পলাশির পরে – ৬০

৬০

আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘের আগ্রাসী বিস্তার। দিনের বেলাতেই চারিদিকে যেন আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। বৃষ্টি নেমেছে সকাল থেকে। শ্রাবণের ক্লান্তিহীন একঘেয়ে ধারাবর্ষণে ভিজছে ঢাকা শহর। ভিজছে জিঞ্জিরা প্যালেস। অলস, নিশ্চিন্ত, নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে একটা বুরুজের মাথায় বসে ভিজছে কয়েকটা কাক। এই ধারাপাত নিয়ে কোনও হেলদোল তাদের নেই।

বর্ষায় ফুলেফেঁপে উঠে ফুসছে বুড়িগঙ্গা। চঞ্চল জলরাশি ছলাৎছলাৎ শব্দে ধাক্কা মারছে নদী গর্ভের কিনারা থেকে উঠে আসা প্যালেসের বিরাট চওড়া, পাথর গাঁথা প্রাকারের গায়ে। দোতলায় একটি কক্ষ সংলগ্ন ক্ষুদ্র অলিন্দে একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছেন শরফ উন্নেসা—আলিবর্দির বেগম, সিরাজের নানি বেগম। চেয়ে আছেন কালো মেঘে ছাওয়া বর্ষণমুখর আকাশের পানে।

নানি বেগমের শরীরটা গত কয়েক মাসে অনেকটা ভেঙেছে। কালির প্রলেপ পড়েছে চোখের নীচে। মাথার চুল রুক্ষ। দেহভঙ্গিতে স্পষ্ট অবসাদের ছাপ। নানি বেগম আজ যেন মৃতকল্প এক মহীরুহ। শিকড় উপড়ে চিরতরে মাটিতে আশ্রয় নেওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনে চলেছেন।

কেন এই গর্দিশ? কেন এই বদ-কিসমতি? কেন এই দুঃখ-জহমত? কেন রাতারাতি হারিয়ে গেল সব খুশি? কেন বেরং হল জিন্দেগি? কেন অচানকই বরবাদ হয়ে গেল নবাব আলিবর্দি খাঁর খানদান? কার পাপে? কার অভিশাপে? বোবা করুণ চাহনিতে আকাশের দিকে চেয়ে সর্বশক্তিমান পয়গম্বরের কাছে জবাব মাঙেন শরফ উন্নেসা। তিনি ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত। দুঃসহ স্মৃতির বোঝা মাথায় নিয়ে দেহটাকে যেন শুধু শুধু বয়ে নিয়ে চলেছেন। অর্থহীন এই দিন গুজরান। মাটি নিয়ে রেহাই পেয়েছেন আলিবর্দি খাঁ। তাঁর কি কোনও নিস্তার নেই?

সহসা আকাশে গুমরে ওঠে মেঘরাশি। নানি বেগম চমকে ওঠেন। সেদিন রাতেও আকাশ এমনই গুমরে গুমরে উঠছিল, বুড়িগঙ্গার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দমকা হাওয়ায় হঠাৎই যেন নানি বেগমের কানে ভেসে আসে নিষ্পাপ কিশোর মির্জা মেহেদির আর্তনাদ—‘নানি বেগম আমাকে বাঁচাও। ওরা আমাকে খতম করবে।’ জহ্লাদের মতো দুই সেপাই মির্জাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে চলে গেল। রক্ত রক্ত—শুধু চাপ চাপ রক্ত। পাষাণের মেঝের উপরে পড়ে আছে রক্তস্নাত একটা নিথর দেহ। কে পড়ে আছে ওভাবে? ওই তো মির্জা! চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পাশে দাঁড়িয়ে শুঁড় দোলাচ্ছে পাহাড়ের মতো বিশাল একটা হাতি। মিরনের নির্দেশে হাতি দিয়ে পিষে মারা হয়েছে মির্জাকে। কি বীভৎস! কী ভয়ংকর!

‘হে আল্লা—কোন গুণাহের কাজ করেছিল মির্জা? আমি ইনসাফ চাই।’ আকাশের দিকে মুখ তুলে চিৎকার করে ওঠেন নানি বেগম। তারপর মাথা ঠুকতে থাকেন পাথরের দেওয়ালে।

ছুটে আসেন জেনেতুন্নেসা। মুর্শিদকুলি খাঁর কন্যা, শরফরাজ খাঁর আম্মিজান। এই প্যালেসেরই একতলার বাসিন্দা। বেনসিব এক জেনানা। তাঁর কথা মনে রাখেনি মুর্শিদাবাদ। দুঃখে-শোকে পাথর হয়ে যাওয়া জেনাতুন্নেসা বেগম ধীরে ধীরে মেনে নিয়েছেন নিজের বদ-কিসমতি। মাঝে মাঝেই দোতলায় আসেন, নানি বেগমের খোঁজখবর নিয়ে যান।

‘কী করছ? এ কী করছ বহেন? শান্ত হও।’

শরফ উন্নেসাকে পরম স্নেহে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে তার হাত বোলাতে থাকেন জেনাতুন্নেসা। ‘শান্ত হও বহেন শান্ত হও। নসিব বড় আজিব চিজ। সে তো তোমার আমার মুঠোবন্দি গোলাম-বাঁদি নয়, কেঁদে কী করবে বলো? তোমার আঁসুর কিম্মত কেউ বুঝবে না। এ দুনিয়া সঙ্গদিল।’

‘তোমার খুশি বরবাদ করেছিলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। তাই আমার এই কিসমতি। রহেম করো দিদি, রহেম করো।’ হাহাকার করে ওঠেন নানি বেগম।

জেনাতুন্নেসা শান্ত গলায় বলেন, ‘ইনসান মামুলি এক চিজ। পয়গম্বরের যা খায়েশ, তাই হয়েছে। ঘরে চলো বহেন। জিন্দেগি স্রেফ এক সুনহারি খোয়াব নয়, সিদ্দত-জহমত-বেনসিবি-বদকিসমতি এই সব সয়েই দিন গুজরান করতে হয়।’

এই দেলাসায় খানিকটা শান্ত হন শরফ উন্নেসা।

বুড়িগঙ্গার যে পাড়ে ঢাকা শহর তার বিপরীত পাড়ে অবস্থিত জিঞ্জিরা প্যালেস। শহরের কোলাহল থেকে দূরে নির্জন নিরিবিলি এক স্থান। এখানে তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়েছে বুড়িগঙ্গা। সংলগ্ন তটভূমি সবুজে মোড়া, দ্বীপাকৃতির। একদা এখানেই আমোদফূর্তির জন্য হাভেলি গড়েছিলেন সুবাদার ইব্রাহিম খাঁ। হাভেলি থেকে ঢাকা শহরে আসা যাওয়ার জন্য বুড়িগঙ্গার উপরে গড়ে তোলা হয়েছিল কাঠের সাঁকো। সেই সাঁকো এখনও অটুট আছে। তবে ইব্রাহিম খাঁ ও পরে ঔরঙ্গজেব বাদশার নাতি আজিমুশ্বানের অতিপ্রিয় এই হাভেলি এখন এক হাবুজখানা।

গিরিয়ার যুদ্ধে মারা গেলেন মুর্শিদকুলি খাঁর দৌহিত্র, সুবে বাংলার তৎকালীন নবাব সরফরাজ খাঁ। সিরাজের মতোই ওমরাহ, জমিদার ও দেশি বেনিয়ানদের চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন তিনি। সেবার সাজিশের কারবারিদের বাজি ছিলেন আলিবর্দি খাঁ। সরফরাজ খাঁকে মসনদচ্যুত করার জন্য পাটনার ডেপুটি সুবাদার আলিবর্দিকে উত্তেজিত করে তুলেছিলেন ষড়যন্ত্রীরা। সসৈন্যে পাটনা থেকে এগিয়ে এলেন আলিবর্দি। গিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে গোলা এসে লাগল সরফরাজ খাঁর মাথায়। তিনি হাতির পিঠ থেকে ছিটকে পড়লেন মাটিতে। গাদেলার উপর শায়িত নবাবের নিথর দেহটা নিয়ে রাতের অন্ধকারে চুপিসারে চেহেল সেতুনে ফিরে এল হাতি। এ দৃশ্য দেখে আর্তনাদ করে উঠছিলেন নবাবজননী জেনাতুন্নেসা। পুত্রশোকে কাতর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ সেদিন চেহেল সেতুনের বোবা পাথরে প্রতিধ্বনিত হয়ে বিষাদঘন আবহ রচনা করেছিল। মসনদে বসে শরফরাজ জননীকে জিঞ্জিরা প্যালেসে নির্বাসিত করলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। সেই থেকে জেনাতুন্নেসা ও সরফরাজ খাঁর খানদানের বাকি সদস্যরা এখানে বন্দি হয়ে আছেন।

আলিবর্দির হাতে মওত হয়েছিল সরফরাজের। মুসিবত হয়েছিল, মুর্শিদকুলি ও সুজাউদ্দৌলার রক্তের সম্পর্কের উত্তরাধিকারীদের। তবে এ নিয়ে আলিবর্দি বা তাঁর পরিবারের কারও উপর নফরতি নেই জেনাতুন্নেসা বেগমের। নফরতি-কেরাহিয়াত এসবের উর্দ্ধে চলে গিয়েছেন তিনি। মেনে নিয়েছেন এই সারসত্য—এ দুনিয়া চলে খোদাতালার খুশ খেয়ালে। ইনসান তাঁর হাতের পুতুল।

জমানা বদলেছে। গিরিয়ার পর ফির ইনকিলাব হয়েছে মুর্শিদাবাদে। জেনাতুন্নেসার মতো আজ আলিবর্দির বেগম ও দুই বেটিও একই হাভেলিতে বন্দি। নসিবের কী পরিহাস!

দেওয়ালে মাথা ঠুকতে থাকা নানি বেগমকে কক্ষের অন্দরে টেনে নিয়ে এসে পালঙ্কে শুইয়ে দিলেন জেনাতুন্নেসা। হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন তাঁর কপালে।

.

দেওয়ালজোড়া মস্ত বেলজিয়ান কাচের আরশির সামনে একাকী দাঁড়িয়ে আছেন ঘসেটি বেগম। স্তনযুগল অনাবৃত। ঘসেটি বেগমের দৃষ্টি নিবদ্ধ আরশিতে। সম্মোহিতের মতো চেয়ে আছেন নিজের প্রতিবিম্বের দিকে। কোমরে জড়ানো একখানা স্বচ্ছ মসলিনের কাপড়। কোমরের বাঁধন আলগা করে দিলেন বেগম সাহেবা। গা পিছলে কাপড়া খসে পড়ল ফরাসের উপরে। নিজের নিরাবরণ দেহের দিকে চেয়ে রইলেন বেগম সাহেবা। তারিফির ভাষা ফুটে উঠল চোখে।

মধ্যতিরিশে পৌঁছেছেন ঘসেটি বেগম। শরীরের বাঁধন এখনও এতটুকু টোল খায়নি। অসামান্য রূপ, হুকুমতের তাগদ, একাধিক পুরুষের সংসর্গ, বিত্তসুখ এ জিন্দেগিতে প্রায় সবকিছুই পেয়েছিলেন তিনি, অনেক জেনানাই যা পায় না এক জনমে। লেকিন নসিবের খেয়ালে হারিয়েছেন প্রায় সবই। শুধু রয়ে গিয়েছে এই দেহ, এই রূপরাশি। নিজের এই শেষ সম্পদটুকুকে আগলে রাখতে চান, হয়তো সেকারণেই ইদানীং রূপচর্চা ও প্রসাধনের প্রতি বাড়াবাড়ি রকমের ঝোঁক হয়েছে তাঁর। অনেকে বলে তিনি উন্মাদ দশাগ্রস্ত। কথাটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। দীর্ঘদিন হতাশা ও অবসাদে ভুগতে ভুগতে ঘসেটি বেগম খানিকটা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছেন। সারাক্ষণই বিচরণ করেন এক কল্পনার জগতে। ভয়ানক উগ্রসুন্দর রূপে নিজেকে সাজিয়ে তুলে অপেক্ষা করেন কোনও এক আশিকের জন্য। অলিন্দে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকেন পথের পানে। প্রত্যাশা করেন, ঘোড়া হাঁকিয়ে আসবে কোনও সুপুরুষ ওমরাহ। কেউ আসে না। আসার কথাও নয়। ফের তিনি হতাশায় নিমজ্জিত হন। তখন শরাবের নেশায় ডুবে গিয়ে মনের ইলাজ করেন।

জিঞ্জিরা প্যালেসকে আজকাল কখনও কখনও মোতিঝিল বলে ভুল করেন ঘসেটি বেগম। তখন ফিরে আসে নবাবজাদির মেজাজের পুরোনো ঝাঁঝ। অস্থির হয়ে কোড়া হাতে পদচারণা করেন ঘরের মধ্যে। রাজবল্লভের পথ চেয়ে প্রতীক্ষা করেন। একদা রাজবল্লভ ছিলেন তাঁর দেওয়ান। অলীক কল্পনায় ভাসতে ভাসতে বেগম সাহেবা ভাবেন, মসনদ ফিরে পাওয়ার কোনও উপায় বাতলাতে রাজবল্লভ ছুটে আসবেন তাঁর কাছে। শোনাবেন খুশির খবর। ফের নসিবের চাকা ঘুরবে। বাঁদিরা কানাকানি, ফিসফাস করে, বেগম সাহেবার দিমাগ ঠিক নেই।

সারা দেহে সুগন্ধি তেল মাখলেন ঘসেটি বেগম। স্তনের উপরে ও কেশবিহীন বাহুমূলে ছিটিয়ে দিলেন গোলাপজল, আতর। ময়ূরকণ্ঠী রঙের কাঁচুলি আটোসাটো করে বাঁধলেন বুকে। ত্বকের সঙ্গে এঁটে বসা সাদা রঙের পেশোয়াজের উপরে পরলেন প্রায় পা অবধি লুটিয়ে পড়া আসমানি রঙের ঘাগরা। চোখে লাগালেন সুরমা, কাজল। ভুরু আঁকলেন যত্ন করে। তাম্বুলে রাঙা করলেন ঠোঁট। কপালে পরলেন বিন্দিয়ার টিপ। জরির ফিতে দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চুল বাঁধলেন খুব যত্ন করে। চুলে গুঁজলেন কদম ফুল। হাতে লাগালেন মেহেন্দি। এরপর সোনা, হিরে, চুনি, পান্নার বহুমূল্যবান গয়না পরে, কাঁচুলির উপরে উড়নি বিছিয়ে আরশির সামনে এসে ফের যখন দাঁড়ালেন, গোটা আরশি যেন রূপের জলুসে ঝলমল করে উঠল।

কড়া নাড়ার আওয়াজ হল দরজায়। এ আওয়াজ ঘসেটি বেগম চেনেন। একমাত্র খাস বাঁদি মেহেরেরই অধিকার আছে বেগম সাহেবার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার। খুব জরুরি কোনও দরকার না থাকলে মেহের বিরক্ত করে না। কী হল?

দরজা খুললেন ঘসেটি বেগম।

তসলিম জানায় মেহের।

‘কী হয়েছে?’ খানিকটা বিরক্তির সুর ধরা পড়ে ঘসেটি বেগমের গলায়।

‘গোস্তাকি মাফ করবেন মালকিন। রাজবল্লভ দূত পাঠিয়েছেন মুর্শিদাবাদ থেকে। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। বললে বহুত জরুরি বাত।’ চাপা গলায় বলে মেহের।

খুশিতে হঠাৎই উচ্ছল হয়ে ওঠেন ঘসেটি বেগম। রাজবল্লভ দূত পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে! কী পয়গাম? তাহলে কী এতদিন ধরে যে একিন ও ইরাদা নিয়ে তিনি ইন্তেজার করছিলেন, তা সত্যি হতে চলেছে? ফের ইনকিলাব হবে মুর্শিদাবাদে?

ঘসেটি বেগম প্রবল উৎকণ্ঠার সঙ্গে বলেন, ‘জলদি তাকে ডেকে নিয়ে আয় অন্দরে।’

বেহেস্তের ফেরেস্তার মতো দেখাচ্ছে তার মালকিনকে। মেহের মুগ্ধনেত্রে তাকিয়ে থাকে মালকিনের মুখপানে।

‘হাঁ করে দেখছিস কী? যে এসেছে তাকে জলদি নিয়ে আয়।’

হুঁশ ফেরে মেহেরের। ‘জি হুজুরাইন।’

খানিকবাদে বোরখা পরিহিতা এক আগন্তুককে অন্দরমহলে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেয় মেহের।

সন্তর্পণে কক্ষের দোর বন্ধ করে দেন ঘসেটি বেগম।

মুখের অবগুণ্ঠন সরায় আগন্তুক।

‘ব-ক-র আ-লি!’ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে ঘসেটি বেগমের দুই চোখ।

‘জি হুজুরাইন! সেলাম!’

আলিবর্দির জমানায় নিজামত কেল্লার দেওয়ানের অধীনে নোকরি করত বকর আলি। ঘসেটি বেগমের খুবই পরিচিত। বেগম সাহেবা শুধোলেন, ‘কী পয়গাম এনেছ বকর ভাইয়া?’

‘পয়গাম শুভ হুজুরাইন।’ মুচকি হাসে বকর আলি।

‘সচ?’ উৎসাহিত হয়ে ওঠেন ঘসেটি বেগম।

বকর আলি বলে, ‘আমি অনেক মেহেনত করে নবাব ও নবাবজাদার নজর এড়িয়ে এখানে এসেছি। হাতে ওয়াক্ত খুবই কম। আপনাকে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যেতে এসেছি হুজুরাইন।’

‘মুর্শিদাবাদ?’

‘জি হুজুরাইন।’

‘সচ বলছ বকর ভাইয়া?’ আবেগে গলা কেপে যায় ঘসেটি বেগমের।

‘আমি এসেছি রাজবল্লভজির হুকুমে। তার সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া হয়েছে কোম্পানির।’

‘কী বোঝাপড়া? জলদি বলো।’ ঘসেটি বেগম অধীর হয়ে ওঠেন।

‘ইদানীং নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন নবাব খাঁ সাহেব। নবাবজাদা মিরন নাদান, নালায়েক। থমকে গিয়েছে নিজামতের কাজ-কারবার। সওদা চালাতে গিয়ে ভয়ানক তকলিফের মধ্যে পড়তে হচ্ছে ইংরেজ কোম্পানিকে। মুর্শিদাবাদে ফির ইনকিলাব ঘটাতে চান ক্লাইভ। তিনি চান আপনিই নিজামতের রাশ ধরুন। আপনি নবাব আলিবর্দির বড়ি বেটি। আপনার চেয়ে মসনদের বড় দাবিদার আর তো কেউ নেই হুজুরাইন।’

প্রবল আবেগে বকর আলির হাতটা চেপে ধরেন ঘসেটি বেগম। বলেন, ‘আল্লার নামে কসম খেয়ে বল তুমি সচ বলছ বকর ভাইয়া?’

বকর আলি মুচকি হেসে বলে, ‘বহুকাল নবাব আলিবর্দি খাঁর নিমক খেয়েছি। তার বড়ি বেটির সঙ্গে নিমকহারামি তো করতে পারি না।’

খুশিতে উদ্বেল হয়ে ঘসেটি বেগম ছুটে যান পাশের কক্ষে। একমুঠো আশরফি নিয়ে ছুটে এসে বলেন, ‘এই নাও বকর। তোমার নজরানা। বহুত খুশির খবর শোনালে তুমি।’

আশরফিগুলো দ্রুত জেবের অন্দরে চালান করে বকর আলি বলে, ‘খুব সাবধান হুজুরাইন। কেউ যেন এ বিষয়ে কিছু জানতে না পারে।’

ঘসেটি বেগম বলেন, ‘তুমি নিশ্চিন্ত থাকো বকর ভাইয়া। আমি বেওকুফ নই।’

‘আজ রাতেই রওনা হতে হবে হুজুরাইন।’

‘আজই?’ ঘসেটি বেগম ভয়ানক উত্তেজিত।

‘দেরি হলে সব বানচাল হয়ে যেতে পারে।’

‘কিন্তু এই জিঞ্জিরখানা থেকে কী করে বেরোব ভাইয়া?’

‘তৈয়ার থাকবেন হুজুরাইন। আমি আসব জেনানার জালসাজিশে। গোপন সুড়ঙ্গপথে আপনাকে বের করে নিয়ে যাব এই হাবুজখানা থেকে।’

‘মেহেরকে আমি সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই।’

থমকে যায় বকর আলি। কী যেন ভাবতে থাকে।

‘মেহেরকে ভরসা করা যায়। অনেকদিন আমার কাছে রয়েছে।’

মুচকি হেসে বকর আলি বলে, ‘আপনার যা ইরাদা, তাই হবে হুজুরাইন। তবে কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, বাঁদিকে আগাম ভেঙে কিছু বলবেন না যেন।’

‘বুঝেছি ভাইয়া।’

‘আমি আসি। বান্দার কোনও গুস্তাকি হয়ে থাকলে রহেম করবেন হুজুরাইন।’

মুখের সামনে কালো আবরণটা নামিয়ে দিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায় বকর আলি।

দরওয়াজা বন্ধ করে ফের আরশির সামনে এসে দাঁড়ান। হর্ষে, উল্লাসে বন্ধ ঘরের মধ্যে একাকী উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন। বহুদিন পরে ঘসেটি বেগম এমন প্রাণ খুলে হাসলেন।

.

চোখের নীচে কালির প্রলেপ। বেশবাস মলিন। মাথার চুল এলোমেলো। জিঞ্জিরা প্যালেসে নিজের কক্ষ থেকে কখনও বেরোন না সিরাজদ্দৌলার আম্মিজান- আমিনা বেগম। কথা বলেন না কারও সঙ্গে। মাঝে মাঝে একাকী করুণ সুরে কাঁদেন। আফিং, গাঁজা, সিদ্ধি, ভাঙ, সিরাজি সব রকমের নেশার প্রতিই ইদানীং বড় বেশি রকমের ঝুঁকেছেন আলিবর্দির ছোটি বেটি। দিনের বেশির ভাগ সময় নেশায় বেসামাল হয়ে থাকেন। গতকাল রাতে ফরাসের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম যখন ভাঙল তখন প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে।

দুধে খুরমা ভিজিয়ে নিয়ে এসেছে বাঁদি। আমিনা বেগমের খেতে ইচ্ছে করে না কিছু। তবুও খেতে হয়। চামচে করে বাদিই মুখে তুলে দিচ্ছে খাবার। কয়েক চামচ খাওয়ার পর সবেগে মাথা নাড়েন আমিনা বেগম – ‘এসব নিয়ে যা। ভালো লাগছে না।’

‘বিকেল হতে চলল। কিছু খাওয়া হয়নি আপনার। খেয়ে নিন হুজুরাইন।’ বাঁদি জোর করে।

‘বলছি তো ভালো লাগছে না।’ চিৎকার করে উঠে আমিনা বেগম। হাতের এক ঝটকায় উলটে দেন বাঁদির হাতে ধরে রাখা দুধ-খুরমা ভর্তি পাথরের পাত্র।

ফরাস পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বাঁদি।

‘কী করে খাই বল দেখি? কতদিন খায়নি আমার সিরাজ, আমার মির্জা। ঘুমিয়ে আছে কবরে।’ এই বলে হঠাৎই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন আমিনা বেগম।

বাঁদির দুচোখও জলে ভরে ওঠে। কোন দেলাসায় শান্ত হবে তার হুজুরাইন, ভেবে পায় না।

নিজেকে সামলে নিয়ে দছমালে চোখ মোছেন আমিনা বেগম।

‘হ্যাঁ রে কোয়েল, মুর্শিদাবাদের কোনও খবর কানে আসে তোর? কে জানে কেমন আছে লুৎফা, কেমন আছে সায়েরা—’

‘সায়েরা খুশ তবিয়ত আছে হুজুরাইন। লুৎফা বেগমও সহি সালামত আছেন।’

সহসা পুরুষকণ্ঠ শুনে সচকিত হয়ে ওঠেন আমিনা বেগম।

চমকে উঠে ঘুরে তাকায় কোয়েলও।

দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে বকর আলি। হাতে একটা ডালি। তাতে উপচে পড়ছে বসরাই গুলাব।

চোখ কুঁচকে আমিনা বেগম বলেন ‘কে? মিরনের কাসিদ? খতম করতে এসেছ আমাকে?’

‘আমি বকর আলি। আপনার বান্দা। চিনতে পারছেন না ছোটি হুজুরাইন?’

‘বকর আলি? দেওয়ানখানার নোকর? মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছ?’

‘জি ছোটি হুজুরাইন। আপনার জন্য বসরাই গুলাব নিয়ে এসেছি। আপনি ভালোবাসেন।’ এই বলে গুলাবের ডালি আমিনা বেগমের সমুখে ফরাসের উপরে রাখে বকর আলি।

একটা গুলাব তুলে নিয়ে আমিনা বেগম হতাশ গলায় বলেন, ‘বরবাদ হয়ে যাওয়া এক জেনানার জন্য তুমি এত ফুল নিয়ে এসেছ বকর ভাই? ইয়াদ রেখেছ আমাকে?’

‘বহুকাল খিদমত খেটেছি আপনাদের। আমি কি আপনাদের ভুলতে পারি ছোটি হুজুরাইন?’

‘মুর্শিদাবাদের কথা বলো। কেমন আছে আমার সিরাজ? কেমন আছে মির্জা? লুৎফা রোজ ফুল ছড়িয়ে দেয় কবরে? চিরাগ জ্বালে?’

‘লুৎফা বেগম খোশবাগকে বেহেস্ত করে তুলেছেন। বড় শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন নবাব।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমিনা বেগম বলেন, ‘লুৎফা সাক্ষাৎ ফেরেস্তা। এক খুশনসিব আওরাত। তাই বোধ হয় কোনও হাবুজখানা কয়েদ করতে পারেনি ওকে।’

‘মুর্শিদাবাদে যাবেন ছোটি হুজুরাইন? নবাবের কবরকে জেয়ারত করে আসবেন।’

‘ইচ্ছে তো করে বকর ভাইয়া। লেকিন যাব কী করে?’

‘আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি?’

করুণ হাসি হেসে আমিনা বেগম বলেন, ‘মজাক করছ বকর ভাইয়া?’

‘মজাক নয় ছোটি হুজুরাইন। আমি সচ বলছি। মরহুম নবাবের নামে কসম খেয়ে বলছি।’

‘পরোয়ানা কোথায়? কী করে বেরোব এখান থেকে?’

‘পরোয়ানা আমি নিয়ে এসেছি ছোটি হুজুরাইন।’

অবাক চোখে বকর আলির দিকে তাকালেন আমিনা বেগম।

বকর আলি মুখে হাসির রেশ নিয়ে বলে, ‘আমি সচ বলছি। বিলকুল সচ।’

‘কী বলছ? সিরাজের কবর জেয়ারত করার পরোয়ানা দিয়েছেন খাঁ সাহেব?’

‘মিরজাফর খাঁ তো নামেই নবাব। ক্লাইভ সাহেবের খায়েশের গোলাম তিনি। হুকুমত দিয়েছেন ক্লাইভ সাহেব। নবাবের সাধ্য কী তা ইনকার করার? আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন খাঁ সাহেব। আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আরও একটা খুশির খবর আছে ছোটি হুজুরাইন। আর এখানে ফিরে আসতে হবে না আপনাকে। এখন থেকে মুর্শিদাবাদেই থাকবেন। রোজ নবাবের কবরে ফুল ছড়িয়ে, চাদর চড়িয়ে চিরাগ জ্বেলে দেবেন।’

‘ক্লাইভ সাহেবের অনেক মেহেরবানি।’ এই বলে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন আমিনা বেগম।

‘তৈরি থাকবেন ছোটি হুজুরাইন। আজ রাতেই রওনা হতে হবে। আমি এখন আসি।’

কান্না থামিয়ে আমিনা বেগম বলেন, ‘কত খুশির খবর নিয়ে এলে তুমি? কিন্তু বলো তো কী সওগাত দিই তোমাকে? আজ যে কিছুই আমার নেই।’

মাথা ঝুঁকিয়ে বকর আলি বলে, ‘আপনার খুশিই আমার সওগাত।’

একটু দাঁড়াও। এই বলে দ্রুত ভিতরের ঘরে গিয়ে দেরাজ খুলে সুন্দর কারুকার্য করা ছোট্ট একটা কাঠের পেটিকা নিয়ে আসেন আমিনা বেগম।

‘সিরাজের পছন্দের চিজ। তোমাকে দিলাম।’ এই বলে পেটিকা খুললেন আমিনা বেগম।

বকর আলির চোখ ঝলসে যায়। বাক্সের মধ্যে রয়েছে হিরকখচিত বহুমূল্যবান একটি আংটি।

‘তোমার ইনাম।’

হাত পেতে আংটিটা নিয়ে বকর আলি বলে, ‘আমি বোধ হয় এর যোগ্য নই ছোটি হুজুরাইন।’

কথাটা বলতে গিয়ে বকর আলির গলা কেঁপে যায়।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *