১৯৩৭ নানকিং – দেবশ্রী চক্রবর্তী
1937 Nanking
A Bengali novel by Debasree Chakraborti
প্রথম প্রকাশ – নভেম্বর ২০২০
প্রচ্ছদের ছবি : শাটারস্টক
প্রচ্ছদ প্রস্তুতি : বিতান চক্রবর্তী
.
সাম্রাজ্যবাদী থাবায় আক্রান্ত
পৃথিবীর সমস্ত অত্যাচারি, অবহেলিত মানুষকে
.
প্রাককথা
অতীতের এক অন্ধকার চিত্রপটের মাঝে ঘনীভূতসাদা কুয়াশা, যার মাঝখান থেকে ভেসে আসা অসহায় মানুষের আর্তনাদ৷ মুহূর্তে সেই চিত্রপট রক্তাক্ত হয়ে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে, যার মাঝে ফুটে ওঠে অপক্ক থেকে জীর্ণ খণ্ডিত যোনিপথ৷ সেই অন্ধকার পথে কান পাতলে শোনা যায় বিদেশি সেনার বুট আর গুলির শব্দ৷ চিত্রকর এবং দর্শকের চেতনা মিলেমিশে গেলে, দু-চোখে ধরা দেয় এক আলো-আঁধারি মিশ্রিত রাস্তা, যার মাঝে ভেসে চলেছে রক্তের ধারা৷ সেই ধারাকে লক্ষ করে কিছু দূর গেলেই রাস্তার মাঝে এক নগ্ন ক্ষতবিক্ষত মাতৃ অবয়ব৷ যার ছিন্ন পেটের মাঝখান থেকে মোটা দড়ির মতো নাড়ি সংযুক্ত হয়ে আছে কিছু দূরে পড়ে থাকা এক মৃত ভ্রূণের সাথে৷ সেই মৃত ভবিষ্যতের দুই চোখে চোখ রেখে দেখা যায় এক সমুদ্রসৈকত, যার বালুরাশির ওপর পড়ে আছে হাজার হাজার মৃতদেহ, সেই সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের রং রক্তিম৷ সেই রক্তিম চিত্রপটে একটি দরজা, যার মধ্যে থেকে বীভৎস এক আওয়াজ ভেসে আসছে৷ সেই দিকে ছুটে গেলে দেখা যায় এক বৃদ্ধা উঁচু হয়ে বসে বমি করছেন, যার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে নোংরা বীর্যমাখা পোকা৷ নিমেষে চিত্রপটটি ঢেকে যায় সেই সব পোকায়৷ এখন আর কিছুই দেখা যায় না৷ কিন্তু মুহূর্তে সেই চিত্রপটের পোকাগুলি এক-একটি শব্দের রূপ ধারণ করে রচনা করে ফেলে এক রক্তাক্ত ঐতিহাসিক দলিল ‘‘১৯৩৭ নাননিং’’৷
১৯৩৭ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপান অতর্কিতে আক্রমণ করে চিনের নানকিং প্রদেশ৷ সেই আক্রমণ চিনের সাধারণ মানুষের বুকে এঁকে দিয়েছিল এক ভয়ংকর ক্ষত৷ নারী থেকে শিশু, কেউ বাদ যায়নি সেই হত্যালীলায়৷ বলা ভালো, যুদ্ধের সমস্ত বীভৎসকতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল জাপান৷ অথচ চিনের এই ইতিহাস গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে প্রায় মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে এতকাল৷ চিনের সরকারও সামান্য মেমোরিয়াল বানিয়েই দায় সেরেছেন৷ কিন্তু স্মৃতিরও এক জীবন আছে৷ ধ্বংসের সেই ছোটো ছোটো দেহাবশেষ এই উপন্যাসে সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ চীন শুধুমাত্র বিশ্ববাসীর জন্য নয়, নিজের নাগরিকদের জন্য সমান ভয়ংকর৷ এমন এক দেশ, যে দেশ নাগরিকদের প্রাথমিক অধিকারগুলির মর্যাদা দিতে জানে না৷ ১৯৩৭ সালে জাপান যে ভয়ংকর হত্যালীলা নানকিং-এর ওপর চালিয়েছিল, সেই ইতিহাসকে এবং সেই সব আক্রান্ত মানুষদের অতি সাবধানে সেখানকার সরকার মুছে দিয়েছে৷ শুধুমাত্র একটি মিউজিয়াম তৈরি করে নিজেদের দায় সেরেছেন সরকার৷ আক্রান্ত মানুষেরা কোনোরকম ক্ষতিপূরণ পায়নি৷ যে জাপান এই ভয়ংকর হত্যালীলা চালিয়েছিল, সেই জাপান আজ সব থেকে বেশি ব্যবসা করছে চিনে৷ ১৯৩৭ নানকিংকে একটি উপন্যাস বলা যাবে না কি জানি না, তবে একটি চলমান আত্মকথা বলা যেতে পারে৷ সময়ের বিভিন্ন পর্যায় থেকে কিছু মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম একটি অন্ধকার ঘরের আলো আর অন্ধকার মিশ্রিত এক পরিবেশে৷ এই আলো আর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে অতীতের এক ঘন কুয়াশাময় চিত্রপটে চিত্রিত হয়েছে এই ইতিহাস৷ কিন্তু সব কিছু শেষ হয়ে গেলেও তো কিছু রয়ে যায়৷ ধ্বংসাবশেষের সেই ছোটো ছোটো দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত তথ্য নিয়ে রচনা করেছি আমার এই সম্পদ৷
দেবশ্রী চক্রবর্তী


Leave a Reply