রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
দুটি হার্ড বয়েলড থ্রিলার
প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০২০
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : রাহুল ঘোষ
.
বিপুলপাপ আর দুটি পাল্প উপন্যাস
জ্যাজ কিংবা সুপারহিরোদের মতো হার্ড বয়েলড প্রাইভেট ডিটেকটিভও একেবারেই মার্কিন সভ্যতার অবদান। মার্কিন ‘পাল্প’ বই ও ম্যাগাজিনে নাগাড়ে প্রকাশিত হত তাদের কার্যকলাপ। এই ‘পাল্প’ শব্দটি বহু ব্যবহারে এখন এক ভিন্নতর রূপ ধারণ করেছে। সস্তা, চটুল, বাজারি, অপেক্ষাকৃত নিম্ন রুচির সাহিত্য ইদানীং ‘পাল্প’ আখ্যায় ভূষিত হচ্ছে। কিন্তু আদতে সাহিত্যের গুণাগুণের সঙ্গে ‘পাল্প’ শব্দটির কোন সম্পর্কই নেই। ‘পাল্প’ শব্দটি এসেছে ‘পাল্পউড’ থেকে। অক্সফোর্ড ডিকশনারির ভাষায় যা হল ‘soft mass of wood fibre, used for making paper’। খুব সস্তা, হলদেটে, খসখসে এক ধরনের কাগজে, মাঝারি থেকে বাজে মানের ছাপায় ছাপা হত এই ম্যাগাজিনগুলো। অবশ্য এরও ইতিহাস আছে। ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ম্যাগাজিনের আকারে কিছু ‘dime novels’ প্রকাশিত হত আমেরিকায়, তার মূল উপজীব্য ছিল রহস্য, অ্যাডভেঞ্চার ও ওয়েস্টার্ন কাউবয়ের কীর্তিকলাপ। আমেরিকার অলিগলিতে গজিয়ে-ওঠা ভাওডেভিল, তার সস্তা জনপ্রিয়তায় মাতোয়ারা জনগণ আর সদ্য আসা বিপুলসংখ্যক উদ্্বাস্তুর ‘তথাকথিত’ অসংস্কৃত রুচির পালে হাওয়া লাগিয়েছিল এই dime novel-রা। পাল্প ফিকশন আর পাল্পউড ম্যাগাজিনরা এই ‘ডাইম’ নভেলেরই উত্তরপুরুষ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে-না-হতেই আমেরিকার সমাজচিত্র এক অদ্ভুত পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। আমেরিকা যেন সাততাড়াতাড়ি যুদ্ধের রেশ কাটিয়ে সামনের দিকে দৌড়োতে শুরু করে। প্রেসিডেন্ট কেলভিন কুলিজ ঘোষণা করেন, ‘the business of America is business’. হঠাৎই গোটা মার্কিন সমাজ হাত-পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল। বেকারত্ব কমল, ব্যাবসা বাড়ল, স্টক মার্কেট ফুলে-ফেঁপে উঠতে লাগল ক্রমান্বয়ে। এদিকে ১৬ জানুয়ারি, ১৯২০-তে রীতিমতো আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হল মদ বিক্রি ও মদ্য সেবন। ফলে ঝাঁ-চকচকে নিউইয়র্ক শহরের অন্ধকার গলিতে, হাডসন নদীর গোপন বাঁকে লুকিয়ে-চুরিয়ে চলতে লাগল মদের কালোবাজারি। শুধুমাত্র মদের বোতল সঙ্গে রাখার দোষে ছা-পোষা সাধারণ মানুষও মিশে গেলেন দুর্দান্ত অপরাধীদের সঙ্গে একাসনে। গজিয়ে উঠল গ্যাংস্টারের দল, বুটলেগাররা আর আল-কাপোনের মতো চোরাচালানকারীরা। আর এদেরকে নিয়ে সংবাদপত্র শুরু করল এক নতুন সাংবাদিকতা, যা আজ বিশ্বজুড়ে ‘জ্যাজ জার্নালিজম’ নামে খ্যাত। ১৯১৯ সালের ২৬ জুন, ‘Illustrated Daily News’ প্রথম প্রকাশ করল ‘ট্যাবলয়েড’ নিউজপেপার। দেখাদেখি ‘Chicago Tribune’-ও তাদের পত্রিকার আকার কমিয়ে ‘ট্যাবলয়েড’ আকার বানিয়ে দেয়। Tribune-এর প্রকাশক জোসেফ প্যাটারসন বুঝতে পারেন, এই ধরনের পত্রিকা খুব সহজে সঙ্গে রাখা যায়। পড়তে গিয়ে কাউকে অসুবিধেয় ফেলতে হয় না। দরকার হলে পকেটেও ভরে ফেলা যায়। বছর ঘুরতে-না-ঘুরতে প্যাটারসন আরও একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেন তাঁর পত্রিকায়। ব্যস্ত মার্কিন নাগরিকদের পক্ষে লম্বা খবর পড়া অসুবিধের। তাই কথা কমল, ছবি বাড়ল, মিডিয়া টাইকুন উইলিয়াম রানডলফ্ হার্স্টের এই ব্যাবসাটা বুঝতে বিন্দুমাত্র সময় লাগল না। ২৪ জুন ১৯২৪ আমেরিকার নিউজস্ট্যান্ডে প্রকাশ পেল ‘New York Daily Mirror’। পাঠক টানার জন্য যার মুখ্য হাতিয়ার ছিল চমকে-দেওয়া শিরোনাম, রগরগে বর্ণনা আর চনমনে ছবি। এদের প্রধান আকর্ষণ ছিল যৌনতা আর অপরাধে। দেখাদেখি ‘Daily Graphic’ পত্রিকাও বাজারে নেমে পড়ল। অদ্ভুত সব অপরাধ, যৌন ঈর্ষা, খুন, ডিভোর্স, পরকীয়া প্রেম, রক্তপাত, হত্যার শিহরন-জাগানো বর্ণনা আর ছবিতে (সে-ছবি মিথ্যে হলেও) সাজানো থাকত প্রতিটি সংখ্যা। নিত্যনৈমিত্তিকের পরিশ্রমে ক্লান্ত মার্কিন সমাজ গোগ্রাসে গিলত এসব, পেত ক্ষণিকের বিনোদন। Graphic-এর বিখ্যাত শিরোনামগুলো ছিল এইরকম, ‘I know who killed my brother’ কিংবা ‘For 36 Hours I Lived Another Woman’s Love Life’— যা পড়লেই গোটা ঘটনা না পড়ে পাঠক থাকতেই পারবেন না, সঙ্গে ছবিও তেমনি। এদের বলা হত ‘Composograph’। অনেক সময়ই হাতে ছবি এঁকে বা অভিনেতাদের দিয়ে ইচ্ছেমতো ছবি তুলিয়ে তাতে খবরের পাত্রপাত্রীর মুখ superimpose করা হত, সঙ্গে স্পিচবাবল সমেত। ফলে জনগণের পাঠের ধরনটাই বদলে গেল খোলনলচে সমেত। সংবাদপত্রের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠল পাল্প-ম্যাগাজিনরা। বিশের দশকে মাসে প্রায় ৫০০টি করে পাল্প কাহিনি প্রকাশিত হতে লাগল। ঘটনা ও লেখকে পার্থক্য থাকলেও কতকগুলো ব্যাপারে তাদের মিল ছিল দেখার মতো। এরা সবাই ছিল রীতিমতো সস্তা, অর্থাৎ দাম জনগণের সাধ্যের মধ্যে (এক ডাইম থেকে পনেরো সেন্টের মধ্যে); উজ্জ্বল, ঝকঝকে, রঙিন মলাট যাতে কাহিনিরই কোনো রগরগে বা টান টান দৃশ্য প্রায় ফটোগ্রাফিক ডিটেলে আঁকা, সবচেয়ে বড়ো কথা কাহিনি ছিল অ্যাকশন বা অ্যাডভেঞ্চার নির্ভর— কোনো আদর্শ কিংবা দর্শনের প্রশ্নই ছিল না। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাতায় পাতায় নিত্যনতুন ঘটনা, অসহ্য সাসপেন্স আর সুতীব্র ভায়োলেন্স পাঠককে নিশ্বাস ফেলতে দেয় না। বিশের দশকে গড়ে-ওঠা এই নতুন ‘সাহিত্যধারা’ প্রতি হপ্তায় লক্ষ লক্ষ কপি বিকোতে লাগল। প্রথম দিকে এই ‘পাল্প’ ম্যাগাজিনরা সব ধরনের স্বাদের কাহিনিই প্রকাশ করত। প্রতিটি সংখ্যায় একইসঙ্গে ওয়েস্টার্ন, অ্যাডভেঞ্চার, কল্পবিজ্ঞান, রহস্য, এমনকী খেলাধুলার গল্পও থাকত। উদাহরণ হিসেবে বলাই যায়, বিশ্বখ্যাত পাল্প ম্যাগাজিন ‘Black Mask’-এর প্রথম দিকের মলাটে প্রায়ই ওয়েস্টার্ন কাউবয়দের ছবি থাকত। বিশ শতকের মাঝামাঝি এরা সবাই রহস্য-রোমাঞ্চের দিকে ঝুঁকে পড়ে (একমাত্র ‘Weird Tales’ নামের ম্যাগাজিনই বহুদিন পর্যন্ত কল্পবিজ্ঞান আর বিচিত্র রূপকথার কাহিনি প্রকাশ করত)।
এই সমস্ত ‘পাল্প’ ম্যাগাজিনগুলির অসম্ভব জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ ছিল গল্পের মুখ্য চরিত্র হিসেবে হার্ড-বয়েলড ডিটেকটিভের আত্মপ্রকাশ। নাম তার যা-ই হোক না কেন, চরিত্রগতভাবে সে নিঃসঙ্গ, একলা। তার দুর্নিবার লড়াই ভয়ংকর সব চোরাচালানকারী, খুনি, অপরাধী, শয়তান, রাজনৈতিক নেতাদের সাথে। প্রায়ই এসব গোয়েন্দারা একাধিক কাহিনিতে আবির্ভূত হতেন এবং প্রতিটিতেই অমিতশক্তিধর ভিলেনদের (বেশিরভাগই পুরুষ) বুদ্ধি ও শক্তির জোরে হারিয়ে দিতেন। চিরাচরিত গোয়েন্দাদের মতো ছিলেন না এঁরা, অনেক বেশি মারকুটে। বন্দুক চালানো থেকে ঘোড়ায় চড়ায় সিদ্ধহস্ত, দরকারে পাইপ বেয়ে উঠতে পারেন, লোহার রড দিয়ে প্রতিপক্ষের মাথা ফাটাতে পারেন, আবার শত আঘাত খেলেও কাহিনির শেষে ঠিক বেঁচে থাকেন। এই ধরনের গোয়েন্দা প্রথম সৃষ্টি করেন লেখক ক্যারল জন ড্যানি। ১৫ মে, ১৯২৩ সালে প্রকাশিত ‘Three Gun Terry’ কাহিনিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে প্রথম হার্ড-বয়েলড ডিটেকটিভ টেরি ম্যাকের। তার ঠিক পরেই ড্যালি সৃষ্টি করেন গোয়েন্দা রেস উইলিয়ামসকে— সিরিজ গোয়েন্দাদের মধ্যে প্রথম হার্ড-বয়েলড গোয়েন্দা। লেখক হিসেবে নিতান্ত অপটু হলেও পাল্প গোয়েন্দা সাহিত্যের প্রাথমিক ব্যাকরণ ড্যালির হাতেই তৈরি হয়। পরবর্তীতে ‘Black Mask’, ‘Detective Fiction Weekly’, ‘Dime Detective’ নামের পাল্প ম্যাগাজিনরা ভরে ওঠে ড্যাসিল হ্যামেটের কন্টিনেন্টাল অপ, ফ্রাঙ্ক গ্রুবারের অলিভার কোয়েড, রামন ডেকুলার জো গ্যার, নোবার্ট ডেভিসের মাক্স লাতিন, জর্জ হারমোন কক্সের ফ্ল্যাশ কেসি, কিংবা রবার্ট রিডের কেনিস্মিথের নানা কাহিনিতে।
পাল্পের গোয়েন্দারা আদর্শবাদী এবং নির্মম। তারা অপরাধের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীকেও ঘৃণা করে। পাল্পের জগৎ এক বিচিত্র সাদা-কালো জগৎ। এখানে ধূসরের কোনো স্থান নেই। পাল্পের ঝকঝকে মলাটের মাঝে লুকিয়ে থাকা হলদে, খসখসে পাতায় পাতায় শুধুমাত্র ধর্মের জয় আর অধর্মের পরাজয় রচিত হয়। তিরিশের দশকের মহা মন্দার সময় এই ‘পাল্প’ কাহিনি তার জনপ্রিয়তার চরমে ওঠে। আমেরিকার মহা মন্দা, বেকারত্ব, নেতাদের কারচুপি আর প্রত্যহের দুর্দশায় অস্থির মানুষ পাল্পের গোয়েন্দাদের মধ্যে যেন নিজেকেই খুঁজে পেত— গোয়েন্দাপ্রবরের মতো সেও লড়াই করতে চাইত তার সঙ্গে ঘটা যাবতীয় অন্যায়ের।
গোয়েন্দাকে বাদ দিলে পাল্প ফিকশনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যাবশ্যকীয় চরিত্র হল ‘লার্জার দ্যান লাইফ’-এ এক ভিলেনের উপস্থিতি। গোয়েন্দাকে মহান হতে গেলে ভিলেনকেও হতে হবে এতটাই ক্রূর, নীচ, বিবেকহীন ও শক্তিশালী যে, একমাত্র অমিত-ক্ষমতাশালী নায়কই পারবে তার মোকাবিলা করতে। গোয়েন্দার পথ কণ্টকসংকুল। প্রতি মুহূর্তে পাঠক ভাববে এবার বুঝি তার শেষরক্ষা হল না—কিন্তু সব বিপদকে হেলায় তুচ্ছ করে শেষ পর্যন্ত জয় নায়কেরই হয়। তবে পাল্প গোয়েন্দা কাহিনিতে তিরিশের দশকের শুরু থেকে এক নতুন ধরনের ভিলেনের আবির্ভাব হয়। এরা চোর, আইন ভঙ্গকারী— কিন্তু রবিন হুডের মতো। এরা মানুষ খুন করে না, গরিবদের উপর অত্যাচার করে না। এরা শুধু ধনী মানুষদের লুণ্ঠন করে, যারা নানা কুটিল উপায়ে সে-ধন সংগ্রহ করেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিন রুটির জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানো, না খেতে পাওয়া, বেকার মার্কিন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা এদের গোয়েন্দার থেকেও বেশি আপন করে নেয়। এদের সিরিজে মজাটা হত অন্য জায়গায়। ভিলেন কখনোই ধরা পড়ত না, বা পড়লেও শেষ মুহূর্তে পালিয়ে যেত, আর বই থেকে বইতে গোয়েন্দা পালটে গেলেও ভিলেন পালটাত না। কিছু ক্ষেত্রে তো এইসব ভিলেনদের গোয়েন্দার ভূমিকাও পালন করতে হত। ধরা যাক কোনো খুন হয়েছে, যা সেই ভিলেন করেনি, কিন্তু পুলিশ তাকেই সন্দেহ করছে। সেক্ষেত্রে ভিলেন নিজেই নেমে পড়ে আসল অপরাধীকে ধরতে।
পাল্প ম্যাগাজিনের তৃতীয় স্তম্ভটি হল মহিলা চরিত্র। প্রথম দিকে পাল্প কাহিনির মুখ্য চরিত্র হিসেবে মহিলারা প্রায় অনুপস্থিতই ছিল। ‘Black Mask’-এ প্রথম দশ বছর মহিলা চরিত্র কম ছিল আর কোনো পাল্পেই মহিলা লেখকদের দিয়ে লেখানো কিংবা মহিলা চরিত্রদের নিয়ে সিরিজ তৈরির কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। যেসব লেখক মহিলাদের নিয়ে কিছুমাত্রও লিখেছেন, তাঁদের কলমে মহিলারা হয় নিষ্পাপই নয় তো খারাপ মেয়ে। কাহিনিতে তারা সর্বদাই আক্রান্ত ভিলেন অথবা গোয়েন্দার হাতে। পাল্পের ভাষায়, ‘They got what was coming to them’। অবস্থাটা বদলাতে থাকে তিরিশের দশক থেকে। গোয়েন্দার সহকারী, গার্লফ্রেন্ড, রিপোর্টার হিসেবে মহিলা চরিত্রদের উত্থান ঘটে। তাদের সম্বোধনও করা হত girl, doll, honey, sugar, baby অথবা cutie বলে। শেষ দৃশ্যে তাদের বাঁচাতে দরজা কিংবা জানলা ফুঁড়ে উদয় হতেন নায়ক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই দৃশ্যটিকেই চিত্রায়িত করা হত বইয়ের উজ্জ্বল প্রচ্ছদে। ফলে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মহিলাদের অপরূপা সুন্দরী ও সেক্সি হতেই হত। সঙ্গে ছিল লো-কাট পোশাক, বক্ষ বিভাজিকা কিংবা শরীরী বিভঙ্গের অমোঘ আকর্ষণ। ‘Gun Molls’, ‘Saucy Stories’, ‘Spicy Detectives’-এর মতো ম্যাগাজিনরা নারী শরীরকে অবলম্বন করেই একের পর এক প্রচ্ছদ তৈরি করতে থাকে। এদের আসল পাঠক ছিল অল্পবয়েসি মার্কিন শ্রমিক শ্রেণি, যারা তাদের মাসিক আয়ের দশ শতাংশ পর্যন্ত এই ম্যাগাজিন ও বইগুলোর পিছনে ব্যয় করত। মধ্য তিরিশের দশকে মহিলাদের ভূমিকা আবার বদলাল। কিছু কিছু সিরিজ তৈরি শুরু হল মহিলা ভিলেনদের নিয়ে। প্রায়শই তারা বহিরঙ্গে অপরূপা এবং ধনী। যৌনতার প্রলোভনে ফাঁসিয়ে তারা চুরি করে নেয় দামি হিরে, জহরত, মণি-মুক্তা। পাল্পের গোয়েন্দা প্রায়ই অসহায় তাদের হাতে। প্রথম দিকে খুনজখমে যুক্ত না থাকলেও চল্লিশের দশকে বিষ প্রয়োগ ও দু-হাতে বন্দুক চালানোতে মেয়েদের জুড়ি ছিল না। মহিলা ভিলেনদের পাশাপাশি উদয় হয় মহিলা গোয়েন্দারাও। আচার-আচরণ বা যৌন আকর্ষণে বিন্দুমাত্র পিছিয়ে নেই তারা। তবে আস্তে আস্তে তাদেরও বিবর্তন ঘটে। যুবতী, বয়স্কা, সুন্দরী, সাধারণ, হাসিখুশি গোমড়া সাহসী, ভীতু, উগ্র, শান্ত, সৎ, অসৎ— এককথায় পাল্পের পুরুষ চরিত্রদের মতোই বিচিত্র রূপে মহিলাদের দেখতে পাওয়া যায়। তারা আর পুরুষদের থেকে পিছিয়ে রইলেন না কোনোমতেই।
ড্যাসিল হ্যামেট নিজে ছিলেন গোয়েন্দা। এককালে কাজ করতেন পিংকারটন ডিটেকটিভ এজেন্সিতে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। যাদের নিয়ে গল্প ফেঁদেছিলেন স্বয়ং কোনান ডয়েল তাঁর ‘ভ্যালি অফ ফিয়ার’-এ। পিংকারটন থাকার দিনে তাঁর সত্যিকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯২৯ সালে হ্যামেট লিখে ফেলেন ‘রেড হার্ভেস্ট’, হার্ড বয়েলড ডিটেকটিভ নিয়ে লেখা প্রথম বড়ো উপন্যাস। উপন্যাসটি ঐতিহাসিক, কারণ বহু ঘটনা ১৯২০ সালের মন্টানা তার খনির হত্যাকাণ্ডের থেকে নেওয়া। এই বইয়ের প্রভাব অনন্য। গোয়েন্দা কন্টিনেন্টাল অপ এক আইকনিক গোয়েন্দা চরিত্র। ভাবতে অবাক লাগে, কুরোসাওয়ার ‘ইয়োজিম্বো’, পোলানস্কির ‘চায়নাটাউন’ কিংবা সের্জিও লিওনের ‘ডলার ট্রিলজি’র মতো কাল্ট ছবিদের অনুপ্রেরণা এই একটামাত্র বই। বইটির প্রথম লাইন ‘‘I first heard Personville called Poisonville by a red-haired mucker named Hickey Dewey in the Big Ship in Butte’’ বিশ্বের সেরা প্রথম লাইনদের মধ্যে স্থান পেয়েছে। ক্লাসিক হার্ড বয়েলড-এর আলোচনাই সম্ভব নয় যদি না এই বইয়ের আলোচনা হয়।
এই ধারায় দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বই অবশ্যই ‘দ্য বিগ স্লিপ’। লেখক রেমন্ড শ্যান্ডলার। বিগ স্লিপ মার্কিন স্ল্যাং-এ মৃত্যুর দ্যোতনা নিয়ে আসে। গোটা কাহিনিতে ঠাস বুনোট চমক, রেড হেরিং, পর্নোগ্রাফি আর অভিজাতদের অবনমনের কথা। বোগার্ট আর বিকলের ইতিহাস তৈরি করা নোয়ার ছবিটা মাথায় রেখেই বলছি, এই বই পড়ার মজাই আলাদা। ঊনবিংশ শতকের সেরা বইদের মধ্যে অন্যতম এই উপন্যাস। লেখক শ্যান্ডলারের অদ্ভুত বাক্যবন্ধ এক দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি করে। ১৯৩৯-এ প্রকাশিত এই উপন্যাস আদতে ব্ল্যাক মাস্ক ম্যাগাজিনে ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘কিলার ইন দ্য রেইন’ আর ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য কার্টেন’-এর অদ্ভুত আত্তীকরণ। নিজের বড়োগল্পকে মিলিয়ে এত অসামান্যভাবে এক সফল উপন্যাসের রূপ দেওয়ার উদাহরণ আগে পরে খুব বেশি নেই। শুধু এই দুটোই নয়, ফিঙ্গার ম্যান আর ম্যান্ডারিন’স জেড নামে দুটো ছোটোগল্প থেকেও শ্যান্ডলার তাঁর গল্পের উপাদান নিয়েছেন। শ্যান্ডলারের গোয়েন্দা ফিলিপ মার্লো এখনও পাল্প গোয়েন্দাদের মধ্যে অন্যতম সেরা। তাঁকে বাদ দিয়েও পাল্প আলোচনা বৃথা।
দুঃখের কথা, বাঙালি স্বপন কুমার বা শশধর দত্তর হার্ড বয়েলড গোয়েন্দার একাগ্র পাঠক হওয়ার পরেও সেরা দুটি পাল্প উপন্যাস নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয়। এত বছরে তাঁদের নিয়ে আলোচনা দূরে থাক, তাঁদের একটা ঠিকঠাক অনুবাদ অবধি হয়নি। কেন কে জানে! ঠিক যেমন মেইগ্রে, নিরো উলফ বা ম্যাক্স ক্যারাডসের উপন্যাসগুলোর ভালো অনুবাদ চোখে পড়ে না। এখনও বাঙালির কাছে বিদেশি গোয়েন্দা বলতে হোমস আর কিছুটা পোয়ারো। আমাদের ভাগ্য ভালো ঋজু গাঙ্গুলীর মতো গোয়েন্দা সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক পাল্প গোয়েন্দা কাহিনির সেরা দুটো কাহিনির অনুবাদ করেছেন সুন্দর ঝরঝরে গদ্যে। আমি নিজে মূল উপন্যাস দুটো পড়েছি, তবু ঋজু বাবুর অনুবাদ আমাকে আবার পড়তে বাধ্য করেছে। যঁাদের মূলটা পড়া নেই, তাঁরা এই বই পড়লে মূলের স্বাদ পাবেন সে-গ্যারান্টি দেওয়াই যায়।
তবে আর কী? আপনার পাল্প যাত্রা শুরু হোক…
কৌশিক মজুমদার




এক পেইজে এতবার “আরো দেখুন” আসাটা খুবই বিরক্তিকর। বই পড়ার ইচ্ছেটা নষ্ট হয়ে যায়। আপনারা স্ক্রিনের উপরের একটা অংশ বিজ্ঞাপনের জন্য রাখুন। প্রয়োজনে উপরে এক ইঞ্চি রাখুন (মোর দ্যান এনাফ) তাও বইয়ের মধ্যে ব্রেক না করার চেষ্টা করুন।
এমন হলে যত বই কালেকশন থাকুক, ভিজিটর আসা কমে যাবে।
সর্বোপরি, অসংখ্য বই কালেকশন এর জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
সরি, আমার ব্রাঊজারে একটা সমস্যা হয়েছিল। যার ফলে একই নোটিফিকেশন বার বার আসছিল। এখন ঠিক আছে। বিজ্ঞাপন কেন্দ্রিক ঝামেলা বেশি নেই। বিজ্ঞাপন ও আছে, বই পড়াও তেমন অসুবিধে হচ্ছে না। ধন্যবাদ
মাসে মাসে বাড়তি কিছু টাকাপয়সা ম্যানেজ করতে পারলে বিজ্ঞাপন একেবারেই বাদ, বা কমিয়ে দেয়া হবে।
Bhai notun boi upload korun