পলাশির পরে – ৬১

৬১

কাশিমবাজারে ওয়ারেন হেস্টিংসের ছোট্ট বাংলোটা যেন এক স্বপ্নের দেশ। সরু লাল ইটের তৈরি কোঠাবাড়িটাকে ঘিরে রেখেছে নানারকমের গাছপালা, সবুজ লন ও কেয়ারি করা রকমারি ফুলের বাগান। পলাশির যুদ্ধের পর রেসিডেন্টের সহকারীর পদে বহাল হওয়ার পর পত্নী মেরিকে নিয়ে এই বাংলোর বাসিন্দা হয়েছেন ওয়ারেন হেস্টিংস। আগে এখানে থাকতেন স্ক্র্যাফটন। সে সময় এ বাড়ির চারপাশের পরিবেশ এমন মনোরম ছিল না। এখানে এসে অল্প সময়ের মধ্যেই রকমারি গাছপালা দিয়ে বাংলোর বাগানটা সুন্দর করে সাজিয়ে তুলেছেন মেরি। নিজেই ঘুরে ঘুরে দেখভাল করেন মালিদের কাজ। নিজের হাতেও গাছের পরিচর্যা করেন।

বাংলোয় প্রবেশের মুখে গেটের উপরে বাঁশের বাখারি দিয়ে তৈরি ধনুকের মতো কাঠামোর গা বেয়ে এলোমেলো ভাবে বেড়ে উঠেছে মাধবীলতা। মই বেয়ে উঠে একজন মালি কাঁচি হাতে যত্ন করে ছেটে দিচ্ছিল উচ্ছৃঙ্খল ভাবে বেড়ে ওঠা শাখাপ্রশাখাকে। নীচে দাঁড়িয়ে তার কাজ তদারক করছিলেন মেরি। পরনে ফুলেল নকশাতোলা সিল্কের গাউন। জরির ফিতে দিয়ে খোঁপা বাঁধা চুল। ছোট্ট একটা সূর্যমুখী ফুল গুঁজেছেন খোঁপায়। মুখ তুলে নির্দেশ দিচ্ছিলেন মালিকে। তাঁর নিজের অজান্তেই একগাছি চুল এসে পড়েছে গালের উপরে। বড় অপূর্ব দেখাচ্ছিল তাঁকে।

‘মেরি-ই-ই! মেরি-ই-ই! মাই ডার্লিং—’

সচকিত হয়ে ওঠেন মেরি। ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন নদীর দিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসছেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

মেরি-ই-ই! মেরি-ই-ই। ভয়ানক উত্তেজিত হেস্টিংস।

ছুটে এসে শূন্যে দু-হাত প্রসারিত করে মেরির সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন ওয়ারেন হেস্টিংস। ‘মেরি মাই সুইটি। মাই ডার্লিং।’

‘কী হয়েছে? হোয়াই সো এক্সাইটেড?’

ওয়ারেনের হাত ধরে তাকে টেনে তোলেন মেরি।

‘মেরি মেরি মাই ডার্লিং—’ মেরিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে চুম্বনে উদ্যত হলেন ওয়ারেন।

‘আঃ! কী অসভ্যতা করছ? ছাড়ো। বাগানে কাজ করছে লোকজন। পাগল কোথাকার। এত খুশি কীসের?’

হেস্টিংস হেসে বলেন, ‘কোথায় লোকজন? কেউ তো নেই।’

চারিদিকে চোখ বুলিয়ে অবাক হয়ে যান মেরি। সত্যিই তো কেউ নেই। একটু আগেই তো তিনজন মালি কাজ করছিল বাগানে। সাহেব ও মেমসাহেবের কান্ডকারখানা দেখে সব ছুটে পালিয়েছে। খিলখিল করে হেসে উঠলেন মেরি। হাসলে তাঁর দুগালে টোল পড়ে।

প্রথম কন্যাসন্তানের অকালমৃত্যুর পর থেকে খুব মনমরা হয়ে থাকতেন মেরি। অনেকদিন পর মেরিকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখলেন ওয়ারেন। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তিনি চেয়ে রইলেন মেরির মুখের দিকে। সত্যিই হাসলে মেরিকে অপূর্ব দেখায়।

‘হাঁ করে অমন দেখছ কী?’

‘তোমাকে!’

‘সত্যিই তুমি পাগল একটা। ঘরে চলো।’

বাগানের পথ ধরে হাঁটতে থাকেন হেস্টিংস দম্পতি।

মেরি শুধোলেন, ‘অমন এক্সাইটেড হয়ে ছুটতে ছুটতে এলে যে? কী হয়েছে?’

‘ছুটে আসব না? পারলে উড়ে আসতাম। আই হ্যাভ বিন অ্যাংশাস সিন্স ইয়েসটারডে।’

‘ও মাই গড! হোয়াট হ্যাপেনড?’

‘আমি দরবারের রেসিডেন্ট হয়েছি মেরি।’

‘রিয়েলি?’ আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠেন মেরি। খুশিতে উদ্ভাসিত হয় মুখ।

‘গভর্নরের অর্ডার এসেছে। অগ্রদ্বীপে পৌঁছে হাতে পেলাম।’ তারপর নিমেষে মেরিকে পাঁজাকোলে করে তুলে ঘরে ঢুকে পড়লেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

‘এই দ্যাখো দ্যাখো কী করছ?’

‘ইউ ব্রট মাই গুড লাক।’

মেরিকে বিছানার উপরে ফেলে তার উপরে উপুড় হয়ে পড়ে ওয়ারেন বললেন, ‘তোমাকে খুব আদর করতে ইচ্ছে করছে ডার্লিং।’

মেরি হাসেন। সোহাগ করে হেস্টিংসের টিকালো নাকটা নেড়ে দিয়ে বলেন, ‘আই অলসো হ্যাভ অ্যা গুড নিউজ ফর ইউ।’

‘গুড নিউজ?’

‘আই অ্যাম প্রেগন্যান্ট।’

‘রিয়েলি?’ এবারে ওয়ারেন হেস্টিংস আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।

মৃদু হেসে ইতিবাচক ঘাড় নাড়েন মেরি।

খুশিতে উচ্ছল হেস্টিংস মুখটা আরও নীচের দিকে নামিয়ে আনেন।

সাড়া দিলেন মেরি। ধরা দিলেন প্রগাঢ় চুম্বনে।

বিকেলের আলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। বাগান থেকে ভেসে আসছে পাখির কলকাকলির শব্দ। বাতিদান হাতে ঘরে আসছিল এক নোকর। আলিঙ্গনে মত্ত সাহেব ও মেমসাহেবকে দেখে উলটো মুখে ছুটে পালাল।

.

সপ্তাহখানেক হতে চলল, অগ্রদ্বীপ থেকে যাত্রা করে হুগলি এসে পৌঁছেছেন নবাব মিরজাফর খাঁ। নবাবের খোশ-আমদেদ, আমোদ ফূর্তি, আশরতের এলাহি আনজাম করে রেখেছিলেন ফৌজদার ওমর বেগ। খুশিতে ভাসছেন নবাব। তাঁর সঙ্গীসাথীরাও গা এলিয়ে দিয়েছে আলস্যে। কলকাতা পৌঁছনোর কোনও আগ্রহ নেই কারোরই। অবশ্য রায়দুর্লভকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় গিয়েছেন স্ক্র্যাফটন। ক্লাইভের সঙ্গে কিছু জরুরি আলোচনা সেরে কয়েকদিন পরে স্ক্র্যাফটন ফিরবেন কাশিমবাজারে। তারপর রেসিডেন্টের চার্জ হ্যান্ডওভার করবেন হেস্টিংসকে।

ওদিকে নবাবকে দ্রুত কলকাতায় নিয়ে আসার জন্য বারবার ক্লাইভের বার্তা আসছে। কী করে এই পরিস্থতি থেকে উদ্ধার করে নবাবকে দ্রুত কলকাতায় টেনে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে ওয়াটস চিন্তিত। নবাব এখানে বেশিদিন বসে থাকলে ডাচেরা না তাঁর কান ভাঙানোর সুযোগ পেয়ে যায়। বাংলার ব্যাবসায় এই মুহূর্তে ডাচেরাই তো ইংরেজদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী।

নবাবকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ব্যাবসার ক্ষেত্রে একতরফা অনেক সুযোগ আদায় করে নিয়েছে ইংরেজরা। ডাচেরা পিছিয়ে পড়ছে। সুযোগ পেলেই নবাবের কাছে তারা ক্ষোভ উগরে দেবে। এটাই স্বাভাবিক। আর নবাব যদি ডাচেদের দিকে ঝুকে পড়েন তাহলে ইংরেজদের তকলিফ বাড়বে। ইদানীং এমনিতেই সুরে বাজছেন না নবাব। তাই তার অহংবোধকে তোয়াজ করার জন্য ক্লাইভের এত ব্যস্ততা। দক্ষিণে নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে ফরাসিদের হাতে। এই সময়ে নবাব ডাচেদের দিকে ঝুঁকলে সমূহ বিপদ। তবে ওয়াটসের কাছে আশার কথা হল, সপ্তাহ খানেক হয়ে গেলেও এখনও নবাবের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পায়নি ডাচেরা। ডাচ গভর্নর, বিসডাম নবাবের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু আমোদে মশগুল নবাব এখনও সে চিঠির জবাব দেননি। তবে বিসডাম কিন্তু হাল ছেড়ে বসে নেই। নবাবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

যাই হোক, কলকাতাযাত্রার কথা ফের একবার নবাবকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য হুগলি দুর্গে এসে হাজির হলেন উইলিয়াম ওয়াটস। বেলা বেশ গড়িয়েছে কিন্তু এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি নবাব। গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত মুজরোর আসরে ছিলেন। কখন যে শয্যাত্যাগ করবেন, তার কোনও ঠিক নেই। দুর্গের অলিন্দে অস্থির ভাবে পায়চারি করতে লাগলেন ওয়াটস। কুঞ্চিত ভুরুযুগল। মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। খানিকবাদে ফৌজদার ওমর বেগ এসে তাঁকে জানালেন, ‘বেগম সাহেবা আপনাকে এত্তেলা দিয়েছেন।’

‘বেগম সাহেবা?’ অবাক হলেন ওয়াটস।

‘জি সাহেব। নবাব বেগম।’

দু’জন বাঁদি এসে অন্দরমহলে নিয়ে গেল ওয়াটসকে।

সূর্যের আলো জাফরির ফাঁক গলে চকমিলানো মেঝের উপরে এসে পড়েছে। ফরাসের উপরে হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছেন বেগম সাহেবা। তার পরনের জামদানি কাজ করা, শাদা জমির উপরে ফুলেল নকশাতোলা সিল্কের ঘাগরা অর্ধবৃত্তাকারে ফুলের পাপড়ির মতো ছড়িয়ে রয়েছে ফরাসের উপরে। মণি বেগমের সামনে কিছুটা দূরে রাখা রয়েছে রাখা রয়েছে জল ভর্তি মস্ত এক রুপোর রেকাবি। তাতে ভাসছে লাল গুলাব। আতরের উগ্র গন্ধে ম-ম করছে ঘর। তার সঙ্গে মিশেছে অম্বুরি তামাকের সুবাস। বেগম সাহেবার হাতে ফরসির নল। পাশেই রাখা রয়েছে একটা রুপোর গড়গড়া। সামনে চিকের আড়াল। ওপাশে উইলিয়াম ওয়াটস।

‘সেলাম হুজুরাইন।’

‘বসুন সাহেব। কিছু জরুরি কথা আছে। তাই আপনাকে একটু তকলিফ দিলাম।’

খুশইলহান গলার আওয়াজ ওয়াটসকে যেন অবশ করে দিল।

‘না না তকলিফ কোথায়? আপনি ডেকেছেন, এ তো আমার খুশনসিব।’ এই বলে ফরাসের অদূরে একটা চৌপাইয়ের উপরে বসলেন ওয়াটস। চিকের ওপারে আবছা মণি বেগমের অবয়ব।

‘আপনাদের মনসুবা কী?’ শুধোলেন বেগম সাহেবা।

বেমক্কা এই প্রশ্নে খানিকটা যেন থতমত খেয়ে গেলেন ওয়াটস। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘কোন মনসুবার কথা বলছেন আপনি?’

মণি বেগম বললেন, ‘এই যে অচানকই নবাবের প্রতি আপনাদের এই খাতিরদারি?’

অবাক হওয়া গলায় ওয়াটস জবাব দেন, ‘এতে কসুর কোথায়? আমরা নবাবের প্রজা।’

‘কলকাতায় নিয়ে গিয়ে নবাবকে কোনও মুসিবতের মধ্যে ফেলতে চান না তো আপনারা?’

ওয়াটস মুখে হাসির রেশ নিয়ে বললেন, ‘আপনি সন্দেহ করেন আমাদের?’

মেহেন্দি রাঙানো করতলের দিকে চেয়ে আনত চোখে মণি বেগম বললেন, ‘না, তা নয়। নবাব মসনদে বসেছেন এক সাল হয়ে গেল। এতদিন বাদে খাতির দেখিয়ে আপনারা তাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইছেন, তাই মনে হল আপনাকে ডেকে একবার পুছতাছ করি।’

মোলায়েম গলায় ওয়াটস বলেন, ‘ক্লাইভ সাহেব কলকাতার গভর্নর হয়েছেন। সেই খুশিতে কোম্পানির তরফ থেকে নবাবকে উনি সম্মান জানাতে চান।’

‘স্রেফ ওইটুকুই? আশা করি আপনি আমাকে ঝুট বলছেন না।’

‘আমাদের অন্য কোনও মতলব নেই হুজুরাইন।’

‘আপনাকে ডেকে এসব পুছতাছ করার জন্য কিছু মনে করবেন না সাহেব। আসলে ভয় করে। নবাব না অচানক বরবাদ হয়ে যান।’ শঙ্কা ফুটে ওঠে মণি বেগমের গলার আওয়াজে।

‘একথা ভাবছেন কেন?’

‘নবাবের দুশমন তো কম নেই।’

‘আমরা নবাবের দোস্ত।’

মুচকি হেসে বেগম সাহেবা বললেন, ‘জানি।’

কথাটা যেন বিদ্রুপের মতো শোনাল ওয়াটসের কানে। ব্যস্ত হয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি অহেতুক পরেশান হবেন না হুজুরাইন। মসনদে খাঁ সাহেবই বহাল থাকবেন। আমরা তাই চাই।’

ক্ষণেকের জন্য নস্তব্ধতা নেমে এল ঘরে। ভুর ভুর করে ফের খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে মণি বেগম বললেন, ‘জাফর আলি খাঁ সাহেব কিন্তু আপনাদের অনেক কিছু দিয়েছেন।’

‘জরুর। তাঁর মদত না মিললে মুসিবত হত আমাদের। এ কথা আমরা কবুল করি।’

‘খাঁ সাহেব সিধাসাদা ইনসান। কে তার দোস্ত, আর কে তার দুশমন বোঝেন না। আপনারা তাকে সালামত রাখবেন। এইটুকুই মণি বেগমের আরজু।’

‘আমরা তো খাঁ সাহেবকে সালামতই রাখতে চাই, লেকিন তাঁর মুসিবত ডেকে আনতে পারেন নবাবজাদার খুশখেয়াল।’

‘নবাবজাদা নাফরমান। সে কথা আমি জানি।’

মণি বেগমের মনের আন্দাজ পেয়ে ওয়াটস বললেন, ‘গুস্তাকি মাফ করবেন হুজুরাইন। আমার মনে হয়, তার উপরে জেয়াদা জিম্মেদারি দিয়ে ভালো করেননি নবাব।’

‘সে কথা ওঁকে সমঝানোর কোশিশ করে চলেছি আমি। আশা করি তিনি বুঝবেন।’

‘ইয়ে তো বহুত খুশি কি বাত।’

‘জানবেন মণি বেগম আপনাদের দোস্ত। আপনারা যে শর্তে সওদা করতে চাইবেন, তাই হবে। শুধু নবাবকে সালামত রাখবেন আপনারা। নবাবের মুসিবত হলে বরবাদ হয়ে যাবে আমার দুই লেড়কা নজম ও সইফের ভাবীকাল। মির্জা মেহেদির মওত কী ভাবে হয়েছে আমি জানি। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন সাহেব আমার দহসতের কারণ কী?’

‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন হুজুরাইন। শুধু নবাব নন, আপনি ও আপনার দো লেড়কার সালামতির জিম্মেদারি যেন নয়া রেসিডেন্ট সাহেব নেন, আমি বলে দেব।’

‘শুনেছি স্ক্র্যাফটন সাহেবের ছুটি হয়ে গিয়েছে।’

‘জি হুজুরাইন। নতুন রেসিডেন্ট হয়েছেন ওয়ারেন হেস্টিংস।’

‘নয়া রেসিডেন্ট সাহেবকে আমার সেলাম জানাবেন।’ অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন মণি বেগম।

‘আমি বলে দেব। আপনি মুর্শিদাবাদে ফিরলেই নয়া রেসিডেন্ট সাহেব যেন আপনার সঙ্গে মোলাকাত করেন।’ একটু থেমে ওয়াটস ফের বললেন, ‘একটা আরজি ছিল হুজুরাইন।’

‘বলুন।’

‘ক্লাইভ সাহেব অপেক্ষা করছেন কলকাতায়।’

‘তো?’

‘নবাব ফওরান যদি কলকাতা রওনা হন তো খুব ভালো হয়। আমরা তো বারবার কথাটা তুলছি। নবাব কানেই নিচ্ছেন না।’

মণি বেগম বললেন, ‘আপনারা যা চাইছেন, তাই হবে। নবাব যাতে তুরন্ত এখান থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন সে বন্দোবস্ত আমি করে দিচ্ছি। তবে কী বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা হল তা নিজামতের কোনও ওমরাহ যেন জানতে না পারেন।’

‘আমার উপরে আপনি ভরসা রাখতে পারেন।’ এই বলে ফের বেগম সাহেবাকে তসলিম জানিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন ওয়াটস।

‘মণি বেগম আপনাদের দোস্ত—কথাটা ইয়াদ রাখবেন।’

ঘুরে তাকিয়ে ওয়াটস বললেন, ‘জি হুজুরাইন।’

বেশ হালকা মেজাজে ফৌজদারের কেল্লা থেকে বেরিয়ে এলেন ওয়াটস। বেশ কিছুদিন ধরে কানাঘুষোয় তিনি শুনে আসছেন, নিজামতের উপরে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন মণি বেগম। হিরাঝিলের অলিন্দে, চেহেল সেতুনের আনাচেকানাচে আলোচনা হয়, কিছুদিনের মধ্যেই নাকি নিজামতের রাশ তিনি হাতের মুঠোয় নেবেন। এই জেনানা অতীব বুদ্ধিমতী। দ্বিতীয় নূরজাহান বেগম হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখেন। মণি বেগমের সঙ্গে আজ কথা বলে ওয়াটসের মনে হল এই সব গুঞ্জন সম্পূর্ণ মিথ্যে নয়। আর তিনি যদি সত্যিই ইংরেজদের সাচ্চা দোস্ত হয়ে ওঠেন, তাতে খুবই সুবিধা হবে কোম্পানির। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের ক্যাম্পে ফিরছিলেন ওয়াটস। সহসা পালকি বাহকেরা সরে গেল রাস্তার এক পাশে। উলটো দিক থেকে তীব্র গতিতে ছুটে আসছে একদল ঘোড়সওয়ার।

পালকি থেকে মুখ বাড়িয়ে ওয়াটস দেখলেন, গভর্নর বিসডামের নেতৃত্বে পথের ধুলো উড়িয়ে হুগলির কেল্লা অভিমুখে ছুটে চলেছে ডাচ প্রতিনিধিদল।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *