৬৬
নদীতে ভাসছে দুটো বজরা। একটার ছাতে মিরন ও তার কয়েকজন ইয়ারদোস্ত। আরেকটা বজরার ছাতে মিরকাজিম খাঁ ও তার অনুচরেরা। দুই দল ঘুড়ির লড়াইয়ে মেতেছে। উপস্থিত দর্শকদের প্রবল হর্ষধ্বনিতে আপ্যায়িত হয়ে আকাশে উড়ল মস্ত ল্যাজওয়ালা মসলিনের তৈরি আলিশান দুটো ঘুড়ি। সুতো ছাড়ছে দুই পক্ষই। ঘুড়িদুটো তরতর করে উঠছে উপরে। দেখতে দেখতে অনেক উপরে উঠে গিয়ে নীল আশমানের বুকে সচল দু’টো বিন্দুতে পরিণত হল। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ও নদীর বুকে নৌকোয় ভাসমান দর্শকদের জোড়া জোড়া চক্ষু ঊর্ধ্বমুখী। এ লড়াইয়ের সবটুকু মজা তারা উশুল করে নিতে চায়।
হর সাল শীতের মরশুমের শুরুয়াতে ঘুড়ি উৎসবের আনজাম করে মিরন। ইয়ারদোস্ত, সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে তাঁবু ফেলে ভাগীরথীর চরে। মিরনের তরফ থেকে আমির-ওমরাহদের কাছে ঘুড়ি ওড়ানোর লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার দাওয়াত যায়। একেক দিন একেক জনের সঙ্গে লড়াই। সূর্যোদয়ের খানিক পরেই শুরু হয় ঘুড়ির খেলা। চলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। নবাবজাদার দাওয়াত গ্রহণ করে যারা আসেন তারা কয়েকদিনের জন্য মিরনের মেহমান হন নদী তীরবর্তী অস্থায়ী ছাউনিতে।
ভাগীরথীর বুকে বজরার ছাত থেকে ওড়াতে হবে ঘুড়ি। এটাই নিয়ম। খেলোয়াড়ের সঙ্গে থাকে বাজনদারের দল। ঢাকঢোল, কাড়ানাকাড়ার শব্দে সরগরম হয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ এলাকা। দুই পক্ষের বজরা ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলে নদীতে। লড়াইয়ে মত্ত দুই দলের বেশ কিছু সমর্থক শালতি নিয়ে ভেসে চলে বজরার পিছু পিছু। নদীর বুকের উপর দিয়ে উড়ে চলা কাটি পতঙ্গ নিজেদের জিম্মায় নেওয়ার জন্য শালতিগুলোর মধ্যে হড়োহুড়ি পড়ে যায়। এই হুড়োহুড়ি, উত্তেজনায় বেসামাল হয়ে কেউ কেউ শালতি থেকে টুপ করে খসে নদীতে পড়ে হাবুডুবু খায়। অনেক সময় শালতিটাই উলটে যায়। দুর্ঘটনা ঘটে। এসব নিয়ে অবশ্য কারোরই কোনও হেলদোল নেই। ঘুড়ির লড়াইকে কেন্দ্র করে রগড়, তামাশা, হুল্লোড়বাজিই শেষ কথা।
দিনের শেষে প্রতিযোগীদের বজরা ফিরে আসে ঘাটে। আমআদমি ঘরের পথ ধরে। তখন সরগরম হয়ে ওঠে নদীর চরে কয়েকমাইল জুড়ে বিস্তৃত ছাউনিগুলো। আলোর মালায় সেজে ওঠে তাঁবু। মেহমানদের নিয়ে ফূর্তিতে মেতে ওঠে নবাবজাদা। মজলিশ, গুলতানি, মুজরো, মেহফিল, জুয়া—সেই সঙ্গে খানাপিনার শাহি আনজাম। কয়েক সপ্তাহের এই উৎসবে উড়ে যায় মুঠো মুঠো টাকা। ফূর্তির এই বহর দেখলে কে বলবে সেনাদের বেতন মেটানোর কড়ি নেই নিজামতের তোশাখানায়। সদ্য ঢাকা থেকে ফিরেছে বকর আলি। নিয়ে এসেছে খুশখবর। নবাবজাদার পরিকল্পনা মতোই মওত হয়েছে আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমের। সেই খুশিতে এবারের উৎসবের আয়োজন আরও জাঁকাল।
প্রতিবছরই মিরনের এই ঘুড়ি উৎসবের দাওয়াতে নিয়ে আসেন মিরকাজিম খাঁ। নবাবের সহোদর। মিরনের মতোই ওস্তাদ খেলোয়াড় হিসেবে নামডাক আছে তাঁর। চাচা-ভাইপোর ঘুড়ির লড়াই নিয়ে সকলের জোর উৎসাহ। আগে একবার মিরন কেটেছে মিরকাজিমের ঘুড়ি, একবার তিনি কেটেছেন মিরনের ঘুড়ি। এবারে চূড়ান্ত লড়াই। ওদিকে দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। বজরা ও শালতিতে ভাসমান সকলের নজর আকাশের দিকে। প্যাঁচ লেগেছে দুই ঘুড়ির সুতোয়। শেষ পর্যন্ত মিরকাজিমের ঘুড়িটাই ভোকাট্টা হল। হেলে দুলে ভেসে যেতে লাগল বাতাসে। ঘুড়ি ধরার জন্য দৌড় শুরু হয়ে গেল শালতিগুলোর মধ্যে। বিজয়োল্লাসে মাতল মিরনের অনুচরেরা।
সন্ধে গড়িয়ে যাওয়ার পর নিজের ছাউনিতে ফিরে জমকালো পোশাকে সজ্জিত হয়ে মিরকাজিম এলেন মিরনের তাঁবুতে। বিশেষ দাওয়াত দিয়েছে নবাবজাদা। খানাপিনা হবে, গানবাজনা হবে, ঘুড়ির লড়াইয়ের কুদরতি, কেরামতি নিয়ে গুলজার, গুলতানি হবে। সেই সঙ্গে খুবসুরত জেনানাদের নিয়ে নরম বিছানায় ফূর্তি। বেশ ফুরফুরে মেজাজে মিরনের তাঁবুতে প্রবেশ করলেন মিরকাজিম।
ফরাসের উপরে কাত হয়ে আয়েশ করছিল মিরন। হাতে শরাবের পাত্র।
নবাবজাদাকে তসলিম জানালেন মিরকাজিম। দু’জনের মধ্যে চাচা-ভাতিজার রিস্তেদারি থাকলেও এটাই দরবারি সহবত। মিরন নবাবজাদা। হবু নবাব। একমাত্র নবাব ও নবাব বেগম ছাড়া তার সমুখে মাথা ঝোঁকাতে হয় সকলকেই।
‘আলেকুম সালাম। আপনারই ইন্তেজার করছিলাম চাচাজি।’ মিরন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়।
এগিয়ে এসে আসন গ্রহণ করেন মিরকাজিম।
একজন দাখিলা এসে শরাবপূর্ণ পানপাত্র দিয়ে যায়। সঙ্গে রেকাবি বোঝাই ভাজা মাংস।
শরাবে গলা ভিজিয়ে খোশামুদে গলায় মিরকাজিম বলেন, ‘হুজুর, আপনি এক নাজুক খিলাড়ি। ঘুড়ির লড়াইয়ে আপনার সঙ্গে টক্কর নেওয়া মুশকিল।’
এরই মধ্যে মিরনের নেশা বেশ জমাট হয়েছে। জড়ানো গলায় সে বলে, ‘শুধু ঘুড়ির লড়াই কেন, মরজি হলে সাদেক আলি অনেক কিছু করতে পারে। ইনসানের নসিব, তালেনামার হিসেব-নিকেষ সব উলটে পালটে দিতে পারে।’
‘বিলকুল পারেন হুজুর।’ মোসাহেবি ঢঙে বলেন মিরকাজিম।
‘টোপিওয়ালা ইংরেজদেরও বাংলা থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে সাদেক আলি।’
‘বেশক পারেন। আপনি কামিল-ই-ইনসান। দিলওয়ার আদমি।’
‘ইয়ে কি আপনার মন কি বাত?’ প্রশ্ন করে মিরন।
‘বেশক মন কি বাত। আপনাকে ঝুট বলব কেন হুজুর?’
‘লেকিন অনেকে বলে সাদেক আলি খন্নাস। খতরনক এক খুনিয়ারা।’
‘ইয়ে গলত বাত। দুশমনের চাপানো ঝুটা ফৈজত।’
খিলাল দিয়ে খুচিয়ে দাঁতে আটকে থাকা মাংসের কুচি থু করে ফেলে দিয়ে মিরন বলে, ‘এই দুশমনেরা অনেকে মসনদের খোয়াব দেখে। ফির ইনকিলাব ঘটাতে চায়।’
পানপাত্রে চুমুক দিয়ে মিরকাজিম বলেন, ‘এদের চাবকে সবক শেখাতে হয়।’
‘উঁহু উঁহু। চাবুক নয়। সবক শেখানোর একটাই তরিকা জানে সাদেক আলি। ম-ও-ত।’
‘ইয়ে সচমুচ আচ্ছা তরিকা। খরিশের বাচ্চাদের জিন্দা রাখতে নেই।’
‘সহি সমঝবুঝ আপনার।’ এই বলে মিরন জোরে একটা চাপড় মারে মিরকাজিমের হাঁটুতে হাঁটুতে। পানপাত্র থেকে ছলকে পড়ে পানীয়। তাঁবুর এক কোণায় রুপোর দাঁড়ে বসা মিরনের বাজপাখি চঞ্চল হয়ে ওঠে। গিরদা কোলের উপরে টেনে নিয়ে হঠাৎই মিরকাজিমের মুখপানে চেয়ে হেসে ওঠে মিরন।
মিরনের কথাবার্তার ধরন ও আচরণে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন মিরকাজিম।
হাসি থামিয়ে মিরন বলে, ‘আপনার তকলিফ হল বোধ হয়।’
‘না না তকলিফ কেন হবে?’
‘হল না? হাতের শরাব ছলকে গেল।’
‘ও ঠিক হ্যায়।’ এই বলে বেওকুফের মতো হাসেন মিরকাজিম।
‘দুশমনের কলিজা ফাড়লে খুন এভাবেই ছলকায়।’ এই বলে বিশ্রি ভাবে হেসে ওঠে মিরন।
মিরকাজিমও হাসেন। লেকিন মনহুশ এক আন্দেশায় তাঁর কলিজা কেঁপে ওঠে। পাটনা অভিমুখে রওনা হয়েছেন শাহজাদা আলি গোহর। মিরকাজিম জানেন। অনেকদিন থেকেই শাহজাদার সঙ্গে তাঁর চিঠি চালাচালি চলছে। সম্প্রতি একটা চিঠিতে শাহজাদাকে তিনি লিখেছেন—
‘…জাঁহাপনা আপনি মুর্শিদাবাদে এসে পড়লেই এই গোলাম ফৌজসহ আপনার সঙ্গে যোগ দেবে। সুবে বাংলায় আরও অনেকে আপনার সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য তৈয়ার হয়ে রয়েছে। আপনি নির্ভয়ে দ্রুত মুর্শিদাবাদে আসুন। নবাব মিরজাফর খাঁ বুজদিল আদমি। নবাবজাদা মিরন শয়তান, সঙ্গদিল। তামাম মুর্শিদাবাদবাসী ফির ইনকিলাব চায়। আপনি এসে মসনদ দখল করুন। স্রেফ এক গুজারেশ– কাজ হাসিল হলে এই বান্দাকে ইয়াদ রাখবেন।…’
শঙ্কার মেঘ জমাট বাঁধে মিরকাজিমের মনে। চারিদিকে ঘুরছে মিরনের গুপ্তচরেরা। তাঁর সঙ্গে শাহজাদার সম্পর্কের কথা কি জেনে ফেলেছে মিরন? যে কাসিদের হাত দিয়ে তিনি চিঠি পাঠিয়েছিলেন শাহজাদার কাছে, বেশ কিছুদিন হয়ে গেল তার কোনও খবর নেই।
মিরকাজিমের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ধরা পড়ে যায় মিরনের চোখে। সে হেসেই প্রশ্ন করে, ‘লাগতা হ্যায় আপ কিসি চিজ সে ডরে হুয়ে হ্যায়।’
মুখে হাসি এনে সহজ হওয়ার চেষ্টা করেন মিরকাজিম। বলেন, ‘এই বান্দা আপনার ওফাদার। আপনার গোলাম। আপনি হবু নবাব। আমার কি ভয়ের কিছু থাকতে পারে?’
মিরকাজিমকে চমকে দিয়ে সহসা তার পিঠে একটা জোরালো চাপড় মেরে মিরন বলে, ‘আপনি এক নাজুক খিলাড়ি।’
‘মতলব?’ ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করেন মিরকাজিম।
হেসে ওঠে মিরন। ‘ফিরসে আপ ডরতে হ্যায়? আমি ঘুড়ি ওড়ানোর কৌশলের কথা বলছি।’
‘হুজুর মেহেরবান।’
মিরন ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলে, ‘প্যাঁচ আপনিও কম জানেন না। এমন ওস্তাদ খিলাড়ির মোকাবিলা করতে পারলে মজাক হয়।’
‘বহুত সুক্রিয়া।’
মিরকাজিমের মুখপানে চেয়ে এবারে শীতল কঠিন গলায় মিরন বলে, ‘আপনি স্রেফ এক জবরদস্ত খিলাড়ি নন, খতরনক ভি।’
ভয়ানক হিংস্র হয়ে ওঠা মিরনের দুই চোখের দিকে তাকিয়ে মিরকাজিমের শিরদাঁড়া বেয়ে যেন ঠান্ডা রক্তস্রোত বয়ে যায়।
কাতর গলায় মিরকাজিম বলেন, ‘কোনও গোস্তাকি হয়ে থাকলে মাফ করবেন হুজুর।’
সহসা সজোরে দুই হাতে তালি দেয় মিরন।
তাঁবুর কানাতের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে মিরনের অতি বিশ্বস্ত কয়েকজন অনুচর। প্রত্যেকের হাতেই ঝকঝক করছে উন্মুক্ত তরবারি।
বিপদ বুঝে চকিতে উঠে দাঁড়িয়ে কোমরবন্ধনী থেকে তরোয়াল বের করার কোশিস করেন মিরকাজিম। তার আগেই চারজন ঝাপিয়ে পড়ে তাঁর উপরে। একজন সজোরে তরবারি ঢুকিয়ে দেয় তাঁর পেটে। আর্তনাদ করারও ফুরসত পান না মিরকাজিম। নিথর দেহটা লুটিয়ে পড়ে ফরাসের উপরে। শাদা জমির উপরে ফুলেল নকশা তোলা সুজনি রক্তে লাল হয়ে ওঠে।
পৈশাচিক আনন্দে হেসে উঠে মিরন বলে, ‘শালা খন্নাসের আওলাদ খালাস।’
ঘাতকেরা শির ঝুঁকিয়ে তসলিম জানায়।
মোহরে বোঝাই একটা খেরিয়া তাদের উদ্দেশে ছুড়ে দিয়ে মিরন বলে, ‘তোদের ইনাম। ইবলিশের আওলাদ নবাব হওয়ার খোয়াব দেখছিল। ছুপিয়ে মদত দিচ্ছিল আলি গোহরকে। সাবুত মিলেছে। লাশটা নদীতে ভাসিয়ে দে।’
উঠে দাঁড়ায় মিরন। মাটিতে পড়ে থাকা মিরকাজিমের দেহে পদাঘাত করে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে তাঞ্জামে চড়ে বসে। কাহারদের উদ্দেশে বলে, ‘জলদি চল।’
রাতের অন্ধকারে নবাবজাদাকে নিয়ে পালকিবাহকেরা ছুটে চলে হিরাঝিল প্যালেসের উদ্দেশে।
.
‘…আমার বেটা আলি গোহর বাগি হয়েছে। আমাকে খতম করে দিল্লির তখতে বসতে চায়। সে নাফরমান। এই বেতমিজি আমি বরদাস্ত করব না। শুনলাম সে বাংলা মুলুকে যাচ্ছে। আপনি যদি তাকে মদত দেন তো আপনার বিরুদ্ধে গদ্দারির ইলজাম আনব। মোগল বাদশার রোষে মুসিবত হবে আপনার। তাই আপনার ভালোর জন্য বলছি, বাগি শাহজাদা বাংলা মুলুকে পৌঁছলেই তাকে কয়েদ করে তুরন্ত দিল্লিতে ওয়াপস পাঠাবেন।…’
চিঠিটা সদ্য এসে পৌঁছেছে মুর্শিদাবাদে। মোগল বাদশার চিঠি। পাঠিয়েছেন উজির ঘাজীউদ্দিন। তিনিই বাদশাকে চাপ দিয়ে লিখিয়েছেন এই চিঠি। খাস মুনশি পড়ে শোনাচ্ছিলেন। ভয়ে কেপে উঠলেন নবাব মিরজাফর খাঁ। দিল্লির বাদশার হুকুমে শাহজাদাকে বন্দি করতে হলে লড়াই অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু লড়াই করার মুরোদ কোথায় তাঁর? রামনারায়ণ লিখে যা পাঠিয়েছেন, তা রীতিমতো ভীতিকর। বিরাট বাহিনী নিয়ে পাটনার দিকে আসছেন শাহজাদা। ক্রমশ ভারী হচ্ছে তার দল। এরই মধ্যে বিহারের অনেক জমিদার শাহজাদার দলে যোগ দিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। অবিলম্বে পাটনায় ফৌজ পাঠানোর জন্য বার বার অনুরোধ করেছেন রামনারায়ণ। না হলে অচিরেই হয়তো হাতছাড়া হয়ে যাবে পাটনা। সেখানেই থামবেন না আলি গোহর। এগিয়ে আসবেন মুর্শিদাবাদের দিকে।
ফৌজ নিয়ে পাটনা অভিমুখে রওনা হওয়া মানে বিরাট খরচের ধাক্কা। টাকা কোথায়? কে মেটাবে খরচ? কার কাছে হাত পাতবেন নবাব? যিনি টাকা ধার দিতে পারতেন সেই জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ এখন রাজধানীতে নেই। কলকাতা থেকে ফিরেই সহোদর মহারাজ স্বরূপচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছেন। গন্তব্য পরেশনাথ।
নবাবের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে তাতে চোখ বোলালেন মণি বেগম। তারপর চিঠিটা নবাবের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনি কোম্পানির মদত চেয়ে ক্লাইভ সাহেবকে চিঠি লিখুন।’
‘ফের ইংরেজদের মদত চাইব মণি?’ অসহায় গলায় প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন নবাব।
‘এছাড়া আর উপায় কী?’
‘আগে মিরনের সঙ্গে বাতচিত করে দেখি।’
‘কী দেখবেন সরতাজ? আপনি এখনও তার উপরে ভরসা রাখেন?’ বিরক্তি ফুটে ওঠে মণি বেগমের গলার আওয়াজে।
‘সে ছাড়া এই আওকাতে আমার মদতদার আর কে আছে মণি?’
‘তার কি সেই মুরোদ আছে যে ঘামাসান লড়াই করে শাহি ফৌজকে রুখতে পারবে?’
‘নিজামতের অনেক ক্ষমতা এখন তার হাতে। তার মতামত নেওয়া জরুরি।’
‘বেগমের গোস্তাকি মাফ করবেন। নিজের রুকসত যদি না চান তো ফওরান ক্লাইভ সাহেবকে সব লিখে জানান। এছাড়া অন্য পথ নেই। আপনিই বলেছেন বিরাট ফৌজ নিয়ে আসছেন শাহজাদা। কোম্পানি ছাড়া এই সুবে বাংলায় এখন কার হিম্মত আছে যে তাকে রুখবে?’ কথাগুলো বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়েন মণি বেগম।
খুবই যুক্তিপূর্ণ কথা। তবুও নিশ্চুপ থাকেন নবাব। ইংরেজদের সাহায্য চাইতে সায় দিচ্ছে না মন। আজাদি চাইছেন নবাব। ফের ক্লাইভকে ডেকে আনার অর্থ ইংরেজদের হাতের মুঠোয় বন্দি হয়ে থাকা। তাছাড়া নবাব জানেন, এই সুযোগে ফের মোটা টাকা চেয়ে বসবে কোম্পানি। যুদ্ধ চালানোর যা খরচ, তার কয়েকগুন টাকা মেটাতে হবে ইংরেজদের। আপাতত তাদের মদত না চেয়ে এই বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার অন্য উপায় হাতড়ে বেড়াচ্ছেন নবাব।
নবাবকে চুপ করে থাকতে দেখে মণি বেগম মিনতির সুরে বলেন, ‘আমাকে গলত সমঝবেন না সরতাজ। আর যাই হোক মণি বেগম আপনার বরবাদি চায় না। কোম্পানির ফৌজ আপনার মদতে এগিয়ে না এলে মসনদ খোয়াতে হবে আপনাকে। আপনি আকলমন্দ ইনসান। বহু লড়াইয়ের সিপাহ সালার। আপনি বুঝছেন না এ কথা?’
‘মিরন যে ইংরেজদের পছন্দ করে না।’
মণি বেগম বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘সে কি পারবে আপনাকে সালামত রাখতে? মিরন নালায়েক। স্রেফ কিছু বেনসিব আদমির উপর সে জবরজুলুম করতে পারে, তাদের খতম করতে পারে। লেকিন শাহজাদার ফৌজের মোকাবিলা করার মুরোদ তার আছে কি? কোনওদিন কোনও লড়াই কি সে লড়েছে? মিরন নাদান, বেওকুফ, বুজদিল। তার সঙ্গে কী পরামর্শ করবেন আপনি? তার মতামতের কী গুরুত্ব আছে?’
হাঁ করে মণি বেগমের মুখপানে চেয়ে থাকেন নবাব।
‘এসব বাত বুরা লাগতে পারে আপনার লেকিন ইয়ে সচ।’
বেগম সাহেবার কথায় সম্মতি জানিয়ে মরিয়া গলায় বললেন, ‘তুমি হয়তো ঠিকই বলছ মণি, লেকিন ইংরেজ কোম্পানি যে আমাকে তাদের গোলাম বানিয়ে রাখতে চায়।’
‘ভুলে যাবেন না সরতাজ তারাই আপনাকে মসনদে বসিয়েছে। তাদের হাত ধরেই নসিব বদলেছে আপনার। মসনদের উপরে আপনার অধিকারকে সালামত রেখেছেন ক্লাইভ। তিনিই ভরসা। আজই আপনি চিঠি লিখে ক্লাইভ সাহেবের মদত চান। এতে আপনার ভালো হবে।’
ফরসির নল মুখে দিয়ে নীরবে তামাক টানতে থাকেন মিরজাফর খাঁ।
‘শুধু আপনার কথা নয়, নিজের কথাও ভাবছি আমি। ভাবছি আমার দুই পুত্র নজম ও সইফের কথা। আপনি সালামত থাকলে আমরাও সালামত থাকব। এখন আপনি যা ভালো মনে করবেন তাই করুন। আমার নসিবে যা আছে তাই হবে।’ এই বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন মণি বেগম।
‘মণি—’
কাঁদতে কাঁদতে মণি বেগম ছুটে চলে যান অন্দরমহলে।
খাস দরবারে একাকী বসে রইলেন নবাব। মানসিক উত্তেজনা আজকাল আর সহ্য হয় না তাঁর। ক্লান্তিতে বুজে আসছে চোখদুটো। কখনও মনে হয় অর্থহীন এই মসনদ, অর্থহীন এই রওনক, নবাবিয়ানার জোশ, রওশন। ফকির দরবেশের মতো নিশ্চিন্তে দিন গুজরান করতে পারলে বোধ হয় ভালো হত। সব কিছু ছেড়ে খোদার পথের রাহী হয়েছেন যাঁরা, তাঁরাই সুখী এই দুনিয়ায়। আবার পরক্ষণেই নবাব ভাবেন, অনাবিল পার্থিব সুখের আস্বাদ, ভোগের ক্ষমতা অর্জনই হল আসল। এসব থেকে বঞ্চিত হয়ে মামুলি এক ইনসানের মতো দিন গুজরান অর্থহীন।
নাঃ! মসনদ ছাড়া তিনি বাঁচতে পারবেন না। যে ভাবেই হোক রুখতে হবে শাহজাদাকে। তিনি মসনদও চান আবার ইংরেজদের গড়া পিঁজরা ভেঙে আজাদ চিড়িয়ার মতো আকাশে উড়তেও চান। মনের এই দুই ইরাদাকে কিছুতেই মেলাতে পারেন না নবাব। কী করে আলি গোহরের মোকাবিলা করবেন তিনি? তাগদ কোথায় তাঁর? মণি বেগমের যুক্তিকে উড়িয়ে দিতে পারছেন না মন থেকে। তাহলে এই ওয়াক্তে উপায় কী? ক্লাইভ সাহেবকে ইয়াদ করা? ফের ইংরেজদের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া? দুমুখী ভাবনার টানাপোড়েনে জেরবার হয়ে পড়েন নবাব।
সহসা ঝড়ের বেগে মিরন এসে প্রবেশ করে খাস-দরবারে।
‘তলব করেছিলেন আব্বাহুজুর?’ শরাবের নেশায় পা টলছে মিরনের।
‘এসেছ বেটা? তোমারই ইন্তেজার করছিলাম। শুনেছ নিশ্চয়ই আলি গোহর বিরাট ফৌজ নিয়ে পাটনার দিকে আসছেন।’
‘শুনেছি। আমি জানি নিজামতের অন্দরে অনেকেই তার মদতদার। আপনি পরেশান হবেন না আব্বাহুজুর। নিজামতের কাসিদরা সব শয়তানকে খুঁজে বের করবে। সব শারারতি আমি ঘুচিয়ে দেব। আপনি শুনলে হয়তো খুশি হবেন যে ইতিমধ্যেই এক গদ্দারকে সবক শিখিয়ে দিয়েছি।’
‘কে গদ্দার?’ কৌতূহলী হয়ে ওঠেন নবাব।
‘চাচাজি। মিরকাজিম খাঁ। চিঠিটা পড়ে দেখুন।’
মিরনের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরেন মিরজাফর। বিস্ফারিত হয়ে ওঠে নবাবের দুই চোখ। নবাব শুধোলেন, এ চিঠি কী করে হাতে এল তোমার?
মিরন বলে, ‘চাচাজির এক কাসিদ কে ঘায়েল করে এই চিঠি নিয়ে এসেছিল অঙ্গন সিং।’
‘বাহাদুর আদমি। আমার তরফ থেকে শ-আসরফি ইনাম দিও ওকে।’
‘অঙ্গন সিং-এর মওত হয়েছে। আন্দাজ মিরকাজিমের ওফাদারেরাই খুন করেছে তাকে।’
মিরজাফর প্রবল আক্রোশে চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘বেইমান। মিরকাজিমের গর্দান নেব আমি।’
‘শান্ত হোন আব্বাহুজুর। ও কাজ আমি হাসিল করে এলাম।’
‘মিরকাজিম খতম?’
‘বেতমিজের লাশ এখন নদীতে ভাসছে।’
‘সাবাশ বেটা।’ পৈশাচিক উল্লাসে চেঁচিয়ে ওঠেন নবাব। জিঘাংসা মূর্ত হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিক্রিয়ায়। পরক্ষণেই অবশ্য আশু বিপদের কথা ভেবে বদলে যায় নবাবের অভিব্যক্তি। চিন্তার ছাপ ধরা পড়ে মুখে। নবাব বললেন, ‘পাটনায় ফৌজ পাঠানো দরকার। হাতে কড়ি নেই। কী করব তুমি বল বেটা?’
‘লড়াইয়ের জরুরত নেই।’
‘কী বলছ তুমি বেটা?’ মিরনের কথায় বিস্মিত হলেন নবাব।
‘সওগাতে বশ করব শাহজাদাকে। সুবে বাংলার মসনদ নয়, শাহজাদা চান দিল্লির তখত। আমার আন্দাজ মোটা নজরানা পেলে তিনি খুশি হয়ে ফিরে যাবেন।’
কথাটা মনে ধরল মিরজাফরের। তিনি যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। কিন্তু ফের হতাশ হয়ে পড়লেন। শাহজাদার নজরানা মানে মোটা টাকার ব্যাপার। কোথায় টাকা?
‘শাহজাদার নজরানা মেটানোর কড়ি কোথায় পাব বেটা?’
‘জগৎশেঠজি জোগাবেন।’ মিরন জবাব দেয়।
‘তিনি রাজধানীতে নেই। পরেশনাথের পথে রওনা হয়েছেন।’
‘ফওরান ওয়াপস আসার জন্য চিঠি পাঠিয়ে দিন।’
‘কালই পাঠিয়ে দেব চিঠি। বেশক।’ খুশি ঝলকায় মিরজাফরের মুখে।
‘আমি আসি আব্বাহুজুর।’
‘এসো বেটা।’
দরজার মুখে গিয়ে ঘুরে তাকিয়ে মিরন বলে, ‘শেঠজি যদি টাকা দিতে ইনকার করেন তো এই খন্নাসি বরদাস্ত করব না আমি। শেঠজির কোঠি লুঠ করে তাঁকেও খতম করব।’
শিউরে ওঠেন মিরজাফর খাঁ। ‘অ্যায়সা মাত শোচো বেটা।’
নবাবের প্রতিক্রিয়াকে উপেক্ষা করে ঘর থেকে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হয় মিরন।
.
