পলাশির পরে – ৫৩

৫৩

অনেক সময় দাবানলের চেয়েও দ্রুত গতিতে গুজব ছড়ায়। কোনও ঘটনা লোকের মুখে বিকৃত হতে হতে যখন দূরবর্তী কোনও জায়গায় গিয়ে যখন পৌঁছয় তখন তার অঙ্গ থেকে সত্যির আবরণটাই খসে পড়ে। প্রচারিত হয় ঝুটা কহানি। সত্য-মিথ্যা, সম্ভব-অসম্ভব হিসেব-নিকেশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে মানুষ। বিকৃত সংবাদই মান্যতা পায় সাধারণ লোকের মুখে মুখে। অসত্য কাহিনিকে কেন্দ্র করে তপ্ত হয়ে ওঠে চারিদিক। সুযোগ বুঝে লুঠেরা-বদমাশের দল তৎপর হয়। খামোখা মুসিবতের মধ্য পড়ে আমআদমি। এমনই এক কাণ্ড ঘটে গেল মুর্শিদাবাদে।

একদিন সকালে অচানকই ত্রস্ত হয়ে পড়ল ব্যস্ত চকবাজার। ঝুপঝাপ করে ঝাঁপ ফেলতে লাগল দোকানিরা। একের পর এক দোকানে লুঠপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে লাগল লুঠেরা, দাঙ্গাবাজেরা। রায়দুর্লভের ঘনিষ্ঠ বলে যারা পরিচিত, তাদের ঘর থেকে টেনে বের করে প্রকাশ্য রাজপথে কোতল করতে লাগল মিরনের অনুচরেরা। এসব ঘটল মিরনের প্রত্যক্ষ মদতে। সাধারণ মানুষ প্রবল ত্রাসে অস্থাবর সম্পত্তি ফেলে রেখে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালাতে লাগল। শয়তানদের কামনার বলি হল অনেক জেনানা, আওরাত। সুবে বাংলার রাজধানী ফের অশান্ত হল। কিন্তু কেন?

পাটনা থেকে উড়ে এসেছে এক খারাপ খবর। রামনারায়ণের চক্রান্তে নিহত হয়েছেন নবাব মিরজাফর খাঁ। রামনারায়ণের অনুগত টিকারির রাজা সুন্দর সিং গভীর রাতে নবাব মিরজাফর খাঁর কক্ষে ঢুকে তরবারির আঘাতে তাঁকে খুন করেছেন। এ কাজে মদত দিয়েছেন রায়দুর্লভ।

একেবারে উলটপুরাণ। মিরকাজিমের চক্রান্তে আক্রান্ত হয়েছিলেন রামনারায়ণ— সেই খবরটাই লোকের মুখে মুখে বদলে গিয়ে এই চেহারা নিয়েছে।

খবরের সত্য-মিথ্যা ভালো করে যাচাই না করে রাগে ও আতঙ্কে অস্থির হয়ে পড়ল মিরন। দুর্বলচিত্ত নবাবজাদা প্রবল ত্রাসে খবরটা ছড়িয়ে দিল রাজধানীতে। আর নিজের তাগদের সাবুত দাখিল করতে গিয়ে নিজের অনুচরদের উসকে দিয়ে গোটা রাজধানীকে অশান্ত করে তুলল। হাহাকার করে উঠল পীড়িত মানুষ। তাদের করুণ আর্তনাদে গুমোট হল বাতাস।

ওদিকে জাফরাগঞ্জ প্যালেসের চারিদিকে সেনা মোতায়েন করে, ঘরের অন্দরে বসে ভয়ে কাঁপতে লাগল মিরন। সত্যি সত্যিই ফের ইনকিলাব ঘটে গেল। কী আছে তার নসিবে?

ভুল ভাঙল কয়েকদিন পর। মিরনের হাতে এসে পৌঁছল মিরজাফরের চিঠি। রাজমহল থেকে লিখেছেন। ‘…আশা করি আল্লার মেহেরবানিতে খুশ তবিয়ত, সহি সালামত আছ ও রাজধানীকে সালামত রেখেছ। আমি পাটনা থেকে ফিরছি। খুশ তবিয়ত আছি। তবে মন ভালো নেই। রাজমহলে বসে এই চিঠঠি লিখছি তোমাকে।…’

এই অবধি পড়ে থমকাল মিরন। আজিব বাত। আব্বাহুজুর চিঠঠি লিখছেন রাজমহল থেকে। ইয়ানে তাঁর কোতল হওয়ার পয়গাম ঝুটা? বাকি চিঠিটা দ্রুত পড়তে লাগল মিরন।

‘…আপাতত কয়েকটা দিন রাজমহলে কাটিয়ে ফের মুর্শিদাবাদের পথে রওনা হব। এই ওয়াক্তে আমার জখমি দিলের ইলাজ জরুরি। আমার পাটনা অভিযানের মনসুবা বরবাদ হয়েছে। রামনারায়ণ খুশ তবিয়ত, সহি সালামত আছে। তাকে পাটনার নায়েব সুবাদারের জিম্মেদারি দিতে হয়েছে। জানি, এ কথা শুনলে তোমার গুসসা হবে। মিরকাজিমের এক আহাম্মকিতে আমার সব কোশিশ বরবাদ হয়ে গেল। সে সব কথা ফিরে এসে তোমাকে বলব। ক্লাইভ সাহেব ছিলেন রামনারায়ণের পক্ষে। তবে আমি মনে করি রায়দুর্লভই আমার এই বেইজ্জতির জন্য দায়ী। রামনারায়ণের পক্ষ নেওয়ার জন্য ক্লাইভ সাহেবকে সেই বুঝিয়েছিল বলে আমার আন্দাজ। কী আর করা যাবে। বদকিসমতি আমারই।’

‘ক্লাইভ সাহেব এতক্ষণে হয়তো ভগবানগোলা পৌঁছে গিয়েছেন। ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে মুর্শিদাবাদে ফিরছেন রায়দুর্লভ। রামনারায়ণ, রাজারাম, রায়দুর্লভ কাউকেই খতম করতে পারলাম না আমি। এই মায়ুসী আমার কলিজাকে জখম করেছে। বড় হতাশ লাগছে। রাজমহলে কয়েকটা দিন কাটিয়ে মনের ইলাজ করাতে চাই।’

এই অবধি পড়ে রাগে কাঁপতে লাগল মিরন। তাঁর আপত্তি, নবাবের আপত্তি সত্ত্বেও নায়েব সুবাদারের কুরসিটা ধরে রাখলেন রামনারায়ণ! কর্নেল ক্লাইভ এক দুষ্ট জিন। নবাবকে ভেড়া বানিয়ে রেখেছেন। ইংরেজদের সুবে বাংলা থেকে তাড়াতে না পারলে নবাব কিছুতেই আজাদ হতে পারবেন না। এই ভাবনা দিনে দিনে বদ্ধমূল হয়ে উঠছে মিরনের মনের মধ্যে।

ফের চিঠিতে চোখ রাখে মিরন। মিরজাফর আরও লিখেছেন, ‘…তবে তোমাকে বলি বেটা দিমাগ শান্ত রেখো। আমার আগেই ক্লাইভ সাহেব পৌঁছে যাবেন মুর্শিদাবাদে, তাঁর খোশ আমদেদ ও খাতিরদারিতে যেন কোনও গলতি না হয়।…’

চিঠিটা ভাঁজ করে জেবের ভিতরে পুরে রাখল মিরন। অস্থির হয়ে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। হঠাৎ তার মাথায় উঁকি দেয় এক আশঙ্কা। ক্লাইভ সাহেবের মনসুবা কী? নবাব লিখেছেন, ফৌজ নিয়ে ভগবানগোলায় পৌঁছে গিয়েছেন তিনি। ওদিকে নবাব রাজমহলে। ক্লাইভ এত দ্রুত মুর্শিদাবাদে ফিরছেন কেন? ওদিকে আবার তাঁর সঙ্গেই ফিরছেন রায়দুর্লভ। তাহলে কী রফা হয়ে গিয়েছে দু’জনের? সত্যিই কী তবে ইনকিলাব ঘটবে? ক্লাইভ ও রায়দুর্লভ মুর্শিদাবাদে এসেই বন্দি করবে তাকে? তারপর কয়েদ করবে হাবুজখানায়? মিরনের কল্পনা বল্গাহীন তুর্কি ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকে।

কেউ যেন হেসে উঠল আড়ালে। মনের ভ্রম।

চিৎকার করে ওঠে মিরন, ‘কে?’ ভয়ার্ত চোখে চারিদিকে চোখ ঘোরায় নবাবজাদা। না, কেউ কোথাও নেই। শুধু দেওয়ালের গায়ে কাঁপছে তার নিজের অতিকায় ছায়া।

হঠাৎই সিরাজের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটা মনে পড়ে যায় মিরনের। হ্যাঁ এখানেই তো, এই জাফরাগঞ্জ প্যালেসে মাটির নিচে গোপন কারাকক্ষে কালো পাথরের মেঝের উপরে মুখ থুবড়ে পড়েছিল দেহটা। মুখে তখনও স্পষ্ট যন্ত্রণার ছাপ। মাথার ঝাকড়া চুলগুলো রক্তে ভেজা। তাহলে তারও পরিণতি কি এমনই…ভয়ে কেঁপে উঠল মিরন। ঘামছে গোটা শরীর।

নবাবজাদার জরুরি তলব পেয়ে ছুটে এলেন রাজবল্লভ।

মিরন উত্তেজিত গলায় বলে, ‘শুনেছেন তো, ইংরেজ ফৌজ দ্রুত এগিয়ে আসছেন।’

‘জি হুজুর।’

‘ক্লাইভের সঙ্গে ওয়াপস আসছেন খন্নাস রায়দুর্লভ।’

‘জি হুজুর। শুনেছি।’

‘আমার আন্দাজ ফের ইনকিলাব ঘটাতে চান ক্লাইভ।’

রাজনৈতিক কূটকৌশলে পোক্ত রাজবল্লভের এ কথায় একিন নেই। এখনই ইনকিলাব ঘটানোর কোনও ইরাদা ক্লাইভের আছে বলে তাঁর মনে হয় না। দিব্যি ক্লাইভের বশে রয়েছেন মিরজাফর খাঁ। ক্লাইভ যা চাইছেন, তাই ঘটছে সুবে বাংলায়। এই পরিস্থিতিতে খামোখা হুজ্জুতির মধ্যে যেতে চাইবে কেন ইংরেজরা। রাজবল্লভ যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারেন যে নবাবজাদা যা ভাবছেন তা ভুল। তবে সে পথে তিনি গেলেন না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। নবাবজাদা কোনও বিরুদ্ধমত বরদাস্ত করেন না। তিনি যা ভাবেন সেটাকেই সহি বলে মনে করেন।

‘কী করা যায় এখন?’ প্রশ্ন করে মিরন।

রাজবল্লভ বলেন, ‘হুজুর আপনি যা হুকুম করবেন তাই হবে।’

‘জাফরাগঞ্জ প্যালেস নিরাপদ নয়। সহজেই আমার নাগাল পেয়ে যাবে দুশমন।’

‘কী চান—ফরমায়েশ করুন হুজুর।’

‘ফৌজ নিয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে মোতিঝিল প্যালেসে ঘাঁটি গাড়তে চাই।’

‘জি হুজুর।’

হঠাৎই গর্জন করে ওঠে মিরন, ‘তক্ত ইয়া তাবুত। ফৌজ তৈয়ার করুন জলদি।

অবাক হয়ে রাজবল্লভ শুধোলেন, ‘এখনই? এই রাতে?’

‘হাঁ! হাঁ! আভি। ওয়াক্ত বহুত কম। এখনই মোতিঝিলে যেতে চাই আমি।’

‘জি হুজুর।’ মাথা ঝুঁকিয়ে কথাটা বলে বিদায় নিলেন রাজবল্লভ।

সেই রাতেই হাতি ঘোড়া, লোক-লস্কর, সেপাই-পেয়াদা, কামানের গাড়ি, পরিবার ও হারেমের খুবসুরতিদের নিয়ে রওনা হল মিরন। চেঁচামেচি, হইহুল্লোড়, কামানের গাড়ির ঘড়ঘড় আওয়াজে ভেঙে খান খান হল রাতের স্তব্ধতা। ঘুম ভেঙে চোখ কচলে বাইরে বেরিয়ে এসে মানুষজন দেখল, নবাবজাদার কাফেলা চলেছে মোতিঝিল প্যালেস অভিমুখে। খবরটা তামাম মুর্শিদাবাদে ছড়িয়ে পড়ল সেই রাতেই। ফের ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই বাঁধতে চলেছে।

সিরাজের সঙ্গে লড়াইটা হয়েছিল পলাশিতে। রাজধানী থেকে দূরে। সে সময় অক্ষত ছিল মুর্শিদাবাদ। কিন্তু এবার যে লড়াই মুর্শিদাবাদেই। দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়ল রাজধানীর আমজনতা। মিরজাফরের মওতের ঝুটা খবরকে কেন্দ্র করে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল মুর্শিদাবাদে, তা ধীরে ধীরে নিভে আসছিল। কিন্তু সেই আগুনকে ফের উসকে দিল নবাবজাদার লড়াইয়ের আনজাম। ফের আগুন জ্বলল, সক্রিয় হল লুঠেরার দল। শুরু হল লুঠতরাজ। পুড়তে লাগল ঘরবাড়ি, মানুষের নসিব।

মুর্শিদাবাদ ফের বেচ্যায়েন। এই খবর পেয়ে ব্যস্ত হয়ে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে কাশিমবাজার থেকে ছুটে এলেন স্ক্র্যাফটন। রাজধানীর হালত দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি। মুর্শিদাবাদ নগরী কার্যত বিধ্বস্ত। বাতাসে পোড়া ইট-কাঠের গন্ধ। পথের ধারে এখানে ওখানে পড়ে থাকা শবদেহ ঠোকরাচ্ছে শকুন। সুনসান রাজধানীর পথঘাট। সদাব্যস্ত চকবাজার থমথমে। বহু দোকানপাট ভস্মীভূত। বাতাসে উড়ছে পোড়া ছাই।

লুঠতরাজের ভয়ে কুঠির সদর দেউড়ি বন্ধ করে ঘরে নিজেকে স্বেচ্ছা বন্দি করে রেখেছিলেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। ফৌজ নিয়ে স্ক্র্যাফটনের মুর্শিদাবাদে প্রবেশের কথা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তার মুখ থেকেই স্ক্র্যাফটন শুনলেন সব কাহিনি। রাগে ফুঁসতে লাগলেন স্ক্র্যাফটন। ফের একবার বেয়াদপ ছোকরা মিরন তাঁকে তকলিফের মধ্যে ফেলেছে।

দিন কয়েকের মধ্যেই ক্লাইভ এসে পৌঁছবেন মুর্শিদাবাদে। তার আগে শহরের এই বেলাগাম পরিস্থিতির উপরে রাশ টানা দরকার। বিশ-পঁচিশজন গোরা-পল্টনকে সঙ্গে নিয়ে ঝড়ের গতিতে স্ক্র্যাফটন এসে হাজির হলেন মোতিঝিলে। মিরনের কাণ্ডকারখানা দেখে হাঁ হয়ে গেলেন তিনি। রীতিমতো যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। তোপ দাগার জন্য গোলন্দাজরা প্রস্তুত। জঙ্গি হাতিগুলো গায়ে, মাথায় বর্ম চাপিয়ে তৈরি হয়ে আছে। সেপাইরা হাতিয়ারবন্ধ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঘামাসান লড়াই লড়তে হবে—কোরান ছুঁইয়ে সেনাপতিদের দিয়ে শপথ করিয়ে নিচ্ছে মিরন।

স্ক্র্যাফটনকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এলেন রাজবল্লভ।

ক্ষোভে ফেটে পড়লেন স্ক্র্যাফটন। ‘কোথায় নবাবজাদা?’

স্ক্র্যাফটনের চড়া গলার আওয়াজ মিরনের কানে গেল।

শপথ গ্রহণের কার্যক্রম ফেলে রেখে সেও ছুটে এল।

মনে মনে মুচকি হাসলেন রাজবল্লভ। ক্লাইভের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তাল ঠুকছেন নবাবজাদা ওদিকে স্ক্র্যাফটনের কড়া মেজাজ দেখেই মিইয়ে গিয়েছেন। বাহাদুর বটে তার মনিব।

মিরনকে এগিয়ে আসতে দেখেই স্ক্র্যাফটন গর্জন করে উঠলেন, ‘ইউ হ্যাভ ডিস্টার্বড মুর্শিদাবাদ এগেইন বাই স্প্রেডিং রিউমারস। রাজধানী দেখভালের দায় আপনার। আর আপনি বারবার ট্রাবল ক্রিয়েট করে আমাদের পরেশান করবেন? কী ভেবেছেন আপনি?’

মিরন নিরুত্তর। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

‘লড়াইয়ের আনজাম কেন? কার সঙ্গে লড়বেন?’

রীতিমতো ঘাবড়ে যাওয়া গলায় মিরন বলে, ‘ক্লাইভ সাহেব তুরন্ত আসছেন রাজধানীর দিকে। সঙ্গে দেওয়ানজি। তিনি মসনদ দখল করতে চান। ফির ইনকিলাব হবে। সেই আন্দেশায়—’

‘আপনার দিমাগ খারাপ হয়ে গেছে। হু টোল্ড ইউ দিস ননসেন্স?’

মিরন নিরুত্তর।

‘ইনকিলাব ঘটানোর কোনও মতলব ক্লাইভ সাহেবের নেই।’

মৃদু গলায় মিরন বলে, ‘তবে আমি গলত আন্দাজ করেছিলাম।’

রক্ত চড়ে গেল স্ক্র্যাফটনের মাথায়। নবাবজাদা না হয়ে অন্য কেউ হলে হয়তো ঠাস করে এক চড় কষিয়েই বসতেন। নিজেকে সামলে নিয়ে চড়া গলাতেই বললেন, ‘কাজটা আপনি ঠিক করেননি। আমআদমির চোখে কর্নেলকে আপনি বেইজ্জত করলেন।’

ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলেন স্ক্র্যাফটন। মিরনের চোখের সামনে একরাশ ধুলো উড়িয়ে তিরবেগে ফের চকবাজার অভিমুখে ঘোড়া হাঁকালেন।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মিরন।

.

রাজমহলে আমোদ-আশরতে বেশ দিন গুজরান করছিলেন মিরজাফর। দিনে শিকারখেলা, রাতে মেহফিল। হারেমের খুবসুরতিদের নিয়ে ফূর্তি, নাচগান, খানাপিনা আর হইহুল্লোড়। সহসা তাল কাটল। ক্লাইভের চিঠি একেবারে যেন তোপের গোলার মতো আছড়ে পড়ল মিরজাফরের মাথার উপরে।

ক্লাইভ লিখেছেন, ‘…গুজব ছড়িয়ে নবাবজাদা কী কাণ্ড ঘটিয়েছে, তা শুনলে আপনার হাড় হিম হয়ে যাবে। নিজের খেয়ালের বশে সে চারিদিকে প্রচার করেছে যে আমি নাকি আপনাকে মসনদ থেকে সরিয়ে রায়দুর্লভকে মসনদে বসানোর আনজাম করছি। তাই আপনাকে পিছনে ফেলে রেখে দ্রুত মুর্শিদাবাদে এসেছি।

‘আপনি ভালো করেই জানেন ইংরেজ এক ইমানদার জাত। আপনার সঙ্গে যে ইকরারনামায় কোম্পানির হয়ে আমি দস্তখত করেছি, তা অচানক বরবাদ করে দিয়ে এমন বেওকুফি করার তামান্না আমার নেই। তাছাড়া কোম্পানির কাছেও আমার জিম্মেদারি আছে। আমি স্রেফ আমার খুশখেয়ালে চলতে পারি না। মরজি, খেয়াল– এসব নবাবি রিয়াসতে চলতে পারে, লেকিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কারবারে চলে না।

 ‘মুর্শিদাবাদে পৌঁছে আমিও তাজ্জব বনে গিয়েছি এ কথা শুনে যে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নবাবজাদা মোতিঝিল প্যালেসে ছাউনি ফেলেছেন। এ আমার বেইজ্জতি, কোম্পানির বেইজ্জতি। আমআদমির কাছে ইংরেজদের হেয় করেছে নবাবজাদা। আপনাকে মসনদ থেকে টেনে নামানোর আনজাম যদি আমরা করি তো আপনাকে জানিয়েই করব। লুকিয়ে ছুপিয়ে কোনও কাজ করা আমাদের ধাতে নেই। আপনি বলেছিলেন মুর্শিদাবাদে পৌঁছে আপনার জন্য ইন্তেজার করতে। আপনার এই অনুরোধ রাখতে পারলাম না। এ ভাবে বেইজ্জত হওয়ার পর মুর্শিদাবাদে থাকার ইচ্ছে আমার আর নেই। আমি কলকাতায় ফিরে চললাম।

‘সব শেষে বলি, নবাবজাদাকে আপনি সতর্ক করবেন। ভবিষ্যতে খামোখা রাজধানীকে বেচ্যায়েন করে কাশিমবাজারের রেসিডেন্টকে যেন তকলিফের মধ্যে না ফেলে। মনে রাখবেন আমাদেরও ধৈর্যের একটা সীমা আছে। নবাবজাদা যদি নিজেকে না শোধরান তো ভবিষ্যতে আমরা এমন কদম উঠাতে বাধ্য হব যে, সেটা আপনার বা নবাবজাদার, কারও পক্ষেই ভালো হবে না।…’

এই চিঠি পেয়ে আমোদ-ফূর্তি মাথায় উঠল নবাবের। রাজমহল থেকে তাঁবু গুটিয়ে দ্রুত তিনি মুর্শিদাবাদের পথে এগোতে লাগলেন।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *