১৯৩৭ নানকিং – ১১

১১

স্থান : নানকিং

ইয়াংজিং নদীর ধারে এক মনেস্ট্রি৷ মনেস্ট্রির দরজা দিয়ে সাদা কুয়াশা এসে ঢুকছে ভেতরে৷ গৌতম বুদ্ধের শায়িত মূর্তির সামনে বসে ওরা কয়েকজন প্রার্থনা করছেন৷ ওদের সকলের হাতে একটা প্রদীপ৷ প্রার্থনা শেষ হলে সবাই প্রদীপগুলো বুদ্ধের মূর্তির সামনে রেখে আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসলেন৷ ঘরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রদীপের মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়েছে৷ বাইরে থেকে ঘন কুয়াশা আর ঠান্ডা হাওয়া এসে ঢুকছে, এতে প্রদীপের আলোগুলো বেশ কয়েকবার দপদপ করে উঠল৷ প্রার্থনার প্রদীপ নিভে যাওয়ার অর্থ মৃত আত্মার অকল্যাণ, তাই একজন সন্ন্যাসী উঠে গিয়ে প্রধান প্রবেশদ্বারটা বন্ধ করে দিলেন৷ এক পবিত্র আলোয় প্রত্যেকে আবৃত হয়ে আছেন৷ কারুর মুখে কোনো কথা নেই, সবার চোখ দিয়ে জল ঝরছে৷ এমন সময় মিসেস চ্যাং বললেন,

জুয়াং এই জন্যই হয় তো নানকিং-এ ফিরে এসেছিল৷ নিজের মাতৃভূমিতে মৃত্যুর সৌভাগ্য কজনারই বা হয় বলো? ও তো ভাগ্যবতী৷ সেদিন ও যখন ফিরছিল না, আমরা পুলিশের কাছে গিয়ে জুয়াং-এর ছবিসহ সমস্ত বিবরণ জমা দিয়ে আসি৷ তারপরই তো মাঝ রাতে সেই ভয়ংকর সংবাদ আসে৷

সুচেতনা ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, যেন কারুর অপেক্ষায় আছে৷ মিসেস হুনান বললেন, সুচেতনা এবার আলোচনা শুরু করো, আর চল্লিশ মিনিট সময় আছে, এর মধ্যেই আমাদের সভা শেষ করতে হবে৷

সুচেতনা বলল, আর একটু অপেক্ষা করুন, তা ছাড়া দশ-পনেরো মিনিট বেশি সময় নিলে কী সমস্যা হবে?

মিসেস হুনান বললেন, সরকারের নিয়ম আমরা ভাঙতে পারি না৷ তাই যা করার তাড়াতাড়ি করো৷

সুচেতনা বলল, সুদূর আমেরিকা থেকে নানকিং-এ আমরা যখন আসি, আমাদের সাথে জুয়াং এসেছিলেন৷ ৮৯ বছরের বৃদ্ধা জুয়াং এবং মিসেস চ্যাং বিশেষ অনুমতি নিয়ে এসেছিলেন এই দেশে৷ কারণ এত বয়সে ভিসার অনুমতি পাওয়া যাচ্ছিল না৷ প্রথম দিকে ওঁরা মানসিকভাবে অত্যন্ত ভেঙে পড়েছিলেন৷ কিন্তু নানকিং-এ ফিরে আসার ইচ্ছা এতটাই প্রবল ছিল যেসব প্রতিকূলতাকে জয় করে তাঁরা এখানে আসেন৷ কিন্তু জুয়াং-এর হয়তো ফেরার কোনো ইচ্ছেই ছিল না, তাই কাল আমাদের ওঁকে আর নানকিংকে চিরবিদায় জানিয়ে ফিরতে হবে৷ মন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত, কথা বলার মতো কোনো ভাষা আমি খুঁজে পাচ্ছি না৷ কিন্তু একটা কথাই বলতে চাই, যে নানকিং-এর কল্পনা আমি করেছিলাম, তার সাথে এই নানকিং-এর কোনো মিলই পেলাম না৷

মিসেস হুনান বললেন, কীভাবে মিল পাবে বলো! আমার মুখটার অবস্থা দেখেছ? ৩৭ বার বেয়োনেটের খোঁচা সহ্য করেছি৷ আমার সারা মুখ আর শরীর সেই ভয়ংকর সময়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ তাই সরকারের কাছ থেকে কোনো সাহায্য আমি পাইনি৷ আমার নিজের বোনকে সেনারা ধর্ষণ করে পুড়িয়ে রোস্ট বানিয়েছিল৷ আমার ভগ্নীপতি যখন জানতে পারেন যে সরকার জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ সম্মান দিয়ে এই দেশে নিয়ে আসছেন, এই খবর শুনে তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়ে গিয়েছিল৷ আমার মুখের এই বীভৎসতার জন্য আমি কোথাও কোনো চাকরিও পাচ্ছিলাম না৷ আমার স্বামী চিনা সেনাবাহিনীতে ছিলেন, কিন্তু সাংহাই যুদ্ধের সময় তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান, যার জন্য সেনাবাহিনীর ভাতাটাও আমি পাইনি৷ আমার থেকেও ভয়ংকর অবস্থায় বহু মানুষকে থাকতে হয়েছে৷ ঝাঁ-চকচকে শহরের বাইরে নদীর ধারে এদের আবর্জনার মতো থাকতে দেওয়া হয়েছিল, যাতে বাইরের লোকজন শহরে আসলে তাদের চোখে এরা না পড়ে৷ আজ সেসব অতীত, তাদের অনেকেই আজ মৃত৷ আমার মতো কিছু মানুষ, বয়সের ভার বয়ে চলেছে৷

এমন সময় দরজায় আঘাত পড়ল৷ সবাই এক মনে হুনানের কথা শুনছিলেন, কিন্তু এমন অবস্থায় দরজায় আঘাত পড়লে সবাই সচেতন হয়ে ওঠে৷ একজন সন্ন্যাসী এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলে একটা ঘন কুয়াশা এসে ঢোকে ঘরের ভেতরে৷ ওরা সবাই তাকিয়ে আছে দরজার দিকে, কুয়াশা ভেদ করে একটি ছোট্ট মেয়ে আর তার বাবা ঘরে এসে ঢুকল৷ সে মনেস্ট্রির ভেতরে এসে বলল আমি বিমিং, সুচেতনার সাথে দেখা করতে এসেছি৷ সুন্দর গোলাপি রঙের জামায় বিমিংকে পরির মতো দেখাচ্ছিল৷ সুচেতনা উঠে গিয়ে বিমিংকে জড়িয়ে ধরে৷ বলে আমিই সুচেতনা৷ সুচেতনা বেশ কিছু দিন চিনের ভাষা শিখেছে, সে দু-তিন রকমের চিনের ভাষা অতি স্বচ্ছন্দে বলতে পারে, তাই বিমিং-এর সাথে কথা বলতে ওর কোনো সমস্যা হচ্ছিল না৷ বিমিং বলল, সুচেতনা এই খাতাটা আমার দাদুর, এতে ১৯৩৭ সালের বর্ণনা লেখা আছে৷ আপনাকে এটা আমি দিলাম৷ সুচেতনা খাতাটা হাতে নিয়ে তাতে চুমু খেল৷ তারপর বিমিং-এর হাত ধরে তাকে নিজের পাশে বসাল৷

সবাই চুপচাপ বসে আছে, এমন সময় মায়াংকি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি কিছু বলতে চাই৷ আজ এই মুহূর্তের জন্য এতদিন ধরে আমি অপেক্ষায় ছিলাম৷

সুচেতনার কপালে কতগুলো ভাঁজ পড়ল, ওর আগের থেকেই এই মেয়েটার ওপরে সন্দেহ ছিল৷ তবে মেয়েটা কী বলতে চায়?

মিসেস চ্যাং বললেন, মায়াংকি খুব ভালো মেয়ে, ও-ই তো আমাকে এই মনেস্ট্রিতে সভার আমন্ত্রণ জানাতে বলেছিল,

সুচেতনা বলল, ও কী করে এই মনেস্ট্রির সন্ধান পেল? ওর তো এর সন্ধান জানার কথা না৷

মিসেস চ্যাং বলল, ও রাত জেগে অনেক পড়াশোনা করে, তা ছাড়া ইন্টারনেটে বসে অনেক কিছু সংগ্রহ করে৷

সুচেতনা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নীচু করল৷ ওর মহাভারতের কথা মনে পড়ে গেল, কোনো মানুষের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা ঠিক না৷

এবার মায়াংকি বলল, আমার দাদু জাপানি সাংবাদিক হয়ে ১৯৩৭ সালে নানকিং এসেছিলেন৷ সেই সময় যা কিছু ঘটেছিল, তাঁর ছবি তুলে তিনি বেশ কয়েকটা কপি করে বিভিন্ন জায়গায় রেখে দেন৷ জাপান সরকারের কাছে এই খবর চলে গেলে আমার ঠাকুরদার ওপর তল্লাশি চালানো হয়৷ কিন্তু কোনো কিছু তারা খুঁজে পায়নি৷ আমার ঠাকুরদা পরে আমেরিকাতে আশ্রয় নেন৷

মিসেস হুনান বলেন, ম্যাসাও কি তোমার দাদু?

মায়াংকি সম্মতি জানিয়ে বলেন, আমার দেশ যে ভয়ংকর অত্যাচার আপনাদের দেশের ওপর চালিয়েছে, তার প্রায়শ্চিত্ত আমি করতে চাই৷ মায়াংকির হাতে একটা কাগজ৷ যা এতক্ষণ কেউ লক্ষ করেনি৷ কাগজটা খুলে মায়াংকি বলল এক সেট ছবি এই মনেস্ট্রিতে আমার দাদু রেখে গিয়েছিলেন৷ সেই ছবি আজ আপনাদের হাতে আমি তুলে ধরতে চাই৷ মায়াংকি হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আর পাঁচ মিনিট সময় আমাদের হাতে আছে, তারপর এই মনেস্ট্রি থেকে আমাদের চলে যেতে হবে, তাই আর অপেক্ষা না৷ সে ঘুরে দাঁড়িয়ে, গৌতম বুদ্ধের মূর্তির দিকে চলল৷ সবাই তাকিয়ে আছে সেই দিকে৷ প্রধান সন্ন্যাসী উঠে দাঁড়িয়ে চললেন ওর পেছনে৷

গৌতম বুদ্ধের মূর্তির পায়ের দিকে একটা বুদ্ধের ধ্যানস্থ মূর্তি রাখা, যা একটা কাচের বাক্সের মধ্যে রাখা আছে৷ মায়াংকি সন্ন্যাসীকে বলল বাক্সটা খুলতে৷

সবাই প্রথমে ভেবেছিল সন্ন্যাসী আপত্তি করবেন৷ কিন্তু না তিনি কোনো আপত্তি করলেন না৷ সন্ন্যাসীর চোখেও জল, তিনি বললেন, আমার পরিবারকেও এই ভয়ংকর সময়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তাই আপনাদের সাহায্য করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব৷ তিনি কাচের বাক্সটা তুলে পাশে রেখে দিলেন৷ এখন মূর্তিটাকে ছুঁয়ে অনুভব করা যাচ্ছে৷ মায়াংকি সন্ন্যাসীকে বলল, আপনারা বুদ্ধের মূর্তিকে একটু তুলে ধরুন, এর নীচেই রাখা আছে সেই সব ছবি৷

সন্ন্যাসী আরও দু-জন সন্ন্যাসীকে ডাকলেন, তারা সবাই মিলে মূর্তিটা তুলে ধরলে সেই মূর্তির নীচ থেকে একটা খাম এনে তুলে ধরল মায়াংকি৷

মায়াংকি বলল, এতগুলো বছর ধরে এই খাম এখানে লুকানো ছিল, মিসেস চ্যাং যে নানকিং-এর সন্ধানে আপনি এখানে এসেছিলেন, সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই খামের ভেতরে৷ একজন জাপানি সাংবাদিক লুকিয়ে রেখে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য৷

মায়াংকি সুচেতনার কাছে এসে সেই খামটি তুলে দিল ওর হাতে৷ তারপর বলল, সুচেতনা, আপনি প্রথম দিন থেকে আমাকে সন্দেহ করেছেন৷ সন্দেহ করাই স্বাভাবিক৷ আমি নানকিং যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কোনো রাস্তা আমি পাচ্ছিলাম না৷ ছোটোবেলা থেকেই আমার পরিবারের কাছে নানকিং-এর বিড়ম্বনার কাহিনি শুনে বড়ো হয়েছিলাম৷ তাই আইরিশের মৃত্যুর পর মিসেস চ্যাংকে দেখাশোনা করার জন্য ওর বাড়িতে আশ্রয় নিই৷ যে কারণে আশ্রয় নিই, তা আজ আপনার হাতে৷ আর আপনি না আসলে তা সম্ভবও হত না৷

সভার বাকি সদস্যদের দৃষ্টি সেই খামের দিকে৷

এমন সময় বাইরে মনেস্ট্রির ঘণ্টা বেজে উঠতেই দরজা খুলে গেল৷ ওরা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে দরজা দিয়ে বাইরে গিয়ে কুয়াশায় মিলিয়ে যেতে শুরু করল, এই একটা খাম যেন বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে তাদের প্রত্যেকের সাথে ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে চলতে থাকল৷ মনেস্ট্রির দরজা তখনও খোলা, ভেতর থেকে শান্তির মন্ত্র ‘ওম মণি পদ্মে হুম’ বয়ে আসছে৷ এই মন্ত্র আর সাদা কুয়াশা শান্তির প্রতীক হয়ে ওদের নিয়ে চলল অমৃতের পথে৷

***

সূত্র

১. দ্যা রেপ অফ নানকিং, আইরিশ চ্যাং

২. দ্যা মেকিং অফ দ্যা ‘‘রেপ অফ নানকিং’’, তাকাসি যোশিদা

৩. দ্যা গুড ম্যান অফ নানকিং দ্যা ডাইরিস অফ জন রাবে, জন রাবে

৪. জোশুয়া এ ফোগেলের লেখা ‘‘দ্যা নানজিং ম্যাসাকার ইন হিস্ট্রি এন্ড হিস্ট্রিওগ্রাফি’’

৫. টেরর ইন মিননিই ভুত্রিন’স নানজিং, মিননিই ভুত্রিন

৬. দে ওয়ার ইন নানজিংঃ দ্যা নানজিং ম্যাসাকার উইটনেসড বাই আমেরিকান এন্ড ব্রিটিশ ন্যাশনালস, সুপিং লু

৭. এই বিষয়ক বিভিন্ন চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্র৷

৮. অন্তর্জাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *