৫
স্থান : নিউ ইয়র্ক, আইরিশ চ্যাং-এর বাড়ি
আজ সুচেতনা সকাল ১০টার মধ্যে পৌঁছে গেছে মিসেস চ্যাং-এর বাড়িতে৷ যথারীতি জাপানি মেয়েটি এসে দরজা খুলেছে, সে সামনের দিকে ঝুঁকে সুচেতনাকে সম্মানও জানিয়েছে৷ মেয়েটি তাকে একতলায় বসতে দিয়ে চলে গেছে৷ এখন এই ঘরটা বেশ থমথমে৷ সুচেতনার এরকম পরিবেশ খুব ভালো লাগে৷ আজ দোতলা থেকে একটা চিনা ভাষায় গানের মৃদু শব্দ আসছে৷ গানটা সে মন দিয়ে শুনছে৷ এর মর্মার্থ কিছু বুঝতে না পারলেও মনের ওপর সুন্দর একটা প্রভাব পড়ছে৷ সুচেতনা যখন গানে মগ্ন হয়ে আছে, ঠিক তখন সিঁড়িতে আবার আওয়াজ উঠল৷ খুব জোরে আওয়াজ করে মিসেস চ্যাং নেমে আসছেন কাঠের সিঁড়ি দিয়ে৷ এখন গানটা আর শোনা যাচ্ছে না৷ মিসেস চ্যাং-এর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে তিনি অত্যন্ত অধীর আগ্রহে সুচেতনার অপেক্ষায় ছিলেন, আর সুচেতনা যে ফিরে এসেছে, এর জন্য তিনি খুব খুশি হয়েছেন৷ সুচেতনাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেন তিনি৷ তারপর তাকে বসতে বলে উলটো দিকের সোফাতে গিয়ে বসলেন৷
সুচেতনা বলল, মিসেস চ্যাং, গত রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি৷ আমি দেখলাম একটা দ্বীপে আমি পৌঁছে গেছি, যেখানে ধনী ব্যক্তিরা উলঙ্গ হয়ে ঘুরছেন, টাকা সমুদ্রের জলে ভেসে যাচ্ছে৷ আমি সেই দ্বীপের একটি ঘরে বন্দি হয়ে গেছি, যেখানে এক বৃদ্ধা আমার সেবা-যত্ন করছেন৷ সেই বৃদ্ধার হাত ধরে আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দেখতে গেছি৷
মিসেস চ্যাং বললেন, আমি স্বপ্ন নিয়ে সেই ভাবে কোনোদিন পড়াশোনা না করলেও তোমার স্বপ্নের অর্থ আমি বুঝেছি৷ তুমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের বিশ্বকে অনুভব করেছ৷ সেই সময় অর্থের কোনো মূল্য ছিল না, সব মানুষ সমান ছিল৷ তাই টাকা সমুদ্রের জলে ভেসে যাচ্ছে৷ ধনী ব্যক্তিদের তো টাকা ছাড়া আর কিছুই নেই৷ সেই জন্য টাকা যখন তার মূল্য হারায়, এই সব ধনী ব্যক্তিরা উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় ঘুরছিল৷ যে বৃদ্ধাকে তুমি দেখেছ, তিনি আমি৷ আমি তোমাকে সেই সময়ের চিত্র দেখাচ্ছি৷ কিন্তু তোমার মনের মধ্যে কোথাও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আছে, যা তোমাকে খুব কষ্ট দেয়৷ মুক্তিযুদ্ধ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটা বিন্দুতে এসে একাকার হয়ে গেছে৷ আর আমাদের সেই সব ভয়ংকর স্মৃতি আমাদের সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক নির্জন দ্বীপে আবদ্ধ করেছে৷ সেই দ্বীপ আমাদের মন৷
সুচেতনা গালে হাত দিয়ে বসে তাঁর কথা শুনছে৷
মিসেস চ্যাং এখন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সুচেতনার দিকে৷ আজ তিন দিন ধরে খুব বরফ পড়ছে, তাই ঘরের উত্তাপ বৃদ্ধির জন্য ফায়ার প্লেসে আগুন না দিয়ে ঘরের দুই প্রান্তে দুটো রুম হিটার জ্বালানো হচ্ছে৷ ঘরের তাপমাত্রা বেশ মনোরম৷ সুচেতনা তার ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বার করে পড়তে লাগল,
এই চিঠিটি লিখেছেন ১৯৩৭ সালের জাপানি সেনা বিভাগের ১১৪ নম্বর ডিভিশানের একজন সেনা৷ যার নাম হচ্ছে, তাকোকোরো কোজো৷ মিসেস চ্যাং আর সুচেতনা সেই দৃশ্য যেন দেখতে পাচ্ছেন৷ রাস্তার ধারে হাসিয়াকোয়ানা লেখা৷ কালো মেঘ আর কুয়াশায় ঘিরে আছে সেই অঞ্চল, রাস্তাঘাট কীরকম স্যাঁতসেঁতে, আশেপাশের বাড়িঘর থেকে ধোঁয়া উড়ছে৷ কয়েকটা ট্রাক একসাথে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে৷ প্রত্যেকটি বাড়ি থেকে ধোঁয়া উড়ছে, যুদ্ধবিদ্ধস্ত শহরের যেমন অবস্থা হয়, ঠিক সেরকম দেখাচ্ছে এই শহরটিকে৷ বাড়িগুলোর পাশের গলি থেকে মহিলাদের আর্তনাদের আওয়াজ ভেসে আসছে৷ পুরো চিত্রপট কালো আর ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে, তাঁর মাঝে কয়েক-শো নারী, যাদের ধূসর শরীরে রক্তের ছাপ লেগে আছে৷ জোর করে এদের ট্রাকে তোলা হচ্ছে৷ সুচেতনা দেখতে পাচ্ছে, মেয়েদের শরীরে যেমন খুশি হাত দিচ্ছে সেনারা, তারপর বস্তার মতো তুলে ছুড়ে ফেলছেন ট্রাকে৷ কিছুক্ষণ পর ধূসর বর্ণের কুয়াশা ভেদ করে ট্রাক চলতে থাকল, কিছু দূর যাওয়ার পর রাস্তার দুই ধারে খেত, কিন্তু এই খেতের বর্ণও ধূসর৷ কোথাও অন্য কোনো রং নেই, তবে চিত্রপটের মাঝে মাঝে লাল রঙের ছিটে দেখা যাচ্ছে৷ রাস্তার দুই ধারের গ্রাম থেকে মানুষের আর্তনাদের আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল৷ এই ভাবে ট্রাকটা চলতে চলতে কখন যেন রাত্রির অন্ধকার ঢেকে দিল প্রকৃতিকে৷ এখন আর কিছু দেখা যায় না৷ রাস্তার একধারে একটি খোলা মাঠে এসে দাঁড়াল ট্রাকটি৷ দূরে সেনা ছাউনি থেকে লাল রঙের আলো ভেসে আসছে৷ ট্রাক আসতে দেখে সেনারাও ছুটে আসতে থাকে৷ এরপর ট্রাক থেকে মহিলাদের নামানো হয়, সেনা ছাউনির লাল আলো যেন লাল প্লাবন এনেছে কালো চিত্রপটে৷ নারীদের আর্তনাদ আর সেনাদের জান্তব শীৎকারের শব্দে চারিদিকের মাঠ থেকে রাতের অজানা জন্তুরা চিৎকার করে উঠল৷
সুচেতনা বলল, এই চিঠিতে লেখা আছে প্রতিটি মহিলাদের ষোলো জন করে সেনা ধর্ষণ করেছিল৷ তারপর, সুচেতনা আর মিসেস চ্যাং দেখতে পেল অন্ধকারের কালো রং লাল বর্ণ ধারণ করেছে৷ সেখানে নারীশরীরগুলো বাদামি বর্ণ ধারণ করেছে, নারীশরীর থেকে লাল রং বেরিয়ে চিত্রপটকে আরও রক্তিম করে তুলেছে৷ সেনাবাহিনীদের কালো বর্ণের দেখাচ্ছে৷ তারা নারীদের উঠে দাঁড়াতে বলল, মহিলারা উঠে দাঁড়িয়ে যখন পেছন ফিরলেন, তাদের গুলি করে দেওয়া হল৷ এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে সুচেতনা আর মিসেস চ্যাং চোখ বন্ধ করল৷
এ তো গেল তাকোকোরো কোজোর কথা৷ আমি এখন জানতে চাই সেদিন আপনাদের যে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হল, সেখানে গিয়ে কী হল?
মিসেস চ্যাং একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমাদের যখন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হল তখন প্রায় মাঝ রাত৷ সারা শরীর ভয়ংকর ক্লান্তি আর যন্ত্রণায় অবশ হয়ে এসেছিল, ওখানে গিয়ে দেখলাম আমাদের গ্রামের টুন, সেম ওদেরও নিয়ে আসা হয়েছে৷ টুনের অবস্থা উন্মাদ পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল৷ ক্যাম্পের এককোণে উলঙ্গ হয়ে বসে মাথার চুল ছিঁড়ছিল৷ সেম কাঁদতে কাঁদতে বলল, সন্ধ্যের দিকে সেনারা ওদের বাড়ি আক্রমণ করে৷ তারপর টুনের বাবাকে বলে টুনকে ধর্ষণ করতে, না হলে ওরা পুরো পরিবারকে গুলি করে উড়িয়ে দেবে৷ টুনের বাবা বাধ্য হয়ে ওদের কথামতো কাজ করে৷ ভাইকে বলে মাকে ধর্ষণ করতে৷ ভাই রাজি না হওয়ায় বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে ভাইয়ের কাঁধে ফুটো করে দেয়৷ ভাই বাধ্য হয়ে ওদের কথামতো কাজ করে৷ সেম বলে, চারজন সেনা মিলে আমার ওপর অত্যাচার চালায়৷ আমি বুঝতে পারলাম যে আমাদের বাবা আর দাদারা বাড়ি থাকলে ওরা আমাদের সাথেও একই অত্যাচার করতে বাধ্য হত৷
সুচেতনা নিজের বাঁ-হাত দিয়ে নিজের গাল খামচে ধরে৷ এরকম পৈশাচিক অত্যাচার একটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশ চালাতে পারে তা সত্যিই ভাবা যায় না৷ সুচেতনা তার গালে ব্যথা অনুভব করে৷ কিন্তু এ যন্ত্রণা নানকিংবাসীর ওপর হয়ে যাওয়া অত্যাচারের যন্ত্রণার কাছে কিছুই না৷ মিসেস চ্যাং বললেন, জাপানিরা সবরকম হিংসার প্রয়োগ করেছিল আমাদের ওপর৷ ওরা চিনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ভয়ংকর পথ অবলম্বন করে শেষ করে দিতে চেয়েছিল৷
এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ ধারাবাহিক অত্যাচারের ইতিবৃত্ত৷ ক্ষুধার্ত, নগ্ন নারীদের ওপর চলতে থাকে নির্মম যৌন নির্যাতন৷ আমার চোখের সামনে আমার দুই দিদি আর কয়েকজন প্রতিবেশিনীর মৃত্যু হয়৷ আমি নিজেও আর এই অত্যাচার সহ্য করতে পারছিলাম না৷ প্রাণটা তখনও বুকের ভেতরে ধুকপুক করছিল৷ এই সময় এক সেনা এসে আমাকে কিছু খাবার খাইয়ে দেয়, আমি সেই সেনার চোখে প্রথম করুণা দেখেছিলাম৷ সে একটা কাপে করে কিছুটা জল আমার মুখে ঢেলে পাশের চেয়ারে বসে থাকে৷ চারপাশে যখন উন্মত্ত সেনারা যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে, তখন এক সেনার চোখে আমার প্রতি সমবেদনা দেখে সত্যিই অবাক হয়েছিলাম৷ আমার আজও মনে আছে সেই সেনাকে নির্লিপ্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখে তার এক বন্ধু এসে তাকে কিছুক্ষণ বিদ্রুপ করে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ সেই সেনা যখন নিজের খিদে মেটাচ্ছে, আমি তখন সেই করুণাময় মানুষটির দিকে একভাবে তাকিয়ে ছিলাম৷ সব কিছু শেষ হবার পর বুঝলাম আমার সাথে যারা এই ক্যাম্পে এসেছে তাদের প্রায় সবারই মৃত্যু হয়ে গেছে৷ কারণ আর কোনো আর্তনাদের আওয়াজ আমি পাচ্ছিলাম না৷ সন্ধ্যার সময় সেই করুণাময় মানুষটি এসে বলল, একটু পরে সব মৃতদেহ সরিয়ে দেওয়া হবে৷ আমি তোমাকে মৃতদেহের সাথে এখান থেকে বাইরে নিয়ে যাব৷ আমি তার কথামতো মৃত মানুষের মতো পড়ে থাকলাম৷ একসময় একটা ঠ্যালা গাড়িতে মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে আমাকে নিয়ে ওরা নদীর ধারে চলল৷
সেই সেনার ওপর দায়িত্ব ছিল দেহগুলোকে দাহ করার৷ স্থানীয় দু-জন মানুষ ঠ্যালা থেকে লাশগুলো নদীর ধারে ফেলে চলে গেল৷ ওরা চলে গেলে সেই সেনা আমাকে একটা শার্ট আর একটা জ্যাকেট পরিয়ে দিয়ে বলে যে আমি না কি জলে ভেসে থাকতে পারব৷ এই বলে সেই মানুষটি আমাকে ইয়াংজিং নদীতে ভাসিয়ে দেয়৷ ভাসানোর আগে তার নাম জিজ্ঞাসা করায়, সে বলে, তার নাম আকারা৷ আমাকে ভাসিয়ে দেওয়ার সময় আমি ওর চোখে জল দেখেছিলাম৷
সুচেতনার গাল দিয়ে রক্ত পড়ছে দেখে বৃদ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে পাশের তাক থেকে একটা ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে এলেন৷ তারপর তুলোতে ওষুধ দিয়ে তা গালের মধ্যে চেপে ধরে বললেন, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি৷ ভগবান বুদ্ধের ওপর আমার এক গভীর আস্থা ছিল৷ তাই হয়তো!
সুচেতনা তুলোটা নিজে চেপে ধরে বলল, এরপর আপনি ভাসতে ভাসতে কোথায় গিয়ে পৌঁছালেন?
এরপর কত ঘণ্টা যে ভেসে ছিলাম আজ আর মনে নেই৷ এ যেন আমার কাছে এক কঠিন তপস্যার মতো ছিল৷ নদীর জলে তৃষ্ণা মিটলেও খিদে মিটছিল না কিছুতেই৷ সেই সময় জলে ভাসমান ছোটো প্রাণী, গাছপালা কাঁচা অবস্থায় খেয়ে চলতে থাকি৷ মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েও পড়ছিলাম৷ এক সময় জলের স্রোত খুব বেড়ে যায়৷ আমি ভাসতে ভাসতে কখন যেন এক অজানা পাড়ে এসে ঠেকি৷ চারিদিকে বড়ো বড়ো ঘাস আর পাহাড়৷ অত্যন্ত ক্লান্তিতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি৷ দূর থেকে ‘ওম মণিপদ্মে হুম’ এই মন্ত্র ভেসে আসছে৷ আমি আমার অচেতন মনে এই মন্ত্র শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম৷ যখন ঘুম ভাঙল, দেখলাম একটি মনেস্ট্রিতে লাল রঙের বিছানার ওপর আমি শুয়ে আছি৷ আমার চারপাশে তিনজন লামা আর দু-জন বিদেশি৷ পরে জেনেছিলাম সেই দু-জন বিদেশি রেডক্রসের ডাক্তার৷ ওনারা আক্রান্তদের সেবা করে চলেছেন৷
বৃদ্ধা আবার কিছুক্ষণ থামলেন, এখন ওনার দু-চোখ দিয়ে জল ঝরছে৷ আশেপাশের কোনো পরিস্থিতির প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ তাঁর নেই৷ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন তিনি৷ সুচেতনা তাঁর পাশে গিয়ে বসে বৃদ্ধার মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে৷ এতে বৃদ্ধা আরও বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে কেঁদে ফেলেন৷ জানো সুচেতনা, আমি একমাস পর জানতে পারি যে আমি গর্ভবতী৷ একজন নারীর কাছে তার প্রথম সন্তানের আগমনের খবর কতটা আনন্দের তা একজন মা-ই জানে, কিন্তু আমি এমন এক অভাগী মা যে তার সন্তানের পিতার পরিচয়টুকুও জানতাম না৷ সেই মনেস্ট্রিতে দু-জন মহিলা সন্ন্যাসিনী ছিলেন৷ তাঁরা আমাকে বলেন যে সন্তান শুধুমাত্র তার মায়েরই, বাবার পরিচয়ের কোনো প্রয়োজন তো নেই৷ ওকে পৃথিবীতে আনা আমার কর্তব্য৷
আমি তাঁদের কথামতো চলতে থাকি৷ কিন্তু আমি জানতাম না, এই দুই বিদেশি ডাক্তার আমাকে আমার দেশ থেকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন৷ তখন আমার পাঁচ মাস চলছে, দুই সন্ন্যাসিনী এসে বললেন যে এই বয়সে সন্তানের জন্ম দেওয়া আমার পক্ষে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক৷ তাই আমাকে আমেরিকা চলে যেতে হবে৷ সেখানে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে আমি আমার সন্তানকে নিরাপদে জন্ম দিতে পারব৷ আমাকে রাতের মধ্যে তারা তৈরি করে দিল৷ তখন ভোরের আবছা আলো ফুটছে আকাশে, সবুজ ধান খেত পার করে ওরা আমাকে একটা গাড়িতে তুলে দিয়ে এলেন৷ আমি দুই সন্ন্যাসিনীর চোখে জল দেখে কেঁদে ফেললাম৷ মেয়েদের এই সময় মায়ের যত্নের প্রয়োজন থাকে৷ আমি যেন আমার দুই মাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি৷ তাই আমিও খুব কাঁদতে লাগলাম৷ পাগলের মতো কাঁদছিলাম৷ তারা গাড়ির দরজা বন্ধ করে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ আমাদের গাড়িটা সবে স্টার্ট নিয়েছে, এমন সময় দেখলাম একটা প্লেন উত্তর দিক থেকে মনেস্ট্রির ওপর বোম ফেলে আবার চলে গেল নদীর ওপর৷ আমাদের গাড়িটা খুব জোরে চলতে থাকল৷ আমি দেখলাম ভয়ংকর আগুন খেতের ওপর ছড়িয়ে যাচ্ছে৷ এখন আর সন্ন্যাসিনীদের দেখা যাচ্ছে না৷
আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি৷ পরে বিমানে ওঠার বেশ কিছুক্ষণ পর যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসে তখন জানতে পারি যে আমি বাদে সবাই জানতেন যে মনেস্ট্রির ওপর আক্রমণ হতে চলেছে৷ তাই অত্যন্ত সাবধানে সন্ন্যাসিনীরা আমাকে নিরাপদে সরিয়ে দিলেন৷
আমি কীরকম যেন পাথর হয়ে গেলাম৷ আর কোনো অনুভূতি আমার ওপর কাজ করছিল না৷ এই ভাবে উড়তে উড়তে সেদিন এক অজানা দেশ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চলেছিলাম৷
নিউ ইয়র্ক শহরে পৌঁছে জানতে পারলাম আমাদের এখানে আসার একমাস আগে আর একটি দল চিন থেকে এখানে এসেছে৷ সেই দলে একজন ধর্মযাজক, একজন সমাজসেবী আর একজন মহিলা ছিলেন৷ ঠিক হয় আমাকে মহিলাটির সাথে রাখা হবে, কারণ সে একজন চিনদেশীয় মহিলা এবং সেই সাথে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স৷ আমাকে এই শহরের একটি আবাসনের তিনতলার একটা ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়৷ মহিলার সাথে প্রথম আলাপেই তিনি আমাকে অত্যন্ত আবেগে আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরেন, তারপর আমার পেটে চুমু খেয়ে আমাকে তিনি স্নানঘরে নিয়ে যান৷ সেখানে আগে থেকেই গরম জল রাখা ছিল৷ আমাকে ভদ্রমহিলা সুন্দর করে স্নান করিয়ে, নতুন জামা পরিয়ে একটি সুন্দর বিছানায় তিনি বসতে দিলেন৷ তারপর আমাকে বালিশে হেলান দিয়ে বসিয়ে তিনি একগ্লাস গরম দুধ খাওয়ালেন৷ এই ভাবে একজন অপরিচিতা আমাকে নিজের বুকে আগলে নিলেন৷ আমার ভগবান বুদ্ধের ওপর গভীর আস্থা ছিল৷
আমি জানতাম আমার কোনো ক্ষতি তিনি হতে দেবেন না৷ তাই হয়তো তাঁর দূতেরা আমাকে এই ভাবে সেবা-যত্ন করে চলেছিলেন৷ আমার সত্যিই অবাক লাগত, মেইমেই (দিদি) যেভাবে দিনরাত এক করে আমার সেবা করে চলেছিলেন, আমার মনে হচ্ছিল মেইমেইর হাসি মুখের পেছনে এক গভীর যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে৷ কোনো এক গভীর যন্ত্রণাকে ভোলার জন্য তিনি এই ভাবে দিনরাত এক করে শারীরিক পরিশ্রম করে চলেছিলেন৷
সেই দিনটার কথা আজও ভুলব না৷ সকাল থেকে পেটে হালকা একটা যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম, আমার একটু একটু জল ভাঙা শুরু হয়েছিল৷ মেইমেই আর অপেক্ষা না করে ডাক্তারবাবুদের খবর দেন৷ আমাদের আবাসনের সামনের বড়ো রাস্তাটার উলটো দিকেই ছিল হাসপাতাল৷ ওরা সবাই চাইছিল আমি স্বাভাবিকভাবে বাচ্চাটার জন্ম দিই৷ কিন্তু সেরকম কোনো লক্ষণ আমার শরীরে তখনও দেখা দেয়নি৷ মেইমেই আমার হাত ধরে বিছানার পাশে বসেছিলেন৷ আমি অবাকভাবে দেখলাম তাঁর ঠোটে হাসি আর চোখে জল৷ এরকম বিপরীত অনুভূতি একসাথে কীভাবে কোনো মানুষের মধ্যে প্রকাশ পায়, তা দেখে সত্যিই অবাক হলাম৷ আমি বাধ্য হয়েই সেদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, মেইমেই, তোমার অতীত তোমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে৷ আমি জানি সেই অতীতে অত্যন্ত ভয়ংকর কিছু লুকিয়ে আছে৷ আমি সেই ভয়ংকর অতীতের কথা জানতে চাই৷
মেইমেই কাঁদতে কাঁদতে বললেন, কী হবে সেই সব ভয়ংকর দিনগুলো রোমন্থন করে?
আমি বললাম, আমার যে খুব জানতে ইচ্ছে করছে, পরে যদি আর না ফিরে আসি, তাহলে যে অজানাই থেকে যাবে!
আমার কথাটা শেষ হবার আগেই মেইমেই বললেন, ছিঃ ছিঃ একথা মুখেও আনতে নেই৷ তোমাকে ফিরে আসতেই হবে সিজা৷
আমি বললাম তাহলে বলো, আমি শুনতে চাই তোমার কথা৷
মেইমেই-এর ছায়া দেওয়ালে এসে পড়ছে৷ আলো-আঁধারি পরিবেশের মাঝে মেইমেই-এর কথা বলার ধরনটা বেশ রহস্যময় মনে হচ্ছে৷
মেইমেই সেদিন যা বলেছিলেন,
আমি আর আমার স্বামী সাং আর আমাদের ছেলে-মেয়ে নানকিং শহরে একটি ডাক্তারখানা চালাতাম৷ আমার স্বামী সাং রেডক্রসের হয়ে কাজ করত৷
আমার আজও মনে আছে সেই দিনের কথা, যেদিন জাপানি সেনারা নানকিং আক্রমণ করে৷ আমার স্বামী আর রেডক্রসের সদস্যরা সারা শহর থেকে আক্রান্তদের নিয়ে আসছিল আমাদের ছোট্ট হাসপাতালে৷ আমি সেদিন আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে কিছু মেয়েকে নিয়ে এসেছিলাম৷ সারাদিন রাত জেগে আমরা মানুষের সেবা করছিলাম৷ দু-দিনের মধ্যে শহরটা পুরো ধ্বংস হয়ে গেল৷ চারদিকে ভাঙা ইমারতের ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠছে, আমাদের হাসপাতালের পক্ষ থেকে আমার স্বামীকে পাঠানো হয় জাপানি সেনার প্রতিনিধির কাছে৷ সারা রাস্তা থমথমে৷ আমার স্বামী হাতে রেডক্রসের পতাকা নিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন, নিজের প্রাণের থেকেও দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ তাঁর কাছে সব থেকে বেশি দামি ছিল৷ যেমন করেই হোক অসহায় মেয়ে আর শিশুগুলোকে রক্ষা করতে হবে৷ থমথমে রাস্তার দুই ধারে ভাঙা ইমারত আর চারপাশে যুদ্ধবিধ্বস্ত মাতৃভূমির ক্ষতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোটা শহর৷ রাস্তায় জাপানি সেনাদের সাথে দেখা হলে মাথা নত করে তাদের সম্মান জানিয়েছেন তিনি, কিন্তু বিদ্রুপ আর হিংসার প্রতিদান নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছিলেন৷ সেদিন জাপানি সেনাপ্রধানের কাছ থেকে সাদা কাগজের ওপর লেখা কিছু প্রতিশ্রুতি নিয়ে যখন তিনি ফিরছেন, সেই সময় আমাদের হাসপাতালের ওপর একদল সেনা আক্রমণ করে৷ তারা প্রতিটি ওয়ার্ডের অসহায় রুগিদের ওপর গুলি চালাতে থাকে, তারপর শুরু হয় মেয়েদের ওপর অত্যাচার৷ রেডক্রসের অন্যান্য পুরুষ সদস্যরা অত্যন্ত অসহায় হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলেন, সেই সময় আমার মেয়েটাকে ওরা ছিঁড়ে খাচ্ছিল৷ আমি অনেকবার ওদের পায়ে পড়ার চেষ্টা করি, কিন্তু ওরা আমাকে লাথি মেরে সরিয়ে দিতেই আমার দশ বছরের ছেলেটা ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ ও নিজের দিদি এবং বাকি মেয়েদের এই হিংস্র পশুগুলোর হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল৷ কিন্তু ওরা আমার চোখের সামনে ছেলেটাকে তুলে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল৷ আমাদের চোখের সামনে আমার ছেলেটার শরীরটা মেঝের ওপর থেঁতলে গেল৷
মেইমেই দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন৷
মিসেস চ্যাং একটু থামলেন৷ তারপর বললেন, এই ভয়ংকর বর্ণনা শোনার পর আমার গর্ভযন্ত্রণা আরও তীব্র হল৷ সেই রাতে আমি একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিলাম৷ আমার দেশ থেকে বহু দূরে এক ভিন দেশে আমার দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আবির্ভাব হল৷ ওকে কোলে নিয়ে আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম৷ তারপর মেইমেই-এর যত্নে আমার পুত্র বড়ো হতে লাগল৷ মেইমেইও যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরে পেলেন৷ কিন্তু নিজের সব কাজের ফাঁকে তিনি আমাকে তাঁর অন্ধকার অতীতের সব ঘটনা জানাতে থাকলেন৷ একদিন রাতে বাচ্চাটা কিছুতেই ঘুমোচ্ছিল না, মেইমেই তাকে কোলে নিয়ে বসে আছেন আর আমি মেইমেইয়ের কোলের কাছে মাথা রেখে শুয়ে ছিলাম৷ তিনি আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, ঈশ্বর আমার ছেলে আর মেয়ে দু-জনকেই ফিরিয়ে দিয়েছে৷ আমিও বলেছিলাম, আমি নিজের মা আর বড়োদিদিকে ফিরে পেয়েছি৷ মেইমেই তোমাকে আমার সব কথা বলেছি, এবার তুমিও আমাকে তোমার সব কথা বলো৷
সেই রাতে আমরা দু-জনে দু-চোখের পাতা এক করতে পারিনি৷ মেইমেই বলেছিলেন একের পর এক হত্যা আর ধর্ষণের পর এক সময় সেনাবাহিনী থেকে আমাদের বলে পাঠানো হয় যে আমরা রেডক্রসের সদস্যরা যেন এই দেশ ছেড়ে চলে যাই৷ সেদিন এই নির্দেশ পাওয়ার পর আমরা স্থানীয় একটি গির্জায় মিলিত হই৷ সেখানে আমরা আমাদের আশ্রিত প্রত্যেকের সামনে ঘোষণা করি যে আমরা নানকিং ছেড়ে চলে যাচ্ছি৷ একথা শুনে সবাই কেমন যেন পাথরে পরিণত হয়েছিল৷ সেনারা জানত যে আমরা চার্চের ভেতর মিলিত হব, তাই আগে থেকেই তারা সেখানে ছিল, আমাদের ঘোষণা শেষ হলে জাপানি সেনারা চারদিক থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়, বন্দুক দিয়ে নিরীহ জনগণের ওপর আঘাত করতে থাকে, তারপর আমাদের সবাইকে রেখে শুধুমাত্র যুবতি মেয়েদের ধরে নিয়ে যায় তারা৷ মেয়েগুলো যাওয়ার সময় আমার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়েছিল৷ শেষবারের মতো একটা আশ্রয় তারা পেতে চেয়েছিল৷ কিন্তু আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়ার সাক্ষী হয়েছিলাম৷ সেদিন বিকেলে আমার স্বামী, আমি, ফাদার হেনরি আর জন দেশে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য যখন নানকিং-এর দ্বারে এসে পৌঁছালাম, তখন জনকে আটকে দেওয়া হল৷ ওরা বলল, শুধুমাত্র তিনজনকে ওরা ছাড়বে৷ জনের বয়স মাত্র ২২ বছর৷ সামনে বিশাল ভবিষ্যৎ পড়ে আছে তার৷ আমার স্বামী বলল, জনকে যেতে দেওয়া হোক, সে থেকে যাবে শহরে৷ আমি আমার স্বামীকে জড়িয়ে ধরে বললাম এই অবিচার কোরো না৷ কিন্তু সে কোনো কথা শুনল না৷ সে বলল, আমার থেকে জনের প্রাণের মূল্য অনেক বেশি৷ ওকে বাঁচতে হবে৷ সেদিন গেটের বাইরে আমাকে ধাক্কা দিয়ে বার করে দিল প্রহরীরা৷ তারকাঁটার ওপর হাত রেখে কয়েক মুহূর্ত আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ তারপর ওরা লাইটপোস্টের সাথে ওকে বাঁধতে লাগল, আমি সেই ভয়ংকর মুহূর্তের অপেক্ষায় সেই দিকে তাকিয়ে থাকলাম, আমার স্বামীর চোখ বাঁধতে গেলে সে বলে তাঁর চোখ বাঁধার দরকার নেই৷ ওর সামনে একজন সেনা বন্দুক তুলে দাঁড়িয়ে ছিল, মৃত্যুর সময়ও কোনো মানুষের চোখে এরকম সাহস থাকে, তা ভাবা যায় না৷ আমার স্বামী মাথা উঁচু করে সেনার দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ তারপর বেশ কয়েকটা গুলির শব্দ৷ আমার চোখের সামনে সব শেষ৷
এখন ঘরের মধ্যে অদ্ভুত নীরবতা৷ টুং টাং করে একটা বেলের শব্দ হচ্ছে৷ ঘরের এককোণে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে৷ সুচেতনা বলল, জনের সাথে যোগাযোগ করতে চাই৷ কী করে করি বলুন৷
মিসেস চ্যাং বললেন জুয়াংকে আমরা ভালোবেসে জন বলতাম৷ ও কিন্তু মেয়ে, মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী জুয়াং, রেডক্রসের হাসপাতালে মানসিক চিকিৎসার কাজ শুরু করেছিল৷ কারণ সেইসময় ডাক্তারের অভাব থাকায় জুয়াংদের মতো মানুষদের নিয়ে কাজ করানো হত৷ মেইমেই-এর মুখে শুনেছিলাম, ওরা যেদিন চার্চে মিলিত হয়েছিল, জন সেদিন হাসপাতালে ছিল, না হলে ওর অবস্থাও বাকি মেয়েদের মতো হত৷ এখন মিচিগানে থাকে৷ আমি ওর ঠিকানা তোমাকে দিয়ে দেবো, তুমি ওর সাথে যোগাযোগ করলে অনেক তথ্য পাবে৷
সুচেতনার চোখ সিঁড়ির শেষ প্রান্তে গিয়ে পড়ল৷ সে দেখল জাপানি মেয়েটা সেখানে গালে হাত দিয়ে বসে আছে৷
