৬
স্থান : মিচিগান
শিকাগো থেকে গত রাতের ট্রেনে সুচেতনা এসে পৌঁছেছে মিচিগানে৷ আজ সে যাচ্ছে জুয়াং-এর বাড়িতে৷ মিসেস চ্যাং জুয়াংকে ফোন করে সুচেতনার যাওয়ার কথা জানিয়েছেন৷ তাই সেই দিক থেকে নিশ্চিন্ত সে৷ সারা শহর বরফে ঢেকে আছে৷ গাছগুলোর মাথা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না৷ রাস্তায় প্রায় হাঁটু পর্যন্ত বরফ৷ তবুও রাস্তায় লোক চলাচল করছে৷ ট্রেনের লাইনে আগুন ধরিয়ে বরফ গলানো হচ্ছে৷ তাই সে এখানে পৌঁছাতে পেরেছে৷
বাড়িটা চিনতে খুব একটা অসুবিধা হল না৷ চিনার গাছগুলো পার করে যে পার্ক সেই পার্কের গায়ে একটাই বাড়ি৷ এই বাড়িই জুয়াং-এর৷
জুয়াং-এর বয়স মিসেস চ্যাং-এর বয়সিই হবে৷ এত বয়সেও সে নিজেকে অনেক সাজিয়ে-গুছিয়ে রেখেছে৷ বাড়িতে ঢুকেই মনে হল যেন কোনো বড়োদিনের অনুষ্ঠানে সে এসেছে৷ সাদা দেওয়াল আর লাল পর্দা, বসার ঘরের মাঝে বিশাল বড়ো একটা ক্রিসমাস ট্রি রাখা৷ অসাধারণভাবে সাজানো চারপাশ৷ জুয়াং লাল রঙের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছেন সাদা সোফার সামনে, তাঁর মুখে অদ্ভুত সুন্দর একটা প্রাণোচ্ছল হাসি৷ উনি সুচেতনাকে বসতে বললেন৷
ঘরের ভেতরে রুম হিটার জ্বলছে, কিন্তু একটা কাচের জানালার পাল্লাগুলো বন্ধ থাকলেও পর্দা সরিয়ে রেখেছেন সে৷ সেখান দিয়ে আলো এসে ঢুকছে ঘরে৷
সুচেতনার প্রথম প্রশ্ন, এই বয়সেও এত প্রাণোচ্ছল থাকেন কীভাবে?
আবার একটা প্রাণোচ্ছল হাসি, তারপর জুয়াং বললেন, জীবনে অনেক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে একটা ব্যাপার অনুভব করেছি যে জীবনে যত কঠিন সময় আসুক না কেন, এই জীবন অত্যন্ত সুন্দর এবং ছোট্ট৷ তাই প্রতিটা মুহূর্ত সুন্দরভাবে এবং সুস্থভাবে যাপন করতে হবে৷
সুচেতনা এবার বলল, আমি নানকিং সম্পর্কে গবেষণা করছি৷ মিসেস চ্যাং-এর কাছ থেকে যেটুকু জেনেছি আমি সমৃদ্ধ হয়েছি, কিন্তু এখনও অনেক কিছু আমার অজানা থেকে গেছে৷ আমি ইতিহাসের এই অজানা অধ্যায়কে আপনার চোখ দিয়ে দেখতে চাই৷
জুয়াং হাসিমুখে বললেন কোথা থেকে শুরু করি বলো৷
একদম প্রথম দিন থেকে৷
বৃদ্ধা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, নানকিং আমার স্বপ্নের শহর চারিদিকে সবুজ পাহাড়, চা-বাগান আর নীল নদীর শহর নানকিং৷ চা-বাগানের ধারে আমাদের বাড়ি ছিল৷ ভোরবেলা মেঘ আর কুয়াশায় ঘিরে থাকত আমাদের ছোট্ট বাড়িটা৷ আমার বিছানার সাথেই ছিল বিশাল বড়ো কাচের জানালা, আর জানালার ধারে ছিল চা-বাগান, বিছানায় শুয়ে আমি সবুজ চা-পাতার দিকে তাকিয়ে থাকতাম৷
সুচেতনা জুয়াং-এর সাথে একাত্ম হয়ে যেন সেই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিল৷ এখানে জুয়াং আর সুচেতনা যেন একজনই মানুষ৷ একটা সাদা রঙের নরম বিছানা৷ নরম লেপের নীচে শুয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে সে তাকিয়ে আছে সবুজ চা-গাছগুলোর দিকে৷ প্রতিটি পাতাকে সে এক-একটি জীবন্ত প্রাণের মতো অনুভব করছিল, ভোরের কুয়াশায় ভিজে চিক্কন এক-একটি জীবন্ত পাতা, এদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও মন ভালো হয়ে যায়৷ জুয়াং-এর হালকা একটা প্রতিফলন এসে পড়ছিল কাচের ওপর৷ নিজেকে সদ্য প্রস্ফুটিত একটি গোলাপের মতো লাগছিল৷ আর কয়েকদিন পর সে নতুন এক জীবনে প্রবেশ করতে চলেছে৷ নানা রঙের রঙিন প্রজাপতিরা তার চারপাশে খেলা করছে, জুয়াং আজকাল সবসময় সুন্দর ফুলের গন্ধ অনুভব করে৷ জুয়াং যখন দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে, এমন সময় একঝাঁক পাখির দল আর্তনাদ করতে করতে উড়ে গেল চা-বাগানের ওপর দিয়ে৷ আজন্ম সে এই প্রকৃতির মাঝেই তো বড়ো হয়ে উঠেছে, এদের ভাষা বুঝতে তার অসুবিধা হয় না৷ এ যেন এক অশনি সংকেত৷ এমন সময় পাহাড়ের ওপরের মনেস্ট্রির ঘণ্টা খুব জোরে জোরে বেজে উঠল৷ সে আর নিশ্চিন্তে বিছানায় শুয়ে থাকতে পারল না, বিছানা থেকে উঠে বসতে যাবে, এমন সময় খুব জোরে একটা আওয়াজ হল, সেই সাথে তাদের বাড়িটা কেঁপে উঠল৷ ঘরের দেওয়ালের ছবিগুলো খুব জোরে জোরে কাঁপতে কাঁপতে মেঝের ওপর পড়ে গেল৷ আবার একটা জোরে আওয়াজ, এই আওয়াজটাও আগের আওয়াজটার মতোই ছিল, ঘরটা আবার কেঁপে উঠল৷ জুয়াং শুনতে পাচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে খুব জোরে কেউ ওপরের ঘরে উঠে আসছে৷ জুয়াং-এর অনুমান ঠিক ছিল, তার মা ঘরে ঢুকে জুয়াংকে বলে, জাপান আমাদের শহরে আক্রমণ করেছে, আমাদের এই শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে, তাড়াতাড়ি চলো৷
জুয়াং মনে মনে ভাবল তার রঙিন স্বপ্নের কথা, দীর্ঘদিন ধরে যে স্বপ্ন সে নিজের মনের মধ্যে অত্যন্ত যত্নে বপন করেছে৷ সে ভাবল তার জীবনসঙ্গীর কথা, এই শহর ছেড়ে চলে গেলে তাদের যদি আর কোনোদিন দেখা না হয়, তাহলে কী হবে! না, এই ভাবে সব কিছু ছেড়ে যাওয়া যায় না৷ আর একটু ধৈর্য নিয়ে তাদের অপেক্ষা করতে হবে৷
কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক৷ এমন সময় খুব জোরে একটা আওয়াজ ওদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছিল, ওরা মা মেয়ে দু-জনে তাকিয়ে থাকল কাচের জানালার দিকে৷ একঝাঁক যুদ্ধবিমান আকাশপথে এগিয়ে আসছিল ওদের বাড়ির দিকে৷ বিমান থেকে প্রথম বোমটা পড়ল পাঁচশো মিটার দূরে, ঠিক চা-বাগানের মাঝে৷ জ্বলন্ত চা-বাগানের আগুনের প্রতিবিম্ব এসে পড়ল কাচের ওপর৷ ওরা মা আর মেয়ে দু-জনে আর অপেক্ষা না করে দৌড়াতে শুরু করল৷
জুয়াং-এর একঝাঁক রঙিন স্বপ্নকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মাঝে ফেলে ওরা ছুটে চলল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে৷ বাবা, মা আর জুয়াং তিনজনে ছুটে চলল স্টেশনে৷ শেষ ট্রেন তাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে৷ এই শহরকে চিরকালের মতো ‘আলবিদা’ জানিয়ে সে-ও চলবে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে৷ জুয়াং আর তার বাবা-মায়ের মতো কয়েক হাজার যাত্রী তখন এই ট্রেনকে নিজেদের শেষ অবলম্বন ভেবে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে৷ কিন্তু এতজন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতাও ছিল না সেই ট্রেনের৷ ঝুলন্ত মানুষের মধ্যে নিজের সন্তানকে কোনোক্রমে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন মা-বাবা৷ নিজেরা না বাঁচুন, এই শহরের বাইরে গেলে তাদের সন্তান নিরাপদে থাকবে, এই তাদের ধারণা ছিল৷ অনেক স্বামী তার স্ত্রী এবং সন্তানদের ট্রেনে তুলে চোখের জল ফেলছিলেন৷ জুয়াং আর তার মাকে কোনোক্রমে তাঁর বাবা তুলে দেয় ট্রেনে৷ কিন্তু তিনি নিজে উঠতে পারলেন না৷ এক সময় ট্রেনটা চলতে থাকল, ট্রেনের ভেতর থেকে মানুষ আর্তনাদ করতে করতে তাদের প্রিয় মানুষজন আর প্রিয় শহরকে বিদায় জানাতে জানাতে চলতে থাকে৷ সবুজ পাহাড়ের ধার দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেনটি এগিয়ে যেতে থাকে৷ কয়েক হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং ধাক্কাধাক্কিতে তারা এগিয়ে চলতে থাকে, স্বর্গের মতো সুন্দর পরিবেশের অধিবাসীরা এক ধাক্কায় যেন নরকে পৌঁছে যায়৷ এমন সময় আকাশপথে ট্রেনের সামনের কামরার ওপর আক্রমণ চালানো হয়৷ জুয়াংদের কামরার বহু মানুষ ভয়ে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেয়৷ জুয়াং-এর মা জুয়াংকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়৷ জুয়াং পাহাড়ের ধার দিয়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তে একটি গাছের মধ্যে আটকে যায়৷ ও দেখে ট্রেনটা দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে৷ ও নিজের চোখের সামনে মায়ের শেষ পরিণতি দেখে আর্তনাদ করে ওঠে৷
জুয়াং পাহাড়ের ঢাল দিয়ে নীচে নামতে থাকল, অত্যন্ত দ্রুতবেগে সে নীচে নেমে চলেছে৷ পাহাড়, জঙ্গল আর প্রকৃতির সাথে তাঁর আজন্ম সম্পর্ক৷ এদের সাথে এক আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ সে৷ নিজের মাতৃভূমির এই ভয়ংকর পরিণতির মাঝে তার কী করণীয়, কিছুই বুঝতে পারে না সে৷ চলতে চলতে হোঁচট খায় সে৷ এক হোঁচটে পাহাড় থেকে গড়িয়ে অনেকটা নীচে গিয়ে পড়ে জুয়াং৷ নরম ঘাস আর লতাপাতার জন্য সেরকম কোনো আঘাত লাগেনি, নীচে পড়ার পর অনেকক্ষণ অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে ছিল সে৷ বিকেলের দিকে সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ আগে তার চেতনা ফিরে আসে৷ জুয়াং দেখে যে ঘন জঙ্গলের মাঝে একটি দেওয়ালের নীচে পড়ে আছে সে৷ সারা শরীরে তখন অসহ্য যন্ত্রণা তার, উঠে বসতে খুব সমস্যা হচ্ছিল৷ কোনোক্রমে উঠে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে জুয়াং চারপাশটা খুব ভালো করে দেখে৷ আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেও ও কত খুশি ছিল, কিন্তু এই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সব কিছু কতটা বদলে গেল৷ চারপাশটা দেখে একটা ভয়ংকর স্বপ্নের মতো মনে হল৷ আর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যে নেমে রাত হয়ে যাবে, তখন এই সব জঙ্গলে তার এই ভাবে থাকা নিরাপদ নয়৷ জুয়াং পাঁচিল ধরে এগিয়ে যেতে থাকল৷ এগিয়ে যেতে যেতে একটি গেটের সামনে গিয়ে সে পৌঁছাল, ভাঙা গেটের দরজার ওপর হাত রেখে জুয়াং দেখল এটি একটি কবরস্থান৷ মৃত মানুষেরা এখানে ঘুমিয়ে আছে৷ একঝাঁক পাখি ডাকতে ডাকতে জুয়াং-এর মাথার ওপর দিয়ে ঢুকে গেল কবরস্থানের ভেতরে৷ এরা বেলাশেষে ঘরে ফিরছে৷ ওদের দেখে জুয়াং-এর ভালো লাগল, কেউ তো ভালো আছে, কেউ তো নিরাপদে তার পরিবারের কাছে ফিরছে! তখন সন্ধ্যা নামছে জঙ্গলে৷ জুয়াং ভালো করে তাকিয়ে দেখল কবরস্থানের ভেতর ছোটো ছোটো প্যাগোডার মতো৷ এখানে রাতে আশ্রয় নেওয়াই যায়৷
অভুক্ত, অসহায় জুয়াং-এর চোখ থেকে সব জল যেন শুকিয়ে গিয়েছিল৷ এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার মতো কয়েক লক্ষ মানুষের জীবনে কী ভয়ংকর অন্ধকার নেমে এলো৷ এই সব কবরস্থানে একরকমের প্রাণী থাকে, যারা মাটির ভেতরে আশ্রয় নিয়ে মৃতদেহগুলো খুবলে খায়৷ এই সব প্রাণীদের ডাক অনেকটা মহিলাদের কান্নার মতো শোনায়৷ যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তারা ভাববে কোনো প্রেতাত্মা কাঁদছে৷ কিন্তু জুয়াং এই প্রাণীর গল্প তার মায়ের মুখে শুনেছিল! তার মা যে গ্রামের মেয়ে, সেই গ্রামের কবরস্থানে রাতেরবেলায় এই প্রাণী ডাকত৷ সেই রাতে জুয়াং এই প্রাণীর ডাক শুনেছিল৷ এরকমভাবে তিন দিন কাটানোর পর রেডক্রসের একটি দল অর্ধমৃতা জুয়াংকে এই কবরস্থানের গেটের বাইরে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করে৷
জুয়াং আর সুচেতনা দু-জনেই বর্তমানের মানবজমিনে ফিরে এলো৷
জুয়াং বলল, চিনা বাহিনী সাংহাইয়ের যুদ্ধে জাপানের কাছে পরাজিত হয়৷ এই পরাজয় আমাদের জন্য ভয়ংকর এক সময় ডেকে আনে৷ চিনা বাহিনী জানত ধরা পড়লে তাদের অবস্থা কী ভয়ানক হবে, তাই সেনাবাহিনীরা বাঁচার জন্য জনসাধারণের মধ্যে মিলেমিশে যেতে থাকে৷ মিউজিয়ামগুলোতে আমাদের যেসব ঐতিহ্য রাখা ছিল, সেগুলোকে রক্ষা করার জন্য বাক্সের মধ্যে প্যাকিং করে ছোটো ছোটো নৌকা করে নদী দিয়ে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হতে থাকে৷ উফফ, কী ভয়ংকর পরিস্থিতি বুঝতে পারছ! বাড়িতে ডাকাত পড়লে যা অবস্থা হয়, বাড়ির লোকেরা তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র সব সরিয়ে দিতে থাকে, এখানেও সেই একই অবস্থা হয়৷ আমাদের বর্তমান এত ভয়ংকর ছিল, যে আমরা আমাদের ঐতিহ্যময় অতীতকে জলে ভাসিয়ে দিলাম এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে৷
সুচেতনা বলল, চিনের এই ভয়ংকর পরাজয়ের পেছনে কী কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়?
দেখো, কারণ একটা ছিল না, অনেকগুলো কারণ এর পেছনে ছিল৷ প্রথমত, আমাদের বিমানবাহিনী ওদের থেকে অনেক দুর্বল ছিল৷ জাপানের শক্তিশালী বিমান বাহিনীই নানকিং দখল করে নিয়েছিল৷
দ্বিতীয়ত, সরকারের আমলারা নানকিং থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগে অত্যাধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলি সঙ্গে করে নিয়ে গেছিল৷ এর ফলে সেনারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারছিল না৷
তৃতীয়ত, সমগ্র চিনে একরকম ভাষা চলে না৷ সৈন্যরা বিভিন্ন অঞ্চলের থেকে এসেছিলেন, তাই ভাষার সমস্যার জন্য তাদের মধ্যে যোগাযোগের সমস্যা হচ্ছিল৷ চতুর্থ কারণ, যুদ্ধের সময় চিনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যুবকদের জোর করে সেনাতে যোগ দেওয়ানো হয়েছিল৷ এরা অনেকেই বন্দুক চালাতে পারত না৷ কারণ ঠিকমতো প্রশিক্ষণ তাদের দেওয়া হয়নি৷ এই সব সেনারা ঠিকমতো যুদ্ধ করতে পারেনি৷
সাংহাই আর মাঞ্চুরিয়া দখল করার পর যখন জাপানি সেনা নানকিং-এর প্রবেশদ্বারে অপেক্ষা করতে থাকল, চিনের কোনো প্রতিনিধি সেখানে আসল না, তখন তারা প্রবেশদ্বার ভেঙে শহরে প্রবেশ করল৷ এদিকে চিনা সেনাবাহিনীর বড়ো অফিসারেরা এবং আমলারা ইয়াংজিং নদীপথে পালানোর চেষ্টা করছিলেন৷ কিন্তু সেই সময় আকাশপথে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়৷
আমাকে রেডক্রসের একটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়৷ সেখানে আক্রান্ত মানুষের মানসিক চিকিৎসা করার দায়িত্ব আমার ওপর এসে পড়ে৷ কিন্তু আমার আর তাদের মানসিক পরিস্থিতি একই ছিল৷ আমি নিজের উদাহরণ তাদের সামনে তুলে ধরতে থাকি৷ ধীরে ধীরে ওদের বোঝাতে থাকি৷ কিন্তু তারপরই এক ভয়ংকর দিন আসে৷
সুচেতনা বলল, আমি মিসেস চ্যাং-এর কাছে সেই সব দিনের কথা শুনেছি৷ এখন থাক৷ মিস জুয়াং, আমি নানকিং যেতে চাই৷ একা না, আপনাদের সবাইকে নিয়ে একবার যেতে চাই সেই দেশে৷ আপনারা ফিরতে চান না আপনাদের মাতৃভূমিতে?
সুচেতনা দেখল তার কথা শুনে মিস জুয়াং-এর চোখের কোণটা চকচক করে উঠল৷
