ভয়াল দশ – ঋজু গাঙ্গুলী
Bhoyal Dosh by Riju Ganguly
প্রথম প্রকাশ- জুলাই ২০২১
অনুবাদ- ঋজু গাঙ্গুলী
প্রকাশনা, প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – মায়াকানন
.
উৎসর্গ
শ্রীমতী শর্মিষ্ঠা গাঙ্গুলী এবং কুমারী মেঘনা গাঙ্গুলী-কে,
যাঁদের ‘একটা গল্প বলো তো’ দাবি ছাড়া এই বইটাই হত না।
.
ভূমিকা
রাতের শেষ ট্রেন ঢুলতে-ঢুলতে স্টেশনে ঢুকল। আমি ছাড়া সাকুল্যে জনাচারেক যাত্রী নামলেন। তাঁরা অন্ধকারে কোথায় যে গায়েব হলেন— বুঝতেই পারলাম না। ঘুম-চোখো টিকিট-চেকারের হাতে টিকিট গুঁজে দেওয়ার পর তিনিও পা-টেনে-টেনে দূরে চলে গেলেন। স্টেশন থেকে বাইরে এসে দেখলাম, চারদিক শুনশান। লোকজন নেই, গাড়িঘোড়া নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে আমার পেছনে দপ্-দপ্-করা প্ল্যাটফর্মের লালচে গ্যাসবাতি ছাড়া কোত্থাও কোনও আলো অবধি নেই।
হঠাৎ মনে হল, সেই অন্ধকারের সমুদ্র ঠেলে একটা টমটম এগিয়ে আসছে। ঘোড়ার গলায় বাঁধা ঝুমঝুমির শব্দ আর গাড়ির ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ কাছে আসতে-আসতে থেমে গেল। আবছায়া গাড়ির মধ্যে আরও ঘন একতাল অন্ধকারের মতো বসে ছিল কোচোয়ান। সে বলে উঠল, ‘কোথায় যাবেন, বাবু?’
না, এই সংকলনে এমন কোনও গল্প নেই।
তাহলে কী আছে এখানে?
আজ থেকে একশো বছরেরও বেশি আগের কথা। বিশেষ কিছু সন্ধ্যায় এক অধ্যাপক তথা গবেষক তাঁর ছাত্র ও বন্ধুদের নিয়ে জমাটি গল্পের আসর বসাতেন। ধীরলয়ে, আড্ডা মারার মতো করে তিনি একটা উষ্ণ, চেনা পরিবেশ তৈরি করতেন। ঘর-বাড়ি-লাইব্রেরির বর্ণনা, কিছু সরস পর্যবেক্ষণ, চরিত্রদের একেবারে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলা— এইসব হতে-হতে দুম্ করে সেই গল্পে ঢুকে পড়ত ভয়! উপস্থিত শ্রোতারা সিঁটিয়ে যেতেন। আলো আর উত্তাপের সন্ধানে তাঁরা কাছাকাছি আসতেন। আসর শেষে দেখা যেত, অন্ধকার গলিপথ ধরে একা ফেরার ব্যাপারে সবারই আলসেমি দেখা দিয়েছে।
তবু তাঁরা অপেক্ষা করতেন পরের আসরের জন্য।
মন্টেগু রোডস্ জেমস্ নামক মানুষটি নিজের গবেষণা ও প্রজ্ঞা দিয়েই মধ্যযুগীয় খ্রিস্টধর্ম-চর্চার জগতে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু বন্ধুদের আনন্দ দেওয়ার জন্য লেখা এই গল্পগুলো তাঁকে সাহিত্যিক অমরত্ব দিয়েছে। তার চেয়েও বড়ো কথা, গল্পগুলো এতই প্রভাবশালী ছিল যে পরবর্তীকালে বহু লেখক তাঁকে অনুসরণ করেছেন। তৈরি হয়েছে ‘জেমসিয়ান হরর’ নামক একটি আস্ত ঘরানা।
বাংলায় মানুষটির লেখা তথা তাঁর ঘরানা নিয়ে আগ্রহ তৈরি করার জন্য সিংহভাগ কৃতিত্ব পাবেন শ্রীরাজর্ষি গুপ্ত। এই তরুণ অধ্যাপক জেমস্-এর পাঁচটি বিখ্যাত কাহিনির সটীক অনুবাদ নিয়ে ‘ছায়া কায়া ভয়’ নামক সংকলনটি প্রকাশ করেন। জেমস্-কথিত ‘আ প্লিজিং টেরর’— যে আতঙ্ক গল্প শেষ হওয়ার পরে পাঠককে আনন্দ দেয়— নতুন করে ফিরে আসে আমাদের মধ্যে।
এই বইয়ে আছে তেমন আটটি লেখা, আর দু’টি প্যাস্টিশ।
জেমসিয়ান হরর-এর সর্বোৎকৃষ্ট অনুসারীদের মধ্যে একজন হলেন হার্বার্ট রাসেল ওয়েকফিল্ড। এম.আর.জেমস নিজে তাঁর লেখার প্রশংসা করেছিলেন! ‘বৃশ্চিক-১’ (অরণ্যমন) সংকলনে ‘দেও’-খ্যাত তমোঘ্ন নস্কর তাঁর একটি গল্প অনুবাদ করেছিলেন ‘সীমানা’ নামে। আমি পরে একটি গল্প অনুবাদ করেছিলাম ‘কানামাছি’ নামে— যা ‘রোমাঞ্চকর ১০’ (বইচই)-এ স্থান পেয়েছিল। কিংবদন্তি লেখকের অন্য চারটি গল্প অনূদিত হয়েছে এই বইয়ে।
জেমস-এর সমকালীন আরও ক’জন লেখক প্রভূত পাঠককে যুগপৎ ভয় ও আনন্দ জুগিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন এডওয়ার্ড ফ্রেডরিক বেনসন। তাঁর একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গল্প ঠাঁই পেল হেথায়।
‘গোস্টস্ অ্যান্ড স্কলার্স’ নামক একটি উচ্চ-প্রশংসিত পত্রিকায় রোজমেরি পারডো’র সযত্ন সম্পাদনায় দীর্ঘদিন লালিত হয়েছিল জেমসিয়ান হরর। সেখানেই স্টিভ ডাফি’র লেখা দু’টি গল্প পড়ে সর্বাঙ্গ শিরশিরিয়ে উঠেছিল আমার। সেই গল্পদু’টি রয়েছে এই বইয়ে।
‘প্যান বুক অফ হরর স্টোরিজ’ ভয়ের বদলে বীভৎস ও নিষ্ঠুর লেখাজোখার জন্যই কুখ্যাত। কিন্তু সেখানেই একদা প্রকাশিত হয়েছিল মোরাগ গ্রিয়ার-এর লেখা এক সরস অথচ ভয়-জাগানিয়া বড়োগল্প। সেটিও রইল এখানে।
এমন বইয়ে জেমস্ নিজে না-থাকা মানে তো শিবহীন যজ্ঞ! তাই তিনিও রইলেন।
এই ন’টি জেমসিয়ান হররের পর এই বইয়ে এসেছে শার্লক হোমসের একটি অনূদিত প্যাস্টিশ। এরাও ভয়ের গল্প, তবে একটু অন্যরকম। এর একটিতে আতঙ্কের উৎস অলৌকিক। আর অন্যটিতে… সেটা আপনারাই পড়ে দেখুন না হয়।
গল্পগুলো রাতে পড়বেন, প্লিজ। ভয় পাবেন কি না— জানি না। তবে আনন্দ পাবেন।
ধন্যবাদ ও নমস্কারসহ,
ঋজু গাঙ্গুলী
ফেব্রুয়ারি ২০২১




Leave a Reply