কাঙালসংঘ – ১

॥ ১ ॥

এই শহরের দূরসম্পর্কের আত্মীয় একটি গ্রাম হচ্ছে রাখালপাড়া। চেহারায় কিংবা স্বভাবে শহরের সাথে মিল না থাকলেও শুধু জেলা একই হওয়ায় আত্মীয়তাটুকু বজায় আছে। রাখালপাড়া নামের সাথে পেশার সম্পর্ক হয়তো অতীতে ছিল, বর্তমানে একেবারেই নেই। গ্রামের অধিকাংশই দরিদ্র চাষী, গৃহপালিত পশু প্রায় সব ঘরেই আছে। সেসব পশু অবসরের শ্রম আর ফসলের উচ্ছিষ্টের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। হাড় জিরজিরে, পেট ফোলা হাবাগোবা গরু ছাগলগুলোকে দেখতেও নিতান্ত গ্রাম্য মনে হয়। এরা কষ্টে সৃষ্টে আধসের দুধ দিয়েই বর্তে যায়। মুরগিগুলো ডিম দেয় ক্ষীণকায়, তাও কালেভদ্রে, মন চাইলে। মোরগগুলো বংশবৃদ্ধি ছাড়াও মূলত জামাইদের আপ্যায়নের জন্য বেঁচে থাকে। এইসব পশুপাখি গ্রামের অর্থনীতিতে খুব একটা হেরফের করে না, তবুও তারা গৃহস্থের ঘরের পাশে অনেকটা ঐতিহ্যের মতো টিকে আছে। বাপ দাদা পুষত তাই তারাও পোষে। সব বাড়িতেই খোঁয়াড় আর গোয়ালঘর আছে। যাদের দুধ কেনার পয়সা আছে, যারা চাষবাসের মতো নিম্নবর্গীয় কাজ আর করে না, তাদের গোয়ালঘর থেকে গরু ছাগল বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

মোসলেম জমাদ্দারের পয়সা হয়েছে, তাই গোয়ালঘরও শূন্য। এই শূন্য গোয়ালঘরে আশ্রয় পেয়েছিল মনু মিয়া।

ধান কাটার মরশুমে উত্তরের কামলাদের সাথে ভেসে এসেছিল মনু মিয়া। জমিতে কাস্তে চালানোর সময় সূর্যের আলো তার পেশিতে প্রতিফলিত হয়ে চকচক করতো। একাই সে দু‘জনের সমান ধান কাটতে পারতো। তার কর্মদক্ষতা দেখে মোসলেম জমাদ্দারের মনে একটা চিন্তা খেলে যায়, বাড়িতে তার সারা বছরই টুকটাক কাজ থাকে, এমন একটি কাজের লোক থাকলে মন্দ হয় না। মনু মিয়াকে প্রস্তাব দিলে সে বিনা দ্বিধায় রাজি হয়ে যায়, ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে গেছে সে, এবার একটু থিতু হতে চায় ৷

জমাদ্দার সাহেব জানে এমন তাগড়া জোয়ান ছেলেকে গোয়াল ঘরের টিন বেশিদিন বেঁধে রাখতে পারবে না। তাই তাকে আরো শক্ত বাঁধনে বেঁধে দিয়েছিলেন। কানা ফকিরের পালিত কন্যা হাজেরার সাথে বিয়ে হয়ে যায় মনু মিয়ার। কোনো উৎসব, অনুষ্ঠান এবং আশীর্বাদের অপচয় ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন হয়।

হাজেরা দেখতে একেবারেই সাধারণ কিংবা সাধারণের চেয়েও একটু কম, মাটির মতো রঙ, বেটে শরীরে শক্ত বাঁধুনি, চোখেও তেমন বিশেষত্ব নেই। তেল ছাড়া আর কোনো প্রসাধনের সাথে তার পরিচয় নেই। অন্য প্রসাধনের অভাব মিটাতেই বিয়ের দিন মাথায় তেল দিয়েছে উদার হস্তে। সেই তেল মাথা ছাড়িয়ে মুখে এসে পড়েছে, হাজেরা চকচক করছে কষ্টি পাথরের মতো। রূপ দিয়ে স্বামীর মন ভুলাবে এই দুরাশা সে করে না। উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে ছলাকলার শিক্ষাটুকুও কখনো পায়নি সে। পুরুষ মানুষ ভুলানোর কোনো অস্ত্রই তার কাছে নেই। তবুও সে জানে, এইমাত্র যাকে নিজের সম্পত্তি করে নিয়েছে, সে যতই কুরূপা হোক পুরুষ তাকে নেড়েচেড়ে দেখার লোভ সামলাতে পারবে না। স্থিতির প্রত্যাশায় সে রাতেই হাজেরার গর্ভে সংসারের বীজ বপন করে মনু মিয়া ৷

পুরুষ মানুষ দিনে ঠ্যাঙাবে, রাতে সোহাগ করবে, এই নিয়মটিকেই সত্য ভেবে এসেছে হাজেরা। সংসারে নারী দাসী হতে পারে সঙ্গী নয়, চিরদিন তাই দেখে এসেছে সে। প্রেম ভালোবাসা এসব শুধু ভদ্রলোকের বিলাসিতা, রূপকথার গল্প। মনু মিয়ার সাথে হাজেরার কয়েকটা দিন অবাস্তব রূপকথার মতোই কাটে। অনেক আবেগের সাথে তার নতুন করে পরিচয় হয়। মনু মিয়া আদর সোহাগ করার জন্য দিন রাতের সীমা মানে না। ক্ষেত থেকে বুনো ফুল জড়ো করে বউয়ের খোপায় গুঁজে দেয়। হীনমনা হাজেরাও ঐ মুহূর্তে নিজেকে রানি ভাবে।

গোয়ালঘরে হাজেরা রানি হয়ে থাকে, কিন্তু গোয়ালের বাহিরে সে চাকরানি। জমাদ্দার সাহেব বিষয়ী লোক, এই সমাজ উদ্ধারের বিয়েতে লাভের অঙ্কটা তার দিকেই ভারী থাকে। ঘরে বাইরে স্থায়ী দুটি কাজের লোক পাওয়া গেল। হাজেরার শক্ত বাঁধুনির শরীরটার সম্পূর্ণ উপযোগ করে জমাদ্দার গিন্নি তাকে যারপরনাই খাটায়। তবুও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ত্রুটিতে হাজেরার অকর্মণ্য এবং অবহেলা খুঁজে পায় সে। কটূক্তি করার সামান্যতম সুযোগও হেলা করে না জমাদ্দার গিন্নি। কথায় কথায় উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে চোখ রাঙায়, আশ্রয়ের খোঁটা দিয়ে গঞ্জনা দেয়। অপমান, গঞ্জনা এমনকি গালাগালিও হাজেরার জন্য রীতিমত সুপাচ্য খাবার। কানা ফকিরের সাথে ভিক্ষা করেছে সে, ভিক্ষার চেয়ে মানুষের বিরক্তি, তাচ্ছিল্য, তিরস্কার জুটত বেশি। খাবারের চেয়ে বেশি অপমান হজম করেছে তারা। এসব অপমান দারিদ্রের বর্ম ভেদ করে তার গায়ে এসে বিদ্ধ হয় না। নিরাশ্রয় হওয়ার দুশ্চিন্তাও তার নেই, যার এমন কর্মপটু পুরুষ আছে, তার আশ্রয়ের অভাব হবে না।

হাজেরার স্বামীগর্ব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ক্ষেতের আগাছা নিড়াচ্ছিল মনু মিয়া। জমির অর্ধেক আগাছাকে উচ্ছেদ করার পর হঠাৎ বাতাস শুরু হয়, অল্প সময়ের মধ্যেই বাতাস তেজি ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকে এবং কালো পাষণ্ড মেঘ বয়ে নিয়ে আসে। সেই মেঘ থেকে সোনালি চাবুকের মতো লিকলিকে একটা বজ্ৰ মনু মিয়াকে স্তব্ধ করে দেয়। ক্ষেতের অর্ধেক আগাছা উদ্বাস্তু হওয়া থেকে রক্ষা পায় ৷

মনু মিয়ার কাদামাখা লাশটা যখন গোয়ালঘরের সামনে উঠানে নামানো হয়, তখন হাজেরার ব্যাপারে সবার আগ্রহ হয়। মানুষ জড়ো হলো প্রচুর, শোকের চেয়ে কৌতূহলই ছিল বেশি। যে মরেছে সে চাকর শ্রেণির, মৃতের চেয়ে তাই মৃত্যুর কারণটাতেই আগ্রহ বেশি মানুষের। হাজেরা ঘরভর্তি মহিলা মানুষের মাঝখানে মূর্তির মতো বসে রইলো। তার অশ্রুপ্রবণ চোখে আজ খরা। বিলাপ করার জন্য খুব বেশি পীড়াপীড়িও কেউ করলো না। গরীব মানুষ, এমন কত দুর্যোগ তাদের পোহাতে হয়। তবুও হাজেরা কোনো নাটকীয় শোক না করায়, আশেপাশের বউ ঝিরা আহা! উহু! করার সুখ থেকে বঞ্চিত হলো। পুরুষদের একটা তামাশা দেখার সুযোগ মাঠে মারা গেল। বজ্রে মরা লাশের প্রদর্শনী শেষে সেই রাতেই সৎকার করা হলো। মৃত্যুর পর ভূমিহীন মনু মিয়া এক খণ্ড ভূমি পেলো, গ্রামের গোরস্থানে।

প্রবল একটা দ্বিধার মধ্যে হাজেরার চোখের জল ফুরিয়ে গিয়েছিল, গর্ভে প্রাণ আসার আনন্দ এবং স্বামীহীন হওয়ার শোক তার দ্বিধাগ্রস্ত মনে একটা স্থায়ী বিকৃতি রেখে গিয়েছিল। হাজেরার মধ্যে একটা গুমোট ভাব চলে এসেছে, পৃথিবীর কোনো কিছুর সাথেই সে আর সংযোগ স্থাপন করতে পারে না। একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একা একা থাকে সে। বেঁচে আছে কিন্তু তার মধ্যে যেন আর প্রাণ নেই, শুকনো কাঠের শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পত্রহীন বৃক্ষের মতো তার প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ হয়। অথচ কাজ সে ঠিকই করে, আগের চেয়ে বেশিই করে। নিজের অন্ধকার জীবন হাতড়ে কাজ ছাড়া আর কিছু খুঁজে পায় না সে। সবটুকু মনোযোগ দিয়ে থালাবাটি মাজে, কাপড়চোপড় ধোয় তপস্যার মতো, ঘর পরিষ্কার করে নিষ্ঠার সর্বোচ্চ দিয়ে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিখুঁত ভাবে কলের মতো কাজ করে যায়, যন্ত্রণা তাকে যন্ত্র বানিয়েছে। যত কাজ করলে ক্লান্তিতে এক মুহূর্ত আর জেগে থাকা যায় না, তত কাজ করে সে। নিজের ঘরে এসে মনু মিয়ার হাজারটা স্মৃতিচিহ্নের মধ্যে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। ভাবনার সকল পথ রুদ্ধ করে দিয়ে মনটাকে বন্দী রাখে সে। কাজে হাবুডুবু খেয়ে, শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকা ছাড়া তার জীবনে আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। সে ভুলে যায়, তার পেটে একটা প্রাণ আছে ৷

কপালের দোষে হাজেরা বিধবা, আর বয়সের দোষে যুবতি। অরক্ষিতা, স্বামীহীনার দৈহিক কষ্ট কল্পনা করে অনেক পুরুষের মনেই সমবেদনা জন্মেছে। এই পুরুষদের মাঝে বয়স্ক পুরুষদের দরদটাই যেন বেশি। হাজেরার মুখে শ্রী ছিল না, তাতে দরদে ভাটা পড়েনি, দেহে তার যৌবনের জোয়ার। কিন্তু সুযোগের অভাবে এবং কলঙ্কের ভয়ে অনেক পুরুষই এই সদ্য বিধবার সেবার বাসনা তাদের অপূর্ণ খায়েশগুলোর সাথে গোপনে লুকিয়ে রাখলো। সুযোগ যাদের আছে তারা নিজেদের লোভকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

জমাদ্দার সাহেবের বয়স হয়েছে, সেই সাথে মনের বিকারও বেড়েছে। নিজের বউয়ের স্থূল শরীর আর মাথাভর্তি পাকা চুল দেখলে বিতৃষ্ণা লাগে এখন। বউয়ের চুল মুঠোয় নিয়ে কিল, লাথি মারতেও সুখ লাগে না আর। বউয়ের চুল কাচা থাকতেই ছিড়তে ভালো লাগে, সোজা পিঠ কিল দিয়ে বাঁকা করতে যে আনন্দ, বাঁকা পিঠে তা আর কই? কুচকানো চামড়ায় চড় মারতেও রুচি হয় না আর।

হাজেরার মতো যুবতি, বিধবা এবং সহজলভ্য মেয়ের প্রতি তিনি একটা দায়িত্ব অনুভব করেন। তাছাড়া মনু মিয়া মরার পর তার যে ক্ষতি হয়েছে তার কিছুটা হলেও হাজেরার পোষানো উচিত বলে মনে করেন তিনি, হাজেরার প্রতি এক রকম অধিকারবোধও জন্মায় তার। তাই দেনা পাওনার হিসাব মেলানোর জন্য জমাদ্দার সাহেব একরাতে গোয়ালঘরে ঢুকলেন। হাজেরা ঝাঁপ খুলে দিলো, সে দেখতে সুশ্রী নয়, কিন্তু ভাগ্য ভালো ঘরে আলো ছিল কম। জমাদ্দার সাহেব খুব স্বাভাবিক ভাবে খাটে বসে বললেন, তোমার কষ্টে মনডা আমার কান্দে, তাই খবর নিতে আইলাম।

হাজেরার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায় না। তবে বুঝা যায় সে তাকিয়ে আছে মুসলেম জমাদ্দারের দিকে। জমাদ্দার সাহেব আরো একটু ভূমিকা করলেন, সারাদিন দেখি, তোমারে খুব খাটায় বুড়িটা। আমার মায়া লাগে ৷

মায়াটা দিনে সবার সামনে না দেখিয়ে গভীর রাতে কেন চুপিচুপি জাহির করতে আসতে হলো, সে প্রশ্ন হাজেরা করে না। তাকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জমাদ্দার সাহেব দাঁড়িয়ে তার সামনে এলেন। তারপর হাজেরার কাঁধে একটা হাত রেখে পাকা দাড়িগোঁফের আড়ালে ঢেকে থাকা ঠোঁটে ইঙ্গিতপূর্ণ অস্পষ্ট একটা হাসি দিয়ে বললেন, কিছু লাগলে আমারে কইবা, আমি তো তোমার বাপের মতন।

কী আশ্চর্য! হাজেরা তখনো নিশ্চুপ, নিশ্চল। এমন নির্লজ্জ স্পর্শে লজ্জায় সে কুঁকড়ে যায়নি, শরীরে বিন্দুমাত্র কাঁপন ধরা পড়লো না। জমাদ্দার সাহেব বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন, যেন শান্ত পুকুরে ঢিল ছোড়ার পর ঢিলটি কোনো ঢেউ তৈরি না করে টুপ করে ডুবে গেল। হাজেরার শরীরে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি হলো না। জমাদ্দার সাহেব হাত গুটিয়ে নিলেন, মানুষের শরীর এত ঠান্ডা হয়! ঘরের অন্ধকার সয়ে যাওয়ার জন্য হোক, অথবা কাছে এসে দাঁড়ানোর জন্য হোক, জমাদ্দার সাহেব দেখলেন, হাজেরার চোখ দুটি শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে, সেই দৃষ্টিতে কোনো ভাষা নেই, মৃত মানুষের দৃষ্টি। জমাদ্দার সাহেব আঁতকে উঠলেন, তার মনে হলো একটা লাশকে তিনি স্পর্শ করেছেন। তার বৃদ্ধ দেহ ভয়ে কেঁপে উঠলো, বিদ্যুৎগতিতে গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

হাজেরাকে দেখে পুরুষদের যেটুকু কামনা জাগত, তার চোখ দেখলেই সে কামনা আত্মহত্যা করতো। এমন একটা শরীরের বিপুল অপচয় করে মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেল, ভেবে অনেকের আফসোস হতো। কেউ কেউ হাজেরার দৃষ্টির শূন্যতা এবং মানসিক অস্বাভাবিকতা ডিঙ্গিয়ে শুধু শরীরটার প্রার্থনা করতো। তাদের মধ্যে অন্যতম রওশন জমাদ্দার, মুসলেম জমাদ্দারের সদ্য যুবক হওয়া ছেলে। জমাদ্দার সাহেবের একমাত্র পুত্র হিসেবে সে ছোটোবেলা থেকেই যথেষ্ট আদর, আহ্লাদ এবং আশকারা পেয়ে এসেছে। শিক্ষকদের অনুশাসন এবং পাঁচ ফুট উঁচু দেয়ালও তাকে স্কুলে আবদ্ধ রাখতে পারেনি। তার মায়ের অবারিত যত্ন, প্রার্থনা, মণে মণে দুধ, ডজনে ডজনে ডিম, শিক্ষকদের প্রাণান্ত চেষ্টা সব ব্যর্থ করে দিয়ে সে যখন তৃতীয়বারের মতো পরীক্ষায় ফেল করলো, তখন সবাই হাল ছেড়ে দিলো। রওশন পড়ালেখার জঞ্জাল থেকে মুক্তি পেয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে মন দিলো। পরীক্ষায় ফল আনতে না পারলেও মানুষের গাছের পাকা ফল এবং সাথে বিস্তর নালিশ আমদানি করেছিল সে। ছোটোখাটো শখের চুরি, জুয়া, নেশা ইত্যাদি পার হয়ে এখন তার আগ্রহ নারীতে এসে ঠেকেছে। দলবেঁধে গ্রামের স্কুলগামী মেয়েদের উত্যক্ত করা তখন তার প্রধান কাজ। অভিযোগ আসলে তার মা ছেলের চেয়ে ছেলের বয়সের ঘাড়েই দোষ চাপায় বেশি।

শহরে গিয়ে দুই একবার নারী দেহের রহস্য উন্মোচন করে এসেছে রওশন। এতে তার আসক্তি কমে না গিয়ে বরং বেড়ে গেছে। রওশন চেয়ে দেখলো, হাজেরা পাগল হলেও সে নারী, শহরে গিয়ে তার চেয়ে কত নোংরা এবং কুৎসিত মেয়েদের পেছনে সে পয়সা ঢেলেছে। হাতের নাগালে এমন একটা দেহ ঘুরে বেড়াচ্ছে, সে যেন এতদিন খেয়ালই করেনি। সম্মতির তোয়াক্কা সে কখনোই করে না, ইচ্ছে করে না দিলে জোর করবে, একটা ফকিন্নীর মেয়ে, চাকরানির তাতে কীইবা ক্ষতি হবে? বরং কৃতজ্ঞই হওয়া উচিত। সে শুধু জোর করতে জানে, জয় করতে জানে না। একদিন কলপাড়ে হাজেরাকে স্খলিত বসনে কাপড় ধুতে দেখে সে কাছে গিয়ে বসলো, হাজেরা ফিরে তাকালো না, লুটিয়ে যাওয়া আঁচল তুলে পুরুষের দৃষ্টিকে বাঁধাও দিলো না। রওশন হাজেরাকে নিচু স্বরে ডাকলো। হাজেরা ফিরে তাকালো, কিন্তু মনে হলো না কোথাও কিছু দেখছে। রওশনের অস্থির দৃষ্টি হাজেরার শরীরে ঘুরাফেরা করছিল। বললো, দেখাবি?

হাজেরা আনমনাই রইল, কিন্তু আঁচল ফেলে দিয়ে ব্লাউজের বোতাম খুলতে শুরু করলো। হুকুম পেলে সে কাজ করে, সহজ, কঠিন, ন্যায়, অন্যায়, সময়, অসময় সে বিবেচনা করতে পারে না। হাজেরাকে উন্মুক্ত হতে দেখে রওশন আতঙ্কিত হয়ে উঠলো, তার প্রয়োজন আড়াল, অগোচর না পেলে ভেতরের পশুটা তার শিকারে নামে না। কিন্তু একি কান্ড হাজেরার, সূর্যকেও লজ্জা করে না! মেয়েটাকে দেখতে যতটা মনে হয়, সে আসলে তার চেয়েও বেশি পাগল। এমন পাগলামিতে রওশন অসহায় বোধ করে, কেউ এসে পড়লো কিনা এই ভেবে তটস্থ হয়ে ওঠে, এই সময় কার যেন পায়ের শব্দ শুনে সে ভয়ে ছুটে পালালো। জমাদ্দার গিন্নি ভরদুপুরে কলপাড়ে হাজেরাকে অর্ধনগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠলো। গলায় যথেষ্ট উৎকণ্ঠা এনেও কীভাবে যেন প্রায় ফিসফিস করে বললো, আয় হায়! করস কী লো ছেড়ি? সব্বনাশ কইরা ছাড়বি, ঘরে দুইডা পুরুষ মানুষ আছে ৷

কলপাড়ের ঘটনার নেপথ্যের নায়কটি যে তার পুত্রধন, তা আবিষ্কার করতে বেশি সময় লাগলো না জমাদ্দার গিন্নির। ঘটনার প্রতিফল হিসেবে দুর্ঘটনা ঘটলো, রওশন জমাদ্দারকে বিয়ে করানো হলো। একটি মেয়ের দুর্ভাগ্যে গ্রামের স্কুল পড়ুয়া অনেকগুলো মেয়ে পরিত্রাণ পেলো।

হাজেরার শরীরে মাতৃত্বের চিহ্ন তার ময়লা শাড়ি ভেদ করে প্রকট হয়ে উঠেছে। পুরুষদের চোখে যে ছিল যুবতি, এখন সে শুধুই পোয়াতি। তার স্ফীত গর্ভ দেখে সবার অবশিষ্ট কামনাও বাষ্পীভূত হয়ে গেছে। নিজের এই অস্বাভাবিক ভারবৃদ্ধিতেও হাজেরা নির্ভার। মনের বিকৃতির প্রভাবে দেহের বিকৃতিটা সে উপলব্ধিই করতে পারে না। কোনো প্রতীক্ষা, রোমাঞ্চ, আনন্দ, আতঙ্ক কিছুই নেই তার। নিজের বর্ধিত অঙ্গটিকে প্রত্যঙ্গের মতো বহন করে সে আগের মতোই কাজ করে যায়।

হাজেরার পেটে যে প্রাণটি আছে সে একদিন অধীর হয়ে উঠলো। প্রকৃতির নিয়মে গর্ভের জেলখানা থেকে তার মুক্তির সময় হয়েছে। আকাশে জমা মেঘের রাগী গর্জন ছাপিয়ে গোয়ালঘরে চিৎকার শোনা গেল। জমাদ্দার গিন্নি ছুটে গিয়ে দেখল, হাজেরা পশুর মতো একা একাই একটা ছেলের জন্ম দিয়েছে। মা এবং ছেলে নিজ নিজ শোকে সমবেত বিলাপ করছে। হাজেরার মনে কষ্টের যে বোমাটা সঞ্চিত ছিল, একটা আপন মানুষ পেয়ে আজ তার বিস্ফোরণ হয়েছে।

আরেকটি ভূমিহীন প্রাণীর আগমন হলো পৃথিবীতে। এই বিশাল জগতের এক কণা মাটির উপর যার কোনো অধিকার নেই, যার দেহ আছে, শিকড় নেই। যার পূর্বপুরুষেরা জোর জবরদস্তি কিংবা জোচ্চুরি করে যথেষ্ট মাটি দখল করতে পারেনি, তাদের ভাগটা অন্য কেউ নিয়ে গেছে মন ভুলিয়ে অথবা চোখ রাঙ্গিয়ে। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাও গেছে নদীর ভোগে। নদীর মতো অবিবেচক আর নেই, গরীবের ভিটা খেয়ে ধনীদের জমিতে পলি বিলায়। “

মনা জন্মের পরে উত্তরাধিকার সূত্রে দারিদ্রের অভিশাপ এবং বাপের পুরানো একটা লুঙ্গি পেয়েছিল, বাপের ভূমি তো ছিলই না, ভূমিকাও ছিল অতটুকুই। সেই লুঙ্গিতে তাকে পেঁচিয়ে নিজের বুকের কাছে রেখেছে হাজেরা। যে এতদিন তার পেট দখল করে ছিল, আজ ভূমিষ্ঠ হয়ে সে তার পুরো বুক দখল করে নিল। পৃথিবীতে মায়ের হৃদয়টাই মনার একমাত্র স্থাবর সম্পত্তি।

মা হয়ে হাজেরার মনোবিকৃতি সেরে যায়নি, শুধু দিশা পরিবর্তন হয়েছে। মনের ওপর যে আবছা পর্দাটা তাকে বিবশ করে রেখেছিল, সেটা সরে যাওয়ায় সে এখন অতিরিক্ত সচেতন হয়ে উঠেছে। সামান্য শব্দে চমকে ওঠে, ছেলেকে এক মুহূর্তের জন্য বুক থেকে সরাতে চায় না। কাউকে সে বিশ্বাস করে না, তার মনে হয় জগতের সবাই তো বটেই, এমনকি আকাশের উপর বসে থাকা অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তাও তার সন্তানের ক্ষতি করার জন্য চক্রান্ত করছে।

হাজেরা কাজ করে কিন্তু ছেলেকে কোল থেকে ফেলে রাখতে পারে না। কাপড় দিয়ে বেঁধে ছেলেকে পুটলি বানিয়ে নিজের কোলে রাখে। মনাকে পেটে বেঁধে আরেকবার গর্ভবতী হয় সে। নয়মাস ছেলের ভার এবং অস্তিত্ব সে উপলব্ধি করেনি, এখন যেন ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। মনা যেন হাত পায়ের মতোই আরেকটা অঙ্গ তার। ছেলে তার যত বড়ো হয়, হাজেরা তত কুঁজো হয়। একসময় ভার বইতে পারে না তার দেহ, পেটের ছেলে তখন পিঠে বদলি হয় ৷

মনার চেহারায় দিন দিন মনু মিয়ার সব লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, শুধু পার্থক্য হলো, তার চামড়া এখনো রোদের তেজে তামাটে হয়ে যায়নি, তার ভাসা ভাসা টলটলে চোখে জীবনের অপ্রাপ্তির ছায়া পড়েনি, চুল ধুলোর স্পর্শ পায়নি, কিন্তু ঠোঁটে যেন সেই অবিকল সরল হাসি। হাজেরা তাকে মাটিতে নামায় না, দেড় বছরের ছেলে তাই এখনো হাঁটতে শিখেনি। হাজেরার পিঠে ছেলে তার দিন দিন যত পুষ্ট হচ্ছে, সে হচ্ছে তত ক্লিষ্ট। তাকে দেখলে মনে হয়, শ্যাওলা ধরা শীর্ণ একটা বৃক্ষ, যার ডালে একটা অপূর্ব সুন্দর ফুল ফুটে আছে।

জননী হওয়ার পর হাজেরার যৌবন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। পর্যাপ্ত সাধনা এবং সাধাসাধি করলে, যৌবন হয়তো অভিমান ভেঙ্গে মুচকি হাসতো। কিন্তু হাজেরা নিজেই যৌবনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তার সব তপস্যা শুধু মনার জন্য। নিজেকে ক্ষয় করে সে ছেলেকে গড়ে তুলছে। মনার সুন্দর, সবল শরীরে তার মায়ের সব ত্যাগ এবং শঙ্কা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনা যত বড়ো হয়, তার শরীরের তাবিজ কবজের সমাহার তত বাড়তে থাকে। কপালে কাজলের ফোঁটা আর গা ভর্তি তাবিজের উপরও হাজেরা সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে পারে না। এই কাজলের ফোঁটার প্রহরা আর তাবিজের ব্যূহ ভেদ করে দুই একটা কুদৃষ্টি কি তার ছেলেকে ছুঁতে পারবে না? এমন ফুলের মতো ছেলেকে কাজলের অস্থায়ী কলঙ্ক কোনোমতেই রক্ষা করতে পারবে না। তাই গ্রামের কবিরাজ আসাদ আলীর পরামর্শ মেনে হাজেরা বরইয়ের বিচি পুড়িয়ে মনার কপালে স্থায়ী কলঙ্ক এঁকে দিলো ৷ মনা বড়ো হওয়ার সাথে সাথে হাজেরার মনে নিরাশ্রয় হওয়ার ভয়টাও বড়ো হতে থাকে। একসময় আশ্রয় নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তা হয়নি, কারণ তার ভরসা করার মতো একটা শক্ত সামর্থ্য পুরুষ ছিল। আজ সে নির্ভার থাকতে পারে না, কারণ তার একটা সন্তান আছে। তাই ছোটো খাটো ত্রুটিতেও যখন তাদের তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়, হাজেরা একেবারে মলিন হয়ে যায়। গাছতলায় সে তার সাত রাজার ধনটিকে কীভাবে আগলে রাখবে? গৃহহীন হওয়ার আতঙ্কে হাজেরা আরো বিপর্যস্ত হয়ে যায়। জমাদ্দার বাড়ির সীমানা ছেড়ে আর কোথাও যায় না সে। তার মনে হয়, একবার এই বাড়ির সীমানা ছেড়ে গেলে তাকে আর ঢুকতে দিবে না, এবং তার মনের বিকৃতি একটা নতুন রূপ পায় ৷

কিছু তোষামোদের বিনিময়ে জমাদ্দার গিন্নি মাঝে মাঝে তার আচলের গিট খুলে হাজেরাকে অল্প অল্প টাকা দিত। সেই টাকায় মনা স্কুলের সবচেয়ে উচু শাখা পর্যন্ত উঠেছিল। জমাদ্দার গিন্নি তাকে ভরসা দিত, চিন্তা করিছ না, তোর পোলারে আমি একটা কিছু দিয়া যামু। এই ভরসার বিনিময়ে হাজেরা দিনরাত তার সেবায় নিয়োজিত ছিল।

হাজেরার পাগলামিটা দিন দিন বাড়ার কারণে পর্যাপ্ত তোষামোদ সে সরবরাহ করতে পারেনি, জমাদ্দার গিন্নির হাত পা টিপে দিতে গিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে কী এক দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকত, মাঝে মাঝে একা একাই বিড়বিড় করতো। গিন্নি বিরক্ত হত, তবুও হাজেরাকে ডাকতো। পুত্রবধূর বদনাম করার জন্যও তো একটা মানুষ লাগে।

তারপর একটা দুর্যোগ আসলো আকস্মিকভাবে। রাতে পান খেতে খেতে হাজেরার কাছে পুত্রবধূর ত্রুটি বিশ্লেষণ করছিলো জমাদ্দার গিন্নি, হঠাৎ হাঁপানির টান উঠলো। রওশন জমাদ্দার ডাক্তারের প্রয়োজন বোধ করলো না। বললো, তেল গরম কইরা বুকে মালিশ করলেই ঠিক হইয়া যাইব। জমাদ্দার বধূর রোগ নির্ণয় করলো, বললো, ঢং।

ভোরবেলা দিনের আলো যখন ফুটতে শুরু করেছে, তখন মনার ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়ে জমাদ্দার গিন্নি মারা গেল। জমাদ্দার বধূ মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করলো, এত উৎকট শোক করলো যে, রওশন জমাদ্দার পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে গেল।

মনার বয়স সময়ের নিয়মে বাড়ে, সেই সাথে বাড়ে একাকীত্বও। গ্রামের অন্য ছেলেদের সাথে কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে তার। তার শার্টের অনুপস্থিত বোতাম, জুতায় মুচির অতিরিক্ত স্পর্শ, ফেরিওয়ালাদের সাথে সওদা করার অক্ষমতা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে সে গরীব। সে দেখে, সবাই নিজ বাড়ি ফেরে, সে ফিরে জমাদ্দার বাড়ি, সে বাড়ি তো তার নয়। এই সত্যটা জমাদ্দার গিন্নি দিনে অগণিত বার স্মরণ করিয়ে দেয় মাতা পুত্রকে। সবার মায়ের আঁচলে ছেলের আবদার পূরণের জন্য একটা গিট বাঁধা কোষাগার থাকে। তার মায়ের ছেড়া আঁচলে সুই সুতার মিলন হয় অহরহ, এই মলিন আঁচলে টাকা পয়সা বেঁধে রাখা যায় না, শুধু ঘাম মোছা যায়। যাদের ঘর আছে, সুস্থ মা আছে, তাদের হিংসা হয় তার। নিজের নামটা তার গৌণ হয়ে যায়, হাজেরা পাগলির ছেলে হিসেবেই সবাই চিনে তাকে। এই পরিচয়ে কোনো মান নেই, অপমান আছে। যারা তাকে চিনে না, তার ভদ্র এবং সম্ভ্রান্ত চেহারা দেখে তারা বিভ্রান্ত হয়, তাদের কাছ থেকে অযাচিত সমীহ পেয়ে মনাও লজ্জিত হয়। কিন্তু এই লোকগুলোই যখন তার পরিচয় পায়, তখন সমীহের দ্বিগুন তাচ্ছিল্য করে, মনা তখন বিপর্যস্ত হয়ে যায়। ভাঙ্গা গোয়াল ঘর, মায়ের পাগলামি, মানুষের নিগ্রহের দৃষ্টি, এই পরজীবী জীবন, সব জঘন্য লাগে মনার ৷

মায়ের উপর অভিমান হয়। রাতে শুয়ে নীরবে চোখ ভেজায়। হাজেরা ছেলের গালে হাত বুলাতে গিয়ে চোখের আর্দ্রতা টের পায়। কী হইছে বাপ, কান্দস ক্যান? হাজেরা কাতর হয়ে জিজ্ঞাসা করে। মনা কতকিছু বলতে চায়, সব অভিমান, অপমান, তাচ্ছিল্য উগড়ে দিতে চায়। কিছুই পারে না, শুধু একটা কথাই বের হয় মুখ দিয়ে, তুই গরীব ক্যান মা?

হাজেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, জন্মের দোষে।

চকচকে টিনে জং ধরে বৃদ্ধ হতে থাকে জমাদ্দার বাড়ির গোয়ালঘর। জমাদ্দার বাড়ির একতলা দালানটা ঘাড়ে আরেকটা দালান নিয়ে দোতলা হয়। মানুষ বাড়ে, কোলাহল বাড়ে, হাজেরার মনিবের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। হাজেরার সবগুলো চুল খুব অল্পসময়ে পেকে গিয়ে, তাকে বার্ধক্যে ঠেলে দিয়েছে। মনা নিজের মাকে অসময়ে বৃদ্ধ হতে দেখে আঁতকে ওঠে। মা তার কখনো রানি হতে পারবে না, কিন্তু দাসত্ব করতে করতেই মা মরে যাবে, সেটা সে মানতে পারে না। মায়ের জন্য এক টুকরো মাটি সে কিনে দিতে চায়। একটা ঘর থাকবে তার, যেখানে তার মা ঘুম থেকে উঠে আরামে দাওয়ায় বসে রোদ পোহাবে। উচ্ছেদ আতঙ্ক ছাড়াই রাতে ঘুমাতে যাবে। জমাদ্দারদের গোয়ালঘরে মনার দমবন্ধ লাগে, এক খণ্ড ভূমির জন্য তার পূর্বপুরুষের হাহাকার মনার বুকেও স্পর্শ করেছে।

স্কুলের ব্যাগ খুব বেশিদিন পিঠে থাকেনি মনার। পিঠ হালকা হওয়ার পর ভারী হয়েছে বুক। জন্মের দোষে সেও আজ ভৃত্য হয়েছে। জমাদ্দারদের পেছনে বাজারের ব্যাগ নিয়ে হাঁটাই যেন তার নিয়তি। অতিথিদের ডাব দিয়ে আপ্যায়নের প্রয়োজনে মনাকে গাছে চড়তে হয়। তাদের ব্যাগ মাথায় বহন করে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়াও তার কাজ। জমাদ্দারের শরীরের ম্যাজম্যাজ ভাব দূর করার জন্য তৈলাক্ত হাতে মালিশও করে সে। গোয়াল ঘরে থেকে থেকে মনার স্বভাবও গরুর মতো নিরীহ হয়ে গেছে। জমাদ্দার সাহেবের সামনে মাথা নিচু রেখে প্রভুভক্তি দেখায়, কেউ গালি দিলে প্রতিবাদ করে না, ভাত এবং লাথি দুটোই হজম করতে পারে। দিনে দিনে হাজেরার যুবক সন্তানটি একজন উত্তম চাকর হয়ে উঠছে।

হাজেরার বয়স বাড়ার কারণে কাজকর্মে ত্রুটি বাড়তে থাকে। নিয়মিত কাঁচের গ্লাস, চায়ের কাপ তার হাত থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করে। ঘর মুছলেও চকচক করে না এখন, হাজেরার চোখের মতোই ঝাপসা দেখা যায়, কাপড় ধুলে কলারের কলঙ্ক যায় না। জমাদ্দার বাড়ির নতুন শিশুদের মলমাখা জামাকাপড় পরিষ্কার করাটাই এখন হাজেরার উপযুক্ত কাজ। তার শ্যাওলা ধরা দেহটার উপস্থিতি জমাদ্দার বাড়ির আভিজাত্যের সাথে বেমানান। যাদের নোংরা পরিষ্কার করে হাজেরা বড়ো করে তুলেছে, তারাই হাজেরাকে দেখলে নাক কুঁচকায়; হাজেরার সাথে একই বাতাসে শ্বাস নিতেও কুণ্ঠাবোধ হয় তাদের।

গোয়াল ঘরের চালের ছিদ্র দিয়ে একটুখানি আকাশ উকি দেয়। অমাবস্যায় অন্ধকার গলে গলে পড়ে। রোদ, জোছনা, বৃষ্টি ঢুকে হুড়মুড়িয়ে। এই ছিদ্রগুলোই মনাকে মাঝে মাঝে গৃহত্যাগী হতে উৎসাহী করে। মনের মধ্যে বিদ্রোহ পাক দিয়ে ওঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে তার শীর্ণ মাকে দেখলে, সব আগুন ছাই হয়ে যায়। চোখ গড়িয়ে এক ফোঁটা অশ্রু কানের গোড়ায় সুড়সুড়ি দেয়।

জমাদ্দার বাড়ির সবুজের মধ্যেও মনার কেমন ধূসর লাগে। নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। নিজের জন্মের প্রতি বিরক্তি বোধ হয়। মৃত বাবাকেও মনে মনে গালি দেয়, যার এক খণ্ড ভূমি নেই, পিতৃত্বের শখ, তার জন্য পাপ। জন্মের অপরাধ তো তার নয়, সে কেন শাস্তি পাবে। অপরাধী এখন একজনই বেঁচে আছে, তার মা।

বিভিন্ন সময় মায়ের প্রতি তার ক্ষোভ সে লুকাতে পারে না। খাওয়ার পর মুখ মোছার জন্য মায়ের আঁচল খোঁজে না এখন আর। সমবয়সিরা যখন তার মাকে নিয়ে সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ করে, সে ঘরে ফিরে মায়ের সাথে কথা বলে না। অভিমান হয়, সবার মা ভালো, তার মা কেনো এমন। গুম হয়ে বসে থাকে মনা। হাজেরা বুঝতে পারে না, ছেলের কী হয়েছে। কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলায়। অন্য সময় মনা শুধু আদরের স্পর্শটাই পায়, আজ পেলো মাছের আঁশটে গন্ধ। মনা বিরক্ত হয়ে মাথা সরিয়ে নেয়। হাজেরার আদর তাতে দমে যায় না। তার হাত ঠিকই ছেলের মাথা খুঁজে নেয়।

কী হইছে বাপ? মন খারাপ?

মনার গলা বুজে আসে অভিমানে। তারপরও চোখমুখ শক্ত করে, ঠান্ডা গলায় বলে, কিছু না। তুই যা মা।

মনার কণ্ঠের শীতলতা পাগলি হাজেরাও বুঝতে পারে। ছেলের কষ্টে নির্বিকার থাকতে পারে না সে। পিঠে হাত বুলিয়ে আকুতি মাখা সুরে বলে,

আমার বাপটার কী হইছে? কেউ কিছু কইছে? আমার কাছে ক।

মনা ঘৃণ্য বস্তুর মতো মায়ের হাত সরিয়ে দেয়। ক্ষেপে গিয়ে বলে, কইলে কী করবি? পরের ঘরের চাকরানি তুই, মাথা ঠিক নাই। কী করবি তুই? হাজেরা খুব বিপন্ন বোধ করে। মনার ক্ষোভের উদগীরণ দেখে কোনো কথা বলতে পারে না। কিন্তু মনাকে যেন ভূতে পেয়েছে। সে প্রলাপ বকে যেতেই থাকে।

নিজের জীবনের যত ব্যর্থতা, যত অপমান তার জন্য মাকেই দায় দেয় সে। হাজেরা মূক হয়ে বসে থাকে। একসময় মাকে অভিশাপ দিতে দিতে চোখ মুছে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। অভিসম্পাত, অভিযোগ কিছুই হাজেরাকে আঘাত দেয় না, সে ডুবতে থাকে মনার চোখ থেকে ঝরে পড়া দুই ফোঁটা অশ্রুতে, ডুবন্ত মানুষের মতোই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তার।

গভীর রাত পর্যন্ত হাজেরা একই ভঙ্গিতে বসে থাকে। অন্ধকার রাতে তার কাছে সব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঠিকই তো তার জন্যই মনার এই দুর্দশা। মনার জীবনের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ তার পরিচয়। এই পরিচয়টাই তো তার দেয়া। মনার কল্যাণের জন্য তাকে সেই পরিচয় থেকে মুক্তি দেয়া প্রয়োজন। নিজেকে কীভাবে মনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে ভেবে পায় না সে। আকাশে বসে থাকা ঈশ্বর তার স্বামীর প্রতি যথেষ্ট কৃপা করেছিল, তাকেও কী এই কৃপাটুকু করতে পারে না!

মনা গ্রামগুলোকে পেছনে ফেলে ময়নার মাঠে এসে পৌঁছালো। আশেপাশে কোনো লোক কিংবা লোকালয় নেই। মাঠের মধ্যে ফাগুন মাসের বাতাস প্রেতাত্মার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। হালকা বাতাসে গাছগুলো ফোস ফোস নিঃশ্বাস ফেলছে। ফসলের মাঠে ঝিঁঝিঁ পোকারা যেন প্রতিযোগিতা করে পড়া মুখস্থ করছে। রাতের পাখিগুলো বিগত দিনের কী দুঃখের কথা স্মরণ করে মাঝে মাঝেই বিলাপ করে উঠছে। তাদের আর্তচিৎকারে রাতের থকথকে অন্ধকারের ভারী পর্দায় কাঁপন ধরছে। গাছগুলোর গোড়ায় ঝোপঝাড়ে সরসর, খসখস শব্দ, শিকার শিকারির খেলা চলছে সেখানে। রাতের এইসব আয়োজনের মধ্যে মনা একজন অনাকাঙ্ক্ষিত আগন্তুক। প্রকৃতির নিখাদ সুরের মধ্যে একটুখানি বেসুর।

ঘড়ির কাঁটায় রাতের গভীরতা কত সে বুঝতে পারে না। রাত যেমন গভীর হলে, প্রচণ্ড সাহসী মানুষের মনেও ভয় উঁকি দেয়, যেমন রাতে বৃদ্ধরা কাশে না, যুবতিরা হাসে না, পুরুষেরা তাদের হাসায় না, কুকুর আর দারোয়ানের হাকডাক ঝিমিয়ে আসে, রাত তেমন গভীর।

ময়নার মাঠের নির্জনতায় কিছুক্ষণ বসে থেকে মনা উপলব্ধি করলো, এই জগতে মা ছাড়া তার আর কিছুই নেই। আঁধার রাতে চোখের সামনে সবকিছুই কালো, সেই কালোতে সে শুধু তার মায়ের হতবাক মুখটাই দেখলো। বুক ভেঙ্গে পড়ে রইলো শিশির ভেজা ঘাসের উপর। অনুতাপে ভরা মন নিয়ে অদৃশ্যের কাছে সে একটা প্রার্থনাই করে, এই রাতটা যেন মা ভুলে যায়৷

ভোরের আলোতে মনা ঘরে ফিরে আসে। মায়ের সদ্য জাগ্রত মুখটা দেখার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দরজা ঠেলেই সে পেলো শূন্যতা। একটা ছুটে পালিয়ে যাওয়া ছুচো ছাড়া ঘরে জীবন্ত কোনো কিছুর লক্ষণ নেই। মনা তখনো বুঝতে পারেনি, তার জীবনে এই শূন্যতা শীঘ্রই ঘুচবে না।

রাতের পাখিরা যখন আঁধারের গান গাইছে, তখন হাজেরা জীবনের সবচেয়ে কঠিন স্বিদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছে। যে আশ্রয়ের জন্য আজীবন শঙ্কায় কাটিয়েছে, সর্বস্ব দিয়েও মাথায় যে ছাদ টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল, সে ছাদকে অবহেলা করে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বেরিয়ে গেল সে। জমাদ্দার বাড়ির আলোর সীমানা পার হতেই রাত তাকে গ্রাস করে নিলো। সন্তানের মায়াতেই সন্তানকে ত্যাগ করলো সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *