১
স্থান : টোকিয়ো
নিস্তব্ধ হলঘরের এক কোণ থেকে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে রকিং চেয়ারের আওয়াজ ভেসে আসছে৷ আলো-আঁধারি পরিবেশের ডানদিকের দেওয়ালটি আজ যেন ক্যানভাসে পরিণত৷ সেখানে দুলন্ত চেয়ারে বসে থাকা একটি অবয়ব ভেসে উঠছে৷ দোলাচলের মাঝে অতীত এবং বর্তমানকে কোথাও যেন সংযোগ স্থাপনের আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে প্রকৃতি৷ উত্তর দিকের কাচের জানালার ওপরে ঝোলানো দেওয়াল ঘড়িতে রাত দুটো বাজল৷ কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতরের সব আওয়াজ নিস্তব্ধ হয়ে গেল৷ উত্তরের লাল রঙের দেওয়ালে কাচের জানালা আলো-আঁধারির মাঝে দেওয়ালের রংটি আজ আরও বেশি গভীর লাগছে৷ অতীতের হাতছানিকে উপেক্ষা করা আজ অসম্ভব৷ অতীতের টানে আকারা উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে৷ বার্ধক্যের ভারে আজ মেরুদণ্ডের জোর সে হারিয়েছে৷ শরীরের কাছে প্রাণশক্তি হার মানলে যা হয়, বৃদ্ধ কোনো ক্রমে ঝুঁকে পড়া শরীর নিয়ে এগিয়ে চলল উত্তর দিকের লাল দেওয়ালটির দিকে৷ অতীতের আকর্ষণকে অবজ্ঞা করার সাহস তার নেই৷
কাচের জানালাটা খুলে দিলে ঠান্ডা হাওয়া এসে ঢোকে ঘরের ভেতরে৷ বাইরে টাঙিয়ে রাখা উইন্ড বেলের টুং টাং শব্দ ঘরের ভেতরে এসে ঢুকছে৷ বৃদ্ধ কিছুটা সরে গিয়ে দেওয়ালের মধ্যে হাত বোলাতে লাগল৷ দেওয়ালটাজুড়ে শতাব্দীর প্রাচীনতম এক বৃক্ষ যেন আজ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে৷ সাম্রাজ্যবাদ আর হিংসার প্রতীক এই বৃক্ষের শিকড় যে কোন গভীরে প্রবেশ করেছে তার হিসেব করা আজ সম্ভব না৷ এর ডালপালা,পাতা, ফল সব কিছুর সঙ্গে পরিচিত বৃদ্ধ আকারা৷ তার সারা শরীর কাঁপছে, কানের পাশে ঘামের বিন্দু জমা হচ্ছে৷ কম্পিত হাতে সে ধীরে ধীরে স্পর্শ করল গাছটির সবুজ একটি কচি পাতাকে৷ আকারার চোখ বন্ধ, তার মনে হল সে কোনো অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ দিয়ে ছুটে চলেছে৷ এ মাধ্যাকর্ষণের থেকেও গভীর টান৷ চারিদিক অন্ধকার৷ কিছুটা পথ পার করার পর সে একটা তীব্র আলো অনুভব করল৷ একটা বড়ো জানালা খোলা৷ আলোয় ঝলমল করছে একটা ক্লাসরুম৷ ছাত্রদের সামনে কিছু রাখা আছে, গভীর আগ্রহ নিয়ে সবাই সেই বস্তুটির দিকে তাকিয়ে আছে৷ ঘরের পেছন দিক থেকে একটা কান্নার আওয়াজ আসছে, আওয়াজটা শুনে মনে হয় কোনো বালক কাঁদছে৷ সেই সঙ্গে একজন পুরুষের চিৎকারের শব্দ৷ আকারার অনুভূতি সেই আওয়াজকে লক্ষ্য করে পেছনের দিকে ছুটে চলল৷ জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে একটি ব্যাঙের ওপর৷ একজন বালকের হাতে ছুরি, তার সারা শরীর কাঁপছে৷ ব্যাঙটির দিকে তাকিয়ে তার কান্না আরও বেশি তীব্র হচ্ছে৷ আকারা এই বালককে চিনতে পেরেছে৷ এ তো বালক আকারা! আকারা নামের অর্থ হচ্ছে ‘‘স্বচ্ছ-সুন্দর’’৷ সত্যিই তো বালকের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে তার এই কথাটাই বার বার মনে হয়েছে৷ এই নাম সার্থক ছিল কোনো এক সময়৷ জীবনের এক পর্যায় পর্যন্ত সত্যিই তো তার নাম সার্থক ছিল৷ কিন্তু তারপর তার মধ্যে যে ভয়ংকর পরিবর্তন এসেছে, সেই পরিবর্তনের জন্য তাকে একা দায়ী করা উচিত না৷ একটা তীব্র শব্দ শুনে সে তাকাল বালকের দিকে৷ বালকের ডান গাল লাল হয়ে গেছে, তার কানে মনে হচ্ছে রক্ত জমে গেছে৷ শিক্ষক বালকের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তোমার মঙ্গল চাই, তাই তোমাকে থাপ্পড়টা মারলাম৷ আজ তুমি একটা ব্যাঙ কাটতে ভয় পাচ্ছ? কিন্তু আর দশ বছর পর তোমাকে হাজার হাজার চিনবাসীকে হত্যা করতে হবে৷ তাই এখন থেকে মন শক্ত করো৷ বালকটির হাত শক্ত করে ধরে তার শিক্ষক ব্যাঙটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন৷ ব্যাঙটির পেট ওঠা-নামা করছে, এখনও সে বেঁচে আছে৷ বালকটি তাকিয়ে আছে সেই দিকে, তার চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল এসে পড়ছে ব্যাঙটির পেটের ওপর৷ ঘড়ির কাঁটায় টিকটিক করে একটা শব্দ হচ্ছে৷ তারপর সেই পেটটা চিরে দুই ভাগ হয়ে গেল, তখনও প্রাণীটার হৃদযন্ত্র কাজ করছে, হৃদযন্ত্রটা হাতে তুলে ধরলেন শিক্ষক৷ তার মুখে তৃপ্তির হাসি৷ একজন শিক্ষকের দুটো আঙুলের মাঝে দপদপ করছে একটি নিরীহ জীবের হৃদয়৷ বালক আকারা তার দুই হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে গিয়ে গাল দুটো চিটচিটে হয়ে উঠল৷ সে কিছুর একটা গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করছে৷ তীব্র গন্ধ৷ এ গন্ধ তার গাল থেকে নাকে প্রবেশ করতেই আকারা মেঝের ওপর উপুড় হয়ে বমি করে ফেলল৷ বৃদ্ধ আকারার স্পন্দন জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল রক্তিম সূর্য আঁকা পতাকা নিয়ে বিভিন্ন বয়সি ছাত্ররা মার্চ করছে এবং তাদের মুখে সাম্রাজ্যবাদী শ্লোগান৷ আকারার স্পন্দন ছুটে গেল বিদ্যালয়টির শিশু বিভাগের দিকে৷ সেখানে ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা সবুজ ঘাসের ওপর বসে খেলছে, এরা জাপানের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম৷ আকারা তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল শিশুদের হাতের খেলনাগুলির দিকে৷ সে নীচু হয়ে খুব ভালো ভাবে খেলনাগুলি দেখতে লাগল৷ সে যত ভালো ভাবে দেখার চেষ্টা করছে, তার বুকের ভেতরে তত বেশি চাপ সে অনুভব করছে৷ প্রত্যেক শিশুর হাতে খেলনা-যুদ্ধাস্ত্র৷ আর তাদের চারপাশে মাঠের ওপর রাখা ট্যাঙ্ক সহ বিভিন্ন সামরিক খেলনা-যান৷ বিদ্যালয়টির চারপাশ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শ্লোগান উঠল৷ শুধু এই বিদ্যালয় না, জাপানের প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ের প্রতিটি ঘর থেকে উগ্র সাম্রাজ্যবাদের শ্লোগান দেওয়া হতে লাগল৷ লাল সূর্যের রক্তিম ছটা ছড়িয়ে পড়েছে পতাকার ওপরে, সেই পতাকা চারদিকে ছেয়ে গেছে, সেই পতাকার মাঝখান দিয়ে আকারা দেখতে পাচ্ছে এক-একটি খেলনার দোকান, যেসব দোকান খেলনা যুদ্ধ সরঞ্জামে সেজে উঠেছে৷ আকারা আর এক ধাক্কায় আরও কিছু বছর পিছিয়ে গেল৷ সে তার অনুভূতি দিয়ে জাপানের সব কয়টা শহর একসাথে দেখতে পাচ্ছে৷ প্রতিটি শহরের কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মানুষজন রাস্তার দুই ধারে বসে হাহাকার করছে৷ কী ভয়ংকর দৃশ্য! দেখতে দেখতে রাতের অন্ধকার নেমে আসে শহরের বুকে৷ রাতের অন্ধকার শহরের বুকে বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলে ওঠে৷ অন্ধকার গলিপথ দিয়ে আকারার অনুভূতি ছুটে চলেছে৷ গলির প্রান্ত থেকে কুকুরের ডাক এগিয়ে আসছে তাকে লক্ষ্য করে৷ কুকুর হয়তো মানুষের অনুভূতিকে অনুভব করতে পারে৷ সেদিন এদের ডাকের মধ্যে একটা বেদনা সে অনুভব করেছে৷ একটা বাড়ির বাইরে এসে আকারা থামল৷ এ-বাড়ির সঙ্গে আজন্ম তার পরিচয়৷ কিন্তু এই সময় তার জন্ম হয়নি বলে মনে হচ্ছে, সে তার অন্তঃসত্ত্বা মাকে দেখতে পেল৷ সে তার যুবক বাবাকেও দেখতে পাচ্ছে, যে ঘরের এককোণে বসে কান্নাকাটি করছে৷ ঘরের ভেতর খুব হালকা প্রদীপের আলো৷ আকারার দাদু আর বাবা দু-জনেই কারখানায় চাকরি করতেন এবং তাদের চাকরি চলে গেছিল, সে-কথা সে জানে৷ আকারার বাবা হয়তো এই জন্যই কাঁদছে৷ কিন্তু ঘরের ভেতর থেকে মহিলাদের কান্নার আওয়াজ আসছে৷ আকারার অনুভূতি ঘরের ভেতরে ছুটে গিয়ে দেখে দুটি মেয়েকে একজন বৃদ্ধ হাত ধরে টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন, আর এক বৃদ্ধা তার পায়ে পরে কাকুতি-মিনতি জানাচ্ছে৷ কিন্তু বৃদ্ধ কোনো কথা শুনছে না৷ বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, নোংরা জায়গায় ওদের বিক্রি করো না৷ এটা ঠিক হচ্ছে না৷ নিজে বাবা হয়ে তুমি এই পাপ করতে পারো না৷ বৃদ্ধ বৃদ্ধার দিকে ঝুঁকে বলল, ওদের বিক্রি করলে আমরা সবাই দু-বেলা দু-মুঠো খেতে পাব৷ না হলে না খেতে পেয়ে মরতে হবে৷ বৃদ্ধ কারুর কথা শুনল না, সে যখন ঘর থেকে বেরোতে যাবে তখন আকারার যুবক বাবা বৃদ্ধের পা জড়িয়ে ধরলে, বৃদ্ধ তাকে লাথি মেরে ছিটকে ফেলে দেয়৷ কী ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে জাপান সেই সময় গিয়েছিল ভাবা যায় না! ঘরের মেয়েকে বাবারা পতিতালয়ে বিক্রি করেছিল৷ এ তো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরের কোনো এক সময়৷ আকারা দেখতে পাচ্ছে খেতে কোনো ফসল নেই৷ মাঠের পর মাঠ খালি৷ চারিদিক থেকে মানুষের হাহাকার ভেসে আসতে থাকে৷ দূরে পাহাড়ি কুয়াশা ভেদ করে ষড়যন্ত্র আর আশঙ্কার ফিসফিস শব্দ ভেসে আসতে থাকে৷ সকলের মনে একটাই সন্দেহ আর তা হচ্ছে পাশ্চাত্য শক্তি আর চিনের ষড়যন্ত্রে জাপানের অর্থনীতির এই ভয়ংকর অবস্থা৷ জাপানকে পৃথিবীর মানচিত্রে আবার সুপ্রতিষ্ঠিত করতে গেলে শক্তিশালী সৈন্যদল তৈরি করতে হবে, দেশের প্রতিটি মানুষকে যোদ্ধা হতে হবে৷
আকারা নিজের অনুভূতি ফিরে পায়৷ সে চোখ খুলে তাকায় খোলা জানালার দিকে৷ সূর্যোদয়ের সময় হয়ে আসছে, আকাশ রক্তিম আভায় আবৃত৷ সে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে৷ রক্তিম আকাশ দেখে তার বন্ধু আইটোর কথা মনে পড়ল৷ আইটোর সেই রক্তাক্ত মুখটা সে আজও ভুলতে পারেনি৷ আইটো ছিল তাকায়ামার এক দরিদ্র চাষির সন্তান৷ দরিদ্র পরিবারের এই সন্তান প্রথম থেকেই শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ছিল৷ ১৯৩০ সাল নাগাদ সারা দেশের মানুষকে যন্ত্রমানবের মতো সৈনিক হবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে৷ এই সময় জাপানের অবস্থা অনেকটা প্রাচীন যুগের স্পার্টার মতো ছিল৷ স্পার্টায় যেমন প্রত্যেক নাগরিকের সৈনিক হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, ঠিক সেইভাবেই ছোট্ট দুধের শিশু থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয় জাপানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে৷ শিক্ষকদের কথামতো না চললে কপালে জুটতে থাকে ভয়ংকর নির্যাতন৷ ক্লাসরুমগুলো থেকে আর্তনাদের আওয়াজ ছুটে আসতে থাকে৷ এরকমই রোজ নির্যাতিত হতে হত আইটোকে৷ আইটোর পক্ষে আর কোনোভাবে নিজের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না৷ রোজ রোজ মানসিকভাবে ধর্ষিত হতে হতে একদিন সে ঝুলে পড়ে৷ তাদের বিদ্যালয়ের পেছনে পাইনের বনে তার ঝুলন্ত দেহ পাওয়া যায়৷ আইটোর মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল৷ সবাই এই ঘটনাটাকে আত্মহত্যা ভাবলেও আকারা জানে এটা হত্যা ছাড়া আর কোনো কিছু ছিল না৷ একজন দুর্বল মানুষের কোনো স্থান যে সে-দেশে ছিল না৷ আকারা আর অন্যান্য তিনজন ছেলের সঙ্গে আইটো এক ঘরেই থাকত৷ রাতের খাবারের আগে দু-জন লোক এসে সেদিন আইটোকে ডেকে নিয়ে গেছিল৷ আইটো যখন যাচ্ছিল, আকারা দাঁড়িয়ে ছিল দরজার সামনে৷ অন্ধকার করিডোরে সেদিন হালকা একটা আলো ছিল৷ দেওয়ালে দুর্বল আইটোর ছায়া এসে পড়ছিল৷ তাকে দুই হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল৷ সেদিন রাতের খাবার সে ঠিকঠাক খেতে পারেনি৷ অনেক রাত পর্যন্ত সে তার বন্ধুর অপেক্ষা করেছিল৷ মাঝরাতের দিকে হস্টেলের ঘরের পেছনে কালো পাইনের বন থেকে একটা আওয়াজ আসছিল৷ আকারা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালাটা একটু ফাঁক করে দেখে পাইনের জঙ্গলে মৃদু আলো৷ কারা দাঁড়িয়ে আছে কিছু বোঝা যাচ্ছে না, তবে ভারী কিছু দড়ি দিয়ে বেঁধে গাছের ওপর তোলা হচ্ছে তা বোঝা গেছিল৷ সেই রাতেই আকারা বুঝতে পেরে গেছিল আইটোকে হত্যা করে তার দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ কারণ তাঁদের যে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল, সেখান থেকে সে এই পদ্ধতি শিখেছিল৷ নিজের অক্ষমতার প্রতি ঘৃণায় ছটফট করেছিল সে, কিন্তু চিৎকার করতে পারেনি৷ চিৎকার করলে তার পরিণতি আইটোর মতোই তো হত৷
ভোরের আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে৷ আকারা তার ক্লান্ত শরীর রকিং চেয়ারের ওপর মেলে দিয়ে চোখ বন্ধ করল৷ ভোরের রক্তিম আলো সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে৷ এক রক্তিম চেতনার মাঝে রকিং চেয়ারটা দোল খাচ্ছে৷ উইন্ড বেলের টুং টাং শব্দ আবহ সংগীতের মতো বেজে চলেছে৷
