২
স্থান : নিউ ইয়র্ক
একটু আগে একটি মেয়ে দরজাটা খুলে দিয়েছে৷ সাদা দরজার পাশ দিয়ে বেগুনি রং-এর একটা লতানো ফুলের গাছ অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে৷ সাদার সঙ্গে বেগুনি রং মিলেমিশে একটা পজিটিভ এনার্জি দিচ্ছে সুচেতনাকে৷ বাইরে এত আলো, কিন্তু ঘরের ভেতরটা খুব অন্ধকার, ঘরে ঢুকতেই সুচেতনার চোখ পড়ল যে দরজার ডানদিকে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে৷ দেখে মনে হয় জাপানি মেয়ে৷ সে ঝুঁকে তাকে সম্মান জানাচ্ছে৷ সুচেতনা হাত জোড় করে তাকে নমস্কার জানাতেই মেয়েটি আবার ঝুঁকে তাকে সম্মান জানাল৷ ঘরের ভেতর এক ফায়ার প্লেস৷ আগুনের হালকা আলো ঘরটাকে কিছুটা আলোকিত করে রেখেছে৷ একটা লাল দেওয়ালে চিনা ভাষায় কিছু লেখা আছে৷ সেই দেওয়ালের এককোণে সাদা সোফা পাতা৷ সোফার পেছন দিক থেকে একটা সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে৷ মেয়েটি তাকে বসতে দিয়ে ওপরে চলে যাচ্ছে, কাঠের সিঁড়ির খট খট শব্দ ঘরের ভেতর একটা আবহ সংগীতের কাজ করছে৷ সে কিছুক্ষণ মেয়েটির চলে যাওয়া দেখল, দোতলায় যেখানে সিঁড়ি শেষ হয়েছে সেই জায়গাটিও অত্যন্ত অন্ধকার৷ গত দশ বছরে বাড়ির সদস্যদের মতো এ-বাড়িও যে শোকযাপন করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ সুচেতনা তার হাত-মোজা দুটো খুলে ফায়ার প্লেসের সামনে গিয়ে বসল৷ আগুনের দিকে দুটো হাত এগিয়ে দিয়ে যখন যে শরীরে উত্তাপ নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় ডানদিকের ছোট্ট টেবিলের ওপর রাখা লাল জামা পরা একটি সুন্দরী মেয়ের ছবির দিকে তার চোখ গেল৷ মেয়েটির হাতে এক গোছা লাল গোলাপ, প্রাণোচ্ছল হাসিতে মেয়েটির মুখ ঝলমল করছে৷ ছবিটির ফ্রেমের নীচে লেখা আইরিশ চ্যাং৷ যার লেখার বর্ণনা এত ভয়ংকর, সে এত সুন্দরী! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সিঁড়িতে আবার খট খট শব্দ উঠল৷ সুচেতনা উঠে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে দেখল একজন বৃদ্ধা সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন৷
ফায়ার প্লেস থেকে চিড়চিড় করে আগুনের আওয়াজ আসছে, ঘরের আলো-আঁধারির মাঝে মুখোমুখি দুই অসমবয়সি নারী৷ বৃদ্ধা এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছেন আগুনের দিকে৷ সুচেতনা তার রাত জাগা লাল চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, যার কলম এত দৃঢ়, সে কী করে আত্মহত্যা করতে পারে আমি বুঝতে পারছি না৷
কিছুক্ষণ ঘরের ভেতরটা নীরব, দু-জনেই চুপ৷ শুধুমাত্র আগুনের লেলিহান শিখার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে৷ বৃদ্ধা তার মৌনতা ভেঙে বললেন, যারা এই ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে, তারা ভুল বলে৷ আইরিশকে খুন করা হয়েছিল৷ ওর বইটা বেস্ট সেলার হবার পর থেকেই ওর ওপর মানসিক নির্যাতন শুরু হয়৷ হাসিমুখে সব কিছু সহ্য করে নিয়েছিল সে৷ কিন্তু আর পারল না৷ বৃদ্ধা কান্নায় ভেঙে পড়ল৷ সুচেতনার খুব খারাপ লাগছিল, সে একজন সাংবাদিক ছাড়াও যে একজন নারী, তা সে ভোলে কী করে? সে নিজের পেশাগত খোলস থেকে বেরিয়ে বৃদ্ধার পাশে গিয়ে বসে এবং তার হাত দুটো ধরে সান্ত্বনা দিতে থাকে৷ বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, জাপানিরা যে কী ভয়ংকর তা তুমি জানো না৷
বৃদ্ধা কিছুটা শান্ত হলে সুচেতনা তাকে জিজ্ঞাসা করে, আইরিশের জন্ম তো আমেরিকায়, ওর নানকিং সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকারই কথা না, কারণ ইতিহাসের এই অধ্যায়কে এক অদৃশ্য গ্যাস চেম্বারের মধ্যে ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেই অর্থে ছিটেফোঁটা অস্তিত্বও আজ আর বর্তমান নেই৷ তাহলে কীভাবে নানকিং সম্পর্কে এত আকর্ষণ তার মধ্যে তৈরি হল?
বাইরের বাগান থেকে রাজহাঁসের কর্কশ একটা শব্দ এলো৷ ঢোকার মুখে সুচেতনা লক্ষ করেছে সবুজ ঘাসের ওপর একটা ছোট্ট জলাশয় আছে, তার ধারে বেশ কিছু সাদা রাজহাঁস ঘুরছে৷ অন্ধকার পরিবেশে রাজহাঁসের কর্কশ ডাক শুনে চমকে উঠলেন মহিলা৷ তিনি যেন গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে ছিলেন, এক ধাক্কায় বেরিয়ে এসে বললেন, কে বলেছে আর কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট নেই? আছে, আমি নিজে ওকে নানকিং-এর সম্পর্কে সব তথ্য জানিয়েছি৷
— আপনি?
— হুম, আমি, কারণ আমি সেই নারকীয় কাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম৷ ছোটোবেলায় আমাদের ঠাকুমারা আমাদের রূপকথার গল্প শোনাতেন৷ কিন্তু আমাদের কাছে সেই সব রূপকথার চরিত্ররা বীভৎস আকার ধারণ করেছিল৷ আমার কাছে আমার নাতনিকে শোনাবার মতো সেই বীভৎস বর্ণনা ছাড়া আর কিছুই তো ছিল না৷
সুচেতনা বৃদ্ধার দিকে ঝুঁকে বলল, মিসেস চ্যাং, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে দেখুন, আপনি মনে করুন যে আমাকে আপনার নাতনি আইরিশ আপনার কাছে পাঠিয়েছে৷ আমি পুরো ঘটনা জানতে চাই, যা যা সেদিন ঘটেছিল সব কিছু খুলে বলুন৷ বৃদ্ধার লাল চোখে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠল৷ তার দু-চোখ দিয়ে যেন হোয়াং হো আর ইয়াং সিকিয়াং নদী বয়ে যাচ্ছে৷ বৃদ্ধার মুখটা চিন দেশের মানচিত্রে পরিণত হয়েছে৷ ধীরে ধীরে তার দুটি চোখ সবুজ উপত্যকায় পরিণত হল৷ বাইরে উইন্ড বেলের টুং টাং শব্দ আর অন্ধকার ঘরের আলো-আঁধারির সোপান ধরে তারা ধীরে ধীরে পৌঁছে গেল অতীতের এক অজানা অধ্যায়ে৷
— তাই হু সরোবরের ধারে আমাদের ছোট্ট গ্রাম সুচো৷ চারিদিকে পাহাড় বেষ্টিত সবুজ উপত্যকা, আর প্রাচীন মন্দিরের এই শহরটিকে প্রাচ্যের ভেনিস বলা হত৷ সবুজ ধান খেতের ধার দিয়ে যে সরু নদী বয়ে যেত, তার ওপর দিয়ে পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি একটা ছোট্ট সেতু ছিল৷ সন্ধ্যাবেলায় যখন দূরের পাহাড়ের মাঝে সূর্য ডুব দিত, তখন পশ্চিম দিক থেকে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ত সারা গ্রামে৷ মনে হত খাগের কলম দিয়ে বিধাতা এক অসাধারণ কবিতা লিখে চলেছেন৷ ঠিক সেই সময় প্রাচীন সেতুর ওপর দিয়ে গান গাইতে গাইতে কৃষকরা ঘরে ফিরত৷ তাদের মাথায় গোল টুপি, সারা দিনের ক্লান্তিতে তাদের শরীরটা ঝুঁকে যেত৷
‘হাও ই দাও মো লি হুয়া,
হাও ই দাও মো লি হুয়া,
মান ইয়ুয়ান হুয়া কাই জিয়াং য়ে জিং বু গউ টা৷’
ঝিলের জলের ওপর প্রাচীন মন্দিরের ছায়া এসে পড়ত৷ সাদা রাজহাঁসেরা ডাকতে ডাকতে ঘরে ফিরত৷ গ্রামের মেয়েরা সারা দিনের কাজ সেরে ঘরে প্রদীপের আলো জ্বালিয়ে সিল্কের ওপর সুতো দিয়ে নানারকম নকশা তৈরি করত৷ তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠত সেই নকশায়৷ আমাদের গ্রামে দুঃখ বলে কিছু ছিল না৷ আমরা সবাই খুব সুখে ছিলাম৷ কিন্তু সেই দিন যা হল, তা আমাদের সুখের ওপর এক রাক্ষসের ছায়া এসে পড়ল, বলতে পারো৷ দিনটা ছিল ১৯শে নভেম্বর ১৯৩৭৷ আমি আমার জ্যাঠতুতো বোনেদের সঙ্গে বারান্দায় বসে সিল্কের কাপড়ের ওপর সুতোর নকশার কাজ করছিলাম৷ বাবা আর তার দুই ভাই মাঠে কাজে গিয়েছিল৷ আমার মা ঘরের ভেতরে ছোটোভাইটাকে দুধ খাওয়াচ্ছিল৷ জেঠিমারা দুপুরের রান্না এবং বাড়ির অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন৷ একটি কৃষক পরিবারের মহিলাদের পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠের কাজও করতে হত৷
আমাদের গ্রামে সবার বাড়িতেই এই সময় এই এক চিত্র থাকে৷ সেদিন একটা লাল সিল্কের কাপড়ের ওপর কাজ করছিলাম৷ সূর্যের আলো কাপড়ের ওপর প্রতিফলিত হয়ে আমাদের মুখে এসে পড়ছিল৷ সেদিন আমাদের সবার শরীর এবং বারান্দার এক দিক রক্তবর্ণ ধারণ করেছিল৷ বাড়ির রাজহাঁসগুলো গ্রামের খালে চড়তে যায়, তারা ফেরে বিকেলবেলায়৷ কিন্তু সেদিন বেলা এগারোটা নাগাদ গ্রামের হাঁসগুলো তারস্বরে চিৎকার করতে করতে ফিরে এলো৷ ধান খেতের মাঝে বৌদ্ধ মন্দিরে দুম দুম করে বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠল৷ এই দুম দুম শব্দ আমাদের বুকের ভেতরে এক ভয়ংকর ভূমিকম্প তৈরি করল৷ আমরা সবাই নিজেদের কাজ থামিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম৷ দূরে কোথাও বেশ কয়েকবার গুলির শব্দ হল৷ মা আমার ভাইকে কোলে নিয়ে বাইরে ছুটল৷ আমাদের বারান্দা থেকে বাইরের পুরো চত্বরটা খুব ভালো করে দেখা যায়৷ বাড়ির বাইরে মাটির রাস্তা, রাস্তার একধারে ধান খেত৷ রাস্তা আর ধান খেতের মাঝখান দিয়ে একটা সরু নালা বয়ে গেছে৷ সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের কিছু মানুষ সরু নৌকা করে গান গাইতে গাইতে নিজেদের কাজে যায়৷ আমার মা দাঁড়িয়ে ছিলেন একটা গোলাপি ফুলের গাছের নীচে৷ মায়ের পায়ের পাশ দিয়ে গোলাপি ফুল ছড়িয়ে কার্পেটের মতো বিছিয়ে ছিল৷ মনে হচ্ছিল প্রকৃতি শেষবারের জন্য এই দেবীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিচ্ছে৷ আমি দেখলাম মা হাত ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কাকে যেন ডাকছেন৷ কিছুক্ষণের মধ্যে আমার জ্যাঠার ছেলে চাও ছুটতে ছুটতে এসে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে খুব তাড়াতাড়ি কিছু বলে আবার ছুটে পালিয়ে গেল৷ চাউ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা বাড়ির দিকে ছুটে এসে বললেন, দেশে বিদেশিরা আক্রমণ করেছে, গ্রামে ঢোকার মূল ফটকের বাইরে রক্ষীদের সাথে তাদের গুলির লড়াই চলছে, যেকোনো সময় তারা গ্রামে প্রবেশ করবে৷
আমরা সবাই বাড়ির ভেতর ঢুকে যেতেই মা আমাদের কাছে ভাইকে দিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলেন৷ আমরা সবাই জানতাম মা কোথায় গেছিলেন৷ আমাদের মাকে গ্রামের সবাই খুব সম্মানের দৃষ্টিতে দেখত৷ যেকোনো পরামর্শ নিতে হলে গ্রামের মেয়েরা মায়ের কাছে আসত৷ এই গ্রামে মা ছিলেন এক আধুনিক নারীর প্রতীক৷
এখন তো চিন সারা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী এবং আধুনিক দেশ৷ কিন্তু আমার মায়েদের সময় সেখানে এমন কিছু সংস্কার ছিল, যা বর্তমান সময়ে বসে আমরা ভাবতে পারি না৷ আমার দেশে এক সময় মেয়েদের পায়ের আঙুল ভাঁজ করে কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা হত, যাতে সে পুরুষদের মতো স্বাভাবিক চলাফেরা না করতে পারে৷ কিন্তু আমার দিদিমা মায়ের জন্মের পর তার পায়ের আঙুল বেঁধে দেননি৷ তাই মায়ের চলাফেরা অন্য মেয়েদের থেকে একদম আলাদা ছিল৷ মা যখন বিয়ের পর এই গ্রামে আসেন, তার চলাফেরা, ব্যবহার সবাইকে আকৃষ্ট করে৷ আমার মা পড়াশোনা জানতেন, তিনি আজ থেকে ৯০ বছর আগে আমাদের গ্রামের মেয়েদের নিয়ে একটি সান্ধ্য বিদ্যালয় খুলেছিলেন৷
সেদিন কতক্ষণ বাড়ির ভেতরে বন্দি ছিলাম বলতে পারব না৷ সময় যেন বন্যার স্রোতের মতো আমাদের নিয়ে বয়ে চলছিল৷ দিনের বেলায় ঘরের ভেতরটা সেদিন বড্ড বেশি অন্ধকার আর মায়াবী ছিল৷ ছোটোভাইটাও অধৈর্য হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল৷ অন্ধকার ঘরের এক কোনা দিয়ে একটা কাঠের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে৷ ছাদের ফাঁক থেকে বিন্দু বিন্দু সূর্যের আলো সিঁড়ির ওপর এসে পড়ছিল৷ আমি আর অপেক্ষা করতে পারছিলাম না, মনে হল এই সব বিন্দুর মধ্যে নিস্তারের উপায় লুকিয়ে আছে, তাই সেই সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে তিন তলায় উঠে ছাদের ঢাকনাটা খুলে মাথা উঁচু করে দেখি খেতের পশ্চিম দিকে গ্রামে ঢোকার ফটকটা ভেঙে গেছে, সেখান থেকে কালো পিঁপড়ের মতো একদল এগিয়ে আসছে গ্রামের দিকে৷ ধীরে ধীরে এক মারণ রোগের জীবাণু ছেয়ে যেতে লাগল সারা গ্রামে৷ যেদিকে ওরা এগোতে লাগল, সেই দিক থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে আসতে লাগল৷
গ্রামের ফটকটা দাউদাউ করে জ্বলছে, সেখান থেকে একটা কালো ধোঁয়া এগিয়ে আসছে সবুজ খেতের মাঝের প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরটির দিকে৷ প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের ভেতর আর ধান খেত থেকে গুলির শব্দ আসছে৷ আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তার ধার দিয়ে যে নালাটা বইছিল, তার স্রোত হঠাৎ বৃদ্ধি পেল৷ আমি দেখলাম জলের রং লাল হয়ে গেছে, তাতে ভেসে আসছে মানুষের দেহের খণ্ডিত অংশ৷
ওরা তিন দিক থেকে নানকিং আক্রমণ করেছিল৷ আমাদের গ্রামকে আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিল নাকাজিমা কেসাগো৷ এরকম ভয়ংকর মানুষ পৃথিবীতে আর দুটো জন্মায়নি৷
ভদ্রমহিলা একটু থামলেন৷ একটানা কথা বলায় তাঁর বোধ হয় একটু অসুবিধা হচ্ছিল৷ সুচেতনা বলল, ওনার জীবনীকার কিমুরা কুনিওরি নাকাজিমাকে ‘নরখাদকের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন৷
বৃদ্ধা সম্মতি জানিয়ে বললেন, ঠিকই বলেছে৷ এখন বৃদ্ধার দৃষ্টি একদম স্থির৷ তিনি আগুনের দিকে তাকিয়ে আছেন৷ সুচেতনা তাকিয়ে আছে তাঁর চোখের দিকে, চোখ দুটি রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে৷
নিস্তব্ধ ঘরে আগুনের ফুটফাট শব্দ হচ্ছে, বাইরের হাওয়া চলাচল যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে৷ এখন আর উইন্ড বেলের শব্দ কানে আসছে না৷ বৃদ্ধা আবার ধীরে ধীরে বলে চললেন, নাকাজিমা কেসাগো ইয়াংজিং নদীর উত্তর দিক থেকে পশ্চিম দিকের শহর আর গ্রামগুলি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন৷ দূরদূরান্ত থেকে জ্বলন্ত মানুষের আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসছিল৷ এমন ভয়ংকর অত্যাচার এই পৃথিবীতে আর কোনোদিন ঘটেছিল বলে আমার মনে হয় না৷ জাপানি বিমানবাহিনী আকাশপথে বোম ফেলে রেললাইন আর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছিল, এর ফলে স্থানীয় মানুষরা সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে৷
আমি দেখলাম মা আর আমার দুই জেঠিমা ছুটে আসছে আমাদের বাড়ির দিকে৷ আমি ছাদের দরজা বন্ধ করে নীচে এসে দেখলাম মা আর জেঠিমারা ঘরে ঢুকে পাগলের মতো কিছু খুঁজছে৷ সেই সময় কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস আমাদের হয়নি৷ কাঠের সিঁড়ির নীচে অনেকগুলো ধান বোঝাই বস্তা ছিল৷ মায়েরা সেগুলো সরিয়ে মেঝের ওপর কাঠের দুটো কপাট খুলে ফেলে৷ আমরা ছোটোবেলা থেকে দেখে এসেছি এই পাতালঘরে সারা বছরের শস্য জমিয়ে রাখা হত৷ তা দিয়ে এই বিশাল পরিবারের পেট চালানো হত৷
আমার বড়োজেঠিমারা দিদিদের হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে মেঝের ওপর বসিয়ে দেয়৷ ছোটোভাইটা মাকে দেখে খুব কান্নাকাটি করছিল৷ মা ওকে একটা কাপড় দিয়ে নিজের বুকের সাথে বেঁধে নেন, তারপর আমাকেও মেঝের ওপর বসিয়ে দেন৷ এর পরের পরিণতি কী হবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মা আমাদের বোনেদের চুলগুলো কাঁচি দিয়ে কাটতে থাকেন৷ আমাদের বাড়ির মেয়েদের কাছে তাঁদের চুল প্রাণের থেকেও বেশি মূল্যবান, কিন্তু এই ভাবে চুলগুলো কেটে দেওয়ায় আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম৷ চুল কাটা হলে আমাদের ধাক্কা দিয়ে পাতালঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়৷ এই পাতালঘর ছিল আমাদের কাছে এক ভয়ংকর জায়গা৷ ছোটোবেলায় কেউ কোনো অন্যায় করলে বাড়ির বড়োরা বলত এরকম কাজ আর দ্বিতীয় দিন করলে আমাদের পাতালঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে৷ আমরা জানতাম অন্ধকার পাতালঘরে বড়ো বড়ো সব সাপেরা থাকে৷ আমার বড়োদিদি রাতের বেলায় সিঁড়ির নীচ থেকে না কি এই সব সাপেদের আওয়াজ বহুদিন পেয়েছে৷ সেই অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়ার সময় আমি প্রতিবাদী হয়ে উঠি৷ চিৎকার করে জানিয়ে দিই যে আমরা কিছুতেই পাতালঘরে যাব না, কারণ সেখানে সাপ আছে৷
আমার মা ওপর থেকে অন্ধকার ঘরে মাথা ঢুকিয়ে বলেন, আমাদের গ্রামকে হিংস্র সাপেরা আক্রমণ করেছে৷ গ্রামের পুরুষদের ইয়াংজিং নদীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, পুরুষশূন্য এই গ্রামের নারীরা এখন এই সব সাপেদের খাদ্য৷
কথাগুলো কোনোক্রমে শেষ করে মা দরজা বন্ধ করে দেন৷ আমরা বুঝতে পারছিলাম ধান ভর্তি বস্তাগুলো পাতালঘরের দরজার ওপর চাপিয়ে দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে৷
সেদিন অস্তগামী সূর্যের আলো যখন তাই হু সরোবরের ওপর প্রতিফলিত হচ্ছিল, তখন চারিদিক রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল৷ বিদেশি সৈন্যরা গ্রামের পুরুষদের ইয়াংজির নদীর ধারে বসিয়ে রেখেছিল৷ একটা লোহার শেকল দিয়ে সামনের দিকটা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল৷ শেকলের এপার আর ওপারের মধ্যে অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতা বজায় ছিল৷ ইয়াংজিং নদীর জলের এমন স্তব্ধতা এর আগে কোনোদিন দেখা যায়নি৷ মনে হচ্ছিল সময় যেন থমকে গেছে, গ্রামের ছেলেরা নীরবে কারুর প্রতীক্ষা করছিল৷ সবার আগে বসে ছিল বাউজেম আর আমার মেজোজ্যাঠার ছেলে অ্যান৷
বাউজেমদের আমাদের গ্রামে খুব প্রতিপত্তি ছিল৷ ওরা প্রায় দশ পুরুষ ধরে নানকিং-এর বিভিন্ন অঞ্চলে মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দিতেন৷ নানকিং এবং আশেপাশের অঞ্চলের সেনাবাহিনীদের সঙ্গেও ওর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল৷
সেদিন যখন বিদেশি সেনারা আমাদের গ্রামে আক্রমণ করল, বাউজেম আর কয়েকজন সৈনিকরা মিলে আশ্রয় নিয়েছিল ধান খেতের মাঝের প্রাচীন মনেস্ট্রিতে৷ সেখান থেকে তারা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সবাইকে সাবধান করে দিয়েছিল৷ গ্রামের ছেলেরাও সেদিন বাউজেমের কথায় হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল৷ আমাদের দেশের সেনাবাহিনী জানত যে তারা অত্যন্ত দুর্বল৷ তাদের একার পক্ষে বিদেশি সেনাকে প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না৷ তাই হয়তো স্থানীয় যুবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল৷
সুচো গ্রামের প্রাচীন মনেস্ট্রি সেদিন এক দুর্গে পরিণত হয়েছিল৷ গ্রামের আর এক প্রান্তে ছিল সেনাবাহিনীর ক্যাম্প৷ আমার ভাই অ্যানের বয়সি ছেলেদের কাজ ছিল ধানের খেতের ভেতর দিয়ে লুকিয়ে ক্যাম্প থেকে অস্ত্র এনে মনেস্ট্রিতে পৌঁছে দেওয়া৷ বাউজেম এবং তার সঙ্গীরা ধান খেতের ভেতর থেকে গেরিলা পদ্ধতিতে বীরবিক্রমে আক্রমণ চালিয়েছিল৷
জাপানি সেনাবাহিনী প্রথমে একটি ট্যাঙ্ক নিয়ে প্রবেশ করে, তাদের সঙ্গে ছিল কয়েক-শো সেনা৷ দীর্ঘ পথ চলার পরিশ্রমে তারা প্রথমে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল৷ তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং জলও ফুরিয়ে গেছিল৷ গ্রামে ঢোকার মুখে বিমিং আর ইয়াং-এর দুটো দোকান ছিল৷ সেখানে গৃহস্থালির নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সাথে সাথে ওয়াইন, ফল, মাংস, লেমনেড এসবও পাওয়া যেত৷ জাপানি বাহিনীর কিছু সেনা সেই দোকানে ঢুকে ইচ্ছেমতো ওয়াইন খাওয়া শুরু করে দেয়৷ বাকিরা ফল, মাংস, কেক, সিগারেট লুঠ করতে থাকে৷ এর ফলে তাদের মনসংযোগ বেশ কিছুটা নষ্ট হয়ে যায়৷
সুচেতনা, আসলে কী বলো তো, মানুষের প্রাথমিক কিছু চাহিদা থাকে, সাম্রাজ্যবাদ এই সব চাহিদার অনেক পরে স্থান পায়৷ এদের প্রাথমিক চাহিদাগুলো পূরণ হচ্ছিল না বলে এরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল৷ তাদের এই ক্লান্তির সুযোগ নেয় আমাদের গ্রামের যুবকরা৷ তারা ধান খেতের ভেতর থেকে গুলি চালাতে থাকে৷ কয়েক মিনিটের মধ্যে গ্রামের রাস্তা রক্তে ভেসে যায়৷ সেই রক্ত এসে জমা হতে থাকে রাস্তার ধারের সরু নালায়৷
কিন্তু শত্রুবাহিনীর সেনারা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল৷ গ্রামের ফটকের বাইরেও অনেকে অপেক্ষা করছিল৷ এদিকে আমাদের সেনার গুলি প্রায় শেষ৷ তখন আমার ভাই অ্যানেরা খেতের ভেতর দিয়ে লুকিয়ে সেনা ক্যাম্প থেকে ধানের বস্তার মধ্যে গুলি ভরে নিয়ে আসতে থাকে৷ তখন রাস্তার মাঝখানটা থমথমে, শুধু শত্রুবাহিনীর ট্যাঙ্কটা দাঁড়িয়ে আছে৷ চারদিক একেবারে থমথমে৷ রাস্তার এপারের খেত থেকে ওপারের খেতের দিকে একটা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল৷ সেই হাওয়ায় রাস্তার ধুলো উড়ে চারিদিকে এক অস্পষ্ট পরিমণ্ডল তৈরি করেছিল৷ প্রকৃতিও যেন এক গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল৷ সেনার বুটের শব্দ এক রণহুংকার সৃষ্টি করেছিল৷ তারা খেতের ভেতরে ঢুকতে যাবে, এমন সময় জাপানি সেনাদের লক্ষ্য করে ট্যাঙ্কের মুখ থেকে গোলা ছুটতে লাগল৷ আমাদের গ্রামের বাউজেম সবার অলক্ষে কখন যেন শত্রু সেনার ট্যাঙ্কটি দখল করে নিয়েছিল৷ বীরবিক্রমে সে যুদ্ধ করে নিজের সঙ্গীদের রক্ষা করে৷ কিন্তু ওই যে বললাম ওরা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল৷ আমরা আর বেশিক্ষণ নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারলাম না৷
ইয়াংজিং নদীতে সূর্যাস্তের পর যখন প্রকৃতি নীলাভ রূপ ধারণ করেছে, তখন একটি বাঁশি বেজে উঠল আর সামনের চেন খুলে গেল৷ বিদেশি সেনারা আমাদের গ্রামের যুবকদের নির্দেশ দিল যে তাদের নদীর দিকে এগিয়ে যেতে হবে৷ সেদিন কেউ উঠতে ইচ্ছুক ছিল না৷ কারণ পরিণতিটা সকলেরই জানা ছিল৷ মৃত্যুর আগে না কি মানুষের চোখগুলো কালো হয়ে যায়৷ সেদিন আমাদের গ্রামের পুরুষদের চোখগুলো প্রকৃতির নীল রঙের সাথে মিলিয়ে গেছিল৷
বৃদ্ধা আবার কিছুক্ষণ থামলেন৷ বাইরে মনে হয় খুব জোরে হাওয়া দিচ্ছে, কারণ উইন্ড বেলের শব্দগুলো খুব জোরে জোরে কানে আসছে, সেই সাথে রাজহাঁসের কর্কশ শব্দ৷ এ যেন ঝড়ের পূর্বাভাস৷ সুচেতনা বলল, আবহাওয়া বদলাচ্ছে, আজ তুষারপাত হতে পারে৷
বৃদ্ধার কানে যেন কোনো কথাই যাচ্ছিল না৷ তিনি হাত দুটো মুঠো করে চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন৷ কাঠের সিঁড়িতে আবার আওয়াজ উঠল৷ সুচেতনা তাকিয়ে দেখল মেয়েটি ট্রে-তে করে কিছু নিয়ে আসছে৷ সে মেয়েটির দিকে লক্ষ করছে৷ তার চলার মধ্যে অদ্ভুত একটা ছন্দ আছে৷ তাকে এক বিজয়ী জাতির প্রতিনিধির মতো দেখাচ্ছে৷ মেয়েটির মুখে এক স্মিত হাসি, যা মনকে অত্যন্ত বেদনাতুর করে তোলে৷ সে ট্রে-টা সুচেতনার সামনে রেখে তার চোখে চোখ রেখে হাসল, তারপর আবার আওয়াজ তুলে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল৷ মেয়েটির দৃষ্টি সুচেতনার চেতনায় গভীর একটা আঁচড় কেটে দিল৷ ব্যাপারটা প্রথম থেকেই একটু সন্দেহজনক বলে ওর মনে হয়েছিল৷ একটা চিনদেশীয় মানুষের পরিবারে জাপানি কাজের মেয়ে ও৷ মেয়েটি এই বাড়িতেই থাকে বলে মনে হয়৷ কারণ এই সব অঞ্চলে সাধারণত আফ্রিকানরা এসব কাজ করে এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থেকে সব কাজ সেরে আবার চলে যায়৷
সুচেতনা দেখল তার সামনে একটা সাদা কাপে চা রাখা৷ চায়ের ধোঁয়া দিয়ে সুন্দর একটা গন্ধ আসছে৷ এরকম একটা পরিবেশে এই চায়ের জন্যই যেন সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল৷ সে চায়ের পাত্রটি তুলে সবে চুমুক দিয়েছে, এমন সময় বৃদ্ধা বললেন, সেদিন বাউজেম আর অ্যান সবার আগে উঠে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা হয়তো বীরের মতো মৃত্যুবরণ করতে চেয়েছিল৷ তাদের দেখে সাহস পেয়ে গ্রামের অন্য পুরুষরাও উঠে দাঁড়ায়৷ তারা নদীর দিকে চলে গেলে আবার শেকল তুলে দেওয়া হয়৷ কিছুক্ষণ পর এক ঝাঁক গুলির শব্দে গ্রামের আকাশ-বাতাস কেঁপে ওঠে৷ এই ভাবে ধাপে ধাপে গ্রামের সব পুরুষদের হত্যা করে ওরা৷
পুরুষশূন্য সেই গ্রামের নারীদের অবস্থা ছিল আরও ভয়ংকর৷ গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে গণধর্ষণ করে বিদেশি সেনারা৷ আমাদের বাড়িতে সন্ধ্যার দিকে আক্রমণ হয়৷ মায়েরা দরজায় হেলান দিয়ে প্রাণপণে আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন৷ আমার নিজের মনেও বিশ্বাস ছিল যে মা নিজের প্রাণ থাকতে কারুকে এই বাড়িতে প্রবেশ করতে দেবেন না৷ কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাদের কাছে চিনদেশের গ্রাম্য নারীরা অত্যন্ত দুর্বল ছিল৷ ছাদের ঢাকনা ভেঙে পাঁচজন সেনা সিঁড়ি বেয়ে নীচের ঘরে চলে আসে৷ আর বাকি কয়েকজন দরজা আর জানালা ভেঙে ঢুকে পড়ে৷ বাড়ির মহিলাদের তাঁদের মেয়েদের লুকিয়ে রাখার সব চেষ্টা সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল৷ কারণ সেনাদের শস্যের প্রয়োজন ছিল, তারা নারীশরীরের সাথে সব বাড়ি থেকে শস্যও সংগ্রহ করছিল৷ আমাদের বাড়িতে ঢুকেই তাদের নজর পড়ে সিঁড়ির নীচের ধান বোঝাই বস্তাগুলোর দিকে এবং এই গ্রামের সব বাড়িতেই পাতালঘরে সারা বছরের শস্য মজুত থাকে, অন্য সব বাড়ির থেকে তারা পাতালঘরের সন্ধান পেয়ে যায়৷ ওরা যখন ধানের বস্তা সরাচ্ছিল, আমরা তিন বোন ভয়ে কাঁদতে থাকি৷ গ্রামের মেয়ে তো, এত বুদ্ধি আমাদের ছিল না, আমরা বুঝতাম না কোন পরিস্থিতিতে ঠিক কী করা উচিত৷ কারণ এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন কোনোদিন এর আগে আমাদের হতে হয়নি৷ ওরা আমাদের গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে গেছিল৷ তাই ধানের বস্তা সরিয়ে ওরা পাঁচজন পাতালঘর থেকে আমাদের তিন বোনকে অত্যন্ত ঘৃণ্যভাবে বাইরে নিয়ে আসে৷ আমরা পুরুষ বলতে বুঝতাম বাবা আর দাদাদের৷ তাঁরা আমাদের চোখে অত্যন্ত সম্মানের ছিলেন৷ কিন্তু কোনো পুরুষমানুষ যে এত ভয়ংকর হতে পারে, সেদিন তা প্রথম অনুভব করেছিলাম৷ আমি বাইরে এসে দেখলাম, মা ভাইকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে দেওয়ালের এককোণে দাঁড়িয়ে আছেন, মায়ের চোখে তীব্র এক ঘৃণা৷ কিন্তু ওরা কোনো কথা শুনতে বাধ্য ছিল না, কারণ আমাদের দেশ ওদের হাতে আক্রান্ত, আমার মায়ের কোল থেকে ছোটোভাইকে নিয়ে দেওয়ালে ছুড়ে মারা হয়৷ তারপর আর একজন সেনা এসে ভাইয়ের বুকের ওপর পাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে আমাদের দিকে৷ আমাদের চোখের সামনে মা-জেঠিমাদের আর তাঁদের চোখের সামনে ওরা আমাদের ধর্ষণ করতে থাকে৷ আমাদের ওপর যখন অত্যাচার চলছিল, আমি তাকিয়ে ছিলাম মায়ের দিকে, মা আমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ আমরা অপেক্ষা করছিলাম কতক্ষণে সব কিছু শেষ হবে৷ একের পর এক প্রায় কুড়িজনের হিংস্র থাবায় যখন আমি ক্ষতবিক্ষত, তখন জানতে পারলাম আমাদের সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সেদিন আমার দুই জেঠিমার মৃত্যু হয়েছিল, মায়ের শরীরে প্রাণ তখনও ছিল৷ মা কোনোক্রমে দুই হাত আর পায়ে ভর দিয়ে ছোটোভাইয়ের দিকে এগিয়ে এসে তাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করে৷ ভাইয়ের শরীরটা মায়ের স্পর্শে কেমন যেন কেঁপে উঠেছিল৷ আমার সারা শরীর যন্ত্রণায় অবশ হয়ে গিয়েছিল, আমার দুই দিদি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল৷ আমি ওদের বুকের ওঠা-নামা দেখে বুঝতে পারছিলাম যে ওরা জীবিত ছিল৷ দু-জন সেনা দুই দিকে দাঁড়িয়ে দিদিদের মুখে পেচ্ছাপ করে দিলে ওদের জ্ঞান ফিরে আসে৷ আমাদের ওরা টেনে-হিঁচড়ে যখন বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, তখন আমার মাকে বসে থাকতে দেখে একজন সেনা বন্দুক দিয়ে মায়ের মাথায় বেশ কয়েকবার আঘাত করতে করতে মাথাটা পুরো থেঁতলে দেয়৷ আর ভাইটার বুকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হৃদযন্ত্রটা টেনে বের করে আনে৷ আমি তাকিয়ে ছিলাম ভাইয়ের ছোট্টো হৃদয়ের দিকে৷ কিন্তু ওরা আমাদের মায়ের ঘিলুর ওপর দিয়ে হিঁচড়ে নিয়ে চলে যায়৷
গ্রামের প্রাচীন মনেস্ট্রিগুলোকে ওরা রেপ ক্যাম্পে পরিণত করে৷ গ্রামের কয়েক শত মেয়ের স্থান হয় সেই সব ক্যাম্পে৷ পরে জেনেছিলাম গ্রামের জনসংখ্যা ছিল তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার, যা এক সপ্তাহ পর এসে দাঁড়িয়ে ছিল পাঁচশোতে৷
সুচেতনা ঘড়ির দিকে তাকাল৷ সন্ধ্যে ছ-টা বাজে৷ আবহাওয়া ভালো না৷ আজ আর অপেক্ষা করা সম্ভব না৷ সে রেকর্ডারটা বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে বলল, আজ উঠি৷ কিন্তু সাক্ষাৎকার এখানেই শেষ হচ্ছে না৷ আমি আর একদিন আসব৷ বৃদ্ধা অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছেন সুচেতনার দিকে৷ এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে যেন এক গভীর আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন মেয়েটির মধ্যে৷ জাপানি মেয়েটি যেন আড়ালে দাঁড়িয়ে তাঁদের গতিবিধির ওপর নজরদারি করছিল৷ সে দোতলার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আবার সিঁড়িতে আওয়াজ তুলে নেমে আসতে থাকে৷ সুচেতনা বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করে, ও কি সব সময় এই বাড়িতে থাকে?
বৃদ্ধা সম্মতি জানিয়ে বলল, হুম, ওর তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই৷ তাই এখানেই থাকে৷ সুচেতনার মনে আবার একটা জিজ্ঞাসার জন্ম হল, কেন কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই? তাঁর দুই ভুরুর মাঝে কতগুলো রেখা জেগে উঠল৷ মেয়েটি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে, বাইরে থেকে উইন্ড বেলের টুং টাং শব্দ আর তুষার শীতল বাতাস ঘরে এসে ঢুকছে৷ সে বেরিয়ে যেতেই বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়৷ সুচেতনা রাস্তার দিকে এগিয়ে যেতে পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে দেখল বাড়িটির দিকে, ওর মনে হল একতলার কাচের জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ এ দৃষ্টি সুচেতনার চেতনায় আরও বেশ কিছু আঁচড় কেটে দিল৷ সে তাড়াতাড়ি পথ চলতে লাগল৷
