১৯৩৭ নানকিং – ৯

স্থান : আমেরিকা

সুচেতনা নিউইয়র্কে ফিরে এসেছে৷ ওদের ভিসার ব্যবস্থা এবং বিমানের টিকিট সব তৈরি হয়ে গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসের দশ তারিখে ওরা নানকিং যাচ্ছে৷ সেখানে গিয়ে প্রথম কয়েকদিন কয়েকজনের সাথে দেখা করা এবং স্থানীয় জায়গাগুলো খুব ভালোভাবে দেখতে হবে৷ এখন এই কয়েকদিন সে কোথাও যাবে না৷ সারা দিন বাড়িতে বসে নিজের সাথে কথা বলবে সে৷ কয়েকদিন বরফ পড়া বন্ধ আছে৷ নিউ ইয়র্ক শহরের থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে একটি ছোট্ট গ্রামে সে আছে৷ আশেপাশের প্রকৃতিটা বড্ড বেশি ফাঁকা৷ খোলা প্রকৃতির মাঝে পাতাহীন গাছগুলোকে দেখে খুব মায়া হচ্ছে তার৷ শীতের ভয়ংকর তাণ্ডবে সব শেষ করে দিয়ে গেছে৷ এই গ্রামে এর আগেও বহুবার সে এসেছে, তখন সারা প্রকৃতিটা রং-বেরং-এর পাতায় ঢেকে থাকে, কিন্তু এর এরকম পরিণতি দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে তার৷ ছোটোবেলার বহু স্মৃতি তার মনে পড়ে যাচ্ছে৷ সুচেতনার দাদামশাই একসময় ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে মেজর পোস্টে৷ অবসর নেওয়ার পর তার কাজ ছিল পরিবারের সদস্যদের কাছে যুদ্ধের বর্ণনা শোনানো৷ গরমের ছুটিতে একমাস সুচেতনা আর তার মা মামার বাড়িতে থাকত৷ সেখানে মাঝরাত পর্যন্ত বাংলাদেশ যুদ্ধের গল্প চলত৷

আজ এই প্রকৃতির প্রতিটি কোনায় সে বাংলাদেশ যুদ্ধের বিভীষিকাকে অনুভব করছে৷ প্রতিটি গাছ যেন এক-একজন বীরাঙ্গনার রূপে নিজেদের জীবন বৃত্তান্ত বলে চলেছে৷ সুচেতনার জানালার সামনে দিয়ে একটা পথ চলে গেছে কিছুটা দূরে একটি ছোটো জলাশয়ের ধারে৷ সেখানে একটি ছোট্ট বাড়ি সে দেখতে পাচ্ছে৷ সেই বাড়ির ধারে এক বিশাল গাছ৷ সেই গাছটি জানাল তার নাম ফতেমা৷ সুচেতনার চেতনা এই আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে সেই বাড়িটার ভেতরে ঢুকে এককোণে গিয়ে বসল৷ ঘরের ভেতরে একটা তেলের পলতে টিমটিম করে জ্বলছে, আর একটু পর সেটাও নিভে গিয়ে সারা ঘরে নেমে আসবে নিস্তব্ধ অন্ধকার৷ সুচেতনা ফতেমার চেতনাকে অনুভব করতে পারছে৷ বহু বছর আগে তার দাদামশাইয়ের মুখে এই ফতেমার গল্প শুনেছিল সে৷ কিন্তু আজ তার সমগ্র সত্ত্বা এবং অনুভূতিকে সে অনুভব করতে পারছে৷ এই অন্ধকার বড়ো প্রিয় ফতেমার৷

সারাজীবনের বিক্ষিপ্ততার অবসানে নিজের ঘরে ফিরে আসে চেতনা৷ আত্মপোলব্ধির এই মুহূর্তে অতীতের ফেলে আসা বীভৎসতা বার বার উঁকি মেরে যায় চুপিসারে৷ ফতেমা চুপিসারে শীতল পাটি পেতে দিয়ে তাকে বসায় সামনে, তারপর বাড়ির বাইরের গাছটা থেকে বেরিয়ে আসে কাঁটা-ছেঁড়া বীভৎস সেই লাশ, দুর্গন্ধে ভরে যায় সারাটা ঘর৷ ফতেমা আর তার অতীত নিশ্চিন্তে বসে কাঁটা-ছেঁড়া করে সেই বীভৎস অতীত৷ আজ সুচেতনা আর ফতেমা মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গেছে৷ মৃত অতীতের চোখ দুটো তখন জীবিত, বেদনার্ত দুটি চোখ অনেক না-বলা কথা বলে দেয়, ঘরের দরজা, জানালা, ইট, কাঠ, পাথর সাক্ষী হয়ে থাকে তার সেই বীভৎস অতীত দর্শন করে৷ অনেকটা যেন টাইম মেশিনের মতো৷ ফতেমা যেন টাইম মেশিনে করে তার সেই ঘোরের টানে পৌঁছে যায় ৪৫ বছর আগের সেই রাতে৷ ঘরের নিভে যাওয়া পলতেতে আগুন জ্বলে ওঠে৷ ফতেমা বসে আছে খাটের ওপর, কোলে এক মাসের ছেলে আতাউর৷ আব্বু পাশের ঘরে বসে তামাক টানছে, আম্মি আর পাড়ার চাচিদের সাথে ছেলে কোলে ফতিমা গল্প করছে৷ সবাই নতুন মাকে সন্তান পালনের নানা রকম ব্যাপারে পরামর্শ দিচ্ছে, ফতিমা লাজুক মুখে শুনছে৷ আজ আতাউরের আব্বুর আসার কথা, তাই লাল রঙের জংলি ছাপার একটা শাড়ি পরেছে ও, হাতে লাল কাচের চুড়ি৷ আতাউরের আব্বুর প্রিয় রং লাল, তা ছাড়া ছেলে হবার এক মাস পর আজ একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হবার সুযোগ পেয়েছে ও৷ ফতেমা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে একবার দেখল, ফর্সা সুন্দর হাতগুলোতে একটু মেহেন্দির রং পরলে আরও ভালো লাগত৷ ছোটোভাইটা গালে হাত দিয়ে মাটির মেঝেতে বসে সবার কথা শুনছে আর বোকার মতন হাসছে৷ ফতেমা জানে ভাই কিছু বোঝে না, মাথায় বেড়েছে, কিন্তু বুদ্ধিতে এখনও সে পাঁচ বছরের শিশু, যে মা আর দিদির আঁচল ধরে সারা দিন থাকতে ভালোবাসে৷ সবার সাথে হাসিমুখে কথা বললেও, আজ ফতেমার মন বড়ো আনচান করছে৷ বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, বাড়ির পেছন দিক দিয়ে খরস্রোতে বয়ে চলেছে ঘাসিয়াখালী নদী৷ একটা ভয়ংকর শব্দ হতেই বেড়ার ফাঁক দিয়ে আলো এসে ঢুকল ঘরে, মনে হয় নদীর বুকে বাজ পড়ল৷ চাচিরা গল্পে ব্যস্ত, পিরোজপুরের মানুষজন এখানকার প্রকৃতির সাথে যেন মিলেমিশে আছে, কোনোরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগকে এরা ভয় পায় না, ফতেমার ছেলে যেন এই গ্রামের সবার নাতি, তাকে ভালো রাখার তাগিদে ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করেও এরা বসে আছে৷ পাশের ঘর থেকে আব্বুর তামাক টানার গড়গড় শব্দ কানে আসছে৷ ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে সবাই একটা গাড়ির শব্দ পেল৷ এ শব্দ কারুর অজানা না, সেই শব্দ বুকের ভেতরের সব অনুভূতিকে নিমেষের মধ্যে খতম করে দেয়৷ পাশের বাড়ির রাবেয়াচাচি দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে কী যেন দেখল, তার মেয়ে ঝুমুর কী যেন বলছিল৷ ঝুমুরের কথা শেষ হবার আগেই রাবেয়া তার মেয়ের হাত ধরে একটা ঝটকা মেরে তুলল, তারপর নিজের সারা শরীরের শক্তি দিয়ে ঝুমুরকে ঘর থেকে টেনে বার করে নিয়ে বেরিয়ে গেল৷ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুটের শব্দ কানে এলো, শব্দটা খুব তাড়াতাড়ি ঘরের দিকে আসতে লাগল, ছোটোভাইটা এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে দরজাটা বন্ধ করে তার ওপর নিজের পিঠের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ ফতেমার মনে হল এই অল্প সময়ের মধ্যে তার ভাইটা যেন অনেক বড়ো হয়ে গেল৷ ভাই ফতেমার দিকে তাকিয়ে আছে, পাশের ঘর থেকে আব্বুর আর্তনাদ কানে এলো, একটা ভারী কিছু ভাঙার শব্দ কানে এলো, আর সঙ্গে সঙ্গে তামাকের গন্ধ বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরময় ভরে গেল৷ আব্বুর আর্তনাদ কিছুক্ষণের মধ্যে থেমে যেতেই আমি ফতেমার দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার আম্মি মূর্ছা গিয়ে মেঝের ওপর পড়ে আছে৷ ভাইটা তখনও টিনের দরজাটায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ আমার চোখের সামনে ভাইটা মেঝের মধ্যে পড়ে গেল, দরজায় একের পর এক বেয়োনেটের খোঁচা এসে পড়তে থাকল, সব যেন স্বপ্নের মতন মনে হচ্ছিল৷ আমার কোলে আমার একমাসের ছেলেটা কেঁদে উঠল, আল্লার কাছে আতাউরের আব্বুর জন্য দুয়া করতে থাকলাম, লাল কাচের চুড়িগুলো প্রদীপের আলোতে তখনও ঝলমল করছে, এমন সময় দরজা খুলে গেল৷ ৭ জন খান সেনা আমাদের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে৷ প্রদীপের আলো-আঁধারিতে মনে হল সাতটা শুয়োর দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে৷ আমি গুঙিয়ে কেঁদে উঠি৷ আতাউরকে বুকে চেপে রাখি, বাজান আমার, আমার সোনা মানিক, তোরে কিস্যু হতে দিমু না, কিস্যু না ওদের কাছে বিন্তি করি তুমরা যা করার কর, কিন্তু আমার আতাউররে ছাইড়া দাও৷ হায় আল্লা, এ কী নির্দয়, এ কী অবিচার, আমার আতাউরকে আমার নিকট থেকে জোর করে ছিনিয়ে নেয় একজন, আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে, আমার মাথার ভেতর রক্ত উঠে জ্বালা দিতে থাকে, তারপর আমার চোখের সামনে আমার ছেলেকে মাটির সাথে আছাড় দিয়ে হত্যা করে৷ প্রদীপের আলো নিভে যায় ঘরে, ওরা নিজেদের মধ্যে কীসব কথা বলতে থাকে৷ আমি বাঙালি, ওদের কথা বোঝার মতন ক্ষমতা ছিল না আমার৷ তারপর আমাকে এক-এক করে ৭ জন পাক সেনা পাশবিক অত্যাচার করে৷ প্রায় ২/৩ ঘণ্টা আমার ওপর পাশবিক অত্যাচার করার পর কিছুক্ষণ হয়তো জ্ঞান হারিয়েছিল আমার৷ সচেতন হয়ে উঠে বসতেই বুঝলাম এটা থানা, সামনে বসা আর্মি অফিসার৷ স্বাধীন হবার পর আর তাঁদের খোঁজ-খবর পাওয়া যায়নি৷ একই দিনে ওই গ্রামের প্রায় ১০/১২ জন মহিলার ওপর পাশবিক অত্যাচার করে এবং প্রায় ৭ জন মহিলাকে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়৷ বেশ কিছুদিন চিকিৎসা হবার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি৷ অফিসারটি পরম সোহাগে আমাকে নিয়ে জিপে উঠল৷ কিছু দূর যাবার পর সে গল্প জুড়ল, অর্থাৎ কৃতিত্বের কথা আমাকে শোনাতে লাগল৷ আমার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না৷ হঠাৎ ওই চলন্ত জিপ থেকে আমি লাফ দিলাম৷ ড্রাইভিং সিটে ছিল অফিসার, আমি পেছনে, পেছনে দু-জন জওয়ান৷ আমার সম্ভবত হিতাহিত জ্ঞান রহিত হয়ে গিয়েছিল৷ যখন জ্ঞান হল দেখি মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, আমি হাসপাতালের বিছানায়৷ ছোট্ট হাসপাতাল৷ যত্নই পেলাম, সব পুরুষ৷ একজন গ্রামের মেয়েকে ধরে এনেছে আমার নেহাত প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য৷ মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে৷ সন্ধ্যায় অফিসারটি চলে গেল৷ যাবার সময় আমাকে হানি, ডার্লিং ইত্যাদি বলে খোদা হাফেজ জানালো৷ দিন তিনেক শুয়ে থাকার পর উঠে বসলাম৷ সুস্থ হয়েছি এবার৷ হিন্দুদের ভেতর সংস্কার আছে পাঁঠা বা মহিষের খুঁত থাকলে তাকে দেবতার সামনে বলি দেওয়া যায় না৷ আমি এখন বলির উপযোগী৷ একদিন আমার ওপর পাশবিক নির্যাতন করে একজন বাঙালি৷ আমি বিস্ময়ে বোবা হয়ে গিয়েছিলাম৷ অসুস্থ দেহ, দুর্বল, যুদ্ধ করতে পারলাম না৷ লালাসিক্ত পশুর শিকার হলাম৷ ওই রাতে কতজন আমার ওপর অত্যাচার করেছিল বলতে পারব না, তবে ছ-সাত জনের মতো হবে৷ সকালে অফিসারটি এসে আমাকে ওই অবস্থায় দেখল, তারপর চরম উত্তেজনা, কিছু মারধরও হল৷ তারপর আমাকে তার জিপে তুলে নিল, আমি তৃতীয় গন্তব্যে পৌঁছোলাম৷ এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুকে আমি একমাত্র পরিত্রাণের উপায় বলে ভাবতে লাগলাম৷ ভাবতে ভাবতেই এক সময় এলো নতুন চিন্তা, হ্যাঁ মৃত্যুই যদি বরণ করতে হয় ওদেরই বা রেহাই দেবো কেন? আমি কৌশলের আশ্রয় নিলাম এবার৷ এখন আর অবাধ্য মেয়ে নয়, দস্তুরমতো খানদের খুশি করতে শুরু করলাম, ওদের আস্থা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগলাম৷ বেশিদিন লাগল না, অল্প ক-দিনেই নারীলোলুপ সেনারা আমার প্রতি দারুণ আকর্ষণ অনুভব করল৷ আর সেই সুযোগে আমি ওদের কাছ থেকে জেনে নিতে শুরু করলাম পাক বাহিনীর সব গোপন তথ্য৷ এক পর্যায়ে বিশ্বাসভাজন ফতেমাকে ওরা নিজেদের ঘরেও যেতে দিত৷ আর কোনো বাধা নেই৷ আমি, ফতেমা এখন নিয়মিত সামরিক ক্যাম্পে যাই আবার ফিরে আসি নিজ গ্রামে৷ এর মধ্যে আমি আমার মূল লক্ষ্য অর্জনের পথেও এগিয়ে গেলাম অনেকখানি৷ গোপনে মুক্তিবাহিনীর সাথে গড়ে তুললাম ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ৷ এরপরই এলো আসল সুযোগ৷ জুন মাসের একদিন আমি খান সেনাদের নিমন্ত্রণ করলাম আমার নিজের গ্রামে৷ এদিকে মুক্তিবাহিনীকেও তৈরি রাখা হল যথারীতি৷ ৪৫ জন খান সেনা সেদিন হাসতে হাসতে বাঘমারা কদমতলা এসেছিল, কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ৪/৫ জন ক্যাম্পে ফিরতে পেরেছে বুলেটের ক্ষত নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে৷ বাকিরা আমার গ্রামেই শিয়াল-কুকুর-শকুনের খোরাক হয়েছিল৷ এরপর আমি আর ওদের ক্যাম্পে যাইনি৷ ওরা বুঝেছে এটা ফতেমার কীর্তি৷ কীর্তিমানরা তাই হুকুম দিল জীবিত অথবা মৃত ফতেমাকে ধরিয়ে দিতে পারল তাকে নগদ এক হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে৷ কিন্তু আমি তখনও জানতাম না আমার জন্য আরও দুঃসহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে৷ একদিন রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লাম আমি৷ আমাকে নিয়ে এলো পিরোজপুর সামরিক ক্যাম্পে৷ খান সেনারা এবার আমার ওপর হিংস্রতার পরীক্ষার আয়োজন করল৷ এক হাটবারে আমাকে শহরের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হল জনবহুল চৌমাথায়৷ সেখানে প্রকাশ্যে আমার অঙ্গাবরণ খুলে ফেলল কয়েকজন খান সেনা৷ তারপর দু-গাছি দড়ি আমার দু-পায়ে বেঁধে একটি জিপে বেঁধে জ্যান্ত শহরের রাস্তায় টেনে বেড়ালো ওরা মহা উৎসবে৷ ঘণ্টা খানিক রাজপথ পরিক্রমায় পর আবার যখন ফিরে এলো সেই চৌমাথায়, তখনও আমার দেহে প্রাণের স্পন্দন রয়েছে৷ এবার তারা দুটি পা দুটি আলাদা জিপের সাথে বেঁধে নিল এবং জিপ দুটিকে চালিয়ে দিল বিপরীত দিকে৷ আমার শরীর দু-ভাগ হয়ে গেল৷ উফফ সেই ভয়ংকর যন্ত্রণার কথা তোমাদের বলা ঠিক হবে না৷ সেই দু-ভাগে দুটি জিপে আবার শহর পরিক্রমা শেষ করে জল্লাদ খানরা আবার ফিরে এলো সেই চৌমাথায় এবং সেখানেই ফেলে রেখে গেল আমার বিকৃত মাংসগুলো৷ একদিন-দু-দিন করে মাংসগুলো ওই রাস্তার মাটির সাথেই একাকার হয়ে গেল এক সময়৷ বাংলামায়ের মেয়ে আমি ফতেমা এমনিভাবেই আবার মিশে গেলাম বাংলার ধূলিকণার সাথে৷ আমার পরিচয় জানতে চাও? আমি প্রকৃতপক্ষে একজন বীরাঙ্গনা; শুধু দেহে নয়, মনে, মননে, হৃদয়ে৷ হাসছ তো? বীরাঙ্গনার আবার অন্তর, তার আবার মনন? কিন্তু এদেশের মায়ের সন্তান যারা ছিল তারা হয় শহিদ, নয়তো গাজি৷ যুদ্ধকালে যারা খেয়ে-পরে সুখে ছিলেন তাঁদের আমি ঘৃণা করি, আজ এই এতগুলো বছর পরও থুথু ছিটিয়ে দিই তাদের মুখে, সর্বদেহে৷ একজন বীরাঙ্গনার এত অহংকার কীসের? আমি তো বীরাঙ্গনাই ছিলাম৷ তোমাদের সমাজ বানাতে চেয়েছে বারাঙ্গনা৷ তাইতো তোমরাও আমার কাছে কাপুরুষ, লোভী, ক্লীব, ঘৃণিত এবং অপদার্থ জীব৷ আমি আজও বীরাঙ্গনা, আজও আমি তোমাদের করুণা করবার অধিকার রাখি৷ কারণ আমার রক্তাক্ত শরীর এখনও পড়ে আছে শীতল পাটির ওপর, যার ওপর গজিয়ে উঠেছে স্বাধীন দেশ, যা ডালপালা বিস্তার করে সারা বিশ্বকে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে, কিন্তু আমি এখনও অশরীরী আত্মার মতন জেগে আছি, ৭১-র এর সেই লাশ আগলে৷

সুচেতনার চেতনা আবার ফিরে আসে তাঁর ঘরে জানালার ভেতরে৷ সত্যিই তো ফতেমাদের যন্ত্রণার খবর কেউ রাখে না৷ এখানে বাংলাদেশের ফতেমা আর নানকিং-এর হুনা এদের সবার গল্পই তো এক৷ কিন্তু পাকিস্তানের পরাজয়ের পর ভারতীয় সেনারা তাদের ওপর কোনো অত্যাচারই করেনি, দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবন্দিদের জামাই আদরে খাইয়ে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল৷ ভারতের সেনাপ্রধান নিজে গিয়ে তাদের খবর নিতেন বলে দাদামশাই তাদের জানিয়েছিলেন৷ কিন্তু ভারতের বন্দি সেনাদের পাকিস্তান মুক্তি দেয়নি৷ তাদের সাথে কী হয়েছিল তার কোনো খবরই আমাদের কাছে নেই৷ কিন্তু জাপান কি কোনোভাবে এই উদারতা নানকিং-এর ওপর দেখাতে পারত না? জাপান তো ভগবান বুদ্ধের অহিংসার বাণী দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি দেশ৷ কিন্তু সে কেন এরকম নির্মমতা দেখিয়েছিল!

উফফ, মাথার ভেতরটা কীরকম যেন টনটন করে উঠল৷ আর সত্যিই নেওয়া যাচ্ছে না৷ এমন সময় টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা টিকটিক করে বেজে উঠল৷ সুচেতনা মোবাইলটা হাতে তুলে দেখল একটা নোটিফিকেশন এসেছে, পেজটা খুলে সে দেখল দু-জন জাপানি বৃদ্ধের ঝুলন্ত মৃতদেহ, নীচে লেখা আছে প্রাক্তন জাপানি সেনা অফিসার আকারা আর তাঁর সাংবাদিক বন্ধু এইচো টোকিয়োতে আকারার বাসভবনে আত্মহত্যা করেছেন৷

সুচেতনার হাত থেকে মোবাইলটা নীচে পড়ে গেল৷ এ কী করে সম্ভব! যাঁরা ইউটিউবে ভিডিয়ো তৈরি করে নানকিং-এর ভয়ংকর বিবরণ দিয়ে চলেছিলেন, তাঁদের পক্ষে আত্মহত্যা করা সম্ভব না৷ কিছুতেই না৷ তাহলে কি এই দুই বৃদ্ধকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বলি হতে হল!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *