॥ ১০ ॥
বস্তির অধিকাংশ অধিবাসী ঘর শূন্য রেখে পেটের প্রয়োজনে বাইরে আছে ৷ একটা জীর্ণ গাড়ি এসে থামলো রাস্তার মাথায়, কেউ লক্ষ করেছে কিনা বোঝা যায় না। ষষ্ঠী বহু কষ্টে দুষ্ট গাড়িটাকে এই পর্যন্ত সামলেছে, তবারকের গ্যারেজে নিয়ে পৌঁছে দিতে পারলেই তার কাজ শেষ হবে, একটি মাত্র ভালো চোখ দিয়ে এমন অবাধ্য গাড়ি চালানো সোজা কথা নয়। পান বিড়ির টং দোকানে মৃদু স্বরে গান বাজছে, দোকানদার বসে বসে ঝিমিয়ে নিচ্ছে কিছুটা। এই নিঝুম সময়ে টগরকে নিয়ে গুরুজির ঘরে ঢোকে মনা। টগর বিস্ময়াবিভূত হয়ে ঘরের প্রতিটি কোনা দেখছে, লাল বেলুনের কথা ভুলে গেছে সে। তার পরিচিত জগতের মোহনীয় পর্দা সরে গিয়ে একটা ভিন্ন জরাজীর্ণ জগত উন্মোচিত হলো তার সামনে। ঘরে চোখ বোলানো শেষ হলে সে দেখলো, একজন শীর্ণ মানুষ, কাচাপাকা, খোচা খোচা দাড়ি নিয়ে তাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছে। মানুষের এমন কৌতূহলী দৃষ্টিতে সে অভ্যস্ত, তার চেহারায় কী যেন একটা উত্তর খোঁজে সবাই।
একটু স্থির হয়ে বসে মনা যেন এতক্ষণে উপলব্ধি করতে পারে, কী একটা ভয়ংকর কাজ সে করে ফেলেছে। প্রবল অপরাধবোধের কারণে টগরের দিকে তাকাতে পারছে না সে। একটা সরল মনকে প্রতারণা করেছে, কতবড়ো বিশ্বাসঘাতক হয়েছে সে। নিজের প্রতি ঘৃণায় তার চোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। গুরুজিকে লুকিয়ে সে শার্টের হাতায় অনুশোচনার অশ্রু মোছে। এরপর কী হবে সে জানে না। তার সজল চোখ মেলে গুরুজিকে অনুরোধের সুরে বলে,
এখনো সময় আছে গুরু, পোলাডারে দিয়া আসি। আমার মন সায় দিতাছে না।
গুরুজি ঠান্ডা গলায় বললো,
তুই অখন যা, রাইতে সবাইরে নিয়া আসিস।
মনা উঠে দাঁড়িয়ে কাতর চোখে গুরুর দিকে তাকিয়ে বললো,
পোলাডার কোনো ক্ষতি হইব না তো?
গুরু তাকে আশ্বস্ত করলো,
চিন্তা করিস না, টগর তার বাপের কাছে ফিরা যাইব।
মনা ঝাঁপ সরিয়ে বকুলের ঘরে ঢুকতেই উৎকণ্ঠিত বকুলের চেহারাটা দেখতে পায়। বকুল জসিমকে পরিত্যক্ত পাবলিক টয়লেটের সামনে প্রতীক্ষায় রেখে ভাঙ্গা দেয়াল গলে পালিয়ে এসেছে বহু আগেই ৷ মনাকে দেখে কিছুটা স্বস্তি সে ফিরে পায়। কিন্তু মনার মুখে বিষাদের ছায়া দেখে তার উদ্বেগ বাড়ে।
কাজ হইছে?
মনা মাথা হেলে জানায় কাজ হয়েছে। তারপর তার দম আটকে আসে, বলে,
আমরা খুব খারাপ কাম করছি, খুব খারাপ।
এই বলে মনা ছোটো বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। বকুল প্রবল মমতায় তাকে বুকে চেপে ধরে। মনে মনে বলে, আহারে! তুমি ক্যান আইছিলা এই মরার শহরে।
মুখে বলে, সব ঠিক হয়া যাইব।
বকুলের সান্ত্বনায় অথবা তার নরম উষ্ণতায় মনা শান্ত হয়। প্ৰশান্ত চোখগুলো তার আবার স্বপ্নালু হয়,
এই শহর আমার ভালা লাগে না বকুল। আমার চইলা যাইতে মন চায়, তোমাগো সেই ছোট্ট বাড়িটাতে, চারপাশে গাছগাছালি ভরা, একপাশে ঘর, মাঝখানে গোল উঠান। টাকা পাইলে মারে খুঁইজা বাইর করমু।
তারপর, তুমি, আমি, আর মা, আমরা তিনজন একসাথে থাকমু। কাঠাল গাছের ছায়ায় পিড়িতে বইসা তোমার চুলে তেল দিয়া দিব মা, তুমি মার উকুন বাছবা। আমি ঘরের চাল থেইক্যা ঝিঙা পাইড়া আনব, মরিচের চারায় পানি দিব। তারপর একটা দোলনা হইব, দোলনায় চড়ার মানুষ হইব।
বকুলের হাতটি নিজের অজান্তেই ধরে থাকে মনা। বকুল নীরবে মনার স্বপ্নের কথা শুনে যায়, শুনতে ভালো লাগে তার।
সেদিন সন্ধ্যায় মদিনা হোটেলের পাশে যে টেলিফোনের দোকান আছে, সেখান থেকে ডাক আসে ষষ্ঠীর। তার মেয়ে ফোন করেছে। সারাদিনের উত্তেজনা তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে, দুপুরে খাওয়া হয়নি তবুও পেটের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ আসে না। পান মুখে দিয়েছিল, সেটাও বিস্বাদ লাগায় ফেলে দিয়েছে। টেলিফোনের দোকান থেকে মোবাইল ফোনটা কানে লাগিয়ে সে চলে যায় কলার আড়তের সামনে। এখানে একটু ফাঁকা থাকে, ষষ্ঠীচরণ হ্যালো বলতে পারে না, তার গলা বুজে আসে। ঐ পাশেও কেউ কথা বলে না, শুধু নাক টানার শব্দ পাওয়া যায়। তারপর বহুক্ষণ পরে, নাক টানার শব্দ থামে, ঐ পাশ থেকে ভেজা গলা ভেসে আসে,
বাবা, তুমি চইলা আসো।
ষষ্ঠীচরণ এই আহবানে মেয়ের বেদনা টের পায়। মেয়েটা হয়তো ভাবছে, তার কারণে তার বৃদ্ধ বাবাকে মানুষের দয়া কুড়াতে হয়, বাবার এই অসহায়ত্বের জন্য নিজেকে দায়ী করছে হয়তো। মেয়েকে সে সান্ত্বনা দেয়,
মাগো, তুই মনে কষ্ট পাইছ না, আমি চইল্যা আসব। সব ঠিক হয়া যাইব ৷
ফোন রাখার পরও ষষ্ঠীচরণ কিছুক্ষণ কলার আড়তের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। টগরের চেহারাটা কোনোমতেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় গড়া নিজের লম্বা ছায়াটাকে খুব কুৎসিত লাগে তার।
সেদিন রাতে বকুল, মনা আর ষষ্ঠীচরণ তিনজন একযোগে গুরুজির ঘরের সামনে হাজির হয়। টাকা যদি নাও পায়, ছেলেটিকে তার বাবার কাছে নিরাপদে ফিরিয়ে দেয়ার সংকল্প নিয়ে আসে তারা। চিরকুটের ‘বিনামূল্যে লাশ” সংক্রান্ত লাইনটি তাদের শান্তি দিচ্ছে না। অনুশোচনায় ভারি বুক দিয়ে তারা টগরকে আগলে রাখতে চায়। কিন্তু গুরুজির ঘরের সামনে এসে তারা অভূতপূর্ব এক দৃশ্যের সম্মুখীন হয়, বহুদিন পর গুরুজির ঘরের দরজার দুই কপাটের মিলন হয়েছে। বন্ধ দরজায় ঘরটিকে তাদের অপরিচিত মনে হয়, কিছু সময়ের জন্য তারা বিভ্রান্ত হয়, এটা কি আসলেই গুরুজির ঘর? তারপর তাদের মনে হয়, টগরের উপস্থিতির কারণেই হয়তো এই ব্যবস্থা। কিন্তু তারা যখন দুই কপাটকে নিজেদের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করে তখন ঘরে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই পায় না। ঘরের মেঝেতে দাঁড়িয়ে তাদের চেতনা কিছু সময়ের জন্য বিলুপ্ত হয়, এই শূন্যতার কোনো অর্থ আবিষ্কার করতে না পেরে তারা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে থাকে।
