কাঙালসংঘ – ৩

॥ ৩ ॥

মাঝরাতে বেহালার সুরের মতো কার যেন কান্না শুনতে পেলো মনা। সারাদিন ঘুমিয়ে মনার ঘুম ক্ষয়ে গেছে অনেকটাই, একটা পাতলা তন্দ্ৰায় আচ্ছন্ন সে এখন। তার ইন্দ্রিয়গুলো সচল হতে শুরু হয়েছে, কানে বাজছে সেই অপূর্ব বিষাদময় কান্না, সাথে আরো অনেক অপরিচিত শব্দ, নাকে পেলো একটা সূক্ষ্ম এবং স্থায়ী দুর্গন্ধ। নাক এবং কান যখন বিভ্ৰান্ত তখন সে চোখ খুললো। ঘরের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অন্ধকার, দরজা, জানালা ছাড়াও বস্তির এই ঘরে ছিদ্রের অভাব নেই, সেই ছিদ্র গলে কিছু আলো ঢুকে পড়ে বেহায়ার মতো। অনেক ভেবে মনা এটাকে একটা স্বপ্ন সাব্যস্ত করে আবার চোখ বন্ধ করলো। অচেনা কিংবা অশরীরী কোনো এক মানবীর সুরেলা শোক তার বুকটাকেও ভারী করে দিলো। আধোঘুমে সে ভাবতে লাগলো, এমন করুণ কান্না কে কাঁদে, কী তার এত দুঃখ!

সকালে জলিল এল চোখ লাল করে। চোখ লাল হলেও মন তার এখন ঠান্ডা, রাতে গাঁজা টেনেছে, পয়ত্রিশ টাকায় আর কী হয়? ব্রিজের নিচেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, গাঁজা পুড়িয়ে যতটুকু দুঃখ ভোলা যায় তা ভুলে এসেছে এখন ঘরে। মনাকে শুয়ে থাকতে দেখে হয়তো তার ঠান্ডা মনটা আবার কিছুটা উত্তপ্ত হয়। শব্দ করে একদলা থুতু ফেলে মাটিতে, মনার প্রতি এটা তার প্রচ্ছন্ন ধমক। কিন্তু তার অপরাধই বা কী? মনা তবুও অপরাধীর মতো উঠে বসে, জলিলকে ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখে, বাসে জলিলের উপস্থিতিটা তার মনে আছে, বাকি সব স্মৃতি ঘোলা ঘোলা। জলিলের দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বলে,

ভাবছিলাম মইরা যাব।

জলিল শীতল গলায় বললো,

মরলেই পারতা, পইতিরিশ ট্যাকা লইয়া বাসে না উইঠ্যা বাসের তলে ঝাপ দিতা।

এখন নিজের অপরাধ স্পষ্ট হয় মনার। কিন্তু সে ভেবে দেখে না, লোকটা কীভাবে জানলো তার কাছে কত টাকা আছে ৷

বাসের ভাড়া কত নিছে, আমি দিয়া দিব।

কইত্তে দিবিরে? ফকিন্নীর পোলা হইয়া এমন বড়োলোকের মতো চেহারা লইয়া ঘুরস, শরম করে না ৷

জলিলের গলায় রাগ ঝরে পড়ে। মনা হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকে, তাকে লোকটা তুই করে বলছে। জলিলের মনটা জ্বলছে, এভাবে তার মতো দরিদ্র নেশাখোরকে বিভ্রান্ত করাটা যে কত বড়ো অন্যায়, তা যদি ছেলেটা বুঝতো!

শালা, আবার হইছে আমার খালাতো ভাই। বাপ, মার খবর নাই আবার খালা। কান্ধে তুইল্যা আনছি, ঘরে থাকছো, অহন যাও ভাগো ৷

মনাকে উদ্দেশ্য করে ঝাল ঝাল কথাগুলো ছুড়ে মারে জলিল। মনা সঙ্কুচিত হয়ে যায়। তার নীরব সংকোচকে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে হয় না, বাইরে থেকে একটা গলা শোনা যায়,

কইরে জলিল?

জলিল শওকতের গলাটা শুনেই গলা নামিয়ে মনাকে বলে,

মদিনা হোটেলের মেনেজার শালায় আইছে, জিগাইলে কবি তুই আমার খালতো ভাই। সকালের নাস্তাডা ফিরি কইরা এরপর ফুট দিবি। বুঝলি ?

মনা জানে না, কোথায় ফুট দিবে সে, তবুও ঘাড় নাড়ে ৷

মদিনা হোটেলের বার্নিশ ওঠা চেয়ার টেবিলে বসে তেলে ভাজা পরোটা আর ছোলার ডাল খায় তারা। পেটের জ্বালার সাথে জলিলের মনের

জ্বালাও কমে যায়। অনেকটুকু পরোটা মুখে পুরে দিয়ে ভাঙ্গা চাপা ও ফুলিয়ে তোলে, খেতে খেতেই বলে,

বাড়িতে কে আছে রে তোর?

মনা এই প্রশ্নে অসহায় বোধ করে। বলে,

বাড়িই তো নাই।

বাড়ি না থাকা জলিলের মতো ভাসমান মানুষের কাছে খুবই সাধারণ ব্যাপার, তিনটা পরোটার জন্য সে মনার প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করে, তাই সৌজন্য তার থামে না।

বাপ মা নাই? ভাই বোন?

মনার চোখে তার মায়ের অপ্রকৃতস্থ, মলিন, শীর্ণ চেহারাটা ভেসে ওঠে, মায়ের জন্য তার মনে জেগে ওঠে অপরিসীম মমতা, সেই মমতা তার কণ্ঠরোধ করে, তেলেভাজা পরোটা তার গলা দিয়ে নামতে চায় না। রুদ্ধ কণ্ঠে সে বলে,

শুধু মা আছে।

মা কই?

মনা আর কথা বলতে পারে না। ঘাড় নেড়ে জানায়, জানে না। তার চেহারায় বিষাদের এমন কালো ছাপ পড়ে যে জলিলের মতো নেশাখোরের চোখও এড়ায় না।

কী হইছে?

এক চুমুক পানি খেয়ে গলাটা পরিষ্কার করলো মনা। বললো,

মাথায় একটু সমস্যা আছিলো মার। একদিন সকালে দেখি নাই, কই জানি চইলা গেছে।

পথে থেকে পাথর হয়েছে জলিল কিন্তু তার মনের গভীরেও লুকিয়ে আছে কিছু তরল দুঃখ। গাঁজা খাওয়া লাল চোখগুলো জ্বলে ওঠে অশ্রুহীনতায়। তার মা-ও পাগল ছিল, বাজার ঘিরে তখন কেবল একটা শহর জন্ম নিচ্ছে। সেই নবীন শহরের বাজারে ঘুরে বেড়াতো তার মা। পরনে ধুলোর আস্তরণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। দিনের আলোতে বিব্রত পুরুষের চোখগুলো রাতের আঁধারে লোভে চকচক করত। দিনের ঘৃণা রাতে লালসায় পরিণত হত। সেই লালসাতেই জলিলের জন্ম। এই শহর ভর্তি তার বাবা, তারা তাকে গালি দেয় ‘হারামজাদা’ বলে। পথ ছাড়া আর কেউই তাকে আশ্রয় দেয়নি।

মনার সাথে জলিলের আত্মীয়তা হয়ে যায় দুঃখের বন্ধনে। মনাকে সে বলে,

চিন্তা কী, তোর মা আমার খালা। দুইজনে মিল্লা খুজুম। চল আগে গুরুজির কাছে যাই।

গুরুজি আবার কে? তিনি কি কোনো অলৌকিক সমাধান দিবেন? গোল কাচের বলে চোখ রেখে বলে দিবেন, তোর মা নদীর পাড়ে বসে আছে? গুরুজির আস্তানায় যাওয়ার পথে যেটুকু শহর দেখা যায়, মনা অবাক হয়ে দেখে। পিঁপড়ার দলের মতো মানুষের ছুটাছুটি দেখে, কোথায় কোন খাদ্য কণা পড়ে আছে, তা সংগ্রহের তাড়া আছে তাদের। মনা পিছিয়ে পড়ে, সে তাল মেলাতে পারে না, হোঁচট খায়, ধাক্কা খায়। রিকশার টুংটাং, গাড়ির হর্ন ক্রমাগত ধমকাতেই থাকে, সাইড দাও, গতি না থাকলে সরে যাও, সরতে না পারলে মরে যাও। কেউ কারো জন্য দাঁড়ায় না এখানে, এটা কি শহর নাকি হাশরের মাঠ!

জলিলের খয়েরি ডোরার শার্টটাতে চোখ রেখে মনা হেঁটে চলে জনতার স্রোতে। মাঝে মাঝে খয়েরি ডোরা উধাও হয়ে যায়, দুই তিনজনের পা মাড়িয়ে ফিরে পায় আবার, এক সময় চোখের ভুলে খয়েরির জায়গায় কালো ডোরা অনুসরণ করে, ভুল শোধরাতে গিয়ে আবারও হোঁচট খায়, ধাক্কা খায়, ভরপেট গালিও খায় ৷

রেল লাইনের ধার ঘেষে মানুষের ভিড় কমে আসে, আবর্জনা বাড়তে থাকে। ছেড়া পলিথিনের সংসার রাস্তা জুড়ে। জলিলের বস্তির সেই সূক্ষ্ম দুর্গন্ধটা উড়ে এসে জানান দিচ্ছে এখানেও কীট পতঙ্গের বাস। রেল লাইনের ঐ পাড়ে জলিল দাঁড়িয়ে আছে একটা কংক্রিটের ভগ্নস্তূপে ঠেস দিয়ে। এতসব অনিশ্চয়তার মাঝে মনা স্বস্তি পায়, কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে ৷

দো-চালা একটা ছোটো ঘরে গুরুজির আবাস। দরজা খোলা, ভেতরে যথারীতি একটা চৌকি হামা দিয়ে বসে আছে, পানির জগ, কলস, দড়িতে ঝোলানো কিছু কাপড়চোপড় ছাড়া কিছুই নেই, গুরুজিও নেই। একটু পরেই ভদ্রগোছের মোটা গোফওয়ালা একজন মানুষ ঢোকে, গায়ে ধূসর স্যান্ডো গেঞ্জি, হাতে একটা লাল বদনা। জলিল চৌকি থেকে উঠে বলে,

কই গেসিলা গুরু?

মনা অবাক হয়, এই বদনা হাতের শুষ্ক লোকটিই তবে গুরু? মনে মনে সে রাশভারী, সাদা দাঁড়িগোফে ঢাকা, গম্ভীর, রহস্যময় একটা অবয়ব চিন্তা করেছিল। বাস্তবের সাথে মিলিয়ে সে ভীষণ হতাশ হলো। গুরু বদনাটাকে চৌকির নিচে রেখে বললো,

পেটটা ভালো যাইতাছে না রে জলিল। গতকাল রাতে শখ কইরা মুন্সির দোকান থেইকা এক প্লেট ফুচকা খাইছিলাম। এখন শখের মাশুল দিতাছি। সকাল থেইকা চাইর বার গেছি।

মুন্সির ফুচকার উপর দোষ চাপালেও জলিল জানে, গুরুজির পেট একটু পাতলা। অহরহ তাকে লাল বদনা নিয়ে ছুটাছুটি করতে দেখা যায়। গুরুর চোখেমুখে চতুর্থ যাত্রার অবসাদ, নাকি চেহারাটাই এমন? মনা বুঝতে পারে না। গুরু মনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, ক্লান্তির কারণে হাসিটা ঠিক ফুটে উঠতে পারে না, তাকে আরো অবসন্ন লাগে। জলিলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে,

এইটাই কি তোর পয়ত্রিশ টাকার হাবলাটা ?

জলিল আহত মনার দিকে তাকিয়ে লজ্জিত হলো, গুরুজির দিকে তাকিয়ে বললো,

খুব ভালা পোলা গুরু, অনেক দুঃখ।

গুরুজি তার মুখের ভাব অপরিবর্তিত রেখে বলে,

হাবলা মানুষরাই ভালা হয়, এই জইন্য দুখিও হয় ৷

তারপর জলিলের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে বললো,

আর তুই হইছস গাধা, তোর কপালে শনি আছে, তুই মরবি গণধোলাই খাইয়া। তুই ক্যামনে এই পোলারে টার্গেট করতে গেলি, কাপড়চোপড় দেখলেই তো কওয়া যায়, এইগুলা তার নিজের না, দান খয়রাত পাইছে। পায়ের দিকেও খেয়াল করছ নাই নিশ্চই। রবারের চপ্পল পইরা কোন রাজকুমার শহরের বাসে ওঠে? খালি আলাভোলা চেহারাটা দেইখাই লালা পড়ছিল তোর।

মনা নিজেকে এভাবে বিশ্লেষিত হতে দেখে অভিমান করবে নাকি অভিভূত হবে ভেবে পায় না। জলিল বলে,

গুরু পোলাডা মারে খুঁজতে আইছে। তুমি একটু কইয়া দেও কী করব? গুরু মনার দিকে তাকিয়ে বললো,

তার মানে আত্মীয় স্বজন কেউ নাই। রাগ কইরা গেছে?

মনা নিচু গলায় বলে,

জানিনা, মার মাথায় একটু গোলমাল আছে।

ছেলেটার প্রতি জলিলের হঠাৎ গজানো মমতার রহস্যটা খোলাসা হয় গুরুজির কাছে। মনার দিকে তাকিয়ে বলে,

তাইলে তো ভাগ্যের উপর ছাড়তে হইব, আর ভাগ্য গরীব মানুষ পছন্দ করে না ৷

গুরুর মুখের মানচিত্রে হঠাৎ পরিবর্তন এলো। চৌকির নিচে হাত বাড়িয়ে তার সবচেয়ে প্রিয় আসবাব লাল বদনাটা নিয়ে বের হওয়ার সময় জলিলকে বললো,

এখন যা, সন্ধ্যায় আইছ।

পেটের অনাগত চাপকে কিছুক্ষণের জন্য উপেক্ষা করে, মনার দিকে তাকিয়ে বললো,

তুইও আইছ।

রেল স্টেশনের সোলেমান টি স্টলে বসে দাগ পড়া সাদা কাপে চা খাচ্ছে মনা আর জলিল। এতক্ষণে মনা জেনে গেছে, জলিল তাকে লুট করতে চেয়েছিল আচারের সাথে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে, জানার পরও তার কোনো রাগ হয় না জলিলের উপর; বরং মায়া হয়, লুট হওয়ার মতো যথেষ্ট অর্থ তার ছিল না বলে আফসোস হয়। জলিলের ব্যর্থতার কিছুটা দায় তার নিজেরও। চায়ে চুমুক দিতে দিতে জলিল গুরুর মহিমা বর্ণনা করে।

গুরু লোকটি পড়াশোনা জানা লোক, জলিল নিশ্চিত করে বলতে পারে না, গুরু কতটুকু শিক্ষিত। আদি ইতিহাস জানার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না তারা, শুধু এইটুকু জানে লোকটা জেলখানায় ছিল তেরো বছর সাত মাস। কী অপরাধে জেলে ছিল কিংবা আদৌ কোনোদিন জেলে ছিল কিনা তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না, অথবা করলেও উত্তর পায় না। এইসব উত্তরের কোনো উপযোগিতা তাদের কাছে নেই। জেল লোকটা থেকে তেরো বছর সাত মাস নিয়েছে কিন্তু দিয়েছে সারাজীবনের জ্ঞান। চোর, ডাকাত, খুনি, ছিনতাইকারী, ঠগ, প্রতারক সবার কাছ থেকেই জ্ঞান সংগ্রহ করেছে, আর সে জ্ঞান বিলানোয় তার বিন্দুমাত্র কার্পণ্য নেই। সমাজের উপরের স্তরের প্রতি তার ঘৃণা অপরিসীম আর নিচুস্তরের জ্ঞানবুদ্ধির উপর তাচ্ছিল্য সীমাহীন। এই বোধবুদ্ধিহীন মানুষগুলোকে সে ছিনিয়ে নেওয়া শেখায়, ভয় দেখানোর কলাকৌশল বলে, ছল করার ছক এঁকে দেয়। ব্যর্থতা নিশ্চিত জেনেও সে একটা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে।

হঠাৎ মানুষের কোলাহল বাড়ে, সেই সাথে বাড়ে কৌতূহল। দূর থেকে ভাসা ভাসা শোনা যায়, এইমাত্র যে ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে চলে গেল, কাকে যেন পিষে দিয়ে গেছে। উদ্বিগ্ন মানুষগুলো ছুটতে থাকে, কাকে শিকার করলো ট্রেনটি তার পরিচয়ের জন্য অথবা খণ্ডিত লাশ দেখার বাসনায়। মনার হাতের চা ঠান্ডা হতে থাকে, চায়ের তৃষ্ণা তার মিটে গেছে। জলিল চায়ে চুমুক দিচ্ছে ঘন ঘন, ঠান্ডা হয়ে গেলে খেয়ে মজা নেই, এক কাপ চায়ের দাম পাঁচ টাকা। উদ্বিগ্ন মুখগুলো ফিরে আসে নির্বিকার হয়ে, তাদের কেউ না, পাগলি একটা পড়েছে ট্রেনের নিচে।

লাশ ঘিরে উৎসুক দর্শকদের বৃত্ত তৈরি হয়েছে একটা। মনা তার সব মনোবল একত্র করেও এই বৃত্তে সামিল হওয়ার মতো সাহস সঞ্চয় করতে পারে না। হাটু ভেঙ্গে আসে তার, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও ফুরিয়েছে, জলিল তাকে বসিয়ে রেখেই বৃত্তে প্রবেশ করে। একটু আগে দেখা মুখগুলোর মতো জলিলও নির্বিকার হয়ে ফিরে আসে,

আরে বাচ্চা একটা মাইয়া, টোকাই ফোকাই হইব। তিন টুকরা হইছে, দেখবি? পুলিশ আইসা লইয়া গেলে আর সুযোগ পাবি না।

তিন খণ্ড লাশ দেখার মতো বিরল সুযোগের প্রতি মনার কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। শূন্য চোখে সে তাকিয়ে থাকে জলিলের দিকে। যে মেয়েটি মারা গেল, একটু পরে যে লাশের ব্যাগে করে মর্গে যাবে, সে হয়ে যাবে গল্প, চায়ের সাথে বিস্কুটের বিকল্প। তারপর গল্পটা পানসে হয়ে যাবে, পৃথিবীর আকাশে বাতাসে কিংবা মানুষের মনে অথবা কোনো দীর্ঘশ্বাসে টোকাই মেয়েটার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

জলিলের ঘরে তার নোংরা চৌকির উপর শুয়ে থাকে মনা। জলিল কোথায় যেন গেছে, হয়তো রাতের নেশার সংস্থান করতে। দিনের আলো ঘরের কদর্যতা তুলে ধরেছে স্পষ্টভাবে। পাশের ঘরে মানুষের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়, ফিসফাস হচ্ছে। গতরাতে যেখানে বেজেছিল করুণ কান্না; সেখানে বইছে এখন খিলখিল হাসির ঝর্ণা। হাসিতে প্ৰাণ নেই, প্রয়াস আছে। যে এত বিশুদ্ধ কান্না কাঁদতে পারে তার হাসি কীভাবে এত মেকি হয়?

মনার চোখ বুজে আসে, দুর্গন্ধটা এখন আর পাচ্ছে না, তার নাকটা বস্তিতে পোষ মেনেছে, চোখটা এখনো অভ্যস্ত হতে পারেনি ডাস্টবিনের পাশে কুকুর আর শিশুকে একসাথে খাবার খুঁজতে দেখলে চমকে ওঠে, সাদা চুল দাড়ির বৃদ্ধ যখন ছানি পড়া চোখ মেলে ভাঙ্গা রিকশার হ্যান্ডেল ধরে যাত্রী খুঁজে, চোখ তার সজল হয়, রাস্তার ধূলোয় ঘুমন্ত মানুষের মুখের উপর ভনভন করে ঘোরা মাছি তাকে বিভ্রান্ত করে, লাশ মনে করে সে আঁতকে ওঠে। কদর্যতা ছেঁকে শহরের ঐশ্বর্য দেখতে শিখেনি সে এখনো। জলিলের ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দারিদ্র্য থেকে চোখ ফিরিয়ে সে টিনের চালে তাকায়, জং ধরা টিনের সূক্ষ্ম ফুটো গলে আলোর ফুটকি দেখা যায়। হঠাৎ দেখলে তারা বলে ভ্রম হয়। দিনের সেই তারাতে চোখ রেখে মনা ঘুমিয়ে যায় এক সময়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *