কাঙালসংঘ – ৭

॥ ৭ ॥

বকুলের ঘরে থাকতে মনার তেমন অস্বস্তি হয় না, বরং তার অভ্যস্ততার পক্ষে ব্যাপারটা সুবিধাজনক হয়, জীবনের অল্প কয়েকটি দিন বাদে সবসময় সে একজন নারীর সাথেই ছিল। তার ঘুম ভাঙত বুলবুলি, শালিক, টুনটুনির ডাকাডাকিতে, ঘুম ভেঙ্গে দাওয়ায় বসা মায়ের বিষণ্ণ দেহটা সে দেখতে পেত। এই শহুরে বস্তিতে হাতুড়ির সাথে ইট, পাথরের সংঘর্ষের উৎকট শব্দে সে জেগে ওঠে কিন্তু এখানেও একটা বিষণ্ণ দেহ সে দেখতে পায় ৷

গুরুজির পরিকল্পনাটা বকুলের কাছ থেকে লুকায়নি মনা। তাছাড়া তাদের একজন নারীও প্রয়োজন। বকুলও হয়তো মুক্তির এই সংকীর্ণ পথ পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে, মনে ভয় নিয়েও রাজি হতে বেশি সময় সে নেয় না।

ভবিষ্যত নিয়ে আলাপ করে তারা, কিন্তু দুটো মানুষ এক ঘরে থাকলে তাদের মধ্যে যা সবচেয়ে বেশি উন্মোচিত হয়, তা হলো তাদের অতীত। বকুলের ইতিহাস মনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে, কল্পনায় সে বকুলের গ্রাম সাজায়, বাবার চেহারা বানায়, মায়ের মুখ আঁকে। সে দেখে, বিরাট প্রান্তরের একপাশে ছোটো সবুজ তিল, এখানেই গাছপালা আর ঝোপঝাড় ঝাকরা চুলের মতো বেড়ে উঠেছে, বকুলদের ছোটো কুড়ে ঘর এবং সবুজের দেয়াল লুকিয়ে রেখেছে একটা ধূসর উঠান মূল গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন এই ছোটো তিলটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ঘন সবুজ দ্বীপের ছোটো একটা খণ্ড কেউ ভাসিয়ে দিয়েছে।

এই বিচ্ছিন্নতার কারিগর বকুলের পিতামহ। সে বর্ষাকালে নৌকা ভাসিয়ে দূর দেশে গিয়ে সওদা করতো। ধান চাল নিয়ে যেত, আর নানান কিসিমের জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে আসতো, মেয়েদের সাঁজগোজের সরঞ্জাম, বাসনকোসন, শাড়ি ধুতি ইত্যাদি। দূর দেশে গিয়ে সে কিছু বদভ্যাসও নিয়ে এসেছিল। জনশ্রুতি আছে, বিভিন্ন অঞ্চলে তার আরো অনেকগুলো স্ত্রী আছে, সেগুলোকে মানুষ প্রয়োজন বিবেচনা করেছে, বদভ্যাস নয়। লোকের কথায় যতটুকু জানা যায়, বদভ্যাসটা এনেছিল বার্মা থেকে। সেখান থেকে একবার নিঃস্ব হয়ে ফিরেছিল বকুলের দাদা, সাথে এনেছিল মদের নেশা। তারপর এখান থেকে ধান, চাল নিয়ে গিয়ে প্রায়ই সে ফিরতো খালি হাতে, চোখের নিচে কালি নিয়ে। যা কিছু গড়েছিল সব শেষ হলো, জমা হতে লাগলো মদ আর ওষুধের খালি বোতল। মৃত্যুর পর জানা গেল, ভিটেটাও বেচা হয়ে গেছে। গ্রামের বাইরে এক খণ্ড অনুর্বর বিক্রি অনুপযোগী জমি ছাড়া সব গেছে মদের তৃষ্ণায়। বকুলের বাবা সেই জমির অর্ধেকটাতে কোনোমতে ঘর বানিয়ে থাকতে লাগলো, বাকি অর্ধেকটাকে বহু যত্ন আর তোয়াজ করে অল্পকিছু ফসল পেত।

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে গ্রামের অধিকাংশ সামাজিকতায় ব্রাত্য হয়েই থাকলো তারা। বিচার আচারে, বিয়ে কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গ্রামের মানুষ অহরহই তাদের ভুলে যেতে থাকলো। যোগাযোগ যতটুকু ছিল, তা একপাক্ষিক। বকুলের বাবা গ্রামের সম্ভ্রান্তদের সামনে হাত কচলে, ঘাড় বাঁকা করে, অজস্র গুণকীর্তন করে বর্গায় চাষ করার জন্য কিছু জমি আদায় করলো। টিকে থাকার প্রয়োজনে মানুষ সবই করতে পারে। তারপর সংসার বড়ো হয়েছে, ঘরে এসেছে উর্বর বউ। বউকে যত সহজে গর্ভবতী করা যায়, মাটিকে অত সহজে যায় না। পরিবার বড়ো হয় কিন্তু ফসল বাড়ে না। একটা বাছুরকে ঘাস খাইয়ে যুবতি করেছে বকুলের বাবা, কুদ্দুসের ষাড়ের কাছ থেকে ঘুরিয়ে এনেছে বেশ কয়েকবার। কুদ্দুসের ষাড় গ্রামের সব গাভীকে পোয়াতি করেছে কিন্তু বকুলদের গরু রয়ে যায় নিঃসন্তান। ঘরের বউ দুটি মেয়ে জন্ম দিয়েছে, পেটে সম্ভবত আরেকটি আছে। বকুলের বাবা মাঝেমাঝে আফসোস করে, গরুটা বাঁজা না হয়ে যদি বউটা হতো!

সে বছর মাটিও কেমন কৃপণ হয়ে গেল, ধানের চেয়ে চিটা হলো বেশি। বকুলের গর্ভবতী মা ছাড়া সবার পেট খালি। গরুটাকে এবার বেচতেই হবে, গরুটা যে বাঁজা এই বদনাম ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, হাটে তাই বেশি দাম উঠলো না। সেই টাকায় মাসখানেক টিকে রইলো তারা, তারপর আবার শুরু হলো উপোস। এরমধ্যে তাদের সংগ্রামকে আরো ভয়াবহ করে তোলার জন্য বকুলের বড়ো বোন একটা ভীষণ অসুখ বাঁধালো। বকুলের মা তার অসুস্থ মেয়েকে এমনভাবে বকে, যেন ইচ্ছে করে সবাইকে শাস্তি দেয়ার জন্য সে অসুখ ডেকে এনেছে। খুব বেশি শাস্তি অবশ্য সে দেয়নি, কিছুদিনের মধ্যেই মরে গিয়ে সংসারে একটি মুখ কমিয়ে স্বস্তি দিয়ে গেল সবাইকে। এই মৃত্যুতে গ্রামের লোকে ভর্ৎসনা করলো বকুলের বাবাকে।

তুই মারলি মাইয়াডারে, একবার ডাক্তার দেখাতি পারলি না?

বকুলের বাবা মনে মনেই গজগজ করে। গঞ্জে ডাক্তারের কাছে কি সে যায়নি? শেষ সম্বল পঞ্চাশ টাকা খরচ করে ওষুধও সে কিনেছিল, ডাক্তার বলেছিল, ওষুধ ভরা পেটে খাওয়াতে, তা ঘরে চাল নেই, পেট ভরবে কীসে?

ঘরের একটি মুখের অভাব পূরণ করতেই বকুলের মায়ের প্রসব বেদনা উঠলো। সারাদিন ব্যথায় কাতরিয়ে সন্ধ্যায় সে একটা অপুষ্ট মেয়ে শিশুর জন্ম দিলো। যে শিশু জন্ম নিয়ে চিৎকার করে তার আগমনের ঘোষণা দেয়নি, ক্লান্তিতে একটু গুঙ্গিয়ে উঠেছিল কেবল। তার অপুষ্ট মায়ের পেটেই সে অভাব পেয়েছিল, চিৎকার দেয়ার শক্তি তার হয়ে ওঠেনি। পৃথিবীর বাতাসে ঘণ্টা দুই শ্বাস বিনিময় করে সে চলে গিয়েছিল। এই শিশুর মৃত্যুতে বকুল ছাড়া কেউই তেমন শোক করেনি, ছেলে হলেও না হয় একটু চোখের জল ফেলা যেত।

কিছুদিন পর বকুলেরও মনে হলো, তার বড়ো আর ছোটো বোনটি মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধার বীভৎস অবসাদ তাদের স্পর্শ করেনি। সে শুনেছে, মৌলভি সাহেব বলেছে বাচ্চারা মারা গেলে বেহেশতে চলে যায়, সেখানে গিয়ে তার দুই সহোদর নিশ্চয়ই মাংস দিয়ে পেট ভরে ভাত খাচ্ছে। মাঝে মাঝে হিংসাও হয় তার।

মাটির কৃপণতায় গ্রামের প্রায় সব ঘরই ছিল অভাবগ্রস্ত, সবারই নিজস্ব সংগ্রাম আছে। দুর্যোগের সময় মানুষ হয়ে ওঠে সবচেয়ে স্বার্থপর, ডুবে মরার আগে মা-ও সন্তানের ঘাড় চেপে ধরে ভাসতে চায়। গ্রাম থেকে আলাদা হওয়ার জন্য বকুলদের ক্ষুধার্ত মুখগুলো কারো চোখে পড়তো না, পড়লেও যে কারো দয়ার উদ্রেক হতো না, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

তারপর একটি ঘটনায় তাদের সংকট গিয়ে ঠেকল চরমে। উঠানের একপাশে বসে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিল বকুলের বাবা, ধানের চারাগুলো বাতাসে নির্বিকার দুলছে, ফসল দেয়ার কোনো তাড়া নেই তাদের। বকুলের বাবা মনে মনে শুধু দিন হিসাব করে। কিন্তু দিন যে ফুরায় না, গাছে এখনো শীষ দেখা যায়নি, কবে যে ধান হবে। শাক লতাপাতা খেয়ে বেঁচে আছে, কয়েকদিন পর তাও জুটবে কিনা বলা যায় না। এমন সময় নাক টানার মতো ঘোৎ ঘোৎ শব্দ শুনে পেছনে ফিরে দেখলো, একটা ছোটোখাট কালো প্রাণী তার উঠানে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে, ভালো করে লক্ষ করে বুঝলো, একটা শুকরের বাচ্চা। নিশ্চয়ই মাঠের ওপাশের ঋষিবাড়ি থেকে দলছুট হয়ে এখানে এসে পড়েছে। বকুলের বাবার কোনো ঘেন্না হলো না, বরং তার পেটের প্রবল টান তাকে জানিয়ে দিলো, এই প্রাণিটিও খাদ্য, ফসলের মাঠের ঐপাড়ে তার মতো হাত পা মাথা সমৃদ্ধ মানুষেরাই খায় বিনা সঙ্কোচে, তাহলে তারা কেন পারবে না। শুকরের আর্তচিৎকার শোনা গেল কিছু পরেই, সেই চিৎকার মাঠের বাতাসে মিলিয়ে গেল।

বকুলের মা আপত্তি করেছিল, কিন্তু সে আপত্তিতে জোর ছিল না। অনেকদিন পর হলুদ মরিচে মাংস রান্না হলো বকুলদের ঘরে। সংস্কারের বাধাও ছিল দুর্বল, যেহেতু ক্ষুধা ছিল প্রবল। বহুদিন পর পেট ভরে খেলো তিনজন। বকুলের বাবা সবাইকে সাবধান করে দিলো, এই ঘটনা যেন কেউ জানতে না পারে। বাঁচার জন্য খেলে কোনো পাপ হয় না বলে সান্ত্বনাও দিলো বকুলের মাকে। সে রাতে বকুলের মা অঝোরে কেঁদেছিল। ক্ষুধা মিটে যাওয়ায় তার পাপবোধ জাগ্রত হয়ে উঠেছিল।

তাছাড়া দুটো মৃত সন্তানের বকেয়া শোক পরিশোধ করার তাড়নাও ছিল

তার। তারপর উপোস দিয়ে আরো বহুদিন কেটেছে তাদের, না খেয়ে তারা মরেনি। হয়তো নিষিদ্ধ খাদ্যটা না খেলেও তারা মরতো না, এই অনুশোচনা বকুলের মায়ের মনে অগ্নিকুণ্ডের মতো জ্বলতে থাকে ৷ জৈষ্ঠ মাসে এক টুকরি চাল আর এক হালি পাকা আম নিয়ে ঘোমটা প্রসারিত করে বকুলের মা হাজির হয় মৌলবি সাহেবের কাছে। প্রথমে সে কৌতূহল নিয়েই জানতে চায় নিষিদ্ধ বস্তু ভক্ষণের কী শাস্তি, শাস্তি সে আগেই জানে। তারপর সে জানতে চায় এর কোনো প্রতিকার আছে কিনা। মৌলবি সাহেবের তখন সন্দেহ হয়। মাঠ পেরিয়ে একটি শূকর ছানার নিখোঁজ সংবাদ তার কানেও এসে পৌঁছেছিল। মৌলবি সাহেব জানালেন তওবা করতে হবে। উপঢৌকনের চাল আর হলদে আভায় মিষ্টতার পূর্বাভাস দেয়া আম দেখে মৌলবি সাহেব খুশি হন। বকুলের মাকে তওবা পড়ান এবং পরিবারের অন্য সবাইকেও তওবা করার নির্দেশ দেন। রাতে আম আর দুধ দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় মৌলবি সাহেব এই আমের উৎস সম্পর্কে নিজের বিবির জিজ্ঞাসার জবাবে সবই বলে দেন, মিথ্যা তিনি বলতে পারেন না, কিংবা বলতে চাননি। মৌলবি সাহেবের বিবির কল্যাণে পুরো গ্রামময় কথাটা ছড়িয়ে পড়লো। গাছে তখন ফল ছিল, গোলায় ছিল ধান কিন্তু নিরানন্দ জীবনে অভাব ছিল একটু উত্তেজনার, এই খবরটা উত্তেজনা উন্মাদনা সবই জোগালো। মারমুখি হলো একদল, আগুন জ্বালাতে তৎপর ছিল তারা, কিন্তু গ্রীষ্মের গরমে আগুনের বিচার অনেকের পছন্দ হলো না, বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত শ্রেণির। তারা এই উত্তেজনার রস তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে চায়, তাই সালিশ বসলো বট গাছের ছায়ায়। কান ধরানো, নাকে খত দেওয়া এসব কিছু সাচ্ছন্দ্যেই করেছে বকুলের বাবা। শাস্তির এসব নাটকীয়তায় লোকজনের মনোরঞ্জন হয় কিছুটা কিন্তু তৃপ্তি হয় না। যার মান নেই অপমানও নেই, তার কাছে এসব শাস্তি পানসে লাগে। তাই সমাজপতিরা আরো কঠোর এবং দীর্ঘস্থায়ী সাজা ঘোষণা করলেন, থেকে সমাজচ্যুত হলো। বকুলরা সেদিন গ্রাম থেকে আলাদা থাকায় তারা একরকম সমাজচ্যুত ছিলই, তাই করতে পারেনি বিশেষভাবে এই শাস্তির কী প্রকোপ তা আন্দাজ বকুলের বাবা। প্রথম উপলব্ধি হলো, যখন তাকে বর্গা দেয়া জমিগুলো কেড়ে নেয়া হলো, তার মাচার কচি লাউ হাটে রয়ে গেল অবিক্রীত, তার সুফলা আমগাছটাকে একরাতে নিঃস্ব করে দিয়ে গেল গ্রামের বেকার যুবকেরা, কিন্তু সে বিচার চাইতে যেতে পারলো না কারো কাছে।

পানি অপবিত্র হওয়ার ভয়ে বকুলের মাকে পুকুর ঘাটে নামতে দেয় না কেউ। ক্ষেতের আইল ধরে আধামাইল হেঁটে খালে গিয়ে গোসল করে বকুলের মা, নির্জন দুপুরে জনশূন্য খালপাড়ে ভয়ে অস্থির হয়ে থাকে সে, বকুলকে পাড়ে বসিয়ে রেখে তড়িঘড়ি ডুব দেয়। নির্দিষ্ট করে সে বলতে পারে না কীসের ভয় তাকে আতঙ্কিত করে, পানিতে ডুবে থাকা কোনো সত্তা, বাতাসের ঘোড়ায় পুরো মাঠ ঘুরে বেড়ানো কোনো অশরীরী নাকি মানুষের ভয়? বকুল সবসময় দোটানায় থাকে, বাবার সাথে ক্ষেতে যাবে নাকি মার সাথে খালে যাবে। তারা মানুষের অভাববোধ করে প্রবল ভাবে, মানুষ যেহেতু তাদের ত্যাগ করেছে, তাই তারা নিজেরাই মানুষ উৎপাদন করবে। বকুলের বাবা আবার তার মায়ের সাথে থাকতে আরম্ভ করলো। বকুলের মায়ের খালি পেট আবার ভরে উঠলো। ঘরের পাশে অল্প একটু ক্ষেতে যা কিছু ধান হয় তাতে সাড়ে তিনজনের সংসার চলে না। বকুলের বাবা দুই গ্রাম পেরিয়ে কুঞ্জদের জমিতে কামলা খাটতে যায়, কিছু টাকা আসে। সেই টাকায় সওদা করতে তাকে যেতে হয় চার মাইল দূরের হাটে, যেখানে তার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে মানুষের জানা নেই। আধপেটা খেয়ে তারা কোনোমতে বেঁচে থাকে। সংসারে মানুষ বাড়ানোর প্রয়াসে পরিবার তাদের আরো ছোটো হয়ে যায়। এবার আর মুমূর্ষু নয়, মৃত ছেলে সন্তান প্রসব করে বকুলের মা, প্রসবকালীন জটিলতায় অথবা মৃত ছেলের নগদ শোকে বকুলের মা সারাদিন আহাজারি করে গভীর রাতে শোক সমাপ্ত করে চিরদিনের জন্য নিথর হয়।

বকুলের বয়স তখন আট বছর। বাপ মেয়ের সংসারও চলে যায় কোনোভাবে। তার বয়স যখন চৌদ্দ তখন তার বাবা মারা যায় সপ দংশনে। গ্রামের মানুষ তখন বলাবলি করে, এটা তার কুকর্মের ফল। নিষিদ্ধ বস্তু ভক্ষণজনিত অপরাধটা তারা ভুলতে পারে না এবং তার লাশ সৎকার করতে অস্বীকৃতি জানায়। বকুল উঠানের পাশে কাঠাল গাছের ছায়ায় গর্ত করে তার বাবাকে মাটি চাপা দেয় ৷

বকুল জন্ম থেকেই মানুষের সংস্পর্শ খুব একটা পায়নি, একা থাকা তার জন্য অসম্ভব ছিল না। কিন্তু শত্রু ছিল তার বয়স। এই বয়সে একা থাকা যায় না, এইটুকু বোধ সে নিজের মধ্যে টের পেয়েছিল। একা থাকলে ছিড়ে খাবে হিংস্র জন্তুরা, নিরাপত্তার জন্য সে চলে এলো এই শহরে, যেখানে মানুষ গিজগিজ করে। কিন্তু এখানে আসার পর হাজার হাজার মানুষের মাঝে থেকেও সে আরো বেশি একাকীত্ব অনুভব করলো। তারপরের ঘটনা খুব একঘেয়ে, যে শহরে ছায়া নেই, মায়া নেই সেখানে বেঁচে থাকার জন্য নিজের একমাত্র সম্বল শরীরটাকেই হাটে তুললো বকুল ৷

বকুলের অনেক দুর্ভাগ্যকে পাশ কাটিয়ে তার সবুজ তিলের মতো ছোটো বাড়িটাই মনে উজ্জ্বল হয়ে থাকে মনার। পুরুষানুক্রমে এরকম এক টুকরো ভূমির স্বপ্ন তারা বয়ে চলেছে, নদীর ভোগে ভিটা যাওয়ার পর তার পূর্ব পুরুষ ভবঘুরে হয়েছিল, শ্রমিক হয়েছিল, তারা ঘাম আর অশ্রু বিসর্জন দিয়েও এক খণ্ড ভূমির অধিকার ফিরে পায়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *