কেমব্রিজ

কেমব্রিজ

এক স্নাতক শিক্ষার্থী হিসেবে ১৯৬২ সালের অক্টোবরে কেমব্রিজে এসেছিলাম আমি। সেকালের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ ফ্রেড হয়েলের সঙ্গে গবেষণা করার ইচ্ছায় সেখানে আবেদন করলাম। তিনি ছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরি বা স্থিতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বের প্রধানতম সমর্থক। তাঁকে জ্যোতির্বিদ বললাম, কারণ, কসমোলজি বা বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব তখনো কোনো গ্রহণযোগ্য ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু ঠিক এ বিষয়েই গবেষণা করার ইচ্ছা ছিল আমার। ফ্রেড হয়েলের ছাত্র জয়ন্ত নারলিকারের সঙ্গে এক সামার কোর্সে অংশ নেওয়ার পর এ ব্যাপারে আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গিয়েছিল। তখন হয়েলের অধীনে যথেষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থী ছিল। কাজেই অত্যন্ত হতাশ করে ডেনিস সায়ামার অধীনে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। অথচ তাঁর নাম আমি আগে কখনো শুনিনি।

অবশ্য তাতে আমার জন্য এক দিক দিয়ে হয়তো ভালোই হয়েছিল। কারণ, হয়েল খুব বেশি বাইরে থাকতেন। এমনকি তাঁর খুব একটা নজরেও পড়তাম না আমি। অন্যদিকে সায়ামাকে সব সময় কাছেই পাওয়া যেত এবং তাঁর সঙ্গে কথাও বলা যেত সহজেই। তবে তাঁর অনেক ধারণার সঙ্গেই একমত ছিলাম না। বিশেষ করে ম্যাকের নীতি বিষয়ে। এ নীতি অনুযায়ী বস্তুর জড়তার পেছনে মহাবিশ্বের অন্যান্য সব বস্তুর প্রভাব দায়ী। তবে এ বিষয়ে দুজনের ভিন্নমতই আমার নিজস্ব ধারণা বিকাশে উদ্দীপনা জুগিয়েছিল।

যখন গবেষণা শুরু করি, তখন দুটি ক্ষেত্রকে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল। সেগুলো হলো বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব ও মৌলিক কণা পদার্থবিদ্যা। দ্বিতীয়টি ছিল বেশ সক্রিয় আর দ্রুত পরিবর্তনশীল এক ক্ষেত্র। এটিই আমার মনকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। অন্যদিকে বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব ও সাধারণ আপেক্ষিকতা সেই ১৯৩০-এর দশকেই আটকে গিয়েছিল। এ বিষয়ে বিশ শতকের অন্যতম সেরা পদার্থবিদ নোবেল বিজয়ী রিচার্ড ফাইনম্যানের একটি কথা স্মরণযোগ্য। ১৯৬২ সালে ওয়ারশতে সাধারণ আপেক্ষিকতা ও মহাকর্ষবিষয়ক এক সম্মেলনে চমৎকার কিছু মন্তব্য করেছিলেন তিনি। স্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘এ আলোচনা থেকে আমি কিছুই নিতে পারলাম না। কিছু শিখতেও পারলাম না। এ বিষয়ে তেমন গবেষণাও হচ্ছে না, এটি আর সক্রিয় নেই। তাই সামান্য কিছু মেধাবী মানুষ এখন এ ক্ষেত্রটিতে গবেষণা করছেন। ফলে এখানে মূর্খরাই (১২৬ জন) ) এখন এর পৃষ্ঠপোষক। আমার রক্তচাপের জন্য এটা মোটেও ভালো ঠেকছে না। এর পরেরবার মহাকৰ্ষবিষয়ক কোনো সম্মেলনে যাতে না আসি, আমাকে সে কথা মনে করিয়ে দিয়ো।’

.

গবেষণা শুরু করার সময় এসব বিষয়ে তেমন সচেতন ছিলাম না। কিন্তু আমার কাছে সে সময় মৌলিক কণাবিষয়ক গবেষণাটা উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করার মতো সাদামাটা মনে হয়েছিল। আলো ও ইলেকট্রনের তত্ত্ব কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকস বা কণাবাদী বিদ্যুৎগতিবিদ্যার কাজকারবার রসায়ন ও পরমাণুর কাঠামো নিয়ে। এ বিষয়ে গবেষণা ১৯৪০ থেকে ১৯৫০-এর দশকেই পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই তখন সবার নজর গিয়ে পড়ল পরমাণুর নিউক্লিয়াসে কণাগুলোর মধ্যকার দুর্বল আর সবল পারমাণবিক বলগুলোর ওপর। কিন্তু অন্য বলগুলোর জন্য প্রযোজ্য একই ধরনের ফিল্ড থিওরি বা ক্ষেত্রতত্ত্ব এ বলগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারছিল না। আসলে বিশেষ করে কেমব্রিজ স্কুলের ধারণা ছিল, এ বলগুলোর জন্য কোনো ক্ষেত্রতত্ত্ব নেই। তাদের ধারণা অনুযায়ী সবকিছুই নির্ধারিত হয় ইউনিটারিটি বা এককত্ব দিয়ে। অর্থাৎ সম্ভাবনার নিত্যতা ও কণাদের বিক্ষেপের নির্দিষ্ট চারিত্রিক বিন্যাসের মাধ্যমেই সবকিছু নির্ধারিত হয়। এখন ভাবতে মজাই লাগে যে তখন এই দৃষ্টিভঙ্গিটিই কার্যকর হবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। আমার এখনো মনে আছে, দুর্বল পারমাণবিক বলের জন্য একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্বের প্রথম প্রচেষ্টাকে কীভাবে তাচ্ছিল্য করা হয়েছিল। অথচ সেটিই পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে বিশ্লেষণী এস-মেট্রিকস নিয়ে গবেষণার কথা তো এখন বিস্মৃতপ্রায়। আমি খুবই খুশি যে মৌলিক কণা নিয়ে তখন কোনো গবেষণা শুরু করিনি। তাহলে আমার তখনকার কোনো কাজই এখন আর টিকে থাকত না।

অন্যদিকে বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব ও মহাকর্ষ তখন ছিল অবহেলিত এক ক্ষেত্র। সে সময় এটি বিকশিত হওয়ার জন্য বেশ পরিপক্ব হয়ে উঠেছিল। মৌলিক কণার জন্য কোনো সুসংজ্ঞায়িত তত্ত্ব না থাকলেও এ ক্ষেত্রটির জন্য এমন একটি তত্ত্ব ছিল। সেটি হলো আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব। কিন্তু একে অসম্ভব রকমের জটিল বলে ভাবা হতো। আইনস্টাইনের ক্ষেত্র সমীকরণের যেকোনো সমাধান পেলেই তখন লোকজন একেবারে বর্তে যেত। তাদের পাওয়া এ সমাধান তত্ত্বটিকে ব্যাখ্যা করত বটে, তবে এ সমাধানের কোনো ভৌত তাৎপর্য আছে কি না, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ছিল না। সাধারণ আপেক্ষিকতার এই সেকেলে দলের সঙ্গেই ওয়ারশর সম্মেলনে মুখোমুখি হয়েছিলেন ফাইনম্যান। হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে, ওয়ারশর ওই সম্মেলনটি ফাইনম্যানের স্বীকৃতি পায়নি। অথচ সাধারণ আপেক্ষিকতার রেনেসাঁ হিসেবে একেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই সে সময় একে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য ফাইনম্যানকে ক্ষমা করা যেতে পারে।

একসময় নতুন প্রজন্ম এ ক্ষেত্রটিতে আসতে শুরু করল এবং সাধারণ আপেক্ষিকতা নিয়ে গবেষণার নতুন কিছু কেন্দ্রেরও জন্ম হতে দেখা গেল। এর মধ্যে দুটি কেন্দ্র ছিল আমার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর একটির অবস্থান ছিল জার্মানির হামবুর্গে বিজ্ঞানী প্যাসকাল জর্ডানের অধীনে। সেখানে আমি কখনো যাইনি। তবে সেখানে জন্ম নেওয়া রুচিশীল গবেষণাপত্রগুলো দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সাধারণ আপেক্ষিকতা নিয়ে আগের বিদ্ঘুটে কাজের তুলনায় এগুলো ছিল একেবারেই বিপরীত চরিত্রের। হারমান বন্ডির অধীনে লন্ডনের কিংস কলেজে ছিল আরেকটি কেন্দ্র।

সেন্ট অ্যালবান্সে আমি গণিত নিয়ে তেমন চর্চা করিনি। আবার অক্সফোর্ডেও পদার্থবিদ্যার খুবই সহজ কোর্স নিয়েছিলাম। সে কারণে সায়ামা আমাকে জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণার পরামর্শ দিলেন। তবে ফ্রেড হয়েলের সঙ্গে কাজ করতে ব্যর্থ হয়ে অন্য কোনো বিরক্তিকর বা ফ্যারাডের ঘূর্ণনের মতো ভূকেন্দ্রিক কোনো বিষয়ে গবেষণায় আমার আগ্রহ ছিল না। কসমোলজি বা বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে কাজ করতেই কেমব্রিজে গিয়েছিলাম। তাই শেষমেশ স্থির করে ফেললাম, বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়েই কাজ করব। সে জন্য সাধারণ আপেক্ষিকতা নিয়ে লেখা পুরোনো পাঠ্যবইগুলো পড়তে শুরু করলাম। পাশাপাশি সায়ামার অন্য তিন ছাত্রের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে লন্ডনের কিংস কলেজে লেকচার শুনতে যেতে লাগলাম। এভাবে আমি এ-সংক্রান্ত শব্দ ও সমীকরণগুলো বুঝতে পারলেও বিষয়টিতে সত্যিকারের কোনো অনুভূতি পেতাম না।

আমাকে হুইলার-ফাইনম্যানের তথাকথিত বিদ্যুৎ তত্ত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সায়ামা। এর ভাষ্য হলো, বিদ্যুৎ ও চুম্বক সময় প্রতিসাম্য। কোনো ল্যাম্পে সুইচ অন করা হলে তা মহাবিশ্বের অন্য সব বস্তুর প্রভাবের ফল। এ কারণে আলোকতরঙ্গ অসীম থেকে ল্যাম্পের ভেতরে আসা এবং তার ভেতরই শেষ হওয়ার বদলে ল্যাম্প থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। হুইলার – ফাইনম্যানের বিদ্যুৎ তত্ত্ব কার্যকর হতে ল্যাম্পের বাইরে থেকে আসা সব আলো মহাবিশ্বের অন্য বস্তুতে শোষিত হওয়া দরকার। এটি কেবল বস্তুর ঘনত্ব সর্বদা ধ্রুব থাকা কোনো স্থিতিশীল মহাবিশ্বেই ঘটা সম্ভব। তবে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি মহাবিশ্বে এটি ঘটা সম্ভব নয়। কারণ, মহাবিশ্ব যতই প্রসারিত হতে থাকবে, তার ঘনত্ব ততই কমতে থাকবে। কাজেই কোনো প্রমাণের প্রয়োজন হলে দাবি করা হতো যে আমরা যে একটি স্থিতিশীল মহাবিশ্বে বাস করি, এটা তারই আরেকটি প্রমাণ।

এটি সময়ের তিরের ব্যাখ্যা করতে পারে বলে ধারণা করা হতো। এ রকম মতের কারণ হলো, বিশৃঙ্খলা ক্রমেই বাড়ছে এবং আমরা কেন ভবিষ্যৎ নয়, অতীত মনে করতে পারি। কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে ১৯৬৩ সালে হুইলার-ফাইনম্যানের বিদ্যুৎ ও সময়ের তিরবিষয়ক একটি সম্মেলন আয়োজিত হয়েছিল। সময়ের তির সম্পর্কে কিছু আজগুবি প্রস্তাব ফাইনম্যানের কাছে এতই বিরক্তিকর মনে হয়েছিল যে ওই সভার কার্যবিবরণীতে নিজের নাম রাখতেও অস্বীকার করেন তিনি। তাই তাঁকে মি এক্স হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবু মি এক্সের পরিচয় সবাই জানত।

একসময় আবিষ্কার করলাম, হয়েল ও নারলিকার তত দিনে প্রসারণশীল মহাবিশ্বের জন্য হুইলার-ফাইনম্যানের বিদ্যুৎ তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। মহাকর্ষের সময় প্রতিসাম্যতাবিষয়ক একটা নতুন তত্ত্বও সূত্রবদ্ধ করতে শুরু করেছেন তাঁরা। তত্ত্বটি ১৯৬৪ সালে রয়্যাল সোসাইটির এক সভায় প্রকাশ করলেন হয়েল। সেই লেকচারে আমিও উপস্থিত ছিলাম। প্রশ্নোত্তর পর্বে আমি বললাম, কোনো স্থিতিশীল মহাবিশ্বে সব বস্তুর প্রভাবের ভর অসীম হয়ে যাবে। হয়েল প্রশ্ন ছুড়লেন, আমি এ কথা বলছি কেন। উত্তরে জানালাম, হিসাব করে বের করেছি। কিন্তু সবাই ভেবে বসল, আমি হয়তো বুঝিয়েছি যে ওই লেকচার চলাকালেই হিসাবটি মাথার মধ্যে করে ফেলেছি। আসলে নারলিকারের সঙ্গে একটি অফিস ভাগাভাগি করতাম। সেখানে সময়সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্রের খসড়া দেখে এ সভার আগেই হিসাবটা করতে পেরেছিলাম।

অবশ্য এ ঘটনায় হয়েল অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। কারণ, সে সময় তিনি নিজের জন্য একটি ইনস্টিটিউট খোলার চেষ্টা করছিলেন। সে জন্য কোনো অর্থের জোগান না পেলে আমেরিকায় চলে যাওয়ারও হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছি। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর ইনস্টিটিউট পেয়েছিলেন এবং পরে সেখানে আমাকে একটি চাকরিও দিয়েছিলেন। কাজেই আমার সম্পর্কে তাঁর কোনো বিদ্বেষ ছিল না বলেই মনে হয়।

.

অক্সফোর্ডের শেষ বর্ষে খেয়াল করেছিলাম, আমার দৈহিক জড়তা ক্রমেই বাড়ছে। একবার সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলাম। তিনি শুধু বললেন, ‘বিয়ার ছেড়ে দাও।’

কেমব্রিজে আসার পর আমার এই জড়তা বেড়েই চলল। এক বড়দিনে সেন্ট অ্যালবান্সে হ্রদে স্কেট করতে গিয়ে নিচে পড়ে আর উঠতে পারলাম না। এসব সমস্যা খেয়াল করে আমাকে পারিবারিক এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেন মা। তিনি এক বিশেষজ্ঞকে দেখানোর পরামর্শ দিলেন। আমার ২১তম জন্মদিনের কিছুদিন পরই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য হাসপাতালে যেতে হলো আমাকে। বিভিন্ন রকম পরীক্ষার জন্য সেখানে প্রায় দুই সপ্তাহ থাকতে হলো। তারা ইলেকট্রোড ঢুকিয়ে আমার হাতের পেশির নমুনাও নিয়েছিল। আবার আমার মেরুদণ্ডে কিছু তেজস্ক্রিয় তরল ঢুকিয়ে বিছানা এপাশ-ওপাশ করে এক্স-রের মাধ্যমে সেগুলোর ওঠানামা দেখা হলো। সব পরীক্ষা শেষে আমার কী হয়েছে, আমাকে তার কিছুই বলল না তারা। শুধু এটুকুই জানানো হলো, আমার মাল্টিপল স্কেলেরোসিস হয়নি এবং বিরল কোনো রোগে ভুগছি আমি। বুঝতে পারলাম, তারা এটা আরও ভয়াবহ কোনো পর্যায়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে। আর সেটি হলে তখন আমাকে ভিটামিন দেওয়া ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকবে না। স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, একসময় ভিটামিনেও কোনো কাজ হবে না বলেই তারা আশঙ্কা করছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছুই জিজ্ঞাসা করিনি। কারণ, নিশ্চিত ছিলাম, তাদের কাছে বলার মতো কোনো সুসংবাদ ছিল না।

আমার এক দুরারোগ্য অসুখ হয়েছে, যেটি আমাকে কয়েক বছরের মধ্যে মেরে ফেলতে পারে জেনে বেশ আঘাত পেয়েছিলাম। আমার ভাগ্যে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল? হাসপাতালে থাকার সময় আমার উল্টো পাশে এক ছেলেকে লিউকেমিয়ায় মারা যেতে দেখলাম। একেবারে চোখের সামনে এমন ঘটনা মোটেও সুখকর ছিল না। সত্যিই আমার চেয়েও অনেকেই আরও খারাপ অবস্থায় আছে। অথচ এ অবস্থায় নিজেকে তো অন্তত অসুস্থ রোগী বলে মনে হয়নি। তাই নিজের ব্যাপারে কখনো দুঃখবোধ হলেই আমি মনে মনে ওই ছেলেটির কথা ভাবতাম।

.

আমার কী হবে বা অসুখটা কতটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, তা না জেনেই একপ্রকার হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। তবে চিকিৎসকেরা আমাকে কেমব্রিজে ফিরে গবেষণা চালিয়ে যেতে বললেন। তখন কেবল সাধারণ আপেক্ষিকতা আর বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেছি আমি। কিন্তু কিছুতেই এগোতে পারছিলাম না। কারণ গণিতে আমার ভিত্তি তেমন ভালো ছিল না। আবার পিএইচডি শেষ করার জন্য যথেষ্ট সময় বাঁচব কি না সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়াও কঠিন। স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে কোনো বিয়োগান্ত নাটকের চরিত্রের মতো মনে হচ্ছিল।

আমি ভাগনারের সংগীত শুনতে লাগলাম। সে সময় প্রচুর মদ পান করতাম বলে ম্যাগাজিনে কিছু লেখা ছাপা হয়েছিল। সেগুলো আসলে অতিরঞ্জিত। একবার একটি লেখায় কথাটি ছাপা হয়েছিল। লেখাটি বেশ ভালো হওয়ার কারণে পরেরগুলোয় সেটা থেকেই কপি করা হতে লাগল। আর কোনো কিছু ছাপার অক্ষরে বারবার দেখা গেলে একসময় সবাই সেটাকেই নিশ্চিত সত্য বলে বিশ্বাস করে বসে।

তবে আমার স্বপ্নগুলো সে সময় সত্যিই কিছুটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। এই রোগটা ধরা পড়ার আগে জীবন নিয়ে খুবই বিষণ্ণ ছিলাম। কোনো কিছুই আর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হতো না। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফেরার কিছুদিন পরই স্বপ্ন দেখলাম, আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আমার শাস্তি রদ করা হলে অনেক মূল্যবান কাজ করার আছে। আরেকটি স্বপ্ন বেশ কয়েকবার দেখেছি। সেটা হলো অন্যদের বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করছি আমি। মোটকথা, আমাকে যদি কোনোভাবে মরতেই হয়, তাহলে ভালো কিছু করে যাওয়া দরকার।

.

তবে আমি মরিনি। আসলে আমার ভবিষ্যৎ জীবন মেঘাচ্ছন্ন হলেও একসময় অবাক হয়ে দেখলাম, জীবনকে বেশ উপভোগ করতে শুরু করেছি। এ ক্ষেত্রে সত্যিকার পরিবর্তনটা এসেছিল জেন ওয়াইল্ড নামের এক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্কের পর। হাসপাতালে আমার এএলএস (অ্যামিওট্রোফিক লেটারাল স্কেলেরোসিস) সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় তার সঙ্গে প্ৰথম দেখা হয়েছিল। এটিই আমাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন জুগিয়েছিল।

দুজনের বিয়ের জন্য আমার একটা চাকরি দরকার। তবে চাকরির জন্য আমাকে অবশ্যই পিএইচডি শেষ করতে হবে। কাজেই জীবনে প্রথমবার সত্যিকার গবেষণা করতে শুরু করলাম। একসময় অবাক হয়ে দেখলাম, এটা করতে আমার বেশ ভালো লাগছে। অবশ্য একে হয়তো কাজ বলাও ঠিক হবে না। কে যেন একবার বলেছিল, বিজ্ঞানী আর পতিতারা কাজের বিনিময়ে অর্থ পান, সেই সঙ্গে তাঁরা কাজটাও উপভোগ করেন।

পড়ালেখার সময় নিজের সহায়ক হবে ভেবে আমি রিসার্চ ফেলোশিপ হিসেবে গনভিলে অ্যান্ড কিস কলেজে আবেদন করলাম। কলেজটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে লাগোয়া। ক্রমবর্ধমান দৈহিক জড়তার কারণে লেখা বা টাইপ করা আমার জন্য ক্রমেই কষ্টকর হয়ে উঠছিল। তাই ভাবলাম, আমার আবেদনপত্রটি জেন টাইপ করে দেবে। সে যখন কেমব্রিজে আমাকে দেখতে এল, তখন তার হাতে প্লাস্টার, ওর হাতটা ভেঙে গেছে। স্বীকার করছি, সে সময় আমার যতটা সমব্যথী হওয়া উচিত ছিল, ততটা হতে পারিনি। তবে আমার নির্দেশনা অনুযায়ী বাঁ হাত দিয়েই সে আবেদনপত্রটা লিখতে পেরেছিল। পরে সেটা টাইপ করার জন্য আরেকজনকে পেয়েও গিয়েছিলাম।

আবেদনপত্রে এমন দুজনের নাম দেওয়ার দরকার ছিল, যাঁরা আমার গবেষণা সম্পর্কে সুপারিশ করতে পারবেন। আমার সুপারভাইজার পরামর্শ দিলেন, আমি যেন হারমান বন্ডির সঙ্গে কথা বলে তাঁর নাম দিই। বন্ডি তখন লন্ডনের কিংস কলেজে গণিতের অধ্যাপক এবং সাধারণ আপেক্ষিকতা বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল। আমার একটা গবেষণাপত্র প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি জার্নালে প্রকাশের জন্য জমা দিলেন তিনি। কেমব্রিজে এক বক্তৃতা দেওয়ার পর তাঁকে সুপারিশ করার কথা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমার দিকে একবার ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে রাজি হয়ে গেলেন। অথচ ওই কলেজ থেকে তাঁকে যখন সুপারিশের জন্য লেখা হলো, তখন আমার কথা তাঁর মনে ছিল না। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, আমার কথা নাকি কখনো শোনেননি। বর্তমানে অনেকেই কলেজে রিসার্চ ফেলোশিপের জন্য আবেদন করছে। তাই কোনো সুপারিশকারী যদি একবার বলে বসেন, তিনি আবেদনকারীকে চেনেন না, তাহলে তার সুযোগ ওখানেই শেষ। কিন্তু তখন দিনকাল বেশ শান্তিময় ছিল বলা যায়। কলেজ কর্তৃপক্ষ আমার সুপারিশকারীর তরফ থেকে বিব্রতকর ওই জবাবের কথা আমাকে লিখে জানাল। এ কথা শুনে বন্ডির সঙ্গে আমার সুপারভাইজার দেখা করে তাঁর স্মৃতি চাঙা করতে সক্ষম হন। পরে বন্ডি আমার জন্য সুপারিশ করে যা লিখেছিলেন, আমি তার যোগ্য নই। যা-ই হোক, রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে গেলাম এবং তখন থেকেই আমি কিস কলেজের আজীবন ফেলো।

এ ফেলোশিপের মানে হলো জেন আর আমি এখন বিয়ে করতে পারব। ১৯৬৫ সালের জুলাইয়ে আমরা সেটা সেরে ও ফেললাম। সাফোকে এক সপ্তাহ মধুচন্দ্রিমা কাটালাম আমরা। তখন ওটুকুই করার সামর্থ্য ছিল। পরে সাধারণ আপেক্ষিকতার এক সামার স্কুলে যোগ দিতে আমরা কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম।

অবশ্য এ কাজ করা একদমই ঠিক হয়নি। আমরা একটা ডরমিটরিতে ছিলাম। জায়গাটা তখন একগাদা দম্পতি আর তাদের ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চার ভয়াবহ হইচইয়ে ভরপুর ছিল। আমাদের নবদম্পতির জন্য এটা একধরনের অত্যাচার বলেই মনে হয়েছিল। তবে অন্য দিক দিয়ে দেখলে ওই সামার স্কুলটি আমার বেশ কাজে লেগেছিল। কারণ, এ ক্ষেত্রটির নেতৃত্বস্থানীয় অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেখানে।

আমাদের বিয়ের সময় জেন লন্ডনের ওয়েস্টফিল্ড কলেজে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়ছিল। তাই ডিগ্রি সম্পন্ন করতে তাকে কেমব্রিজ থেকে সপ্তাহান্তে লন্ডনে যেতে হতো। অসুখের কারণে আমার মাংসপেশির দুর্বলতা বাড়তে লাগল। এর মানে, একসময় হাঁটাও আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠল। কাজেই আমাদের এমন কোনো জায়গা খুঁজে বের করতে হলো, যেখান থেকে আমি নিজেই সবকিছু করতে পারব। এ ব্যাপারে কলেজের সহায়তা চাইলাম। কোষাধ্যক্ষের মাধ্যমে জানানো হলো, কলেজের নীতি অনুযায়ী কোনো ফেলোকে বাসস্থানের জন্য সহায়তা করা হয় না। তাই বাধ্য হয়ে মার্কেটের কাছে নির্মাণাধীন একগুচ্ছ নতুন ফ্ল্যাটের মধ্যে একটা ভাড়া নিতে নাম জমা দিলাম। জায়গাটা আমাদের জন্য বেশ সুবিধাজনক। (অনেক বছর পর আবিষ্কার করলাম, ওই ফ্ল্যাটগুলোর মালিক ছিল আসলে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তারা আমাদের সে কথা বলেনি।) আমেরিকায় গ্রীষ্মকাল কাটিয়ে কেমব্রিজে ফিরে দেখলাম, ফ্ল্যাটগুলো তখনো ব্যবহারোপযোগী হয়নি।

এদিকে গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে আমাদের একটা রুম ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন কলেজের সেই কোষাধ্যক্ষ। তাঁর ভাবখানা এমন যেন আমাদের বিশাল কোনো ছাড় দিচ্ছেন। তিনি জানালেন, ‘সাধারণত এক রাতের জন্য আমরা এ রুমের ভাড়া ১২ শিলিং ৬ পেন্স নিই। কিন্তু আপনারা যেহেতু রুমে দুজন থাকবেন, তাই মাত্র ২৫ শিলিং দিলেই চলবে।’ আমরা কোনোমতে তিন রাত ছিলাম সেখানে। পরে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে একটা ছোট্ট বাসা খুঁজে পেলাম। ওটা আবার আরেকটি কলেজের মালিকানায়। সেটা তাদের এক ফেলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি তিনি উপশহরে এক বাসায় চলে গেছেন। তাঁর বরাদ্দের মেয়াদ তখনো তিন মাস বাকি। সে কারণেই আমাদের কাছে বাড়িটি তিন মাসের জন্য সাবলেট দিলেন তিনি

এ তিন মাসের ভেতর একই রাস্তায় আরেকটি খালি বাড়ি দেখতে পেলাম। এক প্রতিবেশী বাড়িটির মালিককে ডরসেট থেকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, তরুণেরা যখন থাকার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না, তখন বাড়ি খালি রাখা ভীষণ অন্যায়। কাজেই বাড়িওয়ালা ভদ্রমহিলা আমাদের কাছে বাড়িটি ভাড়া দিলেন। কয়েক বছর সেখানে থাকার পর বাড়িটি কিনে সংস্কার করতে চাইলাম। সে জন্য কলেজে একটা বন্ধকি ঋণের আবেদন করলাম। কলেজ কর্তৃপক্ষ সবকিছু দেখে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না। কাজেই শেষ পর্যন্ত আমাদের অন্য জায়গা থেকে ঋণ নিতে হলো। বাড়িটি সংস্কারের জন্য আমার মা-বাবাও টাকা দিয়েছিলেন।

.

সে সময় কিস কলেজের পরিস্থিতিটা ছিল লেখক সিপি স্নোর উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো স্মৃতিচিহ্নের মতো। তথাকথিত কৃষক বিদ্রোহের পর থেকে সেখানে ফেলোশিপগুলোর মধ্যে একটা তিক্ত বিভাজন চলছিল। তাতে সিনিয়রদের অফিস থেকে হটাতে অনেক জুনিয়র ফেলো জোট বেঁধে ভোট দিয়েছিল। সেখানে দুটি শিবিরে বিভক্ত ছিল : একদিকে পরিচালক আর কোষাধ্যক্ষের দল, অন্যদিকে প্রগতিশীল দল। একাডেমিক লক্ষ্য পূরণে প্রগতিশীল দলটি কলেজের বিপুল সম্পদ থেকে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর পক্ষে ছিল। প্রগতিশীল দলটি কলেজ কাউন্সিলের এক মিটিং থেকে সুবিধা নিতে পেরেছিল। সেই মিটিংয়ে আমাকেসহ ছয়জন রিসার্চ ফেলো নির্বাচনের সময় পরিচালক ও কোষাধ্যক্ষ অনুপস্থিত ছিলেন।

আমার প্রথম কলেজ মিটিংয়ের সময় কলেজ কাউন্সিলের নির্বাচন চলছিল। অন্য নতুন ফেলোদের আগেই বলা হয়েছিল কাকে ভোট দিতে হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নির্দোষ ছিলাম। তাই দুই দলের প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছিলাম আমি। সেবার কলেজ কাউন্সিলে প্রগতিশীল দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। সে কারণে পরিচালক স্যার নেভিল মট (যিনি পরে কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিকস বা ঘনীভূত বস্তুর পদার্থবিজ্ঞানের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন) রেগেমেগে পদত্যাগ করে বসেন। তবে এর পরের পরিচালক জোসেফ নিদহেম (চীনে বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে বেশ কয়েক ভলিউম বইয়ের লেখক) সেই ক্ষত সারিয়ে তোলেন। তার পর থেকে কলেজটি আগের যেকোনো তুলনায় শান্তিপূর্ণই ছিল বলা যায়।

.

বিয়ের প্রায় দুই বছর পর আমাদের প্রথম সন্তান রবার্টের জন্ম হয়। তার জন্মের কিছুদিন পর তাকে সিয়াটলে এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে নিয়ে গিয়েছিলাম। এটা ছিল আমাদের আরেকটা ভুল। আমার ক্রমবর্ধমান দৈহিক অক্ষমতার কারণে বাচ্চাটিকে আমি প্রায় কোনো সাহায্য করতে পারতাম না। তাই জেনকে বাচ্চাটি একা একাই সামলাতে হচ্ছিল। তাতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে। সিয়াটলের পর যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় ভ্রমণের কারণে তার ক্লান্তি জটিল আকার ধারণ করেছিল। রবার্ট এখন তার স্ত্রী কার্টিনা ও তাদের সন্তান জর্জ ও রোজকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলেই থাকে। তাতে বেশ বোঝা যায়, তখনকার সেই অভিজ্ঞতা তাকে ক্ষতবিক্ষত করতে পারেনি

প্রায় তিন বছর পর ম্যাটার্নিটি হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত এক পুরোনো ওয়ার্কহাউসে আমাদের দ্বিতীয় সন্তান লুসির জন্ম হয়। লুসি গর্ভে আসার পর আমাদের বাড়িটির সংস্কারকাজ চলছিল। তাই সে সময় শুকনো খড়ে ছাওয়া এক বন্ধুর কটেজে উঠেছিলাম আমরা। তার জন্মের মাত্র কয়েক দিন আগে নিজেদের বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম।

তথ্যনির্দেশ

মৌলিক কণা : এমন একটি কণা, যাকে আর ভাঙা যায় না বলে বিশ্বাস করা হয়। একসময় পরমাণুকে ভাবা হতো মৌলিক কণা। পরে পরমাণুকে ভেঙে আরও কণা পাওয়া যাওয়ার পর ধারণা করা হলো ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন হলো মৌলিক কণা। পরে প্রোটন ও নিউট্রন ভেঙেও পাওয়া গেল কোয়ার্ক নামের আরও ক্ষুদ্র কণা। এখন ফার্মিয়ন (কোয়ার্ক, লেপটন, অ্যান্টিকোয়ার্ক ও অ্যান্টিলেপটন) এবং বোসনকে (ফোটন, গ্লুয়ন এবং ডব্লিউ ও জেড বোসন) মৌলিক কণা হিসেবে ধরা হয়।

স্থিতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্ব: বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বে মহাবিশ্বের বিবর্তনে মহাবিস্ফোরণ মডেলের একটি বিকল্প তত্ত্ব এটি। বিশ শতকের মাঝামাঝিতে এই তত্ত্বটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কারণ, ১৯৪৮ সালের দিকে বিজ্ঞানী হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড ও ফ্রেড হয়েল এই তত্ত্বের সপক্ষে কিছু প্রভাবশালী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তবে কিছু পর্যবেক্ষণগত প্রমাণ এই তত্ত্বের বিপক্ষে গিয়েছিল। যেমন অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গের পটভূমি বিকিরণ। এ ধরনের বেশ কিছু প্রমাণ মহাবিস্ফোরণ মডেলের সঙ্গে মিলে যাওয়ার কারণে মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বটি ব্যাপকভাবে মেনে নিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। বর্তমানে স্থিতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বটি অধিকাংশ বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ববিদ, জ্যোতিঃপদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিদেরা নাকচ করে দিয়েছেন।

ফ্রেড হয়েল : ইংরেজ জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ স্যার ফ্রেড হয়েল (১৯১৫- ২০০১ খ্রি.)। স্টেডি স্টেট থিওরি বা স্থিতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বের জন্য বেশি পরিচিত। মহাবিশ্বের উৎপত্তির জন্য মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের বিরোধী ছিলেন তিনি। এমনকি মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বকে ব্যঙ্গ করতে গিয়েই বিগ ব্যাং শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তাঁর তাচ্ছিল্য করে দেওয়া নামটিই এখন তত্ত্বটির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

জয়ন্ত নারলিকার : ফ্রেড হয়েলের ছাত্রদের অন্যতম নামকরা ভারতীয় জ্যোতিঃপদার্থবিদ জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার। ভারতের কোলাপুরে এক পণ্ডিত পরিবারে ১৯৩৮ সালে জন্মেছিলেন তিনি। হয়েলের সঙ্গে তিনি কনফরমাল গ্র্যাভিটি থিওরি প্রণয়ন করেন, এটি এখন হয়েল-নারলিকার থিওরি নামে পরিচিত। কোয়াসি-স্টেডি স্টেট কসমোলজির জন্যও তিনি পরিচিত। এ ছাড়া তিনি ইংরেজি, হিন্দি ও মারাঠি ভাষায় বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, উপন্যাস, ছোটগল্প লিখেছেন। ভারত সরকারের কাছ থেকে পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ পেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন অ্যাডামস প্রাইজ। বর্তমানে ভারতের পুনেতে বাস করেন।

ডেনিস সায়ামা : ব্রিটিশ পদার্থবিদ ডেনিস উইলিয়াম সিয়াহুও সায়ামা (১৯২৬-৯৯ খ্রি.)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞান বিকশিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁকে আধুনিক কসমোলজির জনক বলা হয়। স্টিফেন হকিং ছাড়াও তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানী হিসেবে বিখ্যাত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জর্জ এলিস, ব্র্যান্ডন কার্টার, মার্টিন রিস, গ্যারি গিবনস, জেমস বিন্নি, জন ব্যারো উল্লেখযোগ্য।

ইউনিটারিটি বা এককত্ব: ইউনিটারিটি বা এককত্ব হলো কোয়ান্টাম সিস্টেমের পরিবর্তনের একটি শর্ত। শর্তটি বলছে, সিস্টেমের মধ্যে পরিবর্তন ঘটে সম্ভাব্য যত রকম ঘটনা ঘটতে পারে, সে সব কটি সম্ভাবনার যোগফল হবে ১।

পরমাণু : খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৬০০ বছর আগে (অনেকের মতে ২০০ খ্রিষ্টাব্দে) ভারতীয় দার্শনিক কণাদ বলেছিলেন, সব পদার্থই অতি ক্ষুদ্র আর অবিভাজ্য কণা দিয়ে তৈরি। তিনি এই ক্ষুদ্র মৌলিক কণার নাম দিয়েছিলেন পরমাণু। এ শব্দটিকে ভাঙলে পাওয়া যায় পরম ও অণু। পরম অর্থ প্রথম বা চূড়ান্ত। অর্থাৎ যে অণুর পর আর কিছু নেই। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ সালে গ্রিসের এক দার্শনিক লিউসিপ্পাসও একই কথা বলেছিলেন। কোনো বস্তুকে অবিরামভাবে ভেঙে যেতে থাকলে কী হবে, সেটি তিনি ও বুঝতে পারছিলেন না। এ প্রক্রিয়ার নিশ্চয়ই একটি শেষ আছে। এভাবে বারবার একটি বস্তুকে ভাঙতে ভাঙতে এমন পর্যায়ে আসবে, যখন সেই বস্তুকে আর ভাঙা যাবে না। লিউসিপ্পাসের ছাত্র ছিলেন আরেক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০-৩৭০)। ডেমোক্রিটাসও এভাবে চিন্তা করেছিলেন। তাঁর তত্ত্বগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এই বিশ্বজগৎ অতি ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি। এই কণাগুলো এতই ছোট যে সেগুলোকে আর ভাঙা সম্ভব নয়। ডেমোক্রিটাস এসব অতি ক্ষুদ্র কণার নাম দেন অ্যাটমস (Atomos)। গ্রিক এ শব্দের অর্থ অবিভাজ্য বা অভঙ্গুর, যাকে আর ভাঙা যায় না। এখান থেকে ইংরেজিতে অ্যাটম (Atom) শব্দটি এসেছে।

ফ্যারাডে : বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব মাইকেল ফ্যারাডে (১৭৯১-১৮৬৭ খ্রি.)। শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও বিদ্যুৎচুম্বকীয় তত্ত্ব এবং ইলেকট্রোকেমিস্টের ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন যে চুম্বকত্ব আলোকরশ্মিকে প্রভাবিত করে এবং এই দুই প্রত্যক্ষ ঘটনার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর আবিষ্কারের প্রধান বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎচুম্বকীয় আবেশ, ডায়াম্যাগনেটিজম, তড়িৎ বিশ্লেষণ। তাঁর আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল বের করেন বিখ্যাত বিদ্যুৎচুম্বকীয় সমীকরণ।

ইলেকট্রন : ঋণাত্মক চার্জযুক্ত একটি কণা, যা একটি পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘোরে। পরমাণুর নিউক্লিয়াস ধনাত্মক চার্জযুক্ত। সহজাতভাবেই ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের ধনাত্মক চার্জের প্রতি আকর্ষিত হয়। সে কারণে পরমাণুর কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রনগুলো ঘুরপাক খায়। ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জে জে থমসন ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন।

নিউক্লিয়াস : পরমাণুর কেন্দ্রীয় অংশ। এখানে শুধু ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন এবং চার্জ নিরপেক্ষ নিউট্রন থাকে। নিউক্লিয়াসে এই দুটি কণা শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বল দ্বারা পরস্পর একত্র থাকে।

দুর্বল পারমাণবিক বল : প্রাকৃতিক চারটি মৌলিক বলের মধ্যে মহাকর্ষের পর দ্বিতীয়তম দুর্বল বলের নাম দুর্বল পারমাণবিক বল বা দুর্বল নিউক্লিয়ার বল। এর প্রভাবের পাল্লা অল্প। এটি সব বস্তু কণার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তবে বলবাহী কণাদের ওপর এর কোনো প্রভাব নেই।

সবল পারমাণবিক বল : চারটি মৌলিক বলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বলটির নাম সবল পারমাণবিক বল বা শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বল। কিন্তু এর প্রভাব খুবই স্বল্প পাল্লায়। এই বল প্রোটন ও নিউট্রনের ভেতর কোয়ার্কগুলো ধরে রাখে এবং প্রোটন ও নিউট্রনকে একসঙ্গে ধরে রেখে পরমাণু গঠন করে।

ক্ষেত্র (Field) : স্থান ও কালে পুরোপুরি অস্তিত্বশীল একটা জিনিস একটি কণার বিপরীত, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটিমাত্র বিন্দুতে যার অস্তিত্ব।

ফিল্ড থিওরি বা ক্ষেত্রতত্ত্ব : কোনো ক্ষেত্রের পরিপ্রেক্ষিতে এবং অন্য বস্তু বা অন্য ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সাপেক্ষে কোনো ভৌত ঘটনা ব্যাখ্যা করতে যে তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়।

সাধারণ আপেক্ষিকতা : বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত তত্ত্ব। ১৯১৫ সালে এই তত্ত্ব দিয়েছিলেন তিনি। বিজ্ঞানের নিয়মকানুন সব পর্যবেক্ষকের জন্য একই হবে, তাদের গতিশীলতার ওপর এই নিয়মকানুন নির্ভরশীল নয়—এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই তত্ত্ব গড়ে উঠেছে। চতুর্থ-মাত্রিক স্থান-কালের বক্রতার ভিত্তিতে এটি মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে।

কণা পদার্থবিদ্যা : পদার্থবিজ্ঞানের যে শাখায় যেসব কণা বস্তু ও বিকিরণ সৃষ্টি করে তাদের প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করা হয়। সব কণার বর্তমান শ্রেণিবিভাগ স্ট্যান্ডার্ড মডেল বা প্রমিত মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়।

রিচার্ড ফাইনম্যান : নোবেল বিজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী। রিচার্ড ফাইনম্যান (১৯১৮-৮৮ খ্রি.) পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচিত। কোয়ান্টাম মেকানিকসে পাথ ইন্টেগ্রাল ফরমুলেশন, কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকস, অতি শীতল তরল হিলিয়ামের অতিপরিবাহিতার ক্রিয়াকৌশল ব্যাখ্যা এবং কণা পদার্থবিজ্ঞানে কাজের জন্য তিনি সুপরিচিত। কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকসে তাঁর অবদানের জন্য ১৯৬৫ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান।

হারমান বন্ডি : অ্যাংলো-অস্ট্রিয়ান গণিতবিদ ও বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ববিদ ছিলেন হারমান বন্ডি (১৯১৯-২০০৫ খ্রি.)। ফ্রেড হয়েল ও থমাস গোল্ডের সঙ্গে তিনি স্থিতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্ব গড়ে তুলেছিলেন। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়েও তাঁর অবদান আছে।

কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিকস : কণা পদার্থবিজ্ঞানে বিদ্যুৎগতিবিজ্ঞানের একটি আপেক্ষিকতাভিত্তিক কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব। কণাবাদী বিদ্যুৎগতিবিদ্যা সংক্ষেপে কিউইডি (QED) নামেও পরিচিত। আলো এবং পদার্থ কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করে, সেটিই আলোচনা করা হয় এখানে। এই তত্ত্বের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো কোয়ান্টাম মেকানিকস এবং বিশেষ আপেক্ষিকতা পরস্পরের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়ানো সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান এই তত্ত্বকে বলেছিলেন পদার্থবিদ্যার রত্ন (দ্য জুয়েল অব ফিজিকস)।

মহাকর্ষ বল : প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বলতম কথিত আছে, গাছ থেকে আপেল কেন নিচের দিকে পড়ে, সেটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিউটন মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। একইভাবে পৃথিবীর চারপাশে চাঁদ ঘোরার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। নিউটনের সূত্রমতে, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। যে বলে বস্তুগুলো পরস্পরকে আকর্ষণ করছে, তাকেই বলা হয় মহাকর্ষ বল। পৃথিবীর জন্য এই বলকে মাধ্যাকর্ষণ বল বলা হয়। নিউটনের সূত্রমতে, এই আকর্ষণ বলের পরিমাণ দুটো বস্তু ভরের গুণফল এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক।

জেন ওয়াইল্ড : পুরো নাম জেন বেরিল ওয়াইল্ড। ইংরেজ লেখক ও শিক্ষক জেনের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৯ মার্চ। ইংল্যান্ডের হার্টফোর্ডশায়ারের সেন্ট অ্যালবান্সে তাঁর জন্ম এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। ১৯৬২ সালে বন্ধুদের এক পার্টিতে স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে পরিচয় জেনের। হকিংয়ের বাঁচার কোনো আশা নেই জেনেও হকিংকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন জেন। ১৯৬৪ সালে দুজনের বাগদান সম্পন্ন হয় এবং ১৯৬৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা। এরপর টানা ৩০ বছর সংসার করেন। এ সময় তাঁদের রবার্ট, লুসি ও টিমোথি নামের তিন সন্তান জন্মে। তবে ১৯৯০ সালে হকিং ও জেন আলাদা থাকতে শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে ঘটে বিবাহবিচ্ছেদ। পরে মিউজিশিয়ান জোনাথান হেলিয়ার জোন্সকে বিয়ে করেন জেন। ১৯৯৯ সালে তিনি হকিংকে নিয়ে একটি আত্মজীবনী লেখেন, যার শিরোনাম মিউজিক টু মুভ দ্য স্টারস : আ লাইফ উইথ স্টিফেন। ২০০৭ সালে বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয় ট্রাভেলিং টু ইনফিনিটি : মাই লাইফ উইথ স্টিফেন শিরোনামে। এ বইটি অবলম্বনে ২০১৪ সালে নির্মিত হয় দ্য থিওরি অব এভরিথিং নামের চলচ্চিত্র।

লুসি হকিং : বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মেয়ে লুসির জন্ম ১৯৭০ সালে। তিনি একাধারে সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক ও শিক্ষাবিদ। হকিংয়ের সঙ্গে শিশু- কিশোরদের উপযোগী করে জর্জ সিরিজের পাঁচটি বই লিখেছেন তিনি

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *