ডেকাগন – ঋজু গাঙ্গুলী
কল্পবিজ্ঞান-থ্রিলার সংকলন
কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনস
Decagon
A Collection of Science Fiction Thriller Stories
by Riju Ganguly
প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ২০১৯
বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের চার চিরসবুজ মহীরুহ
প্রেমেন্দ্র মিত্র, দিলীপ রায়চৌধুরী, অদ্রীশ বর্ধন
এবং সত্যজিৎ রায়ের উদ্দেশে
.
ভূমিকা
নমস্কার।
আগেই বলি, সবকিছুর জন্য দায়ী ‘কল্পবিশ্ব’!
এই ওয়েবজিনটা যখন প্রথম এল তখন ভেবেছিলাম, এটাও আর পাঁচটা পত্রিকার মতো ‘রোবটের চোখে জল’ আর ‘ভূত বনাম ভিনগ্রহী’ প্রকাশ করেই সন্তুষ্ট থাকবে। আমিও ‘বাড়ি’ নামে একটা ভূতের গল্পই সেখানে পাঠিয়ে দিব্যি ছিলাম। কিন্তু তারপর দেখি, এই পত্রিকা একদম ‘সিধি বাত, নো বকওয়াজ’ স্টাইলে কল্পবিজ্ঞান লেখা তুলে আনতে চাইছে। অঙ্কিতা আর সন্দীপনের গল্প, বেশ কিছু প্রবন্ধ—এ-সব পড়ে তখন বেশ হিংসেই হচ্ছে এই ভেবে যে আমি কেন এইরকম লিখতে পারি না? যা-থাকে-কপালে ভেবে, আসিমভকে অদৃশ্য গুরু মেনে, লিখে ফেললাম হালকা রহস্য, কিছুটা মজা, আর সেই পরিমাণে রোমাঞ্চ মিশিয়ে একটা গল্প। তবে সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের তুলে আনলাম এক গভীর অভিমানের জায়গা থেকে।
অভিমান কেন বলুন তো? কারণ অদ্রীশ বর্ধনের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি প্রফেসর নাট বল্টু চক্র আর দীননাথ নাথের অ্যাডভেঞ্চারগুলো পড়তে-পড়তে অভিমানই হত। মনে হত, কেন লেখক এই দুই চরিত্রকে আরেকটু সিরিয়াসলি নিলেন না? কেন তিনি এই দুই চরিত্রের মাধ্যমে ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন’ ডানা লাগিয়ে বাঙালিকে নিয়ে গেলেন না দূরে, আরও দূরে? ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের আঁকায় সেই প্রনাবচ-ই আমার সামনে আরও রাগি, আরও সিরিয়াস, এবং আরেকটু ধারালো হয়ে এক অতিপ্রিয় অভিনেতার নাম নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন। সাংবাদিক দীননাথ নাথও অনেকটা পলিশড, আধুনিক, এবং নারায়ণ সান্যালের আঁকায় ইন্দ্রজিৎ রায়ের মতো চেহারা নিয়ে মাথা তুললেন রোভার্স থেকে অনেক দূরে আমার নিজস্ব খেলার মাঠে। তাঁদের নিয়ে লেখা ‘ভুল’ নামের সে গল্প বেরোল নভেম্বর ২০১৬-য়।
তারপরেই ফ্লাডগেট খুলে গেল।
পরের এক বছরে আরও চারটে কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখলাম আমি, যারা সবাই ইতিমধ্যেই ‘দশ’-এ এসে গেছে। রয়-ধৃতিমান সিরিজেও আরও চারটে গল্প এল পরের এক বছরে। আর তারপরেই ঘটল এক বিপর্যয়। বাঙালিকে কল্পবিজ্ঞান চেনানো, ধৃতিমান আর রয়ের আসল অনুপ্রেরণা অদ্রীশ বর্ধন দারুণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
তাঁর বাড়িতে গিয়ে, কলমে দিগ্বিজয়ী মানুষটির সেই ভগ্ন দশা দেখে আমি ভেতরে-ভেতরে দুমড়ে গেছিলাম। তাও হয়তো সামলে নিতাম, কিন্তু তার কিছুদিন আগেই আমার বাবা মারা গেছিলেন। এক অতি প্রিয় সাহিত্য-পরিবারের সঙ্গেও ঘটেছিল অত্যন্ত দুঃখজনক বিচ্ছেদ। সব মিলিয়ে আমি বুঝতে পারছিলাম, ধৃতিমান আর রয় আমাকে ত্যাগ করেছেন। সিরিয়াসলি ভাবছিলাম, আমি আর কল্পবিজ্ঞান লিখতে পারব না। তখনই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমি একটা গ্রাফিক নভেল পড়লাম।
ওল্ড ম্যান লোগান!
‘ওয়াচমেন’ আর ‘ডার্ক নাইট রিটার্নস’ নিয়ে লোকে টেরাবাইট খরচা করে ফেলে, কিন্তু এই বইটা নিয়ে তার ভগ্নাংশও বলে না। অথচ স্মৃতি, অনুতাপ, ক্রোধ, প্রতিশোধ, আর প্রায়শ্চিত্তের এত বড় মহাকাব্য আমাদের সময়ে আর একটিও লেখা হয়েছে বলে মনে হয় না। ওটা পড়তে-পড়তেই আমার চোখের সামনে দানা বাঁধল কয়েকটা চরিত্র—মরুভূমি, একটা মেয়ে, কিছু দস্যু, ট্রাক, রক্ত-ঘাম-অশ্রু, আর হুইলচেয়ারে বসে থাকা একটা বুড়ো।
বিস্ফোরণের মতো আমার মাথা থেকে বেরিয়ে এল একটা গল্প ‘প্ল্যান’! সে গল্প বেরোল অরণ্যমন থেকে প্রকাশিত সংকলন ‘প্রহেলিকা’-তে। তারপর এল আরও চারটে গল্প, যাদের মধ্যে দুটো তো উপন্যাস বললেই চলে। এদের সবাইকে নিজের চওড়া কাঁধে বহন করল ‘কল্পবিশ্ব’-ই।
এবার, অবশেষে, আমার দুঃসাহসিক অপপ্রয়াসের দশটি নমুনা এল এই বইয়ের দু’মলাটের মধ্যে। এদের গ্রন্থবদ্ধ করার দুষ্কর্মটি করেছেন কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনের কর্ণধারেরা। তাই বইটা পড়ে যদি মনে হয় “এইসব হাবিজাবি ছাপানোর কী দরকার ছিল?” তাহলে নির্দ্বিধায় তাঁদের ধরবেন। গল্পগুলো ভালো লাগলেও সিংহভাগ কৃতিত্ব তাঁদেরই দিয়েন, কারণ কল্পবিশ্ব না থাকলে এরা জন্মই নিত না।
এর চেয়ে বেশি সত্যিই কিছু বলার নেই। যা বলার তা এই দশটা গল্পই বলুক এবার।
ভালো থাকবেন।
ঋজু গাঙ্গুলী
ডিসেম্বর, ২০১৯
.
ঋজু গাঙ্গুলী। জন্ম: ৬ নভেম্বর ১৯৭৪। স্নাতকোত্তর, কেন্দ্রীয় সরকারি চাকুরে। কল্পবিজ্ঞান এবং রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের অনুরাগী পাঠক। বিভিন্ন লেখালেখি প্রকাশিত হয়েছে ‘কল্পবিশ্ব’ এবং আরও ক-টি ওয়েবজিনে, মাঝেমধ্যে অন্য পত্রপত্রিকায় আর বার্ষিকীতেও।




Leave a Reply