॥ ২ ॥
যার মা নেই, মাটিও নেই তার চেয়ে নিঃস্ব আর কে আছে।
মনা লক্ষ করে যে, তার এই বিপর্যয়ে পৃথিবী আর কারো তেমন কোনো বিকার নেই। তার মা অন্যদের দৈনন্দিন জীবনে বিরক্তি হয়েই উপস্থিত ছিল, কারো কারো কাছে ছিল কৌতুকের উপাদান, অপরিহার্য কোনো অনুষঙ্গ নয়। হাজেরার হারিয়ে যাওয়াতে শুধু জমাদ্দার বধূ কিছুটা বিচলিত হয়। ঘরের জিনিসপত্র রেকি করতে থাকে, হিসেব করে মিলিয়ে দেখে কিছু খোয়া গেছে কিনা। অনুসন্ধান শেষে ঘোষণা করলো, পিতলের একটা ডালের চামচ আর দুটো বিদেশি সাবান পাওয়া যাচ্ছে না ৷
তারপর মনা তার জীবনের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্তটা নিলো। স্কুল জীবনের একমাত্র স্মৃতি ধুলোমাখা ব্যাগে কিছু কাপড়চোপড় ঢুকিয়ে মনা বেরিয়ে পড়লো। ব্যাগটার উপরের পকেটের জিপারটা নষ্ট, পকেটটা কুকুরের জিহ্বার মতো ঝুলে থাকে। রাখালপাড়া ছেড়ে যে কোনোদিন কোথাও যায়নি, সে আজ বেরিয়ে পড়েছে অজানায়, পকেটে অল্প কিছু টাকা আর বুকে অনেক ভয় নিয়ে সে গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছে। ছোটো গোয়াল ঘর, মাথার উপর বিশাল বট গাছ, পুকুরপাড়ের জঙ্গল সবকিছুকে ত্যাগ করে পেছনে চলে যাওয়ার সময় বিচ্ছেদের যন্ত্রণা হয় তার, কিন্তু মা‘র কাছে সব মায়া তুচ্ছ।
অর্থের সাথে সঙ্গতি রেখে মনা খুব বেশিদূর যেতে পারলো না। বাকলিয়া বাজারে এসে সে অটোরিক্সা থেকে নামলো। রাস্তার দুপাশে লম্বা দোকানের সারি, মাঝে মাঝে আবার গলিও আছে, সেই গলি ধরে আবার বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট। রাখালপাড়া থেকে ছেলেরা প্রায়ই এখানে আসে নগ্ন সিনেমা দেখার জন্য। মনা কখনো আসেনি, ইচ্ছা যে করেনি তা নয়, কিন্তু কখনো চাঁদার টাকা দিতে পারেনি। সে ভেবে রেখেছিল, কোনোদিন যথেষ্ট টাকা হলে এমন সিনেমা সেও দেখে যাবে। একবার নেশা করেও দেখবে কেমন লাগে, কীভাবে মানুষ মাটিতে বসেই আকাশে উড়ে। সবাই বলে এসব করলে স্বভাব নষ্ট হয়, মনার স্বভাব ভালো, যেহেতু স্বভাব নষ্ট করতেও টাকা লাগে।
বাকলিয়া বাজারে হট্টগোল দেখে মনা উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে লাগলো এদিক সেদিক। এত মানুষের ভীড়ে সে কোথায় খুঁজবে মাকে! ক্ষুধাও লেগেছে প্রচুর। বাজারে ঘুরেফিরে সে একটা চায়ের দোকানে এসে থামলো। চায়ের দোকানদার স্যান্ডো গেঞ্জি পরে আছে, তার স্বাস্থ্যবান, সুগোল পেটটা গেঞ্জি দিয়ে ঢাকা যায়নি, পেটের উপরে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে সাদা রঙের ময়লা গেঞ্জিটি। লোকটা অবিরাম পান চাবাচ্ছে, সাদা স্যান্ডো গেঞ্জির বিভিন্ন জায়গায় পানের রসের লাল চিহ্ন, প্রথম দেখায় রক্ত মনে হয়। দোকানে হিন্দি গান বাজছে, খুব আমুদে পরিবেশ। মনা এক কাপ চা আর একটা পাউরুটি নিলো। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলো,
এই বাজারে কোনো মহিলা দেখছেন, মাথায় একটু সমস্যা আছে।
লোকটা মুচকি হেসে বললো,
সব মহিলাগো মাথাতই ডিস্টাব। কি কন ভাইসব?
আশেপাশে সব পুরুষরাই মাথা নেড়ে সায় দিলো। মনা খুবই বিরক্ত হলো, চা অর্ধেক বাকি থাকতেই ফেলে দিলো। চায়ের দোকানদারের সামনে কেউ অর্ধেক চা ফেলে দিলে, তার অহমে আঘাত লাগে। দোকানদার আহত গলায় বললো,
চা ভালো হয় নাই?
মনা কিছু বললো না। দোকানদার বললো,
ভাই কি রাগ করলেন নাকি?
মনা জবাব না দিয়ে দাম দিতে গেল। দোকানদার বললো,
দাম লাগব না, বসেন। যার কথা বললেন সে আপনের কী হয়? আমার মা।
দোকানদারের পান চাবানো বন্ধ হয়ে গেল। মুখটা চুপসে গেলে মুহূর্তেই। পেছনে ফিরে গান বন্ধ করে দিলো, বললো,
কিছু মনে কইরো না ভাই, আমি বুঝি নাই। চা বেচি, বিদ্যাও নাই বুদ্ধিও নাই। তুমি আরেক কাপ চা খাও, নাইলে আমার মন খারাপ হইব।
মনা খেয়াল করলো, দোকানদার তাকে তুমি করে বলছে, স্নেহ করেই বলছে। দোকানদারও এক কাপ চা নিল, চায়ে চুমুক দিয়েই বললো,
এই বাজারে এখন আর কোনো পাগল নাই, গতমাসে মারা গেছে, রহমত পাগলা। তুমি ভাই শহরের দিকে গিয়া দেখো, পাগলেরা সব শহর পছন্দ করে। এইখান থেকে শহরে বাস যায় দিনে দুইটা। এক ঘণ্টা পরেই বাস আসব। দেখো গিয়া পাও নাকি মনা জিজ্ঞাসা করতে পারলো না, বাস ভাড়া কত। তার পকেটে মাত্র পয়ত্রিশ টাকা আছে।
কোনোদিন বাসে চড়েনি মনা। মানুষ পেটে পুরে চার চাকার দানবেরা কালো পিচে দৌড়ে বেড়ায়, সে শুধু দূর থেকে দেখেছে, মনসুর প্রধানের মেয়ের বিয়েতে বরযাত্রী এসেছিল বিরাট এক বাস নিয়ে, সেই বাস ঢোকার মুখে আমগাছ, জামগাছের ডাল ভেঙ্গেছে, শেষে ইলেক্ট্রিক তারের সাথে কুস্তিতে হেরে আটকে রইল পুকুর পাড়ে। মনা গিয়ে দেখে এসেছে, বাসে উঠে ভিতরটা দেখার লোভ হয়েছিল তার, কিন্তু সাহস হয়নি। বাস, ট্রেনের গতির প্রতি তার কৌতূহল থাকলেও কখনো চড়ার প্রয়োজন
হয়নি। বাসে চড়ে মানুষ আত্মীয়ের বাড়ি যায়, কাজে যায়, ভ্রমণে যায়। মনার একমাত্র আত্মীয়টি জমাদ্দার বাড়ি ছেড়ে কোথাও যায়নি এতদিন, তার কাজ রাখালাপাড়ার গণ্ডি পার হয়নি কখনো, ভ্রমণ তার পুকুরপাড়ের জঙ্গলেই সীমাবদ্ধ। আজ তার প্রয়োজন আছে, সাহস আছে কিন্তু সঙ্গতি নেই।
বাস দাঁড়িয়ে আছে অলস বিড়ালের মতো, তার শরীর মৃদু কাঁপছে। মনা জোরে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বাসে উঠে পড়লো, কী হবে দেখা যাবে, আর কিছু ভাববে না সে, ভাবনায় পড়ে গেলে এই বাকলিয়া বাজার, এই পরজীবীর জীবন এসব কিছু থেকেই মুক্তি পাবে না, এরকম কোনো বাসের নিচে পিষ্ট হওয়ার আগেই তার মাকে খুঁজে পেতে হবে। মাকে আর গোয়ালঘরের পশুর জীবনে ফিরিয়ে নিবে না সে। জীবনের প্রথম বাসটি তাকে একটা নতুন জীবনে নিয়ে যাক।
বাসে উঠেই দেখলো, অনেকগুলো মুখ গদির চেয়ারে একযোগে বিরক্ত হয়ে বসে আছে, যাদের হাতে ঘড়ি আছে তারা প্রতি দশ সেকেন্ডে একবার করে ঘড়ি দেখছে, যাদের নেই তারা উশখুশ করছে, ঘড়িওয়ালাদের সময় জিজ্ঞাসা করছে, কনডাক্টর বাস থেকে একটু সামনে গিয়ে যাত্রী ডাকছে, কোনো কারণে কাছে এলেই যাত্রীরা সব চেঁচামেচি, গালাগালি করছে, আর কতক্ষণ, মানুষের কি কাজকাম নাই? ড্রাইভার হেল্পারের জাতটাই খারাপ।
এই মানুষগুলোই চায়ের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করে, তর্ক করে, টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখে। সিনেমার ফাকে ধৈর্য ধরে বিজ্ঞাপনও দেখে। চাকার উপর উঠলেই কি মানুষের ধৈর্যে ঘাটতি দেখা দেয়? বাসের বধির ড্রাইভার ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক, একমনে মনোযোগ দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে রিকশা গুনছে। বাসের গায়ে ভুল বানানে বিভিন্ন উপদেশ বাণী লেখা আছে, ভদ্রতা বজায় রাখুন, ভাঙতি দিন, অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু খাবেন না, নামাজ কায়েম করুন ইত্যাদি। অনেকক্ষণ পরে, বাসের অধিকাংশ সিট পূর্ণ হওয়ার পর কনডাক্টর বাসটাকে দুটো চপেটাঘাত করলো। মানুষের কটু কথায় যে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি, দুটো চপেটাঘাতে সে চঞ্চল হলো। বধির ড্রাইভার তখন শ্রবণ এবং বাকশক্তি ফিরে পেলো,
এক খিলি পান দে।
পান মুখে দিতেই বাসের চাকা ঘুরতে শুরু করলো। মনে হলো, বাস পেট্রোলে চলে ঠিকই কিন্তু ড্রাইভার চলে পানে।
কোনো এক অদ্ভুত কারণে বাসে উঠে মনার লজ্জা লাগছে, যথেষ্ট অর্থ না থাকায় তার মনে বিরাজ করছে অনধিকার প্রবেশের গ্লানি। নিজের অস্তিত্বকে যথাসম্ভব প্রচ্ছন্ন করে সে এক কোনায় বসে আছে। নিজেকে একটা ছায়া মনে হচ্ছে তার, অথচ সে জানলো না, এক জোড়া শিকারী, ধূর্ত চোখ তাকে নিমগ্ন দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করছে।
জলিল মনাকে এবং তার সংকুচিত ভাব দেখে খুশি হলো। ছেলেটা একই সাথে গেয়ো এবং বোকা, চেহারা দেখে বুদ্ধির পরিমাণটা মেপে নিতে হয় জলিলকে। ভুল হলে দিনটাই মাটি হবে। এমন বহুদিন মাটি করে মানুষের বুদ্ধি মাপতে শিখেছে সে। শুধু নিজের চেহারাটাই বেইমানি করেছে তার সাথে। ভোরবেলা মোহনদিঘীর ঠান্ডা পানিতে ডুব দিয়ে সাবান ঘষে পরিচ্ছন্ন হয়েছে, ভাঁজ করা প্যান্ট, শার্ট পরেছে। চিরুনি চালিয়ে মাথার একপাশে সোজা সিঁথি করেছে, একটা জিরো পাওয়ারের চশমাও পরেছে। কিন্তু তোবড়ানো গালে তার চেহারায় শঠতার যে ছাপ পড়েছে, সাবান ঘষেও তা মোছা যায়নি। তাকে দেখেই যে কেউ বুঝবে সে ভদ্র নয়, ভদ্র সেজেছে। এমন সন্দেহজনক চেহারা নিয়ে অজ্ঞান পার্টির কাজ করা সহজ কথা নয়। আজকাল মানুষ সব চালাক হয়ে গেছে, সাধলে কিছু খেতে চায় না, বাঁকা চোখে তাকায়। বোকা মানুষ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর, অথচ বোকা মানুষরাই তার ব্যবসার লক্ষ্মী।
জলিল মনার পাশে এসে বসলো, মনা আরো জড়োসড়ো হয়ে গেল। বাসের গতি বাড়ার সাথে সাথে মনার অস্বস্তিও বাড়তে থাকলো, এত গতির সাথে তার পরিচয় নেই, বাসের জানালা থেকে, গাছপালা, বাড়িঘর, দোকানপাট, মানুষ সাই সাই করে সরে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে সব ভেঙ্গেচুড়ে, দুমড়েমুচড়ে বিকট শব্দে বাসটা এগিয়ে চলছে। নিজের সিটে বসে সে ড্রাইভারের সামনে কাচে দেখছে, একটার পর একটা গাড়ি, অটোরিকশা বাসটার নিচে চলে যাচ্ছে, অথচ কারো কোনো বিকার নেই। একটা পোড়া গন্ধ তার পেটে ঢুকে পাক দিচ্ছে, পৃথিবীটা টলছে, মনে হচ্ছে পেটের নাড়িভুড়ি দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে আসছে। মনা আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো, অধিকাংশ চোখ বন্ধ করে ঢুলছে, কেউ কেউ কথা বলছে মোবাইল ফোনে, কারো মধ্যে অস্বস্তি কিংবা অস্বাভাবিকতা নেই, ছোটো কোলের বাচ্চাটাও জানালায় চোখ পেতে গাছের ছুটে চলা দেখছে। মনার এমন লাগছে কেন কে জানে। তার পাশে বসা লোকটা তার দিকে বারবার ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে, কিছু বলবে নাকি? মনা আর ভাবতে পারছে না, এই গতি সে নিতে পারছে না, তার ইচ্ছে হচ্ছে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে।
জলিল দেখলো, তার পাশের সিটের ছেলেটা হাতের ব্যাগটা জাপটে ধরে আছে বুকে, মনে মনে ভীষণ প্রসন্ন হলো সে। শুধু কাপড়চোপড় থাকলে মানুষ তাচ্ছিল্যের সাথে ব্যাগ এদিকে সেদিক ফেলে রাখে, আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে বসে। এই ছেলেটার হাতের ব্যাগটার চেহারাও সুশ্রী নয়, সুন্দর আধুনিক ব্যাগ যারা ব্যবহার করে, তাদের টাকা পয়সা ব্যাগে রাখে না, ব্যাংকে রাখে। সাধারণত গ্রামের ছেলেরা শহরে যায় চাকরির খোঁজে অথবা মামলার কাজে। তারা রাবারব্যান্ড পেঁচিয়ে টাকার বান্ডিল রাখে ব্যাগের কোনায়, তারপর ব্যাগটা বুকে চেপে বসে থাকে।
জলিলের ব্যাগে সব সরঞ্জাম সাজানো আছে, পান, আচার, পানি, জুস। এখন একটু আলাপ জমাবার পালা, এটাও একটা কঠিন কাজ। বাসে উঠে সবাই এমন ঘুম দেয় যে, আলাপ করার সুযোগই পাওয়া যায় না। আবার পছন্দের প্রসঙ্গ না পেলে অনেকে কথাই বলতে চায় না। বয়স্ক লোকেরা যে কোনো কিছুর সমালোচনা পছন্দ করে, অতীতের সাথে তুলনা করে বর্তমানকে যতটা জঘন্য প্রমাণ করা যায় তারা ততই খুশি হয়। মধ্যবয়স্করা পছন্দ করে রাজনীতির কথা, এখানেও বিপত্তি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বুঝে কথা বলতে হয়। কমবয়সি যুবক ছেলেরা মেয়েদের নিয়ে যে কোনো রসিকতা পছন্দ করে, নারী ছাড়া আর কোনো ব্যাপারেই তাদের অত আগ্রহ নেই।
জলিল নারী সংক্রান্ত কোন কৌতুকটা বলবে, ভাবছিলো। পাশের ছেলেটা কিছুক্ষণ বাসের জানালায় চোখ পেতে অস্থির হয়ে সামনের সিটে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজেছে। বাসে উঠলে মেয়েমানুষেরা এমন করে, বাসে উঠার আগে তারা ট্যাবলেট খায়, ব্যাগ ভর্তি করে নেয় টক আচারের প্যাকেট। আচার খেয়ে দাঁত মুখ শিরশির করে তাদের, তবুও তারা শেষ পর্যন্ত বমি করে, একবার করলে বারবার করে, একজন করলে আরেকজন করে। জলিলের ধারণা বমি ব্যাপারটা মেয়েদের জন্য খুব স্বাভাবিক, পেটে সন্তান আসলে তারা বমি করে, দুর্গন্ধে বমি করে, অতিরিক্ত শোকে এবং মাত্রাতিরিক্ত সুখেও তারা বমি করে, কিন্তু ছেলে হয়ে বমি করার মতো লজ্জার আর কিছু নেই। এই ছেলের লক্ষণ সুবিধার নয়, মনে হচ্ছে কেলেঙ্কারি করে ছাড়বে। এখন নারী সংক্রান্ত রসিকতা এর রুচবে না।
কী ভাই, খারাপ লাগতাছে?
মনা আন্তরিক গলা শুনে চোখ তুলে চাইলো। কিছু বলতে পারলো না, সব অন্ধকার হয়ে আসছে। জলিল বললো,
আচার আছে আমার কাছে, খান। ভালা লাগবো ৷
ব্যাগ খুলে বিষ মেশানো বিশেষ আচারটা জলিল বের করে মনার হাতে দিলো। বাসের গায়ে লেখা উপদেশটুকু মনা ভুলে গেছে, তার মাথায় তোলপাড় করছে একটা ঘুর্ণিঝড়। মনা তেতুলের টক আচারের কিছুটা মুখে দিয়ে আবার মাথাটা এলিয়ে দিলো সামনের সিটে। এত সহজে কাজ হয়ে যাবে জলিল ভাবতেই পারেনি। গত কয়েকদিনে অনেকগুলো ব্যর্থ অপারেশনে সে মুষড়ে পড়েছিল। ছেলেটাকে এখন দশ পনের মিনিট সময় দিলেই হবে, চোখে তার যে ঘুম নামবে তা দুই দিনের আগে ভাঙবে না। বোকা ছেলেটার হাতের ব্যাগটা অনায়াসে নিজের আয়ত্তে এনে সে নেমে যাবে বাস থেকে।
আচারের তেতুলেও সর্বনাশ ঠেকানো গেল না। গলার কাছে যে ঢেউটাকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করেছিল মনা, তা সব বাঁধা ঠেলে বেরিয়ে পড়লো। বমি করে মনা জলিলের ইস্তিরি করা প্যান্টের একাংশ এবং ছেলেদের সুনাম দুটোই নষ্ট করে দিলো। জলিলের মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল, ওষুধটুকু পেটে গিয়েছে কিনা কে জানে, পুরো বাস সচকিত হয়ে উঠেছে। যারা ঘুমিয়েছিল তারাও উঠে নাক কুঁচকে খুঁজছে কোথায় বমি হচ্ছে, উৎস থেকে নিরাপদ দূরত্বে আছে কিনা। সামনে পিছনের সিট থেকে দুই একজন তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠলো, কনডাক্টরকে ডাকা শুরু করেছে কে যেন। ভালোই বিপদ হলো, এখন সবাই এদিকেই তাকাচ্ছে। তার চেয়ে বড়ো কথা বাসের মধ্যে জলিলের পরিচিত একজনকেও দেখা যাচ্ছে। পরিচিত লোকদের মধ্যে তার যে খুব একটা সুনাম আছে তা বলা যাবে না।
মদিনা হোটেলের ম্যানেজার শওকত নিজের সিট থেকে উঠে এসে জলিলের পাশে দাঁড়ায়, চোখ ছোটো করে চেয়ে দেখে তার আপাদমস্তক। চোখের চশমাটার দিকেই তার তীব্র দৃষ্টি। কী হইছে রে জলিল?
জলিল মনে মনে খুব রেগে যায়, কী হয়েছে তাকে জিজ্ঞাসা করা কেন ? দেখতে পাচ্ছে না, বমি করে সব ভাসিয়ে দিয়েছে। তবুও সে শান্ত গলায় বললো,
বমি করছে ভাই, আমার পেন্ট ভরাইয়া দিছে।
শওকত এই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারে না, বলে, তুই কিছু খাওয়াইছস নাকি? তোরে তো বিশ্বাস নাই।
জলিল বুঝলো সে ভীষণ ঝামেলায় পড়েছে। মদিনা হোটেলে কবে কোনকালে বাকি খেয়ে টাকা দেয়নি, তার জন্য লোকটা তার পিছনে লেগে আছে, তাকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। জনতাকে যদি একবার সে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে তাহলে গণধোলাই নিশ্চিত, জেল, পুলিশের হাঙ্গামা তো আছেই। এসব কাজ তাই একা করতে নেই, সাথে দল থাকলে তারা জনতার চিন্তার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো। এখন তাকেই কিছু একটা ভাবতে হবে। জলিল দেখলো, ছেলেটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে, পুরোপুরি অচেতন হয়নি মনে হয়। সে মদিনা হোটেলের ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে একটু ঝাঁঝের সাথেই বললো,
শওকত ভাই, মাইনসেরে এমন সন্দেহ করন ভালা না। এইটা আমার খালাতো ভাই, শহরে নিয়া যাইতেছি। কে জানে তার এমন মাইয়া মাইন্সের মতো স্বভাব ৷
জলিলকে শওকত ভালোই চিনে। তাকে এমন পরিচ্ছদে আগে কখনো দেখেনি, বললো,
শার্ট প্যান্ট চশমা পইরা সাহেব সাঁজছোস ক্যান? মতলব কী?
জলিল লাজুক হেসে বললো,
বহুতদিন পরে খালার বাইত গেছি, একটু ভালা কাপড় পইরা যামু না। নাকি খালি আপ্নেরাই ভালা কাপড় পরবেন, আমরা পারুম না।
শেষের শেষেই শওকত কুপোকাত হলো। সন্দেহটা তার এখন রাগে পরিণত হয়েছে, জলিলের গালে একটা চড় বসানোর ইচ্ছাটা ভিতরে পুষে রেখে সে নিজের সিটে চলে গেল।
জলিলের মেজাজ চূড়ান্ত খারাপ হলো তখন, যখন কনডাক্টর তার সদ্য পাতানো খালাতো ভাইয়ের ভাড়া তার কাছ থেকেই আদায় করে নিলো। বাসে বমি করেছে বলে, কয়েকটা বাঁকা কথাও শুনিয়ে গেল।
মনা পড়ে আছে চোখ বন্ধ করে, সে নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারছে না। স্বজনহীন পৃথিবীতে এমন একটি আত্মীয় তার কীভাবে জুটে গেল? বেশি ভাবতে চায় না সে, বাসের ভাড়াটা যে দিতে হচ্ছে না সেটাই স্বস্তি, মনে হচ্ছে সে তলিয়ে যাচ্ছে বাসের নরম গদিতে, দুর্দমনীয় ঘুম পাচ্ছে তার।
জলিল দেখলো, ছেলেটার হাতের বন্ধন আলগা হয়েছে, ইচ্ছে করলেই ব্যাগটা বাগিয়ে নেমে পড়া যায় যে কোনো স্টেশনে। কিন্তু সামনের সিটে শওকত পোদ্দারের কঠিন পাহারা, ঘাড় ঘুরিয়ে বারবার দেখছে পিছনে, তাকে এড়িয়ে নেমে যাওয়া অসম্ভব।
বাসের জানালা থেকে গাছপালা হারিয়ে যেতে থাকে, ধুলোবালি মাখা দোকানপাট সারি বেঁধে বসে জানান দিচ্ছে শহর বেশি দূরে নয়। শহরের লক্ষণগুলো জানালায় আরো স্পষ্ট হতে থাকে, কিন্তু এসব কিছুই মনা দেখতে পায় না, তার ঘন ঘুম তাকে অন্য জগতে টেনে নিয়ে গেছে। . অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছায় তারা, বাসের ইঞ্জিন শান্ত হয়, বাসে নেমে আসে ঝিম ধরা নীরবতা, বাহিরে শহুরে কোলাহল তাতে আরো স্পষ্ট হয়। যাত্রীরা সব নেমে গেছে প্রায়, শওকত এখনো প্রহরায়। জলিল মনে মনে কিছু কুৎসিত গালি শওকতের উদ্দেশে নিবেদন করলো। বাধ্য হয়ে মনাকে ঠেলতে লাগলো,
উঠরে ভাই, আইসা পড়ছি।
যাকে ঘুম পাড়িয়েছে এখন তাকেই আবার ডেকে তুলতে হচ্ছে। ঘুম পাড়ানো সহজ নয়, কিন্তু ঘুম ভাঙ্গানো তার চেয়েও বেশি কঠিন। মনা কোনোমতে চোখ মেললো, সবকিছু ফ্যাকাসে অবাস্তব লাগছে তার কাছে। জলিলের কাঁধে হাত রেখে সে বাস থেকে নামলো। শওকত তখনো নজর সরায়নি। কাছে এসে বললো,
আমার অটোরিকশা আইছে, চল তগো দুইজনরে নামাইয়া দিমু। একি জ্বালা, এখন কি এই আপদটাকে ঘরে নিয়ে যেতে হবে? জলিল কিছু বললো না, নীরবে শওকতকে অনুসরণ করলো। মনা নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে, চিন্তা করার মতো যথেষ্ট সচেতনতা নেই তার। তাকে যেখানে খুশি নিয়ে যাক, এমনিতে তার যাওয়ার কোনো জায়গাও নেই ৷ শওকত তার ঢুলো ঢুলো চোখে চেয়ে বললো,
জলিল তোমার খালাতো ভাই?
জলিল মনে মনে আঁতকে উঠলো, কিন্তু মুখটা তার শান্ত পুকুরের মতো করে রাখলো। ছেলেটা যদি বলে বসে, জলিল কে? কী বলবে সে? তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা হচ্ছে, শওকত কী করবে? তাকে পুলিশে দিবে? লোকজন ডেকে ধোলাই দিবে? কিন্তু মনা ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। জলিল স্বস্তি পেলো মনে, কিন্তু মুখে ফুটিয়ে তুলল বিরক্তি। শওকতের দিকে তাকিয়ে বললো,
গরিব বইলা এমন অপমান করতে পারলেন, আমি কইলাম বিশ্বাস হইলো না আপনের। শোনেন হাতের পাঁচ আঙ্গুল এক সোমান না। একটা নোংরা বস্তির সামনে জলিল আর মনাকে নামিয়ে দিলো শওকত, কিন্তু এত সহজে জলিলকে মুক্তি দিবে না সে, বললো, বমি কইরা কাহিল হইছে তোর ভাই, আমি কাইলকা যাওনের সময় খোঁজ নিয়া যামু। জলিল মনে মনে শওকতের পরিবারের সব নারীর সাথে সঙ্গম করলো, তাতেও তার রাগ কমলো না ৷
মনার লতানো ঢলঢলে দেহটাকে একটা ঘরের মধ্যে নিয়ে যায় জলিল। টিনের ঝাঁপ দেয়া ঘরের মধ্যে একটা চৌকি অধিকাংশ দখল করে রেখেছে। জলিল মনাকে খুবই অবহেলার সঙ্গে ছুড়ে ফেলে চৌকির উপর, মনার ব্যাগটাকে অবশ্য খুব যতন করে বাম হাত দিয়ে ধরে রাখে। একটা বিছানা পেয়ে মনা আবার তলিয়ে যায় গাঢ় ঘুমে।
জলিল মেঝেতে বসে ব্যাগ খোলে তার পুরস্কারের আশায়। প্যান্টে তার বমির শুকনো দাগ, সেদিকে তার কোনো খেয়াল থাকে না। আবর্জনায় যার জন্ম তার আবার কীসের ঘৃণা। একসময় সে পাগল সেজে হাতে ময়লা নিয়ে মানুষ থেকে টাকা আদায় করতো, মানুষের ঘৃণাই ছিল তার পুঁজি। এক খাবলা মানব বর্জ্য দিয়ে পকেট ভর্তি টাকা আয় করত। যে জিনিস সবাই পেটে নিয়ে ঘুরে, তা চোখের সামনে দেখলে এত নাক কুঁচকানোর কী আছে? ঘৃণার ব্যবসাটা বেশিদিন টিকেনি তার, পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল। একরাত হাজতে ছিল, সেই স্মৃতি মনে পড়লে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। একজন হাবিলদার তাকে বলেছিল,
গু দিয়া চান্দাবাজি করছ? আইজকা মাইরা তোর গু বাইর করুম। সত্যি সত্যি তাই করেছিল। শুধু তাইনা, ডাস্টবিনের পচা খাবার খেয়ে যে কোনোদিন বমি করেনি, পুলিশের লাঠির গুতা খেয়ে সে-ও সেদিন বমি করে দিলো। সেদিন থেকে পুলিশ তার নমস্য, দেখলেই পেটে মোচড় দিয়ে ওঠে।
মনার ব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে কিছু রঙজ্বলা কাপড় চোপড়, একটা কলম, ছেড়া গামছা, কয়েকটা মলিন বই ছাড়া আর কিছুই পেলো না জলিল। রাবারব্যান্ড দিয়ে বাঁধা টাকার বান্ডেলের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাহলে হয়তো পকেটে আছে, শার্ট প্যান্টে লুকানো পকেট থাকে অনেকের, সাবধানতার জন্য তারা টাকা নিজেদের কাছ থেকে আলাদা রাখে না। জলিল ঘুমন্ত মনার পকেট, চোর পকেট সব হাতড়ে সব মিলিয়ে পয়ত্রিশ টাকা খুঁজে পেলো। তিনটা দশ টাকার নোট, আর একটা পাঁচ টাকার ধাতব পয়সা তার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করছে, এ কী প্রহসন! নিজের বোকামিতে নিজেকেই গালি দিতে লাগলো মনে মনে। পৃথিবীর কোনো কিছুর প্রতি তার এত ঘৃণা নেই যতটা আছে তার দুর্ভাগ্যের প্রতি, তার নিত্য সঙ্গী দারিদ্র্যের প্রতি। মনটাই বিগড়ে গেল তার, আজ একটু মাল খেতে পারলে ভালো হয়। পয়ত্রিশ টাকা পকেটে ঢুকিয়ে বেরিয়ে পড়লো সে।
