৬৪
নবাব আসছেন শহরে। এবারে ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে কলহবিবাদ নয়, লড়াই-মোকাবিলাও নয়, তিনি আসছেন সৌহার্দ্যের আবহে, সৌজন্যের খাতিরে, ফোর্ট উইলিয়ামের নয়া গভর্নর রবার্ট ক্লাইভের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে। তাঁকে সম্মান জানাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
হুগলিতে বেশ কিছুদিন নিশ্চিন্ত অবসরযাপনের পর কলকাতার উদ্দেশে মিরজাফরর খাঁ রওনা হবেন আগামীকাল। দ্রুতগামী ছিপনৌকো বেয়ে এই খবর নিয়ে এসেছে কোম্পানির প্রতিনিধি। হুগলি থেকে চিঠি লিখে এ কথা জানিয়েছেন নবাবের সঙ্গী উইলিয়াম ওয়াটস। নবাবের মতিগতি নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েছিলেন ক্লাইভ। কেন হুগলিতে এত দিন ধরে বসে আছেন নবাব? শেষ পর্যন্ত তিনি আসবেন তো? যদি তিনি কোম্পানির দাওয়াত উপেক্ষা করেন তো ঘোর বেইজ্জতি হবে ইংরেজদের। যাই হোক, নবাব আসছেন। ক্লাইভ এখন চিন্তামুক্ত।
নবাবের সফরসঙ্গী মণি বেগম, জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ, রায়দুর্লভের পরিবর্তে নবনিযুক্ত দেওয়ান উমিদ রায় ও গোলাম হোসেন। তাঁদের খাতির-যত্নের সব আয়োজন চূড়ান্ত করতে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে কলকাতায়।
এই নিয়ে বিগত দুই বছরে তৃতীয়বার কলকাতায় আসছেন সুবে বাংলার নবাব বাহাদুর। ১৭৫৬ সালের মাঝামাঝি ও ১৭৫৭ সালের গোড়ায় কলকাতায় এসেছিলেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। দু’বারই ইংরেজদের বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করার মনসুবা নিয়ে এসেছিলেন তিনি। প্রথমবারে তছনছ করে দিয়েছিলেন গোটা কলকাতা শহরকে, ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়াম। ইংরেজরা পালিয়ে গিয়েছিল ফলতায়। সুবে বাংলায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ইংরেজদের ব্যাবসাবাণিজ্য।
কিছুদিন পরে ক্লাইভ ও ওয়াটসন মাদ্রাজ থেকে বাংলায় এসেই পুনর্দখল করে নিলেন ফোর্ট উইলিয়াম। এই খবর পেয়ে ক্ষিপ্ত সিরাজদ্দৌলা ফের ফৌজ নিয়ে কলকাতায় ধেয়ে এলেন ১৭৫৭ সালের গোড়ায়। কিন্তু সেবারে এক কুয়াশামাখা শীতের ভোরে ক্লাইভের দুঃসাহসিক অভিযান বেসামাল করে দিয়েছিল নবাব ও তাঁর গোটা বাহিনীকে। ত্রস্ত নবাব ইংরেজদের সঙ্গে সন্ধি করে ফিরে গিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদে। সেই থেকে সিরাজদ্দৌলার বিপর্যয়ের শুরুয়াত, যার চূড়ান্ত পরিণতি পলাশির প্রান্তরে।
১৭৫৬ ও ১৭৫৭ সালে নবাবের আগমন সংবাদে ত্রাসের সঞ্চার হয়েছিল কলকাতা শহরে। কী সাহেবপাড়া, কী দেশি পাড়া কেঁপে উঠেছিল বিপর্যয়ের আতঙ্কে। কলকাতা ছেড়ে পালানোর হিড়িক পড়ে গিয়েছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। এবারে পরিস্থিতি ভিন্ন। ইংরেজরা এখন নবাবের দুশমন নয়, দোস্ত। পলাশিতে সিরাজের মুসিবতের পর ইংরেজদের হাত ধরে মসনদে বসেছেন মিরজাফর খাঁ। এবারে সেই বন্ধু নবাবের পদসঞ্চার ঘটতে চলেছে কলকাতায়। ভয়ভীতির আবহ নয়, উল্লাস, সেলিব্রেশনের পটভূমি। ত্রাসের সঞ্চার নয়, কলকাতার হাওয়ায় এবার খুশির আমেজ। নবাবকে স্বাগত জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কলকাতা। কী দেশিপাড়া, কী সাহেবপাড়া সর্বত্রই ফূর্তির মেজাজ।
নদী বেয়ে এসে কেল্লাঘাটে নামবেন মিরজাফর খাঁ। সেখান থেকে তাঞ্জামে চড়ে যাবেন চিৎপুরে গোবিন্দরাম মিত্তিরের বাগানবাড়িতে। ওখানেই তিনি থাকবেন। পাশেই আরেকটি বাগানবাড়িতে জগৎশেঠ, উমিদ রায় ও গোলাম হোসেনের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। দুই বাড়িতেই এখন চলছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি। নবাবের খোশ আমদেদের জন্য বহু টাকা খরচ করেছে কোম্পানি। কেনা হয়েছে মেহগিনি কাঠের নতুন নতুন আসবাবপত্র, বাহারি ঝাড়বাতি, চিনেমাটির বাসনপত্র। চকমিলানো মার্বেলের মেঝে মুড়ে দেওয়া হয়েছে দামি গালিচায়। ঘরদোর, অলিন্দ সাজিয়ে তুলতে বেশ কয়েকখানা মার্বেল পাথরের ভেনাসের মূর্তি বসানো হয়েছে জায়গায় জায়গায়। নবাবের খাতিরযত্নে কোনও ত্রুটি রাখতে চায় না ক্লাইভ। তাঁর নির্দেশে সরেজমিনে সব দেখতে এসেছিলেন ওয়ালস। সব দেখেশুনে প্রসন্ন চিত্তে বেরিয়ে এসে তিনি চেপে বসলেন ঘোড়ার পিঠে। চিৎপুরের রাস্তা ধরে ঘোড়া ছুটে চলল ফোর্ট উইলিয়ামের উদ্দেশে।
নবাবকে স্বাগত জানানোর জন্য ফোর্ট উইলিয়াম থেকে গোবিন্দ মিত্তিরের বাগানবাড়ি যাওয়ার পথে বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে বড় বড় বাহারি নকশার তোরণদ্বার। সেসবের মাথায় পাশাপাশি উড়ছে কোম্পানি ও নিজামতের নিশান।
কেল্লাঘাটেও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ঘাট থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের দেউড়িতে পৌঁছনোর পথে সিঁড়ির ধাপগুলো মুড়ে দেওয়া হয়েছে লাল গালিচায়। ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে সদর দেউড়ি। ক্লাইভ, ড্রেক, হলওয়েল, মানিংহ্যাম, বীচার সকলেই উত্তরপানে চেয়ে অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে আছেন—কখন নবাবের নৌবহর দৃশ্যমান হয়ে উঠবে চোখের পর্দায়। ফোর্ট উইলিয়ামের নড়বড়ে বুরুজের উপরে বসানো হয়েছে কামান। প্রস্তুত হয়ে আছে গোলন্দাজেরা। ভাগীরথীর বুকে নৌবহরের দেখা মিললেই খুশিতে শূন্যে তোপ দাগবে তারা। সেই আওয়াজে নবাবের আগমনবার্তা ছড়িয়ে পড়বে গোটা কলকাতা শহরজুড়ে। নবাবকে ওয়েলকাম জানাতে ঘাটের উপরে প্রস্তত হয়ে আছে ফৌজি ব্যান্ড।
খানিকবাদে এল সেই প্রতীক্ষিত শুভক্ষণ। দূরে দেখা গেল নবাবের নৌবহর। এগিয়ে আসছে অজস্র বজরা শালতি, সুলুপ, ছিপনৌকা। প্রত্যেক জলযান থেকেই উড়ছে নিজামতের পতাকা।
দুম-দুম-দুম! তোপ গর্জনে কেঁপে উঠল গোটা কলকাতা। হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল নদীর তীরে জমায়েত আম-আদমি। ওই যে নবাব আসছেন।
পড়ন্ত বিকেলের আলো গায়ে মেখে বজরার ছাতে বসেছিলেন মিরজাফর খাঁ। উপভোগ করছিলেন তাঁর খাতিরদারির খাতিরে তোপের গর্জন, নদীর পাড়ে জমায়েত আম-আদমির কৌতূহল, হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি, ফৌজি ব্যান্ডের বাজনা।
তোপ দাগার আওয়াজে ত্রস্ত হয়ে কেল্লার বুরুজের নিশিন্ত আবাস ছেড়ে আকাশে চক্কর কাটতে লাগল একঝাঁক পায়রা।
নবাবের বজরা এসে ভিড়ল কেল্লাঘাটে। নবাব নেমে আসতেই এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করলেন গভর্নর ক্লাইভ। তারপর ওয়ালশের হাত থেকে রুপোর কাজ করা একটা মেহগিনি কাঠের সুদৃশ্য বাক্স নিয়ে নবাবের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘আপনার নজরানা হুজুর, একশো আশরফি।’
প্রসন্ন হাসি হাসলেন মিরজাফর খাঁ। বজরা থেকে নামার সময়েই চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়েছেন তাঁর খাতিরদারির জন্য এলাহি আনজাম-ইন্তেজাম। অতীতে কোনও নবাবকেই এভাবে সম্মান জানায়নি ইংরেজরা। কলকাতায় পা রেখেই মন ভরে গিয়েছে মিরজাফরের। সিরাজের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামের কঙ্কালসার কলেবরে চোখ বোলাতে বোলাতে ক্লাইভের পাশাপাশি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলেন নবাব। সেবারে তিনি ছিলেন সিরাজদ্দৌলার সিপাহসালার। কামানের গোলার ঘায়ে ভয়ানক জখম হওয়া কেল্লাটাকে দেখে কেমন যেন একটা অপরাধবোধে সংকুচিত হয়ে পড়লেন মিরজাফর খাঁ। শুকনো হাসি হেসে বললেন, ‘সেবারে খুবই তকলিফ হয়েছিল আপনাদের।’
একচিলতে সরস হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘হুজুর আপনি কলকাতায় এসেছেন, আমাদের সব তকলিফ দূর হয়ে যাবে।’
হেলে পড়েছে একটা বুরুজ। সেদিকে তাকালেন মিরজাফর।
ক্লাইভ হেসে বললেন, ‘আপনার কুদরতির ইয়াদগার।’
বেশ কুণ্ঠিত গলায় নবাব বললেন, ‘সে সময় তো আমি নেহাতই এক সিপাহসালার। হুকুমের বান্দা। আমার কি কসুর বলুন?’
‘কসুর আপনার নয়, কোম্পানির বদবখতি।’ হাসলেন ক্লাইভ।
‘নতুন কেল্লার ইমারত গড়ছেন কোথায়?’ শুধোলেন নবাব।
‘কাছেই। গোবিন্দপুরে। সবে কাজ শুরু হয়েছে। শেষ হতে অনেক সময় লাগবে। আপনাকে একদিন দেখিয়ে নিয়ে আসব। এই কেল্লার হালত যে কী, তা তো চোখে দেখেই বুঝতে পারছেন। এই ওয়াক্তে অচানক আমাদের উপরে কেউ যদি হামলা করে তো আপনিই ভরসা।’
‘আপনারা বাহাদুর ইনসান। কার হিম্মত হবে যে আপনাদের উপরে হামলা করে?’
‘নসিবের কথা কে বলতে পারে হুজুর? আমাদের দুশমন তো কম নেই। ফরাসি জেনারেল জাঁ ল সুজাউদ্দৌলার তাঁবে রয়েছেন। ডাচেরাও আমাদের উপরে সন্তুষ্ট নয়।’
ক্লাইভের মুখে ডাচেদের নাম শুনেই মিরজাফরের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তাহলে কি ডাচদের সঙ্গে মিরজাফরের গোপন দোস্তির কথা জেনে ফেলেছেন ক্লাইভ? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? বিসডামের সঙ্গে একান্তে আলোচনা হয়েছিল তার। তৃতীয় কেউ ছিল না কক্ষে।
নবাব শুধোলেন, ‘আপনি কি মনে করেন, ডাচেরা হামলা করতে পারে আপনাদের উপরে?’
‘কার মনসুবা যে কী, তার আগাম আন্দাজ কী করে পাব বলুন?’
মিরজাফর বললেন, ‘আর যাই হোক, সুবে বাংলাকে ফের বেচ্যায়েন হতে দেব না আমি।’
ক্লাইভ মুচকি হেসে বললেন, ‘তাই তো বলছিলাম হুজুর, আপনিই ভরসা।’
ফোর্ট উইলিয়াম থেকে গোবিন্দরাম মিত্তিরের বাগানবাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করলেন নবাব। চিৎপুর রোড ধরে এগিয়ে চলল নবাবের ডুলি। পথের দুপাশে জড়ো হয়েছে বহু উৎসাহী মানুষজন। বাংলার নবাবকে কোনওদিনও এরা চোখে দেখেনি। সকলেরই চোখেমুখে নবাবকে একঝলক দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
মিরজাফর জানেন কলকাতার মানুষজন বরাবরই ইংরেজদের দিকে ঝোঁকা। ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নরই এদের কাছে নবাব-বাদশা। সেবার সিরাজদ্দৌলার সিপাহসালার হিসেবে কলকাতা অভিযানে এসে তিনি নজর করেছিলেন আম-আদমির চোখেমুখে নবাবের প্রতি তীব্র নফরতি। সদ্য গড়ে ওঠা শহরটা তছনছ হয়ে যাওয়ায়, বহু মানুষের রুটিরুজির উপায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছিল সাধারণ মানুষজন। সিরাজদ্দৌলা শখ করে এই শহরের নামকরণ করেছিলেন আলিনগর। সেই আলিনগরকে খালি করে দিয়ে কোথায় যেন গায়েব হয়ে গিয়েছিল লোকজন। সে যেন নবাবের প্রতি নফরতি প্রকাশের আরেক তরিকা। সেই কলকাতাবাসী আজ তাঁকে একঝলক দেখার জন্য ভিড় করেছে পথের পাশে। মনের মধ্যে বেশ গর্ব অনুভব করতে লাগলেন নবাব।
নবাবের ডুলির পিছু পিছু পর্দা ঢাকা পালকিতে চলেছেন মণি বেগম। বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসছে, পুরোপুরি আঁধার নামতে অবশ্য এখনও ঢের দেরি। পর্দার আড়াল থেকে অবাক চোখে শহরটাকে দেখছিলেন মণি বেগম। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পিছনপানে তাকালেন। চিকের আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছে নজম ও সইফকে। গোরা পল্টন পরিবৃত হয়ে টাট্টুর পিঠে চড়ে আসছে। পরনে নবাবের মতোই পোশাকাশাক। দুজনেরই মাথায় উষ্ণীষ, কোমরবন্ধনী থেকে ঝুলছে খুদে আকারের তলোয়ার। খুব আমোদ হয়েছে দুই ভাইয়ের। পাশাপাশি চলতে চলতে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে। ফুলের মতো নিষ্পাপ দুই শিশু। প্রাণশক্তিতে ভরপুর। জল চিকচিক করে মণি বেগমের চোখে। এ আঁসু খুশির।
সহসা নহবতের সানাইয়ের সুর কানে আসতে সচকিত হয়ে ওঠেন বেগম সাহেবা। দেউড়ি টপকে গোবিন্দ মিত্তিরের বাগানবাড়ির অন্দরে প্রবেশ করল মণি বেগমের পালকি।
.
হাসি-আনন্দ, ফূর্তি-আসরতে, মজলিশ, হুল্লোড়, মুজরো, শিকারখেলা এই সব কিছু নিয়ে কলকাতায় বেশ কয়েকটা দিন কাটালেন নবাব। তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের উপহার পেশকাশ, সওগাতে ভরে দিল ইংরেজরা। ইংরেজ কোম্পানির কাছে এই অভূতপূর্ব খাতির পেয়ে আবেগে ভেসে গেলেন মিরজাফর খাঁ। বারবার তাঁর মনে হতে লাগল সত্যিই ইংরেজদের চেয়ে, ক্লাইভের চেয়ে পরম সুহৃদ তাঁর আর কেউ নেই। কলকাতা আসার পথে বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করার মনসুবা নিয়ে তিনি যে চুঁচুড়ার ডাচ গভর্নর বিসডামের সঙ্গে একপ্রস্থ আলোচনা সেরে এসেছেন সে কথা মনে হতে ভিতরে ভিতরে ভয়ানক অপরাধবোধ হতে লাগল নবাবের। মনে হতে লাগল, বিসডামের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মস্ত আহাম্মকির কাজ করে এসেছেন তিনি। আর যাই হোক ডাচেরা ইংরেজদের মতো বাহাদুর নয়, ক্লাইভের হাতেই তিনি সুরক্ষিত থাকবেন। সুরক্ষিত থাকবে তাঁর মসনদ।
নবাবের দিনগুলো সুনহারি এক খোয়াবের মতো দিব্যি কেটে যাচ্ছিল কলকাতায়। কিন্তু তাল কাটল হঠাৎই। একদিন সাতসকালে কলকাতায় নবাবের বাসভবনে এসে হাজির হলেন ওমর বেগ। তাঁর এক কাসিদ চুঁচুড়া থেকে নিয়ে এসেছে বিসডামের একটা চিঠি। আঁতকে উঠলেন নবাব। বিসডাম লিখেছেন, ‘…হুজুর আপনি যেমন বলেছিলেন, ইংরেজদের মোকাবিলা করার জন্য আমরা প্রস্তুত। আমাদের একটা জাহাজ হুগলি নদীর মোহনায় এসে পৌঁছেছে। খুব শিগগিরই আমরা কলকাতার উপরে হামলা করব। এই ওয়াক্তে কলকাতায় থাকা আপনার পক্ষে নিরাপদ নয়। আপনি তুরন্ত মুর্শিদাবাদে ফিরে যান।…’
মুখ গম্ভীর হল নবাবের। ওমর বেগকে বিদায় দিয়ে ভাবতে বসলেন এখন কী করা যায়। তবে ভাবার অবকাশ পেলেন না বেশিক্ষণ। ওমর বেগ বিদায় নেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ঘোড়া হাঁকিয়ে গোবিন্দরাম মিত্তিরের বাগানবাড়িতে এসে হাজির হলেন রবার্ট ক্লাইভ ও উইলিয়াম ওয়াটস। থমথম করছে ক্লাইভের চোখমুখ। কলকাতায় আসার পর থেকে সর্বদাই ক্লাইভের মুখে যে মৃদু হাসির রেশ দেখে আসছিলেন নবাব, সেটা আজ অন্তর্হিত।
দরবার ঘরে নবাবের মুখোমুখি কুরসিতে বসলেন ক্লাইভ ও ওয়াটস। কোনও ভূমিকা ছাড়াই গম্ভীর গলায় ক্লাইভ বললেন, ‘আজ আমি শিকায়ত জানাতে এসেছি হুজুর।’
ক্লাইভের গলায় ক্ষোভের সুর। থতমত খাওয়া ভঙ্গিতে নবাব শুধোলেন, ‘তকলিফ কী হল সাহেব? কীসের জন্য শিকায়ত?’
‘কারণ খুবই গহেরা। আমার কাছে খবর এসেছে ডাচদের একখানা জাহাজ বাটাভিয়া থেকে ফৌজিদের নিয়ে হুগলি নদীর মোহনায় এসে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয় আমি আরও শুনলাম কাশিমবাজার ও চুঁচুড়ায় দেশি লোকেদের টাকার টোপ দিয়ে ফৌজে বহাল করছে ডাচেরা।’
এই বলে স্থির দৃষ্টিতে নবাবের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন ক্লাইভ। সেই ধারাল চাহনি যেন নবাবের মনের অন্দরমহলকে ছানবিন করতে লাগল।
ক্লাইভের চোখের দিকে তাকাতে অস্বস্তি বোধ করলেন নবাব। ঢোক গিলে বললেন, ‘তাজ্জব বাত। এরা চায় কী?’
‘ডাচেরা আপনার প্রজা। এ সওয়াল তো আপনার কাছে আমারই করার কথা।’
‘ডাচদের মনসুবা কী– আমি পুছতাছ করে দেখব।’
ক্লাইভ বললেন, ‘আমার মনে হয় ডাচেরা কলকাতায় হামলা করতে চায়।’
‘এই ওয়াক্তে আপনিই তো ভরসা।’ বেশ নরম গলায় বললেন ওয়াটস।
‘আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন সুবে বাংলাকে আমি কিছুতেই বেচ্যায়েন হতে দেব না।’
ক্লাইভ এবারে স্পষ্টতই আদেশের সুরে বললেন, ‘আপনি ডাচদের কড়া একটা চিঠি লিখে দিন। ডাচদের জাহাজ যেন হুগলি নদীর মোহনা থেকেই ফিরে যায়। কৈফিয়ৎ তলব করুন, কেন তারা ফৌজি মজুত করছে চুঁচুড়ায়, কাশিমবাজারে?’
নবাবের প্রত্যুতরের অপেক্ষা না করে বুটের শব্দ তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ক্লাইভ।
ওয়াটস উঠে দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে বললেন, ‘গভর্নর সাহেব খুব রেগে গিয়েছেন।’
মিরজাফর মরিয়া হয়ে বললেন, ‘আমাকে গলত সমঝাবেন না আপনারা। ডাচেরা কী করল, তা নিয়ে আপনাদের সঙ্গে আমার রিশতেদারি যেন না টুটে যায়। আমি আজই লিখে দিচ্ছি ডাচ গভর্নরকে। তাদের জাহাজ যেন ফওরান বাংলা মুলুক ছেড়ে চলে যায়।’
‘চিঠিটা তুরন্ত পাঠিয়ে দিন।’ এই বলে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন ওয়াটস।
নবাবের কলকাতাবাসের সুখ ঘুচে গেল নিমেষে। ইংরেজদের উপরে হামলা করার জন্য ক’দিন আগেই তিনি মদত দিয়ে এসেছেন গভর্নর বিসডামকে। সেসব ভুলে গিয়ে কড়া একখানা চিঠি না হয় তিনি লিখে পাঠাবেন, কিন্তু তাঁর হুকুমকে উপেক্ষা করে সত্যিই যদি ফৌজিদের নিয়ে ডাচ জাহাজ কলকাতায় এসে হাজির হয়, তখন কী হবে? মিরজাফরের মনে হল, আর যাই হোক, নিজের নিরাপত্তার খাতিরে অবিলম্বে তাঁর কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়া খুবই জরুরি।
উমিদ রায়কে ডেকে মুর্শিদাবাদে দ্রুত ফেরার আয়োজন করতে বললেন নবাব।
কিছুক্ষণ পরে নবাবের চিঠি নিয়ে চুঁচুড়া অভিমুখে রওনা হয়ে গেলেন ওমর বেগ।
ডাচ গভর্নরের উদ্দেশে নবাব লিখলেন, ‘…শুনলাম ফৌজিদের নিয়ে আপনাদের একখানা জাহাজ এসেছে হুগলি নদীর মোহনায়। আমি স্পষ্ট জানতে চাই আপনাদের ইরাদা কী? আপনারা কি সুবে বাংলাকে বেচ্যায়েন করতে চাইছেন? লড়াই বাঁধাতে চান ইংরেজদের সঙ্গে? অবিলম্বে যেন আপনাদের জাহাজ যেন হুগলি নদীর মোহনা ছেড়ে চলে যায়। কোনও ফৌজি যেন সুবে বাংলার মাটিতে পা না রাখে। ইয়াদ রাখবেন এটা আমার হুকুম…’
নবাবের চিঠি পেয়ে তাজ্জব বনে গেলেন বিসডাম। কয়েকদিন আগে একান্ত আলোচনায় নবাব হুগলিতে বসে যা বলে গেলেন তার সঙ্গে এ চিঠির বয়ানের যে কোনও মিল নেই। বিসডাম বুঝলেন, যতই ক্ষোভ থাকুক না কেন, ক্লাইভের বিরুদ্ধে যাওয়ার হিম্মত নেই নবাবের। অতএব তাঁর কাছে দরবার করে ইনসাফ চাওয়া অর্থহীন। নবাবকে উপেক্ষা করেই ইংরেজদের সঙ্গে সরাসরি বোঝাপড়াটা এবারে সেরে নিতে হবে ডাচেদের। যদিও এই মুহূর্তেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাওয়ার ইচ্ছে বিসডামের নেই। তিনি চাইছিলেন ধীরে ধীরে চুঁচুড়া ও কাশিমবাজের সেনা মজুত করতে। কিন্তু বিধি বাম। বিসডাম সব কথা লিখে জানালেন বাটাভিয়ায়।
‘…নবাবের কাছ থেকে ইনসাফ পাওয়ার কোনও আশা নেই। লড়াই করেই সুবে বাংলায় আমাদের অধিকার বুঝে নিতে হবে। এই ওয়াক্তে নিজেদের শক্তি না বাড়িয়ে নবাবের হুকুমতের বিরুদ্ধে যাওয়া মস্ত আহাম্মকির কাজ হয়ে যাবে। কাজেই নবাবের হুকুম মোতাবেক হুগলির মোহনায় পৌঁছনো জাহাজটা আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি। খুব দ্রুত অনেক ফৌজি ও গোলাবারুদসহ বেশ কয়েকখানা যুদ্ধজাহাজ একসঙ্গে বাংলায় পাঠান। অচানক জোরদার হামলা করতে পারলে সুবে বাংলায় ইংরেজদের বেসামাল করে দেওয়া যাবে।…’
ওদিকে নবাবের চিঠি পাওয়ার পরপরই বিসডামের হাতে এসে পৌঁছয় ক্লাইভের চিঠি। ক্লাইভ কৈফিয়ৎ চাওয়ার ঢঙেই জানতে চেয়েছেন হুগলি মোহনায় ডাচ যুদ্ধজাহাজ আগমনের উদ্দেশ্য কী?
বিসডাম জবাবে বেশ নরম সুরেই লিখলেন, ‘…আমাদের ভুল বুঝবেন না সাহেব। আপনাদের সঙ্গে আমাদের দোস্তি অনেকদিনের। হুগলির মোহনায় আমাদের যুদ্ধজাহাজ এসেছে ঠিকই, তবে আপনাদের সঙ্গে লড়াই করার কোনও মতলব আমাদের নেই। আসলে জাহাজটার যাওয়ার কথা ছিল নেগাপত্তনম। খারাপ আবহাওয়ার কারণে এদিকে এসে পড়েছে। জাহাজিদের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ চুঁচুড়া থেকে আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। কয়েকদিনের মধ্যেই জাহাজটি মোহনা ছেড়ে নেগাপত্তনমের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবে।…’
এই চিঠি পেয়ে অনেকটা হালকা বোধ করলেন ক্লাইভ।
কলকাতা ছেড়ে তখন মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছেন নবাব। তিনি নিঃশব্দে চুঁচুড়া ও হুগলি পেরিয়ে গেলেন। ফের যদি ডাচ গভর্নরের মুখোমুখি হতে হয়, সেই সংকোচে এবারে আর হুগলিতে থামলেন না। তাছাড়া অন্য একটা কারণে সে সময়ে দ্রুত মুর্শিদাবাদে ফেরাটা নবাবের পক্ষে খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে খবরটা নিয়ে এসেছিল নিজামতের এক কাসিদ। বাগি মোগল শাহজাদা আলিগোহর এলাহাবাদে বসে বাংলা আক্রমণের মতলব ভাঁজছেন। তাঁকে মদত দিচ্ছেন অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা।
কয়েকদিন বাদেই বিদায় নেবে ১৭৫৮ সাল। বিপরীতমুখী উত্তুরে হাওয়া ঠেলে দ্রুত গতিতে মুর্শিদাবাদ অভিমুখে এগিয়ে চলল নবাবের নৌবহর। মিরজাফরের কপালে ভাঁজ। একদিকে ডাচদের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াই বাধার আশঙ্কা, অন্যদিকে বাগি শাহজাদা। নবাব বুঝতে পারছেন ফের একটা অশান্তির মেঘ জমাট বাঁধছে বাংলার আকাশে। আসন্ন এই ঝঞ্ঝা যে কোন খাতে টেনে নিয়ে যাবে তাঁর নসিবকে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় নবাবের মন তোলপাড়। দুশ্চিন্তার দাওয়াই শরাব। নবাব ডুবলেন নেশায়।
.
