াচ্ছে লনে। চিনাবাদাম খাওয়াচ্ছে লনের উপরে অবাধে বিচরণকারী কাঠবেড়ালি ও বুনো খরগোশদের। এই বাড়িতে এসে বেশ খুশি মার্গারেট। ফোর্ট উইলিয়ামের পাশে যে বাড়িটি ক্লাইভের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল, মার্গারেটের মনে হত, এই বাড়ি ক্লাইভের পদমর্যাদার উপযুক্ত নয়। বাড়ির চারপাশে এত জায়গাও ছিল না। তাছাড়া সেই বাড়িতেই জেনি মারা যায়। সে এক দুঃস্বপ্নের স্মৃতি।

ক্লাইভ শুধোলেন, ‘এখানে কেমন লাগছে মার্গারেট?’

মার্গারেট হাসেন। ‘খুব সুন্দর। বিউটিফুল।’

‘প্রথম যেদিন বাড়িটা দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল, আহা এমন একটা বাড়ি যদি আমার থাকত তো বেশ হত।’

মুচকি হেসে রসিকতা করেন মার্গারেট, ‘বেঙ্গলের সব প্রপার্টিই তো তোমার। কোনটা নয়?’

একটু দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ক্লাইভ বললেন, ‘বেঙ্গল ইজ অ্যা বিউটিফুল প্লেস।’

দূর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে মার্গারেটের মুখের উপরে সংহত করে ক্লাইভ বললেন, ‘এদেশের নবাব-বাদশাদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু পেয়েছি মার্গারেট। সম্মান পেয়েছি, খেতাব পেয়েছি, জমিদারি পেয়েছি, টাকা পেয়েছি। একদিন গরিব ছিলাম, কিন্তু আজ আমার যা টাকা আছে, তার হিসেব কষতে বসলে লন্ডনের বিত্তবানদের মাথা ঘুরে যাবে। কিন্তু খারাপ লাগে কী জান, কোম্পানির জন্য আমি যা করেছি, তার রিকগনিশন কোথায়? আমার জন্য কী করেছে কোম্পানি?’

মাথা নেড়ে সম্মতি জানান মার্গারেট। বলেন, ‘শুনতে পাই এই সুবে বাংলায় কী কাউন্সিল, কী নবাব সবাই তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইউ ডিসার্ভ দ্য পোস্ট—গভর্নর অফ ক্যালকাটা।’

 ‘লন্ডনে ডিরেক্টরেরা শুধু লাভের টাকা গুনতে ব্যস্ত। কিন্তু কী ভাবে, কার কন্ট্রিবিউশনের জন্য কোম্পানি প্রফিট আর্ন করছে, দে ডোন্ট হ্যাভ টাইম টু থিংক অ্যাবাউট ইট।’ ক্লাইভের গলায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে হতাশা।

সহসা ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে এল দূর থেকে। একটা নয় অনেকগুলো ঘোড়ার পায়ের শব্দ। মার্গারেট ঘুরে তাকিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন দূরে।

শিমুল গাছের নুইয়ে পড়া একটা ডাল ক্লাইভের দৃষ্টি অবরুদ্ধ করেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন, পরিখার উপরের কাঠের পুল পার হয়ে তাঁর বাড়ির চৌহদ্দিতে প্রবেশ করলেন, ড্রেক, বীচার, ম্যনিংহাম, হলওয়েল ও ওয়াটস। গোটা কলকাতা কাউন্সিল।

অবাক হলেন ক্লাইভ। কোনও আগাম খবর ছাড়াই কলকাতা কাউন্সিলের সব সদস্যের হঠাৎ একসঙ্গে এখানে হাজির হওয়ার কারণ? যাই হোক, গেস্টদের ওয়েলকাম জানানোর জন্য এগিয়ে গেলেন সাহেব ও মেমসাহেব দু’জনেই।

উচ্ছ্বসিত গলায় কর্নেল ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েলকাম! ওয়েলকাম! হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ!’

ঘোড়া থেকে নামলেন সকলে। গেস্টদের নিয়ে বাড়ির অন্দরে প্রবেশ করলেন ক্লাইভ দম্পতি।

ড্রেক গম্ভীর গলায় বললেন, ‘উই হ্যাভ অ্যান আরজেন্ট ম্যাটার টু ডিসকাস উইথ ইউ।’

ড্রেক ও হলওয়েলের গম্ভীর মুখের দিকে চেয়ে ক্লাইভ বুঝলেন ব্যাপার খুবই গুরুতর।

ক্লাইভ বললেন, ‘চলুন। কনফারেন্স রুমে গিয়ে বসি।’

বাড়ির একতলায় বেশ বড়সড় একটা ঘর। মাঝে ডিম্বাকৃতির বড়সড় একটা মেহগিনি কাঠের টেবিল। শ্বেতপাথরের টপ। টেবিলকে ঘিরে রয়েছে অনেকগুলো গদিআঁটা মেহগিনি কাঠের চেয়ার। কাঠের পালিশ আরশির মতো চকচকে। মাটিতে পাতা পুরু লাল গালিচা। পা ডুবে যায়। মাথার উপরে বিরাটাকার সুদৃশ্য এক ঝাড়বাতি। দেওয়ালের গায়ে উপরের দিকে আটকানো অনেকগুলি বাহারি দেওয়ালগিরি। ঘরের একদিকের দেওয়ালের গায়ে আঁটা রয়েছে বেশ বড়সড় একটা বেলজিয়াম কাঁচের আয়না। ঝাড়বাতিকে কেন্দ্র করে সমদূরত্বে কড়িবরগার ছাত থেকে ঝুলছে টানা পাখা। ঘরের চার কোণায় বাহারি কর্নার স্ট্যান্ডের উপরে রাখা রয়েছে কালো পাথর খোদাই করা চারটি সিংহের মূর্তি।

গালিচা, ঝাড়বাতি, টেবিল, চেয়ার, কর্নার স্ট্যান্ড, টানা পাখা, দেওয়ালগিরি, সিংহের মূর্তি, বেলজিয়াম কাঁচের আরশি এসবই পলাশির গনিমত। হিরাঝিল থেকে নিয়ে আসা এসব উপকরণ দিয়ে নিজের বাড়িকে মনের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছেন রবার্ট ক্লাইভ। মিটিংরুমের বাহারি সাজসজ্জা দেখে মুগ্ধ কাউন্সিলের সকল সদস্য। দমদমার বাড়িতে এই প্রথম তাঁদের আসা। ওয়াটসের মনে হচ্ছিল যেন হিরাঝিল প্যালেসে এসে ঢুকেছেন।

‘প্লিজ সিট’। এই বলে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন ক্লাইভ। ঠোঁটে গোঁজা জ্বলন্ত পাইপ। কাউন্সিলের সকল সদস্য বসলেন কুরসিতে। কয়েকজন দাখিলা এসে পলকাটা কাচের গেলাসে কাঁচা আমের শরবত নিয়ে এল। অতিথিদের আসনের পাশে রেখে গেল গড়গড়া।

পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘বলুন, আপনাদের তকলিফ কী আছে?’

লং-কোটের জেবের ভিতর থেকে একটা কাগজ বের করে ড্রেক বললেন, ‘লন্ডন থেকে এসে গতকাল কলকাতায় অ্যাঙ্কর করেছে হার্ডউইক ইন্ডিয়াম্যান।’

গভীর কৌতূহলের সঙ্গে ড্রেকের মুখপানে চেয়ে আছেন ক্লাইভ।

ড্রেক বললেন, ‘লন্ডন থেকে এসেছেন কোম্পানির রিপ্রেসেন্টেটিভ জন স্যামসন।’

স্থির দৃষ্টিতে ড্রেকের মুখপানে চেয়ে ধোঁয়া ছেড়ে চলেছেন ক্লাইভ। ক্ষণিকের নীরবতা ঘরজুড়ে। মাথার উপরে দুলছে টানা পাখা। ক্যাঁচ-ক্যাঁচ আওয়াজ বেশ স্পষ্ট।

ড্রেক কাগজটা ক্লাইভের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘কোম্পানি সেন্ট অ্যা ডেসপ্যাচ।’

কাগজটায় চোখ রাখলেন ক্লাইভ। ক্রমশ গম্ভীর হয়ে উঠতে লাগল তাঁর মুখটা।

কোম্পানির ডিরেক্টরেরা কলকাতা কাউন্সিলের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বিষয়ে এক অর্ডার পাঠিয়েছেন। গভর্নরের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে রজার ড্রেককে। তাঁর জায়গায় নির্দিষ্ট কাউকে গভর্নর করা হয়নি। তার পরিবর্তে আজব এক সিস্টেমের কথা লিখেছেন লন্ডনের কর্তারা। দশজন মেম্বার নিয়ে এক কাউন্সিল তৈরি হবে। আর সেই কাউন্সিলের চারজন সিনিয়র মেম্বার তিন মাস করে কলকাতা কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট বা গভর্নর হবেন। এই চার সিনিয়র মেম্বার হলেন হলওয়েল, বীচার, ম্যানিংহাম ও ওয়াটস। গোটা ডেসপ্যাচে ক্লাইভের নামের উল্লেখ নেই কোথাও।

প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন ক্লাইভ। বাংলা থেকে প্রায় উৎখাত হতে বসা কোম্পানিকে তিনি প্রবল ভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন, নিজের খায়েশের গোলাম বানালেন নবাবকে, অথচ তাঁর সাফল্যের কোনও দাম দিল না কোম্পানি? মনে মনে তিনি আশা করেছিলেন পলাশিতে কুদরতির জন্য কোম্পানি হয়তো তাঁকে কলকাতার গভর্নরের পদে বসাবে। লন্ডন থেকে আদেশনামা এল বলে।

বাংলা ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে মোটেই নেই ক্লাইভের। গভর্নরের পদটা পেলে কলকাতায় তার থাকার একটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর প্রতি এমন অবিচার কেন কোম্পানির বড় সাহেবদের? গভর্নর না হয়েও তিনিই তো কলকাতার অলিখিত গভর্নর। তাঁর সঙ্গে আলোচনা না করে আজকাল একটা সিদ্ধান্তও নিতে সাহস করে না কলকাতা কাউন্সিল। তিনি যা চান তাই মেনে নেয় কাউন্সিল। বেঙ্গল কাউন্সিল বলতে ক্লাইভকেই বোঝে নিজামত। অথচ গভর্নরের পদের উপরে অফিসিয়ালি তাঁর অধিকারকে বৈধতা দিতে কোম্পানির ডিরেক্টরদের এত কুণ্ঠা কেন? তাঁর পরিবর্তে তাঁর চেয়ে অযোগ্য চারজনকে পালা করে গভর্নরের পদটা দেওয়া হল। বোঝাই যাচ্ছে এঁদের কারও উপরেই কোম্পানির তেমন ভরসা নেই। তবুও বঞ্চিত তিনি? রাগে ও অপমানে ভিতরে ভিতরে ফুঁসতে লাগলেন ক্লাইভ। মনে মনে ঠিক করে ফেললেন, ঢের হয়েছে, আর নয়। এবারে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি লন্ডনে ফিরে যাবেন। হিন্দুস্তানেই আর থাকবেন না।

গোটা ঘর জুড়ে স্তব্ধতা। কেবল মাথার উপরে শব্দ করে চলেছে টানা পাখা। বাইরে থেকে ভেসে আসছে পাখির কুজন। ক্লাইভের প্রতিক্রিয়ার জন্য অধীর হয়ে উঠেছে সকলে। কাগজটা ভাঁজ করে ঠোঁট থেকে পাইপটা হাতে নিয়ে চেয়ারের গায়ে দেহ এলিয়ে গম্ভীর মুখে ক্লাইভ বললেন, ‘ডিরেক্টরেরা যখন এই বন্দোবস্ত করেছেন, তখন তা মেনে নিতে হবে। আই শ্যাল রিটার্ন টু মাদ্রাজ ফর নাউ। ফ্রম দেয়ার আই উইল গো ব্যাক টু লন্ডন ভেরি সুন।’

এ অভিমানের কথা। তবে এ কথাও সত্যি ক্লাইভকে উপেক্ষা করার জন্য লন্ডনের সাহেবদের পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না। পলাশির যুদ্ধের আগে ক্লাইভ নিজেই কোম্পানির ডিরেক্টরদের চিঠিতে জানিয়েছিলেন বাংলার সমস্যার সমাধান করে দিয়ে তিনি মাদ্রাজে ফিরে যাবেন। পলাশির যুদ্ধের খবরটা কোম্পানির বড় সাহেবেরা জেনেছিলেন ঠিকই কিন্তু ক্লাইভ যে এখনও বাংলাতেই রয়েছেন, এটা তাঁরা জানতেন না। তাঁদের ধারণা ছিল, ক্লাইভ মাদ্রাজে ফিরে গিয়েছেন। তাই কলকাতা কাউন্সিলের জন্য নতুন নির্দেশিকা জারি করার সময় ক্লাইভের কথা তাঁরা ভাবেননি।

ড্রেক, বীচার, ম্যানিংহাম, হলওয়েল, ওয়াটস প্রমাদ গুনলেন। একদিকে ফরাসি আক্রমণের ভয়, অন্যদিকে সুজাউদ্দৌলা ও মারাঠাদের হানাদারির আশঙ্কা। এই অবস্থায় ক্লাইভ যদি দক্ষিণে ফিরে যান, তো কলকাতার কী হবে? কাউন্সিলের পাঁচ কর্তাব্যক্তি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। ক্লাইভের মান ভাঙানোর জন্য কী করতে হবে, সে বিষয়ে শলাপরামর্শ অবশ্য আগেই তাঁরা সেরে এসেছেন।

ম্যানিংহাম বললেন, ‘চারজন মিলে পালা করে গভর্নরগিরি করা এক হাস্যকর ব্যবস্থা। নবাব এতে কনফিউসড হয়ে যাবেন। দিস ডেসপ্যাচ উইল অলসো ক্রিয়েট ক্যাওস ইন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।’

ওয়াটস টেবিল দাবড়ে বললেন, ‘অ্যাবসোলিউটলি রাইট।’

হলওয়েল বললেন, ‘উই মে ইগনোর দিস ডেসপ্যাচ।’

বীচার বললেন, ‘দ্যাট শ্যুড বি ডান রাইট নাউ।’

বিস্মিত হলেন ক্লাইভ। লন্ডনের ডেসপ্যাচ ইগনোর করা মানে? কী বলতে চাইছেন এঁরা?

ক্লাইভের মুখপানে চেয়ে ড্রেক বললেন, ‘উই ওয়ান্ট ইউ অ্যাজ গভর্নর অফ ক্যালকাটা।’

ক্লাইভ বলে উঠলেন, ‘না না, তা হয় না। আই ক্যাননট ডিসওবে কোম্পানিজ অর্ডার।’

হলওয়েল বললেন, ‘আপনি একা নন, ডিসওবে করব আমরা সবাই। আমরা সবাই মিলে যে আপনাকে গভর্নরের চেয়ারে বসতে বাধ্য করেছি, সেটা মিনিটসে লেখা হবে। সেই মিনিটস পাঠিয়ে দেওয়া হবে লন্ডনে। তারপরে ডিরেক্টরেরা যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবেন।’

স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ক্লাইভ। এ কোন হলওয়েল? যিনি বহুদিন থেকে মনে মনে কলকাতার গভর্নরের পদটাকে কামনা করে আসছেন, ক্লাইভের প্রতিপত্তি তাঁর পথের কাঁটা ভেবে একসময়ে পদে পদে যিনি ক্লাইভের বিরোধিতা করেছেন, এই মানুষটা কি তিনিই?

ক্লাইভের চোখের দৃষ্টি আনত। হাতদুটো বুকের কাছে ভাঁজ করা।

সকলেই বিনীত ভাবে তাঁকে অনুরোধ করলেন, ‘প্লিজ অ্যাকসেপ্ট দিস প্রোপোজাল।’

কোম্পানির ডেসপ্যাচ অগ্রাহ্য করলে ডিরেক্টরদের প্রতিক্রিয়া কী হবে ক্লাইভ তা জানেন না, তাঁকে কলকাতার গভর্নর হিসেবে কোম্পানি অফিসিয়ালি যে মেনে নেবে, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই—এসব নিয়ে ভাবনাও ক্লাইভের তেমন নেই। তবে তাঁর কলিগসরা দমদমার বাড়িতে ছুটে এসে একযোগে যে ভাবে গভর্নরের পদটা তাঁকে অফার করে তাঁর প্রতি সম্মান দেখালেন তা এককথায় অভূতপূর্ব। ক্লাইভ অভিভূত। বললেন, ‘ওয়েল। অ্যাজ ইউ অল আর রিকোয়েস্টিং আই এগ্রি উইথ দিস প্রোপোজাল।’

একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠলেন ড্রেক, হলওয়েল, বীচার, ম্যানিংহাম ও ওয়াটস।

কিছুক্ষণ পর কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে ক্লাইভও ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে চললেন ফোর্ট উইলিয়ামের উদ্দেশে। সন্ধের মুখে কলকাতা কাউন্সিলের জরুরি মিটিং বসবে।

ফোর্ট উইলিয়ামের সদর দেউড়িতে প্রস্তুত হয়েছিল ফৌজি ব্যান্ড। ঘোড়া থেকে ক্লাইভকে নামতে দেখেই ব্যান্ডে বেজে উঠল রুল ব্রিটানিয়া। কেল্লার ভিতরে প্রবেশ করলেন ক্লাইভ।

ক্লাইভের হাত ধরে গভর্নরের চেয়ারে তাঁকে বসিয়ে দিলেন রজার ড্রেক।

ফোর্ট উইলিয়াম থেকে তোপ গর্জন করে উঠতে লাগল ঘন ঘন।

রাতারাতি ঢোল শোহরত হল সুতানুটি-কলকাতা-গোবিন্দপুর জুড়ে। কলকাতার গভর্নর হয়েছেন সাবিৎ জঙ্গ, নওশেরউদ্দৌলা, কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ।

খুশিতে মাতল গোটা কলকাতা।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *