পলাশির পরে – ৫১

৫১

ক্লাইভ লিখেছেন, ‘…শুনলাম আপনি গত পাঁচ সালের শালিয়ানা আদায়-উশুলের হিসেব দাখিল করবার হুকুম করেছেন রামনারায়ণের উপরে। আপনার মনসুবা আমি আন্দাজ করতে পারছি। আপনি রামনারায়ণের বরবাদিই চাইছেন। অবশ্য রাজমহল থেকে পাটনা আসার পথে আপনি কথা দিয়েছিলেন যে বিহারের কুরসিতে রামনারায়ণই বহাল থাকবেন। এখন দেখছি আপনার মত বদলে গিয়েছে। এ নিয়ে অবশ্য আমার কিছু বলার নেই। আপনি সুবে বাংলার নবাব। নিজামতের প্রশাসনে কী অদল-বদল ঘটবে তা আপনিই ঠিক করবেন। দেশের ভালো-মন্দের দায় আপনার, প্রজাদের সহি-সালামত রাখার জিম্মেদারও আপনি। আপনার খুশখেয়ালের এতেরাজ করা আমার আরমান নয়, আপনাদের ঘরোয়া কাজিয়ায় জড়িয়ে পড়ার ইরাদাও আমার নেই। তবে বড়ি আফশোস কি বাত হল এই যে, রামনারায়ণের বিষয়ে আপনার মতবদল আমাকে ঝুটা বলে সাবুত করেছে। রামনারায়ণের বরবাদিই যখন আপনার আরজু, তখন সে কথা আপনি আমাকে স্পষ্ট করে বলেননি কেন?…’

এই অবধি পড়ে থমকালেন মিরজাফর। মুখ তুলে মিরকাজিম ও গোবিন্দমল্লের মুখের দিকে চকিতে একবার চাইলেন। তারপরে ফের মনোনিবেশ করলেন চিঠিতে। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পড়ে চললেন বাকি চিঠিটা।

‘…পাটনার কুরসির জন্য আপনার ভাই মিরকাজিমের চেয়ে রামনারায়ণ অনেক চোস্ত ও চৌখস আদমি। রাজমহলে বসে এ কথা আপনাকে স্পষ্টই জানিয়েছিলাম। আমি শুধু আমার একিনের কথা বলেছিলাম। আপনার উপরে জবরানে কোনও কিছু আরোপ করতে চাইনি। সেই অধিকারও আমার নেই। কোন পদে, কাকে আপনি বহাল করবেন, এ বিষয়ে শোচবুঝ করার হকদার আপনিই। রামনারায়ণকে পাটনার কুরসিতে বহাল রাখার প্রস্তাব আপনি মেনে নিয়েছেন দেখে তাঁকে একটা চিঠি লিখেছিলাম আমি। সেই চিঠির খসড়া আমি আপনাকে দেখিয়ে মঞ্জুর করিয়েও নিয়েছিলাম। আমি লিখেছিলাম—মুসিবতের আন্দেশায় ভেঙে পড়বেন না। পাটনার কুরসিতে আপনিই বহাল থাকবেন। আপনার উপরে নবাবের কোনও আখেজ বা আদাওতি নেই। চিঠির এই বয়ান নিশ্চয়ই ইয়াদ আছে আপনার।’

এই অবধি পড়ে মিরজাফরের মনের মধ্যে সব কিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। পঙ্খের কারুকাজ করা ছাতের দিকে মুখ তুলে চোখ বন্ধ করে ক্ষণিকের জন্য ভাবলেন, কিন্তু ক্লাইভ খসড়া লিখে তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন, এমন কোনও চিঠির কথা মনে পড়ল না। যাই হোক, চিঠিটা এখনও শেষ হয়নি। ফের চিঠিতে মন দিলেন মিরজাফর।

‘…এখন আপনি যদি মত বদলে আমাকে ঝুটা আদমি বলে সাবুত করতে চান, সেটা নবাবি রিয়াসতের এক তরিকা হতে পারে, কিন্তু আমি মনে করি এ এক শরাফত ইনসানের বেইজ্জতি। আমি পাটনায় আসতে চাইনি। আপনিই জোর করে পাটনায় ডেকে এনে আমাকে বেইজ্জত করলেন। যাই হোক, ফৌজ নিয়ে দ্রুত কলকাতায় ফিরে যেতে হবে আমাকে। অবিলম্বে আমার একবার মাদ্রাজে যাওয়া প্রয়োজন। ওখান থেকে বার বার তলব আসছে। আগামী দু-তিন দিনের মধ্যেই আমি কলকাতার পথে রওনা হব। আপনি সহি-সালামত, খুশ তবিয়ত থাকবেন। তবে একটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি, নিজের ফৌজকে হুঁশিয়ার রাখবেন। যতদূর খবর আমার কানে এসেছে তাতে মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই শিবভট্ট ও সুজাউদ্দৌলা একযোগে সুবে বাংলা আক্রমণ করবেন।…’

মাথা ঘুরতে লাগল মিরজাফরের। গলা শুকিয়ে কাঠ। চিঠির বয়ানে খুবই স্পষ্ট ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়েছেন ক্লাইভ। কিন্তু ক্লাইভ যে চিঠির খসড়া তাকে দিয়ে মঞ্জুর করিয়ে নিয়েছিলেন বলে লিখেছেন, তা কিছুতেই কেন মনে করতে পারছেন না তিনি। সত্যিই কি এরকম কোনও চিঠির খসড়া ক্লাইভ দেখিয়েছিলেন তাঁকে?

ব্যস্ত হয়ে খাস মুনশিকে তখনই তলব করলেন মিরজাফর।

‘হালে কর্নেল ক্লাইভ কোনও চিঠির খসড়া পাঠিয়েছিলেন আমাকে?’ শুধোলেন নবাব।

মাথা ঝুকিয়ে খাস মুনশি জানাল, ‘জি হুজুর।’

‘চিঠির খসড়া পাঠিয়েছিলেন?’ পরম বিস্ময়ের সঙ্গে ফের শুধোলেন নবাব।

‘আপনি দেখেছেন। মঞ্জুরও করেছেন। খসড়ার উপরে আপনার দস্তখত রয়েছে।’

ধন্দে পড়ে যান মিরজাফর। ‘আমি দস্তখত করেছি? ইয়াদ নেই কেন?’

‘জি হুজুর। আপনার দস্তখত করা ওই চিঠির নকল মহাফেজখানায় আছে।’

নবাব স্মৃতি হাতড়াতে থাকেন।

অস্বস্তিতে পড়ে মহাফেজখানা থেকে চিঠির নকল আনতে ছোটে খাস মুনশি।

গোবিন্দমল্ল বললেন, ‘মুনশি ঠিকই বলছে। ক্লাইভ সাহেবের পাঠানো চিঠির খসড়ায় আপনি দস্তখত করার সময় আমি হাজির ছিলাম আপনার সম্মুখে।’

‘দেখেছিলে চিঠিটা? কী ছিল চিঠির বিষয়? ইয়াদ আছে?’

‘বিলকুল ইয়াদ আছে হুজুর। মুসিবতের আন্দেশায় বেচ্যায়েন হয়ে ওঠা রামনারায়ণজিকে ক্লাইভ সাহেব লিখেছিলেন যে পাটনার কুরসিতে তিনিই বহাল থাকবেন।’

‘আমি মঞ্জুর করেছিলাম ওই বয়ান?’

গোবিন্দমল্ল মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘জি হুজুর।’

এতক্ষণ নবাবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে এই আলাপ আলোচনা শুনছিলেন মিরকাজিম। সহসা তার মনে হল তাকে ধোঁকা দিয়েছেন নবাব। পাটনার কুরসিতে বসাবেন বলে এতকাল তাকে বুঝ দিয়ে গিয়েছেন। এখন সব ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। রাগে কাঁপতে লাগলেন মিরকাজিম। দরবারি সহবতের তোয়াক্কা না করেই চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আপনি নোটঙ্কি করছেন বড়ে ভাইয়া। দু-দিন আগে চিঠিতে কী লিখেছেন তা ইয়াদ নেই আপনার?’

মিরকাজিমের কথার ভঙ্গিতে শিউরে উঠলেন গোবিন্দমল্ল। এ যে ভয়ানক বেতমিজি। কেউ কখনও এ ভাবে নবাবের সঙ্গে কথা বলে না। তিনি নবাবের রিস্তেদার হোন বা অন্য যেই হোন।

নবাব নিজেও স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। প্রবল বিরক্তির সঙ্গে চাইলেন সহোদরের মুখপানে।

নবাবের প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে ফের গর্জন করে উঠলেন মিরকাজিম, ‘আপনি ধোঁকা দিয়েছেন আমাকে। পাটনা অভিযান এক ধোঁকাবাজি। আপনি কর্নেল ক্লাইভের হাতের পুতুল।’

‘খামোশ। বেওকুফ কাঁহিকা।’ ঘর কাপিয়ে চিৎকার করে উঠলেন মিরজাফর খাঁ। নবাবের গলা থেকে এমন জোরালো আওয়াজ অনেকদিন কেউ শোনেনি। কেঁপে উঠলেন গোবিন্দমল্ল। ছুটে এল অন্দরমহলের গোলাম-দাখিলারা।

নবাবের অনুমতির তোয়াক্কা না করে দ্রুত ঘর ছেড়ে চলে গেলেন মিরকাজিম।

রাগে লাল হয়ে উঠেছে মিরজাফরের মুখটা। থরথর করে তিনি কাঁপছেন। হাতের ইশারায় গোলাম-দাখিলাদের চলে যেতে বললেন। কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন গোবিন্দমল্ল।

রাগে ফুঁসছেন মিরজাফর খাঁ। কিন্তু এ রাগ অক্ষমের। শুধু ফোঁসফোঁসানি আছে, বিষ নেই। তাঁর মনের এই আগুন অন্য কাউকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে না। শুধু পোড়ায় তাঁর নিজেরই কলিজা। নবাবি রিয়াসতে সরাসরি নবাবের উপরে কোনও ইলজাম আনা এক ঘোর বেতমিজি। এর একমাত্র সাজা হল মওতের নিদান। লেকিন মিরকাজিমের বিরুদ্ধে কোনও কড়া কদম ওঠানোর হিম্মত নবাবের নেই। তিনি আজ হীনবল।

হতাশায় ডুবতে থাকেন মিরজাফর খাঁ। তিনি নবাব হিসেবে নাজুক, নালায়েক—এই অপ্রিয় সত্যটা মেনে নিতে হচ্ছে। তাঁকে মাড়িয়ে যাচ্ছে সবাই, যেভাবে নরম ঘাস মাড়িয়ে যায় সকলে। তাঁর বুকের উপর পা দিয়ে রয়েছে ইংরেজ। তাঁকে অবজ্ঞা করছেন রায়দুর্লভ, রামনারায়ণ এমনকি সামান্য ফৌজদার রাজারাম। এদের কাউকেই সবক শেখানোর হিম্মত তাঁর নেই। কারণ ক্লাইভ। এ তো গেল ঘরের বাইরের কিসসা। কিন্তু ঘরের অন্দরে? যাদের সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক, তারা আজকাল উঠতে বসতে ইলজাম আনে নবাবের উপরে। তাদের শিকায়ত– নবাবের রিস্তেদার হলেও এই নয়া জমানায় সে ভাবে প্রতিষ্ঠা পাননি তারা। মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি সকলেই নিজের রিস্তেদারদের নিজামতের শাসন কাঠামোয় উঁচু উঁচু পদ দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের পুত্র মিরন ছাড়া আর কার জন্য কী করেছেন মিরজাফর খাঁ?

মুখ বুজে এ-সব অভিযোগ সহ্য করেন মিরজাফর আর মনের মধ্যে গুমরে গুমরে মরেন। কী করে তিনি বোঝাবেন সকলকে যে নিজামতের শাসনযন্ত্রের পুরো রাশ তাঁর হাতে নেই। তিনি ইংরেজদের অগ্রাহ্য করে চলতে পারবেন না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও টোপিওয়ালাদের চাপে অনেক কিছুই তাঁকে মেনে নিতে হয়।

মাঝে মাঝে মাথার উষ্ণীষটা বড্ড ভারী বলে বোধ হয় নবাবের। মাথা টলমল করে। উষ্ণীষটা ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে। কখনও কখনও মনে হয়, মসনদ ছেড়ে কোনও অজানা অচেনা এক দেহাতে পালিয়ে গিয়ে আজনবি এক আদমির মতো দিন গুজরান করতে পারলে হয়তো তিনি শান্তি পেতেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে ওঠে না। তাঁর অন্তর থেকে দুসরা মিরজাফর খাঁ বলে ওঠেন, ‘হলেই না হয় পুতুল নবাব, তবুও তো নবাব। ভোগ-বিলাসের কথাটা একবার ভেবে দেখো। আর যাই হোক, কর্নেল ক্লাইভ তো তোমার ভোগের তাগদ কেড়ে নেয়নি। মসনদ ছেড়ে, কসবি-বাইজি-খুবসুরতিদের ছেড়ে, দৌলতের মোহ ছেড়ে ফকিরের মতো দিন গুজরান করতে পারবে তুমি?

না! পারবেন না মিরজাফর। ভোগের লালচ তাঁর মরেনি। আর এই মসনদ এক আজিব চিজ। মানুষকে আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরে। কেউ জোর করে টেনে নামিয়ে না দিলে নিজের ইচ্ছেয় মসনদ ছেড়ে যাওয়া যায় না।

হতাশা, হীনমন্যতা, গ্লানি আজকাল কুরে কুরে খায় মিরজাফরের অন্তঃস্থলকে। তবুও নেশা জমাট বাঁধলে জেগে ওঠে অহংবোধ। তকাব্বুরি – তিনি নবাব, সুবে বাংলার নবাব। ক্ষণেকের জন্য ফিরে আসে খুনজোশি। দোলা লাগে রক্তে। অকারণ এক ভালোলাগার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হন মূর্খ মিরজাফর। নেশা ছুটলেই ফের হতাশার দরিয়ায় ডুবতে থাকেন।

বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করতে ফরসির নলটা টেনে নিয়ে ঘন ঘন তাতে টান দিতে থাকেন নবাব। চিঠির খসড়া হাতে নিয়ে খাস মুনশি কক্ষে প্রবেশ করে সেলাম জানায়।

মুনশির হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে দ্রুত তাতে চোখ বুলিয়ে ফের একবার স্তম্ভিত হন মিরজাফর খাঁ। সত্যিই তিনি দস্তখত করেছেন খসড়ার নীচে। কী করে মঞ্জুর করলেন এই বয়ান?

খাস মুনশি ও গোবিন্দমল্ল চোখ চাওয়াচাওয়ি করে নীরবে হাসেন। এ কারসাজি তাদের। রামনারায়ণের কড়ি দুজনের জেবের ভিতরেই খানিকটা করে ঢুকেছে। আজকাল সুবহসাম নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকেন নবাব। কখন কার উপরে কী হুকুম করেন নিজেরই খেয়াল থাকে না। এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েছিলেন খাস মুনশি ও গোবিন্দমল্ল।

মূল পরিকল্পনাটা অবশ্য গোবিন্দমল্লের। ক্লাইভের পাঠানো চিঠির নাম করে তারা নবাবকে পড়ে শুনিয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বয়ান। মূল খসড়ার সঙ্গে তার কোনও মিলই ছিল না। নেশার ঘোরে ঝিম মেরে থাকা মিরজাফর কানে শুনে চিঠির বয়ানে আপত্তিকর কিছু খুঁজে পাননি। ঢুলু ঢুলু চোখ দুটোকে কোনওরকমে টেনে খুলে খাস মুনশির বাড়িয়ে দেওয়া কাগজে দস্তখত করে দিয়েছিলেন। নবাবকে শোনানো হয়েছিল এক বয়ান, সই করার জন্য এগিয়ে দেওয়া হয়েছিল অন্য একটা কাগজ।

সেদিনও চোখচাওয়াচাওয়ি করে মুখ টিপে হেসেছিলেন গোবিন্দমল্ল ও খাস মুনশি।

কাগজটা মুনশির হাতে ফিরিয়ে দিয়ে সচকিত হয়ে বসেন নবাব। এই কড়া শীতেও নবাবের কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ছুটে গিয়েছে আফিমের নেশা। ভয়ানক রুষ্ট হয়েছেন ক্লাইভ। তাঁকে তুষ্ট করা দরকার। সত্যিই যদি এই ওয়াক্তে তিনি তার ফৌজ নিয়ে কলকাতায় ফিরে যান, আর শিবভট্ট ও সুজাউদ্দৌলা যদি একযোগে বাংলায় হানা দেন তাহলে?

এই মানসিক চাপ আর সইতে পারলেন না নবাব। খাস মুনশির উদ্দেশে হুকুম করলেন, ‘দাওয়াত পাঠাতে হবে ক্লাইভকে। জলদি কাগজ নিয়ে এসো। চিঠির মুসাবিদা করতে হবে।’

.

নবাবের চিঠি নিয়ে ক্লাইভের কাছে হাজির হলেন চতুর গোবিন্দমল্ল। এঁর মনের হদিশ রাখেন না মিরজাফর। এখনও তিনি মনে করেন গোবিন্দমল্ল হলেন তাঁর অতি বিশ্বস্ত একজন কর্মচারী।

চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে মুচকি হাসলেন ক্লাইভ। হাসির রেশ মুখে ধরে রেখেই শুধোলেন, ‘অচানক এখানে দরবারের আনজাম কেন?’

‘জানি না। তবে আমার আন্দাজ কোনও শুভ খবর আছে। আপনি যা চেয়েছিলেন তাই হবে।’

ক্লাইভ বললেন, ‘সে তো আমার খুশনসিবি। নবাবকে জানাবেন, আমি হাজির থাকব।’

বিদায় নিলেন গোবিন্দমল্ল।

গঙ্গার চরের উপরে নিজের তাঁবুর সামনে ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে আয়েস করছিলেন ক্লাইভ। শীতের দুপুরের রোদ তেরছা ভাবে এসে পড়েছে তার গায়ের উপরে। ক্যাম্পের ঘড়িয়াল ঘণ্টা পিটিয়ে জানাল, দুপুর তিনটে। আড়মোড়া ভাঙলেন ক্লাইভ। কোটের পকেট থেকে পাইপটা বের করে ঠোঁটে গুঁজলেন। চকমকি পাথরের খোঁজে পকেট হাতড়াচ্ছেন, এমন সময় তাঁবুর অন্দর থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন নবকৃষ্ণ।

ঠোঁটে গোঁজা পাইপ। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন ক্লাইভ।

তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘ঘরে ফেলে এসেছিলেন।’

চকমকি পাথরদুটো নব মুনশির হাত থেকে নিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘তুমি যে ভাবে আমার সব দরকারি জিনিসের খেয়াল রাখো, সেভাবে আর কেউ খেয়াল রাখতে পারে না মুনশি।’

এই প্রশংসায় বিগলিত হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে নবকৃষ্ণ বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ‘আমি হুজুরের ওফাদার। দাসানুদাস। আপনার সুখস্বাচ্ছন্দ্যের উপর নজর রাখাই তো আমার কাজ।’

‘বোসো মুনশি।‘ মুচকি হেসে বলেন ক্লাইভ।

ক্লাইভের ইজিচেয়ারের অদূরে রাখা একটা চৌপাইয়ের উপরে বসলেন নবকৃষ্ণ।

‘গোবিন্দমল্লের সঙ্গে দেখা হয়েছে?’ ক্লাইভ প্রশ্ন করেন।

‘জি হুজুর।’

‘কাল দরবার বসবে কেল্লায়। শুনেছ?’

‘জি হুজুর। দরবারে হাজির থাকার জন্য আপনাকে তো এত্তেলা পাঠিয়েছেন নবাব।’

‘কেন বলো তো?’

‘কেন আবার? মনিবকে ঢুঁসো মারতে গিয়ে মদ্দা গর্ধভটি নিজেই চিৎপাৎ হয়ে পড়ে ভাবছে মহা বেতমিজি হয়ে গিয়েছে।’ এই বলে নবকৃষ্ণ ফিক করে হাসেন। তারপর বলেন, এক চিঠিতেই নবাবের আত্মারাম খাঁচাছাড়া।’

‘মতলব?’ কথাটা বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করেন ক্লাইভ।

‘হার্ট ইজ আউট অফ দ্য চেষ্ট।’

হেসে উঠে ক্লাইভ বলেন, ‘লেকিন এর ক্রেডিট তো পুরো তোমার।’

জিভ কেটে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘এ কী কথা বলছেন হুজুর। আমার যে গর্দান যাবে।’

ক্লাইভ বলেন, ‘ক্রেডিট তোমার নয়? চিঠিটা মুসাবিদা করেছিলে তুমি। আমি এক লাইনও ডিকটেট করিনি। শুধু ড্রাফটটা অ্যাপ্রুভ করেছিলাম।’

 ‘প্যাঁচ দিয়ে এমন চিঠি লেখার কৌশল আপনার কাছ থেকেই তো শিখেছি হুজুর।’

‘নোকরি তো অনেকেই করে লেকিন কাজ শেখে ক’জন?’ এই বলে ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন ক্লাইভ। ‘চলো মুনশি। একটু হাঁটাহাঁটি করে আসি।’

নদীর চর বরাবর হাঁটতে থাকেন ক্লাইভ সঙ্গে নবকৃষ্ণ।

রুপোলি বালির গায়ে রঙিন বুটিদার নকশা। সুনসান প্রকাণ্ড চরখানা জুড়ে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছিল হরেক কিসিমের পরিযায়ী পাখি। তাদের এই নিশ্চিন্ত বিচরণের আনন্দে বাধ সাধল ক্লাইভ ও নবকৃষ্ণের পদসঞ্চার। মানুষের পায়ের আওয়াজ পেয়ে উড়ে পালাল পাখির দল। রঙিন চরটা সহসা বেরং হয়ে গেল।

.

ক্লাইভকে স্বাগত জানানোর জন্য নবাব স্বয়ং হাজির দুর্গের সদর দেউড়িতে। দেউড়ি থেকে বহুদূর পর্যন্ত বিছানো হয়েছে লাল গালিচা। এই পথে আসবেন ক্লাইভ। দেউড়ির দুপাশে পরপর রাখা রয়েছে তিনটি করে ছয়টি তোপ। তোপের নলগুলো চেয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। ক্লাইভকে স্বাগত জানাতে শূন্যে তোপ দাগার জন্য প্রস্তুত গোলন্দাজেরা।

হঠাৎই আওয়াজ উঠল পথের ধারে জমায়েত মানুষের মধ্যে থেকে। দূরে দেখা যাচ্ছে আকাশে উড্ডীন ইউনিয়ন জ্যাক। হাতির পিঠে চেপে আসছেন ক্লাইভ। তাঁর পিছনে ছোটোখাটো একটা ফৌজ। তুমুল হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল আমআদমি। কান খাড়া করে শুনলেন মিরজাফর। এরা ক্লাইভের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। কী আশ্চর্য! অবাক চোখে মিরজাফর দেখলেন ক্লাইভ নামের জাদুতে মোহিত হয়েছে পাটনাবাসীও। নবাব যেদিন পাটনা দুর্গে এসে ঢুকেছিলেন, সেদিনও হর্ষধ্বনি দিয়েছিল মানুষ। তবে এভাবে উল্লাসে ফেটে পড়েনি। সহসা মনের মধ্যে খানিকটা ঈর্ষা বোধ করলেন মিরজাফর খাঁ। কী রহস্য লুকিয়ে আছে ক্লাইভের ব্যক্তিত্বে? কী কলকাতা, কী মুর্শিদাবাদ, কী পাটনা, যেখানেই তাঁর পদসঞ্চার হোক না কেন তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয় অগণিত মানুষ। ক্লাইভের পাশে অন্য কারও অস্তিত্ব একেবারে ম্লান হয়ে যায় কেন?

আসলে সহজ একটা সত্য অনুধাবন করতে পারছেন না নবাব, তা হল—আমআদমি তাগদের বশ। বাহুবল যার বেশি, আমজনতা তার দিকেই ঝোঁকে। শুধু পদের গরিমায় মানুষকে বুঝ দেওয়া যায় না। দেশের হালহকিকত দেখে তারা নিজেরাই বুঝে নেয় তাগদের চাবিকাঠি কার হাতে।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *