৬২
‘আমাদের কসুর কী হুজুর?’ নবাবের সমুখে জোড়হাত হয়ে শুধোলেন ডাচ গভর্নর বিসডাম।
নবাব নিরুত্তর। আনত চোখে কোলের উপরে বসে থাকা পোষা কাবলি বিড়ালের মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। আরামে চোখ বুজে নবাবের কোলের উপরে গুটিসুটি মেরে বসল বিড়ালটা।
অনেক কসরত করে নবাবের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছেন বিসডাম। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ নবাবের কাছে তিনি উগরে দিলেন।
‘ইংরেজরা আপনার প্রজা, আমরাও আপনার প্রজা। ইংরেজদের আগে এদেশে এসেছি আমরা। সওদার ক্ষেত্রে ইংরেজরা আমাদের থেকে বাড়তি সুবিধা পাবে কেন? আমরা চিরকাল নিজামতের কানুনকে, পরোয়ানাকে ইজ্জত করে এসেছি। সময় মতো শুল্ক দিয়েছি। তবু আমরা ইংরেজদের জবরজুলুমের শিকার। বার বার শিকায়ত করার পরেও কোথাও কোনও ইনসাফ না পেয়ে বাধ্য হয়েই আজ আপনার কাছে দরবার করতে এসেছি।’
মাথা নিচু করে রইলেন নবাব। বিসডামের অভিযোগকে খণ্ডন করার কোনও উপায় নেই। জবাবে কী বলবেন তিনি? ইয়ে তো বিলকুল সচ বাত। তামাম বাংলা জানে। পলাশির পরে ইংরেজদের নানা বাড়তি সুবিধা দিয়েছেন নবাব। ক্লাইভ যা চেয়েছেন, তাই মঞ্জুর করেছেন। কোনও নিয়মকানুনের ধার ধারেননি।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলার সোরার খুবই চাহিদা। পাটনায় পাওয়া যায় সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সোরা। ক্লাইভকে খুশি করতে পাটনার সোরার কারবারের একচেটিয়া অধিকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দিয়েছেন নবাব। ইংরেজদের কাছ থেকে চড়া দামে সোরা কিনতে হচ্ছে ডাচদের। তাও চাহিদা মতো, সময় মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
বিসডাম বললেন, ‘কেন আমাদের জাহাজ জবরদস্তি খানাতল্লাশি করবে ইংরেজরা?’
মিরজাফর খাঁ অবাক চোখে বিসডামের মুখপানে চাইলেন।
‘আপনি পুছতাছ করে দেখুন। সাগর থেকে নদী বেয়ে জাহাজ নিয়ে আসার জন্য আমাদের ভরসা করতে হচ্ছে ইংরেজ পাইলটদের উপরে। তাদের মর্জি মাফিক চলতে হচ্ছে।’
‘আপনাদের পাইলটরা কোথায়?’ শুধোলেন নবাব।
‘ইংরেজদের জবরদস্তিতে তারা কাজ করতে পারছে না।’
‘তাজ্জব ব্যাপার! এ তো জানা নেই আমার।’ নবাব যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
‘গুস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। এমন পরোয়ানা তো আপনিই দিয়েছেন।’
বিস্ফারিত চোখে নবাব শুধোলেন, ‘আমি দিয়েছি?’
‘সেই পরোয়ানার কপি আমরাও পেয়েছি।’ এই বলে একটা কাগজ পেশ করলেন বিসডাম।
মালিকের মনোযোগ আর তার প্রতি নেই দেখে নবাবের কোল থেকে নেমে সামান্য দূরে মেঝের উপরে গিয়ে আয়েশ করে শুয়ে পড়ল নবাবের পোষ্য।
নবাব বেশ উত্তেজিত। বিসডামের পেশ করা কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে অন্যমনস্ক ভাবে হাতে টেনে নিলেন ফরসির নলটা। ভুরভুর করে খানিকটা তামাক টানলেন। ধোঁয়া ছেড়ে বিস্মিত গলায় বললেন, ‘তাজ্জব ব্যাপার। এ দস্তখত তো আমারই।’
‘আমি কোনও ঝুট বাত বলতে আসিনি হুজুর। এখন আপনি বলুন এই জুলুম কেন?’
নবাব অন্যমনস্ক। বিসডামের পেশ করা পরোয়ানাটা নিয়ে ভাবনায় পড়েছেন। এমন কোনও পরোয়ানায় তিনি যে দস্তখত করেছিলেন, মনে করতে পারছেন না। মনে রাখবেনই বা কেমন করে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি শরাবের নেশায় বেসামাল হয়ে থাকেন। খাস মুনশি এসে কখন যে কোন পরোয়ানার মুসাবিদা পড়ে শোনায়, সবটা সমঝবুঝ করে উঠতে পারেন না। মৌতাতের আমেজে কানেও যায় না সব কথা। অনেক কিছু ভালো করে না বুঝেই তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে দেন। যে সব কাগজ খাশ মুনশি তার সামনে পেশ করেন, সেসবে চোখ না বুলিয়েই দস্তখত করে দেন। নবাবের এই অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে যে যেমন চায় খাস মুনশিকে সওগাতে খুশি করে তেমনই পরোয়ানা আদায় করে নেয়। ইদানীং নানারকম পরস্পর বিরোধী হুকুমত নিয়ে নিজামতের অন্দরে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। সে সব সামলাতে পরেশান হয়ে যাচ্ছেন নবাব। বিসডামের কাছে কার্যত নিজের অক্ষমতার কথা কবুল করে নিলেন তিনি।
‘এ আমারই ভুল।’
‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। তাহলে এই পরোয়ানা আপনি বাতিল করে দিন।’
অনুনয় করলেন বিসডাম।
‘দেখি কী করা যায়।’ এই বলে বিসডামের দেওয়া কাগজটা গুটিয়ে রাখেন নবাব।
বিসডাম ফের গুজারেশ করেন, ‘আমাদের বহুত লোকসান হচ্ছে হুজুর। ধৈর্যেরও তো একটা সীমা আছে। এই জুলুম যদি চলতে থাকে তো ইংরেজদের সঙ্গে আমাদের লড়াই বেধে যাবে।’
কৌতূহলী চোখে বিসডামের মুখের দিকে চেয়ে নবাব বললেন, ‘লড়াই?’
‘সুবে বাংলা ফের বেচ্যায়েন হোক, আমরা চাই না। স্রেফ সওদা ও মুনাফা ছাড়া অন্য কোনও মতলব আমাদের নেই। লেকিন ইংরেজরা যদি জবরজুলুম করে আমাদের কারবারে বাধা দেয়, দিনের পর দিন যদি আমাদের লোকসান হতে থাকে, যদি কোথাও কোনও ইনসাফ আমরা না পাই তো কী করব বলুন? লড়াই ছাড়া উপায় কী?’ বেশ উত্তেজিত গলায় কথাগুলো বললেন বিসডাম।
মিরজাফরের চোখ দুটো সহসা চকচক করে উঠল। তিনি শুধোলেন, ‘লড়াইয়ের ময়দানে ইংরেজদের বেকায়দায় ফেলার হিম্মত রাখেন আপনারা?’
‘আমরা শান্তি চাই। তাই বলে আমাদের নালায়েক, বুজদিল ভাববেন না।’
‘দক্ষিণের খবর রাখেন?’ প্রশ্ন করেন নবাব। মুখে খুশির ছাপ।
‘জানি পরেশানিতে রয়েছে ইংরেজরা। কাউন্ট লালির হাতে নাজেহাল।’
‘ক্লাইভ সাহেবের হাতে এখন ফৌজি খুবই কম।’
‘তাও জানি হুজুর। কলকাতায় এখন ইংরেজদের যুদ্ধজাহাজ আছে স্রেফ চারখানা।’
‘এই ওয়াক্তে লড়াই করে ইংরেজ কোম্পানিকে পরেশান করতে পারবেন আপনারা?’
নবাবের এই প্রশ্ন শুনে বেশ চমকে গেলেন বিসডাম। কী চাইছেন নবাব? ইংরেজদের মুসিবত? তাঁর মোহভঙ্গ হল কি? ইংরেজদের সঙ্গে দোস্তির রিশতেদারি তুড়ে দিতে চাইছেন? বিসডাম ভেবেছিলেন ইংরেজদের নামে কোনও শিকায়ত শুনতে চাইবেন না নবাব। উলটে ডাচদের উপরেই তিনি বিরক্ত হবেন। কারণ যেসব সুযোগসুবিধা ইংরেজদের তিনি দিয়েছেন, তা সমঝবুঝ করেই দিয়েছেন। সে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক। এ নিয়ে ইলজাম আনার অর্থ নবাবের কাজের সমালোচনা করা। নিজামতের ভাষায় এ হল বেতমিজি। বেসহবত কান্ড।
ইনসাফ মিলবে না ধরে নিয়েই খানিকটা কর্তব্যের খাতিরে নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন বিসডাম। বাটাভিয়া থেকে উপরওয়ালাদের নির্দেশ এসেছে, ‘…বাংলার ব্যাবসা যে ডুবতে বসেছে। হয় নবাবের সঙ্গে কথা বলে অবিলম্বে এর বিহিত করো। ইনসাফ যদি না মেলে তো বলপ্রয়োগের পথেই হাঁটতে হবে আমাদের। ইংরেজদের সঙ্গে সত্যিই যদি লড়াই বেধে যায়, তাহলে তিনি যেন ডাচদের একতরফা দোষারোপ না করেন। একথা তাঁকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার।…’
বিসডাম প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি সত্যিই ইংরেজদের মুসিবত চাইছেন?’
মিরজাফর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমি আজাদ হতে চাইছি।’
মরিয়া আকুতি ঝরে পড়ল নবাবের গলায়। নড়েচড়ে বসলেন বিসডাম।
নবাব বলে চললেন, ‘ইংরেজদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে সুবে বাংলা থেকে তাড়িয়ে দিতে চাই আমি। কিন্তু পারছি কোথায়? উলটে ইংরেজ কোম্পানি ফাঁস হয়ে চেপে বসছে আমার গলায়। আমার নিজের তাগদ নেই। আমি একদল কামিল-ই-ইনসানের তালাশ করে বেড়াচ্ছি। পারবেন আপনারা? ইংরেজদের তাড়িয়ে আমার তকলিফ দূর করতে পারবেন?’
এ যে উলটপুরাণ। মেঘ না চাইতে জল। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে বিসডাম বললেন, ‘আপনার মদত পেলে নিশ্চয়ই পারব।’
‘মদত মিলবে। ফৌজ আনান আপনারা। আমি ফির একবার ইনকিলাব ঘটাতে চাই বাংলায়।’ কথাগুলো বলতে বলতে নবাবও উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালেন।
বিসডাম বললেন, ‘আপনাকে এক খুশখবর জানাই হুজুর।’
কৌতূহলী চোখে বিসডামের মুখপানে চাইলেন মিরজাফর।
‘বাটাভিয়া থেকে ফৌজ নিয়ে কয়েকখানা জাহাজ বাংলা মুলুকের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।’
ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন নবাব। হঠাৎই মনের মধ্যে দেখা দিল সংশয়। যে বিপজ্জনক খেলা তিনি খেলতে চাইছেন তাতে কামেয়াব হতে পারবেন তো? কিন্তু এ ছাড়া আর উপায়ই বা কী আছে? মন চাইছে আজাদি। নিজের আজাদি বিকিয়ে দিয়ে একজন ইনসান কখনও সুখী হতে পারে না। মসনদ, দৌলত এসবের থেকেও আজাদি অনেক কিমতি চিজ।
সংশয় ঝেড়ে ফেলে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে এসে বিসডামের মুখোমুখি দাঁড়ালেন নবাব। ডাচ গভর্নরের সঙ্গে কোলাকুলি সেরে নিয়ে বললেন, ‘আমি মোনাজাত করব পয়গম্বরের কাছে, আপনারা কামেয়াব হোন।’
আবেগে বিসডাম বলে উঠলেন, ‘আপনার সঙ্গে এই নয়া রিস্তেদারির ইজ্জত রাখতে জান কবুল করে লড়াই করবে ডাচেরা। আমি ওয়াদা করছি সুবে বাংলা থেকে ইংরেজদের তাড়িয়ে ছাড়ব।’
খুশিতে ভাসতে ভাসতে বিদায় নিলেন বিসডাম।
নবাবও দারুণ খুশি। এখনই তার মনে হচ্ছে বুক থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেল। ওমর বেগকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘বজরা তৈয়ার করো। দিল চাইছে দরিয়ার তাজা বাতাস।’
‘জি হুজুর।’
নবাবের নদী ভ্রমণের আনজাম করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ওমর বেগ।
.
