পলাশির পরে – ৫৯

৫৯

মুর্শিদাবাদ থেকে অগ্রদ্বীপ আসতেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন নবাব। পরিশ্রান্ত তাঁর সঙ্গীসাথীরাও। শ্রাবণের ভ্যাপসা গরমে সকলেরই হাঁসফাঁস অবস্থা। আপাতত এখানে দিন কয়েক বিশ্রাম নিয়ে তারপরে নবাব কলকাতার উদ্দেশে রওনা হতে চান। এতে মনে মনে খুশিই হয়েছেন ওয়াটস। হাতে কিছুটা সময় পাওয়া গেল।

নবাবের পরোয়ানা নিয়ে মুর্শিদাবাদে গিয়েছেন হেস্টিংস। কিন্তু এখনও ওদিক থেকে কোনও খবর নেই। ওয়াটসের ইচ্ছা, রায়দুর্লভকে সঙ্গে নিয়েই কলকাতায় রওনা হবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হল দেওয়ানজির পরিণতি, প্রাণে বাঁচলেন কিনা এ নিয়ে বেশ চিন্তায় রয়েছেন ওয়াটস।

রায়দুর্লভের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা আছে ওয়াটসসহ কোম্পানির অনেকেরই। সিরাজদ্দৌলার জমানায় রেসিডেন্টের পদে যোগ দেওয়ার পর মুর্শিদাবাদ দরবারের জটিল রাজনীতির সহি আন্দাজ পেতে ওয়াটসকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন রায়দুর্লভ। তাঁর মাধ্যমেই পলাশির ইকরারনামা, ইংরেজদের পাওনা-গন্ডার হিসেব নিকেশ চূড়ান্ত হয়েছিল। রায়দুর্লভের সৌজন্যে প্রত্যাশার তুলনায় কোম্পানি পেয়েছে অনেক বেশি। শুধু কোম্পানি কেন, কী ওয়াটস, কী স্ক্র্যাফটন দরবারের প্রাক্তন ও বর্তমান রেসিডেন্ট সাহেব দেওয়ানের কাছ থেকে গোপনে কম সওগাত, পেশকাস তো পাননি, তাই এমন উপকারী বন্ধুর জন্য স্ক্র্যাফটনের মতো ওয়াটসেরও দুর্ভাবনার শেষ নেই।

বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। অগ্রদ্বীপের জাহাজঘাটা সংলগ্ন এলাকায় বহু মানুষের সমাগম। আশেপাশের গ্রাম উজাড় করে এসেছে সাধারণ মানুষজন। এরা কেবল নবাবের কথা শুনেছে। চর্মচক্ষে কোনওদিন নবাবকে দেখেনি। নবাবের জলুস, রওশনের কহানি এদের কাছে খোয়াবের মতো। নবাবকে আজ একঝলক দেখে দেহাতের আনপঢ় মানুষেরা নিজের জীবনকে সার্থক করে নিতে চায়। দূর থেকে ভেসে আসছে তাদের হইহুল্লোড়ের শব্দ। কোড়া হাতে উত্তেজিত জনতাকে দূরে ঠেলছে সেপাই বরকন্দাজেরা।

আজ দুপুরে অগ্রদ্বীপে এসে পৌঁছেছেন নবাব। নদীর চরে বিরাট এলাকা জুড়ে তাঁবু গাড়ার কাজ প্রায় শেষের পথে। সন্ধের আগেই শেষ করতে হবে সব কাজ। সেই নিয়ে মুটেমজুরদের সীমাহীন ব্যস্ততা। নদীর তীরে নোঙর ফেলা মস্ত একখানা নৌকোর উপরে নহবত বসেছে। বাজছে সানাই। চরের উপরে তৈরি হচ্ছে রঙিন কানাতে ঢাকা অস্থায়ী রংমহল। রাতে মেহফিল বসবে। ঘাটের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে নদীর জল ও চরের বেশ কিছুটা এলাকা খুঁটি পুতে রংবেরঙের মোটা অস্বচ্ছ কাপড় দিয়ে ঘিরে নেওয়া হয়েছে। এই আবরুর আড়ালে বিবসনা সুন্দরীদের নিয়ে জলকেলিতে মেতেছেন নবাব। এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গুলতানিতে ব্যস্ত মোসাহেবের দল—অলস পরজীবী একদল মানুষ। রসুইখানা থেকে ছড়িয়ে পড়া পোলাও, দমপোক্ত, কাবাব, দুনিয়াজার স্বাদু গন্ধ ভুরভুর করছে বাতাসে। চরের উপর পসরা সাজিয়ে বসেছে গুলাব-গুলদস্তা, আতর, লস্যি, মালাইয়ের কারবারিরা। টাকার গন্ধ পেয়ে বেশ্যার দালালরাও এসে হাজির। তাদের সঙ্গে দরদস্তুরে ব্যস্ত অনেকে। সব মিলিয়ে যেন একখানা আস্ত মেলা বসে গিয়েছে নদীর চরে। অগ্রদ্বীপ তাজ্জব। ভিড় জমানো মানুষজন দূর থেকে জুলজুলে চোখে পর্যবেক্ষণ করছে সব কিছু। এই নবাবি মেজাজ, কেতা, রংঢঙের সঙ্গে এদের কোনও জান-পহেচান নেই।

বেশ উঁচুতে ঘাটের এক ছয়কোনা রানার উপরে দাঁড়িয়ে মনের মধ্যে একরাশ বিরক্তি নিয়ে নবাবের বাহিনীর আশরত-ফূর্তির আনজাম-আয়োজন লক্ষ করছিলেন উইলিয়াম ওয়াটস। ঠোঁটে গোঁজা চুরুট। কলকাতা রওনা হওয়ার পর থেকে নবাবের খরচের যা বহর দেখছেন ওয়াটস, তাতে তাজ্জব বনে যাচ্ছেন তিনি। এই আড়ম্বর দেখে কে বলবে যে নিজামতের তোশাখানায় টাকা নেই! নবাব দেউলিয়া হতে বসেছেন, টাকার চিন্তায় জেরবার, বকেয়া পড়ে থাকছে ইংরেজদের পাওনা, তবুও বাজে খরচে রাশ টানার কোনও তাগিদ তাঁর নেই।

মুর্শিদাবাদ থেকে অগ্রদ্বীপের দিকে ভেসে আসা কোম্পানির নৌবহর চোখের পর্দায় সহসা যদি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে—এই আশায় নবাবের ছাউনির উপর থেকে নজর সরিয়ে বারবার উত্তর মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন ওয়াটস। গলায় ঝোলানো দূরবিনে চোখ রাখছেন বারবার। তারপরে সেটা নামিয়ে রাখছেন হতাশায়। সব ঠিকঠাক থাকলে এতক্ষণে হেস্টিংস ও স্ক্র্যাফটনের তো চলে আসার কথা। আশঙ্কায় বুক দুরু দুরু করতে থাকে ওয়াটসের। দুশ্চিন্তা বেড়ে চলে।

সূর্য হারিয়ে গেল ঝাঁকড়া একটা অশ্বত্থ গাছের আড়ালে। পশ্চিমাকাশে নানারঙের খেলা। একটু পরেই আঁধার ঘনিয়ে আসবে। নদীর ঘাটের উপরে দেবদেবীর দেউল থেকে ভেসে আসছে ঘণ্টাধ্বনির শব্দ, কাসর-ঘণ্টা, ঢাকের আওয়াজ। গোপীনাথের মন্দির থেকে ভেসে আসছে হরি-সংকীর্তনের সুর। সেখানে এখন পূজা নিবেদনের সাড়ম্বর আয়োজন। পুজো দিতে গিয়েছেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। তিনিও নবাবের সঙ্গে চলেছেন কলকাতায়।

চুরুটটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আধপোড়া চুরুটটাকে ছুড়ে ফেলতে গিয়ে হঠাৎই সচকিত হয়ে উঠলেন উইলিয়াম ওয়াটস। মুটে-মজুরদের কোলাহল, বাতিকরদের হইচই, ঢাকের আওয়াজ, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, হরি-সংকীর্তনের সুরের সঙ্গে মিলেমিশে গেল দূর থেকে ভেসে আসা কোরাসে গাওয়া খুব পরিচিত একটি গানের সুর। গানের সঙ্গে বাজছে বিলিতি ব্যান্ড।

‘রুল ব্রিটানিয়া! ব্রিটানিয়া! রুল দ্য ওয়েভস।

ব্রাইটন্স নেভার, নেভার, নেভার শ্যাল বি স্লেভস…’

চকিতে ফের দূরবিনে চোখ রাখলেন ওয়াটস। কোনও ভুল নেই, ঘাটের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে গোটা কয়েক বজরা। প্রত্যেকটা বজরার মাথায় উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। এই নৌবহরের ঠিক মাঝখানে একটি বজরার মাথায় ইউনিয়ন জ্যাকের পাশে উড়তে থাকা বিশেষ একটি পতাকা দেখে ওয়াটস বুঝলেন ওটি রেসিডেন্ট সাহেবের বজরা।

তীব্র উত্তেজনায় ঘাটের রানা থেকে সরে এসে সারি সারি পৈঠা বেয়ে দ্রুত নীচের দিকে নামতে লাগলেন ওয়াটস। গানের মেজাজ ও জোশ বলছে ইংরেজরা যা চেয়েছিল তাই হয়েছে। তবুও স্ক্র্যাফটনের মুখ থেকে সব না শুনলে, রায়দুর্লভকে চোখে না দেখলে স্বস্তি নেই।

নৌকোঘাটে এসে দাঁড়ালেন ওয়াটস। খানিকবাদে হেলতে দুলতে বজরাগুলো ঘাটে এসে ভিড়ল। রেসিডেন্টের বজরার গলুইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে আছেন স্ক্র্যাফটন, হেস্টিংস ও রায়দুর্লভ।

হাসি ফুটল ওয়াটসের মুখে।

হাসি রায়দুর্লভ, স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংসের ঠোঁটেও।

দুই আঙুল তুলে ওয়াটসের উদ্দেশে ভিকট্রি চিহ্ন দেখালেন স্ক্র্যাফটন।

প্রবল আবেগে ও উচ্ছ্বাসে ওয়াটস হেড়ে গলায় এবারে গেয়ে উঠলেন—

‘রুল ব্রিটানিয়া! ব্রিটানিয়া! রুল দ্য ওয়েভস।

ব্রাইটন্স নেভার, নেভার, নেভার শ্যাল বি স্লেভস…’

রায়দুর্লভ ঘাটে পা রাখতেই এগিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে করমর্দন করলেন ওয়াটস।

জলে ভরে উঠল রায়দুর্লভের দুই চোখ। বললেন, ‘গোবিন্দজির অশেষ কৃপা হুজুর। তাই এখনও শ্বাস চলছে। আপনারাই আমার দেবতা। কী বলে যে আপনাদের—’

ওয়াটস বললেন, ‘আপনি আমাদের দোস্ত। ইন আওয়ার ব্যাড টাইমস বহুত মদত দিয়েছেন। আপনার জান বাঁচাতে পেরে আমরা খুশি। আর কোনও ভাবনা নেই, এবারে আরাম করুন।’

রসিকতার সুরে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘আপনি জিন্দা আছেন শুনলে নবাব বহুত খুশি হবেন।’

ওয়াটস হেসে বললেন, ‘আপনার অনারে মুজরোর আসর বসবে রাতে।’

হেসে উঠলেন রায়দুর্লভ। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার খুশি ঝলকাচ্ছে তাঁর চোখেমুখে।

ওয়াটস বললেন, ‘নাউ ইউ উইল বি আওয়ার নেবার ইন ক্যালকাটা।’

‘আমার খুশনসিব।’

‘ইউ মাস্ট অ্যাকনলেজ, ক্যালকাটা ইজ অ্যা বেটার সিটি দ্যান মুর্শিদাবাদ।’ বললেন ওয়াটস।

‘বেশক। ওখানে ফূর্তি-আশরতে এই বান্দার বাকি দিনগুলো দিব্যি কাটবে।’

‘চলুন।’ এই বলে দেওয়ানজিকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্প অভিমুখে এগিয়ে গেলেন ওয়াটস।

তীব্র স্নায়ুযুদ্ধের অন্তে ক্লান্তি গ্রাস করেছে স্ক্র্যাফটনকে। হেস্টিংসের উদ্দেশে বললেন, ‘আই অ্যাম ফ্যাটিগ্‌ড। ফিলিং টায়ার্ড। লেটস হ্যাভ অ্যা সুইম ইন দ্য রিভার।’

হেস্টিংস মুচকি হেসে বলেন, ‘গুড আইডিয়া। উইশ ফুলফিলমেন্ট হলে নেটিভ হিন্দুস নদীতে ডুব দেয়। দে ওয়রশিপ দ্য রিভার। উইস ফুলফিলমেন্ট তো আমাদেরও। উই হ্যাভ রেসকিউড রায়দুর্লভ। দেওয়ানজির সালামতির জিম্মেদারি নিয়েছিলেন ক্লাইভ। উই সেভড হিজ ফেস।’

‘দ্যাটস ট্রু। তবে আমি ভাবছি অন্য কথা। আই অ্যাম গেটিং এক্সহস্টেড। ওয়ান্ট টু বি রিলিভড ফ্রম দ্য রেসপন্সিবিলিটি অফ রেসিডেন্টশিপ।’

‘আপনার মতো এমন এফিসিয়েন্ট অফিসারকে ক্লাইভ সাহেব সহজে ছাড়বেন না।’

‘থাক ওসব কথা। আলো ফুরিয়ে আসছে চলো সাঁতার কেটে আসি।’

লম্বা কোট ও ঢোলা ব্রিচেস ছেড়ে এদেশি লোকেদের মতো কোমরে একখানা কাপড় কৌপিনের মতো করে জড়িয়ে খালি গায়ে স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস ঝাঁপিয়ে পড়লেন জলে।

সাঁতারে খুব দক্ষ হেস্টিংস। নিমেষের মধ্যে স্ক্র্যাফটনকে ছাড়িয়ে চলে গেলেন অনেক দূরে। একেবারে প্রায় মাঝ নদীতে।

মৃদুমন্দ গতিতে নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছে নবাব-বেগমের ময়ূরপঙ্খী বজরা। জানালায় ঝোলানো চিলমন পর্দার আড়াল থেকে নদীর শোভা উপভোগ করছিলেন মণি বেগম। হঠাৎ দেখলেন, সাঁতার কাটতে কাটতে বজরার দিকে এগিয়ে আসছে এক যুবক। জলের উপরে ভেসে থাকা মুখটা দেখে এই যুবককে মণি বেগমের কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকল। তাঁর ধমনীতে রক্ত চঞ্চল হল।

সে-ই কী? সুপুরুষ, সুদর্শন সেই যুবককে আড়াল থেকে একবার দেখেছিলেন মণি বেগম। ঘাড় অবধি লম্বা চুল। ছিপছিপে চেহারা। চোখা নাক। কটা চোখদুটো বড় সুন্দর। মুগ্ধ হয়েছিলেন মণি বেগম। নিবিষ্ট মনে তাঁর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বেগম সাহেবার মনে হচ্ছিল দেহ, মন সব কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে। সেদিন সে এসেছিল নবাবের সঙ্গে দেখা করতে। একজন গোলামের মুখ থেকে শুনেছিলেন, তাঁর নাম ওয়ারেন হেস্টিংস। কাশিমবাজার কুঠিতে থাকেন, দরবারের রেসিডেন্ট সাহেবের সহকারী।

বজরাটাকে দ্রুত ঘাটের দিকে একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুকুম করলেন মণি বেগম। ব্যস্ত হয়ে দাড় টানতে লাগল মাঝিমাল্লারা। বজরা সামান্য এগোতে মণি বেগম বুঝলেন সাঁতারে মগ্ন যুবক ওয়ারেন হেস্টিংসই। অপলক দৃষ্টিতে তাঁকে দেখতে লাগলেন মণি বেগম। তাঁর অজান্তে তাঁকে লুকিয়ে দেখা। মণি বেগম সহসা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলেন।

দূর থেকে স্ক্র্যাফটনের গলা ভেসে আসে। ‘ওয়ারেন কাম ব্যাক। ইট ইজ গেটিং ডার্ক।’

আলো অনেকটাই মরে এসেছে। ঘাটের দিকে সাঁতার দিয়ে বেগম সাহেবার বজরা থেকে দূরে চলে যেতে লাগলেন হেস্টিংস।

বজরার কক্ষ প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। আঁধার নামল মণি বেগমের মনেও।

একজন বাঁদি বাতি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে।

ঘাড় ঘুরিয়ে তার পানে চেয়ে বেগম সাহেবা বলেন, ‘বাতিটা নিয়ে যা।’

বাঁদি চলে যায়। জানলায় মাথা রেখে অন্ধকারে একাকী চুপ করে বসে থাকেন মণি বেগম।

.

আকাশের চাঁদ আজ প্রায় থালার মতো গোল। সামনেই পূর্ণিমা। জোছনায় ভিজছে চরাচর।

স্ক্র্যাফটনের বজরায়, দোতলার কক্ষ সংলগ্ন রেলিং দিয়ে ঘেরা খোলা ছাতে পার্টির আয়োজন। নিরাপদে রায়দুর্লভের কলকাতা যাত্রা নিশ্চিত করার খুশিতে সেলিব্রেশনে মেতেছেন স্ক্র্যাফটন, হেস্টিংস ও ওয়াটস। মাঝে একটা গোল টেবিলকে ঘিরে কুরসিতে বসেছেন তিন সাহেব। টেবিলের উপরে সাজান রয়েছে ওয়াইনের বোতল, পানপাত্র, বুনো হাঁসের রোস্ট, গ্রিন স্যালাড ও আনারস।

লঘু মেজাজে হাসি-ঠাট্টায় মেতেছেন তিনজনেই। অভিনয় করে ওয়াটস দেখাচ্ছিলেন রায়দুর্লভ অক্ষত অবস্থায় অগ্রদ্বীপে পৌঁছে গিয়েছেন—এই কথা শোনার পর নবাবের প্রতিক্রিয়া কীরকম হয়েছিল। টেবিলের উপরে জ্বলতে থাকা প্রদীপের মৃদু আলোয় ওয়াটসের অঙ্গভঙ্গি ভয়ানক মজাদার দেখায়। সশব্দে হেসে ওঠেন হেস্টিংস ও স্ক্র্যাফটন। ওয়াটসও যোগ দিলেন হাসিতে।

হাসি থামিয়ে ওয়াটস বলেন, ‘দ্য ওল্ড ডেভিল দেন জাস্ট কেম আউট অফ দ্য এনক্লোজার স্যাটিসফায়িং হিজ সেন্স অরগ্যানস আফটার ওয়াটার স্পোর্টস উইথ দ্য ন্যুড গার্লস। আই মেট হিম অ্যান্ড পুট মাই সাবমিশন।’

ওয়াইনের পানপাত্র হাতে নিয়ে স্ক্র্যাফটন বলেন, ‘ইউ স্পয়েলড হিজ সুইট ফিলিংস স্যার।’

‘ইউ আর রাইট।’ মুচকি হেসে চুরুটটা ঠোঁটে গুঁজলেন ওয়াটস। হঠাৎই কী একটা কথা যেন মনে পড়ে গেল তাঁর। চুরুটটা ঠোঁট থেকে ফের দুই আঙুলের ফাঁকে ধরে বললেন, ‘ও মাই গড! তোমাদের দু’জনের জন্যেই গুড নিউজ এসেছে ক্যালকাটা থেকে। চিঠির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।’

কৌতূহলী হয়ে ওঠেন স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস।

দ্রুত পকেট হাতড়ে দুটো চিঠি বের করেন ওয়াটস।

‘গভর্নরের মেমো। আজই পেয়েছি।’ এই বলে দু’জনের হাতে দু’টো চিঠি ধরিয়ে দেন ওয়াটস। তারপর বলেন, ‘ইউ আর রিলিভড মি. স্ক্র্যাফটন। নাউ ওয়ারেন উইল সিট ইন দ্য হট চেয়ার।’

হেস্টিংস ও স্ক্র্যাফটন দু’জনেরই চোখমুখ খুশিতে উজ্জ্বল হল।

চাকরিতে উন্নতির আনন্দ হেস্টিংসের মনে। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে মুর্শিদাবাদ দরবারের রেসিডেন্টের পদে তাঁর অভিষেক হতে চলেছে। পদের গুরুত্বের নিরিখে বয়সটা বড়ই কম। তবুও তাঁর উপরে ভরসা রেখেছেন ক্লাইভ। গর্বে হেস্টিংসের বুক ফুলে ওঠে।

অন্যদিকে দরবার রাজনীতির জটিল আবর্তে পড়ে জেরবার স্ক্র্যাফটনের আনন্দ সাফল্যের সঙ্গে রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের সময়কালটা শেষ করার। রায়দুর্লভকে অক্ষত অবস্থায় কলকাতা পাঠানোর জন্য ওয়াটসের হাতে তুলে দেবার মতো দুরূহ শেষ দায়িত্বও সুচারুভাবে শেষ করেছেন তিনি। ছুটিও মিলেছে স্ক্র্যাফটনের। ক্লান্ত শরীরটাকে ফের তরতাজা করে তুলতে হাওয়া বদলের উদ্দেশে কিছুদিনের জন্য মাদ্রাজে পাড়ি দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। ছুটি মঞ্জুর করেছেন ক্লাইভ। সেই সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত প্রিয় এই কলিগের কথা মাদ্রাজের নতুন গভর্নর জর্জ পোকককে কয়েক ছত্র লিখেও দিয়েছেন। সেই চিঠির কপি পাঠিয়ে দিয়েছেন স্ক্র্যাফটনকে।

পোকককে লেখা ক্লাইভের চিঠিটা পড়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন স্ক্র্যাফটন। এমন ভালোবাসা, এমন স্বীকৃতি কোনও উপরওয়ালার কাছ থেকে আগে কখনও তিনি পাননি। কর্নেল লিখেছেন, ‘…ডিয়ার মি. পোকক…লিউক স্ক্র্যাফটন ইজ অ্যা ইয়ং ফেলো অফ গ্রেট ওয়ার্থ অ্যান্ড হনার। ও মাদ্রাজে যাচ্ছে হাওয়াবদলের জন্য। আশা করি সমুদ্রের হাওয়ায় ওর স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। মুর্শিদাবাদ দরবারের রেসিডেন্ট হিসেবে হি স্পেন্ট অ্যা টাফ টাইম। ইন মাই ওপিনিয়ন হি ম্যানেজড কোম্পানিজ অ্যাফেয়ার্স ভেরি ওয়েল। বেঙ্গলের পলিটিক্স স্ক্র্যাফটন খুব ভালো বোঝে। ওর হেল্প আমার প্রয়োজন। ওর স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটিয়ে দ্রুত আমার কাছে আবার পাঠিয়ে দেবেন।…’

হাতে ধরা পানপাত্র নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন সেরে নিলেন হেস্টিংস ও স্ক্র্যাফটন।

ওয়াটস বললেন, ‘গভর্নর চাইছেন কুইক চার্জ হ্যান্ডওভার।’

‘ইয়েস স্যার।’ একসঙ্গে বলে উঠলেন স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস।

‘নাউ লেট আস সেলিব্রেট। চিয়ার্স।’

‘চিয়ার্স।’

‘চিয়ার্স।’

খানাপিনা শেষ হল অনেক রাতে। টলমল পায়ে নিজের তাঁবুতে ফিরে গিয়েছেন ওয়াটস। মদের নেশায় বেহেড স্ক্র্যাফটন এলিয়ে পড়ে আছেন ছাতের উপরেই। বেহুঁশ। বজরার ছাতের রেলিং ধরে একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছেন হেস্টিংস। মৌতাতে ঝিমঝিম করছে মাথা। হেস্টিংসের গুণ হল প্রচুর মদ্যপান করলেও চট করে বেসামাল হন না। সচল থাকে মাথাটা। নদীর শীতল বাতাস বেশ ভালো লাগছিল হেস্টিংসের। চারিদিক একেবারে প্রায় নিঝুম। শুধু নবাবের রংমহল থেকে এখনও ভেসে আসছে বাইজির গানের খুশ ইলহান মৃদু আওয়াজ।

কাশিমবাজার কুঠির ওয়্যারহাউস ইনচার্জ থেকে খুব অল্প সময়েই মুর্শিদাবাদ দরবারের রেসিডেন্ট। চাকরিতে দ্রুত উন্নতি চেয়েছিলেন হেস্টিংস। যা চেয়েছিলেন তাই হয়েছে। হঠাৎই মেরির কথা মনে পড়ে হেস্টিংসের। তার পদোন্নতির খবরটা শুনলে খুব খুশি হবে মেরি।

এই মুহূর্তে মেরিকে খুবই মিস করছেন হেস্টিংস। মাঝে মাঝেই মেরি বলতেন, ‘কোম্পানির চাকরিতে তোমার যা ডেডিকেশন ওয়ারেন, দেখে নিও একদিন তুমি অনেক উপরে উঠবে। সেদিন অবশ্য আমি থাকব কি না জানি না।’

‘একথা বলছ কেন ডার্লিং?’ মেরিকে বাহুবন্ধনে জড়িয়ে শুধোতেন হেস্টিংস।

হেস্টিংসের বুকে মাথা রেখে মেরি বলতেন, ‘আমার ভয় করে ওয়ারেন। আই অ্যাম অ্যান ইল-ফেটেড লেডি।’ জল ছলছল করে উঠত মেরির দু’চোখে।

সত্যিই মেরি ভাগ্যবিড়ম্বিতা। তার ফার্স্ট হাজব্যান্ড ক্যাপ্টেন জন বুকানন মারা গেলেন ফোর্ট উইলিয়ামের অন্দরে অন্ধকূপে। সে বড় দুঃসময়। তারপরে ফলতার শিবিরে ভালোবাসার বন্ধনে ধরা পড়লেন মেরি বুকানন ও ওয়ারেন হেস্টিংস। দু’জনের বিয়ে হল ফলতাতেই। অস্থায়ী চার্চে। পুরোনো জীবন, পুরোনো স্মৃতি ভুলে নতুন ঘর বাঁধলেন মেরি। জীবন যে শুধু সামনে বয়ে চলে। পিছন পানে চাইতে নেই। পলাশির যুদ্ধের পর ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে মেরি চলে এলেন কাশিমবাজার কুঠিতে। সন্তানসম্ভবা হলেন মেরি। এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিলেন। আনন্দে মাতলেন দু’জনে। কিন্তু হঠাৎই ফের আঁধার ঘনিয়ে এল। জন্মের কয়েকদিন পরেই মারা গেল ওয়ারেন হেস্টিংস ও মেরি হেস্টিংসের প্রথম সন্তান। একরত্তি শিশুকন্যাকে নিজের হাতে গোর দিতে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন হেস্টিংস। কিছুদিনের জন্য বাক্যহারা হয়ে গিয়েছিলেন মেরি। তারপরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেন। তবে যে মেরি ঝরনার মতো উচ্ছল ছিলেন, বড্ড চুপচাপ হয়ে গেলেন।

চাঁদের রুপোলি আলোয় চিকচিক করছে নদীর জল। হেস্টিংসের দুই গাল বেয়ে জলের ধারা নেমে আসে। কোটের আস্তিনে চোখের জল মুছে দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন হেস্টিংস। মাঝ নদীতে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে মণি বেগমের ময়ূরপঙ্খী বজরা। সারি সারি দীপবর্তিকায় ফুটে উঠেছে জলযানটির অবয়ব। জোছনামাখা জলের বুকে এই আলোকমালার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হেস্টিংসের মনের পর্দায় ভেসে ওঠে একটা ছবি। শূন্য বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন মেরি। তাঁর কোলে শায়িত প্রাণহীন একরত্তি শিশুকন্যা। যেন ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎই হেস্টিংসের বুকের ভিতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল। বজরার রেলিঙে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *