॥ ৮ ॥
বিদ্যুতের অভাবে গুরুজির ঘরের হলুদ বাতিটি চোখ বুজে ছিল। একটা মোমবাতি যতটা আলো দিচ্ছে আঁধার বিতরণ করছিলো তার অনেক বেশি। আলো আঁধারিতে পাঁচজন কাঙাল তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় হাজির হয়েছে। তাদের মুখে ভয় আর উত্তেজনার মিশেলে দুর্বোধ্য একটা অনুভূতি ফুটে উঠছে। এই সভায় জলিলকেই সবচেয়ে স্বাভাবিক দেখায়, তার লাল চোখ দুটো সে মেলে রাখে, কিন্তু চোখ দেখে তার মন পড়া যায় না, হয়তো পড়ার জন্য তার মনে কিছু নেইও। সভায় একমাত্র নারী বকুল। নিজাম হায়দারের দুশ্চরিত্র ড্রাইভারের টোপ সে। মনা যখন তাকে প্রথম প্রস্তাবটি দিয়েছিল, সে ভয় পেয়েছিলো, নিজের জন্য নাকি মনার জন্য তা সে নিজেও বুঝতে পারে না। তার কেবল মনে হয়, একটা বিপদ ঘটতে যাচ্ছে। তারপরও সে রাজি হয়, যাদের টাকা আছে সন্তান নেই, তাদের কেউই হয়তো তার বাচ্চাটাকে কিনে নিয়েছে। অর্থবান একজনের সন্তান অপহরণে সে প্রতিশোধের সুযোগ পায়। শূন্য খাঁচার সামনে সে যত কেঁদেছে তার কিছুটা ফিরিয়ে দিতে চায়। পারে না,
ষষ্ঠীচরণ তার ছোটো মেয়ের বেদনাহত চেহারাটা ভুলতে মোমবাতির আলোয় তার চেহারার ভাঁজ আরো গভীর দেখায়, তাকে আরো প্রাচীন মনে হয়। একটি কর্মক্ষম চোখে গাড়ি চালাতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ হয় সবার। কিন্তু মুখ ফুটে কেউ বলে না, তাদের তো আর কোনো উপায়ও নেই।
তারপর তারা একটা প্রতিবন্ধী ছেলের মূল্য নির্ধারণে বসে। এই পর্বে জলিলের আগ্রহ দেখা যায় বেশি, সে নিজের অভাব আর স্বপ্নের অনুপাত হিসেব করে প্রস্তাব দেয়,
এক লাখ টাকা।
লাখ টাকা মানেই তার কাছে অনেক টাকা। তার মনে হয়, এক লাখ টাকায় সে একটি নারী পাবে, তিনবেলা পেট ভরার নিশ্চয়তা পাবে, সন্ধ্যার মাদকের খরচটাও জুটে যাবে।
ষষ্ঠীচরণের মুখের ভাঁজে পরিহাস ফুটে ওঠে। সে বলে,
লাখপতি অনেক মানুষ এই শহরে ভিক্ষার থালা নিয়া ঘুরে। এক লাখ টাকা তাগো তিন মাসের সঞ্চয়।
এই পর্যায়ে মনার বিবেক জেগে ওঠে, সে গুরুজিকে তার দীক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয়,
আমরা কত চামু সেইটা না হিসাব কইরা, হিসাব করা উচিৎ কত আমাগো পাওনা ৷
গুরুজি এবার মুখ খোলে,
আমরা কোনো জুলুম করব না। নিজাম হায়দারের ছেলের দাম স্বয়ং নিজাম হায়দার ঠিক করুক।
গুরুজি সবার কাজ বুঝিয়ে দিলো, খুটিনাটি কিছুই বাদ গেল না। সব বুঝে নেয়ার পরও বকুলের মনে একটা প্রশ্ন জেগে রইলো। কিন্তু ছেলেটারে ফিরত দিবেন ক্যামনে?
এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটার সামনে গুরুজির মুখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা দেখা গেল। গুরুজি বকুলের প্রশ্নের মাহাত্ম্য বুঝতে পেরে, তাকে আশ্বাস দেয়,
ছেলের কিছু হইব না। এই নিয়া চিন্তা কইরো না।
তবুও মোমের কাঁপা আলোতে গুরুজির মুখে যে একটা দ্বিধার রেখা বকুল এক পলকের জন্য দেখতে পেয়েছিল, সেটাই তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তারপর ঘরে একটা অস্বস্তির বাষ্প ছড়িয়ে সে অনেকগুলো প্রশ্ন রাখে গুরুজির প্রতি, তার আসল নাম, জেল খাটার কারণ, নিজাম হায়দার
সম্বন্ধে তার গভীর জ্ঞানের উৎস ইত্যাদি নিয়ে। গুরুজি বকুলের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকায়, তারপর বলে,
বকুলের এইসব জানতে চাওয়াটা আমি সমর্থন করি, আমরা এমন একটা কাজ করতে যাইতেছি যেখানে বিশ্বাসটা হইলো বুনিয়াদ। সবার সম্পর্কে সবার জানার দরকার আছে।
অতীতের স্মৃতিগুলোর প্রতি সমন জারি করার জন্য গুরুজি কিছুক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করলো। যখন চোখ খুলল সে চোখে বেদনা ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না।
এই বস্তিতে গুরুজি হয়ে উঠার আগে, জেলখানায় তেরো বছর সাত মাস ‘নম্বর’ হয়ে কাটিয়ে দেয়ার আগে তার নাম ছিল মহিউদ্দিন। তার বাপ ছিল চাষা, কিন্তু মহিউদ্দিনের হাতে কখনো কাস্তে ওঠেনি, উঠেছিল কলম, কারণ তার মা ছিল শৌখিন। তার নানা ছিল রায়সাহেবের বাগান বাড়ির চাপরাশি। ছুটিতে বাড়িতে এসে সাহেব বাড়ির অদ্ভুত সব গল্প শোনাত। তাদের শখ আর খেয়ালের ফিরিস্তি শুনতে শুনতে মহিউদ্দিনের মায়ের ঘাড়েও কিছু শখের ভূত চেপেছিল। সে উঠানের একপাশ দখল করে বাগান করেছিল, কান্নাকাটি করে একটা শেমিজ জোগাড় করেছিল, রাতের বেলা তার জোড়াতালি দেয়া শেমিজটা সে পরতো, দিনে পরলে সবাই হাসাহাসি, রাগারাগি করে। বাপ তার রায়বাড়ির চাপরাশি হওয়ায় সাহেবদের সাথে নিজের একটা সূক্ষ্ম সম্পর্ক মনে মনে সে স্থাপন করেছিল। চাষার সাথে বিয়ে হওয়ায় মহিউদ্দিনের মায়ের গরিমায় খুব আঘাত লাগে। ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতে নিজের ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড়ো কোনো অফিসের কেরানি বানানোর সংকল্প করে। ছেলেকে লেখাপড়া শেখাতে গিয়ে যথেষ্ট কষ্ট তাকে করতে হয়েছে, চাষার বউ হওয়ার কারণে পরিশ্রম করে দেহ ক্ষয় হয়েছে তার, সেজন্য কোনো আক্ষেপ নেই, ছেলেটাকে পাশ করানোই তার জীবনের লক্ষ্য। মেট্রিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার দিন মহিউদ্দিনের মা এত বেশি উৎকণ্ঠায় ছিল যে দুপুর বেলা সে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। মহিউদ্দিনের বাবার মনে হলো, অতিরিক্ত গরমে এই অবস্থা হয়েছে। মুখে পানি ছিটিয়েও যখন বউকে জাগাতে পারলো না, তখন তার মনে হলো খারাপ কিছু হয়েছে। মহিউদ্দিন সন্ধ্যা বেলায় যখন তৃতীয় বিভাগে পাশ করার সুখবর নিয়ে বাড়িতে এলো, তখন তার জন্য একটা দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিল।
মা চলে যাওয়ার পর পড়ালেখার সাথে মান অভিমানে মহিউদ্দিন আর বেশিদূর আগাতে পারেনি। সে দিশেহারা হয়ে ঘুরতে লাগলো। তার একটা ‘পাশের’ কারণে সে কৃষক হতে পারে না, আবার একটিমাত্র ‘পাশ’ দিয়ে ভালো চাকরি জোটানোও সম্ভব হয় না। একদিন তার বাপ যখন আরেকটি বিয়ে করে বউ ঘরে তোলে তখন সে ঘাড় বাঁকা করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। বাপ তার খুব বেশি বাঁধা দেয়নি তাকে বরং প্রচ্ছন্ন উস্কানিই দিয়েছিলো। সে তখন রহমতগঞ্জ বাজারে গনি মিয়ার মুদি দোকানে সহকারি হিসেবে কাজ নেয়, এবং দোকানের মেঝেতে রাতের বেলায় ঘুমায়। লেখাপড়া না জানা গনি মিয়া তাকে দিয়ে চিঠি লেখায়। তার লেখা চিঠির খুব সুনাম ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনেকেই তাকে দিয়ে চিঠি লেখাতে এবং পড়াতে আসতো। গঞ্জের লোকজন তখন বাজারে একটা নলকূপ বসানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করছিল। সরকারি অফিসে এবং মান্যগণ্য লোকজনের সাহায্য চেয়ে মহিউদ্দিনকে দিয়ে লিখিয়ে আর্জিপত্র পাঠায় তারা। তেমনি একটি চিঠি নিজাম হায়দার ও পায়। চিঠির ভাষায় এবং সুন্দর হস্তাক্ষরে মুগ্ধ হয় নিজাম হায়দার। তাই বাজারে একটা নলকূপ স্থাপিত হয় এবং মহিউদ্দিন লজিং মাস্টার হিসেবে জমিদার বাড়িতে নিয়োগ পায়।
নিজাম হায়দারের মূল বাড়ির বাইরে একপাশে একতলা আরেকটি বাড়ি আছে, সাড়ি সাড়ি ঘর গা ঘেঁষে অবস্থান করছে, সামনে বারান্দাটাও লম্বা। এখানে নিজাম হায়দারের বাড়ির চাকর এবং আশ্রিতরা থাকে ৷ শিক্ষক হবার সুবাদে সেই বাড়ির একেবারে দক্ষিণের সবচেয়ে ভালো ঘরটি দেয়া হলো মহিউদ্দিনকে। মুদি দোকানের মেঝের তুলনায় এখানে বিছানা আরামদায়ক, এবং পদটাও সম্মানজনক, মাস্টার সাহেব। সম্বোধনের সাথে সাহেব যুক্ত হয়েছে, মহিউদ্দিনের তার মায়ের কথা মনে পড়ে।
নিজাম হায়দার মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় বিশ্বাসী না। নিজের মেয়েদের সে শুধু চিঠি লেখার উপযুক্ত করতে চায়, যাতে শ্বশুরবাড়ির দুঃখগাথা তারা লিখে জানাতে পারে। মহিউদ্দিন সকাল সন্ধ্যায় মূল বাড়িতে যায় ধারাপাত আর ছড়া মুখস্থ করায় নিজাম হায়দারের মেয়েদের। মাঝে মাঝে নিজাম হায়দার তাকে ডেকে নিয়ে যায় চিঠি পত্র লিখে দেয়ার জন্য, অতিরিক্ত কৃতজ্ঞতার কারণে মনিবের সামনে বসে চিঠি লিখতে মহিউদ্দিনের অস্বস্তি হয়, তার হাত কাঁপে ভয়ে, অক্ষরের দেহে সেই কম্পনের ভাঁজ দেখা যায়। নিজাম হায়দার মাস্টারের ভয় এবং কৃতজ্ঞতাজনিত কম্পমান হাত দেখে মনে মনে খুশি হয়।
সকাল এবং সন্ধ্যা ছাড়া মহিউদ্দিনের তেমন কাজ থাকে না। বাকি সময় সে বিছানায় শুয়ে থাকে অথবা বাগানে হেঁটে হেঁটে ফুলের নাম মুখস্থ করে। তার নিরুত্তেজ জীবনে আরামও ক্লান্তিকর লাগে। ফুলের নাম সব মুখস্থ করে ফেলেছে, বাগানের প্রতিটা ঘাস তার চেনা হয়ে গেছে, কাঁচামালের অভাবে স্বপ্নও দেখে না আর, ভীষণ একঘেয়ে লাগে নিজের জীবন। তাকে এই বিপন্ন অবস্থা থেকে উদ্ধার করলো একটা বিকাল। জমিদার বাড়ির সীমানার বাইরে একটা মেহগনির বন সৈন্যদের মতো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশে শুয়ে আছে সবুজ খোলা মাঠ বাতাসের দোলায় মেহগনির পাতা ঝরে বৃষ্টির মতো, সেদিন বিকালে একটা চঞ্চল বাতাস ঘুরে ঘুরে গাছের পাতা ঝরাচ্ছিল, শুকনো পাতার পতনের প্রেক্ষাপটে সে দেখে মাঠের কাছ ঘেষে বকুল গাছে হেলান দিয়ে একটা মেয়ে ফুলের মালা গাঁথছে, আর তার চোখ বেয়ে নেমে আসছে স্বচ্ছ অশ্রুধারা। অশ্রু মোছার কোনো প্রয়াস তার নেই, যেহেতু সে ভেবেছে তাকে কেউ দেখছে না। সূর্যের সোনালি রোদে তার অশ্রুধারাকে গলিত সোনার মতোই মনে হয়। মহিউদ্দিনের কাছে এই দৃশ্যটি অলৌকিক মনে হয়, এক মুহূর্তে তার সন্দেহ হয়, এই মেয়েটা কোনো মানবী নাকি দেবী? সে রুদ্ধশ্বাসে নীরবে অশ্রুপাত করা মেয়েটিকে দেখতে থাকে।
মেয়েটি তাকে স্বপ্নের রসদ জোগায়। বিছানায় অলস দুপুরগুলো তার সরস হয়ে ওঠে, বিকালের জন্য অস্থির হয় সে। পরদিন বিকালে মহিউদ্দিন আবার উপস্থিত হয় মেহগনি বনে, বনের পাশে বকুল গাছের নিচে মেয়েটাকে পাওয়া যায়, আজ মেয়েটার হাত খালি, চোখ শুষ্ক। হাটু দুটিকে দুই হাতে বেঁধে তার ওপর মাথা রেখে বিষণ্ণ চোখে সে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে, মাঠে কয়েকটি ছাগল ঘাস খাওয়া আর নিজেদের মধ্যে কলহক্রীড়ায় ব্যস্ত। দূরে অনেকগুলো শিশু ভীষণ কোলাহল করে গোল্লছুট, বা দাঁড়িয়াবান্দা ধরনের কোনো একটা খেলা খেলছে। তাদের কোলাহল এই মেয়েটির বিষণ্নতার কোনো ক্ষতি করতে পারছে না।
মেয়েটির বিষণ্ণতা মহিউদ্দিনকেও স্পর্শ করে। মেয়েটার মন খারাপ, কিন্তু কার জন্য? কার জন্য সে মালা গাথে, চোখের জল ফেলে। সূক্ষ্ম হিংসা চোরাকাঁটার মতো তার মনে বিঁধে থাকে। নিজের সংশয় দূর করার কী উপায়, ভেবে ভেবে তার অস্থিরতা বাড়ে। অবশেষে একরাত্রির অনিদ্রার পর সে একটা চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত নেয়, যেহেতু এই কাজটি সে ভালো পারে। সে নিজের পরিচয় না দিয়ে, সাদা ধবধবে কাগজে তার কৌতূহল জানায়। মেয়েরা গুনগুন করে গান গেয়ে মালা গাথে, মালা গাথার সময় সে তবে কেন কাঁদে? তার মন কে খারাপ করেছে, সে জানতে চায়। চিঠির জবাবে আরেকটি চিঠি পাবার আশায় সে বকুল গাছের নিচে একটি গাঁদা ফুলের ভারে চিঠিটি চাপা দিয়ে আসে।
পরের দিন সে দেখে মেয়েটি চিঠিটি হাতে নিয়ে বসে আছে, আর গাঁদা ফুলটি নিয়ে দুটি ছাগল কাড়াকাড়ি করছে। মেয়েটির মুখের ভাবে কোনো পরিবর্তন না দেখে মহিউদ্দিন শঙ্কায় ভোগে। চিঠি লেখা হয়তো ঠিক হয়নি তার। তবুও আশা নিয়ে পরের দুইদিন বকুলতলাটা পরীক্ষা করে আসে, গ্রামের দুরন্ত শিশুরা যেমন ডোবার পাশে হাঁসের ডিম খুঁজে বেড়ায়, সে তেমনি মেহগনি বনে একটা চিঠি খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু চিঠি সে পায় না।
সেদিন দুপুরে বিছানায় শুয়ে যখন নিজের ভাগ্যকে সে অভিসম্পাত দিচ্ছিল তখন দরজা থেকে একটা মিহি গলা শুনতে পেলো সে, ‘সালামলাইকুম’। মহিউদ্দিন অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে দেখে, বকুলতলার বিষণ্ণ মেয়েটি তার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির হাতে তার দেয়া ভাঁজ করা চিঠি। মহিউদ্দিনের মনে ভীতি ছড়িয়ে পড়লো, মেয়েটি কি অভিযোগ করতে এসেছে? কিন্তু মেয়েটির চোখে লজ্জা আর সংকোচ ছাড়া আর কিছু খুঁজে পেলো না সে। মহিউদ্দিন নিজের বোকামি টের পেলো, যখন মেয়েটি জানালো, এই কাগজটি সে গাছতলায় খুঁজে পেয়েছে। সে পড়তে জানে না, কিন্তু কাগজটিতে গোল গোল সুন্দর সন্নিবিষ্ট অক্ষর দেখে তার ধারণা হয়েছে এটা অবশ্যই কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সে তার বাবাকে দেখিয়েছে, তার বাবারও যেহেতু অক্ষরজ্ঞান নেই, তারও মনে হয়েছে এটা জরুরি কিছুই হবে। তারপর সে তার চাচাকে দেখিয়েছে যে গঞ্জে গুড় আর মুড়ি বিক্রি করে। তার চাচাও তাকে বলতে পারেনি এটা কীসের কাগজ হতে পারে, তবে চাচা তাকে পরামর্শ দিয়েছে মাস্টার সাহেবকে একবার দেখিয়ে আনতে, তাই সে আজ এসেছে।
মহিউদ্দিন কাগজটি হাতে নেয় কিন্তু খুলে দেখে না, মেয়েটি বিভ্রান্ত হয়। মহিউদ্দিন বিভ্রান্তি এবং অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে তার নাম জিজ্ঞাসা করে। মেয়েটি জানায় তার নাম কুসুম। কুসুম নিজের ভিতরে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সে ভেবেছিল মাস্টার সাহেব একজন বুড়োমতো লোক হবে, তাই সে নির্দ্বিধায় তার ঘরে চলে এসেছে। যুবক মাস্টারকে দেখে লজ্জায় গলে যাচ্ছিল সে, লোকটা কী ভাববে তাকে, বেহায়া মেয়ে। তার মা তাকে বলেছে, তার বিয়ের বয়স হয়েছে, শরীর ফুড়ে যৌবনের যেসব চিহ্নের অনাহুত আগমন হয়েছে, সেসবের খবর যেন কেউ টের না পায়, বিশেষ করে জোয়ান ছেলে, মরদের কাছ থেকে নিজেকে সাধ্যমত গোপন রাখতে। আর সে কিনা একটা জোয়ান ছেলের ঘরে চলে এসেছে। কুসুম ঘেমে ওঠে ভয়ে এবং অজানা এক শিহরণে। সে ঘরের মেঝেতে চোখ রেখে জানতে চায়, কাগজটাতে কী লেখা আছে। মহিউদ্দিন বলে,
তেমন কিছু না, বাজারের ফর্দ।
তারপর মাস্টার সাহেবের বৈকালিক ভ্রমণ জমিদার বাড়ির বাগানে সীমাবদ্ধ থাকে না। মেহগনি বনের লাগোয়া মাঠ, যেখানে গরু ছাগল ঘাস খায় আর বাচ্চারা কোলাহল, কোন্দল করে সেখানে সে হেঁটে বেড়ায়। বকুল গাছের তলায় বসে থাকা কুসুমের সাথে তার দৃষ্টি বিনিময় হয়, কিছুদিন গেলে তারা দৃষ্টির সাথে সাথে হাসি এবং কুশলও বিনিময় করে। মহিউদ্দিন তখন জানতে পারে, কুসুম এখানে তার ছাগলগুলোকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে আসে, এবং বর্ষা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানেই ঘাস খাবে তার ছাগলগুলো। মহিউদ্দিন হিসাব করে দেখে, বর্ষা বেশি দূরে নেই। তার আগেই তাকে জানতে হবে, কার জন্য মন খারাপ হয়েছিল কুসুমের। কিন্তু নিজের ইতস্তত কাটিয়ে উঠতে পারে না সে। আকাশে সেদিন মেঘ জড়ো হতে দেখে, মহিউদ্দিন আতঙ্কিত হয়, বর্ষাটা কি তবে চলেই এলো? কালো মেঘের ঘন ছায়ায় মন খারাপ করে সে মেহগনির বন পার হয়ে দেখে, কুসুমের মুখেও মেঘ জমেছে। সেদিন মেঘেদের তাড়নাতেই মহিউদ্দিন বেপরোয়া হয়। কুসুমকে গিয়ে জানায়, সেদিন যে কাগজটা সে তাকে দেখিয়েছিল, সেটা কোনো বাজারের ফর্দ ছিল না। সেখানে একটা প্রশ্ন ছিল।
তুমি কাঁদতে কাঁদতে কার জন্য মালা গাথো?
বকুলের হতভম্ভ মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে জানায়, তার প্রিয় ছাগলটি হাটে যাবে, ছাগল হাটে গেলে সাধারণত আর ফিরে না। তাকে চিরবিদায় দেয়ার জন্য মালা গেথেছিল সে। সেই মালা হাটে যাওয়ার আগেই ছাগলটি খেয়ে ফেলেছিল। তারপর দুটি নরনারীর মধ্যে নীরব বোঝাপড়া হয়ে যায়, যাকে কবিরা প্রেম বলে থাকেন।
আকাশে জমে ওঠা মেঘের উপস্থিতির সাথে সাথেই তাদের প্রণয়ও বৃদ্ধি পেতে থাকে। মহিউদ্দিন সিদ্ধান্ত নেয়, এই বর্ষায় সে সংসারি হবে। যে বর্ষা তাকে শঙ্কিত করে তুলেছিল, সেই বর্ষার আকাঙ্ক্ষায় দিন গুনে সে। বকুল তলায় বসে নির্জন সন্ধ্যায় তারা আসন্ন সুখের কল্পনা করে রোমাঞ্চিত হয়।
বর্ষা তাদের নিষ্কৃতি দিয়েছিল কিন্তু অন্য একটি দুর্যোগ এসে পতিত হলো তাদের উপর। চারটা ছাগলকে তাড়িয়ে মাঠে নিয়ে যাওয়ার সময় কুসুমের নব যৌবনা, দীর্ঘ, ভরাট দেহটা দেখতে পায় নিজাম হায়দার। তার মনে হয় সন্তান ধারণের জন্য এমন একটি শরীর খুব উপযোগী, এবং সেদিন পুত্রাকাঙ্ক্ষী নিজাম হায়দারের তৃতীয় স্ত্রীর অনুসন্ধান সমাপ্ত হয়। গ্রামের গোয়ালার মেয়ে হিসেবে তাদের মধ্যে যে অর্থনৈতিক ব্যবধান ছিল, সেটা বয়সের ব্যবধানকে তুচ্ছ করে দিলো। কুসুমের বাবা মা মেয়ের ভাগ্যে কৃতজ্ঞ হয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়লো। এই সুসংবাদে কুসুম তার বাবা মায়ের মতো উদ্বেলিত হলো না, কে যেন তার মুখ থেকে সব উচ্ছলতা কেড়ে নিলো ৷ আকাশে মেঘ নেই, কিন্তু বকুল তলায় বৃষ্টি ঝরলো সেদিন, মায়ের দেয়া রানি হওয়ার সান্ত্বনাও কুসুমের অশ্রুর স্রোত ঠেকাতে পারেনি। মহিউদ্দিন সেদিন কুসুমকে আরো একবার কাঁদতে দেখে, এবার সে নিশ্চিত হয় এই কান্না তার জন্যই।
এই কান্নার প্রতিকার চাওয়ার জন্য নিজের সব সাহস জড়ো করে মহিউদ্দিন নিজাম হায়দারের সামনে হাজির হয়। সঙ্কোচে তার কথা আটকে আসে, তবুও ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে সে নিজের এবং নিজাম হায়দারের হবু স্ত্রীর প্রণয়ের কথা জানায়। নিজাম হায়দার আরাম কেদারায় শুয়ে ছিল, সব শুনেও তার চেহারায় কোনো পরিবর্তন হলো না। কিন্তু মনে মনে এই সামান্য মাস্টারের স্পর্ধায় বিস্মিত হয়ে গেল সে। নিজাম হায়দার ভেবে পায় না সে মাস্টারকে কীসের শাস্তি দিবে, বোকামির নাকি বেয়াদবির। নিজাম হায়দার যতই ভাবতে থাকে, তার প্রতিহিংসা ততই বাড়তে থাকে। কুসুমকে সে ঘরে আনবে সেটা মনস্থির করেই ফেলেছে, তাই যে কোনো ভাবে মহিউদ্দিনের উপস্থিতি এবং অস্তিত্ব তার অসহ্য লাগে। দরিদ্র, হতচ্ছাড়া, আবেগাক্রান্ত ছেলেটিকে কঠিন শাস্তি দেয়াটা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
পরের দিন দুপুরে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় মহিউদ্দিনকে। মহিউদ্দিন পরে জানতে পারে, তার নামে ডাকাতি, হত্যাচেষ্টা এবং আরো কিছু লোমহর্ষক মামলা হয়েছে, উকিল সাক্ষীর কোনো অভাব ছিল না তার বিপক্ষে। বিচারের পাল্লায় মহিউদ্দিনের অপরাধের চেয়ে নিজাম হায়দারের টাকার পাল্লা বেশি ভারি হলো। জেল মহিউদ্দিনকে পেটের স্থায়ী পীড়া এবং একটি নতুন জীবন দর্শন প্রদান করেছে। জেল থেকে বের হয়ে সে শুনলো, কুসুম একটা পুত্র সন্তান জন্ম দেয়ার ক্লেশে দুনিয়া ছেড়েছে। কুসুমের প্রতি তার আবেগ বিনষ্ট হয়েছে জেলের কঠোর জীবনে, কিন্তু নিজাম হায়দারের প্রতি এবং সমস্ত ধনীকুলের প্রতি ক্ষোভ প্রতিদিন চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে।
এমন অবিচারের প্রতিবিধান করাই উচিত, নিজাম হায়দারের ছেলেকে অপহরণের জন্য নৈতিক ভিত্তি পায় অবশিষ্ট চারজন। শীতের রাতের মতো তাদের সভা দীর্ঘ হতে থাকে। তাদের কথা ফুরিয়ে যায়, তবু তারা সভা শেষ করে না। অপ্রয়োজনীয় টুকটাক আলাপ করে। আলো আঁধারিতে ভয়, শঙ্কা আর অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন হয়, তাদের মনে হয় তারা কোনো স্বপ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, শুধু বুঝতে পারছে না, এটা সুখস্বপ্ন নাকি দুঃস্বপ্ন
