পলাশির পরে – ৫৮

৫৮

মিরনের সেপাইদের হাতে ধরা পড়ে গেলেন রায়দুর্লভ।

সারারাত ধরে গোটা হাভেলি জুড়ে তাণ্ডব চালানোর পর ভোরের দিকে গুপ্ত সুড়ঙ্গপথের সন্ধান পেয়ে গেল সেপাইরা। সেখান থেকে তারা টেনেহিঁচড়ে বের করল রায়দুর্লভ ও তাঁর পুত্রদের। জেনানাদের বন্দি করে রাখা হল হাভেলির মধ্যেই একটা কক্ষে।

সেপাইরা ভেবেছিল দেওয়ানজির ধন-দৌলত জবরানে কেড়ে নেবে। কিন্তু তাদের সেই মনসুবা সফল হল না। মূল্যবান আসবাবপত্র, বহুত কিমতি কিছু ইস্পাহানি গালিচা, বেশ কয়েকটা বাহারি বেলজিয়ান ঝাড়বাতি, ও হারেমের কয়েকজন জেনানা ছাড়া রায়দুর্লভের হাভেলি ছেঁচে তেমন কোনও দৌলত পাওয়া গেল না। পাওয়ার কথাও নয়। বিপদ আন্দাজ করে বেশ কিছুদিন আগেই স্ক্র্যাফটন সাহেবের মদতে নিজের সঞ্চিত টাকা-কড়ি, সোনাদানা রায়দুর্লভ সরিয়ে দিয়েছেন কলকাতায়। নিজেও সরে পড়ার তালে ছিলেন কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।

ভোরের আলো সবে ফুটেছে। রায়দুর্লভের হাভেলির অদূরে নিজামত কেল্লায় বিশ্রাম নিচ্ছিল মিরন। তার ঘুম ভাঙিয়ে রাজবল্লভ জানালেন, ‘দেওয়ানজি গ্রেফতার হয়েছেন হুজুর।’

নবাবজাদার ঘুম ছুটে গেল এক লহমায়। তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে নেমে এসে খুশিতে নিজের গলায় ঝোলানো মূল্যবান একটা চুনি-পান্নার হার রাজবল্লভকে উপহার দিল মিরন।

নবাবজাদাকে তসলিম জানিয়ে বিদায় নিলেন রাজবল্লভ।

প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে মিরনের দুই চোখে। তীব্র উত্তেজনায় আরশির সমুখে দাঁড়িয়ে সে নিজের সঙ্গেই কথা বলে চলে—‘এবারে আপনাকে কে বাঁচাবে দেওয়ানজি? গত কয়েক মাস ধরে বড্ড পরেশান করেছেন আব্বাহুজুরকে, আমাকে। ইংরেজদের মদতে আব্বাহুজুরকে মসনদ থেকে ছুড়ে ফেলার খোয়াব দেখছিলেন। এখন কী হবে? নবাবজাদা সাদেক আলি যে কতটা সঙ্গদিল হতে পারে ধারণা নেই আপনার। মওত নাচছে আপনার মাথায়। কলিজা ফেটে খুন ঝরবে। সেই দৃশ্য দেখে শিউরে উঠবে তামাম মুর্শিদাবাদ। আর কেউ কোনওদিন নবাবের সঙ্গে গদ্দারি করবার কোশিস করবে না। আপনার অন্তিম কাল হাজির দেওয়ানজি। তৈয়ার থাকুন। আমি আসছি।’ ভয়ানক হিংস্র হয়ে ওঠা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে মিরন।

সেপাইরা টেনে হিঁচড়ে সুবে বাংলার ইমানদার দেওয়ানজিকে তাঁরই হাভেলির চৌহদ্দির বাইরে এনে ফেলেছে। একের পর এক কোড়ার আঘাত এসে পড়ছে পড়ছে রায়দুর্লভের দেহের উপরে। পোশাক ছিন্নভিন্ন। থেকে থেকে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠছেন রায়দুর্লভ। অকুস্থলে পৌঁছে এই দৃশ্য দেখে মিরন উল্লসিত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে ‘বহুত খুব। মারো বেতমিজকো। বহুত মারো।’

বাঁচার তাগিদে সামান্য বেতনের চাকুরে এই সেপাইদের কাছেই জোড়হাত হয়ে কাতর আর্জি জানিয়ে চলেছেন সুবে বাংলার মহামহিম দেওয়ান সাহেব। ক্রমাগত পিঠে এসে পড়ছে চাবুক। ভোরের নরম আলো রাজপথের উপর দিয়ে তখন গড়িয়ে যাচ্ছে। পথচলতি মানুষজন দূরে জমায়েত হচ্ছে একটু একটু করে। অবাক চোখে দেখছে সুবে বাংলার দাপুটে দেওয়ানের বেইজ্জতি।

চাবুক মারতে মারতে দেওয়ানকে এনে মিরনের সমুখে দাঁড় করাল সেপাইরা। দেহে যেন এক বিন্দু শক্তি নেই। কোনওরকমে দাঁড়িয়ে আছেন দুই পায়ের উপরে। চাবুকের ঘায়ে দেহের বেশ কিছু জায়গায় কালসিটে পড়েছে। রক্ত ঝরছে। ঝুঁকে গিয়েছে ঘাড়। মিরনের হিংস্র চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে থরথর করে কেঁপে উঠলেন রায়দুর্লভ। তারপর হাঁটু মুড়ে জোড়হাত হয়ে বসে পড়লেন মিরনের পায়ের কাছে।

পৈশাচিক উল্লাসে হেসে উঠল মিরন।

দড়িবাঁধা হাতদুটো জড়ো করে রায়দুর্লভ মিনতি করেন, ‘আমার কসুর মাফ করুন হুজুর।’

‘আরে বাঃ! কসুর আপনার কী হবে? আপনি তো ইংরেজদের দোস্ত আছেন। ক্লাইভ সাহেব আপনার মুরুব্বি। আপনি তো বহুত তাগদবাজ আদমি। ইতনে ডরতে কিঁউ হো?’

রায়দুর্লভ কেঁদে উঠে বললেন, ‘ভিখ মাঙছি আপনার কাছে। আমার জান বাঁচান হুজুর।’

ফের হেসে উঠে মিরন বলল, ‘লোকে বলে সাদেক আলি সঙ্গদিল। আজ সাবুত মিলবে।’

 ‘রহেম করুন হুজুর। রহেম করুন।’ হাহাকার করে ওঠেন রায়দুর্লভ।

‘দিনের পর দিন সেপাইদের বেতন না চুকিয়ে এদের ভুখা মারার মতলব করেছিলেন আপনি। চেয়েছিলেন ভুখা সেপাইরা চড়াও হোক নবাবের উপরে। খতম করুক তাকে। আপনি গদ্দার।’

‘না হুজুর না। ইয়ে ঝুটা ইলজাম। তোশাখানায় জেয়াদা টাকা নেই।’

‘খামোশ। ইয়ে ঝুট বাত। হারামি বুড্ডহা, ইবলিশ কা আওলাদ কাঁহিকা।’ এই বলে তীব্র নফরতির সঙ্গে রায়দুর্লভের মুখের উপরে একদলা থুতু ছুড়ে দিয়ে তাঁকে পা দিয়ে ঠেলে দেয় মিরন। জোব্বার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে নবাবজাদার পায়ের নাগরায় বসানো হিরের কুচিগুলো ঝকমকিয়ে ওঠে।

পথের উপরে চিৎ হয়ে পড়েন রায়দুর্লভ।

মিরনের চোখের ইশারায় রায়দুর্লভকে টেনেহিঁচড়ে ফের খাড়া করে দাঁড় করায় সেপাইরা। তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়ে পথের পাশে সদ্য পুঁতে রাখা এক শাল খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধতে থাকে। মনে মনে ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ করতে থাকেন রায়দুর্লভ। মিরন সঙ্গদিল। রায়দুর্লভ বোঝেন যে তিলে তিলে তাকে যন্ত্রণা দিয়ে মারবে মিরন। জহর আছে ডান হাতের অনামিকার আংটির আধারে। গোখরোর বিষ। নিমেষে সব যন্ত্রণার জ্বালা জুড়োতে দড়িবাঁধা হাতদুটোকে সামান্য তুলে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁত দিয়ে আংটির আধার খোলার জন্য উদ্যত হলেন রায়দুর্লভ।

ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল গুলির শব্দ। পর পর তিনবার। গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম!

থমকে গেলেন রায়দুর্লভ।

সহসা বন্দুকের আওয়াজ শুনে চমকে গিয়ে মিরন দেখল, শূন্যে গুলি ছুড়তে ছুড়তে নিজামত কেল্লার খেয়াঘাটের দিক থেকে দৌড়ে আসছে একদল গোরা পল্টন। নেতৃত্বে মুর্শিদাবাদের রেসিডেন্ট সাহেব—লিউক স্ক্র্যাফটন। পদাতিক সৈন্যদের পিছনে আসছে গোলন্দাজ বাহিনী।

কামানের নৌকো চরায় আটকে যাওয়ায় মুর্শিদাবাদে পৌঁছতে একটু দেরিই হয়েছে স্ক্র্যাফটনের। তিনি ভেবেছিলেন এ যাত্রায় দেওয়ানজিকে বোধ হয় আর রক্ষা করা গেল না। বেইজ্জত হবে কোম্পানি, বেইজ্জত হবেন ক্লাইভ। প্রবল উৎকণ্ঠায় ভুগেছেন স্ক্র্যাফটন। রায়দুর্লভের জান এখনও অক্ষত টের পেয়ে গোরা পল্টনদের নিয়ে আগ্রাসী মেজাজে তিনি ছুটে এলেন।

পলাশির পর থেকে নিজামতের সেপাইদের মধ্যে গোরা পল্টনভীতি ভয়ানক। পঞ্চাশ-ষাটজন গোরাপল্টনকে ছুটে আসতে দেখে ভয়ে গুটিয়ে গেল মিরনের সঙ্গে আসা কয়েকশো সেপাই। এ সেপাইরা কেউ মুর্শিদকুলি বা আলিবর্দির আমলের কুশলী যোদ্ধা নয়, লড়াইয়ের তরিকা-তরিবত না জানা, কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবককে ফৌজের নামে এক জায়গায় জড়ো করা। লড়াইয়ের কথা ভাবলেই এদের হাড়ে কাঁপন ধরে। তার উপরে সম্মুখে বেয়নেটধারী গোরা পল্টন।

ফৌজসহ স্ক্র্যাফটনের নাটকীয় অনুপ্রবেশে মিরন হতচকিত। সে বুঝল, মহা বেওকুফি করেছে সে। নগরে প্রবেশের মুখে সেনা মোতায়েন থাকলেও অরক্ষিত ছিল নদীপথ। ও পথেই এসেছে ইংরেজবাহিনী। ধূর্ত রায়দুর্লভ এবারেও গুপ্তচর মারফত তাঁর আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ তুরন্ত পাঠাতে পেরেছিলেন কাশিমবাজারে।

‘স্টপ দিস ক্রুয়েলটি। স্টপ ইট।’

যে সৈন্যরা রায়দুর্লভকে খুটির সঙ্গে বাঁধার আনজাম করছিল, বেয়নেট হাতে স্ক্র্যাফটনের হুঙ্কার শুনে ছিটকে সরে গেল।

মিরনের মনে হচ্ছিল স্ক্র্যাফটনের সামনে রুখে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমি নবাবজাদা। নবাবের অনুপস্থিতিতে নিজামতের শাসনযন্ত্রের জিম্মেদারি আমার হাতে। আমার কাজে বাধা দেওয়ার আপনি কে? এখানে যা ঘটছে তা নিজামতের অন্দর কি কিসসা। এর মধ্যে মাথা গলাতে কেন এসেছেন আপনারা? এখনই ফিরে যান। নয়তো আপনাদের কয়েদ করব আমি। আমার সেপাইরা এক সঙ্গে যদি আপনাদের উপরে ঝাপিয়ে পড়ে, নিমেষে আপনাদের হাত থেকে বন্দুক, তোপের গাড়ি সব কেড়ে নিতে পারে। গুলি ছুড়ে, তোপ দেগে কতজনকে মারবেন আপনারা?’

মনের মধ্যে এসব কথা গজগজ করলেও স্ক্র্যাফটনের আগুনে মেজাজের সামনে পড়ে স্তিমিত হয়ে গেল মিরনের খুনজোশি। তফরা-তকরারের সাহসই হল না। সেপাইদের মতো তারও ইংরেজভীতি কম নয়। আড়ালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে শেরের মতো তর্জনগর্জন করলেও ক্লাইভ, আয়ারকুট, স্ক্র্যাফট, হেস্টিংসের সম্মুখে সে চুহা।

স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে সেপাইরা। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। নবাবজাদার দিক থেকে কোনও নির্দেশ নেই। গোরা পল্টনেরা ছুটে এসে দড়ির বাঁধন থেকে মুক্ত করল রায়দুর্লভকে।

কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রবল আবেগে স্ক্র্যাফটনের পায়ে লুটিয়ে পড়ে রায়দুর্লভ বললেন, ‘আপনি সাক্ষাৎ দেবতা সাহেব! সাক্ষাৎ গোবিন্দজি। চিরকাল আপনার গোলাম হয়ে থাকব।’

রায়দুর্লভকে মাটি থেকে তুলে, তাঁকে গোরা পল্টনদের হেফাজতে দিয়ে মিরনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন স্ক্র্যাফটন। কৈফিয়ত তলবের সুরে উদ্ধত ভঙ্গিতে শুধলেন, ‘হোয়াট আর ইউ ডুয়িং হিয়ার? ফের দেওয়ানজির উপরে হামলা কেন?’

মিরন জবাব দেয়, ‘এতে আমার কোনও কসুর নেই।’

‘নবাব ইজ আউট অফ স্টেশন। ইউ আর রেসপন্সিবল ফর মেইনটেনিং ল অ্যান্ড অর্ডার। হাউ সাচ ইনসিডেন্ট অকারস ইন ফ্রন্ট অফ ইউ?’ স্ক্র্যাফটনের গলা আরও এক পর্দা চড়ে যায়।

‘সেপাইরা বেতন পায় না অনেকদিন। বেতন মেটানোর জিম্মেদারি দেওয়ানজির। সেপাইরা আজ নিজেদের পাওনা বুঝে নিতে চায়। তাই এই হামলা।’

‘হোয়াট ননসেন্স ইউ আর টকিং। সুবে বাংলার দেওয়ান একজন ইমানদার ইনসান। মামুলি কোনও মুজরিম নন। তার উপর এমন জুলমাত করা যায় না।’

‘সেপাইরা নাফরমান। আমার কথা শোনেনি।’

‘ইয়ে ঝুট বাত। তাদের ইন্সটিগেট করেছেন আপনি।’

আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল মিরন।

স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘আপনার হাতে জান খতরা দেওয়ানজির। মুর্শিদাবাদ ইজ নট সেফ ফর হিম। উই ওয়ান্ট টু সেন্ড হিম টু ক্যালকাটা।’

বেশ ফাঁপরে পড়ে গেল মিরন। রায়দুর্লভের হাভেলি ছেঁচে কোনও দৌলতের সন্ধান পাওয়া যায়নি। মিরনের আন্দাজ ব্যক্তিগত সম্পদ তো বটেই, সেই সঙ্গে নিজামতের তোশাখানা থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সরিয়ে কলকাতায় আগেই পাঠিয়ে দিয়েছেন রায়দুর্লভ। কলকাতায় পাড়ি দিলে তিনি নবাবের নাগালের বাইরে চলে যাবেন। ইংরেজদের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে বেঁচেছেন রাজারাম, একই কায়দায় রেহাই পেয়েছেন রামনারায়ণ, রায়দুর্লভও কি পার পেয়ে যাবেন?

মুখ তুলে স্ক্র্যাফটনের চোখের দিকে তাকিয়ে মিরন বলে, ‘নবাবের হুকুমত ছাড়া দেওয়ানজি মুর্শিদাবাদ ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না।’

মুচকি হাসলেন স্ক্র্যাফটন। ‘হুকুমত?’

সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে মিরন বলে, ‘নিজামতের কানুন এমনই। নবাবের পরোয়ানা জরুরি।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘ইন্তেজার করুন। পরোয়ানা আসবে।’

মুচকি হাসল মিরন। কলকাতার পথে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন নবাব। কী করে আদায় করবেন তাঁর পরোয়ানা? এবারে আপনাকে শূন্য হাতে ফিরতে হবে সাহেব। কিছুতেই রায়দুর্লভকে কলকাতায় যেতে দেবেন না নবাব। আপনি মুর্শিদাবাদ ছেড়ে কাশিমবাজারে ফিরলেই দেওয়ানজিকে খতম করব আমি। তরোয়ালের এক কোপে দেওয়ানজির মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা করে দেব। তারপর কাটা মুণ্ডুটা সওগাত পাঠাব আপনাকে। মনে মনে এসব ভাবলেও মুখে মিরন বলল, ‘বেশ। ইয়ে সহি তরিকা। আপনি নবাবের পরোয়ানা আনিয়ে দিন। আমি ইন্তেজার করছি।’

খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না মিরনকে। খানিকবাদে দেখা গেল ধুলোর ঝড় উড়িয়ে ছুটে আসছে কয়েকজন ঘোড়সওয়ার। একেবারে সম্মুখে এক ঘোড়সওয়ারের হাতে ধরা দণ্ডের মাথায় চরম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে উড়ছে কোম্পানির পতাকা।

স্ক্র্যাফটনের সম্মুখে এসে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামলেন হেস্টিংস। কোমরবন্ধনী থেকে গোটানো কাগজটা বের করে তিনি তুলে দিলেন স্ক্র্যাফটনের হাতে। তাতে চোখ বুলিয়ে মুচকি হাসলেন রেসিডেন্ট সাহেব, তারপর মিরনের সমুখে গিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ‘হুজুর, এই যে আপনার পরোয়ানা। পড়ে দেখুন।’

কাগজে চোখ বুলিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় মিরন। দেওয়ানজিকে কলকাতা যাওয়ার ইজাজত দিয়েছেন আব্বাহুজুর!

‘আমরা নিজামতের কানুনকে ইজ্জত করি। তাই ইন্তেজার করেছি। না হলে এতক্ষণে দেওয়ান সাহেবকে কলকাতার পথে রওনা করিয়ে দিতে পারতাম। আর এটাও মনে রাখবেন যে, রবার্ট ক্লাইভ যার সালামতির জিম্মেদারি নেন, তাকে খতম করা যায় না। এইসব বদখেয়াল ছেড়ে আপনি সহি তরিকায় নিজামতের দেখভাল করুন। এতে ভালাই হবে আপনারই।’

কথাগুলো ঝড়ের গতিতে বলে উলটো মুখে হনহন করে হাঁটতে লাগলেন স্ক্র্যাফটন। রায়দুর্লভের হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন নিজামত কেল্লার নৌকোঘাটের দিকে।

নবাবের পরোয়ানাটা হাতে নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে স্ক্র্যাফটন ও রায়দুর্লভের দূরে চলে যেতে থাকা শরীরী অবয়বের পানে চেয়ে রইল মিরন। অপমানে, রাগে, হতাশায় তার গা জ্বলতে লাগল। খানিকবাদে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত হাতির পিঠে চেপে বসল মিরন। এই বেইজ্জতির পর এখানে বেওকুফের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মানে আশেপাশে জমায়েত বেবাক আদমির হাসি-মজাকের খোরাক হয়ে যাওয়া।

হঠাৎই ভিড়ের মধ্যে থেকে মিরনের কানে উড়ে এল একটা কথা—‘বাহাদুর নবাবজাদা! স্রেফ ইংরেজ রেসিডেন্টের এক দাবড়ানিতেই ঘায়েল।’ কান গরম হয়ে উঠল মিরনের।

চকবাজারের পথ ধরে জাফরাগঞ্জ প্যালেস অভিমুখে ফিরে চলেছে হাতি। মিরনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে অবসাদ। অস্থির হয়ে আছে মন। হঠাৎই কোমরবন্ধনীতে গুঁজে রাখা ছোট্ট খাতাটার কথা ইয়াদ হল তার। মিরনের নিজের জবানে এ খাতার নাম ‘কাতিলনামা’। সেই সব ইনসানের নাম এই খাতায় লালকালিতে প্রথমে লিখে রাখে মিরন, যাদের সে খুন করে দোজখে পাঠাতে চায়। কাজ হাসিল হলে দাফনের পর মরহুম ইনসানের নামটা খাতা থেকে কালো কালিতে সে কেটে দেয়। ইতিমধ্যে ‘কাতিলনামা’ থেকে কাটা পড়েছে নিজামতের অনেক ওমরাহের নাম। মিরনের ইরাদায় তারা কেউ জিন্দা নেই। কালো কালিতে ঢাকা পড়েছে মির্জা মেহেদির নামটা। তবে রাজারাম, রামনারায়ণ, রায়দুর্লভের নাম এখনও লাল কালিতে অমলিন সেই খাতায়। আফশোস। বড় আফশোস। মিরন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎই তার চোখ আটকে কাতিলনামায় লিখে রাখা দু’টি নামের উপরে। দুশমনের খুন ঝরাতে না পারলে নবাবজাদার বেতাব দিলের চ্যায়েন হবে না।

.

নিজামত কেল্লার নৌকোঘাট থেকে রায়দুর্লভকে সঙ্গে নিয়ে বজরায় উঠলেন স্ক্র্যাফটন। জনা বিশেক গোরা পল্টনকে রেখে গেলেন রায়দুর্লভের হাভেলির পাহারায়। আপাতত দেওয়ানজির পরিবারের বাকি সদস্যদের সালামত রাখার জিম্মেদারি গোরা পল্টনদের হাতেই সঁপে দিয়েছেন রেসিডেন্ট সাহেব। পরে ধীরেসুস্থে তাদের পাঠানো হবে কলকাতায়।

মসনদকে কেন্দ্র করে তাগদ, প্রতিপত্তি, তাকাব্বুরির মোহ মুছে গিয়েছে রায়দুর্লভের মন থেকে। ফের মুর্শিদাবাদে ফিরে এসে নিজের জীবন বিপন্ন করতে তিনি চান না। বাকি জীবনটা পরিবারসহ ইংরেজদের আশ্রয়ে কলকাতায় কাটাবেন বলে মনস্থ করেছেন তিনি। অবশ্য কলকাতায় পাড়ি জমানোর ভাবনা অনেকদিন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মনের মধ্যে। তাই নিজের সমস্ত ধনদৌলত একটু একটু করে আগেই সরিয়ে দিয়েছেন কলকাতায়।

চলতে শুরু করল ইংরেজদের নৌবহর, ইংরেজদের বজরা, নৌকো, সুলুপের ঠিক মাঝখানে রয়েছে সুবে বাংলার দেওয়ান সাহেবের মকরমুখী বিলাসবহুল বজরা। এই বজরাই সরাসরি গিয়ে ভিড়বে ফোর্ট উইলিয়ামের জেটিতে। গলুইয়ের উপরে একাকী দাঁড়িয়েছিলেন রায়দুর্লভ। ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে মুর্শিদাবাদের সারি সারি হাভেলি, নিজামত কেল্লার বুরুজ, হিরাঝিল প্যালেস, জাফরাগঞ্জের প্রাসাদ। মরে আসছে দিনের আলো। ঘরে ফিরছে পাখির দল। হঠাৎই আসমান সমান ঠেলে ওঠা বিশাল এক ব্যর্থতার অনুভূতি দেওয়ানজির চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দেয়। সব কাজের শেষে ঘরে ফেরে মানুষ। জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি আজ ঘরছাড়া। যে নগরীতে বসে তামাম সুবে বাংলার উপরে প্রভুত্ব করার খোয়াব দেখেছিলেন, সেই মুর্শিদাবাদ শহর তাঁর পক্ষে এখন খতরনক।

উচ্চ রক্তচাপ ও বহুমূত্র রোগে শরীরটা ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে। যে ক’দিন বাঁচবেন সেই দিনগুলো সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কলকাতায় নিরুদ্বেগে শান্তিতে দিনগুজরান করতে চান রায়দুর্লভ। যাবতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তিনি দাফন করে এসেছেন মুর্শিদাবাদে। তবুও মনে ধন্দ। শান্তি মিলবে কি কলকাতায়? উত্তর জানা নেই।

দ্রুত এগিয়ে চলেছে নৌবহর। রায়দুর্লভের কানে ভেসে আসছে অসংখ্য দাঁড়ের আঘাতে নদীর বুক থেকে উত্থিত ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। চোখের নজর থেকে হারিয়ে গিয়েছে মুর্শিদাবাদ নগরী। অন্ধকার নামছে। ভাগীরথীর রুপোলি জলে কালচে রঙের ছোপ লেগেছে। দূরে পাড়ের সবুজেও কালি ঢেলে দিয়েছে কেউ। অচিরেই আঁধারের কালো চাদরে ঢাকা পড়বে চরাচর।

আকাশের দিকে মুখ তুলে শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন দেওয়ানজি। তাঁর মনকে তোলপাড় করে চলেছে অতীতের স্মৃতি। তাগদ, দৌলত, রওশন, জলুসের নেশায় সিরাজদ্দৌলাকে মসনদ থেকে হঠাতে মিরজাফর, জগৎশেঠের সঙ্গে দরবারি সাজিশিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভূমিকা ছিল বিশাল। ইনকিলাবের পূর্বে পলাশির ইকরারনামা তিনিই তো চূড়ান্ত করেছিলেন। কিন্তু ইনকিলাবের পরে দুবছরের মধ্যে তাঁর পরিণতি যে এমন হবে কে জানত? রায়দুর্লভ ভেবেছিলেন তাগদের জোশে ভাসবেন, গুমানিতে আশমানকে ছোঁবেন, মিরজাফর খাঁ’কে হাতের মুঠোয় রেখে সুবে বাংলার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে উঠবেন। কোথায় পূর্ণ হল সেই বাসনা? আজ ইংরেজদের কৃপায় কোনওরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চিরকালের জন্য পাড়ি জমাতে হচ্ছে কলকাতায়। মুর্শিদাবাদ ও জহান্নাম তাঁর কাছে এখন সমার্থক।

আকাশের মুখ ভার। হঠাৎই গুমরে উঠল মেঘ। রায়দুর্লভের মনে হল বেহেস্ত থেকে হেসে উঠলেন সিরাজ। নসিব কখন যে কী ভাবে ঘর বদলায়, তার আন্দাজ কেউ পায় না।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *