কাঙালসংঘ – ১১

॥ ১১ ॥

নতুন রেলস্টেশনের পাশে প্রাচীন মলিনতা গায়ে মেখে একটা পুরানো স্টেশন আজো টিকে আছে। সেখানে একটা আপাত অন্ধকার কোনায় টগরকে নিয়ে বসে আছে গুরুজি। টগরের গা থেকে তার আভিজাত্যের সব চিহ্ন খুলে ফেলা হয়েছে। দুইটা ছিদ্র সম্বলিত একটা গেঞ্জি এবং পুরানো লুঙ্গি পরানো হয়েছে তাকে। লুঙ্গি কোমরে রাখার বিদ্যাটা তার অজানা বলে, সেটা বারবার খুলে যায়, গুরুজি একটি পাটের দড়ি কোমরে বেঁধে দিয়েছে। টগরের চুল হয়েছে উস্কুখুস্কু, হাতে পায়ে মুখে ধুলো লেপে দিয়ে গুরুজি তার ত্বকের উজ্জ্বলতা ঢেকে দিয়েছে। টগরকে দেখে এখন কেউ বলতে পারবে না, শহরে ঢোকার মুখে বাসের জানালা দিয়ে যে প্রাসাদটি তারা কৌতূহল নিয়ে দেখে, এই ছেলেটি সেই প্রাসাদের সবচেয়ে আদুরে অধিবাসী। টগরের কাছে পুরো ব্যাপারটা একটা খেলার মতো মনে হয়, তার স্কুলের পরিচিত, উত্তেজনাহীন খেলা নয়। প্রতি মুহূর্তে অবাক হওয়ার মতো রোমাঞ্চ আছে এখানে। এতকিছু আছে দেখার, সে দেখে শেষ করতে পারে না। অথচ, এই স্টেশনে মানুষের ভীড় নেই, কোনো কর্ম চাঞ্চল্য নেই, দুটো পুরানো ভবন রাজ্যের স্থবিরতা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। এই শান্ত নীরব পরিত্যক্ত স্টেশনে উত্তেজনার শত শত উপাদান খুঁজে পায় টগর, পুরানো নষ্ট বগিগুলো এখানে জড়ো করা হয়েছে, সেখানে গৃহহীন ভিখারির দল সংসার পেতেছে। এখানে একটু আড়াল থাকায়, নারী এবং মাদক সহজলভ্য। টোকাইরা এখানে সস্তা মাদকের আসর বসায়, গোল করে বসে তারা পলিথিনে নাক ডুবিয়ে আঠা শোঁকে, তারপর প্ল্যাটফর্মের ঠান্ডা ধুলোমাখা মেঝেতে শরীর এলিয়ে পড়ে থাকে। রাস্তায় বর্জ্য দেখলে যেমন মানুষ নাক চেপে ছোটো লাফ দিয়ে ডিঙ্গিয়ে পার হয়ে যায়, রেলের কর্মচারীরাও তেমন এদের ডিঙ্গিয়ে পার হয়ে যায়। ধুলো অথবা বর্জ্যের চেয়ে বেশি অস্তিত্ব তাদের নেই।

গুরুজি একটু পর পর টগরের দিকে চেয়ে দেখে। কুসুমের চেহারা সে বিস্মৃত হয়েছে, টগরের চেহারায় সে হয়তো কুসুমকে খুঁজে বেড়ায়। ঠান্ডা লাগতাছে?

টগর কিছু বলে না, সে লাল বগিতে ঝুলে থাকা কাপড়চোপড়ের নড়াচড়া দেখে। গুরুজি একটা পুরানো লুঙ্গি তার গায়ে জড়িয়ে দেয়। তারপর আবার বলে,

তোমার নাম কে রাখছে জানো?

টগর এবার লাল বগি থেকে চোখ সরায়, মায়ের প্রসঙ্গে কথা বলতে তার খুব ভালো লাগে। মায়ের দেয়া একমাত্র উপহার তার নামটা। মাকে সে দেখেনি, তাই তাঁর প্রতি আগ্রহ তার প্রচণ্ড। সে বলে,

মা রেখেছে। মা ফুল পছন্দ করে, মা নাম দিয়েছে টগর, টগর।

দুই হাত জড়ো করে ছোটো একটা তালি দেয় সে, মুখে ছড়িয়ে পড়ে অমলিন, অকৃত্রিম হাসি। এমন বিশুদ্ধ হাসি গুরুজি আর কখনো দেখেনি।

টগরের হাসিমুখ দেখে অকস্মাৎ কুসুমের চেহারাটা মনে ভাসে গুরুজির। পুরাতন রেল স্টেশনের আলো আঁধারিতে বসে, গুরুজি ফিরে যায়, সেই মেহগনি বাগানে।

সেদিন প্রকাণ্ড এক মেঘের ছায়া পড়েছিলো মেহগনি বনের উপর। গাছের সজীব নতুন পল্লব সমস্ত আলো প্রতিহত করে বনের মধ্যে অন্ধকার বিস্তৃত করে সন্ধ্যা নামিয়েছিল। সেই ইঁচড়েপাকা সন্ধ্যায় কুসুম এবং মহিউদ্দিন উপলব্ধি করে, সারা পৃথিবী থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সেই আঁধার সব ঢেকে দিয়ে উন্মোচন করেছে তাদের গোপনতম আকাঙ্ক্ষা। তাদের অন্যসব পরিচয় অবলুপ্ত হয়ে তারা শুধু নর নারী হয়ে ওঠে, তাদের মধ্যে স্পর্শ অবধারিত হয়ে যায়।

যখন সত্যি সত্যি সন্ধ্যা নামে এবং তাদের বুকের প্রলয় যখন শান্ত হয়, তখন কুসুমের চোখে জল নামে। মাঠের মধ্যে তার ছাগলগুলো আহার সমাপ্ত করে ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য একটানা ডেকে যায়। কুসুমেরও তখন ঘরের কথা মনে পড়ে, তার অশ্রুর প্রবাহ বেগবান হয়, চাপা আর্তনাদ করে সে বলে,

আমি তো শ্যাষ হইয়া গেলাম।

তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, শুধু আর্তনাদই ছিল। মহিউদ্দিন তাকে বলে,

শ্যাষ হইবা ক্যান, শুরু হইব, আমগো সংসার শুরু হইব।

তারপরের বিকালগুলো তারা সংসারের আলাপ করেই কাটায়, বাচ্চাকাচ্চার হিসাব করে। মহিউদ্দিন বলে,

আমাগো গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা হইব। কুসুম মুখ ভ্যাংচিয়ে বলে, তুমি হওয়াইও একলা, আমি নাই। , এইসব রসিকতা, বক্রোক্তির মধ্যেও তারা ছেলেমেয়ের নাম রাখে। মহিউদ্দিন বলে, তাদের যদি প্রথমে মেয়ে হয়, তার নাম হবে, শিউলি আর যদি ছেলে হয়, নাম হবে টগর। কুসুম নাক কুঁচকে বলতো, এহ! টগর, এইটা কোনো নাম হইলো? আমি জীবনেও আমার ছেলের এই নাম রাখব না।

গুরুজি আবারও টগরের মুখের দিকে তাকায়, সেখানে সে শুধু কুসুমকে নয় নিজেকেও খোঁজে। মনাকে গুরুজি সত্যি কথাই বলেছিল, ছেলে তার বাপের কাছেই থাকবে। সে অপেক্ষায় আছে, যে কোনো একটা ট্রেন এলেই সে উঠে পড়বে তার ছেলেকে নিয়ে। নিজাম হায়দারের সম্পদের অভাব নেই, সিন্দুক ভরা রত্ন তার, কিন্তু মহিউদ্দিনের এই একটিই রত্ন, তার একমাত্র সম্পদ, এটি সে হাতছাড়া করতে পারবে না।

ছেলেকে পাওয়ার জন্য বহু বছর ধরে পরিকল্পনা করেছে সে। পেশাদার অপরাধী বহু ছিল হাতের নাগালে, তবুও সে তাদের বিশ্বাস করেনি, এই কাজের জন্য তার প্রয়োজন ছিল কিছু আনাড়ি লোক। মনার আগমনে তার পরিকল্পনা পূর্ণতা পেয়েছে। এখন শুধু একটা ট্রেনের অপেক্ষা।

রাত যখন আরো ঘন আর নীরব হয়, এই শহরের মধ্যে বসেও গুরুজি ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের ডাক শুনতে পায়, কিন্তু ট্রেনের ডাক তার কানে আসে না। টগর টোকাই শিশুদের মতো মেঝেতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। এই নীরবতার মাঝে গুরুজি রেলের কর্মচারীদের কথোপকথনে বুঝতে পারে, লাইনে সমস্যা হয়েছে, ট্রেন কখন আসবে ঠিক নেই। গুরুজির মনে হয়, সে অনন্তকাল ধরে একটা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করে আছে। পুরানো স্টেশনে তখন রাতের সওদা শুরু হয়েছে। ঠিক তখন গুরুজি তার পেটে পুরানো সেই ব্যথাটার উপস্থিতি টের পায়। ছোটো ছোটো ব্যথার ঢেউ আছড়ে পড়ে তার পেটে। গুরুজি জানে কিছুক্ষণ পর ঢেউগুলো আরো বড়ো হবে, তখন আর সহ্য করা যাবে না। দুই হাত দিয়ে পেট চেপে টগরের মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায় হয়ে বসে থাকে।

ভোরে গোঙ্গানির শব্দ শুনে টগরের ঘুম ভাঙ্গে। ঘুমের ঘোর চোখে নিয়ে সে কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে বসে থাকে। ঘুম থেকে উঠে পরিচিত যেসব দৃশ্য দেখে সে অভ্যস্ত তার একটাও চোখে পড়ে না তার। রাতের স্টেশন ভোরবেলা তার কাছে আবার নতুন হয়ে ওঠে। সে চেয়ে দেখে একটা লোক তার সামনে উপুর হয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছে। ক্লান্ত ঘোড়ার মতো মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। গুরুজি হাত দিয়ে পেট চেপে স্টেশনের মেঝেতে কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে হাত বাড়িয়ে বহু কষ্টে টগরের হাত ধরে। দাঁত ঘষে ব্যথাটাকে পিষ্ট করার চেষ্টা করে আর বলে,

বাপ আমার, তোমার নাম তোমার মা রাখে নাই, তোমার বাবা রাখছে। লোকটার মুখে এমন সম্বোধন এবং এই অদ্ভুত কথাটা শুনে টগর বিবশ হয়ে চেয়ে থাকে। গুরুজি আর কিছু বলতে পারে না, ব্যথার তীব্রতায় তার চেতনা লুপ্ত হয়। তার অচেতন দেহটার পাশে টগর নিস্পৃহ হয়ে বসে থাকে।

আলো ফুটে উঠার পর নতুন স্টেশনের কর্মচাঞ্চল্য কিছুটা পুরাতন স্টেশনকেও স্পর্শ করে। লাইন ঠিক হয়ে ট্রেনের যাওয়া আসা শুরু হয়, ট্রেনগুলো বিকট শব্দ করে আগমনের ঘোষণা দিয়ে কোলাহল বাড়ায়, আবার শব্দ করে নিজের সাথে সমস্ত কোলাহল নিয়ে স্টেশনে নীরবতা ছড়িয়ে দিয়ে চলে যায়। গুরুজি কাত হয়ে পড়ে থাকে, তার মুখ থেকে গড়িয়ে পড়া লালার উপর একটা নীল মাছি ঘুরঘুর করে।

পুরানো স্টেশনে অল্প যে কয়জন লোকের যাতায়ত, তারা দেখে, লুঙ্গি গায়ে দিয়ে একটি অস্বাভাবিক দেখতে ছেলে বসে আছে, তার সামনে একটা শীর্ণ দেহ। তাদের মনে হয়, স্টেশনে হয়তো নতুন ভিক্ষুক এসেছে, এবং মানুষের মনে দয়া উৎপাদনের শিল্পে নতুন একটি প্রকরণ উদ্ভাবন করেছে তারা। ছেলেটি মানুষের মুখের দিকে চেয়ে থাকে, তার মুখে কোনো আর্তি নেই, তার চোখেও কোনো আকুতি নেই, শুধু বিস্ময় নিয়ে সে মানুষের চলাচল দেখে। কিছু মানুষ স্ব-উদ্যোগে খুচরা নোট আর পয়সা গুঁজে দিয়ে যায় টগরের নির্বিকার হাতে। নিজাম হায়দারের হাজার কোটি টাকার সম্পদের উত্তরাধিকারী রেল স্টেশনের ভিখারি হয়েছে আজ। হাতের মুঠোতে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত পয়সাগুলোকে কী করবে ভেবে পায় না টগর। তার ভাবনার অবসান ঘটাতেই, একজন বেলুনওয়ালা পুরাতন স্টেশনে ঢুকলো তখন

জলিল শহরব্যাপী উদ্ভ্রান্ত ঘুরে নিজের ব্যর্থতা উদযাপন করার পর ক্লান্ত হয়ে পুরাতন স্টেশনে আসে বিশ্রাম করার জন্য। তার আগে নাস্তা আর তিরস্কার খাওয়ার জন্য গিয়েছিল গুরুজির ঘরে। সেখানে কাউকে না পেয়ে সে কিছুটা অবাক হয়। অন্যসব অনুভূতির মতো বিস্ময়ের অনুভূতিও বেশিক্ষণ তার মাথায় স্থায়ী হয় না। পুরাতন স্টেশনের নির্জনতায় সে ঘুমাতে এসেছে, আপাতত এর চেয়ে বেশি চাওয়া নেই তার। স্টেশনে ঢুকতেই একটা শূন্যে ঝুলে থাকা লাল বেলুন তার নজরে পড়ল। সে দেখলো, বেলুনের সুতা হাতে নিয়ে একটা ছেলে বসে আছে আর একটা লোক কাত হয়ে শুয়ে আছে। প্রথমে চিনতে না পারলেও কাছে এসে সে বুঝলো, ছেলেটি টগর। তার পাশে শুয়ে আছে গুরুজি। কীভাবে কী হয়েছে ভেবে সে কূল পায় না।

গুরুজির কাত হয়ে থাকা শরীরটাকে চিৎ করে জলিল। তার অনুভূতির খরা কাটে, মমতার বর্ষণ হয় শুষ্ক বুকে। এই লোকটাকে সে ভালোবাসে, তার বউ যখন চলে গিয়েছিল, সবাই হেসেছিল। তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো দুঃখটা মানুষের কৌতুকের উপাদান হয়ে গিয়েছিল। গুরুজি একমাত্র লোক, যে হাসেনি, মাথায় স্নেহ এবং সান্ত্বনার হাত বুলিয়েছিল। অল্প একটু স্নেহের বিনিময়ে জলিল সারাজীবনের জন্য গুরুজির প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে গিয়েছিল।

গুরুজির নাকের নিচে আঙ্গুল দিয়ে খুব মৃদু শ্বাসের প্রবাহ টের পায় সে, এখনো প্রাণ আছে। ক্লান্ত শরীরটা তার মুহূর্তেই সতেজ হয়ে ওঠে গুরুজির বুকটাকে নিজের দুই হাতে বেঁধে টেনে নিয়ে চলে জলিল টগরকে একা রেখে গুরুজিকে টেনে নতুন স্টেশনে ঢোকে জলিল অর্ধেক দেহ জলিল শূন্যে তুলে রেখেছে, বাকি অর্ধেক ধুলোতে ছাপ রেখে যাচ্ছে। গুরুজির পা থেকে একটি চপ্পল খসে গেছে, আর একটা কোনোমতে লেগে আছে। স্টেশনের অপেক্ষমাণ ভীড়টা এমন দৃশ্য দেখে কৌতূহলী হয়। গুঞ্জন ওঠে একটা, কিন্তু কোনো হাত এগিয়ে এসে বাকি অর্ধেক দেহ তুলে ধরে না ৷

জলিলের দুর্ভাগ্য জন্মসূত্রে একটা সন্দেহজনক চেহারা পেয়েছে, এবং তার দুর্নামও কম নয়। ভীড়ের মধ্যে তার কয়েকজন সাবেক ভুক্তভোগীও হয়তো ছিল। হয়তো পার্কের সেই প্রেমিকটিও ছিল, জলিলের আইসক্রিম খেয়ে যার প্রেমিকার ঘুম এখনো ভাঙ্গেনি। জনতার মধ্যে জলিলের পরিচয় এবং তার কর্মের বিবরণ ছড়িয়ে পড়লো মুহূর্তেই। সবাই নিঃসন্দেহ হলো, যে লোকটিকে জলিল টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, সে তারই সদ্য প্রতারণার শিকার অভাগা কেউ। অসুস্থ মানুষ দেখলে যারা চোখ ফিরিয়ে দায় মেটায়, তারাই প্রতারকের শাস্তি বিধান করার জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠলো। জনতার গুঞ্জন তখন গর্জনে পরিণত হয়েছে। প্রথমে একজন যখন তার কলারে ধরলো, সে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কেউ বুঝতে চায়নি। আরো কয়েকটি হাত তার গায়ের শার্টটি টেনে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। চোখে ভয়ানক আতঙ্ক নিয়ে জলিল দেখলো, একদল লোক ভয়ানক আক্রোশ নিয়ে তার দিকে ছুটে আসছে। সেই মুহূর্তে প্রাণের তাগিদ অনুভব করে সে, ছুটে বেরিয়ে যেতে চায় উন্মত্ত মানুষগুলোর নাগাল থেকে। কিন্তু পারে না, বৈশাখের ঝরো বৃষ্টির মতো চারপাশ থেকে আঘাত আসতে থাকে। এই শহরের মানুষ তার মাকে গর্ভবতী করেছে, যারা তার শরীর থেকে এখন রক্ত ঝরাচ্ছে, তাদের সাথে তার রক্তেরই সম্পর্ক। যে তার কান খামচে ধরে প্রায় ছিড়ে ফেলেছে, সে হয়তো তার ভাই, যে তার একটা চোখ থেতলে দিয়েছে সে হয়তো তার চাচা, যে তার বুকের পাজর ভেঙ্গেছে সে হয়তো তার বাবা। জনতা উৎসবমুখর পরিবেশে একটা মানুষ হত্যা করলো, খুব একটা সময় লাগেনি, রাস্তার ধুলো খেয়ে বড়ো হওয়া জলিলের এমনিতেই প্রাণশক্তি তেমন একটা ছিল না। এই শহরের মানুষ যে পাপ দীর্ঘদিন আগে করেছিল, আজ তার প্রায়শ্চিত্ত করলো।

গুরুজি মুমূর্ষু অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিল, তার দিকে কারো খেয়াল ছিল না। জলিলকে হত্যা করার উত্তেজনায় জনতা তাকে ভুলেই গেছে। যখন তাদের অসুস্থ লোকটার কথা মনে পড়লো, তখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো স্পৃহা কারো ছিল না। তারা সবাই ব্যস্ত, ট্রেন এসে পড়বে, অন্য কেউ সামলাক এই ঝামেলা। অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে তারা তাদের কাজ করেছে। দায়মুক্তির জন্য, কেউ একজন বললো, পুলিশ আসুক। সবাই সম্মত হলো, হ্যাঁ হ্যাঁ, পুলিশ আছে কী জন্যে? তারা এসে যা করার করুক।

, রেলের পুলিশ এসেছে কিছু পড়েই; এ্যাম্বুলেন্স, গাড়ি, থানার পুলিশ ইত্যাদি ঝামেলায় গুরুজির বুকের উঠানামা বন্ধ হয়ে গেল। পুলিশের ঝামেলাও কমে গেল। তারা এসে দুটি লাশ উঠিয়ে নিয়ে গেল।

এইসব হইহল্লার সময় টগর খুব বিপর্যস্ত বোধ করে। সবাই যখন নিজেদের কৌতূহল এবং মানুষ মারার পৈশাচিক স্বাদ মেটাতে জটলার দিকে ছুটছিল টগর তখন তার বেলুনটা নিয়ে পুরাতন স্টেশনের পাশে খোলা আকাশের দিকে এসে হাঁটতে লাগলো। গুরুজির বেঁধে দেয়া দড়িটিও টগরের কোমরে লুঙ্গিটিকে ধরে রাখতে পারলো না, হাঁটার তালে তালে ধীরে ধীরে লুঙ্গিটি খুলে যেতে লাগলো, লুঙ্গিটি একসময় ভূলুণ্ঠিত হয়ে টগরকে নগ্ন করে দিলো। স্টেশনের বাইরে জামগাছটার পাশে এসে সে লক্ষ করলো, তার আশেপাশে কোনো মানুষ নেই, জীবনে এই প্রথম সে একাকিত্ব অনুভব করলো। মনটা তার এক দুর্বোধ্য উদাসীনতায় ভরে গেল। বেলুনটি সে মুক্ত করে দিয়ে ক্রমাগত ছোটো আর কালো হয়ে যেতে দেখতে লাগলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *