মহাপৃথিবী (১৯৪৪)

মহাপৃথিবী (১৯৪৪) - কাব্যগ্রন্থ - জীবনানন্দ দাশ

অনুপম ত্রিবেদী

এখন শীতের রাতে অনুপম ত্রিবেদীর মুখ জেগে ওঠে। যদিও সে নেই আজ পৃথিবীর বড়ো গোল পেটের ভিতরে সশরীরে; টেবিলের অন্ধকারে তবু এই শীতের স্তব্ধতা এক পৃথিবীর মৃত জীবিতের ভিড়ে সেই স্মরণীয় মানুষের কথা হৃদয়ে জাগায়ে যায়; টেবিলে বইয়ের স্তুপ দেখে মনে হয় যদিও প্লেটোর থেকে রবি ফ্রয়েড নিজ...

আজকের এক মুহূর্ত

হে মৃত্যু, তুমআিমাকে ছেড়ে চলছ ব’লে আমি খুব গভীর খুশি? কিন্তু আরো খানিকটা চেয়েছিলাম; চারি দিকে তুমি হাড়ের পাহাড় বানিয়ে রেখেছে;– যে ঘোড়ায় চ’ড়ে আমি অতীত ঋষিদের সঙ্গে আকাশে নক্ষত্রে উড়ে যাব এই খানে মৃতবৎসা’ মাতাল, ভিখারি ও কুকুরদের ভিড়ে কোথায় তাকে রেখে দিলে...

আট বছর আগে একদিন

শোনা গেল লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে; কাল রাতে ফাল্গুনের রাতের আধারে যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাদ মরিবার হল তার সাধ। বধু শুয়ে ছিল পাশে-শিশুটিও ছিল; প্রেম ছিল, আশা ছিল জোছনায় তবু সে দেখিল কোন্ ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার? অথবা হয় নি ঘুম বহুকাল- লাশকাটা ঘরে মুয়ে ঘুমায় এবার।...

আদিম দেবতারা

আগুন বাতাস জল: আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পারিহাসে তোমাকে দিল রূপ- কী ভয়াবহ নির্জণ রূপ তোমাকে দিল তারা ; তোমার সংস্পর্শের মানুষের রক্তে দিল মাছির মতো কামনা। আগুন বাতাস জল: আদিম দেবাতারা তাদের বঙ্কিম পরিহাসে আমাকে দিল লিপি রচনা করবার আবেগ: যেন আমিও আগুন বাতাস জল, যেন...

ইহাদেরি কানে

একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে — একবার বেদনার পানে                অনেক কবিতা লিখে চলে গেলো যুবকের দল; পৃথিবীর পথে-পথে সুন্দরীরা মূর্খ সসম্মানে                শুনিল আধেক কথা — এই সব বধির নিশ্চল সোনার পিত্তল মূর্তি : তবু, আহা, ইহাদেরই কানে অনেক ঐশ্বর্য ঢেলে চলে গেলো যুবকের...

নিরালোক

একবার নক্ষত্রের দিকে চাই — একবার প্রান্তরের দিকে আমি অনিমিখে। ধানের ক্ষেতের গন্ধ মুছে গেছে কবে জীবনের থেকে যেন; প্রান্তরের মতন নীরবে বিচ্ছিন্ন খড়ের বোঝা বুকে নিয়ে ঘুম পায় তার; নক্ষত্রেরা বাতি জ্বেলে জ্বেলে — জ্বেলে — ‘নিভে গেলে — নিভে...

পরিচায়ক

মাঝে-মাঝে মনে হয় এ-জীবন হংসীর মতন— হয়তো-বা কোনো-এক কৃপণের ঘরে; প্রভাতে সোনার ডিম রেখে যায় খড়ের ভিতরে; পরিচিত বিস্ময়ের অনুভবে ক্রমে-ক্রমে দৃঢ় হয় গৃহস্থের মন। তাই সে হংসীরে আর চায় নাকো দুপুরে নদীর ঢালু জ’লে নিজেকে বিম্বিত ক’রে; ক্রমে দূরে—দূরে হয়তো-বা মিশে যাবে অশিষ্ট...

প্রার্থনা

আমাদের প্রভু বীক্ষণ দাও : মরি নাকি মোরা মহাপৃথিবীর তরে? পিরামিড যারা গড়েছিলো একদিন—আর যারা ভাঙে—গড়ে;— মশাল যাহারা জ্বালায় যেমন জেঙ্গিস যদি হালে দাঁড়ায় মদির ছায়ার মতন—যত অগণন মগজের কাঁচা মালে; যে-সব ভ্রমণ শুরু হ’লো শুধু মার্কোপোলোর কালে, আকাশের দিকে তাকায়ে মোরাও বুঝেছি...

প্রেম অপ্রেমের কবিতা

নিরাশার খাতে ততোধিক লোক উৎসাহ বাঁচায়ে রেখেছে; অগ্নিপরীক্ষার মতো কেবলি সময় এসে দ’হে ফেলে দিতেছে সে-সব। তোমার মৃত্যুর পরে আগুনের একতিল বেশি অধিকার সিংহ মেষ কন্যা মীন করেছে প্রত্যক্ষ অনুভব। পৃথিবী ক্রমশ তার আগেকার ছবি বদলায়ে ফেলে দিয়ে তবুও পৃথিবী হ’য়ে আছে; অপরিচিতের মতো...

ফিরে এসো

ফিরে এসো সমুদ্রের ধারে, ফিরে এসো প্রান্তরের পথে; যেইখানে ট্রেন এসে থামে আম নিম ঝাউয়ের জগতে ফিরে এসো; একদিন নীল ডিম করেছ বুনন; আজও্তারা শিশিরে নীরব; পাখির ঝর্না হয়ে কবে আমারে করিবে...

ফুটপাথে

অনেক রাত হয়েছে-অনেক গভীর রাত হয়েছে; কলকাতার ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে-ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে- কয়েরটি আদিম সর্পিণী সহেদরার মতো এই-যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে পায়ের তলে, সমস্ত শরীরের রক্তে এদের বিষাক্ত বিস্বাদ স্পর্শ অনুভব করে হাঁটছি আমি। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে-কেমন যেন ঠান্ডা...

বলিল অশ্বত্থ সেই

বলিল অশ্বত্থ ধীরে: কোন্ দিকে যাবে বলো- তোমরা কোথায় যেতে চাও? এতদিন পাশাপাশি ছিলে, আহা, ছিলে কত কাছে; ম্লান খোড়ো ঘরগুলো-আজও তো দাঁড়ায়ে তারা আছে এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন্ দিকে কোন্ পথে ফের তোমরা যেতেছ চলে পাই নাকো টের! বোঁচাকা বেঁধেছ ঢের-ভোলো নাই ভাঙা বাটি ফুটা...

বিভিন্ন কোরাস

এক আমাদের হৃদয়ের নদীর উপর দিয়ে ধীরে এখনো যেতেছে চ’লে কয়েকটি শাদা রাজহাঁস; সহধর্মিনীর সাথে ঢের দিন—আরো ঢের দিন করেছি শান্তিতে বসবাস; দেখেছি সন্তানদের ময়দানে আলোর ভিতরে স্বতই ছড়ায়ে আছে—যেমন গুনেছি টায়-টায়; অদ্ভুত ভিড়ের দিকে চেয়ে থেকে দেখে গেছি জনতার মাথা গৃহদেবতাকে দেখে...

মনোকণিকা (অসম্পূর্ণ)

একটি বিপ্লবী তার সোনা রুপো ভালোবেসেছিলো; একটি বণিক আত্মহত্যা করেছিলো পরবর্তী জীবনের লোভে; একটি প্রেমিক তার মহিলাকে ভালবেসেছিলো; তবুও মহিলা প্রীত হয়েছিলো দশজন মূর্খের বিক্ষোভে। বুকের উপরে হাত রেখে দিয়ে তারা নিজেদের কাজ করে গিয়েছিলো সব। অবশেষে তারা আজ মাটির ভিতরে অপরের...

মনোবীজ

জামিরের ঘন বন অইখানে রচেছিলো কারা? এইখানে লাগে নাই মানুষের হাত। দিনের বেলায় যেই সমারূঢ় চিন্তার আঘাত ইস্পাতের আশা গড়ে—সেই সব সমুজ্জ্বল বিবরণ ছাড়া যেন আর নেই কিছু পৃথিবীতে : এই কথা ভেবে যাহারা রয়েছে ঘুমে তুলীর বালিশে মাথা গুঁজে; তাহারা মৃত্যুর পর জামিরের বনে জ্যোৎস্না...

মুহূর্ত

আকাশে জোছনা-বনের পথে চিতাবাঘের গায়ের ঘ্রাণ; হদদয় আমার হরিণ যেন: রাত্রির এই নীরবতার ভিতর কোন্ দিকে চলেছি! রতপালি পাতার ছায়া আমার শরীরে, কোথাও কোনো হরিণ নেই আর; যত দূর যাই কাসেতর মতো বাঁকা চাঁদ শেষ সোনালি হরিণ-শস্য কেটে নিয়েছে যেন; তারপর ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে শত শত...

শব

যেখানে রতপালি জোছনা ভিজিতেছে শরের ভিতর, যেখানে অনেক মশা বানায়েছে তাহাদের ঘর; সেখানে সোনালি মাছ খুঁটে খুঁটে খায় সেই সব নীল মশা মৌন আকাঙক্ষায়; নির্জন মাছের রঙে যেই খানে হয়ে আছে চুপ পৃথিবীর একপাশে একাকী নদীর গাঢ় রদপ; কামতারের একপাশে যে নদীর জল বাবলা হোগলা কাশে শুয়ে শুয়ে...

শহর

হৃদয়, অনেক বড়ো বড়ো শহর দেখেছ তুমি; সেই সব শহরের ইটপাথর, কথা, কাজ, আশা, নিরাশার ভয়াবহ হদত চক্ষু আমার মনের বিস্বাদের ভিতর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিমও তবুও শহরের বিপুল মেঘের কিনারে সূর্য উঠতে দেখেছি; বন্দরের নদীর ওপারে সূর্যকে দেখেছি মেঘের কমলারঙের ক্ষেতের ভিতর প্রণয়ী চাষার...

শীতরাত

এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে; বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা, কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো। শহর ও গ্রামের দূর মোহনায় সিংহের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে – সার্কাসের ব্যথিত সিংহের। এদিকে কোকিল ডাকছে – পউষের মধ্য রাতে; কোনো-একদিন...

শ্রাবণরাত

শ্রাবণের গভীর অন্ধকার রাতে ধীরে ধীরে ঘুম ভেঙে যায় কোথায় দূরে বঙ্গোপসাগরের শব্দ শুনে? বর্ষণ অনেকক্ষণ হয় থেমে গেছে, যত দূর চোখ যায় কালো আকাশ মাটির শেষ তরঙ্গকে কোলে করে চুপ করে রয়েছে যেন; নিস্তব্ধ হয়ে দূর উপসাগরের ধ্বনি শুনছে। মনে হয় কারা যেন বড় বড় কপাট খুলছে, বন্ধ করে...