কাঙালসংঘ – ৪

॥ 8 ॥

মাথার উপর জ্বলা ষাট ওয়াটের বাতিতে গুরুর ঘরে আলো হয়েছে ঠিকই কিন্তু অন্ধকার দূর হয়নি। সোনালি আলোতে মৃদু হাসিটি তার অলৌকিক দেখাচ্ছে, তাকে মনে হচ্ছে গোফওয়ালা বুদ্ধ। শিষ্যরা কেউ নেই ঘরে, তারা বেরিয়ে পড়েছে। কেউ গেছে শহরের অভিজাত এলাকায়, যেখানে ধনী মানুষেরা টাকা উড়াতে আসে, গরীবরা যায় টাকা কুড়াতে। আর গুরুজির শিষ্যরা সেখানে পাতে মায়াবি ফাঁদ। নারী অথবা মাদকের টোপ গিলিয়ে তারা উড়ে যাবার আগেই ধরে ফেলে চকচকে টাকাগুলো। টাকাওয়ালারা এখন চালাক হয়েছে, ক্লাব বানিয়ে মদ এবং নারীর নিরাপদ সংস্থান করেছে। টাকাওয়ালাদের মাথার সাথে পাল্লা দিয়ে গুরুজি শিষ্যদের দীক্ষা দিয়ে চলছে।

মনার অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে গুরুজি একটু নম্র হয়ে বললো,

বাংলাদেশে এত মানুষ, মানুষের জঞ্জালে কই গিয়া ডুবছে তোর মা, বাইর করা সোজা না। আবার দেশে আছে না ইন্ডিয়ায় গ্যাছে কেমনে কবি, পাগলের তো পাসপোর্ট ভিসাও লাগে না। তোর কাছে যদি টেকা থাকতো, তাইলে খুব সোজা আছিল। যাগো টাকা আছে তাগো মা হারায় না। তারা টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেয়; পোস্টার, ব্যানার লাগায়া দেয়াল ঢাইকা দেয়, পত্রিকায় দেয় নিখোঁজ সংবাদ, মাইকে ফুঁ দিয়া সবাইরে জানান দেয় দুইবেলা, তাও না পাইলে ঘোষণা দেয় লাখ টাকা পুরস্কারের, একটা মা হারাইলে তখন দশটা মা ফিরা পায়। টাকা থাকলে সবই হয়।

মনার মুখের অসহায়ত্ব ঘুচে না,

এত টাকা কই পামু?

লুট কর, ছিনাইয়া নে ৷

কিন্তু গুরুজি এইসব করা তো অন্যায়।

গুরুজির গলায় প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ ফুটে ওঠে,

কে কইছে? কে শিখাইছে? ঐ বড়োলোকেরা শিখাইছে এইসব। তারা তো ঠিকই লুট কইরা প্রাসাদ বানাইছে, আমাগো লাইগা দিছে ন্যায় নীতি। আমাগো বান্ধে আইন দিয়া, আমগো ঘরের ফুটা য্যান বন্ধ না হয়, আমরা য্যান তাগো মাথাত বাড়ি দিতে না পারি। তাগো গোলাম হইয়া থাকি, আমাগো ছাড়া তারা অচল কিন্তু তারা বুঝতে দেয় না। আমাগো দান খয়রাত কইরা তারা মহান হয়, আমরা ভাবি তারা ছাড়া আমাগো গতি নাই। শোন, যত ধনীলোক দেখছ্, তারা সব ডাকাইত নাইলে তাগো বাপ দাদায় ডাকাইত আছিল। এখন আমরা যদি তাগো থেইক্যা ছিনাইয়া নেই, এইটারে লুট কয় না, ফিরত নেওয়া কয়।

মনার মাথা ঝাঁঝাঁ করে ওঠে। কী বলে লোকটা, বইপত্রে পড়েছে যা, এতদিন যা শিখেছে, মাথা দুলিয়ে যেগুলো রপ্ত করেছে, সব মিথ্যা? জলিল অবশ্য এক কোনায় বসে সিগারেটের মধ্যে গাঁজা ঢোকাতেই ব্যস্ত, বইপত্র সে পড়েনি, ন্যায় অন্যায়ের গোলক ধাঁধায় সে প্রবেশ করে না। গুরুজি গাঁজা খাওয়া মোটেই দেখতে পারে না, তাতে রাগ ক্ষোভ কমে যায়, যারা যুদ্ধে আছে তাদের অস্ত্র না থাকলেও ক্ষোভের প্রয়োজন আছে। নেশাখোরেরা বায়বীয় তৃপ্তিতে আচ্ছন্ন হয়, তারা পথ ভুলে যায়, ঝিমায়, ঘুমায়। গুরুজি কিন্তু থামায় না জলিলকে, থামানো যাবে না তাকে। এখানে ধমক খেয়ে অন্যখানে যাবে, হয়তো ব্রিজের নিচে গিয়ে আরো অধঃপতিত হবে।

গুরুজির মানসিক সুস্থতা নিয়ে মনার সন্দেহ হয়। এই লোকের সংস্পর্শে থাকাটা বিপদজনক, এইটুকু সে বুঝতে পারে। বের হয়ে যাওয়ার পর গুরুজির ঘরে আর কখনো না ফেরার সংকল্প করে।

রাতে জলিল আজ ঘরে ফিরে, চৌকিতে দুজনের জায়গা হয়ে যায় অনায়াসেই। চারশো টাকার কাঠের এই কাঠামোটি জলিল কিনেছিল দুজনের জন্যই, হয়তো বছরান্তে তিনজন হবে এই আশাও তার ছিল। সঙ্গমের জন্য তার প্রয়োজন ছিল দেয়াল, সংসারের জন্য চাই ছাদ। এই খুপড়ি ঘর ভাড়া নিয়ে তার একমাত্র বৈধ জনক ‘পথ’কে বিদায় জানিয়েছিল, প্রিয় আকাশটাকে দিয়েছিল অব্যাহতি। যে ছিল উন্মুক্ত পথে, আবদ্ধ ঘরে থাকতে তার দম বন্ধ হয়ে আসতো, তবুও সে মুক্তি খুঁজেছিল নারীর বুকে। সেই নারীর বুক ভরিয়ে দিয়েছিল স্বপ্নে, কিন্তু পেট ভরাতে পারেনি। সঙ্গমে, আলিঙ্গনে তার ক্ষুধা মেটেনি। একদিন সে চারশো টাকার চৌকি শূন্য রেখে চলে গেছে ভরা পেটের নিশ্চয়তা পেয়ে। এই চৌকিতে জলিলের চোখে ঘুম আনতে পারেনা মাদকও। কিছুক্ষণ ছটফট করে বেরিয়ে যায়, যে তাকে কখনো ফেলে যায়নি, অভিমান করে ত্যাগ করেনি, সেই পথের কাছেই ফিরে যায়, পথের চেয়ে আপন তার আর কেউ নেই ৷

মনার চোখেও ঘুম নেই, মায়ের পিঠ বেয়ে নেমে আসা আঁচলটা মনে পড়ে তার। বাড়ির গণ্ডি পার হয়ে যে বাইরে উকিও দেয় না আশ্রয় হারাবার ভয়ে, সে কোন অভিমানে বাড়ি ছেড়ে, এমনকি তাকে ছেড়েও চলে গেল। চিন্তায় হাবুডুবু খায়, কোনো কূল পায় না সে।

হঠাৎ গুরুজির কথাগুলো মনে পড়ে তার, এই গভীর রাতেও সন্ধ্যার কথাগুলো তাকে চাবুকের আঘাত করে, গুরজি বলেছিল, শুনে রাখ মনা, খুনিরা শাসন করছে, চোখ রাঙাইছে, আমাগো থেইকা খাজনা নিছে, চান্দা নিছে। আমগো হাত নিছে, ঘাম নিছে আর নিছে মাথা। এখন আর আমাগো মাথা নাই, হাতড়াইয়া খুদ কুড়া খাইয়া বাইচা রইছি। কারো মাথা গজাইলে তারা মাথা কাইট্যা ফালায়, তাগো শুধু হাত দরকার। কিন্তু ভাইবা দেখ, মাথা ছাড়া জীবনের কি দাম আছে?

মনার হাশফাশ লাগে, চিন্তাগুলোর দাঁত আছে, তাকে কামড়াতে থাকে, মাথার মধ্যে যন্ত্রণা হয়। তাকে মুক্তি দেয় পাশের ঘরের সেই মিহি কান্না, বাঁশের বেড়ার দুর্বল বাধা পেরিয়ে এই ঘরটাকেও শোকে অভিভূত করে দিয়েছে। মুহূর্তেই মনার মন থেকে সমস্ত চিন্তা উধাও হয়ে যায়। তার খুব দেখতে মন চায়, কে এমন কাঁদে? দুপুরে সে-ই কি অমন কৃত্রিম হাসি হেসেছিল? বিছানা থেকে উঠে বেড়ার কাছে চলে আসে সে। বেড়ার গায়ে অসংখ্য ফুটো, একটাতে চোখ রাখে মনা। আবছা আলোতে সে স্পষ্ট কিছু দেখতে পায় না। অন্ধকারটা চোখে সয়ে যেতেই সে দেখলো একটি বড়ো খাঁচা। খাঁচাটা খালি, খাঁচার এক কোণে এলোচুলে একটা মেয়ে মাটিতে পড়ে আছে। তার চেহারা দেখা যায় না, শুধু ছায়ার মতো অবয়বটা বোঝা যায়। তার শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে কান্নার তালে। মনার বুকেও মেয়েটার কান্না এসে স্পর্শ করে, মেয়েটার দুঃখে সংহতি প্রকাশ করে একটি দীর্ঘশ্বাসের উদ্গীরণ ঘটে। তার দীর্ঘশ্বাসটি নীরবতা রক্ষা করতে পারেনি, মেয়েটির কান্না থেমে যায় হঠাৎ করে, সচকিত হয়ে সরে যায় সে। সংকোচ আর অপরাধবোধ মনাকে পোড়াতে থাকে, তবুও সে চোখ সরায় না, মেয়েটাকে আর দেখা যায় না, শুধু খালি খাঁচাটা তাকে বিদ্রুপ করতে থাকে, সে রাতে আর কান্না বাজেনি।

পরদিন ভোরে পাশের ঘরে একটি রুগ্ন তালা ঝুলতে দেখে মনা। সে জানে এখানে সব শোক অবসরের জন্য তোলা রেখে জীবিকার খোঁজে যেতে হয় সবাইকে। মনাও বেরিয়ে পড়ে খাদ্য সংস্থানে, ধ্বংস করার মতো যথেষ্ট অন্ন জলিলের নেই। আজ থেকে সংগ্রামে সেও নাম লেখাবে।

যারা এখনো নীতি ভুলতে পারেনি, যাদের মনে লাঠি এবং লাথির ভয় আছে, যাদের ভীরুতা ছাড়া কিছুই নেই, তারা নিজেদের বেচতে জড়ো হয় শহরের প্রধান মোড়ে। একদিনের দাস হওয়ার জন্য মনা তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় সামিল হয়। এখানে এসে সে উপলব্ধি করে, তার চেয়ে নিঃস্ব আর কেউ নেই এখানে, প্রায় সবারই কিছু যন্ত্রপাতি আছে, কোদাল, ঝুড়ি ইত্যাদি। যাদের যন্ত্রপাতি নেই তাদের অভিজ্ঞতা আছে, মনার কিছুই নেই, আছে শ্রমিক হওয়ার অনুপযুক্ত একটা বিভ্রান্তিকর চেহারা। তাই সহজে কেউ কিনে না তাকে। বুড়ো আর শিশুদের দলে সে বাতিল হয়ে পড়ে থাকে। সকাল স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে, বেচাকেনা প্রায় শেষ হতে চলল, অবিক্রিত মানুষগুলোর মুখগুলো বিষণ্নতায় বিকৃত হতে থাকে, উদ্বিগ্ন হয়ে তারা অপেক্ষায় থাকে খরিদ্দারের জন্য। সূর্য আড়মোড়া দিচ্ছে, সূর্য দেখা দিলেই হাট শেষ, হাটের সমাপ্তির সাথে সাথে একটা উপোস দিনের শুরু হবে। কপালডাঙার শুকনো বিলে চৈত্রের রুক্ষ সূর্যটাকেও এত ভয় পায়নি মনা যতটা পাচ্ছে নবীন নরম সূর্যটাকে।

একেবারে শেষ মুহূর্তে ভূড়ি দুলিয়ে এলো একজন, অভিজ্ঞতা তার ভুড়ির মতোই ভারী। উচ্ছিষ্ট থেকে বাছাই করার কঠিন প্রক্রিয়া শুরু হলো। বৃদ্ধগুলো তাদের বাকানো মেরুদণ্ডগুলো যথাসম্ভব সোজা করে দাঁড়ায়, বালক আছে দুইজন চৌদ্দ পনেরো বছরের, প্রতিযোগিতায় নিজেদের যোগ্য করতে তারা ফোলায় বুকের ছাতি। মনা শক্ত হয়ে থাকে, নিঃশ্বাস নেয় সাবধানে, মানুষের গা টেপা আর মালিশ করা ছাড়া আর কিছুই যে পারে না, এই সত্যটা লুকিয়ে চেহারাটাকে শ্রমিকের মতো রুক্ষ করে রাখে। বাজার মূল্যের অর্ধেক দামে মনা বিক্রি হয়ে যায়। যেতে যেতে মনা পেছনে ফিরে তাকায়, বৃদ্ধদের নিরাশ, পরাজিত মুখগুলোর উপর সূর্যের প্রথম কিরণ পড়েছে।

প্রথম চাকরির বিশেষত প্রথম আয়ের উত্তেজনা চুপসে গেল যখন দেখল, তাকে বিশাল সারিবদ্ধ এক ইটের স্তূপের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে। এখান থেকে ইট মাথায় নিয়ে একটা সরু গলির শেষ সীমানায় দাঁড়ানো বাড়ির দুইতলার ছাদে তুলে দিতে হবে। মনাকে হা করে ইটের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে, গৃহকর্তা গলা চড়িয়ে বললো,

খাড়াইয়া রইলি ক্যান? ইট দেখনের কী আছে? শুরু কর।

মনা মাথায় চারটা ইট তুলে নিল, চারটা ইটের ভারে তার ঘাড় বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এগুলো নিয়ে এতদূর হেঁটে আবার পৃথিবীর টানের বিরুদ্ধে গিয়ে উপরে তুলতে হবে? ভাবতেই, মনার ভীষণ পিপাসা পেয়ে গেল। লোকটা চেয়ার পেতে বসেছে, তার কাজের ফাঁকি ধরার জন্য, এই কাজে তার বিশেষ প্রতিভাও আছে মনে হয়। প্রথমেই খেকিয়ে উঠল,

চাইরটা কইরা ইট আনলে ইহজনমেও শেষ হইতো না, ছয়টা কইরা আন ৷

চেয়ারে বসে লোকটা শুধু মুখ সঞ্চালন করে, চা খায়, শরবত খায়, মনার পিপাসা বাড়তে থাকে। তারপর বিস্কুট, চানাচুর, আরো কী কী যেন খায় লোকটা। মনার পেটে ক্ষুধা মোচড় দিয়ে ওঠে, সে শুধু অপেক্ষা করে দুপুরের, বিশ্রাম আর খাদ্য পাওয়া যাবে তখন। সূর্যের শ্লথ গতি দেখে তার মাথা ঘুরে যায়। শরীরের শক্তি তার ফুরিয়েছে বহু আগে, এখনো পা চলছে লোকটার কথার চাবুকে, নতুন বউয়ের মতো টিপ্যা টিপ্যা হাঁটলে হইব? পাও চালা জোরে, হাঁপানি রোগীর মতো হাপাস ক্যান? ফাকিবাজি করলে কিন্তু ট্যাকা দিমু না, টিটকারি পাইছোছ নাকি? এই কয়টা ইট আইন্না বইয়া পড়ছস, ইত্যাদি অনুপ্রেরণামূলক কথা বলে তাকে উৎসাহ দিতে থাকে।

আরো অনেকক্ষণ পর, প্রচুর গালাগাল খেয়ে, নিজের ঘামে পুরোপুরি ভিজে যাওয়ার পর, মনা শুনতে পেলো, মাইক ঘোষণা করেছে দুপুর হয়েছে। নিঃশ্বাসের ঘোড়াটা টগবগিয়ে চলছে, বাগে আনতে পারছে না মনা। রশিদ মোল্লা তখনো জাবর কাটছে, একটা প্রকাণ্ড হাই তুলে চেয়ার ছেড়ে উঠে বললো,

আরে বাপরে, লেবার দিয়া কাম করান সোজা কথা? ক্ষিধা লাইগা গেল তারপর পকেট হাতড়ে একটা ছোটো নোট বের করে দিয়ে বললো,

যা, খাইয়া আয় কিছু। দেরি করিছ না আবার, আমি ঘড়ি ধরলাম। এত অল্প টাকা দেখে মনা বললো,

এই টাকায় কি ভাত খাওন যাইবো?

রশিদ মোল্লার মুখ বিকৃত হয়ে উঠলো,

আরে ভাত খাবি কিরে? ভাত খাইলে কি আর কাম করতে পারবি? ভাত খাইয়া তো ঝিমাইবি। যা, চা টা খাইয়া আয়।

এক কাপ চা আর একটা রুটি অতল ক্ষুধার তল খুঁজে পেলো না। মনার শরীর কাঁপছে, তার মনে হচ্ছে সে আর হাঁটতে পারবে না, এখানেই মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। তবুও দেহটা টেনে তোলে সে, আর তো কিছুক্ষণ মজুরিটা পেলে জলিলকে নিয়ে সে পেট ভরে ভাত খাবে। ভাতে গিয়েই তার স্বপ্নের দম ফুরিয়ে গেল, এর চেয়ে বেশি চিন্তা করার ক্ষমতা তার নেই এখন। তারও কি তবে মাথা কাটা যাচ্ছে? সে-ও কি তবে শুধু হাত হয়ে যাচ্ছে?

তারপর সে বোধহীন হয়ে ইট মাথায় হাঁটে, দেহ যেন তার নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কেউ। তার শরীর আর তার নেই, হাত, পা, বুক সব স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেছে। গোপনে সঞ্চিত শক্তি খরচ করে ফেলছে তার দেহ ৷ মাঝে মাঝে শুধু কান শুনতে পায় নিজের শ্বাসের কাতরধ্বনি।

চেয়ারে বসে বসে গৃহকর্তা নিষ্ঠার সাথে তার ভূড়ি বাড়াতে থাকে, ফাঁকি ধরার জন্য যে চোখ তার নিয়োজিত সে চোখ ভাতঘুমের আকাঙ্ক্ষায় ঝিমাচ্ছে। তার শরীরের সবচেয়ে সচল অঙ্গ জিহবাটা ক্লান্ত হয়েছে সবথেকে বেশি। তার কথার চাবুক গুটিয়ে নিয়ে চুপচাপ পড়ে আছে বিছানার প্রত্যাশায়, কিন্তু বিছানায় সে যাচ্ছে না, গেলে যদি আবার একদিনের দাসটি কাজ না করে বসে থাকে, সেই আশঙ্কায় শয্যাসুখ ত্যাগ করে বসে রইলো। সূর্য যখন আবার ঠান্ডা হতে শুরু করেছে, মনার সঞ্চিত শক্তিও তখন প্রায় ফুরিয়েছে। তার হাঁটার ভঙ্গি হয়েছে সিনেমার মাতালের অতিঅভিনয়ের মতো। তার সলতে নিভু নিভু, চোখের সামনে অন্ধকার। হঠাৎ দপ করে আলো নিভে গেল, মনা মুখ থুবড়ে পড়লো একেবারে লোকটার পায়ের কাছে, প্রায় সবকটি ইট কয়েক খণ্ডে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে গেল, এক খণ্ড ইট ভক্তি ছাড়াই লোকটার পায়ের ধূলো নিতে গিয়ে বাম পায়ের বুড়ো আঙুলটাকে প্রায় থেতলে দিলো। ঘটনার আকস্মিকতায় গৃহকর্তা হকচকিয়ে উঠলো, একটা অচেতন মানুষ কিংবা নিজের আহত আঙুল তাকে বিচলিত করেনি, মনার লুটানো শরীরের পাশে পড়ে থাকা ভাঙ্গা ইটগুলোর দিকে তাকিয়ে শোকে চিৎকার করে উঠলো,

হারামজাদা, আমার ইট সব ভাইঙ্গা শেষ, এক নম্বর ইট।

আঙুলের বেদনা যখন লোকটার মনোবেদনা ছাপিয়ে গেল, তখন তার মুখের বাধ ভেঙ্গে বানের জলের মতো গালি বের হতে লাগলো। গালিগুলো শুধু শুধু খরচ হয়ে গেল, মনা তখনো অচেতন। পানি ছিটিয়ে তাকে তোলা হলো, তার ভাগের বাকি গালি শোনানোর জন্য। সারাদিন অনভ্যস্ত খাটুনি শেষে তীব্র তিরস্কারই ছিল মনার জীবনের প্রথম আয় ৷ পারিশ্রমিক চাওয়ার পর, পিটুনি ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেয়ায় কৃতজ্ঞ থাকার পরামর্শ দিয়েছিল আহত গৃহকর্তা।

সন্ধ্যায় মনা খালি পকেট এবং খালি পেট নিয়ে বস্তিতে ফিরে আসলো। যখন দেখলো জলিলের খুপড়ির ঝাঁপে একটা প্রকাণ্ড তালা ঝুলছে তখন তার মন এবং শরীর দুটোই নিস্তেজ হয়ে গেল। এই তালা জলিল ঝুলায়নি, তালা কেনার টাকা তার কাছে থাকলে সে অবশ্যই সেই টাকায় গাঁজা কিনে খেতো। ভাড়ার টাকা মেটাতে পারেনি বলে মালিক পক্ষের লোকজন তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, তার একমাত্র আসবাব চৌকিটি জব্দ করেছে। মনার নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই, সে খুপড়ির সামনের সামান্য জায়গাটুকুতে শুয়ে পড়লো। ভীষণ শীত লাগছে, লক্ষণ ভালো নয়, মনে হয় জ্বর আসবে। মনা গুটিয়ে যাচ্ছে ঠান্ডায়, মায়ের জরায়ুতে একটা ভ্রূণ যেমন থাকে। নিজের হাত পা ঢুকিয়ে দিচ্ছে ক্ষুধার্ত পেটে।

জ্বরের সময়ই একজন নারীকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। মনা ঘোরের মধ্যে থেকে তার জীবনের একমাত্র নারী, মাকে আহবান করতে থাকে। কাতর হয়ে সে ডাকতে থাকে তার মাকে। জ্বর মাপার উছিলায় মায়ের শীতল কোমল হাতটা স্পর্শ করুক তার কপালে। মনার ইচ্ছাপূরণ হলো মাঝরাতে। একটা কোমল মমতাময়ী শীতল হাত তার কপালে নেমে আসলো। আহ! কী যে শান্তি। মনা বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, মা, মারে, ও মারে, তুই ক্যান গেলি?

মনা যখন চোখ খুলেছে, তখন দিনের তারা দেখা যাচ্ছে ঘরের ছাউনিতে। রাতের একটা মায়াবী স্পর্শ ছাড়া আর কিছুই মনে নেই তার। একটা মেয়েলি সুবাস তার নাকে এলো, তাই সে সচেতন হয় তার অবস্থান সম্পর্কে, ছাদের গা বেয়ে দৃষ্টি নামাতেই তার চোখে পড়লো, একটা বড়ো শূন্য খাঁচা।

জলিলের ঘরের তুলনায় এই ঘরটি অনেক রঙিন এবং গোছানো। এখানে চৌকির উপর তোষক আর চাদরও আছে। একপাশে কাঠের আলনায় পরপাটি হয়ে আছে কাপড়চোপড়, বেড়ার সমান্তরালে একটা দড়িতে ঝুলছে ভেজা জামা, অন্তর্বাস। খাঁচাটার পাশেই একটা মাটির কলস ভদ্র হয়ে বসে আছে, তার উপর উপুর করা একটা চকচকে স্টিলের গ্লাস দেখেই মনার ভীষণ তৃষ্ণা পেলো। ঠিক তখনই ঝাঁপ খুলে ঢুকলো একটা মেয়ে।

তার ভেজা চুল জানান দিচ্ছে, দড়িতে ঝুলানো কাপড়গুলো তার। অপরিচিত নারীর বিছানায় শুয়ে থাকার জন্য অথবা গতরাতে তার জন্য মেয়েটার কী কী দুর্দশা ঘটেছে তা ভেবে মনা বিহ্বল হয়, ব্রিত হয়। বিশেষত তার আগের রাতে চুরি করে মেয়েটাকে দেখতে চাওয়ায় এবং ধরা পড়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ে লজ্জায় সে কোনো কথা বলতে পারে না। এতগুলো অপরাধের কী প্রায়শ্চিত্ত করবে সে। শুধু একবার উঠে বসার চেষ্টা করে।

না না, শুইয়া থাকেন। শিঙ্গারা আনছি, খাইয়া ওষুধ খান। লজ্জার কিছু নাই, জলিল কে হয় আপনার?

মেয়েটা খুব স্বাভাবিকভাবেই কথাগুলো বললো। মনা স্বাভাবিক হতে পারে না, যাকে আড়াল থেকে দেখার জন্য চোখের ফাঁদ পেতে রেখেছিল, সে এমনি এসে ধরা দিলো! কিন্তু এখন মনা তার মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। গলা শুকিয়ে গেছে তার, প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে টের পেলো গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। সে মুখ ঘুরিয়ে মাটির কলসিটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। স্টিলের গ্লাসে টলটলে এক গ্লাস জল ঢেলে আনলো মেয়েটা। সে তার দৃষ্টির ভাষা পড়ে তার তৃষ্ণার কথা জেনে ফেলেছে দেখে মনা আরো সংকুচিত হয়ে যায়, নিজেকে তার নগ্ন মনে হচ্ছে।

মনার কম্পমান হাতে পানির গ্লাস হস্তান্তর হলো, তড়িঘড়ি করে পানি খেতে গিয়ে অল্প একটু পানি সে খেতে পারলো, কিছুটা পড়লো তার বুকে বাকিটা বিছানায়। আরেকটা অনিষ্ট করে তার অপরাধ বৃদ্ধি করলো, প্রতিকার করার জন্য সে হাত দিয়ে বিছানার পানি সেচতে লাগলো। মেয়েটা তাকে থামিয়ে একটা গামছা দিয়ে বিছানা মুছতে মুছতে বললো, আপনি লজ্জা পাবেন না। আমি আরেক গ্লাস পানি দেই, স্থির হইয়া পানি খান ৷

গলা ভিজিয়ে মনার স্বর ফুটলো,

আমি জলিল ভাইয়ের খালাতো ভাই।

মেয়েটা মনার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,

আপনারে কোনোভাবেই জলিলের কিছু মনে হয় না। আমার মনে হয় সে বিপদে পইড়া আপনারে খালাতো ভাই বানাইছে।

মনা কিছু বলতে পারলো না, সে মুখ নামিয়ে বসে রইলো। মেয়েটার গলায় হঠাৎ মায়া নেমে এলো,

এই শহর আপনের জন্য না, ক্যান আসছেন? আপনে এইখানে টিকতে পারবেন না, রাস্তায় দেখেন না, কত মানুষ পইড়া থাকে, কুত্তা বিলাইও গিয়া শুইকা দেখে না।

জলিল মাথা নামিয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলে,

আনছেন। বিড়বিড় করে বললেও, কথাটা মেয়েটার কান পর্যন্ত ঠিকই পৌঁছে যায়। চোখ দুটো তার উদাস আর বিষণ্ন হয়ে ওঠে, যখন আবার কথা বলে তখন কণ্ঠও কিছুটা ভাবপ্রবণ হয়।

আপনি তো ঠিকই আমারে তুলে

আমি ভালো মানুষ না, লোকে খারাপ মেয়ে বইল্যাই জানে। আপনে জানেন না, জানলে আপনেও গালি দিবেন।

ভালো খারাপ কীভাবে নির্ধারণ করে মানুষ? মনা ভেবে পায় না, গুরুজি বলেছিল, যে বাঘ নিরীহ হরিণ ধরে খায়, সে কি খুনি? হরিণ হত্যা না করলে সে না খেয়ে মারা যাবে, তার প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। জলিল যে মানুষকে অজ্ঞান করে টাকা পয়সা নিয়ে যায়, সে কি খারাপ? খারাপ না হলে সেও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তার এই জীবন তাকে কে দিয়েছে? সে তো ইচ্ছে করে রাস্তায় জন্মায়নি, রাস্তায় লাথি খেয়ে বড়ো হওয়া মানুষকে নীতি শেখানোটা কি সমাজের অন্যায় নয়? অঢেল স্বাচ্ছন্দ্য আর খাদ্যের প্রাচুর্য যে উত্তরাধিকার সূত্রে পায়, মূল্যবোধ তার কাছে পাখির কোমল পালক, সময়ে সময়ে তা দিয়ে সুড়সুড়ি দেয়া যায়। ভিখারির ছেলের জন্য তা মস্ত বোঝা, যেটা কাঁধে নিয়ে চলা যায় না, চ্যাপ্টা হয়ে যেতে হয়।

প্যারাসিটামল খুলে মেয়েটা হাতে দিলো মনার। বললো,

কোনো নড়াচড়া, উঠাউঠির দরকার নেই, রেস্ট নেন।

এত স্বল্প পরিচয়ে এমন স্নেহার্দ্র আদেশ কেবল মেয়েরাই দিতে পারে। সেবা, স্নেহ পেয়ে মনা স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে পেলো কিছুটা, একটা কৌতূহল তাই মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। খাঁচাটা দেখিয়ে বললো, কীসের খাঁচা এইটা, খালি ক্যান?

মেয়েটার মুখের রঙ পরিবর্তন হতে দেখে মনা বুঝলো, তার এই কৌতূহলটা দমন করা উচিত ছিল। প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে মেয়েটা নির্লিপ্ত গলায় বললো,

আমি আসতেছি, আপনে থাকেন। অবশ্য খারাপ মেয়ের ঘরে থাকতে ঘিন্না লাগলে কষ্ট কইরা থাকার দরকার নাই।

-মেয়েটা হয়তো জানে না, ঘৃণা করার সামর্থ্যও মনার নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *