৮
স্থান : সিংলি
বিমিং-এর পাশের গ্রামের নাম সিংলি৷ সবুজ পার্বত্য অঞ্চলের মাঝে ছোট্ট এই গ্রামটি প্রায় জনহীন বললেই চলে৷ দূরে দূরে পাহাড়ের গায়ে ছোটো ছোটো দু-একটা ঘর আর সবুজের সমাহারের মাঝে এই গ্রামটিকে একমাত্র স্বর্গের সাথেই তুলনা করা যায়৷ বহু বছর আগে জাপানি সেনারা এই গ্রামে আক্রমণ চালিয়েছিল, এই আক্রমণের পর এই গ্রামের কয়েক-শো মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল৷ এই আক্রমণের আগে সিংলি একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল৷ জাপানি সেনারা এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল৷ এখনও এই ঘটনার স্মৃতি-সৌধ পাহাড়ের ওপর আছে, সেই সাথে একটি লাইব্রেরি এবং মিউজিয়াম আছে৷ বিমিং-এর দাদুর মতো বহু মানুষ সেই সময় খাতার মধ্যে এই ঘটনা লিখে রেখেছিলেন৷ ছাপানোর ক্ষমতা তো সেই অর্থে তাদের ছিল না, তাই এই সব খাতাগুলোকে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন একটি লাইব্রেরি বানিয়ে রেখে দিয়েছে৷ দূরদূরান্ত থেকে মাঝে মাঝে দু-একজনের আগমন হয় এই গ্রামে, তারা এই সব খাতা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ফিরে যায়৷ আজ বিমিং এসেছে সেই গ্রামে৷ একজন লাইব্রেরিয়ান বসে আছেন, বিমিংকে দেখে তিনি একটি খাতা এগিয়ে দিলেন৷ বিমিং সেখানে নিজের নাম লিখে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে গেল৷ লাইব্রেরি বলতে একটি দেওয়ালজুড়ে বেশ কিছু খাতা রাখা আছে৷ বিমিং ডানদিক থেকে প্রথম খাতাটা তুলে নিয়ে সামনে রাখা চেয়ারটা টেনে বসে তা পড়া শুরু করল৷
খাতাটা কোনো ছেলে না মেয়ের কিছু বোঝা যাচ্ছে না, কোনো তারিখও দেওয়া নেই৷ হুট করেই লেখাটা আরম্ভ হয়েছে৷ এখানে লেখক তাঁর নিজের ঠাকুমার কথা লিখেছেন, তিনি লিখেছেন,
‘আমার মা তখন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা৷ সকাল থেকেই মায়ের শরীরটা ভালো ছিল না৷ পেটের যন্ত্রণায় মা ছটফট করছিল৷ বাবা গ্রামীণ হাসপাতালে ডাক্তারকে ডাকতে গেছিলেন৷ বাড়ির দরজাটা খোলাই ছিল৷ আমাদের গ্রামের সবার বাড়ির দরজা সবসময় খোলাই থাকে, কারণ এ-গ্রামে কারুর কোনো অভাব তো নেই, তাই চুরির প্রশ্নও নেই৷ আমি ঘরের এককোণে বড়োঠাকুমার সাথে বসে ছিলাম৷ ঠাকুমা বসে নিজের মনে বুদ্ধের নাম জপ করেছিলেন৷ এমন সময় তিনজন সেনা আমাদের বাড়িতে ঢুকে যায়৷ এদের মধ্যে দু-জন ওপর তলায় মায়ের ঘরে চলে যায়৷
আমার আশি বছরের বৃদ্ধা বড়োঠাকুমার সামনে সেনাটি নিজের প্যান্টের চেন খুলে গোপন অঙ্গ এগিয়ে দিয়ে সেটাকে মুখ দিয়ে পরিষ্কার করতে বলল৷ কিন্তু আমার বড়োঠাকুমা তাকে অত্যন্ত স্নেহের সাথে বলেছিলেন, তুমি আমার নাতির থেকেও ছোটো, এসব তোমার মুখে মানায় না৷ কিন্তু সেনাটি তাঁর মুখের মধ্যে লাথি মেরে তাকে মেঝের ওপর ফেলে দেয়৷ বড়োঠাকুমার মাথার পেছন দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে৷ সেনাটি বড়োঠাকুমার ওপর ঝাঁপিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করে৷ এই অত্যাচার তিনি নিতে পারেননি, অত্যাচার করার সময়ই তাঁর মৃত্যু হয়৷ আমার বয়স তখন মাত্র আট বছর৷ আমি ভয়ে ঘরের এককোণে বসে কাঁদছিলাম৷ সেই সময় আর একজন সেনা আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল৷ সে আমার গলার আওয়াজ শুনে ভেতরে চলে আসে৷ তখনও আমার ঠাকুমার ওপর অত্যাচার চলছিল৷ সেই সেনাটি বাড়িতে ঢুকেই আমার ওপর অত্যাচার শুরু করে৷ আমি উন্মাদের মতো চিৎকার করছিলাম৷ সেই সেনা বেয়োনেট দিয়ে আমার যোনিদ্বারটা কেটে অনেকটা বড়ো করে নেয়৷ সারা মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল৷ আমি ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর নিথর চোখ দুটি অত্যন্ত স্নেহের সাথে আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ সেদিন আমি একা চিৎকার করিনি৷ এই গ্রামের প্রতিটি মেয়ের চিৎকার পাহাড়ে ধাক্কা খাচ্ছিল৷ কিন্তু আমাদের রক্ষা করার মতো সেদিন কোনো রক্ষক এই দেশে ছিল না৷ আমি শুনতে পাচ্ছিলাম আমার মায়ের আর্তনাদ৷ কিছুক্ষণ পর সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল, তারপর দোতলা থেকে একটি রক্তাক্ত শিশুর দেহ ছুড়ে ফেলা হল নীচতলায়৷ বাচ্চার দেহটা মেঝের ওপর পড়ে চারদিকে রক্তমাংস ছড়িয়ে গেল৷ কিছুক্ষণ পর আমার মায়ের দেহটাও দোতলা থেকে নীচে ফেলে দেওয়া হল৷ মায়ের বুক থেকে পেট পর্যন্ত চেরা৷ সেখান দিয়ে রক্ত সারা মেঝের ওপর ছড়িয়ে যাচ্ছে৷
ওদের কাজ শেষ হলে আমাকে পাঁজা কোলা করে তুলে ওরা নিয়ে চলে৷ আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেনা ক্যাম্পে৷ সেখানে আমার মতো বহু মেয়ে ছিল৷ যাদের কাজ ছিল হিংস্র সেনাদের যৌন লালসা তৃপ্ত করা৷ সেখানে আমার পরিচয় হয় হুনার সাথে৷ হুনা আমাকে জানায় যে ১৯৩৭ সালের ১৩ই ডিসেম্বর তিরিশজন সেনা হুনাদের বাড়ি আক্রমণ চালায়৷ হুনাকে দক্ষিণ নানকিং-এর হিসিং লু কাও থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল৷ হুনার বাবার নাম মিস্টার হসিয়া৷ মিস্টার হসিয়া সেনাদের পা ধরে তাদের নিরাপত্তার ভিক্ষা করেন৷ কিন্তু ওরা ওনাকে গুলি করে হত্যা করে৷ মিস্টার হসিয়ার স্ত্রী যখন প্রতিবাদ জানিয়ে চিৎকার করে ওঠেন, তখন তারা তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণ করে হত্যা করে৷ মিস্টার হসিয়ার স্ত্রীর যৌনদ্বার দিয়ে একটি ভাঙা বোতল ঢুকিয়ে তাঁর সারা শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল৷ তারপর তার এক বছরের ছেলেকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে ওরা হত্যা করে৷ হুনা আর তার দিদি হিমা দু-জনে পাশের ঘরে লুকিয়ে ছিল৷ তারা তাদের চার বছরের বোনকে লেপের নীচে লুকিয়ে রেখেছিল, যাতে বোনের কোনো ক্ষতি না হয়৷ বোন ভয়ে লেপের তলায় চুপ করে ছিল৷ সেনারা ১৪ বছরের হুনা আর ১৬ বছরের হিমাকে ধর্ষণ করে৷ দিদি হিমা প্রতিবাদ জানালে তার মুখ দিয়ে বাঁশ ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করা হয়৷ হুনা কোনো প্রতিবাদ করেনি, সে চুপচাপ নীরবে সব কিছু সহ্য করতে থাকে৷ সব কিছু শেষ হলে সেনারা হুনাকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে আসে৷ হুনা আসার আগে পর্যন্ত লেপের তলায় কোনোরকম নড়াচড়া দেখেনি৷ ওর ধারণা ওর চার বছরের বোনটা দম বন্ধ হয়ে মারা গেছিল৷ কিন্তু ওর ধারণা ভুল ছিল, বহু বছর পর হুনা জানতে পেরেছিল যে রেডক্রসের সদস্যরা যখন ওদের বাড়িতে যায়, তারা দেখে চার বছরের ছোট্ট একটি বাচ্চা মেয়ে তাঁর মৃত ভাইকে কোলে নিয়ে বসে আছে৷ মেয়েটি মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে বাকি জীবন তাকে দিয়ে একটাও কথা বলানো যায়নি৷ আমাদের মধ্যে দুটি ভাগ ছিল৷ আমাদের মধ্যে যারা প্রতিবাদ করেনি, তাদের বেঁধে রাখা হয়নি, কিন্তু যারা এই ভয়ংকর অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছিল, তাদের চেয়ারের মধ্যে কিংবা টেবিলের ওপর উলঙ্গ করে শুইয়ে বেঁধে রাখা হত৷ তারপর চলত দীর্ঘ ধর্ষণ৷ মৃত্যুর মাধ্যমে তারা একমাত্র নিস্তার পেয়েছিল৷
নামটা আজ আর মনে পড়ে না৷ কিন্তু একটি মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল, যার বাবাকে বলা হয়েছিল মেয়েটাকে ধর্ষণ করতে, আর তার ভাইকে বলা হয়েছিল মাকে ধর্ষণ করতে৷ কিন্তু তারা রাজি না হওয়ায় ওর চোখের সামনে ওর বাবা আর ভাইকে খুন করা হয়৷ এই দৃশ্য চোখের সামনে ঘটতে দেখে মেয়েটির মা জানালা দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে৷
খাতাটা পড়ে বিমিং বুঝতে পারে যে এটি একটি মেয়ের আত্মকথা৷ কিন্তু শেষের পাতাগুলো ছেঁড়া৷ সে নিজে ছিঁড়েছে না অন্য কেউ একাজ করেছে বোঝা যাচ্ছে না৷ বিমিং বুঝতে পারেনি কখন যে লাইব্রেরিয়ান মহিলাটি ওর সামনে এসে বসেছে৷ বিমিং মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল, আজ আসি, আবার সামনের সপ্তাহে আসব৷ এই সব কটা খাতা আমাকে পড়তে হবে৷ মহিলা বিমিংকে বলল, আমার ঠাকুমার মুখে শুনেছি উনি ওনার পরিবারের সাথে ইয়াংজিং নদীপথে পালানোর চেষ্টা করছিলেন, সেই সময় জাপানি সেনারা তাদের নৌকায় আক্রমণ চালায়, যার ফলে ওদের পরিবারের সবাই নদীর জলে তলিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু আমার ঠাকুমাকে দীর্ঘ ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল৷
বিকেল হয়ে আসছে, মা-বাবার মাঠ থেকে ফেরার সময় হয়ে এলো, তা ছাড়া এতটা পথ যেতে হবে, বিমিং উঠে পড়ল৷ এমন সময় মেয়েটি বলল, সুচেতনা নামে একটি মেয়ে নিউইয়র্ক থেকে আরও দু-জনের সাথে নানকিং-এ আসছে৷ সে নাকি এই বিষয়ে একটা আলোচনা সভা করতে চায় এবং যারা সেই সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তাদের সাথে দেখাও করবে৷ তুমি একবার যোগাযোগ করতে পারো৷
বিমিং বলল, কবে হবে এই সভা?
ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ তারিখে হবে শুনলাম৷ দাঁড়াও আমার কাছে বেশ কয়েকটা প্রিন্ট আউট রাখা আছে৷ সুচেতনা নিজে অনলাইন বিজ্ঞাপন দিয়েছে৷
বিমিং লাইব্রেরিয়ানের কাছ থেকে বিজ্ঞাপনের কাগজটা নিয়ে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে পাহাড়ের কোণে মিলিয়ে গেল৷
