পলাশির পরে – ৫২

৫২

কর্নেল ক্লাইভকে খোশ আমদেদ করে দরবার ঘরে নিয়ে গেলেন নবাব। সদর দেউড়ি থেকে দরবার ঘর পর্যন্ত কালো পাথর বাঁধানো পথের উপর বিছানো নরম লাল গালিচা। সে পথের দু’ধারের সরু ইটে গাঁথা দেওয়াল সাজানো হয়েছে হরেক কিসিমের রংদার সুগন্ধি ফুল ও দেওদার পাতায়। ফুলের সুগন্ধে ম ম করছে চারিদিক। গুলাবের পাপড়ি বোঝাই রুপোর রেকাবি হাতে দাঁড়িয়ে আছে বাঁদিরা। হেঁটে চলেছেন ক্লাইভ। তাঁর দেহের উপরে খুশবুদার গুলাবের পাপড়ি ছুড়ে দিচ্ছে বাঁদির দল। গুলাবের রং, গালিচার রং মিলেমিশে একাকার।

ক্লাইভের পাশে পাশে হাঁটছেন নবাব। মুখে লেগে আছে মৃদু প্রসন্ন হাসি। নহবতখানার সানাইবাদক আবহে খুশির আমেজ অকাতরে বিলিয়ে দিতে নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে। যে খাতিরদারি ক্লাইভের জন্য দেখাচ্ছেন মিরজাফর খাঁ, তা নজিরবিহীন। অতীতে সুবে বাংলার কোনও নবাবও পাটনায় এসে এমন খাতির পাননি।

তবুও ভয়ানক গম্ভীর ক্লাইভ। মুখে এক ফোঁটা হাসি নেই। গায়ে পড়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ জমানোর কোশিশ করছেন নবাব। খোশামুদে কথার প্রত্যুত্তরে কথা প্রায় বলছেনই না ক্লাইভ। তিনি জানেন কী করে প্রতিপক্ষের উপরে মানসিক চাপ তৈরি করতে হয়। ক্লাইভের গোমড়া, গম্ভীর মুখ দেখে সত্যিই চাপ বাড়ছে মিরজাফরের মনের উপরে। এখনও কি কর্নেল গোসা করে রয়েছেন? নবাব বিচলিত। মুখে লেগে থাকা মৃদু হাসির রেশ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।

দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন ক্লাইভ। তাঁকে দেখেই কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন অতিথি, অভ্যাগতরা। বিহার মুলুকের অনেক জমিদারই আজ উপস্থিত। কুরসিতে বসে চারিদিকে চোখ চালিয়ে ক্লাইভ খুঁজলেন রামনারায়ণকে। তাঁর বিষয়ে গোবিন্দমল্লের মুখ থেকে শুনেছেন সব কথা।

খানিকবাদে বচন সিং ও রঘুরামের কাঁধে ভর দিয়ে দরবার ঘরে প্রবেশ করলেন রামনারায়ণ। বুক ও কাঁধে এখনও বাঁধা রয়েছে কাপড়ের পট্টি। রামনারায়ণের অঙ্গসজ্জা ও অভিনয় একেবারে নিখুঁত। হাঁটতে যেন খুবই কষ্ট হচ্ছে এমন একটা ভাব করে এগিয়ে এসে নবাবকে তসলিম জানালেন তিনি। তারপর সেলাম জানালেন ক্লাইভকে।

ক্লাইভও নাটুকেপনায় কম যান না। ভারী অবাক হওয়ার মতো মুখ করে শুধোলেন, ‘কী হয়েছে? তকলিফ কীসের?’

মুচকি হেসে রামনারায়ণ বললেন, ‘কিছু নয় হুজুর, সামান্য চোট লেগেছে।’

মিরকাজিমের হাতে আক্রান্ত হওয়ার অপ্রিয় প্রসঙ্গটা ক্লাইভের সামনে উত্থাপন করলেন না রামনারায়ণ। এতে নবাব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে নিজের জায়গায় বসলেন রামনারায়ণ।

দরবার শুরু হল। মিরজাফর খাঁ ঘোষণা করলেন, ‘পাটনার নায়েব সুবাদার ছিলেন রামনারায়ণজি, নয়া জমানায় ওই পদেই উনি বহাল থাকবেন।’

হর্ষধ্বনি দিয়ে নবাবের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল সকলে। আড়চোখে ক্লাইভকে জরিপ করলেন মিরজাফর। হাততালি দিচ্ছেন কর্নেল। তিনি খুশি। চাপমুক্ত হলেন নবাব।

কুরসি ছেড়ে উঠে রঘুরাম ও বচন সিং-এর কাঁধে ভর দিয়ে হেঁটে এসে ফের নবাবের মুখোমুখি দাঁড়ালেন রামনারায়ণ। তসলিম জানিয়ে রত্ন-বোঝাই একটি পেটিকা নবাবের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘হুজুরের নজরানা।’

কথাটা যেন ব্যঙ্গের মতো শোনাল মিরজাফরের কানে। রামনারায়ণের দিকে চেয়ে মুহূর্তের জন্য প্রবল আক্রোশে তাঁর চোখদুটো ধক করে একবার জ্বলে উঠল। যা তিনি মোটেই চাননি তাই করতে হল ক্লাইভের খায়েশে। প্রতিহিংসার আগুন এখনও জ্বলছে মিরজাফরের বুকের মধ্যে। রামনারায়ণকে বরবাদ করতে না পারলে এত খরচ করে পাটনায় ছুটে আসা নিরর্থক। দরবারি সহবতের খাতিরে মুখে সৌজন্যের হাসি ফুটিয়ে তুললেন মিরজাফর খাঁ। মনে মনে বললেন, ‘ক্লাইভ সাহেব তুরন্ত রওনা হবেন কলকাতার পথে। তারপর ফির বোঝা পড়া হবে আপনার সঙ্গে।’

এক দাখিলা রুপোর রেকাবিতে করে খেলাত নিয়ে এল। রামনারায়ণকে নায়েব সুবেদারের খেলাত পরিয়ে দিলেন মিরজাফর খাঁ।

নীরবে হাসছে ক্লাইভের দুই চোখ। গভীর কৃতজ্ঞতায় তার উদ্দেশে মাথা ঝোঁকালেন রামনারায়ণ। তারপর দুই সঙ্গীর কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে ফের নিজের আসনে গিয়ে বসলেন।

নবাব ঘোষণা করলেন, ‘এই ওয়াক্ত থেকে পাটনার ডেপুটি সুবাদার পদে আমি বহাল করছি নবাবজাদা মিরনকে। মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পাটনায় এসে শাসনকার্য সরাসরি দেখভাল করা তার পক্ষে মুশকিল। তাঁর হয়ে এই প্রদেশ দেখভালের জিম্মেদারি সামলাবেন রামনারায়ণ।’

এই ঘোষণা শুনে রামনারায়ণের মনের খুশি অনেকটাই গায়েব হয়ে গেল। নড়েচড়ে বসলেন ক্লাইভ। রামনারায়ণ বুঝলেন, মিরনের গুপ্তচরদের কড়া নজরদারির মধ্যে রাজ্যপাট চালাতে হবে। নবাব তাঁকে কঠিন এক আজমায়েশের মধ্যে ফেলে দিলেন।

ক্লাইভ যেন একচোট ধোঁকা খেয়ে গেলেন। মিরজাফরের এই চালটা তিনি আন্দাজ করতে পারেননি। সুকৌশলে ফি-সাল বিহারের শালিয়ানার বড় একটা অংশ মুঠোবন্দি করার সুন্দর বন্দোবস্ত করে ফেললেন নবাব। অন্তত একবারের জন্য হলেও মনে মনে নবাবের বুদ্ধির তারিফ করতে বাধ্য হলেন ক্লাইভ এবং এও বুঝলেন যে রামনারায়ণ এখনও নিরাপদ নন।

এবারে দ্বিতীয় প্রসঙ্গে এলেন মিরজাফর খাঁ। ক্লাইভকে দরবারি খেলাত প্রদান করে ঘোষণা করলেন, ‘কোম্পানির ফৌজ সুবে বাংলায় যে ভাবে শান্তি বজায় রেখেছে, তা তারিফ করার মতো। তোফা হিসেবে ছাপরার সোরার একচেটিয়া অধিকার কোম্পানির হাতে তুলে দিলাম আমি।’

নবাবের এই ঘোষণা শুনে হাসি চওড়া হল, ক্লাইভ, ওয়াটস, লাশিংটন, ওয়ালশ সকলেরই।

ধূর্ত রবার্ট ক্লাইভ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সুবে বাংলার নবাবের সঙ্গে কোম্পানির উলফত মোবারক হোক। ইংরেজ এক ইমানদার জাত। তারা শুধু তোফা নিতে জানে না, তোফা দিতেও জানে। যদিও নবাব আমাদের জন্য যা করলেন, তার জন্য কোনও সওগাতই কাফি নয়, তবু এই ওয়াক্তে আমি ঘোষণা করতে চাই যে, হর সাল বিশ হাজার মন সোরা নবাব বাহাদুরকে আমি মুফতে দেব।’

এ যে আশমানে মেঘ না জমতেই তেজ বারিষের উম্মিদ। খুশিতে উদ্ভাসিত হল মিরজাফরের মুখ। এ তার কাছে অভাবনীয় প্রস্তাব। কয়েকদিন আগে ওয়াটসের মুখ থেকে ছাপরার সোরার উপরে ক্লাইভের একচেটিয়া দাবির কথা শুনে তিনি খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন। বর্তমানে ছাপরার সোরার একচেটিয়া কারবারের অধিকারী খোজা ওয়াজিদকে চাপ দিয়ে বছরে বেশ মোটা অঙ্কের একটা টাকা উপায় করে থাকেন নবাব। কিন্তু ক্লাইভের কাছ থেকে তিনি উপরি আদায় করবেন কী করে? চাইবেনই বা কোন মুখে? এই সমস্যার সমাধান করে দিলেন কর্নেল নিজেই।

মিরজাফরের মনে হল, আল্লা বহুত মেহেরবান। ইংরেজদের কোনও ওজর-আপত্তি ছাড়াই মিরনকে বিহারের ডেপুটি সুবাদারের পদে বহাল করে এই প্রদেশের উপরে তাঁর আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলেন। ছাপরার সোরার একচেটিয়া অধিকার ক্লাইভের হাতে তুলে দিয়ে তিনি হাসি ফোটালেন ক্লাইভের গোমড়া মুখে। সেই সঙ্গে হর সাল মুফতে বিশ হাজার মন সোরা। এখানেই শেষ নয়, সেদিন আরও খুশি অপেক্ষা করে ছিল নবাবের জন্য।

এর পরে যা ঘটল তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। এর আগাম আভাস পাননি নবাব। পায়নি ইংরেজরাও। দরবার যখন প্রায় শেষের পথে তখন অচানকই জগৎশেঠের দিল্লি কুঠির জনৈক কর্মচারী রওশনলাল নাটকীয় ভাবে দরবার ঘরে প্রবেশ করল। তার গন্তব্য ছিল মুর্শিদাবাদ। কিন্তু নবাব বর্তমানে পাটনা দুর্গে অবস্থান করছেন জেনে সে এখানে এসে হাজির হয়েছে।

‘সেলাম হুজুর।’ তসলিম জানায় রওশনলাল।

লোকটিকে কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকে মিরজাফরের।

‘আমি রওশনলাল।’

‘জগৎশেঠজির দিল্লি কুঠির নোকর। তাই তো?’

‘জি হুজুর।’

‘কী পয়গাম?’ প্রশ্ন করেন নবাব।

‘আমি দিল্লি থেকে হুজুরের জন্য এক খুশখবর নিয়ে এসেছি। মোগল বাদশার পরোয়ানা।’

উত্তেজিত হয়ে পড়লেন মিরজাফর। উৎকর্ণ হয় সকলে।

‘মোগল বাদশা আপনার নামে বাংলা-বিহার-ওড়িশার সুবেদারির পরোয়ানা জারি করেছেন।’

বেহেস্তের কওসর যেন অচানকই মাটিতে নেমে এসে নবাবকে খুশিতে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

গোটানো একখানা কাগজ নবাবের দিকে এগিয়ে দিল রওশনলাল। তার হাত থেকে পরোয়ানাটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলেন মিরজাফর খাঁ। কাঁপছে তার হাত। হাসছে মুখচোখ। রওশনলাল যা বলছে তা সত্যি। নীচে রয়েছে বাদশার শিলমোহর। শুধু তাই নয়, নবাবকে একটা খেতাবও দিয়েছেন মোগল বাদশা। ‘সুজা-উল্‌-মুলক্‌ হুসেনউদ্দৌলা মীর মুহম্মদ জাফর আলি খাঁ মহাবতজঙ্গ বাহাদুর’।

দরবারি সহবতের তোয়াক্কা না করে কুরসি ছেড়ে উঠে এসে রওশনলালকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন নবাব। বহু মূল্যবান মোতির একটা মালা পরিয়ে দিলেন তার গলায়।

হর্ষধ্বনিতে প্রায় ফেটে পড়ল দরবার ঘর।

সুবে বাংলার নবাব, নিজামত—এখনও মোগল প্রশাসনের অঙ্গ। মোগল বাদশার অনুমোদন ছাড়া মসনদের উপর কারও অধিকার বৈধ হয় না। ইংরেজদের হাত ধরে মসনদে বসেই দিল্লিতে দরবার করেছিলেন মিরজাফর খাঁ– তাঁর নামে সুবেদারির পরোয়ানা জারি করা হোক। এতদিনে মিরজাফরের সেই আরজু মঞ্জুর হল।

যদিও মোগল শাসকদের সে প্রতাপ আর নেই। নখদন্তহীন হয়ে পড়েছেন দিল্লির বাদশা। লোলচর্ম, জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ সিংহের মতো শক্তিহীন। বাদশার অনেক ফরমায়েশ, ফরমানকে আজ কেউ আমল দেয় না। তাঁর অনেক হুকুমই তামিল হয় না আজকাল। তবুও বাদশা বাদশাই। এখনও তাঁর নামে শাসনকার্য চলে হিন্দুস্তানে।

উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছেন মিরজাফর খাঁ। বাদশার পরোয়ানা মুহূর্তের মধ্যেই বদলে দিয়েছে অনেক কিছু। রামনারায়ণের অনুগামী পাটনা মুলুকের যে জমিদারেরা এতকাল তাঁকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেছে আজ সহসা যেন তাদের দেহের অভিব্যক্তি বদলে গিয়েছে। কুরসি ছেড়ে উঠে একে একে তারা এগিয়ে এসে নবাবকে তসলিম জানিয়ে যাচ্ছে। পেশ করছে মোটা নজরানা।

স্বস্তি ক্লাইভের চোখেমুখেও। মুর্শিদাবাদে নবাব বদলানোর অন্যায় খেলায় তিনি মদত দিয়েছিলেন সিরাজের উপরে ক্ষুব্ধ ওমরাহ-বেনিয়ান-মুৎসুদ্দিদের। সেই অবৈধ কাজের উপরে বৈধতার প্রলেপ লাগিয়ে দিলেন মোগল বাদশা। ইংরেজদের দিকে এখন কেউ আঙুল তুললে তারা এবারে বুক চিতিয়ে বলতে পারবে—‘আমাদের কসুর কী? খামোখা ইলজাম ওঠাচ্ছ কেন আমাদের উপরে? সিরাজদ্দৌলাকে হটিয়ে আমরা মিরজাফরকে মসনদে বসাতে মদত দিয়েছি ঠিক কথা, কিন্তু তোমাদের দেশের বাদশাই তো মসনদের উপরে মিরজাফরের অধিকারকে বৈধ বলে শিলমোহর দিয়েছেন। হিন্দুস্তানে মোগল বাদশাই শেষ কথা। তাই নয় কি?’

উঠে দাঁড়িয়ে নবাবকে কুর্নিশ জানালেন ক্লাইভ।

ফের একবার মিরজাফরের গোটা শরীর জুড়ে উপচে পড়ল খুশি।

চমকের আরও কিছু বাকি ছিল।

কোমরবন্ধনী থেকে আর একটা গোটানো কাগজ বের করে রওশনলাল বলল, ‘পলাশিতে কুদরতির জন্য সাবিৎ জঙ্গ কর্নেল রবার্ট ক্লাইভকে ‘নওশেরউদ্দৌলা’ খেতাব দিয়েছেন দিল্লির বাদশা। শাহি হুকুমত আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।’

তোবা। তোবা। আরও একবার হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল গোটা দরবার।

আর্কটের নবাব খেতাব দিয়েছিলেন সাবিৎ জঙ্গ—যুদ্ধে অপরাজেয়। আর দিল্লির বাদশা খেতাব দিলেন নওশেরউদ্দৌলা অর্থাৎ বীরপ্রবর। সপ্রসংশ দৃষ্টিতে ক্লাইভের দিকে চাইলেন মিরজাফর খাঁ।

ক্লাইভের মুখে লেগে আছে কৌশলী হাসি। পলাশিতে কুদরতির জন্য হিন্দুস্থানের বাদশার দেওয়া খেতাব ইংরেজদের অন্যায় কাজকে মান্যতা দেওয়ার পথে আরো জোরদার সাবুত। এই ভেবে তিনি উৎফুল্ল। তবে সবচেয়ে বড় কথা হল বাদশার দেওয়া খেতাব স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, ইংরেজদের সমীহ করছে তামাম হিন্দুস্তান।

দরবার ভাঙল। সপারিষদে বিদায় নিলেন ক্লাইভ।

উৎসবের আনন্দে মেতে উঠল গোটা পাটনা দুর্গ। রাতারাতি আলোকমালায় সেজে উঠল কেল্লা। রাতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে আকাশের গায়ে ফুটে উঠল দুর্গের বুরুজ, প্রাকারের অবয়ব। আতশবাজির জলুসে হারিয়ে গেল নক্ষত্ররাজি। ফিকে হল রাতের আকাশের কালি। দুর্গ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে আমআদমিকে মিঠাই বিলোতে লাগলেন রামনারায়ণ।

.

আনন্দ, ফূর্তি ও হইহুল্লোড়ের আবেশে কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন। হঠাৎই যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মিরজাফর অনুভব করলেন, ক্লাইভের কলকাতায় ফেরার কোনও তাড়া নেই। পাটনায় বসে দিব্যি সোরার কারবারের দেখভাল করে চলেছেন তিনি। নৌকো বোঝাই হয়ে মন মন সোরা প্রতিদিনই চালান যাচ্ছে কলকাতায়।

নবাব ভেবেছিলেন ক্লাইভ কলকাতার পথে রওনা হলেই রামনারায়ণের সঙ্গে কড়া বোঝাপড়া সেরে নেবেন। যে মনসুবা নিয়ে পাটনায় আসা তা পূর্ণ করে তবে ফিরবেন মুর্শিদাবাদে। সবক শেখাবেন রামনারায়ণকে। কিন্তু সেই ফুরসত পাচ্ছেন কোথায়? ক্লাইভের মনসুবা কী তার আন্দাজ পাওয়ার জন্য গুপ্তচর গোবিন্দমল্লকে তিনি পাঠালেন ইংরেজ ছাউনিতে।

ফিরে এসে গোবিন্দমল্ল জানালেন, ‘ক্লাইভ সাহেবের এখনই কলকাতায় ফেরার কোনও তাগিদ নেই হুজুর। আমার আন্দাজ আপনি মুর্শিদাবাদ রওনা না হলে উনি পাটনা ছেড়ে নড়বেন না।’

‘কেন বলো তো?’ মিরজাফরের গলায় ধরা পড়ে শঙ্কার সুর।

গোবিন্দমল্ল বললেন, ‘লাগতা হ্যায়, আপনার ইরাদা কী, ক্লাইভ সাহেব আন্দাজ করেছেন।’

মিরজাফর প্রশ্ন করেন, ‘ইরাদা?’

‘আপনি তো রামনারায়ণজির বরবাদি চান।’

আঁধার নামল মিরজাফরের মুখে।

গোবিন্দমল্ল ফের বললেন, ‘লাগতা হ্যায় কর্নেল বিলকুল আন্দাজ করেছেন, উনি পাটনা ছেড়ে কলকাতার পথে রওনা হলেই আপনি রামনারায়ণকে খতম করবেন। তাই তিনি নজর রাখছেন আপনার উপরে। আপনি মুর্শিদাবাদের পথে রওনা না হলে উনি এখান থেকে তাঁবু গোটাবেন না।’

ফরসির নল হাতে। চোখ বুজে অম্বুরি তামাকের ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন নবাব।

‘আমার মনে হয় এই ওয়াক্তে আপনার মুর্শিদাবাদে ওয়াপস যাওয়াই ভালো।’

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গোবিন্দমল্লের মুখপানে চাইলেন নবাব।

গোবিন্দমল্ল অকপটে বললেন, ‘যতদিন ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে পাটনায় বসে থাকবেন ততদিন ইংরেজ ফৌজের টাকা গুনতে হবে আপনাকে। হর মাস লাখ টাকা। কড়ার তো এমনই।’

হতাশার সঙ্গে মাথা নেড়ে গোবিন্দমল্লের কথায় সম্মতি জানালেন মিরজাফর।

‘এই খরচ আনেওয়ালা দিনে আরও বাড়বে হুজুর।’

‘কেন?’ সহসা যেন চমকে উঠলেন নবাব।

‘তাগদবাজ ভোজপুরী জোয়ানদের ফৌজে ভরতি করছেন ক্লাইভ সাহেব।’

‘শুনেছি।’

‘তায়দাদ এখন কত হয়েছে জানেন?’

‘কত?’

‘করিব এক হাজার।’

ধোঁয়া ছাড়তে গিয়ে বিষম খেলেন নবাব। সামলে নিয়ে বললেন, ‘বলছ কী? এ-ক-হা-জা-র?’

‘জি হুজুর। ক্লাইভ সাহেব এখন তালিম দিয়ে তাদের গড়েপিটে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত। এই সেপাইদের খরচও তো আপনাকেই মেটাতে হবে।’

মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল মিরজাফরের। এই আর্থিক ধাক্কার কথাটা তিনি তেমন আমল দিয়ে ভেবে দেখেননি। অগত্যা পাটনা থেকে তাঁবু গুটিয়ে মুর্শিদাবাদে ফেরা মনস্থ করলেন নবাব।

হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন রামনারায়ণ।

স্বস্তি পেলেন ক্লাইভ। পাটনার কাজ শেষ। শুধু নবাবের উপর নজর রাখার জন্য এখানে বসে থাকা। এই ওয়াক্তে রামনারায়ণের মুসিবত চান না কর্নেল। সেটা সুবে বাংলার নিরাপত্তার খাতিরেই। মূর্খ নবাব এই কথাটা বুঝতে চাইছেন না। রামনারায়ণকে খতম করার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর। তিনি পাটনায় থাকতে সে হিম্মত নবাবের হবে না, একথা ক্লাইভ জানেন। ওদিকে দক্ষিণ থেকে একের পর এক খারাপ খবর আসছে। এবার হয়তো তাঁকে মাদ্রাজের উদ্দেশে রওনা হতেই হবে। প্রস্তুতির জন্য কলকাতায় ফেরাটা খুব জরুরি।

সৌজন্যের খাতিরে নবাবের সঙ্গেই ফিরে চলল ইংরেজবাহিনী। কিন্তু পথে অন্য এক সমস্যায় পড়লেন ক্লাইভ। নবাবের বিশাল বাহিনী চলে এমনিতেই ধীর গতিতে। তার উপরে মাঝে মধ্যেই থেমে পড়ে নবাব কখনও ভাসছেন আশরতে, কখনও মেতে উঠছেন শিকার খেলায়, কখনও বা আসরফি ছড়াচ্ছেন মুজরোর আসরে। অহেতুক বরবাদ হচ্ছে মূল্যবান সময়।

বিরক্ত হয়ে নবাবকে ছেড়ে কলকাতার উদ্দেশে দ্রুত মার্চ করতে শুরু করলেন ক্লাইভ।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *