৪
স্থান : ফুজিয়ান, সানজি
ফুজিয়ান অঞ্চলটি চিনদেশের অন্যতম সুন্দর একটি অঞ্চল৷ ওলটানো বাটির মতো সবুজ পাহাড়, নীল নদী আর সবুজ উপত্যকার মাঝে সানজি একটি অতি সুন্দর গ্রাম৷ সানজির অস্তিত্বটা অনেকটা বন্য ফুলের মতো, যার উজ্জ্বল রং আর উগ্র গন্ধ নিঃসঙ্গ মানুষকে আকর্ষণ করে, কিন্তু বাজারি মূল্য সেই অর্থে নেই৷ পাহাড়ে ঘেরা এই গ্রামটির দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধান খেত, আর দূরে দূরে দু-একটি কাঠের একতলা বাড়ি, খেতের ধার দিয়ে মাটির একটা রাস্তা চলে গেছে প্রধান সড়কের দিকে৷ চারিদিক দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বইছে, মাটির রাস্তার ওপর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে হাওয়া এগিয়ে চলেছে উত্তর দিকে৷
১৩ বছর বয়সি ছোট্ট বিমিং বসে আছে তার বাড়ির বারান্দায়৷ সে খুব মনোযোগ সহকারে একটি খাতা পড়ছে৷ বাড়ির সামনে যে বিশাল কালো পাইনের গাছটি আছে, তার একটা ফল এসে পড়ল বিমিং-এর পায়ের সামনে৷ কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন মেয়েটি যেন অন্য এক জগতে বিরাজ করছে৷ এই সময় বাবা-মা দু-জনেই খেতে কাজে যায়, তাঁরা আসে সন্ধ্যেবেলায়৷ বিমিং স্কুল থেকে এসে রোজই গল্পের বই পড়ে৷ বিমিং-এর দাদুরও গল্পের বই পড়ার খুব নেশা ছিল৷ দাদুর ঘরেই কিছু দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সন্ধান করতে গিয়ে সে একটি অতি জীর্ণ খাতার সন্ধান পেয়েছে৷ যা তার কাছে একটি দুর্লভ মাণিক্যের সমান৷ তাই সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে মনোযোগ সহকারে খাতাটি পড়ে চলেছে৷
১৯৩৭, ১৩ ডিসেম্বর, নানকিং
খাতার জীর্ণ মলাটটি উলটে প্রথম পাতায় লেখা আছে, আমি চেন, আমার দিদি আর মা-বাবার সাথে নানকিং-এ থেকে গেছিলাম৷ আমার স্কুলের বন্ধুরা প্রায় সবাই এই শহর ছেড়ে বহু দূরে চলে গেছে৷ গত এক সপ্তাহ ধরে শুনছিলাম জাপান না কি আমাদের দেশ আক্রমণ করছে৷ সবাই বলছিল যে যেদিকে চোখ যায় চলে যাও, কারণ জাপানিরা কারুকে বাঁচতে দেবে না৷ দেখতে দেখতে শহরটা কীরকম যেন ফাঁকা হয়ে গেল৷ মানুষজন, পশুপাখি, প্রায় সবাই নৌকায় করে কিংবা সড়ক পথে অন্য শহরে চলে যেতে লাগল৷ যারা শহর ছেড়ে সেদিন চলে গেল তাদের প্রত্যেকের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো ছিল৷ কিন্তু আমাদের মতো দরিদ্র মানুষদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না৷ আমার বাবা সবজির চাষ করে তা বাজারে বিক্রি করত৷ আমাদের প্রতিবেশীরা বলল, যদি মরতে হয়, তাহলে এখানেই মরব৷ বহু মানুষের চলে যাওয়ার পর শহরটা কেমন যেন বিষাদময় হয়ে উঠল৷ আমরা প্রত্যেকে খুব একা হয়ে গেলাম৷ একটি নিঃসঙ্গ শহর আর তার হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ এক চরম পরিণতির অপেক্ষায় ছিল৷
অবশেষে সেই মুহূর্ত এসে গেল৷ আজ ১৩ই ডিসেম্বর, ভোর থেকে বোম ফেলার আওয়াজ পাচ্ছি৷ আমরা জানতাম না যে একে বোম বলে, বাবা আমাদের বলেছিলেন যে শত্রুপক্ষ বোম ফেলছে৷ বোমের শব্দে সারা শহর কেঁপে উঠছিল৷ দেওয়ালের তাকের ওপর রাখা কাচের বাসন, জিনিসপত্র সব কিছু মেঝের ওপর এসে পড়ছিল৷ বেলা বাড়ার সাথে সাথে ওরা আমাদের রেললাইন, ব্রিজ, রাস্তাঘাট সব কিছু উড়িয়ে দিল৷ সাধারণ মানুষের যাওয়ার আর কোনো পথ রইল না৷
আমার ঘরের কাচের জানালাটা প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল৷ চারিদিকে কাচ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে৷ এখন আর আমার পক্ষে লেখা সম্ভব না৷
১৪ ডিসেম্বর, ১৯৩৭, নানকিং
দুপুর ১২টা
পাশের বাড়ির চ্যাং ব্যাঙ্কে গিয়েছিল, সে কোনোক্রমে প্রাণ হাতে করে ফিরে জানিয়েছিল শত্রুপক্ষের সেনারা শহরে ঢুকে গেছে, ওরা ব্যাঙ্ক, বাজার, রেস্তরাঁ, সরকারি অফিস সব জায়গায় প্রবেশ করে নির্বিবাদে মানুষকে হত্যা করছে৷ হাজার হাজার মানুষের দেহ ছড়িয়ে আছে রাস্তাঘাটে৷ চ্যাং-এর মতো কয়েকজন কোনোক্রমে প্রাণ হাতে করে ফিরেছে৷ আজ বাবা বাজারে যায়নি, কারণ বাবার শরীরের অবস্থা ভালো না৷ ব্লাড প্রেশারটাও বেড়েছে৷ বাবা রেডিয়োতে খবর শুনছিল৷ কিছুক্ষণ আগে রেডিয়োটাও বন্ধ হয়ে গেছে৷ শেষ খবর অনুযায়ী আমাদের সেনারা আত্মসমর্পণ করছে, তাই আমাদের রক্ষা করার আর কেউ নেই৷ যাদের হাতে এই দেশের রক্ষার দায়িত্ব, তাঁরা যখন এত সহজে হার মেনে নিয়েছে, তাহলে আর আমরা সাধারণ মানুষেরা কী করতে পারি! বাবা অস্ফুট স্বরে বলল, এখন মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ বাকি নেই৷ মা নিস্তব্ধভাবে দিদির চুলগুলো কাটতে লাগল৷ দিদি কাঁদছে৷ আমার খুব অদ্ভুত লাগছে যে, এরকম কেন হচ্ছে? আমরা সবাই তো খুব ভালো ছিলাম, তাহলে এরকম কেন হল?
দুপুর ২টো
আজ বাড়িতে কোনো রান্না হয়নি৷ বাড়ির সবার খিদে না পেলেও আমার খুব খিদে পেয়েছে৷ সারা ঘরে দিদির চুল ছড়িয়ে আছে৷ সে ঘরের এককোণে চুপ করে বসে আছে, বাবা বিছানায় শুয়ে আছে৷ আমি রান্নাঘরে গিয়ে দেখি মা রান্নাঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে কিছু লক্ষ করছে৷ বুঝলাম আজ কারুর সাথে কোনো কথাই বলা যাবে না৷ কিন্তু এরকম কেন হচ্ছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না৷ আমার কিছু ভালো লাগছে না৷ খুব খিদে পেয়েছে৷
দুপুর ২টো ২০ মিনিট
আমার ঘরের পেছনের রাস্তা দিয়ে মনে হচ্ছে রক্তের নদী বয়ে যাচ্ছে৷ এত রক্ত কোথা থেকে এলো কিছুই তো আমি বুঝতে পারছি না৷ মা ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আমি রান্নাঘরের দিক থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেয়ে সেই দিকে গিয়ে দেখলাম মা রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ঝুঁকে কী দেখছে৷ মায়ের কাছে গিয়ে দেখি লাল রাস্তার ওপর দিয়ে কালো পিঁপড়ের মতো সেনারা এগিয়ে চলেছে৷ তাঁরা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে আশেপাশের বাড়িগুলোর ভেতরে প্রবেশ করল৷
আমার মনে হচ্ছে ওরা আমাদের বাড়িতেও আসবে৷ হুম, আমার ধারণাই ঠিক, আমার ঘরের পেছনের রাস্তায় বুটের শব্দ হচ্ছে, কারা যেন আসছে৷
আমার খাতাটা লুকাতে হবে, বাড়ির দরজায় খুব জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে ওরা৷
মাঝে বেশ কয়েকটি পাতা ফাঁকা৷ দু-এক জায়গায় কালো ছিটের দাগ, বিমিং পাতাটা সূর্যের দিকে ধরতেই কালো রংটা লালচে লাগল৷
এরপর খাতায় লেখা আছে ২১শে ডিসেম্বর ১৯৩৭, সেচু গ্রাম৷ রাত ১১টা৷
একটু আগে দোকান বন্ধ করে হুনা বাড়ি ফিরে গেছে৷ আমি দোকানের এককোণে বসে লিখছি৷ আজ প্রায় এক সপ্তাহ হল আমি সেচু গ্রামে আশ্রয় নিয়েছি৷ সেদিন অর্থাৎ ১৪ই ডিসেম্বর যখন ওরা আমাদের বাড়ির বাইরে এসে পৌঁছোল, মা আমাকে সবজির ঝুড়ির ভেতর ঢুকিয়ে তার ওপর সবজি চাপা দিয়ে দিল৷ ওরা বাড়িতে ঢুকে মা আর দিদিকে আমার ঘরে নিয়ে গেল৷ আমি তখন রান্নাঘরে সবজির ঝুড়ির ভেতরে বসে আছি৷ ঝুড়ির ফাঁক দিয়ে সব দেখা যাচ্ছিল, আমি সব কিছু দেখতে আর শুনতে পাচ্ছিলাম৷ পাশের ঘর থেকে মা আর দিদির আর্তনাদ ভেসে আসছে৷ আরও কয়েকজন সেনা এসে সেই ঘরে চলে গেল৷ আর বাকিরা সারা বাড়িতে লুঠ করতে লাগল৷ আমি দেখলাম বাবাকে টানতে টানতে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ আমি যে ঝুড়িটার মধ্যে ছিলাম, সেই সবজি ভর্তি ঝুড়ি সহ আরও অনেক কিছু ওরা নিয়ে গিয়ে রাস্তার এক ধারে রাখল৷ সামনে একটা মাঠ, তার ওপাশে সাদা পাঁচিল৷ সাদা পাঁচিলের সামনে ওরা বাবা সহ পাড়ার পুরুষদের দাঁড় করাল৷ কিছুক্ষণ সব কিছু নিস্তব্ধ৷ তারপর একদল সেনা এসে মাঠের মধ্যে গর্ত খুঁড়তে লাগল৷ সবাই ভাবছে কী হতে চলেছে! আমি তখন আমার একমাত্র সম্বল খাতাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাচ্ছি৷ কারণ খুব জোরে শ্বাস নেওয়ার ফলে ঝুড়ি দুলে যেতে পারে, আর তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়ংকর হবে৷
ওদের গর্ত খোঁড়ার কাজ শেষ হলে, সেনারা এসে বাবা সহ অন্য পুরুষদের হাত পেছন থেকে বেঁধে দিয়ে তাদের গর্তের মধ্যে ঢুকিয়ে গলা পর্যন্ত পুঁতে দেয়, এখন সবার মাথাগুলো মাঠের ওপর ফুটবলের মতো জেগে আছে৷ দূর থেকে কুকুরের ডাকের শব্দ আসছে৷ যা খুব দ্রুত তীব্র হতে লাগল৷ আমি দেখলাম গোটা পঞ্চাশ জার্মান শেফার্ড কুকুরকে রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে নিয়ে আসা হচ্ছে৷ এদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে এরা ক্ষুধার্ত৷ মাঠের সামনে এনে কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হল৷ কুকুরগুলো মানুষের মাথা লক্ষ্য করে ছুটে যাচ্ছে, আর অসহায় মানুষেরা চিৎকার করে প্রাণভিক্ষা করছে৷ সেনারা চারদিক থেকে মাঠটাকে ঘিরে রেখেছে৷ আমি দেখলাম কতগুলো হিংস্র পশু মানুষের মাথা খুবলে খাচ্ছে আর লাল রক্তে মাঠ ভেসে যাচ্ছে৷ আমি খুব জোরে কাঁপতে লাগলাম৷ নিজের বাবার এই ভয়ংকর পরিণতি এভাবে চোখের সামনে দেখে আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম৷ তখন সেনাদের দৃষ্টি রাস্তার একধারে রাখা সবজি, মাছ কিংবা মাংসের ঝুড়ির দিকে ছিল না৷ তাই ঝুড়িটা পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি কোনোক্রমে তার থেকে বেরিয়ে, চ্যাঙের বাড়ির পাশ দিয়ে ছুট দিলাম৷ পেছনের রাস্তাটা তখন ফাঁকা৷ খুব সাবধানে কয়েকটা বাড়ি পার করে আমি ইয়াংজিং নদীর ধারে ছুটলাম৷ তখন দিদি আর মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল৷ কিন্তু নিজের আর খাতার প্রাণের মূল্য আমার কাছে সব থেকে বেশি ছিল৷
আমি নদীর ধারে গিয়ে জঙ্গলের পথ ধরলাম৷ জানি না সেদিন কীভাবে প্রাণ হাতে করে নিরাপদে জঙ্গল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলাম৷ যাই হোক, জঙ্গলের পথে এতদিন টানা চলার পর আমি সেচু গ্রামে এসে পৌঁছাই৷ জঙ্গলের থেকে বাইরে এসে রাস্তার এককোণে পড়েছিলাম৷ সেখান থেকে হুনা আমাকে উদ্ধার করে ওর দোকানে নিয়ে আসে৷ ওর আশ্রয়ে থেকে আমি আজ অনেকটা সুস্থ৷
বিমিং-এর বাবা-মা অনেকক্ষণ হল বাড়ি ফিরেছে৷ এই গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবার কৃষিজীবী৷ তারা সারা দিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রাতের খাওয়া শেষ করে ঘুমোতে চলে যায়৷ বিমিং-এর মা-বাবাও অনেকক্ষণ ঘুমাতে চলে গেছে৷ কিন্তু ছোট্ট মেয়েটার চোখে ঘুম নেই৷ সে দু-চোখের পাতা কিছুতেই এক করতে পারছে না, শুধু তার দাদুর কথা মনে পড়ছে৷ তার দাদু চেন কী ভয়ংকর সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছে, যা ভেবেই তার বুক কেঁপে উঠছে৷ দাদুর খাতা পড়ার পর চেন আর বিমিং-এর সত্তা কোথায় যেন মিলেমিশে একাত্ম হয়ে গেছে৷ চেনের সব অভিজ্ঞতা সে নিজের মধ্যে অনুভব করতে পারছে৷ অন্ধকার ঘরের দেওয়ালের মাঝের জানালার পর্দা যেন হঠাৎ সরে গেল৷ জানালাটা এখন একটা ক্যানভাস, সেখানে অতীতের এক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে৷ একটা খোলা প্রান্তরের মাঝখান দিয়ে রাস্তা৷ রাস্তার ধারে একটা ছোট্ট দোকান৷ দোকানে অসমবয়সি দুই পুরুষ বসে আছে৷ তারা একে অপরকে হুনা আর চেন বলে ডাকছে৷ দূর থেকে ঝোড়ো হাওয়ার সাথে বুটের শব্দ ভেসে আসছে৷ কারা যেন সেচু গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে৷ চেন এই শব্দের সাথে পরিচিত, শব্দটা যখন এগিয়ে আসছে চেন নিজের মধ্যে কেমন যেন গুটিয়ে যেতে থাকল৷ হুনা চেনের সব কথা জানে৷ তাই সে বাইরে গিয়ে দেখল জাপানি সেনারা তাদের গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে৷ এই সময় কী করে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে তা সে খুব ভালোভাবে জানে৷ হুনা চেনকে স্বাভাবিক থাকতে বলল, আর বলল ওরা যা করতে বলবে, চেন যেন তাই করে৷ ওদের সামনে কোনোরকম অস্বস্তির প্রকাশ করা যাবে না৷
একটা হালকা হ্যারিকেনের আলোয় দোকানের ভেতরে আলো-আঁধারি পরিবেশ তৈরি হয়েছে৷ একদল সেনা দোকানের ভেতর ঢুকে ইচ্ছেমতো খাবার জিনিস নিতে শুরু করল৷ হুনা নিজে থেকেই ওদের ধূমপানের সামগ্রী এগিয়ে দিতে লাগল৷ চেন দৌড়ে গিয়ে কিছু কাঠ দোকানের বাইরে জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিল৷ কিছু সেনা সেই আগুনকে ঘিরে বসল৷ হুনা এসে তাদের হাতে বিয়ারের বোতল ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল৷
এই গ্রামে লোকজনের বসতি কম, মাঠের প্রান্তরে এক-একটি বাড়ির মধ্যে অনেক দূরত্ব৷ কিন্তু দূরদূরান্ত থেকে মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছে৷ হুনা আর চেন যখন নিজেদের প্রাণরক্ষার তাগিদে জাপানি সেনাদের সেবায় ব্যস্ত, তখন গ্রামের পুরুষদের চারটি ভাগে ভাগ করে গ্রামের মাঝখানে একটি হ্রদের ধারে দাঁড় করানো হয়৷ প্রথম ভাগের গলা কেটে দেওয়ার পর দ্বিতীয় ভাগকে বলা হয় দেহগুলিকে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিতে৷ দেহগুলি পোঁতা হলে দ্বিতীয় ভাগের পুরুষদের গলা কেটে হত্যা করা হয়৷ তারপর তৃতীয় ভাগকে বলা হয় সেই সব মৃতদেহ পুঁতে দিয়ে আসতে৷ এই ভাবে ধীরে ধীরে গ্রামের সব পুরুষদের হত্যা করার পর চতুর্থ ভাগের সদস্যদের পোঁতার কেউ ছিল না, তখন হুনা আর চেনের দায়িত্ব পড়ে গ্যাসোলিন ঢেলে দেহগুলিকে পুড়িয়ে দেওয়ার৷ তখনও ভোরের আলো ফোটেনি৷ হ্রদের ধারে গিয়ে যখন ওরা দেহগুলি দাহ করছিল তখন কাদার মধ্যে কী যেন পায়ের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছিল৷ আগুন জ্বালানোর পর ওরা বুঝতে পারে যে এগুলো মানুষের শরীরের সরু অংশ, যা গলা কাটার পর বেরিয়ে এসেছে৷ ভোরের আলো যখন হ্রদের ওপর এসে পড়ে তখন হ্রদের জলের রং টকটকে লাল ছিল৷
ওরা চেন আর হুনাকে হত্যা করেনি৷ কারণ ওরা প্রাণপণে ওদের সেবা করতে থাকে৷ সেনাবাহিনী গ্রামের বাইরে তাদের ক্যাম্প তৈরি করে৷ সেখানে গ্রামের মেয়েদের ধরে আনা হয়৷ বিমিং দেখতে পায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের মাঝে একটা খোলা জায়গায় কিছু নগ্ন নারীশরীর৷ সেই সব শরীরের ওপর ইচ্ছেমতো পাশবিক লীলা চালাচ্ছে উন্মত্ত জাপানি সেনা৷ এই সব নারীরা প্রতিবাদের ভাষা ভুলে গেছে৷ তাদের চোখগুলো কীরকম যেন স্থির হয়ে গেছে৷ সারাদিন ধরে এই সব শরীর বিদেশি সেনাদের পাশবিক তৃষ্ণা মেটাতে থাকে৷ কিন্তু একটানা চলার পর যেকোনো যন্ত্র আর কাজ করতে চায় না৷ তা ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায়৷ সন্ধ্যার সময় ছোট্ট চেন আর হুনা একটা বিশাল ঠ্যালা গাড়ি নিয়ে আসে৷ তারপর কিছু নগ্ন মৃত নারীশরীর সেই গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়৷ ঠ্যালা গাড়িটা হ্রদের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়৷ তারপর রাতের বেলায় সেখানে আবার আগুন জ্বলে ওঠে৷ আগুনের আলো সেনা ক্যাম্পের প্রবেশদ্বারের সামনে এসে তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয়৷ তখন আরও একদল নগ্ন নারীশরীর এগিয়ে চলেছে ক্যাম্পের ভেতরে৷
