॥ ৬ ॥
একরাশ বিভ্রান্তি নিয়ে মনা ফিরে আসে বকুলের ঘরে। কোনো প্রসাধনী এবং মেকি হাসির সাহায্য ছাড়াই বকুলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে। মনা লক্ষ করলো, ঘরের মধ্যে খাঁচাটা অনুপস্থিত। মেঝেতে শয্যা পাততে গিয়ে খাঁচাটাকে বহিষ্কার করতে হয়েছে। ভদ্র মানুষের বাস এখানে নেই, সমাজের চোখ রাঙ্গানি এখানে পৌঁছায় না, তাই দুটি ছেলেমেয়ে এক ঘরে থাকলেও এখানে কোনো প্রলয় নামে না। রাতে ভাতের ব্যবস্থা হয়নি, দুজন মিলে পাউরুটি খায়। মনার শয্যা হয়েছে বিছানায়, আতিথ্যের সৌজন্যে বকুল শুয়েছে মেঝেতে। মনার চোখে ঘুম নেই, গুরুজির পরিকল্পনাটা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মনের ভেতর প্রবল দ্বন্দ্ব হচ্ছে তার। যদি সফল হয়, অনেক টাকা পাবে, মাকে খুঁজে বের করতে পারবে। হয়তো এক খণ্ড জমি কিনে একটা ছোটো ঘরও তুলতে পারবে। যে ঘরে তার মা তাড়িয়ে দেওয়ার ভয় ছাড়াই নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে। সে হয়তো চাকরি করবে, নয়ত ব্যবসা করবে, সংসার হবে। আর যদি ব্যর্থ হয়? কী আর হবে? জেল হবে। তবুও এই অনিশ্চিত জীবন থেকে তো মুক্তি পাওয়া যাবে। মনকে এত বোঝানোর পরও কোথায় যেন একটা কাঁটা বিঁধে আছে। পাশ ফিরে সে মেঝেতে তাকায়, আধো আলোতে বকুলের অবয়ব দেখা যায়। “
বকুল ঘুমাও?
‘আপনি’র মতো ভদ্রস্থ সম্বোধন থেকে তারা মুক্তি পেয়েছে। বকুল মুহূর্তেই জবাব দেয়,
না, ঘুম আসে না।
মনা জিজ্ঞাসা করে,
এই জীবন তোমার কেমন লাগে?
মধ্যরাতে এমন প্রশ্নই হয়তো মানানসই, কিন্তু তার জন্য কিছুটা ভূমিকা তো লাগে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে বকুল নিস্পৃহ জবাব দেয়,
এতকিছু তো ভাবি নাই।
তোমার কোনো স্বপ্ন নাই?
ছিল, এখন নাই। খালি পেটে মানুষ একটাই স্বপ্ন দেখে, থালা ভরা ভাত। খাইয়া বাইচা থাকুম, এইটাই চাই শুধু।
মনা তবুও স্বপ্ন প্রসঙ্গটা থেকে বের হয় না। বলে,
তোমার যে স্বপ্ন আছিলো তা সত্য করার জন্য যদি অন্যায় করতে হয়, করবা?
যে জীবনে বাইচা থাকার জন্যই কত অন্যায় করতে হয়, সেই জীবন থেইকা মুক্তি জন্য যদি মাত্র একটা অন্যায় করতে হয়, ক্যান করব না?
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, বকুল মনাকে জিজ্ঞাসা করে,
অন্যায়টা কি আমারে কওন যাইব?
মনা এই কথার কোনো জবাব দেয় না, হয়তো অনেক কিছু ভাবে, কিছুক্ষণ পরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
ঘুমাও বকুল, ঘুমাও ৷
মনার বুক ভারমুক্ত হয় কিছুটা। ঘরের নীরবতায় বাইরে থেকে ভেসে আসে, কুকুরের ঘেউ ঘেউ, গাড়ির হর্ন, দূরে কোথাও নর নারীর কলহের প্রলাপ। দুই একটা দুর্ভাগা ঝিঁঝিঁ পোকা গ্রামের ঠিকানা না পেয়ে এই শহরেই ডাকে মাঝে মাঝে, কেউ সাড়া দেয় না। মনা নানা শব্দ ছেঁকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনার চেষ্টা করে।
গুরুজির আস্তানায় মনার যাতায়াত নিয়মিত হয়। বকুলকে নিয়ে দুই একটা রসিকতা জলিল করার চেষ্টা করে, কিন্তু সেগুলো খুব একটা জমে ওঠে না। গুরুজি প্রায় প্রতিদিন পেট চেপে ধরে শুয়ে থাকে, ব্যথার ঢেউটা চলে গেলে আবার উঠে বসে, পরিকল্পনা করে।
বুঝলি পেট ঠিক না থাকলে মাথা কাজ করে না, কয়েকদিন ধইরা পেট ভালা যাইতাছে না।
নিজের পেটটার মুখরক্ষার জন্য যেন কৈফিয়ত দিচ্ছে, কয়েকদিন ধরে শুধু দুষ্টুমি করছে, আগে কত ভালো ছিল। মনার কিছুটা রাগই হয়, গুরুজি কিংবা তার পেটের উপর। তাদের মুক্তির পথে এই পেটটাকেই একমাত্র বাধা মনে হয় ৷
আপনে ডাক্তার দেখান না ক্যান?
পেটের অসুখ গরীবের অসুখ। ওষুধ দিয়া এই অসুখ সারে না, টেকা হইলে এমনিই সাইরা যাইব।
এইসব বলে গুরুজি পেটের উপর হাত বুলিয়ে ব্যথাটাকে সান্ত্বনা দেয়, ওষুধে তার খুব একটা ভরসাও আছে বলে মনে হয় না। গুরুজি বালিশে মুখ গুজে ব্যথা সয় আর বদনা হাতে ছুটাছুটি করে। এর মাঝেই নিজাম হায়দারের ছেলে সম্বন্ধে ছোটোখাটো তথ্য জানিয়ে দেয়, মনা আর জলিলকে ৷
নিজাম হায়দারের ছেলে টগর সপ্তাহে চারদিন স্কুলে যায়, সকাল দশটায় স্কুলে ঢোকে আর বের হয় ঠিক তিন ঘণ্টা পর। ড্রাইভার গেইটের ভেতরে গিয়ে নিয়ে আসে। একদিন সে যায় ডাক্তারের কাছে, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার দিন তার মুখ থাকে হাসি হাসি, সেদিন তার বাবা তার সাথে থাকে। স্কুল শেষে সে পার্কে আসে, জারুল গাছের নিচে একটা ঝোপে অনেক গুলো ফড়িং আর প্রজাপতি খেলা করে, টগর বিস্ময় নিয়ে তাদের উড়তে দেখে। প্রজাপতি দেখা শেষে সে একটা আইসক্রিম খায়। ড্রাইভারের উপর নির্দেশ আছে, টগরকে যেন এক মুহূর্ত চোখের আড়াল না করা হয়। টগর যখন প্রজাপতিতে মগ্ন থাকে, সেই সুযোগে মধ্যবয়স্ক, দুই সন্তানের জনক ড্রাইভার জসিম মগ্ন হয় যুবতি মেয়ে অনুসন্ধানে। চোখ যেন তার লকলকে জিহবা, দৃষ্টি দিয়ে চাটে নারীদের কোমল দেহ। খুটিয়ে খুটিয়ে যৌবন মাপে, ভোগ করতে পারে না, তাই উপভোগ করে। গুরুজির পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করে এই ড্রাইভারের উপর। তার চরিত্রের দোষটাকে পুঁজি করেই গড়া হয়েছে নীল নকশা। মাংস দেখিয়ে প্রলুব্ধ করা যাবে এই লোকটিকে। নিজাম হায়দার এক ড্রাইভারের উপর ভরসা করেই ছেলেকে ছেড়ে দেয়। তার এই প্রতিবন্ধী ছেলেটির স্বাস্থ্য নিয়ে যতটা উৎকণ্ঠা আছে নিরাপত্তা নিয়ে অতটা নেই, কার কুটিল চোখ পড়বে তার এমন ছেলের উপর!
কঠিন কাজ হবে টগরকে বশ করা, সেজন্য জলিলের ঘুমপাড়ানি ওষুধ আছে, মনার ভদ্র, বিশ্বস্ত চেহারা আছে। একটা গাড়িও প্রয়োজন হবে তাদের, গাড়ি তো পাওয়া যেতেই পারে, শুধু একজন ভাগ্য বিড়ম্বিত, নিরীহ চালক দরকার।
বৃদ্ধ ষষ্ঠীচরণ প্রামাণিককে রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় নিয়ে গেল জলিল। ষষ্ঠীচরণের বাম চোখটি বর্ষার নদীর মতোই ঘোলা। ডান চোখের ছানি কিছুদিন আগে অপসারণ করা হয়েছে, বাম চোখেরটা সে কাটায়নি স্বেচ্ছায়। ফ্যাকাসে চোখ জোড়া দেখিয়ে বেশ ভালো সাহায্য পেয়েছে সে, ভেবেছিল এভাবেই থাক। কিন্তু দুনিয়া দেখার লোভ এবং বিনে পয়সায় ছানি কাটানোর সুযোগ পেয়ে সে নিজেকে পেতে দিয়েছিল ডাক্তারের ছুরির নিচে। একটা চোখ তার দেখার ক্ষুধা মেটায়, আরেকটা মেটায় পেটের। বাম চোখটি দেখিয়ে পয়সা আদায় করে ভালোই। রেল স্টেশনেই থাকে সে, প্ল্যাটফর্মে কাথা বিছিয়ে কোনোমতে রাত্রিযাপন নয়, সে থাকে স্টেশনের বাইরে বোর্ডিং হাউজে, দিনে একশো বিশ টাকা ভাড়ায়। তিনবেলা হোটেলে খায়, তার সাথে হোটেলের মাসকাবারি চুক্তি আছে। জামা কাপড় পরে সে পরিষ্কার এবং পরিপাটী। তাকে দেখলে মনে হবে, কোনো বড়ো অফিসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। সে যখন কাছে আসে, কমবয়সি ছেলেরা তটস্থ হয়ে দাঁড়ায়, কেউ কেউ সম্মান দেখিয়ে সালামও দেয়। কাছে এসে সে তার পর্দানশীন বাম চোখটা প্রদর্শন করে, এবং মৃদুস্বরে তার অসহায়ত্বের কথা জানায়। আরো জানায় যে, চোখটা ভালো হলেই সে লেপ তোশক সেলাইয়ের দোকানে কাজ নিবে। নোংরা হয়ে, ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে আসা ঘ্যান ঘ্যান করা ভিক্ষুকদের দেখে মানুষ বিরক্ত হয়, তাদের দিকে তাকিয়েও দেখে না, না শোনার ভান করে নিজেদের আড্ডা অব্যাহত রাখে, কেউ কেউ আবার খারাপ ব্যবহারও করে। কিন্তু ষষ্ঠীচরণ প্রামাণিককে কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না, তার সম্ভ্রান্ত পরিচ্ছদ, গম্ভীর কণ্ঠের কোমল আর্জি, মানুষের পকেট থেকে টেনে বের করে আনে বড়ো বড়ো নোট। ছোটো নোটও পায়, সেগুলো ষষ্ঠী রাখে বাম পকেটে, ভিক্ষুক হলেও ষষ্ঠী দানশীল। টোকাইরা তাকে দেখলেই ঘিরে ধরে, ষষ্ঠীচরণ গর্বের সাথে বাম পকেট থেকে তাদের হাতে খুচরো পয়সা তুলে দেয়। রেল স্টেশনে ষষ্ঠী কখনোই ভিক্ষা করে না, এখানে তার সব অসহায়ত্ব ঘুচে যায়, পকেটে একটা রেডিও আছে তার, বোর্ডিঙের বাইরে বসে রেডিওতে গান শোনে আর পান খায়। দুটো মেয়ে আছে তার, একটার বিয়ে হয়েছে, আরেকটার দিবে। প্রতিমাসে টাকা পাঠায় বাড়িতে। একটা কুয়াশাচ্ছন্ন চোখের বদৌলতে জীবন তার স্বচ্ছল।
ষষ্ঠীচরণ প্রামাণিক একসময় ডিস্ট্রিক ট্রাকের হেল্পার ছিল, পরে হয়েছে ড্রাইভার। ঘুম তাড়ানোর জন্য গান শুনতো তখন, এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। বার্ধক্য গ্রাস করায়, চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হওয়ায় ট্রাকের স্টিয়ারিঙ আর ছুঁতে পারেনি। দুটি মেয়ে ছাড়া সঞ্চয় আর কিছুই ছিলো না তার প্রথমে পরিচিত লোকজন তাকে সাহায্য করেছে, পরে করেছে অপরিচিতরা, এত সহজে অর্থাগমন সম্ভব দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিল সে। তারপর থেকে এটাই তার পেশা। মেয়েদের কাছে বলেছে, শহরে সে লেপ তোশকের দোকানে কাজ করে। বড়ো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে এক চোখের আয় দিয়ে, আরেক চোখ দিয়ে বিয়ে দিবে ছোটো মেয়েটাকে।
তার ঘর আছে, ঠিকানা আছে, সেই ঠিকানায় আপন মানুষ আছে। আয় আছে, আরামও আছে, সে কাঙাল অথবা নিঃস্ব নয়। এই জীবনেই সে সুখি, গোল কালো স্টিয়ারিঙ ধরার জন্য মাঝে মাঝে তার হাত নিশপিশ করে, সেটা বাদ দিলে তার আর কী অপূর্ণতা আছে! সে তো বন্দী নয়, তার মুক্তির কী প্রয়োজন?
জলিলের প্রস্তাবে রাগ হয় তার, সকালের সময়টা নষ্ট হলো, সকালবেলায় পার্কে কমবয়সি ছেলেমেয়েরা আসে প্রেম করতে, তাদের মন থাকে কোমল, তাদের গলানো খুব সহজ। নিজেদের দানশীলতা প্রমাণ করার সুযোগ পেয়ে তারা দানও করে উদার হস্তে। জলিলের জন্য অন্তত শ খানেক টাকার ক্ষতি হয়ে গেল তার। গালে একটা চড় বসিয়ে দিতে পারলে গাঁজাখোরটার উচিত শিক্ষা হত। কিন্তু ষষ্ঠীচরণ প্রামাণিকের ধৈর্য আর জলিলের ময়লা গাল তাকে বিরত রাখে। তাছাড়া সে দান গ্রহণ করা মানুষ, রাগ ক্ষোভ সামলে চলতে হয়। দান না নিলে হয়তো গৌতম বুদ্ধও বোধি পেতেন না। মুখে হাসি টেনে ষষ্ঠীচরণ বলে,
আমি ঠিকঠাক চউখে দেখি না, বুড়া হইছি, এখন আর এইসব ঝামেলায় যাইতে পারব না। তোমার গুরুরে কইও, ষষ্ঠী তারে আদাব জানাইছে।
ষষ্ঠী তড়িঘড়ি করে গায়ে পানি ঢেলে কোনোমতে গোসল সারে। মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ায়, ভাজহীন মসৃণ পাঞ্জাবি পরে, পাঞ্জাবির তুলনায় মুখে বেশি ভাঁজ তার। জুতাজোড়া পরিষ্কার করা হয়নি, এক কোণার আঠা হাল ছেড়ে দিয়েছে, আর বেশিদিন পরা যাবে না। নতুন জুতা কিনতে হবে, নিজের জন্য আর ছোটো মেয়েটার জন্যও। মেয়েটার বিয়ের কথাবার্তা চলছে, ছেলের নাকি শাড়ির দোকান আছে। লম্বা, স্বাস্থ্য সুন্দর, শুধু একটা চোখ একটু ট্যাড়া ছেলেটার। চোখের মনির অবস্থান সংক্রান্ত দোষটাকেও গুণ হিসেবে হাজির করার জন্য মেয়ের মা বলেছে, লক্ষী ট্যাড়া। ষষ্ঠী শীঘ্রই বাড়ি যাবে, পাত্র দেখতে। মেয়ের বিয়ে, কিছু টাকা হাতে থাকা দরকার, সকাল বিকাল বের হয় টাকা খুঁজতে। বদমাশ জলিলটা সকালটা খেয়ে দিলো।
সূর্য চোখ রাঙিয়েও পার্কে মানুষের ভীড় কমাতে পারেনি দেখে ষষ্ঠী খুশি হয়। আজকে সুন্দর বাতাসও আছে, পরিবেশের উপরও তার আয় নির্ভর করে। গরম চটচটে আবহাওয়ায় মানুষের মেজাজও ক্যাচক্যাচে হয়ে থাকে, ঘামে ভেজা দুপুরে কেউ শারীরিক কোনো অক্ষমতা দেখিয়ে টাকা চাইলে মনের উত্তাপ আরো বাড়ে। মনও বড়ো অদ্ভুত, উত্তাপে হয় কঠিন, আবার গলে শীতলতায়।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশকিছু টাকা জমে যায় ষষ্ঠীচরণ প্রামানিকের পকেটে। মৃদু গলায় সে তার প্রার্থনা জানায়, কৃত্রিম অসহায়ত্বের গান সে গায় না। কেউ যদি বলে, ‘মাফ করেন’ সে আর কোনো আকুতি না জানিয়ে তাদের নির্দ্বিধায় ক্ষমা করে দেয়। কোনো ঈশ্বরের দোহাই সে দেয় না, শুধুই জানায় তার বাম চোখটিতে ছানি পড়েছে, সাহায্য পেলে উপকৃত হবে। যে ঈশ্বরকে সে মানে তার দোহাই দিলে ক্ষুধা তার চিরস্থায়ী হবে।
তারপর পার্কের বড়ো কৃষ্ণচূড়া গাছটার ছায়ায় তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে এবং তার স্বচ্ছল ভিক্ষুক জীবনের সমাপ্তি হয়। চার পাঁচজনের একটা দল সেখানে ফুচকা খাওয়ার জন্য বসে ছিল, নতুন শার্ট প্যান্ট পরা একটা ছেলের কাছে গিয়ে সে তার আবেদন জানালো। তখন দলের সবার কৌতূহল হলো বৃদ্ধ লোকটার প্রতি, নিজেদের মধ্যে আলাপ, হাসি পরিহাস বন্ধ করে সবাই বৃদ্ধটিকে লক্ষ করে দেখলো।
সবার মনেই বৃদ্ধ লোকটার প্রতি মায়ার জন্ম হলো, এক এক করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো সব কটা বুক থেকে। শুধু একটি বুকের শ্বাস আটকে রইলো। ছেলেটির পাশে যে মেয়েটি বসে ছিল, সে লোকটাকে দেখে হতবাক হয়ে রইলো, ষষ্ঠীও মেয়েটার দিকে চেয়ে পাথর হয়ে গেল। নতুন শার্ট প্যান্ট পরা ছেলেটা চশমা পরে আছে, তার চশমা ভেদ করে ভালো করে চোখের দিকে তাকিয়ে ষষ্ঠী দেখলো, ছেলেটা ট্যারা, লক্ষী ট্যারা না ভালোই ট্যারা। পাশে বসে আছে তার ছোটো মেয়ে। এটা নিশ্চয়ই অনানুষ্ঠানিক কনে দেখা পর্ব, মেয়েটা হয়তো তার কিছু বান্ধবী নিয়ে হবু বরের সাথে পরিচয় বাড়াতে এসেছে।
ষষ্ঠীচরণ শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ছুটছে। মেয়েটা তার দিকে কেমন বেদনা নিয়ে তাকিয়ে ছিল, হয়তো এতক্ষণে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, সবাই হয়তো অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করছে, কী হয়েছে? কেউ হয়তো এই ফাকে পাত্রের কাছে বিজ্ঞাপন করবে, মনটা ওর খুব নরম বুঝলেন, বুড়ো লোকটার কষ্ট দেখে মন খারাপ হয়েছে। মেয়েটা কী করছে, পেছনে ফিরে তা দেখার সাহসও ষষ্ঠীর হলো না। ট্যারা ছেলেটি তাকে ডাকছে, এই যে কাকা ট্যাকা নিয়া যান। ষষ্ঠী ফিরে না, পৃথিবীর সব সম্পদও ষষ্ঠীকে আর ফেরাতে পারবে না।
এক মুহূর্তে ষষ্ঠীচরণ নিঃস্ব হয়ে গেল, এই জীবনটা এমন বিষময় হয়ে উঠলো যে মনে হলো, কোনো ট্রাকের নিচে মাথা পেতে দেয়। মাথা থেতলানোর জন্য শহরের মধ্যে কোনো ট্রাক সে পেলো না, দিনের বেলা এখানে ট্রাক চলাচল নিষিদ্ধ। মৃত্যু না পেয়ে ষষ্ঠী ছুটলো নতুন জীবনের সন্ধানে। যেখানে তাকে আর চোখ বেচতে হবে না। সেদিন দুপুরে গুরুজির দরজায় দেখা গেল উদভ্রান্ত ষষ্ঠীচরনকে। এখন সেও মুক্তি চায় একচোখা জীবন থেকে।
