পলাশির পরে – ৫৭

৫৭

পথে আর কোনও গোলমাল হয়নি। হিরাঝিল প্রাসাদে এসে থামল পালকি। ভাদুরে গরমে গলদঘর্ম স্থূলকায় উইলিয়াম ওয়াটস পালকি থেকে বেরিয়ে এসে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। গলার কাছে গোলাপি চামড়ার গায়ে উমিচাঁদের আঙুলের ছাপ এখনও স্পষ্ট হয়ে আছে। দম প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছিল ওয়াটসের। গলায় হাত বোলালেন তিনি। এখনও বেশ ব্যথা রয়েছে। টনটন করছে ডান হাত ও কাঁধের সংযোগস্থল। মাটিতে পড়ে গিয়ে চোট লেগেছে।

ওয়াটসের আগমন সংবাদ নবাবকে আগেই চিঠিতে জানিয়ে রেখেছিলেন স্ক্র্যাফটন। কিন্তু কেন যে হঠাৎ কলকাতা থেকে ওয়াটস মুর্শিদাবাদে আসছেন সে বিষয়ে কিছু লেখেননি। দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নবাব। সবোরোজ তাঁকে লবেজান করার নানা ফন্দি এঁটে চলেছে ইংরেজরা। এই তো সবে ক্লাইভের সঙ্গে কলকাতায় ফিরলেন ওয়াটস। এর মধ্যেই আবার মুর্শিদাবাদে ছুটে আসা কেন? ফের কি নতুন কোনও মতলব?

দরবার ঘরে প্রবেশ করলেন ওয়াটস। নবাবকে তসলিম জানিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ সাহেবের চিঠি নিয়ে আমি কলকাতা থেকে আসছি হুজুর।’

ক্লাইভের চিঠি! ফের কী মতলব? ভিতরে ভিতরে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন নবাব। বহিরঙ্গে গাম্ভীর্য বজায় রেখে শুধোলেন, ‘কী লিখেছেন কর্নেল? খাস পয়গাম কী আছে?’

‘বহুত খুশি কি বাত। আপনাকে কলকাতা যেতে হবে। কর্নেলের আবদার।’

‘আবদার? কেন?’

‘দাওয়াত পাঠিয়েছেন ক্লাইভ সাহেব।’

‘দাওয়াত?’ মিরজাফর খাঁ বিস্মিত।

‘কোম্পানি আপনাকে সম্মান জানাতে চায়।’

হঠাৎ এমন আবদার কেন? বিস্ময়ে চোখের পলক পড়ে না নবাবের।

আমরা তো আপনার গোলাম হুজুর। গোলামলোগের এই আবদার মঞ্জুর করবেন আশা করি।’

এই বলে ক্লাইভের চিঠিটা নবাবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন ওয়াটস।

চিঠির বয়ানে চোখ রাখলেন নবাব। ক্লাইভ লিখেছেন ‘… হুজুর আপনি শুনলে খুশি হবেন যে আমি কলকাতা কাউন্সিলের গভর্নর হয়েছি। আমার এই খুশির ওয়াক্তে কোম্পানির তরফ থেকে আপনাকে আমরা সম্মান জানাতে চাই। কৃপা করে যদি একবার কলকাতা এসে কোম্পানিকে আপনার সেবা করার সুযোগ দেন তো খুশি হব। আপনাকে খোশআমদেদ করে কলকাতায় নিয়ে আসার জন্য আপনার বহুত পুরোনো দোস্ত উইলিয়াম ওয়াটসকে পাঠালাম। আশা করি আমার এই আরজু আপনি মঞ্জুর করবেন।…’

দুশ্চিন্তার মেঘটা আপাতত সরে গেল নবাবের মনের উপর থেকে। কথার প্যঁচে স্নায়ুর চাপ তৈরি করে তার কাছ থেকে টাকা আদায়ের কোনও ফন্দিফিকির নয়। চোখরাঙানি নয়, ধমকানি বা চমকানিও নয়। কোনও শারারতি নয়। ক্লাইভের চিঠির ছত্রে ছত্রে রয়েছে একান্ত আনুগত্য। এমন আনুগত্য পলাশির যুদ্ধের পরে কখনও দেখাননি ক্লাইভ।

নবাব বুঝলেন, ফরাসিদের হাতে মার খেয়ে ভয় পেয়েছে ইংরেজরা। তাই খাতিরের এই বহর। খুশি উপচে পড়তে লাগল নবাবের চোখেমুখে। এতকাল তিনিই কেবল ভয় পেয়ে এসেছেন ইংরেজদের। আজ সত্যিই নসিবের চাকা ঘুরছে। ভয় পেয়েছে ইংরেজরা। এ সম্ভব হয়েছে কাউন্ট লালির সৌজন্যে! তিনিই এখন নবাবের কাছে পয়গম্বরের দূত। আশমানের ফেরেস্তা।

মনস্থির করে ফেললেন নবাব। তিনি যাবেন কলকাতায়। এ যাত্রায় কোনও লড়াই, ঝামেলা, হুজ্জুতি নেই। আছে শুধু ফরহাত-আশরতের উমিদ। সেই সঙ্গে রয়েছে যাত্রাপথে হুগলির ফৌজদার ওমর বেগ ও চুঁচুড়ার ডাচদের কাছ থেকে নজরানা আদায়ের আশা। ডাচদের সঙ্গে একপ্রস্থ আলোচনাও সেরে নেওয়া যায়, কাউন্ট লালি বাংলায় এলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নবাবকে তারা মদত দেবে কি না। ইংরেজদের একচেটিয়া ব্যাবসা ডাচদেরও তো তকলিফ বাড়াচ্ছে।

নবাব বললেন, ‘ক্লাইভ সাহেবকে জানাবেন তাঁর দাওয়াত আমি গ্রহণ করলাম।’

‘বান্দা এই খুশখবর ফওরান কলকাতায় লিখে পাঠাবে।’ শির ঝুঁকিয়ে বললেন ওয়াটস।

মুর্শিদাবাদ থেকে দূত ছুটল ঢাকায়। নবাব সদলবলে কলকাতায় যাবেন। ঢাকার নওয়ারার দারোগা বিরাট এক নৌবহর পাঠিয়ে দিলেন। কিছুদিন পরে অগ্রদ্বীপের ঘাটে এসে ভিড়ল এই নৌবহর। নবাবের বিলাসবহুল বজরাসহ আরও অনেকগুলি বজরা, সুলুপ, পানসি ও বড় বড় মালবাহী নৌকো।

কয়েকদিন পরে সদলবলে রওনা হলেন নবাব। সঙ্গে মোসাহেবের দল, কসবি, বাইজি, গোলাম, বাঁদি, বাবুর্চি, খানসামা, খাজাঞ্চি, হুকোবরদার, ছাতাবরদার, মুটে-মজুর ও আরও হরেক কিসিমের লোকলস্কর। কলকাতা শহর আগে কখনও দেখেননি মণি বেগম। দুই পুত্র নজম ও সইফকে নিয়ে এই যাত্রায় তিনিও চলেছেন নবাবের সঙ্গে। পালকিতে বসে চিলমন পর্দার ফাঁক দিয়ে মুর্শিদাবাদ শহরের প্যালেস, হাভেলি, চকবাজারের পথঘাট, মানুষজন, গাড়িঘোড়া সবকিছু যেন নতুন চোখে দেখছিলেন মণি বেগম। বহুকাল পরে জেনানামহল ছেড়ে বাইরে পা রাখা। মণি বেগমের মনে পড়ে যায় সেই দিনটার কথা।

তখন সবে দিনের আলো ফুরিয়ে গিয়ে আঁধার নামছে চকবাজারে। একে একে পথের ধারের বাতিগুলো জ্বেলে দিচ্ছে বাতিকরেরা। ব্যস্ত পথের দুধারের বিপণিগুলো ঝলমল করছে শামাদানের আলোয়। দিল্লি থেকে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাইজি বিশু বেগের দলবল পৌঁছেছে মুর্শিদাবাদে। চকবাজারের পথ দিয়ে ছুটছে চার-পাঁচখানা জেনানাপালকি। নবাব আলিবর্দি খাঁর দৌহিত্র সিরাজের বিয়েতে মুজরোর দাওয়াত নিয়ে এসেছে বিশুবেগ। এই পথ দিয়েই নিজামতের সেপাইরা সেদিন খাতিরদারির সঙ্গে পালকি বয়ে নিয়ে চলেছিল মুসাফিরখানার উদ্দেশে। সেদিনও পালকিতে বসে অবাক চোখে সুবে বাংলার রাজধানীর রংঢং, জাঁক-জমক-জলুস অবাক চোখে দেখেছিল ষোলো বছরের এক কিশোরী। বিশুবেগের মেয়ে বব্বুর বাঁদি। মণি বাই।

মণি বেগমের মনে হল, রঙেঢঙে চকবাজার সেই একইরকম আছে। কিন্তু অনেক বদলে গিয়েছেন তিনি। প্রথম যেদিন মুর্শিদাবাদে এসেছিলেন, সেদিন সুখ ছিল না জীবনে, ছিল না নিজের ভাবীকাল নিয়ে কোনও ভাবনা। আজ জলুসে, দৌলতে, তাগদে, সুখে ভরপুর মণি বেগম। কিন্তু মাথায় একরাশ ভাবনা। ভাবনা নবাবকে নিয়ে, নজম-সইফের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

যখন আঁধার নামে, কেউ কালি ঢেলে দেয় ভাগীরথীর রুপোলি জলে, সে সময় কোনও কোনওদিন মণি বেগম হিরাঝিল প্যালেসের অলিন্দে পায়চারি করেন একাকী। মাথার উপরে উন্মুক্ত আকাশের বুকে ফুটে ওঠে দু-একটা তারা। কালচে মেরে যাওয়া গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে বেগম সাহেবার চোখে দৃশ্যমান হয় দূরে চলমান এক চিরাগের আলো। ওই জায়গাটা খোশবাগ। রোজ সন্ধেবেলা আলো হাতে সিরাজের সমাধিকে প্রদক্ষিণ করে লুৎফা। এগিয়ে চলেছে নবাব-বেগমের পালকি। মণি বেগমের নজর থেকে সহসা যেন হারিয়ে গেল চকবাজারের জলুস। মনের পর্দায় ভেসে ওঠে সন্ধেরাতের সেই চিরাগবাতি, লুৎফার মুখ। নিজের অজান্তেই মণি বেগম কেঁপে ওঠেন। এর নাম ভয়। দহসত।

বাইরে তখন তুমুল হুল্লোড়। চকবাজার তাজ্জব হয়ে দেখছে, অভূতপূর্ব খাতিরদারির সঙ্গে নবাবকে কলকাতায় নিয়ে চলেছে ইংরেজরা। নবাবের পিছনে ঘোড়ায় চেপে চলেছেন উইলিয়াম ওয়াটস। তাঁর পিছনে নবাবের বিশাল বাহিনী। একেবারে সামনে ও পিছনে চলেছে দুই দল গোরা পল্টন। ফৌজি ব্যান্ডে বাজছে খুশির সুর। এভাবে অগ্রদ্বীপ পর্যন্ত যাবেন নবাব। তারপরে বজরায় চড়ে কলকাতা।

.

আগে থেকেই মিরন প্রস্তুত রেখেছিল সেপাইদের। নবাব মুর্শিদাবাদ ছেড়ে বেরোতে না বেরোতেই বিরাট এক ফৌজ নিয়ে সে রায়দুর্লভের হাভেলি অবরোধ করল।

দোতলার অলিন্দ থেকে একঝলক দৃশ্যটা দেখে ত্রস্ত হয়ে পড়লেন রায়দুর্লভ। চারিদিকে থিক থিক করছে হাতিয়ারবন্ধ সেপাই। মিরনও হাজির অকুস্থলে। সেপাইরা ক্ষিপ্ত। তারা চিৎকার করছে, ‘তনখা নিকালো। মাহিনার কড়ি নিকালো।’

এই সেপাইরা অনেকেই মিরজাফরের সঙ্গে পাটনা অভিযানে গিয়েছিল। মজুরি পায়নি। এদের বেশ কিছুদিন ধরেই উসকাচ্ছিল মিরন—‘দেওয়ানজি তোদের বেতন মঞ্জুর করছেন না। গোপনে তিনি নিজামতের কড়ি চালান করছেন কলকাতায়। নিজেও কলকাতায় পালিয়ে যেতে চান। বেতনের কড়ি জোর করে কেড়ে নিতে না পারলে তোরা ভুখা মরবি।’

এই দাওয়াইয়ে কাজ হয়েছে। খানিক দূরে হাতির পিঠে বসে মজা দেখছে নবাবজাদা। কেরাহিয়াত, নফরতির আগুন সেপাইদের চোখেমুখে। নিজেদের পাওনা তারা আজ বুঝে নিতে চায়। এই ক্ষিপ্ত সেপাইদের দিয়ে প্রথমে রায়দুর্লভের হাভেলি লুঠ করাতে চায় মিরন। তারপর তাদের দিয়েই হাভেলি থেকে টেনে বের করে প্রকাশ্য রাজপথে দেওয়ানকে কোতল করবে সে। এই মনসুবা নিয়ে এসেছে মিরন। ফের মওত নাচাবে মুর্শিদাবাদে। পথের পাশে খুঁটি গেড়ে দেওয়ানজির লাশটা সে ঝুলিয়ে দেবে। সে দৃশ্য দেখে শিউরে উঠবে তামাম মুর্শিদাবাদ। ভয়ে কাঁপবে রাজারাম, রামনারায়ণ। আপন মনেই সজোরে হেসে ওঠে মিরন।

হাভেলির সমস্ত জানলা দরওয়াজা বন্ধ করে দিলেন রায়দুর্লভ। মিরনের হাতে তিনি ফের আক্রান্ত– একথা চিরকুটে লিখে ভাগীরথীতে গিয়ে পড়া এক গোপন সুড়ঙ্গ পথে এক কাসিদ কে পাঠিয়ে দিলেন কাশিমবাজারের উদ্দেশে। সাধারণ এক মাছমারার ছদ্মবেশে দ্রুতগামী ছিপনৌকো নিয়ে কাশিমবাজারের দিকে ছুটে চলল কাসিদ। আত্মরক্ষার্থে পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে সেই সুড়ঙ্গের মধ্যেই আশ্রয় নিলেন রায়দুর্লভ। সেপাইরা হাভেলির দরজা ভেঙে অন্দরে ঢুকে পড়লেও চট করে এই সুড়ঙ্গপথের হদিশ পাবে না, এই আশায় বুক বেঁধে তিনি ইষ্টনাম জপতে লাগলেন।

নিরাপদেই কাসিদ পৌঁছে গেল কাশিমবাজারে। চিরকুটে চোখ বুলিয়ে আঁতকে উঠলেন স্ক্র্যাফটন। আক্রান্ত দেওয়ানজির হাভেলি। ফের অশান্ত মুর্শিদাবাদ।

স্ক্র্যাফটনের হাতে এখন তেমন সংখ্যক ফৌজও মজুত নেই। বাড়াবাড়ি রকমের খাতির করে নবাবকে কলকাতা নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্লাইভের নির্দেশে কাশিমবাজার থেকে গোরা পল্টনদের বড় একটা বাহিনীকে নবাবের এসকর্ট হিসেবে পাঠানো হয়েছে কলকাতায়। এখন উপায়?

চোখে অন্ধকার দেখলেন স্ক্র্যাফটন। কী করে এই পরিস্থিতি সামাল দেবেন। রায়দুর্লভের সালামতির জিম্মেদারি নিয়েছেন ক্লাইভ। অনেকেই জানে। তিনি সহায় বলেই এখনও দেওয়ানের গর্দান নিতে পারেননি নবাব। লেকিন এই ওয়াক্তে রায়দুর্লভ যদি খুন হয়ে যান তো সাধারণ মানুষের চোখে ক্লাইভের প্রতিপত্তি অনেকটাই খাটো হয়ে যাবে। যারা ইংরেজদের দুশমন, তারা মনে করবে ক্লাইভের ইরাদাকে ইনকার করার তাগদ হয়েছে নবাবের। অতএব ইংরেজ ঔদ্ধত্যকে চুরমার করতে এখন নবাবকে মদত দেওয়া যায়। ইংরেজ কোম্পানি দুর্দমনীয়—ভেঙে পড়বে এই মিথ। এতে পলাশিতে প্রাপ্ত সুবিধা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। যে ভাবেই হোক বাঁচাতে হবে রায়দুর্লভকে। অটুট রাখতে হবে ইংরেজ প্রতিপত্তি। কঠিন আজমায়েশের মধ্যে পড়লেন লিউক স্ক্র্যাফটন।

ওয়ারেন হেস্টিংসকে ডেকে জরুরি আলোচনায় বসলেন তিনি। যে কয়জন গোরা পল্টন কাশিমবাজারে রয়েছেন তাদের সঙ্গে নিয়েই মুর্শিদাবাদ রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। স্ক্র্যাফটনের নির্দেশে হেস্টিংস দ্রুতগামী ঘোড়ার পিঠে চেপে ছুটলেন অগ্রদ্বীপের উদ্দেশে। পথে নবাবকে ধরে তাঁকে দিয়ে যে ভাবেই হোক মিরনকে নিরস্ত করার একটা পরোয়ানা লিখিয়ে নিতে হবে।

.

সেপাইদের খুনে মেজাজ দেখে ভয়ে সরে পড়ল রায়দুর্লভের হাভেলির সুরক্ষায় নিযুক্ত পাহারাদারেরা। কার্যত প্রায় বিনাবাধায় হাভেলির চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়ল উন্মত্ত সেপাইয়ের দল। মুখে একটাই বুলি সকলের। ‘রুপেয়া নিকালো! আভি রুপেয়া নিকালো।’

সদর দরোয়াজা ভেঙে ফেলার হুকুম দিল মিরন। বিপুল আক্রোশে চল্লিশ-পঞ্চাশজন সেপাই ঝাঁপিয়ে পড়ল পোক্ত লোহার দরওয়াজাটার উপরে। মোটা মোটা শালের খুঁটি দিয়ে তারা ক্রমাগত আঘাত করতে লাগল দরজায়।

ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছে মিরন। রায়দুর্লভের রক্ত চাই। যত দ্রুত সম্ভব কাজটা হাসিল করতে হবে। আগেরবার দেওয়ানের হাভেলিতে হামলা করতে এসে স্ক্র্যাফটনের ধমক খেয়ে মানসম্মান খুইয়ে পিছু হটতে হয়েছিল মিরনকে। এবারে সে আর খালি হাতে ফিরতে চায় না। আজ সে মরিয়া। গোরা পল্টনেরা এবারেও এসে হাজির হলে যাতে নগরীতে প্রবেশ করতে না পারে, তার জন্য পরিকল্পনা করেই ত্রিপোলিয়া তোরণদ্বারের অদূরে সেনা মোতায়েন করেছে মিরন। সেবারে ঘোড়া দাবড়ে ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে হাজির হয়েছিলেন স্ক্র্যাফটন।

কিন্তু মিরনের হুঁশ নেই যে কাশিমবাজার থেকে মুর্শিদাবাদে পৌঁছনোর আরও একটা পথ আছে। ভাগীরথী বেয়ে অনায়াসেই আসা যায়। সে পথে অবশ্য কোনও পাহারা নেই।

সহসা দড়াম শব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ল লোহার দরজাটা।

‘বহুত খুব। কেয়াবাৎ!’ চেঁচিয়ে উঠল মিরন।

অন্দরে প্রবেশ করল সেপাইরা।

হাভেলি তোলপাড় করে রায়দুর্লভের সন্ধান করতে লাগল তারা।

.

বিরাট বড়সড় বাহিনী নিয়ে ঢিমে তালে চলেছেন নবাব। চলার পথে এই গড়িমসি আলস্যের ভাব দেখে মনে মনে খুবই বিরক্ত বোধ করছেন ওয়াটস। তবে বিরক্তি প্রকাশ করতে পারছেন না। ক্লাইভের কড়া নির্দেশ—যারপরনাই খাতির যত্ন করে মেহমানকে যেন কলকাতায় নিয়ে আসা হয়।

মুর্শিদাবাদ থেকে মানকরা পৌঁছতেই বেলা ফুরিয়ে গেল। ওখানেই আজ তাঁবু ফেলে রাত কাটাবেন নবাব। কাজেই নবাবকে পাকড়াও করার জন্য হেস্টিংসকে খুব বেশি ছুটতে হল না। সন্ধের মুখেই মানকরায় পৌঁছে গেলেন হেস্টিংস। ওয়াটসকে খুলে বললেন সব কথা।

চল্লিশ খুঁটির বিলাসবহুল তাঁবুর বাইরে খোলা আকাশের নীচে আরামকেদারায় দেহ এলিয়ে বসেছিলেন নবাব। হাতে ফরসির নল। চোখেমুখে বেশ একটা প্রশান্তির ছাপ। সন্ধে নামছে। খানিকবাদে মেহফিল বসবে। শামিয়ানা খাটিয়ে, বাহারি নকশার রংদার মোটা বনাত দিয়ে ঘিরে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী রংমহল। রসুইখানা থেকে নাকে ভেসে আসছে স্বাদু গন্ধ।

কলকাতাযাত্রা বেশ উপভোগ করছেন নবাব। গন্তব্যে পৌঁছনোর বিশেষ কোনও তাড়াহুড়ো নেই। পথে পুরোদস্তুর আমোদ-ফূর্তি করতে করতে ধীরে-সুস্থে চলা। এ যেন নিশ্চিন্ত অলস অখণ্ড অবসরযাপন। মানসিক উত্তেজনায় জেরবার নবাব শরীর ও মন দুইয়েরই আরাম চান।

সহসা নবাবের সমুখে ঝড়ের মতো এসে হাজির হলেন হেস্টিংস ও ওয়াটস।

‘নবাবজাদা ফের হামলা করেছেন দেওয়ান সাহেবের হাভেলিতে। ওয়ারেন সেই খবর নিয়ে এসেছে।’ কোনও ভূমিকা ছাড়াই গুজারেশ করলেন ওয়াটস।

তাঁর অনুপস্থিতিতে মিরন যে এমন একটা কাণ্ড ঘটাতে পারে, তা মনে মনে আন্দাজ করেছিলেন মিরজাফর। কথাটা শুনে তিনি খুশিই হলেন। কোনও কিসিমে রায়দুর্লভ কাঁটা যদি পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায় তো মন্দ কী? তিনি রাজধানীর বাইরে। এই ওয়াক্তে দেওয়ান অচানক খুন হয়ে গেলে কোনও ইলজাম তাঁর উপরে আসবে না।

ভারী তাজ্জব হওয়ার মতো ভাব করে নবাব বললেন, ‘এমন তো হওয়ার কথা নয়।’

হেস্টিংস বললেন, ‘নবাবজাদা নাফরমান।’

ওয়াটস বললেন, ‘এখন আপনিই ভরসা হুজুর।’

‘কী করতে পারি আমি?’

‘পরোয়ানা লিখে দিন।’

‘কীসের পরোয়ানা?’

ওয়াটস বললেন, ‘দেওয়ানজিকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাই। তার পরোয়ানা।’

মিরজাফরের মনে হল চিৎকার করে বলে ওঠেন—আমি কী আপনাদের হুকুমের বান্দা? আপনারা যা চাইবেন, তাই লিখে দিতে হবে? তবে কথাটা বলার সাহস তাঁর হল না। তিনি এখন গোরা পল্টন পরিবৃত।

হেস্টিংস বললেন, ‘দেওয়ানজির উপরে অন্যায় জুলুম হচ্ছে হুজুর। তাঁর কসুর কী?’

গুম মেরে রইলেন মিরজাফর। মিরন খতম করতে চাইছে দেওয়ানকে। মনে মনে বেটাকে সাবাশি দিলেও কী করে জোর গলায় তার সপক্ষে সওয়াল করবেন নবাব?

নবাবকে মৌন দেখে ওয়াটস বললেন, ‘আপনাকে সম্মান জানাতে চলেছে কোম্পানি। আপনার এই খুশির ওয়াক্তে অচানক এই হুজ্জুতি-হাঙ্গামা বাধানো কি সহি কাম হবে হুজুর? আপনার সঙ্গে দেওয়ান সাহেবেরও কলকাতা রওনা হওয়াই ভালো। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।’

‘পরোয়ানাটা লিখে দিন হুজুর।’

প্রায় হুকুমের সুরে কথাটা বললেন হেস্টিংস। নবাবের প্রতি ইংরেজদের আনুগত্য প্রদর্শনের খোলসটা খসে পড়ল এক লহমায়। চমকে উঠলেন মিরজাফর। দেখলেন, ওয়াটস ও হেস্টিংসের পিছনে গোরা পল্টনেরা একে একে এসে সব জড়ো হচ্ছে। তাঁর বুক কেঁপে উঠল। ভয়। দহসত। মতলব কী ইংরেজদের? তাঁকে বন্দি করতে চায়? বড় অসহায় বোধ করলেন মিরজাফর খাঁ।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *