পলাশির পরে – ৬৯

৬৯

হিরাঝিল প্যালেসে মণি বেগমের মহল-সংলগ্ন দোতলার অলিন্দে রয়েছে এক চিলতে বাগান। পোর্সেলিনের তৈরি বিভিন্ন আকারের বাহারি আধারে বেড়ে উঠেছে লতাগুল্ম, বনসাই। পাথুরে মেঝের উপরে মাটি বিছিয়ে তৈরি হয়েছে সবুজ ঘাসের লন। অলিন্দের খোলা অংশ সূক্ষ্ম তারের জাল দিয়ে ঢাকা। সেই অর্থে গোটা অলিন্দই যেন মস্ত এক খাঁচা—টিয়া, ময়না, কবুতর, বুলবুলি, কাকাতুয়াসহ আরও হরেক কিসিমের পাখির আস্তানা। গোলাম-বাঁদিরা বলে নবাব-বেগমের চিড়িয়াঘর। রোজ সকালে এখানে এসে নিজের হাতে পাখিদের দানাপানি দেন বেগম সাহেবা। তাঁকে দেখলেই ডানা ঝাপটে আনন্দে হল্লা বাধিয়ে দেয় পাখির দল। টিয়া, ময়না, কাকাতুয়া শেখানো বুলি আওড়ায়– ‘বেগম সাহেবা সেলাম।’ মণি বেগম খুশিতে হেসে ওঠেন।

রোজকার মতো আজও সবুজ ঘাসের উপরে শ্বেতপাথরের একখানা চৌপাইয়ের উপরে বসে পাখিদের গমের দানা খাওয়াচ্ছিলেন মণি বেগম।

‘মণি!’

এই সম্বোধন শুনে চমকে গিয়ে ঘুরে তাকালেন মণি বেগম।

তারজালির দরজা ঠেলে খাঁচা-অলিন্দে ঢুকলেন নবাব।

গমের দানা বোঝাই রেকাবি পাশে রেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন বেগম সাহেবা।

ক্ষুধার্ত পাখিরা দল বেধে ডানা ঝাপটে ঝাপিয়ে পড়ল গমের দানায় বোঝাই রেকাবির উপরে।

নবাব মিরজাফর খাঁ বিস্তরখানা ছাড়েন অনেক বেলায়। সূর্য তখন আশমানের মধ্যিখানে চলে আসে। এত সকালে অচানকই এই চিড়িয়াঘরে নবাবকে হাজির হতে দেখে বেশ আশ্চর্যই হয়েছেন মণি বেগম। ‘সরতাজ! আপনি? এই অনওয়াক্তে?’

নবাব মিরজাফর খাঁর চোখে ঝলকাচ্ছে খুশি। মুখে প্রশান্তির ছাপ। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেশ। মণি বেগমের মনে হল, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যেন অন্য কেউ। পাহাড় প্রমাণ দুশ্চিন্তায় সর্বদা নিমজ্জিত, অবসাদগ্রস্ত, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত নবাব মিরজাফর খাঁ নন।

‘তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে পড়লাম মণি।’

‘আমার খুশনসিব।’

শ্বেতপাথরের চৌপাইয়ের উপরে বসে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে পাখিগুলোকে দেখছিলেন নবাব। হঠাৎই রুপোর দাঁড় ছেড়ে মণি বেগমের কাঁধে এসে বসল একটা কাকাতুয়া। শির ঝুঁকিয়ে বলল, ‘সেলাম নবাব বাহাদুর।’

মিরজাফর খাঁ শিশুর মতো হেসে উঠে বললেন, ‘বেশ সবক জানে তো তোমার চিড়িয়া।’

মণি বেগম কাকাতুয়াটাকে হাতে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলোতে থাকেন।

নবাব হঠাৎ বললেন, ‘আচ্ছা মণি তোমার এই চিড়িয়ারা আজাদি চায় না?’

নবাবের প্রশ্নের ধরনে হাঁ হয়ে গিয়ে চকিতে মুখ তুলে তাকালেন বেগম সাহেবা।

নবাব ফের শুধোলেন, ‘চায় না আজাদি?’

‘না। দরজা খুলে দিলেও এরা কেউ উড়ে পালাবে না। আমি যে কত যত্ন করি এদের। এই এক চিলতে বাগানে রুপোর দাঁড়ে বসে নিশ্চিন্তে দোল খায় এরা। বাইরের দুনিয়ায় লড়াই বড় কঠিন। মণি বেগমকে এরা এদের দোস্ত বলে মনে করে। এরা জানে বেগম সাহেবার হাতে এরা সালামত থাকবে। কোনও ভাবনা নেই।’

মাথা নাড়িয়ে নবাব বললেন, ‘ভালো বলেছ। বেশ বেশ!’

‘আজ এত সকালে উঠে পড়লেন যে।’

‘দেওয়ানজি এসে ঘুম ভাঙালেন। পাটনা থেকে খুশির খবর নিয়ে এসেছে কাসিদ।’

‘এর মধ্যেই খুশখবর? জিত হাসিল করে নিলেন ক্লাইভ সাহেব?’ খুশি ঝরে বেগমের গলায়।

সজোরে হেসে ওঠেন নবাব। নবাবের হাসির শব্দ শুনে আহার্য ছেড়ে ডানা ঝাপটে উড়ে গিয়ে ছাত থেকে ঝুলতে থাকা রুপোর দাঁড়ে গিয়ে বসল পাখির দল।

গলার আওয়াজে দুনিয়ার সব খুশি যেন উজাড় করে দিলেন নবাব। ‘লড়াই হল কোথায়? কসিদের মুখে শুনলাম ক্লাইভ সাহেব ফৌজ নিয়ে পাটনায় পৌঁছতেই শাহজাদা পালিয়ে গিয়েছেন।’

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মণি বেগম। ‘আল্লা মেহেরবান।’

‘এই খুশির খবরটা তোমাকে জানানোর জন্য ছুটে এলাম মণি।’ বললেন নবাব।

‘আমি তো সমানে মোনাজাত করে চলেছি পয়গম্বরের কাছে—কোনও মুসিবত যেন না আসে।’ হাসলেন মণি বেগম।

‘ক্লাইভ সাহেবের মদত চাওয়ার জন্য তুমি পরামর্শ দিয়েছিলে। আমি চিঠি লিখিনি। মস্ত বেওকুফির কাজ করেছি। অথচ দেখো উনি নিজেই ছুটে এলেন। যাই বল, ইংরেজলোগ দোস্তির কিম্মত বোঝে।’ ফের খুশিতে উদ্ভাসিত হল মিরজাফরের মুখমণ্ডল।

‘ক্লাইভ সাহেব সঙ্গে থাকলে কোনও মুসিবত আপনাকে ছুঁতে পারবে না সরতাজ। ইংরেজদের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়ার কথা আপনি ভুলেও কখনও ভাববেন না যেন।’

নবাবের পায়ের কাছে হাঁটু ভাজ করে বসেছিলেন মণি বেগম। তার চিবুক ছুঁয়ে নবাব বললেন, ‘সচ বাত বলেছ তুমি। কে দোস্ত আর কে দুশমন তার সহি আন্দাজ পাওয়া সহজ নয়।’

‘আপনি গোটা রাজধানী জুড়ে খুশি মানানোর আনজাম করুন। খোদ মোগল শাহজাদা পালিয়ে গিয়েছেন। এ তো আপনার বিরাট জিত।’

বেগম সাহেবার কথায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন নবাব। তারপর বললেন, ‘লেকিন আমি যে বহুত পরেশানির মধ্যে পড়েছি মণি।’

‘এই খুশির পলে কীসের পরেশানি আপনার?’ অবাক হয়ে শুধোলেন বেগম সাহেবা।

‘ক্লাইভ সাহেবকে কী সওগাত দিই বলো তো? কীসে খুশি হবেন উনি? ভেবে ভেবে হয়রান হয়ে যাচ্ছি আমি। তোমার উপরে ভরসা আছে। একটা উপায় বাতলাও মণি।’

মণি বেগম একটু ভেবে বললেন, ‘জায়গির দিন ক্লাইভ সাহেবকে।’

‘বাঃ! চমৎকার। কথাটাতো আমার মাথায়ই আসেনি।’ খুশিতে উচ্ছল হন নবাব, পরমুহূর্তেই ভুরু কুঁচকে চিন্তিত গলায় বলেন, ‘লেকিন…’

‘আবার কী ভাবছেন?’

‘কলকাতা থেকে দূরে জায়গির দিলে কি খুশ হবেন তিনি?’

‘দূরে কেন? কলকাতার কাছে জায়গির দিন।’ হেসে বলেন মণি বেগম।

‘ও তল্লাটে সবই তো দোফসলা জমি। অমন জমি জায়গির দেওয়ার রেওয়াজ যে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমল থেকে উঠে গিয়েছে।’

মণি বেগম গালে হাত দিয়ে ফের ভাবতে লাগলেন। কথাটা সত্যি বটে। বিহার, ওড়িশার অনাবাদি জমি জায়গির দেওয়ার প্রথা চালু করে গিয়েছেন মুর্শিদকুলি খাঁ। বহু বছর ধরে চালু এই রীতি। আমির-ওমরাহ-মনসবদাররা মুখ বুজে মেনে নিয়ে আসছে। হঠাৎ এই রীতি ভাঙলে সকলে আবাদি, উর্বর জমি জায়গির পাওয়ার জন্য আবদার জানাবে। এতে তকলিফ বাড়বে নবাবের। জায়গির পাওয়া জমির জন্য খাজনা দিতে হয় না। উর্বর জমির খাজনা অনেক বেশি। এই জমি জায়গির হিসেবে বিতরণ করলে নিজামতের অনেক লোকসান। অনেক দিন আগে একথা বুঝেছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। ঔরঙ্গজেব বাদশার প্রিয়পাত্র এই মানুষটির সে সময়ে যা দাপট ছিল তাতে কেউ তাঁর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার হিম্মত দেখায়নি। পরে ধাতস্থ হয়ে গিয়েছে সকলে। কোনও ওমরাহ, মনসবদার এ নিয়ে এতদিনে প্রশ্ন ওঠায়নি।

মণি বেগম বললেন, ‘এক কাজ করুন। কলকাতার আশেপাশে যে গ্রামগুলো আপনি ইংরেজ কোম্পানিকে জমিদারি হিসেবে দিয়েছেন সেগুলোই ক্লাইভ সাহেবকে জায়গির হিসেবে দান করুন।’

চিন্তিত মুখে নবাব বললেন, ‘এতে হর সাল তিন লাখ টাকা লোকসান হবে নিজামতের।’

‘লোকসান তো এমনিতেই হচ্ছে। দেড় সাল হয়ে গেল। কলকাতার জমিদারির খাজনাবাবদ কোম্পানি তো আপনাকে একটা আশরফিও দেয়নি।’

মিরজাফর অবাক হন। ‘তুমি এত কথা জানো মণি?’

মণি বেগম মুচকি হেসে বললেন, ‘দোস্তের থেকে শালিয়ানা আদায় করা সহজ নয়। ওই জমিদারি ক্লাইভ সাহেবকে জায়গির দিলে উনিও খুশি হবেন আর বকেয়া আদায়ের জন্য আপনারকেও পরেশান হতে হবে না। তিন লাখ টাকা না হয় অন্য খাতে উশুল করে নেবেন।’

নবাব এবারে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, ‘বা বা! চমৎকার বুদ্ধি বাতলেছ মণি। তোমারই নিজামতের দেওয়ান হওয়া উচিত।’

নবাবের কথা শুনে বালিকাসুলভ চাপল্যে খিলখিল করে হেসে উঠলেন মণি বেগম। হাসিতে মুক্তো ঝরল। নবাবের প্রতি কটাক্ষ হেনে তিনি বললেন, ‘মসনদ কোন তরিকায় সালামত রাখতে হয়, তা মণি বেগম বিলকুল বোঝে।’

বিলোল এক কটাক্ষেই ঘায়েল হলেন নবাব। এ যেন বহুবছর আগে দেখা সেই ষোড়শী মণি বাই। সহসা মণি বেগমের হাত ধরে প্রবল ভাবে তাঁকে নিজের দিকে আকর্ষণ করলেন নবাব।

‘আঃ করছেন কী?’

এক ঝটকায় নিজের দুই উরুর উপরে মণি বেগমকে বসিয়ে তাঁর চিকন শরীরটাকে শক্ত বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে প্রবল আবেগে তাঁর মুখমণ্ডলে ঘন ঘন চুম্বন করতে লাগলেন নবাব। আদরের ঘটায় হাঁসফাঁস করতে লাগলেন মণি বেগম। খাঁচা-অলিন্দের চিড়িয়ারা ডানা ঝাপটে মেলা কিচিরমিচির বাধিয়ে দিল।

.

পাটনা থেকে ফিরলেন ক্লাইভ।

খুশির বান ডাকল মুর্শিদাবাদে। হিরাঝিল প্যালেস, মোরাদবাগ প্যালেস, জাফরাগঞ্জ, নিজামত কেল্লা সেজে উঠল আলোকমালায়। আতশবাজির রোশনাইয়ে ম্লান হল রাতের অন্ধকার। নহবতখানা বাতাসে বিলোতে লাগল খুশির সানাই।

খুশির রেশ ছড়িয়ে পড়ল চকবাজারেও। ইংরেজ ফৌজ পাটনায় পা রাখতেই ভয়ে পালিয়ে গিয়েছেন মোগল শাহজাদা আলি গোহর। এই খবর শুনে আনন্দে মাতোয়ারা মিশকিন থেকে রইস আদমি সকলেই। বিগত মাসখানেক বিপর্যয়ের আন্দেশায় ভয়ে কাঁটা হয়েছিল এরা। অতি সাবধানী যারা মুর্শিদাবাদ নগরী ছেড়ে আগেই পালিয়ে গিয়েছিল, তারা সব একে একে ফিরে আসতে লাগল। চকবাজারের পথের ধারে চবুতরাগুলো ফের সরগরম হয়ে উঠল মালপত্রের পসরায়। মিঠাই, শরাব, লস্যি, আতর, গুলাবজল বিকোতে লাগল দেদার। কাবাব, দুনিয়াজা, দমপোক্ত, বিরিয়ানির স্বাদু গন্ধে ম-ম করতে লাগল গোটা চকবাজার। বসরাই গুলাব, গুলদস্তার কারবারিরা ফুলেফেঁপে ঢোল। বাইজি, কসবিদের কোঠি থেকে ভেসে আসতে লাগল দাদরা, ঠুমরি, কাহারবা। রইস আদমিদের হাভেলিতে জ্বলল ঝাড়বাতি। মুজরোর আসরে দামি গালিচার উপরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল মুঠো মুঠো আশরফি। খানাপিনা, মেহফিল, মজলিশ, গুলতানিতে মাতোয়ারা হল সুবে বাংলার রাজধানী। আম-আদমি লড়াই চায় না, শান্তি চায়। লড়াই বিপর্যস্ত করে জনজীবন। দূর হয়েছে মুসিবতের আন্দেশা। তাই এই খুশির আমেজ।

কী রইস আদমির হাভেলির খাসমহল, কী চকবাজারে পথের ধারের গুমটি সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কর্নেল ক্লাইভ। ফোর্ট উইলিয়াম পুনর্দখল, হালসিবাগানের জবরদস্ত লড়াই, চন্দননগরের ফরাসিদের মুসিবত, তারপরে পলাশি, হালে পাটনা– আমজনতার চোখে অতিমানব হয়ে উঠেছেন রবার্ট ক্লাইভ।

মণি বেগমের পরামর্শ মতো কলকাতার আশেপাশের পঞ্চান্নটা গ্রাম ক্লাইভকে জায়গির দিলেন নবাব মিরজাফর খাঁ। ক্লাইভের চোখেমুখে খুশি উপচে পড়ল। মোগল বাদশার কাছ থেকে নওশেরউদ্দৌলা খেতাব পাওয়ার পর থেকে মনটা খুঁতখুঁত করছিল তাঁর। একান্তে অনেককে বলেওছিলেন এদেশের সব আমির-ওমরাহেরই জায়গির আছে। কেবল তাঁরই নেই। একটা জায়গির না পেলে এদেশের আমির-ওমরাহদের কাছে মান থাকছে না। এতদিনে ক্লাইভের এই মনসুবা পূর্ণ হল। এই জায়গিরের শালিয়ানা মনে মনে হিসেব করে ফের একবার তিনি পুলকিত হলেন। কোনও বিনিয়োগ, ঝুটঝামেলা ছাড়াই হর সাল কোম্পানির কাছ থেকে আদায় হবে তিন লাখ টাকা। যতদিন তিনি বাঁচবেন ততদিন বলবৎ থাকবে এই বন্দোবস্ত। তাঁর মৃত্যুর পর এই জায়গির ফের জমিদারি হিসেবে কোম্পানির হাতে ফিরে যাবে।

নবাবের হাত থেকে জায়গিরের পরোয়ানাটা নিলেন ক্লাইভ। তাঁর মুখে মুখে পরম তৃপ্তির হাসিটা মিরজাফর খাঁর নজর এড়ালো না। মিরজাফরের মুখেও খুশির হাসি।

মাথা ঝুঁকিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া।’

এরপর ফৌজ নিয়ে কলকাতা ফিরে চললেন ক্লাইভ। দাবদাহ উপেক্ষা করে ঝড়ের গতিতে কলকাতা থেকে পাটনায় ছুটে যাওয়া ফের লম্বা পথ ভেঙে কলকাতায় ফেরা। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে ক্লাইভের শরীর। গত কয়েকদিন ধরে খরতাপে দগ্ধ বাংলা। শরীরটাকে জুড়োতে চান ক্লাইভ। এক্ষেত্রেও ভাগ্যদেবী তাঁর সহায়।

সহসা আকাশে পুঞ্জীভূত হল মেঘ। বৃষ্টি নামল অঝোরে। প্রাকবর্ষার বারিধারা।

ছাউনি পড়েছে দাউদপুরে। বৃষ্টি নামতেই তাঁবু থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন ক্লাইভ। উন্মুক্ত আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে দু’দিকে দু’হাত প্রসারিত করে ভিজতে লাগলেন অঝোর ধারাপাতে।

.

বর্ষার মরশুমে সুবে বাংলায় হাতি, ঘোড়া, তোপের গাড়ি লোকলস্কর নিয়ে কোনও সামরিক অভিযান করা যায় না। কাজেই বেশ নিশ্চিন্তে থাকেন নবাব। বাইরে থেকে কোনও হানাদারির ভয় নেই, কোনও ঝুট-ঝামেলাও নেই। চলাচলের অসুবিধার কারণে সওদাগরদের কাজকর্মেও ভাঁটা পড়ে। সকলেই এই সময়টা একটু আয়েশ করে। দুদণ্ড জিরিয়ে নেয়।

১৭৫৯ সালের জুলাই মাস। আকাশের মুখ ভার। গত কয়েকদিন ধরে একনাগাড়ে ধারাবর্ষণ হয়ে চলেছে। কাশিমবাজার ডুবুডুবু। ইংরেজ কুঠির কাজকর্ম এই দুর্যোগে প্রায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। উপচে পড়ছে নদীগুলো। কোথায় নদী আর কোথায় ডাঙা তার আন্দাজ পাওয়া দুষ্কর। স্তব্ধ নিজামতের কাজকারবারও। ইদানীং নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্কে যে ফাটল ধরেছিল, আলি গোহরের বাংলা অভিযানের গুঁতোয় তা মেরামত হয়ে গিয়েছে। মাঝে বেসুরো হয়ে ওঠা নবাব ফের সুরে বাজছেন। ইংরেজরা বেজায় খুশি। দরবারের জটিল রাজনীতির উত্তাপ এখন অনেকটাই স্তিমিত। দরবারের রেসিডেন্ট ওয়ারেন হেস্টিংস এদিক থেকে চাপমুক্ত। তবে পরিবারে নতুন অতিথির আগমনহেতু বর্তমানে তিনি ভয়ানক উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।

বারবার ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িবারান্দায় এসে দাঁড়াচ্ছেন হেস্টিংস। না এখনও কৃষ্ণকান্তর দেখা নেই। ওদিকে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন মেরি। প্রসববেদনা উঠেছে। একবার ছুটে গিয়ে স্ত্রীর খাটের পাশে দাঁড়াচ্ছেন হেস্টিংস। স্ত্রীর কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আবার পরক্ষণেই ছুটে বেরিয়ে এসে গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন সদর দেউড়ির দিকে। সাহেব ডাক্তার ও কবিরাজকে ডেকে আনতে গিয়েছেন কৃষ্ণকান্ত। এখনও তাদের দেখা নেই।

খানিকবাদে তালপাতার ছাতা মাথায় দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে সদর দেউড়ি ঠেলে রেসিডেন্ট সাহেবের বাংলোর চৌহদ্দিতে ঢুকলেন কৃষ্ণকান্ত। পিছনে সাহেব ডাক্তার কবিরাজ ও দক্ষ একজন ধাইমা। দ্রুত ছুটে এসে তারা মেরির ঘরে ঢুকে পড়লেন।

বন্ধ ঘরের দরজার সামনে তীব্র উত্তেজনায় পায়চারি করতে লাগলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। এমন উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা আগে কখনও তিনি অনুভব করেননি। প্রথম কন্যাসন্তানের অকালমৃত্যুর পর ফের সন্তান প্রসব করতে চলেছেন মেরি। রুগ্ন শিশুকন্যাটি মাত্র পক্ষকালের আয়ু নিয়ে এসেছিল পৃথিবীতে। প্রভু যিশুর উদ্দেশে একনাগাড়ে মনে মনে প্রার্থনা জানিয়ে চলেছেন হেস্টিংস সাহেব—যেন সব কিছু ঠিক থাকে। এবারে কোনও অঘটন ঘটলে মেরিকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

কৃষ্ণকান্ত বললেন, ‘ভাববেন না হুজুর। গোবিন্দের কৃপায় সব কুশল হবে। এবারে পুত্রসন্তান আসবে আপনার ঘরে। স্বয়ং প্রভু যিশু আবির্ভূত হবেন।’

‘বাজনদারদের বলে রেখেছ?’

‘হ্যাঁ হুজুর। খবর হলেই ডেকে নিয়ে আসব তাদের।’

হেস্টিংসের দু’চোখ খুশিতে চকচক করে ওঠে। ‘আই ওয়ান্ট অ্যা গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন কান্ত।’

‘জি হুজুর। বাজিকর, বাতিকর সবাইকে বলে রেখেছি।’

‘মেরি খুব খুশি হবে।’

সহসা বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে সদ্যোজাত শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। ভয়ানক চঞ্চল হয়ে উঠলেন হেস্টিংস।

অন্দর থেকে বেরিয়ে এসে এক বাঁদি বলে, ‘আপনার ছেলে হয়েছে সাহেব।’

বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। ফুরিয়ে আসছে দিনের আলো।

বৃষ্টি মাথায় নিয়েই কৃষ্ণকান্ত ছোটেন বাজনদার, বাজিকর বাতিকরদের ডেকে আনতে। উৎসব হবে, খানাপিনা হবে, বাজনা বাজবে, বাজি পুড়বে। আজ উৎসব হবে রেসিডেন্ট সাহেবের বাংলোয়।

খানিকবাদে বিমর্ষ মুখে বেরিয়ে এলেন সাহেব ডাক্তার ও কবিরাজ। তাদের অভিব্যক্তি দেখেই অজানা আশঙ্কায় হেস্টিংসের বুক কেঁপে উঠল। ছুটে এসে শুধোলেন, ‘কী হয়েছে?’

সাহেব ডাক্তার বললেন, ‘দ্য বেবি ইজ ওয়েল। বাট—’

‘বাট? কী হয়েছে? মেরি? স্পিক আউট ডক্টর।’ ডাক্তারের কাঁধ ধরে ঝাকুনি দেন হেস্টিংস।

মাটির দিকে আনত চোখ তুলে বলে, ‘শি ইজ ক্রিটিক্যাল।’

ঝড়ের গতিতে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

মেরি শুয়ে আছে। নিস্তেজ। অদূরে বেতের দোলনায় তুলোর নরম বিছানায় শায়িত রয়েছে সদ্যোজাত। তার পরিচর্যায় ব্যস্ত ধাইমা।

হেস্টিংস উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে শিশুপুত্রের পাশে গিয়ে একবার দাঁড়ালেন। তারপর ফের ছুটে এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন খাটের পাশে। মেরি প্রায় বেহুঁশ।

হেস্টিংস অস্ফুট স্বরে ডাকলেন, ‘মেরি, মেরি! মেরি মাই ডার্লিং।’

একবার বহু কষ্টে চোখ খুলে তাকালেন মেরি।

ব্যাকুল হয়ে উঠলেন হেস্টিংস। ‘মেরি! মেরি! মেরি মাই ডার্লিং—’

মেরির চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। ফের চোখ বুজলেন। বাকরুদ্ধ মেরি। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে কৃষ্ণকান্ত বাজনদারদের সঙ্গে নিয়ে হাজির হল রেসিডেন্ট সাহেবের বাংলোয়। বাইরে থেকে ঢাক-ঢোলের শব্দ ভেসে এল।

ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন হেস্টিংস সাহেব। একেবারে বিধ্বস্ত চেহারা।

সাহেবের অভিব্যক্তি দেখে অমঙ্গল আশঙ্কায় কৃষ্ণকান্তর বুকটা ছাঁৎ করে উঠল।

ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘ওদের ফিরে যেতে বলো কান্ত। বাজিকর, বাতিকরদেরও না করে দাও। মেরি ইজ ভেরি ক্রিটিক্যাল। আগে সে সুস্থ হোক। তারপরে না হয়–’ কথাটা শেষ করতে পারলেন না। মনের মধ্যে তীব্র সংশয়। মেরি শেষ পর্যন্ত ভালো হয়ে উঠবে তো?

পরের কয়েকটা দিন কাটল তীব্র উৎকণ্ঠার মধ্যে। ডাক্তার, কবিরাজদের সঙ্গে হেস্টিংস নিজেও দিনরাত মেরির পরিচর্যায় ব্যস্ত রইলেন।

পরপর কয়েকরাত জেগে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন হেস্টিংস। ভোরের দিকে পাশের ঘরে গিয়ে আরাম কেদারায় দেহটা এলিয়ে দিলেন। ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে ডেকে তুললেন কৃষ্ণকান্ত।

ধড়ফড় করে জেগে উঠে ত্রস্ত গলায় হেস্টিংস শুধোলেন, ‘কান্ত? কী ব্যাপার?’

‘হুজুর—’ কান্নায় ভেঙে পড়লেন কৃষ্ণকান্ত।

হেস্টিংস ছুটে গেলেন মেরির ঘরে। ঘরের ভিতরে জানালার পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তার। তখনও নাড়ি ধরে বসে আছেন কবিরাজ। হতাশায় দু’দিকে মাথা নেড়ে সরিয়ে নিলেন নিজের হাতটা। হেস্টিংস খাটের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে ঝুঁকে পড়লেন মেরির মুখের উপরে।

‘মেরি! মেরি! মাই ডার্লিং!’

মেরি নিঃসাড়। নিস্পন্দ। এই দুনিয়ার মায়া-মোহ, বাধা-বন্ধন সব ছিন্ন করে অমৃতলোকে চলে গিয়েছেন খানিক্ষণ আগে।

কাশিমবাজারের গোরস্থানে, যেখানে শায়িত আছেন হেস্টিংস দম্পতির শিশুকন্যা, তার পাশেই মেরিকে সমাহিত করার ব্যবস্থা করা হল।

 জোর এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল খানিক আগে। এখনও আকাশের মুখ ভার। গাছের পাতা থেকে টুপটাপ করে জল ঝরে পড়ছে মাথায়। গোরস্থানে একটা বটগাছের নীচে দাঁড়িয়ে ছিলেন হেস্টিংস। অশ্রুসজল দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন সামনের দিকে। মনের মধ্যে চলমান মেরিকে ঘিরে অজস্র সুখস্মৃতি। কুলি-মজুরেরা তখন বেলচা চালিয়ে ঢেকে দিচ্ছে মাটির নীচে শায়িত মেরির কফিনবন্দি দেহটাকে।

হঠাৎই গোরস্থানে এসে পৌঁছল নিজামতের দেওয়ান উমিদ রায়ের পালকি। সঙ্গে বেশ কয়েকজন দাখিলা। মেরির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাশি রাশি বেল ও জুঁই ফুল পাঠিয়েছেন মণি বেগম। নিজের হাতে সেই ফুল কবরের ভিজে মাটির উপরে ছড়িয়ে দিতে দিতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ওয়ারেন হেস্টিংস। জুঁই ও বেল ফুলের গন্ধে সুবাসিত হল গোটা গোরস্থান।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *