পলাশির পরে – ৬৩

৬৩

জিঞ্জিরা প্যালেসে নিজের কক্ষে অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন ঘসেটি বেগম। নদীর দিক থেকে বয়ে আসা হাওয়ায় থিরিথিরি কাপছে শামাদানের আলো। ঘরের এক কোণায় বসে হাঁটুতে মাথা রেখে ঘুমে ঢুলছে ঘসেটি বেগমের খাস বাঁদি মেহের। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। বেগম সাহেবার কাছ থেকে শুনেছিল, আজ রাতেই তাদের রওনা হতে হবে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে।

রাত গড়িয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টা বাজিয়ে জানান দিচ্ছে জিঞ্জিরা প্যালেসের ঘড়িয়াল। উত্তেজনা বাড়ছে ঘসেটি বেগমের। থেকে থেকে ছুটে যাচ্ছেন জানলার কাছে। জাফরির ফাঁক দিয়ে তাকাচ্ছেন নদীর দিকে। বাইরে যত দূর চোখ যায়, একেবারে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। শুধু কয়েকটা বিন্দু বিন্দু আলো ঘুরে বেড়াচ্ছে নদীর বুকে। ওগুলো মাছমারাদের নৌকা। বেগম সাহেবার কানে ভেসে আসছে বর্ষায় উচ্ছল বুড়িগঙ্গার জলতরঙ্গের শব্দ ও আশপাশ থেকে উত্থিত ঝিঁঝির কলতান।

মুর্শিদাবাদ রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত ঘসেটি বেগম। মন ভয়ানক চঞ্চল হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন পরে বন্দিদশা ঘুচিয়ে নিস্তরঙ্গ, নিশ্চিন্ত দিন গুজরান ছেড়ে ফের সুবে বাংলার রাজনীতির জটিল আবর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ার খোয়াবে তিনি ভাসছেন। মসনদ যেন তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ডাকছে মোতিঝিল। ডাকছে চেহেল সেতুন। তাঁকে কেন্দ্র করে ফের ইনকিলাব হবে মুর্শিদাবাদে?

তবুও থেকে থেকে ঘসেটি বেগমের মনে উঁকি দিচ্ছে সংশয়। মিথ্যে আশা দেয়নি তো বকর আলি? শেষ পর্যন্ত আসবে তো সে? আশায়-নিরাশায় দুলছেন আলিবর্দির বড়ি বেটি। আজাদি চাইছে দিল। মনের গহীনের আশার নকশিকাঁথা বুনে চলেন তিনি। নিরাশাকে চাপা দেওয়ার কোশিশ করেন। বকর আলি ছিল আলিবর্দির একান্ত অনুগত, সামান্য একজন নোকর, কেন মিথ্যে আশা দেবে সে? কেনই বা অচানক এভাবে ছুটে আসবে ঢাকায়?

সহসা মৃদু টোকা পড়ে দরজায়। পরপর তিনবার।

মেহেরের ঢুলুনি ছুটে যায়। উঠে দাঁড়িয়ে দরজা খুলতে যাচ্ছিল সে। তাকে বাধা দিয়ে ব্যস্ত হয়ে নিজেই ছুটে গিয়ে দরজা খোলেন ঘসেটি বেগম।

দরজার ওপাশে দাঁড়ানো বোরখা পরিহিত মানুষের অবয়ব দেখে হাসি ফোটে বেগম সাহেবার মুখে। মুখের সামনের ঘুঙ্ঘট একঝলক সরিয়ে বকর আলি বলে, ‘চলুন হুজুরাইন।’

বোরখায় নিজেকে দ্রুত আবৃত করে নেন ঘসেটি বেগম। বোরখায় নিজেকে আড়াল করে মেহেরও। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে বকর আলির পিছু নেয় দু’জনে। গোটা জিঞ্জিরা প্যালেস অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। অলিন্দে চাতালে নিভু নিভু বাতিদানের আলো। শুধু ঘুমহীন চোখে প্রহর গুণে চলেছে ঘড়িয়াল।

ঘসেটি বেগম ও তার বাঁদি মেহেরকে নিয়ে সন্তর্পণে গোপন এক সুড়ঙ্গ পথে ঢুকে পড়ে বকর আলি। খুবই অপরিসর পথ। দুটো মানুষ কোনওরকমে পাশাপাশি হেটে যেতে পারে। সামনে বকর আলি, তার পিছনে ঘসেটি বেগম, একেবারে পিছনে মেহের। খানিকবাদে সুড়ঙ্গ পথ ধরে নদীর ঘাটে এসে পড়ে তারা। খোলা আকাশের নীচে পৌঁছে সিনা ভরে শ্বাস নেন বেগম সাহেবা। তিনি পুলকিত, রোমাঞ্চিত। অদূরে নদীর উপর ভাসছে দুটো বিলাসবহুল বজরা। বকর আলির প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে ঘসেটি বেগমের মন। লজ্জাবোধও হয়। অহেতুক তিনি সন্দেহ করছিলেন বকর ভাইয়াকে।

ঘাটে বাঁধা রয়েছে ছোট একটা ডিঙি নৌকা। বকর আলি দড়িটা খুলে নিয়ে নৌকোয় উঠে দাঁড় হাতে নেয়। দ্রুত নৌকোয় ওঠেন ঘসেটি বেগম। সঙ্গে মেহের। ঘাট থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে নৌকো। দূরে সরে যেতে থাকে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা জিঞ্জিরা প্যালেসের কালচে অবয়ব।

বজরায় উঠে বকর আলি ঘসেটি বেগমকে নিয়ে যায় দোতলার একটা বিলাসবহুল কক্ষে। একজন গোলাম এসে নিঃশব্দে একটা বাতি রেখে যায় ঘরে। বকর আলি মুখের নেকাব সরিয়ে পানের ছোপ ধরা দাঁত বের করে হাসে। মেহেন্দি রাঙানো দাড়ি মুচড়ে বলে, ‘আর কোনও ভাবনা নেই হুজুরাইন। এবারে আয়েশ করুন। আমি আসি।’

আবেগে আপ্লুত হয়ে ঘসেটি বেগম বলেন, ‘বকর ভাই, কী বলে যে সুক্রিয়া জানাব তোমাকে।’

মাথা ঝুঁকিয়ে বকর আলি বলে, ‘সুক্রিয়া জানানোর জরুরত নেই হুজুরাইন। আমি আপনার বান্দা। মালকিনের খুশিই আমার খুশি।’

বকর আলি চলে যায়। নোঙর তুলে দুলে ওঠা বজরা। মাঝিমাল্লাদের দাঁড় টানার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ বড় মধুর সুরে বাজে ঘসেটি বেগমের কানে। অবশেষে মুক্তি। আল্লা মেহেরবান।

পরিপাটি করে শয্যা রচনা করে মেহের বলে, ‘আরাম করুন মালকিন। রাত অনেক হল।’

‘আমি একটু বসে থাকি জানলার পাশে। তুই শুয়ে পড়।’

মেহের পাশের কক্ষে চলে যায়।

বাইরে অতলান্ত অন্ধকার। শ্রাবণের মেঘে ছেয়েছে আকাশ। একটা তারারও দেখা নেই। থেকে থেকে ঝলকাচ্ছে বিদ্যুৎ। গুমরে উঠছে মেঘ। দুর্যোগের রাতে দুঃসাহসিক নদীযাত্রা। তবুও সব কিছু আজ বড় ভালো লাগছে ঘসেটি বেগমের। জানালায় মাথা রেখে তিনি জলের শব্দ শুনতে থাকেন।

.

এই বজরাতেই একতলার অন্য একটি কক্ষে রয়েছেন আমিনা বেগম। দুই বোন একই বজরার যাত্রী অথচ একজন জানেন না আরেকজনের কথা। বহুদিন হয়ে গেল দুই বোনের কোনও বাতচিত নেই। মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ। এ সব কিছুই জানা ছিল বকর আলি। তাই কাউকেই সে ঘুণাক্ষরে বলেনি দ্বিতীয় জনের কথা। ঘসেটি বেগমকে নিয়ে আসার আগেই সে বজরায় এনে তুলেছে আমিনা বেগমকে। তাঁকে রেখেছে একতলার একটি কক্ষে। নিখুঁত পরিকল্পনা বকর আলির।

বজরায় উঠেই কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন আমিনা বেগম। জিঞ্জিরা প্যালেসে এতকাল শরাব পিয়েছেন মনের দুঃখ ভুলতে। আজ শরাবে ডুব দিয়েছেন খুশিতে। বেসামাল বেগম সাহেবাকে পালঙ্কে শুইয়ে দিয়ে সংলগ্ন পাশের কক্ষে বিশ্রাম নিতে গিয়েছে তাঁর খাস বাঁদি কোয়েল।

বুড়িগঙ্গার জল ভেঙে স্রোতের অনুকূলে ভেসে চলেছে দুটি বজরা। দ্বিতীয় বজরার যাত্রী বকর আলি ও তার সঙ্গের জনা দশেক পাইক বরকন্দাজ।

বকর আলি উত্তেজিত। যে গুরু দায়িত্ব নিয়ে সে মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছে তা হাসিল হবে তো ঠিক মতো? এ কাজে কামেয়াব হলে নিজামতের সামান্য এক নোকর বকর আলির নসিব বদলে যেতে পারে। থেকে থেকেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে গলুইয়ের উপরে দাঁড়াচ্ছে বকর আলি। বজরা কতদূর এল, তার আন্দাজ পাওয়ার কোশিশ করছে। হাঁকডাক করে মাঝিমাল্লাদের বলছে, ‘আরও জলদি চল, জলদি।’

ভোররাতের দিকে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর সংযোগ স্থলে এসে পৌঁছল বজরা দু’টি। চারিদিকে শুধু জল আর জল। নদী এখানে বিশাল চওড়া। এপার ওপার দেখা যায় না। গলুইয়ের উপরে এসে দাঁড়াল বকর আলি। প্রায় নিঃশব্দে মাঝ নদীতে নোঙর ফেলে দু’টি বজরা প্রায় গা ঘেঁষাঘেষি করে দাঁড়াল। আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমের বজরা থেকে মাঝিমাল্লারা চুপিসারে এসে উঠল বকর আলির বজরায়। নোঙর তুলে খানিকটা দূরে সরে গেল বজরাটা।

.

ঘুমের মধ্যে বিছানা থেকে হঠাৎই গড়িয়ে পড়ে গেল আমিনা বেগমের বাঁদি কোয়েল। ঘুম ছুটে গেল তার। একদিকে অনেকটা হেলে গিয়েছে বজরা। ভিতরে জল ঢুকছে কুলকুল করে। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল কোয়েল। ছুটে গিয়ে আমিনা বেগমের কক্ষের দরজা ঠেলে অন্দরে ঢুকল সে। কোয়েলের চেঁচামেচিতে জেগে উঠলেন আমিনা বেগম। ঢুলু ঢুলু দুই চোখ। নেশার রেশ তখনও কিছুটা রয়েছে। সহসা পাক খেয়ে উলটো দিকে হেলে পড়ল বজরা। টলে গিয়ে মেঝেতে পড়লেন আমিনা বেগম। মেঝেতে গোড়ালি-সমান জল। বজরার অন্দরে জলস্তর দ্রুত বাড়ছে। নেশা ছুটে গেল আমিনা বেগমের। চিৎকার করে উঠলেন, ‘বকর ভাই! বাঁচাও! বাঁচাও! বজরা ডুবছে।’

হঠাৎই জলের চাপে ভেঙে পড়ল কক্ষ থেকে বাইরে বেরোনোর দরজাটা। এবারে হুড়মুড়িয়ে জল ঢুকতে লাগল ঘরে। জলের ঝাপটায় বেসামাল হয়ে গেলেন আমিনা বেগম। আর্তনাদ করে উঠল কোয়েল। বজরার পুরো একতলা প্রায় জলের নীচে চলে গিয়েছে। বাঁচার তাগিদে জলস্রোত ঠেলে আমিনা বেগম ও তাঁর বাঁদি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠার কোশিশ করতে লাগলেন।

সহসা দোতলা থেকে ভেসে এল ঘসেটি বেগমের আর্তনাদ– ‘বকর ভাই! বকর ভাই এ কী হল? কোথায় তুমি? নাও ডুবছে। বাঁচাও বকর ভাই। তুমি কোথায়?’

ঘসেটি বেগমের গলা শুনেই চিনতে পারলেন আমিনা বেগম। চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘দিদি! দিদি!’

ছোটি বহেনের গলা চিনতে পারলেন ঘসেটি বেগমও। ‘ছো-টি ব-হে-ন!’

‘আমরা বদ কিসমতির শিকার দিদি।’

মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে নিমেষে ভেঙে পড়ল দুই বোনের মধ্যবর্তী এতকালের দুস্তর ব্যবধান।

আমিনা বেগমের দেহের অর্ধেক জলমগ্ন। বড়ে বহেনের সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে দিলেন হাত। ঘসেটি বেগম টেনেহিঁচড়ে দোতলায় কাঠের পাটাতনের উপরে তুলে নিলেন বোনকে। অনেক কসরত করে উঠে এল কোয়েলও। দিদিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন আমিনা বেগম।

ক্রমশ কাত হচ্ছে বজরা। চারপাশে শুধু বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর অতল জলরাশি। কোনওরকমে দোতলার ছাতের অপরিসর স্থানে এসে দাঁড়াল চার নারী। আলিবর্দির দুই বেটি ও তাদের দুই খাস বাঁদি। শিয়রে সাক্ষাৎ মৃত্যু। এতক্ষণে পুরো ছবিটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে দুই বোনের কাছে। তাঁরা বুঝেছেন তাঁদের প্রতারিত করেছে বকর আলি। নির্ঘাত বজরার তলদেশে আগে থেকেই কোনও ছিদ্র পথ ছিল। গভীর রাতে সেই ছিদ্রপথের ঢাকনা খুলে দিয়ে বকর আলির লোকজন সরে পড়েছে। তাই এই বজরায় এই চারজন অবলা নারী ছাড়া আর কেউ নেই। ষড়যন্ত্রীরা আগে থেকেই উঠেছে গিয়েছে পাশের বজরায়।

আকাশ পরিষ্কার হয়েছে অনেকটা। ওই তো সামান্য দূরে ভাসছে বকর আলির বজরা। ওই তো ওখানে গলুইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন মানুষ। ওই বজরাটা যদি আর একটু কাছে এগিয়ে আসে তাহলে ঝাঁপিয়ে তার উপরে পড়া যায়। এখনও বাঁচার উপায় আছে। চিৎকার করে কাতর আর্তি জানান ঘসেটি বেগম, ‘বকর ভাই। বাঁচাও! আমাদের বাঁচাও!’

বকর আলি চেঁচিয়ে বলে, ‘বান্দার গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুরাইন। এই বান্দা নবাবজাদা মিরনের হুকুম তামিল করেছে। আপনাদের মওতের পরোয়ানা দিয়েই তিনি পাঠিয়েছিলেন আমাকে।’

ঘসেটি বেগম চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘তুইও মরবি শয়তান। তোর কলিজা ফেটে যাবে।’

বকর আলি নিষ্ঠুর ভাবে হেসে উঠে বলে, ‘রহেম করুন হুজুরাইন। আমার কসুর কী? আমি স্রেফ তাগদের গোলাম।’

আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমের বুক অবধি জলের তলায়। দু’জনে কোনওরকমে আঁকড়ে ধরে আছেন পাল খাটানোর একটা দণ্ড। বুক ছাপিয়ে দ্রুত গলা পর্যন্ত উঠে আসছে জলস্তর।

সহসা আকাশের দিকে মুখ তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন আমিনা বেগম, ‘হে আল্লা, ইনসাফ চাই আমি। মওত চাই মিরনের। আসমান থেকে তার শিরের উপরে যেন বিজলি ভেঙে পড়ে।’

মাথা ছাপিয়ে গেল জলস্তর। কোনও রকমে নাকটা ভাসিয়ে প্রাণপণে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন দুই বোন ও তাদের দুই বাঁদি। কিছুক্ষণের এই মরণপণ লড়াইয়ের অন্তে বুড়িগঙ্গার গর্ভে অতলান্ত অন্ধকারে হারিয়ে গেল চার নারী। নদীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল বজরাটা। ক্ষণেক আগে ঘটে যাওয়া এই পৈশাচিক ঘটনার চিহ্ন রইল না কোথাও। প্রকৃতি আবার আগের মতোই শান্ত, সুন্দর। তাজা বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নিয়ে মাঝিমাল্লাদের উদ্দেশে বকর আলি বলল, ‘জলদি চল। খুশ খবরের জন্য নবাব্জাদা ইন্তেজার করছেন।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *