কাঙালসংঘ – ৯

॥ ৯ ॥

অন্ধকারাচ্ছন্ন বস্তিতে যখন সভা চলছিল তখন আলো ঝলমলে শয়ন কক্ষে বসে নিজাম হায়দার স্বচ্ছ স্ফটিক গ্লাসে ভদকা পান করছিল। তার কমবয়সি স্ত্রীটি তার গ্লাসে ডালিমের রস ঢেলে দিয়েছে, রঙহীন ভদকা তখন রক্তবর্ণ হয়েছে। গ্লাসে চুমুক দেয়ায় নিজাম হায়দারকে প্রাগৈতিহাসিক রক্ত পিপাসু দানবের মতো দেখাচ্ছে। হঠাৎ দুটি কাশি শুনে নিজাম হায়দারের নেশা কেটে গেল।

কে কাশে বউ? টগর নাকি?

সতীনের পাগল ছেলের কাশিতে বিচলিত প্রৌঢ় স্বামীকে দেখে কম বয়সি স্ত্রীটি স্বভাবসুলভ হিংসায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু সেই হিংসা প্রকাশ করার সাহস তার হয় না। সে তার বস্ত্রের আরো স্খলন ঘটিয়ে আর চোখে মাদকতা এনে নিজাম হায়দারকে বশ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।

কিছু হয় নাই টগরের, দুই একটা কাশি এমন সবাই দেয়। আমার যে এমন বুক ধড়ফড় করে একটু তো দেখলেন না।

নিজাম হায়দারের হাতটি টেনে এনে তার বউ নিজের হৃৎপিণ্ডের উচ্ছলতা ছোঁয়াতে চায়, ঠিক তখন পরপর বেশ কয়েকটি কাশি দিয়ে তার সব প্রচেষ্টা ভেঙ্গে চুড়মার করে দেয় টগর। নিজাম হায়দার হাত টেনে নিয়ে গ্লাসটা টেবিলে রেখে বেরিয়ে যায় টগরের ঘরের দিকে।

টগরের চোখ মুখ ফুলে আছে, তার সূচালো নাকের অগ্রভাগ ডালিমের রসের মতোই লাল। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে সে ঘন ঘন নাকের তরল মুছছে। নিজাম হায়দার ছেলেকে এই অবস্থায় দেখে ভীষণ ব্যথিত হয়। তার মনে হয় তার ছেলে সঠিক যত্ন পাচ্ছে না। সিন্দুক ভর্তি যার সোনা, তার ছেলে কেন অবহেলায় থাকবে। টগরের সংবেদনশীল অঙ্গে সর্দি কাশিও ভয়ানক রোগ। নিজাম হায়দারের মনে হয়, রূপকথার গল্পের মতো, একমাত্র ছেলেকে হিংসা করে পুত্রদানে অক্ষম তার অন্য স্ত্রীরা। চাকর, ড্রাইভার সবাইকে তলব করা হলো। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জানা গেল, প্রতিদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে টগর পার্কে গিয়ে প্রজাপতির উড়াউড়ি দেখে এবং একটি আইসক্রিম খায়। ড্রাইভার তিরস্কৃত হলো, যদিও আইসক্রিম সম্বন্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা তার জানা ছিল না। নিজাম হায়দার অস্থির হয়ে ডাক্তারকে ফোন করে, পরামর্শ চায়। ডাক্তার টগরকে ওষুধ দেয় কম, নিজাম হায়দারকে শান্ত হওয়ার পরামর্শ দেয় বেশি। নিজের পকেট থেকে সুগন্ধি রূমাল বের করে নিজাম হায়দার টগরের নাক মুছিয়ে দেয় ৷

কষ্ট হইতাছে বাপ?

টগর মাথা নাড়ায়, নিজাম হায়দারের ব্যথিত বুকে এলিয়ে পড়ে। তার নাকের সর্দি দিয়ে বাবার পাঞ্জাবি ভিজিয়ে দেয়। নিজাম হায়দার ছেলেকে বুকে নিয়ে বলে,

তোমার আইস্ক্রিম খাইতে ভালো লাগে?

টগর নাক টেনে ‘হু’ করে শুধু। বাবার সাথে সে খুব বেশি কথা বলে না, বলার প্রয়োজনও হয় না, বাবা এমনিতে সব বুঝে নেয়।

এখন থেইকা আমি আর তুমি একসাথে আইসক্রিম খাব, বাবাকে ফেলে তুমি একা একা আইসক্রিম খাবা না। ঠিক আছে?

টগর আবারও ‘হু’ করে। বুকের মধ্যে শান্ত পায়রার মতো শুয়ে থাকে টগর। নিজাম হায়দারের মনে হয় ঘুমিয়ে গেছে তার ছেলে, তবুও কিছুক্ষণ বুকে চেপে ধরে রাখে। সে তার মেয়েদের যথেষ্ট ভালোবাসে, কিন্তু এই ছেলেটার প্রতি মমতা তার সীমাহীন, শুধু ছেলে বলে নয়, হয়তো তার অসম্পূর্ণতার কারণেই। ছেলেকে বালিশে শুইয়ে দিতেই টগর আবার চোখ মেলে, সে ঘুমায়নি। বাবা, আইসক্রিম খাব, তুমি আর আমি। হ্যা বাপ, তুমি আর আমি টগর প্রতিধ্বনি করে, তুমি আর আমি। অব্যয় দিয়ে বাঁধা এই শব্দ দুটো তার প্রিয় হয়ে যায়, সে জপতে থাকে, তুমি আর আমি।

পার্কের গেইটের বাইরে ষষ্ঠীচরণ গাড়ির স্টিয়ারিঙে হাত রেখে অপেক্ষায় থাকে। তার মতো গাড়িটিরও দৈন্য দশা, একটা হেড লাইট নষ্ট, দিনের বেলায় যদিও তাতে কোনো অসুবিধা হবে না। গাড়ির গায়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন তার বয়স এবং স্বভাব সম্পর্কে আভাস দেয়। অবাধ্য গাড়িটি ব্রেক চাপলে থামে নিজের মর্জিতে, চাবি ঘুরালে প্রথমেই উৎকট কাশে, মাঝে মাঝে বিকট হাসে। যৌন কাতর ষাড়ের মতো অন্য গাড়ি দেখলেই ছুটে যায়, স্টিয়ারিঙ ঘুরিয়েও ফেরাতে কষ্ট হয়। সামনের গ্লাসে অনেকগুলো ফাঁটা দাগ শাখা প্রশাখা মেলে আছে, সিটগুলোতে কুষ্ঠ রোগ ধরেছে, পেছন থেকে কালো ধোঁয়া বের হয় রাশি রাশি। ষষ্ঠীচরণ উপযুক্ত সঙ্গী পেয়েছে। অভূতপূর্ব ভাবে ষষ্ঠীর হাত কাঁপে। তার মনে হয়, উপযুক্ত সময়ে এই গাড়ি বেঁকে বসবে, নিজের প্রতিও ভরসা কম তার। একটা ঘোলা চোখ আর মনে এত শঙ্কা নিয়ে চারটি চাকা কি সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

টগর বসে আছে জারুল গাছের নিচে। জারুল গাছে বেগুনি ফুল ধরেছে, কিছু পাপড়ি নিচে পড়ে বিবর্ণ মাটিকে রঙিন করেছে। টগর অবাক বিস্ময়ে প্রজাপতির ডানার মতো জারুলের পাপড়ি দেখে। তার হা করা মুখ গড়িয়ে লালা ঝরে পড়ে। নিজাম হায়দারের ড্রাইভার জসিম একটু দূরে বসে পার্কে আসা নারীদের শরীর মাপে। সে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে, মেয়েরা প্রেমিকের বাহু আঁকড়ে ধরে হাঁটে, কাঁধে মাথা রেখে বসে, কেউ কেউ এলিয়ে পড়ে প্রেমিকের গায়ে। নিজের জন্য তার আফসোস হয়, কানের কাছে চুলে পাক ধরেছে, বউ হয়েছে নিরামিষ। যৌবন তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, যুবতি মেয়েরা তাকে যখন আংকেল ডাকে, খুব রাগ হয় তার। যৌবন তার নিভে যাওয়ার আগে একবার জ্বালিয়ে দিয়ে একটা যাচ্ছে। ইদানিং খুব নারীসঙ্গ পেতে ইচ্ছা করে, খুব মন চায়, কমবয়সি মেয়ে তার হাত ধরে ঝুলে ঝুলে হাঁটুক। আইসক্রিমের দোকান অথবা ফুচকার ভ্যান দেখে হাত পা ছুড়ে ঢং করে নাঁকি সুরে আবদার করুক। প্রতিদিন পার্কে এসে এসব ইচ্ছা তার তীব্রতা পায়। আর সে কিনা নিজাম হায়দারের লালা ঝরানো পাগল ছেলেটাকে পাহারা দেয়! নিজের ভাগ্যকে খুব বিশ্রী একটা গালি দেয় সে।

একটু পরেই অবিশ্বাস নিয়ে জসিম খেয়াল করে, একটি যুবতি এবং সুন্দরী মেয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে হাসিমুখে। ভূতপূর্বে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি, জসিম তার আশেপাশে চেয়ে দেখলো, তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি। পড়ন্ত দুপুরে পার্ক প্রায় ফাঁকা, মেয়েটি নিশ্চিতভাবে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।

এক্সকিউজ মি ভাই, আপনি কি আমাকে একটা সাহায্য করতে পারেন। মেয়েটি তার দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বললো, কানের দুইপাশে পাকা জুলফি হয়তো মেয়েটার চোখে পড়েনি, আংকেল ডাকেনি, ভাই ডেকেছে। জসিম উদ্বেলিত এবং উত্তেজিত হয়ে বললো,

হ, হ্যা, অবশ্যই, কী সাহায্য?

মেয়েটি তার মুখে একটা লাজুক হাসি এঁকে বললো,

আসলে আমি এখানে প্রথমবার এসেছি, ওয়াশরুমটা খুঁজে পাচ্ছি না। আপনি কি বলতে পারবেন ওয়াশরুমটা কোথায়?

ওয়াশরুম বলতে এই পার্কে কিছু আছে কিনা তার হদিস জানে না জসিম। কোনো সময় প্রয়োজন হয়নি তার, ড্রেন কিংবা অল্প একটু আড়াল পেলেই তার কাজ হয়ে যায়। সে তর্জনি উঁচিয়ে হাত তুললো, কিন্তু তার বিভ্রান্ত তর্জনি কোনো দিক নির্দেশ করতে পারলো না। পড়া না শিখে আসা ছাত্রের মতো আমতা আমতা করতে লাগলো। মেয়েটি তাকে এই বিপন্ন অবস্থা থেকে উদ্ধার করলো,

আসলে আমি একা একা চিনব না বোধহয়, আপনি কি আমাকে একটু দেখিয়ে দিবেন প্লিজ। যদি আপনার কোনো সমস্যা না হয়।

জসিম লাফিয়ে উঠলো, টগর বেঞ্চের উপর নিশ্চল বসে আছে, আড়চোখে দেখে নিলো ৷

আরে না না, সমস্যা কী। হে হে, সমস্যা নাই।

মেয়েটির পাশে হাঁটতে হাঁটতে একটু আগে ভাগ্যকে দেয়া গালিটি ফিরিয়ে নিলো জসিম। পুরো পার্ক একবার চক্কর দেয়ার পর, দুজন ফেরিওয়ালার সাহায্যে তারা একটি ভগ্নপ্রায় ভবনের সামনে উপস্থিত হলো, ভেতর থেকে মলমূত্র মিশ্রিত একটা শক্তিশালী দুর্গন্ধ জানান দিচ্ছে, এটাই সেই ওয়াশরুম। ভিতরের পরিবেশ না দেখে, শুধুমাত্র গন্ধেই বলে দেয়া যায়, ভিতরের পরিবেশ একজন সুন্দরী নারীর জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। কিন্তু মেয়েটির বোধহয় প্রয়োজন খুব বেশি, তাই সে বেশি ইতস্তত করলো না। মেয়েটা তার হাতের হালকা ব্যাগটা জসিমের হাতে দিয়ে বললো,

কিছু মনে না করলে একটু ব্যাগটা ধরবেন? আমি আসছি।

একটা মেয়ের ব্যাগ বহন করার মতো সৌভাগ্যে জসিম অভিভূত হয়ে গেল, সেই দুর্গন্ধময় জীর্ণ ভবনের বাইরে লাল রঙের ব্যাগটি বুকে চেপে দাঁড়িয়ে রইলো সে।

টগরের উপর তখন কোনো চোখের পাহারা নেই। মনা দুরু দুরু বুকে টগরের পাশে গিয়ে বসলো, কিন্তু কিছু বললো না। টগর জারুলের বেগুনি পাপড়ি চোখের সামনে ঘুরায় আর মৃদু হাসে। তখন জলিল গোল প্লাস্টিকের বাক্স নিয়ে সেই বেঞ্চের সামনে ঘুরঘুর করে এবং আইসক্রিমের বিজ্ঞাপন করে কিন্তু সে কোনোভাবেই টগরের দৃষ্টি জারুলের পাপড়ি থেকে সরাতে পারে না। তার মরিয়া বিজ্ঞাপন যে কারো মনেই সন্দেহ উদ্রেক করবে। মনা গ্রাহক সেজে টগরকে প্রভাবিত করার জন্য একটি আইস্ক্রিম নেয় জলিলের কাছ থেকে। মনাকে আইস্ক্রিম খেতে দেখে টগর প্রলুব্ধ না হলেও দূরে এক জোড়া প্রেমিক প্রেমিকার তৃষ্ণা জাগে। তারা জলিলকে ডাকতে থাকে, এই আইসকিরিম, এই দিকে আসো।

জলিলের বাক্সে মাত্র দুইটা আইসক্রিমই ছিল, তার মধ্যে একটা ওষুধ মিশিয়ে শুধুমাত্র টগরের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা। জলিল তাদের ডাকে সাড়া দেয় না, কিন্তু টগরের সামনে বিজ্ঞাপন আব্যাহত রাখে। মনা টগরকে লক্ষ্য করে বলে,

আইস্ক্রিম খাবা?

টগর আইসক্রিমের লোভ সংবরণ করার জন্য মনার দিকে কিংবা তার হাতের রঙিন আইসক্রিমটার দিকে তাকায় না, বলে, ,

আইসক্রিম খাব, আমি আর বাবা।

তারপর অনুপস্থিত বাবাকে কল্পনায় উপস্থিত করে বলতে থাকে, বাবা, তুমি আর আমি, তুমি আর আমি।

এরমধ্যে সেই পিপাসার্ত প্রেমিক প্রেমিকা তাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়।

কী মিয়া ডাকলে শুনো না?

প্রেমিকটির ঝাঁঝালো কণ্ঠ শোনা যায়। জলিল জানায়, আইক্রিম নাই, শেষ। প্রেমিকটি তাতে ক্ষান্ত হয় না।

কী শেষ, দেখি, বরফ টরফ যা আছে কিছু একটা দেও।

এই বলে সে বাক্সের ঢাকনা খুলে একটি নিঃসঙ্গ আইসক্রিম পড়ে থাকতে দেখে। প্রেমিকার জন্য যে চাঁদ পেড়ে আনার সংকল্প করে, একটি আইসক্রিমের আবদার মেটানোর জন্য সে বেপরোয়া হতেই পারে।

এই যে আছে একটা। মিছা কতা কও ক্যান?

জলিলের দিকে একটা নোট ছুড়ে ফেলে, প্রেমিকার হাতে আইসক্রিম সমর্পণ করে, জলিলের বিপর্যস্ত দৃষ্টির সামনে বীরের বেশে প্রেমিকটি তার প্রেমিকাকে নিয়ে আবার ঝোপের আড়ালে চলে যায়। পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় জলিল বিমর্ষ হয়ে যায় এবং গাঁজা টানার একটা উপলক্ষ পেয়ে যায়। লুঙ্গির খুট থেকে গাঁজার পোটলাটা বের করে সেও চলে যায় একটা ঝোপের আড়ালে। এইসব ঘটনায় হতাশ হয়ে মনার আইসক্রিমটি কাঠি ত্যাগ করে মাটিতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করে। কাঠি হাতে বিমূঢ় হয়ে বসে থাকা মনার দিকে তাকায় টগর। মনার কপালের পোড়া দাগটিতে তার দৃষ্টি থমকায়, কুনজর থেকে রক্ষার জন্য হাজেরা ছেলের কপালে এই স্থায়ী ক্ষত চিহ্নটা এঁকেছিল। টগর সান্ত্বনার ভঙ্গিতে মনার হাত ধরে, বলে,

বেলুন, লাল বেলুন, আকাশে কালো হয়।

টগরের মন খারাপ হলে, সে একটা লাল বেলুন উড়ায় আকাশে, অনেক উপরে উঠে বেলুনটা যখন একটা বিন্দুর মতো দেখায়, তখন নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে সেটাকে কালো তিলের মতো দেখায়। আকার এবং রঙ পরিবর্তনে টগর বিস্মিত হয়, মন খারাপের কথা আর তার মনে থাকে না। মনা টগরের কথার মানে বের করতে পারে না, শুধু বোঝে ছেলেটা হয়তো লাল বেলুন চাইছে। সে তাকে বলে, তোমাকে অনেক লাল বেলুন দিব। আসো আমার সাথে। অপ্রত্যাশিতভাবে টগর সহজেই রাজি হয়ে যায় ৷

জসিম মলমূত্রের গন্ধে সয়লাব সেই নির্জন স্থানটিতে লাল ব্যাগ বুকে নিয়ে একটা সুন্দরীর সাথে সংক্ষিপ্ত অথচ আন্তরিক পরিচয়ের শেষ সম্ভাবনা ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে সে আকাশ পাতাল এক করে ফেলে। তার জীবনে যে রসের ধারা চুইয়ে পড়তে শুরু করেছে, তাকে কল্পনায় স্রোতস্বিনী নদী বানায়। কল্পনায় সব সম্ভাবনা ভেবে ভেবে রোমাঞ্চিত হয়ে শেষে সে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, ব্যাগের অধিকারিনী ফিরে আসছে না। ভিতরে গিয়ে খোঁজ করা শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ হবে, কিন্তু তাতেও একটা রোমাঞ্চকর পরিণতির সম্ভাবনা থাকে। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ধৈর্যহারা হয়ে সে ভিতরে ঢোকে। মানুষের বর্জ্যের নোংরা চিহ্ন ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই। জসিম হতভম্ব হয়ে ভাবে মেয়েটা গেল কোথায়? তারপর লাল ব্যাগ খুলে সে আরো অবাক হয়ে যায়, ব্যাগটা আগাগোড়া পুরোটাই ফাঁকা। লাল ব্যাগটার মতো মাথাটাও তার ফাঁকা হয়ে যায়। তারপর সে যখন জারুলতলাটা শূন্য দেখে, তার বিভ্রাট বৃদ্ধি পায়। জারুল তলায় মাটির ঢেলা দিয়ে চাপা দেয়া একটা চিরকুট পায় সে, চিরকুটটা তার জন্য নয়, নিজাম হায়দারকে উদ্দেশ্য করে লেখা। তবুও সে পড়ে এবং তার হাত পা অবশ হয়ে আসে।

সেদিন বিকালে যথাসময়ে মেরুন গাড়িটি জমিদার বাড়িতে প্রবেশ করে, নিজাম হায়দার বারান্দায় বসে প্রতিদিন এই সময়টার অপেক্ষায় থাকে, ছেলে তার বাম দিকের দরজা নিজেই খুলে বের হয়, তারপর ঘরে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত পথটাতেও হাত গলিয়ে ব্যাগ পিঠে ঝুলায়। ছেলে এই দুটি কাজ যে নিজ সামর্থ্যে সুচারু ভাবে করতে পারে, তাতেই নিজাম হায়দারের ভীষণ গর্ব হয়। বারান্দায় আরাম করার ভান করে এই মুহূর্তটির জন্য সে অপেক্ষা করে থাকে। ড্রাইভার জসিম আনাড়ি চালকের মতো গাড়িটি তীর্যক ভাবে পার্কিং করে, এবং খুব তড়িঘড়ি দরজা খুলে বের হয়ে নিজাম হায়দারের দিকে ত্রস্ত দৃষ্টি দেয়। বাম পাশের দরজা আর খুলে না। জসিম ওপরে উঠতে উঠতে নিজাম হায়দার ধারণা করে নেয় যে, তার ছেলের কিছু একটা হয়েছে। তার কঠোর প্রতিক্রিয়াহীন চেহারাটা সেদিন প্রথমবারের মতো ফ্যাকাসে দেখায়। জসিম উপরে উঠতেই নিজাম হায়দারের গলায় অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে, টগরের কী হয়েছে?

জসিম কিছু বলতে পারে না, শুধু চিরকুটটি এগিয়ে দেয়।

‘নিজাম হায়দার তোমার ছেলেকে নিয়ে গেলাম। ছেলের মূল্য তুমিই নির্ধারণ করো। টাকাটা আগামীকাল সকাল এগারোটায় হলুদ পলিথিনে ভরে শহরের পাশে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে আসবে। আমরা সংগ্রহ করে নিব। দুইদিন পর ছেলে পাবে। আর লাশ চাইলে বিনামূল্যেই পাবে।’ নিজাম হায়দারের তখন মনে হয় একী শাস্তি তাকে দিলো শয়তানের দল। নিজের ছেলেকে উদ্ধার করার চেয়ে তার মূল্য নির্ধারণটাই তার কাছে বেশি কঠিন মনে হলো ৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *