॥ ৫ ॥
নিজেকে হাটে উঠানো একজন মেয়ের চোখ হয় অস্থির ফিঙ্গের মতো, এখানে পণ্যও ক্রেতা খোঁজে। পোস্টারে ক্ষতবিক্ষত সিনেমা হলের বিবর্ণ দেয়ালে ঠেস দিয়ে একটা বিষণ্ন মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বকুল। আজ চোখে মুখে রঙ মাখেনি, গাছের নিচে পড়ে থাকা গতরাতের বাসি ফুলের মতো বিমর্ষ হয়ে আছে সে। এই সিনেমা হল পেরিয়ে একটু সামনে হাঁটলেই বিশাল একটা ময়লার ভাগাড় শহরের সব কদর্যতা বুকে নিয়ে রেখেছে। চোখে পড়ার আগেই এই ভাগাড়ের অস্তিত্ব টের পায় নাক। সেখানেই বকুল পেয়েছিল তার জীবনের সবচেয়ে সুবাসিত ফুলটাকে।
এই শহরে সে তখন আগন্তুক, কিছু বুঝে উঠার আগেই ক্ষুধা তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল সিনেমা হলের সামনে। আয়নায় তাকাতে কী যে ঘেন্না লাগতো তখন। এই শহরে কত মানুষ, কিন্তু একটা মানুষও তার আপন নয়, কত অচেনা দেহ তাকে ধরে, তবুও স্পর্শ সে পায় না। চোখের জল দেখে উৎকণ্ঠা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না, কী হয়েছে? হাজার হাজার মানুষের মধ্যে বিভীষিকাময় একাকীত্ব তাকে ক্ষয় করে ফেলছিলো। ময়লার ভাগাড়ের ওপাশে শহরের সব উচ্ছিষ্ট মানুষের বাস, বকুলের বস্তিও সেখানে। একদিন ফাগুনের বিকালে মুঠো ভর্তি কিছু টাকা আর শ্রান্ত, নোংরা দেহ নিয়ে সে ঘরে ফিরছিলো। আবর্জনার পাহাড়টা পার হওয়ার সময় তার কানে এলো মৃদু গোঙ্গানি। অনেকেই হয়তো শুনেছে, কুকুরের বাচ্চার কান্না ভেবে নাক চেপে চলে গেছে। কিন্তু বকুল চলে যেতে পারলো না। বহু বছর আগে এমন একটা কোঁকানো শব্দ তার মনে গেথে গিয়েছিল। তার মা যখন একটা মুমূর্ষু কন্যা সন্তান প্রসব করেছিল, সেই শিশু পৃথিবীতে বেঁচেছিল ঘণ্টা দুয়েক, চিৎকার করে কাঁদার মতো শক্তি তার ছিল না, মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে এমনি করে মৃদুভাবে ককিয়ে পৃথিবীকে অভিশাপ দিয়ে চলে গিয়েছিল। আজ সে কাতরধ্বনি আরেকবার শুনে সে থমকে গেল। একটা সবুজ পলিথিনের ব্যাগে, পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য জায়গায় শুয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছিল শিশুটি। একদল টোকাই এখানে উচ্ছিষ্ট ঘেটে ঘেটে অচল কিংবা সচল জিনিসপত্র বের করে, কতকিছু পেয়েও যায়, সোনার হারও পেয়েছে কেউ কেউ কিন্তু সবচেয়ে অমূল্য সম্পদটা সেদিন খুঁজে পেলো বকুল, তার আপনজন।
আবেগের প্ররোচনায় বকুল শিশুটিকে সবুজ পলিথিন থেকে মুক্ত করে, আরেকবার প্রসবিত হয় শিশুটি। বকুল আগেই নিঃস্ব ছিল, শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে সে হয় বিপর্যস্ত। মুখের খাবার জোটাতে গিয়ে মাথার ছাদ খসে গিয়েছিলো তার। এই শুকনো, কঠিন শহরে সে হয়েছিলো ভাসমান। শহরের রাস্তাঘাট গভীর জঙ্গলের চেয়ে ভয়ঙ্কর, রাতে এখানেও ঘুরে হিংস্র পশুরা, খুবলে খুবলে খায় নারীর মাংস, পান করে বৃদ্ধের রক্ত তাদের উল্লাসের অনুষঙ্গ হয় বালকের অসহায়ত্ব। তারপর তার বিপদ বাড়াতে চোখ রাঙ্গিয়ে আসে বর্ষাকাল, শিশুটিকে শুষ্ক রাখার প্রাণান্ত চেষ্টার মধ্য দিয়ে তার মমতা আরো গাঢ় হয়। শীতকালও তখন তার শত্রু, দুর্ভোগ নিয়ে আসে তার মাতৃত্বের পরীক্ষা নিতে। অকৃতকার্য হওয়ার মতো বিলাসিতা বকুলের নেই। তারপর ফাগুন আসে, ফুল ফোটে, পাখি গায়, মানুষ শীত চলে যাওয়ায় অথবা আসন্ন গ্রীষ্মে তাপদাহের আশঙ্কায় আক্ষেপ করে। বকুল তবুও একটা আশ্রয় জোটাতে পারে না। কোলে ছোটো বাচ্চা নিয়ে কোনো পতিতা কোনোদিন কোনো খদ্দেরকে আকর্ষণ করতে পারেনি। বাচ্চাটি তখন হামাগুড়ি শিখেছে, তাকে কোনোভাবেই একা ছেড়ে দেয়া যায় না। তার এই সংকট সমাধান করে একটি পরিত্যক্ত কুকুরের খাঁচা।
রাস্তার পাশে গাছতলায় খাঁচার মধ্যে একটা শিশু অবাক হয়ে পথের লোকজনের চলাচল দেখছে, পথের মানুষও বিস্মিত হয়, চমকে ওঠে খাঁচায় পাখি, কুকুর, খরগোশের পরিবর্তে মানব শিশু দেখে। তবে তাদের বিস্ময় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না, এই দৃশ্যটি তাদের মাথা থেকে হারিয়ে যায়, অফিসের বসের ধমকে, ছেলেমেয়ের অবাস্তব আবদারে, বান্ধবীর বিয়েতে কোন শাড়িটি পরে যাবে এই দ্বিধায়। বকুলের মনটাও খাঁচাবন্দী থাকে তার বাচ্চাটার সাথে। প্রতিবার সে খালি খাঁচা দেখার আশঙ্কা নিয়ে ফিরে আসে। সে ফিরে এসে কোনোদিন দেখে, পিপড়ার কামড়ে বাচ্চাটা কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে কান্নার রেশ টানছে, কোনোদিন তাকে এসে ঘুমন্ত পায়, কোনোদিন সে দুই হাত মেলে দিয়ে ডাকে, মা। বকুলের চোখের তারা সজল হয়, পৃথিবী হয় ঝাপসা। ভাষাজ্ঞানহীন শিশুটিকে বুকে চেপে ধরে তাকে রাজ্য গড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বকুল ৷
রাজ্য গড়ে দেয়ার অবাস্তব প্রতিজ্ঞা থেকে বকুল মুক্তি পেয়েছিল সেই ফাগুনেই। তার বাচ্চাটা তাকে দেখে কী করবে? আবার কি তাকে ‘মা’ ডেকে উতলা করবে, নাকি গিয়ে দেখবে সে ঘুমাচ্ছে নরম ঘুম, নাকি আজও কোনো পতঙ্গ তাকে উত্যক্ত করছে? সব কয়টা দৃশ্য সে কল্পনা করে রেখেছিল, কিন্তু সেদিন একটাও মিলল না, ফিরে এসে সে দেখলো, খাঁচার ভিতরটায় প্রকট শূন্যতা বিরাজ করছে। রাজ্য পড়ে রইলো, রাজা লুট হয়ে গেল। তারপর সে বেশ কয়েকদিন খুঁজে বেড়িয়েছে কিন্তু তার বুকের এবং খাঁচার শূন্যতা আর ঘুচেনি।
সিনেমা হলের পাশে দেয়াল ঘেষে একজন বৃদ্ধের আবির্ভাব হয়। বকুল এক পলক দেখেই বুঝতে পারে, এই বৃদ্ধটি দেহ কিনতে এসেছে, যৌবনের স্মৃতিচারণ করার শখ হয়েছে তার। বকুলের উচিত আর কারো নজরে পড়ার আগেই এই বুড়োটাকে প্রলুব্ধ করা। খদ্দের হিসেবে বুড়ো আর কম বয়সি ছেলেরা সবচেয়ে উত্তম। তারা তাদের যৌনতা নিয়ে একধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগে, সমাজের চোখ বাঁচিয়ে তারা এমন ভাবে এসে কথা বলে, যেন চুরি করতে এসেছে। এরা ঝামেলা খুব একটা করে না, একজনের কথা বলে পাঁচজন আসে না, সময় বেশি নেয় না, পাওনা পরিশোধেও কোনো গরিমসি করে না। এই বৃদ্ধটাকে দেখে মনে হচ্ছে, তার বাসায় আজ লোকজন নেই, ছেলে নাতি নাতনি নিয়ে বেড়াতে গেছে শ্বশুর বাড়ি, বউ হয়তো বহুদিন যাবত পড়ে আছে হাসপাতালে অথবা বিছানায়, নয়তো মরে গেছে কয়েক বছর আগে। আজ সুযোগ পেয়ে সাহস জুটিয়ে চলে এসেছে, অপ্রস্তুত চাহনি দেখে মনে হয়, আগে হয়তো কখনো আসেনি এখানে। কার কাছে কী বলবে, ইতস্তত করছে। ভালো দাম পাওয়া যাবে এর কাছে, দরাদরি করা লাগবে না। সকাল বেলায় একটা ভালো বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, কিন্তু বকুল নড়ে না। এই সিনেমা হল, ব্যস্ত রাস্তা, মন্দ দেয়াল, যৌনপীড়িত বৃদ্ধ সবকিছু তার কাছে ঝাপসা লাগে। তার মনে শুধু স্পষ্ট হয়ে থাকে তার ঘরে শুয়ে থাকা লোকটার মৃদু স্বরে বলা সেই কথাটা, যে কথায় লোকটা তাকে শহরের সব লোক থেকে আলাদা করে দিয়েছে, ‘আপনে তো ঠিকই আমারে তুইলা আনছেন।’
বকুল ভাবতে থাকে, তার মমতার শুকনো নদীতে কেন আবার স্রোত এলো? খুব বেশি ভাবতে হয় না তাকে। এই লোকটিও তার সেই কুড়িয়ে পাওয়া সন্তানের মতো অসহায় পড়ে ছিল, তার মাও তাকে ছেড়ে চলে গেছে। বকুল দেখলো, দুটো মেয়ে বৃদ্ধ লোকটাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে, তার একটুও আফসোস হয় না। তার ইচ্ছা হয়, সব গ্রাহককে অগ্রাহ্য করে সে অনন্তকাল এই দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ৷
মনা মেয়েলি গন্ধে ভরপুর বিছানায় চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে, তার ঘুম হয় না, বকুলের আদেশমত বিশ্রামও হয় না। তার ভিতরে একটা অস্থিরতা পাক দিয়ে উঠছে। সারাদিন ইট বহন করে যে গালিগুলো অর্জন করেছে সেগুলো তার মাথায় গেথে আছে, প্রবল জ্বরের ঢেউও তার মাথা থেকে গালিগুলো মুছে দিতে পারেনি। সে প্রতারিত বোধ করে, সারাদিন খেটে, শরীরের সব শক্তি খরচ করেও একটি পয়সা পায়নি। বিছানায় এপাশ ওপাশ করেও চিন্তাটা মাথা থেকে তাড়াতে পারে না। তার দুর্ভাগ্যের সাথে, দুর্ঘটনার সাথে, দুর্ভাবনার সাথে গালিগুলো মিলেমিশে গেছে। মনা আর শুয়ে থাকতে পারে না। বকুলের ঘরের ঝাঁপি খুলে সে বেরিয়ে পড়ে।
শহরের যে রাস্তাটা সে সবচেয়ে ভালো চিনে সেটা তাকে নিয়ে এলো গুরুজির ঘরে। গুরুজি একাই থাকে ঘরে এবং তার দরজায় কোনো ছিটকিনি নেই। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে মনা দেখলো, গুরুজি বিছানায় লেপ্টে আছে, আমাশয় তার বহুদিনের সঙ্গী, গত কয়েক দিন যাবৎ খুব বেশিই সঙ্গ দিচ্ছে, লোকটাকে শুষে একেবারে অর্ধেক করে ফেলেছে। মনাকে দেখে গুরুজির নিষ্প্রভ মুখে হাসি দেখা গেল। হাসিটা ঠিক খুশির হাসি নয়, প্রচ্ছন্ন গর্বের হাসি। যার প্রস্থানে ছিল বিদায়ের সংকল্প, সে আবার ফিরে এসেছে। গুরুজি নিশ্চিন্ত হয়, একটা শিষ্য তার বৃদ্ধি পেলো, এবং তার মহাপরিকল্পনায় এই শিষ্যটিকেই তার প্রয়োজন।
গুরুজি বিছানা ছেড়ে গ্লাসে পানি ঢেলে স্যালাইন বানালো, এই লোকটা চা খায় না, সকাল বিকাল সময় পেলেই স্যালাইন বানিয়ে খায়। মনাকে বললে সে সোৎসাহেই কাজটা করতো, কিন্তু গুরুজি নিজের সব কাজ নিজেই করে, কোনোদিন কারো সাহায্য নেয়নি। দক্ষিণা অবশ্য সে নেয়, কেউ সফল হলে তাকে ভাগ দিয়ে যায়।
মনার দুর্ভাগ্যের ইতিহাস তার গলায় এসে ঠেলাঠেলি করছে, কোনো একটা কানে তার কথাগুলো ঢালা প্রয়োজন। বকুলকে বলতে পারতো কিন্তু তার মনে নিশ্চয়ই বেদনার কমতি নেই, এই লজ্জার, পরাজয়ের কথা বলে তার দুঃখের বোঝা বাড়াতে চায়নি। গুরুজি নিজেই কান পেতে দিয়ে বললো,
কী হয়েছে বল এইবার।
জীবন থেকে একটা দিন, দেহের পুরোটা সামর্থ্যের বিনিময়ে সে কিছুই পায়নি। প্রথম আয়ের উৎসাহের প্রচণ্ডতার কারণে এই দুর্ভাগ্য মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। ছেড়া ছেড়া ইতিহাস সে গুরুজিকে শোনালো। গুরুজি বললো,
ভাগ্যের দোষ না, যে তোর প্রাপ্য দেয় নাই তারও দোষ না। দোষ তোর ঘাড়ের, এত নরম ঘাড় দেখলে সবাই চাইপা ধরব, খুব স্বাভাবিক। পরিশ্রম সৌভাগ্যের জননী, এইটা একটা ফালতু কথা, শ্রম দিয়া শুধু টিইকা থাকা যায়, সৌভাগ্য আসে না, পরিশ্রম ক্লান্তি ছাড়া আর কিছু জন্ম দিতে পারে না। অর্থ সম্পদের প্রজনন ছাড়া ভাগ্য ডিম পাড়ে না, বিত্তের উত্তাপ দিয়া সৌভাগ্যের ছানা ফোটে। গরীবের পোলারাই পঙ্গু হয়, বোবা-কালা হয়, আন্ধা হয়। আমার কথা শোন, ভাগ্যের কপালে
লাথি মার, চোখের পানি আগুন দিয়া নিভা। মনে রাখবি, মানুষ শক্তের ভক্ত, এর চেয়ে বড়ো সত্য কথা দুনিয়ায় নাই।
এসব কথা বলার সময়, গুরুজি যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়, বক্তৃতার মতো শোনায় কথাগুলো।
আপনে কী করতে বলেন? মনা আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়।
গুরুজি একটা দেয়াশলাই বাক্স মনার দিকে ছুড়ে ফেলে, খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,
আগুন জ্বাল।
মনার বয়ে আনা ইটে তিন তলায় গাথুনি চলছে। গৃহকর্তা গোলাপি রঙের প্লাস্টিকের চেয়ারটায় বসে যথারীতি মিস্ত্রিদের পাহারা দিচ্ছে, কর্মক্লান্ত শ্রমিকদের ক্ষুধা উস্কে দিয়ে বিস্কুট চানাচুর খাচ্ছে। মনাকে সেখানে দেখে লোকটা খুব অবাক এবং বিরক্ত হলো। মনা যখন জানালো, সে তার পাওনা নিতে এসেছে, লোকটা হতবাক হয়ে রইল। তার পকেট থেকে একটা পয়সা খসানো সহজ কথা নয়, এই ব্যাপারে তার সুনামও আছে। টাকা পরিশোধ না করার একটা যুতসই উপলক্ষ তার হাতে দিয়েও এই ছেলেটা কোন সাহসে তার কাছে আবার টাকা চাইতে আসে? লোকটা চোখ পাকিয়ে গুহ্যদ্বারে মজুরি প্রবেশ করানো সংক্রান্ত খুব অশ্লীল একটা গালি দিলো মনাকে। গালিটাতে যদিও অর্থ প্রদানের ব্যাপার আছে, মনা তবুও বুঝলো, এটা না-বোধক জবাব।
এইটুকুর জন্য মনা প্রস্তুত ছিল, কিন্তু অবশিষ্টটুকুর জন্য লোকটার কোনো প্রস্তুতি ছিল না। পকেট থেকে দেয়াশলাইটা বের করে মনা ফস করে একটা কাঠির মাথায় আগুন জ্বালালো। ঘসা ছাড়াই তার চোখেও জ্বলে উঠলো আগুন। মনে হয় তাকে ভূতে পেয়েছে। আগুনের নীলচে শিখাটা লোকটার বিভ্রান্ত মুখের সামনে ধরে রেখে বললো,
টাকা না দিলে এই বাড়ি আমি জ্বালাইয়া দিমু।
লোকটা স্তম্ভিত হয়ে যায়। কী যেন বলতে চায়, বলতে পারে না। গালিগুলো গলায় এসেছে, গালে আসেনি। মনা বলতেই থাকে,
কী করবেন? জেলে দিবেন? জেলে কয়েক দিন থাকা খাওয়ার জায়গা পামু, আমার লাভ হইব কিন্তু আপনের কী ক্ষতিটা হইব চিন্তা করেন।
আগুন মনার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে, মনের জ্বালা তো ছিলই। মনার উদ্ধত এবং স্পষ্ট হুমকি শুনে লোকটা কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। এমন অপ্রস্তুত সে কোনোকালেই হয়নি।
কপালটা ভিজে উঠলো ঘামে এবং দুশ্চিন্তায়। মিস্ত্রিরা কাজ বন্ধ করে তাদের দেখছে, এরা কেউ তার পক্ষ নিবে বলে মনে হয় না। এই প্রথম তার মুখে দেখা দিলো একটা কাচুমাচু ভাব, গলাটাও তার আশ্চর্য রকম নরম হয়ে গেল।
আমি কি কইছি ট্যাকা দিমু না। নবিজীও কইয়া গেছে, ঘাম শুকানোর আগে শ্রমিকের পাওনা দিয়া দিতে, কিন্তু আমার যে ক্ষতি হইয়া গেল, পায়ে যে ব্যথা পাইলাম।
মনা তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ধরে রেখে বললো,
আমার পাওনার তুলনায় ব্যথা কমই পাইছেন, ঠিক আছে, আপনের একটা ঠ্যাঙ ভাইঙ্গা দেই, তাইলে আর কিছু দেয়া লাগব না। কি কন ?
লোকটা আর কোনো কথা বলেনি, সে হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো, একটা নিরীহ ছেলে কীভাবে এমন সহিংস হয়ে উঠতে পারে? পাগল হয়ে গেল নাকি? হঠাৎ পরিবর্তনে সে হকচকিয়ে গেছে, এই ছেলে যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারে, এই ভাবনাটাই তাকে দুর্বল করে দিলো। তার বুকের ব্যথা বৃদ্ধি করে তার মানিব্যাগ থেকে তিনটা একশ টাকার নোট চলে এলো মনার পকেটে। দুশো টাকা হাতের পারিশ্রমিক, একশো টাকা মুখের।
চোখ রাঙানো শিখেছে মনা, বাচ্চারা হাঁটতে শিখলে যেমন কেবল ছুটতে চায়, মনাও এখন কেবল চোখ রাঙাতে চায়। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় সদর্পে হাঁটতে থাকে সে, কাউকে পরোয়া করে না এখন, মানুষের চোখে ভয় দেখার নেশা আছে, সেই নেশায় মাতাল হয়ে এলোমেলো চলছে সে।
শহরে বিকাল নেমে এসেছে, এই ইট পাথরের কঠিন জঙ্গলেও নরম রোদ একটা স্নিগ্ধতা এনেছে। মনার নেশাটা ঝিমিয়ে এসেছে, লোকটার কাচুমাচু চেহারাটা মনে করে মায়া হলো তার, কিঞ্চিৎ অনুশোচনা ও হলো। কিন্তু পেটে ক্ষুধার অনুভূতি তীব্র হওয়ায় অনুশোচনাটা ঠিক জমতে পারলো না। জলিলকে পেলে মদিনা হোটেলে গিয়ে গরম ভাত খেত, একা একা খেতে ইচ্ছা করছে না। জলিল এই শহরের কোন অন্ধকার কোনায় নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে কে জানে?
সিনেমা হলের সামনের বড়ো পোস্টারটা তাকে থামিয়ে দিলো কিছু সময়ের জন্য। পোস্টারের অধিকাংশ দখল করে রেখেছে স্বল্পবসনা, স্থূলকায় এক নারী, সম্ভবত সে নায়িকা, মেদ দেখিয়ে পুরুষদের প্রলুব্ধ করছে। নায়িকার বাম পাশে ছুড়ি, কাঁচি, বন্দুক, আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা রক্তাক্ত লোকটি সম্ভবত নায়ক, তার চোখে মুখে আক্রোশ। অন্যান্য চরিত্ররা নায়ক নায়িকার হাত, পা, মাথার আশেপাশে কোনোমতে চেহারাটা দেখাতে পেরেছে। পোস্টারটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার পর সিনেমা হলের দেয়ালে চোখ পড়াতে সে একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেলো। পৃথিবীর সবচেয়ে সুরেলা কান্না যে কাঁদতে পারে সেই মেয়েটি পথের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে কী যেন ভাবছে। তার মৌনতাকে বিপন্ন করে মনা এগিয়ে গেল, কী ভাবেন?
মেয়েটি তাকায় মনার দিকে, চোখে নেচে ওঠে উচ্ছ্বাস আর বিষাদ। ভাবনাটাকে অস্বীকার করে, কার বিরুদ্ধে যেন অভিমান হয় তার। মুখে যথাসম্ভব কাঠিন্য ফুটিয়ে তুলে বলে, ভাবি না, অপেক্ষা করি। এইখানে আপনার আসা ঠিক হয় নাই, লোকজন খারাপ ভাববে।
লোকের ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে একটা ভাবনা মনার মনে উদয় হয়। ভাবে, সেদিন সেওতো নিজেকে বিক্রি করার জন্য দাঁড়িয়েছিল রাস্তার মোড়ে। তাহলে এই মেয়েটিও তার মতোই শ্রমিক। তবে তার এত অপবাদ, অপমান কেন? রূপ তো সে একা বিক্রি করে না, রূপের বিনিময়ে ধনী পাত্রের ঘরে যারা শো-পিস হয় তাদের তো কেউ খারাপ বলে না।
আমার খুব ক্ষিদা লাগছে, আপনারে দেইখা মনে হইতাছে দুপুরে কিছু খান নাই, চলেন কিছু খাই, আমি আজকে প্রথম ইনকাম করছি।
মনার আহবান শুনে বকুলের অবিশ্বাস্য লাগে, বলে, সকালের সিঙ্গারার উশুল দিতাছেন?
মনা বলে, আপনে যে দয়া দেখাইছেন তার উশুল হয় না।
এভাবে তারা কথার মালা গাঁথতে থাকে, নিজেদের নাম জানায়। এই শহরে বকুলের কাছে পুরুষ মানেই খদ্দের অথবা দালাল। এই দুই ধরন ছাড়া আর কোনো পুরুষের সাথে এই প্রথম পরিচয় তার। একটা পুরুষের চোখে নিজেকে মানুষরূপে দেখে সে অভিভূত হতে থাকে। নিজেকে আর অতটা ঘৃণ্য মনে হচ্ছে না তার। মনার চোখ দুটো হয়ে গেল তার প্রিয় আয়না।
পথভ্রষ্ট জাহাজের মতো তীর খুঁজে বেড়াচ্ছে মনা। তার দিকভ্রান্ত জলযাত্রায় বকুল যেন একটা সজীব দ্বীপ। বেঁচে থাকার, দু দন্ড শ্বাস নেয়ার অবকাশ দিয়েছে তাকে। বকুলও আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় মনাকে, নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষায় পেয়ে বসেছে তাকে, তাছাড়া তার মমতার ঢেউ এতদিনে বুকের মধ্যে আছড়ে পড়ে মরতো, এখন একটা পথ পেয়েছে। যদিও উপলব্ধি করেনি, তবুও একজন আরেকজনের প্রয়োজন হয়ে গেছে তারা। ঘরে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বকুলের কাছ থেকে বিদায় নেয় মনা। গুরুজিকে প্রণাম এবং দক্ষিণা দিতে যাবে, হয়তো জলিলের কোনো সংবাদও পাওয়া যাবে।
জলিলকে পাওয়া গেল গুরুজির ঘরেই, গালে, ঠোঁটে কালশিটে দাগ পড়া, মুখে বেদনার ছাপ। নড়াচড়া খুব একটা করছে না সে, অঙ্গ সঞ্চালনে মুখে ব্যথার অভিব্যক্তি আরো স্পষ্ট হয়। গুরুজি হতাশ হয়ে চেয়ে আছে, জলিলের দিকে। এমন কুলাঙ্গার শিষ্য তার আর একটিও নেই ৷
নেশার প্রয়োজনে জলিল একটা কুমতলব এঁটেছিলো, দাঁড়িয়ে ছিলো স্টেডিয়ামের পাশে ফাঁকা রাস্তাটায়। এই রাস্তাটার প্রস্থ গলির সমান, শুধু দুইটা রিকশা কোনোমতে পাশ কাটিয়ে চলতে পারে। রাস্তাটার চেহারাও ভালো না, মুখে বসন্তের দাগের মতো খানাখন্দে ভরা। জলিলের কাছে কোনো অস্ত্র নেই, শরীরটাও এমন চিমসে যে কারো সমীহ হয় না, চেহারাটা তার ছিচকে চোরের মতো, ভয় দেখানোর কোনো উপাদানই তার নেই। দুটি পায়ের উপর ভরসা করে সে দাঁড়িয়ে আছে, গয়না পরা কোনো এক নারীর জন্য। কানের দুল, গলার হার যা হাতে আসে, নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাবে, এই ছিল তার পরিকল্পনা। অনেক রিকশাই পার হয়ে যাচ্ছে, দশাসই চেহারার ষণ্ডামার্কা লোক, পিঠে ব্যাগ নিয়ে স্কুলের ছাত্র, খালি কান, গলা নিয়ে চলে গেল কয়েকজন কর্মজীবী নারী। জলিল ভুল করবে না, বকের ধৈর্য্য নিয়ে সে একেবারে উপযুক্ত একটা শিকার ধরার আশায় বসে থাকে।
অবশেষে জলিলের মুখ প্রসন্ন হয়। একজন হালকা ছিপছিপে গড়নের মেয়ে আসছে রিকশায় বসে। রিকশাওয়ালা বুড়ো, রিকশার গতি জলিলের জন্য বেশ সুবিধাজনক। মেয়েটার গলায় রোদের আলোতে চকমক করছে সোনার হার, জলিল সোনা চিনে ভালোই। গলায় থাকতেই সে ওজন মাপে হারটার, দুই ভরি আট আনার কম হবে না। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে, বুকের উত্তেজনা মুখে যেন প্রকাশ না পায়, তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে, কোনো ভুল সে এবার করবে না। রিকশা যেদিকে যাচ্ছে তার উল্টোদিকে দৌঁড় দিবে সে। এবার সে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে রিকশাটার দিকে। মেয়েটা আনমনা, তাকে খেয়ালই করেনি। এটাই সুযোগ, চিলের মতো ছোঁ মারে জলিল, তার হাতে ছিড়ে চলে আসে চকচকে সোনার হার। কাজ অধিকাংশ শেষ, মেয়েটা কিছু বুঝে উঠে চিৎকার দেয়ার আগেই তাকে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যেতে হবে, স্টেডিয়াম পার হয়ে নিউমার্কেটের মোড়ে ভীড়ে মিশে যেতে হবে। কিন্তু জলিল জানে না, মেয়েটার গলার হার দেখে তার মুখ যখন প্রসন্ন হয়েছিল, তখন ভাগ্য একটু মুচকি হেসেছিল।
মেয়েটার কোনো চিৎকার জলিল শোনেনি। কিন্তু হঠাৎ একটা হ্যাঁচকা টানে সে উল্টে পড়ে যায় এবড়ো থেবড়ো রাস্তায়। রোগা মেয়েটা নিজের জিহ্বায় কামড় দিয়ে তার কলারে ধরে টেনে তুললো, এই মেয়ে এত দ্রুত কীভাবে তাকে ধরে ফেললো, মুখে একটা ঘুষি খেয়ে আরেকটা প্রশ্ন তার মাথায় এলো, এই মেয়ের গায়ে এত শক্তি কোথা থেকে এলো! মেয়েটা জলিলকে খুবই স্বচ্ছন্দে কিল ঘুষি মারছিলো। পরে মেয়েটার মুখেই সে শুনেছে, যাকে সে দুর্বল, অসহায় ভেবেছে, সে মেডেল পাওয়া দৌড়বিদ, কারাতে ব্ল্যাকবেল্ট, আরো কী কী যেন। জীবনে যত শিক্ষা আর অর্জন মেয়েটার ছিল, জলিলের সারা অঙ্গের ব্যথা সেসবের সাক্ষ্য দিচ্ছে। জলিল যখন মার খাচ্ছিলো, তখন শুধু একটা অনুরোধই করেছে মেয়েটাকে, “আম্মাগো আমারে পুলিশে দিয়া দেন!”
” পুলিশের হাতে মার সে আরো বেশিই খেয়েছিল, তবুও এতটা পর্যুদস্ত হয়নি। একটা মেয়ের কাছে কিল ঘুষি খেয়েছে এই লজ্জায় সে আরো চিমসে গেছে। তার নমস্য তালিকায় পুলিশ ছাড়াও আরো একটা প্রজাতি যুক্ত হলো।
গুরুজিকে দেখে মনে হলো, তিনি একটা গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত। নিজের সব বিপর্যস্ততা নিয়ে জলিল এক কোনে বসে সিগারেটের খালি খোলসে গাঁজা ভরছে। সে বলছে, এটা তার ব্যথার ওষুধ, শরীরের ব্যথা নাকি মনের ব্যথা তা পরিষ্কার করেনি। মনা গুরুজিকে দক্ষিণা দেয়ার তার জন্য একশো টাকার একটা নোট নিবেদন করলো এবং জানালো, পাওনা সে পেয়েছে। গুরুজির মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিছুক্ষণ চুপ থেকে কী যেনো ভেবে বললো,
এইটা তো একদিনের পাওনা, আর সারাজীবনের?
মনা গুরুর হেয়ালির অর্থ বুঝতে পারলো না। গুরুজির কণ্ঠে পরিবর্তন এলো,
আমাগো ভাগ নিয়া যারা সম্পদ আর সাম্রাজ্য গড়ছে, তাগো থেইকা এইবার নিজেগো ভাগ আর ভাগ্যটাও বুইঝা নিতে হইব।
মনা কিংবা জলিল কারো কোনো দ্বিমত নেই, কিন্তু দ্বিধা আছে বিস্তর। দেয়াল ঘেরা অট্টালিকায় যারা বসে থাকে, তাদের নাগাল কীভাবে পাবে তারা?
গুরুজির চোখেমুখে কোনো সংশয় নেই। ভয়ংকর একটা পরিকল্পনা পেলে-পুষে পুষ্ট করেছে সে।
শহর এবং গ্রামের সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক নকশা করা প্রাসাদ, লোকে বলে জমিদার বাড়ি। নিজাম হায়দার চৌধুরি শহরের সুযোগ সুবিধা ছেড়ে নগরের এক প্রান্তে পড়ে থাকে। শহরে বড়োলোকের কমতি নেই, তাদের আধুনিক, শিক্ষিত রুচির সাথে পেরে ওঠে না নিজাম হায়দার। সেখানে সে যথেষ্ট ভয়, শ্রদ্ধা, সমীহ পায় না ৷ সারাজীবন কুজো পিঠ, নোয়ানো মাথা দেখে অভ্যস্ত সে। শহরের বড়ো বড়ো দালান কোঠার আড়ালে তার প্রাসাদও ঢাকা পড়ে যেতো। শহর হচ্ছে নেতাদের, তার মতো রাজাদের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে গ্রাম। শহুরে দুই তিনটা নেতাকে কেনার মতো অর্থ তার আছে, পূর্বপুরুষেরা তার জন্য ঢের রেখে গেছে, সেগুলোকে সে অঢেল করেছে। তার যে এত অৰ্থ সম্পত্তি আছে, তা জানান দেয়ার জন্য মাঝে মাঝে দান খয়রাত করে। তার সুনাম হয়, খ্যাতি বাড়ে।
নিজাম হায়দারের জীবন যাপনও কিছুটা সেকেলে। হাঁটতে বের হলে মাথায় ছাতা ধরার লোক যায় সাথে, এ ছাড়া নিজের বিশিষ্টতা বোঝানোর আর উপায় কী? তার সিন্দুকে যতটা ঐশ্বর্য আছে, চেহারায় তার কানা কড়িও নেই। চুল দাড়িতে পাক ধরেছে, চামড়া তার তামাটে এবং তৈলাক্ত। নিজাম হায়দার আয়নায় চেয়ে হতাশ হয়, ক্ষেতে কাজ করা মজুরদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারে না। ভবিষ্যত বংশধররা যেন তার মতো না হয়, সেজন্য সে বিয়ে করেছে সব ফ্যাকাসে চামড়ার মেয়েদের। মোট চারটি বিয়ে করেছে নিজাম হায়দার, তিনটা বউ এখনো বেঁচে আছে। সবচেয়ে ছোটো বউটার বয়স এখনো বিশ বছর পূর্ণ হয়নি। সোনার প্রতি বিশেষ দুর্বলতা আছে নিজাম হায়দারের, এই ধাতুটি তার চেহারার আভিজাত্যের ঘাটতি মেটায় বলেই হয়তো। নিজাম হায়দারের দশ আঙ্গুলে আটটি সোনার আঙটি ঝলমল করে। ঝাঁক সোনালি হার তার গলা জড়িয়ে থাকে। সে সোনার থালায় ভাত খায়, দুধ খায় সোনার গ্লাসে, পান খেয়ে পিকও ফেলে সোনার পিকদানিতে। তার ঘরে দুটো সিন্দুক ভরা আছে সোনায়। নিজাম হায়দার সেকেলে লোক হলেও ডাকাতের উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য ঘরে রেখেছে সশস্ত্র পাহারা। লাঠিয়াল বাহিনী ছিল তার বাপ দাদার, লাঠির যুগ ফুরিয়েছে, এখন বারুদের যুগ। এক
বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে চকচকে পিতলের হুকায় তামাক খায় নিজাম হায়দার। গ্রামের লোকেরা মাঝেমধ্যে আর্জি নিয়ে আসে, কেউ আসে বিচার নিয়ে। বৃদ্ধ মানুষেরা চিকিৎসা খরচ নিতেই আসে বেশি। বুড়ো মানুষদের দান করে সুখ পায় না নিজাম হায়দার। এরা সুস্থও হয় না, তাই কৃতজ্ঞও হয় না। বার্ধক্যের অসহায়ত্ব তাদের পুঁজি, দান গ্রহণ করে প্রাপ্য হিসেবে, যথেষ্ট দিয়েও এদের খুশি করা যায় না, সুনামের চেয়ে বদনামই হয় বেশি। বিচারপ্রার্থীও কমে গেছে ভীষণভাবে। কিছু হলেই দৌড় দেয় থানায়, কোর্টে। ,
কার ছাগল কার ক্ষেতে মুখ দিয়েছে, কে কাকে বাজারে গালি দিয়েছে, কার ছেলে চোখ টিপ মেরেছে কার মেয়েকে এইসব বিচার মাঝেমধ্যে আসে নিজাম হায়দারের কাছে, থানার লোকজন এইসব ছোটো ব্যাপারে নাক গলায় না বলেই তারা জমিদার বাড়িতে আসে। বিরক্ত লাগে তার, তবুও গদিওয়ালা বড়ো চেয়ারে বসে, এইসব ফরিয়াদির আর্জি শুনলে নিজেকে তার রাজা মনে হয়। ছোটো ব্যাপারগুলোকে সে বড়ো করে তুলে, তারপর খুব ঘটা করে বিচারের আয়োজন করে। কাউকে উঠবোস করায় কান ধরিয়ে, কারো পিঠে পড়ে চিকন বেত, জরিমানা করে এত বেশি যে, অপরাধীর সামর্থ্য থাকে না, পরে নিজেই জরিমানার টাকা দান করে কিছু বাহবা কুড়ায়। এভাবেই পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখে সে। ইদানিং বয়স ছাড়াও তার কপালে নতুন ভাঁজ এনেছে একটা দুশ্চিন্তা। শহর কেমন মুখ হা করে এগিয়ে আসছে গ্রাম গিলতে। নতুন নতুন দোকানপাট হচ্ছে, নতুন মানুষজন দেখা যাচ্ছে। গ্রামে স্কুল কলেজ হয়েছে। ছেলে বিদেশে পাঠিয়ে চাষার দল জং ধরা টিনের ঘরের জায়গায় ইটের দালান তুলছে, ছেড়া জামার লোকজন কমে যাচ্ছে, তার উপস্থিতিকে গ্রাহ্য না করে নতুন পিচের রাস্তায় দানবের মতো সশব্দে মোটর সাইকেল দৌড়ে চলে যায়। কত নতুন চৌধুরি, ভুইয়া গজিয়ে উঠছে। মসজিদ মাদ্রাসায় দান করে তার সাথে টেক্কা দেয়। মানুষের উন্নতি তার কাছে রীতিমত বেয়াদবি মনে হয়।
নিজাম হায়দারের কিছু কষ্টও আছে। তার প্রথম দুটি স্ত্রী তাকে মোট ছয়টি কন্যা সন্তান দিয়েছে। পুত্রসন্তান কেউই দিতে পারেনি। বংশের ধারা বজায় রাখার জন্য পুত্র সন্তান তার চাই। তার চাওয়া পূরণ হয়েছে তৃতীয় স্ত্রীর মাধ্যমে। একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিয়ে কর্তব্য সমাধা করে সে স্ত্রী পৃথিবী ছেড়েছে। এই ছেলেটি নিজাম হায়দারের প্রাণপাখি। কিন্তু বড়ো হতে হতে নিজাম হায়দার টের পেলো, হাত পায়ে সম্পূর্ণ ছেলেটির ঘাটতি আছে মাথায় হোক বুদ্ধিতে খাটো, তবুও তার একমাত্র পুত্রসন্তান। অম্পূর্ণতার জন্য নিজাম হায়দার ছেলেকে রাখে নিজের ডানার নিচে, বুকের কাছে। সিন্দুক ভরা সোনার চেয়েও এই ছেলেটি তার প্রিয়। ছেলের বয়স আর কদিন বাদেই আঠারো পূর্ণ হবে, কিন্তু আচরণে সে এখনো ছয় বছরের শিশু। এখনো ক্ষিদে পেলে সে কাঁদে, বাবা তাকে ফেলে বাইরে গেলে অভিমান করে, কেউ চোখ রাঙালে ভয়ে কাঁপতে থাকে। নিজাম হায়দার নিয়মিত শহরের বড়ো ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায় ছেলেকে। ডাক্তারের পরামর্শে শহরের বিশেষ স্কুলে ভর্তি করিয়েছে, ছেলে তার এখানে লিখতে পড়তে শিখবে। এই ছেলে তার উত্তরসূরী হবে, আরামকেদারায় শুয়ে শাসন করবে গ্রামের চাষাদের, এই স্বপ্ন দেখে নিজাম হায়দার ৷
গুরুজির চেহারা সবসময়ই অভিব্যক্তিহীন। চেহারার ভাজগুলো বোবা, দেখে ঠিক মনের অবস্থা বোঝা যায় না। কিন্তু নিজাম হায়দারের কথা বলার সময় গুরুজির চেহারায় ঘৃণা ফুটে ওঠে।
গুরুজি এমনভাবে নিজাম হায়দারের কথা বলে যায় যেন, নিজাম হায়দারকে প্রত্যহ প্রত্যক্ষ করে। এতকিছু কীভাবে জানলো সে প্রশ্ন জলিল কিংবা মনা কেউই করে না, গুরুজির কত চোখ আছে! সিন্দুক ভরা সোনার কথা শুনেই জলিলের গাঁজা খাওয়া লাল চোখ দুটোও চকচক করে ওঠে। সে বেশ আগ্রহ নিয়ে বলে,
আমরা কি সিন্দুকের সোনা চুরি করমু?
গুরুজি মাথা নেড়ে বললো,
তার চেয়েও দামি জিনিস।
কী?
নিজাম হায়দারের কইলজা, তার পোলা।
