ব্লু – ঋজু গাঙ্গুলী

ব্লু

এখন

পায়ের নীচে সরু একফালি সাদা লিনোলিয়ামের স্ট্রিপ। দু’পাশের ধবধবে সাদা দেওয়ালটাই অর্ধবৃত্তাকারে বাঁক নিয়ে মাথার ওপরে ছাদ হয়ে গেছে। তাই রয়ের মনে হচ্ছিল, ও যেন একটা টানেলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সামনে পড়ে ছিল নিরাপত্তা রক্ষীর শরীরটা। বেশ কয়েক বছরের ক্রাইম বিটের অভিজ্ঞতা নিয়েও রক্ষীটির মৃত্যুযন্ত্রণায় বেঁকে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠেছিল রয়। কিন্তু ও জানত, থামলে চলবে না।

বিচিত্র এই বডিস্যুট পরে হাঁটা ভীষণ কঠিন, তবু যথাসম্ভব দ্রুত পা ফেলতে হচ্ছিল ওকে। ঘাড়ের ওপর টাইট করে বসানো হেলমেট-টা ভারী হয়ে উঠেছে। কপালে জমে ওঠা ঘামের সঙ্গে ওর শ্বাসও ঝাপসা করে তুলছে হেলমেটের সামনেটা।

কিন্তু অন্য সব অনুভূতি চাপা দিয়ে জোরালো হয়ে উঠছে ভিজরের নীচে, ডান কোণে লাল হরফে জ্বলতে থাকা সংখ্যাগুলো। অক্সিজেনের ভাঁড়ার খালি হয়ে আসছে ওর স্যুটে। রয় জানে, এর থেকেও দ্রুত শূন্য-র দিকে এগোচ্ছে ল্যাবরেটরির দরজার ওপরের ডিসপ্লে-প্যানেল।

দরজার স্লটে ডক্টর কেইন-এর কার্ডটা সোয়াইপ করতেই সবুজ হয়ে ওঠে ওপরের আলোটা। দরজাটা খুলে যায়।

এগিয়ে যায় রয়। মোড় ঘোরামাত্র ও দেখতে পায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ফুয়াদ-কে। ব্লাস্টারের তীব্র তাপ ওর বুকে একটা নিখুঁত গর্ত করে দিয়েছে।

সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে রয়। এই করিডরটা সোজা, কিন্তু অনেকটা লম্বা, যার অন্য প্রান্তে দরজার পাশে নিরাপত্তা রক্ষীর দাঁড়িয়ে থাকার কথা।

হেলমেটের মধ্য দিয়ে দেখলে সবকিছু ‘টানেল ভিশন’-এর মতো করেই দেখায়, যেখানে কাছের জিনিসগুলো সবচেয়ে বড়, আর দূরের জিনিসগুলো ছোট হতে-হতে প্রায় বিন্দুবৎ। তা সত্বেও রয় বোঝে, দরজার পাশে যার দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল সেই রক্ষীটি এই মুহূর্তে মাটিতে পড়ে আছে। শুধু দরজার ওপর লাল আলোটা দপদপ করছে। ওই আলোর নীচে ওকে পৌঁছতে হবে, যেভাবে হোক।

গা ঘিনঘিনিয়ে উঠলেও ফুয়াদের শরীরটা টেনেহিঁচড়ে এনে, সেটাকে দরজার সেনসর প্যানেলের গায়ে ঠেকিয়ে রাখে রয়, তারপর আবার এগোতে থাকে। পিং করে একটা আওয়াজ ভেসে আসে ওর কানে। রয় বোঝে, সিকিউরিটি প্রোটোকল মেনে ওর পেছনে আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল দরজাটা, যেটা খুলে ও এই করিডরে ঢুকেছিল। আপাতত সেটা ঠেকানো গেছে।

কিন্তু আসল বিপদের সঙ্গে তো ওর হেলমেটের ভেতরে ফুরিয়ে আসতে থাকা অক্সিজেনের কোনও সম্পর্ক নেই। এমনকী করিডর দিয়ে এই মুহূর্তে বয়ে চলা বিষ-বাতাস নিয়েও ও ভয় পাচ্ছে না। কিন্তু ল্যাবের নীচে রাখা মৃত্যুবাহী বাক্সটা যে বিপদের জন্ম দিয়েছে, তাকে কি ঠেকাতে পারবে ও?

রয়ের মনে পড়ে, মাত্র কিছুক্ষণ আগে এই করিডর দিয়েই হনহনিয়ে হেঁটে গেছিল ও। শুধু তখন ওর সঙ্গে ছিলেন প্রফেসর ধৃতিমান।

তখন

“আমি জানি এই কাজটা আপনার রেগুলার ‘বিট’-এ পড়ে না প্রফেসর।” যথাসম্ভব দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলছিল রয়, “কিন্তু তা বলে কপালটা এতখানি, আর এতক্ষণ ধরে, কুঁচকে নাই বা রাখলেন।”

“তোমার ভাষায় যেটা ‘বিট’ আমার ভাষায় সেটাই ল্যাবরেটরিতে নিজের কাজে ডুবে থাকা।” স্বভাবসিদ্ধ চেবানো ভঙ্গিতে বলেন ধৃতিমান, “সেখান থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে বলে আমার খারাপ লাগছে ঠিকই। কিন্তু আমার বিরক্তির আসল কারণ সেটা নয়।”

চুপ করে যান ধৃতিমান। রয় জানে, না খোঁচালে ওঁর মুখ থেকে কথা বের করা শক্ত। তাই ও একটা টোপ ফেলে, “আপনি কি ডক্টর কেইন-এর ওপর কোনও কারণে…?”

প্রত্যাশিত বিস্ফোরণ হয় না। একটু বিষণ্ণ গলায় বলেন ধৃতিমান, “কেইন আর ওর মতো আরও অনেকে সেই কাজটা অনেক দিন ধরেই করছে, যেটা আমাকে বহুবার করতে বলা হয়েছিল। আমি যে অফারগুলো পেয়েছিলাম সেগুলো ওদের পাওয়া যে কোনও প্রস্তাবের থেকেও লোভনীয়। কিন্তু…”

রয় বুঝতে পারে ব্যাপারটা। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অংশে ওরা যাচ্ছে সেদিকটা বিশেষ কিছু গবেষণার জন্যেই কাজে লাগে। বিভিন্ন ধনী ব্যক্তির শখ-আহ্লাদ মেটানো বা কর্পোরেট সংস্থাগুলোর কথামতো কোনও প্রোটোটাইপ বানানো—এগুলোই হয় এখানে। এদের থেকে সাধারণ মানুষ কোনও ভাবেই উপকৃত হয় না। কিন্তু বাজেটে কাটছাঁটের ধাক্কায় নাভিশ্বাস তোলা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিরুপায় হয়ে এগুলো করতেই হয়।

এথিক্স কমিটির তরফে ওদের দু’জনকেই আজ এখানে আসতে বলা হয়েছে ডক্টর কেইন এবং তাঁর নিজস্ব ‘প্রোডাক্ট’-কে ভালো ভাবে দেখার জন্য। নিজের অজান্তেই গম্ভীর হয়ে ওঠে রয়। একটা অসহায় নিরপরাধ প্রাণীকে এক বড়লোকের খেয়াল মেনে গিনিপিগ বানিয়েছে লোকটা! কে জানে, হয়তো একটি হাঁসজারু বা বকচ্ছপ গোছের জিনিস দেখতে হবে এখন। শুধু একবার এটা প্রমাণ হোক যে প্রাণীটিকে কষ্ট দিয়ে কাটাছেঁড়া করে এই কাইমেরা বানানো হয়েছে, তারপর ও দেখবে ডক্টর কেইনের ক’বছর শ্রীঘর-বাস হয়!

ওদের সঙ্গে ডক্টর আলি’র আসার কথা ছিল, কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে খবর আসে যে উনি আসতে পারছেন না। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছিল অবশ্য আলি’র না থাকাটা। ভদ্রলোকের কিছু-কিছু চিন্তাভাবনা এতটাই রণচণ্ডী গোছের, যে মাথা ঠান্ডা রেখে ব্যাপারটার গভীরে ঢোকা যেত না।

রয় লক্ষ করেছিল, পাহাড়ের মাথায় বানানো এই বাড়ির স্থাপত্যে চেনাজানা গড়নের বদলে একটা সম্পূর্ণ অন্যরকম গঠনশৈলী অনুসৃত হয়েছে। এখানে উপবৃত্তাকার ঘরগুলো গোলাকার বা টানেলের মতো করিডর দিয়ে যুক্ত। কৌতূহলী চোখে ও তাকিয়েছিল ধৃতিমানের দিকে।

দ্রুত হাঁটার ফলে হাঁফ ধরেছিল ধৃতিমানের। কিন্তু রয়ের কাছ থেকে সেটা আড়াল করার জন্য শীর্ণ চেহারাটা টানটান করে নেওয়ার ফাঁকে একটা লম্বা শ্বাস নেন তিনি। তারপর বলেন, “এখানে প্রায়ই এমন সব জিনিস নিয়ে কাজ করতে হয় যেগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে গেলে সাংঘাতিক বিপদ। তাই ল্যাবগুলো এমনভাবে বানানো, যাতে বিপদ ঘটলে সেগুলোকে দ্রুত মূল বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়। বায়োহ্যাজার্ড সামলাতে পারা বিশেষজ্ঞের দল এসে পরিস্থিতি সামাল দিলে তবেই এই দরজাগুলো খোলা যাবে।”

ততক্ষণে ওরা পৌঁছে গেছিল ওই দরজাটার ওপাশে। তখনই একগাল হাসি আর হাতে একটা ট্যাব নিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে এসেছিল ওই লোকটা।

এখন

“রয়!” হেলমেটের ভেতরে স্পিকারটা হঠাৎই হিসহিসিয়ে ওঠে। ধৃতিমানের গলাটা স্পষ্ট হয়, “তোমাকে আমরা আর দেখতে পাচ্ছি না। তুমি ঠিক আছ তো?”

“হ্যাঁ প্রফেসর।” অমূল্য অক্সিজেন আরও কিছুটা ব্যয় করতে বাধ্য হয় রয়, “আমি মূল করিডরে এসেছি। যা আশংকা করেছিলাম আমরা, সেটাই সত্যি হয়েছে। দরজার কাছের রক্ষীও জীবিত নেই। ফুয়াদ এখানেই পড়ে আছে। তবে ও মারা গেছে ব্লাস্টারের আঘাতেই।”

ওপ্রান্ত কিছুক্ষণ নীরব থাকলেও রয় কিন্তু অত্যন্ত দ্রুত নিজের কর্মপন্থা বদলানোর কথা ভাবছিল। প্রতিটি সেকেন্ড যেখানে মূল্যবান, সেখানে হেলমেট আর বডিস্যুটের এই কম্বিনেশন ওর চলাফেরা মারাত্মক রকম আড়ষ্ট করে তুলেছে। এভাবে চললে ওর পক্ষে সময় থাকতে-থাকতে কিছু করার সম্ভাবনা খুব কম। তার বদলে…

ওর মনের কথাটা সম্ভবত আন্দাজ করেছিলেন ধৃতিমান, তাই স্পিকার সরব হয়ে ওঠে তখনই।

“হেলমেট খোলার কথা ভেব না। তুমি এখনও বেঁচে আছ স্রেফ ওটার জন্যেই। ফুয়াদ, মানে যদি লোকটার নাম আসলে ওটাই হয়, এমন কোনও অস্ত্র নিয়ে এগোয়নি যা দিয়ে রক্ষীটিকে দূর থেকে মেরে ফেলা যাবে। ওর পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। কিন্তু তবুও রক্ষীটি মারা গেছে, এটা থেকে একটাই জিনিস স্পষ্ট হয়।

ব্লাস্টারের আঘাতে মারা যাওয়ার আগেই ফুয়াদ আরও একটা ভায়াল বের করার সুযোগ পেয়েছিল। এও হতে পারে যে ব্লাস্টার থেকে বেরোনো রে যেখানে আঘাত করেছিল, সেখানেই রাখা ছিল দ্বিতীয় ভায়ালটা। অর্থাৎ, ওখানের বাতাসেও এখন শ্বাস নেওয়ার অর্থ মৃত্যুকে ডেকে আনা।”

ধৃতিমানের গলার আওয়াজটা আবছা হয়ে আসে রয়ের কানে। কান, এবং নজর স্পষ্ট করার জন্যে মাথাটা ঝাঁকানো মাত্র রয়ের মনে হয়, যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। কোনওরকমে পাশের দেওয়ালে ভর দিয়ে নিজেকে সামলায় ও। তারপর নীচের ঠোঁটটা কামড়ে দরজার দিকে এগোতে থাকে একটু-একটু করে। আর মিনিট দুয়েকের মধ্যে ওই দরজাটা না খুললে ওদের কারও নিস্তার নেই।

তখন

“ডক্টর ধৃতিমান? মিস্টার রয়?” হাসিমুখে এগিয়ে এসে ওদের দিকে হাত বাড়িয়েছিল লোকটা।

“আমি ফুয়াদ।” ওদের হাত ঝাঁকানোর ফাঁকে বলেছিল লোকটা, “যাঁর ফরমায়েশি ‘জিনিস’ দেখতে চলেছেন আপনারা, আমি তাঁরই সামান্য খিদমতগার। আপনারা যাতে কোনও ভাবে তাঁর সম্বন্ধে ভুল না ভাবেন, সেজন্যে তাঁকে, বা এই ‘জিনিস’ বানানো নিয়ে যে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার এক্তিয়ার আমার আছে। আজকে আপনাদের এসকর্ট আমি, এমনটাই ভাবতে পারেন।”

ধৃতিমানের মুখচোখের অবস্থা দেখে রয় বুঝেছিল, উপায় থাকলে এমন একটা লোকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন বলে এখনই নিজের হাত ধুতেন তিনি। রয় নিজেও অবশ্য নিজেকে সামলে রেখেছিল। যতবার ফুয়াদ ‘জিনিস’ বা প্রোডাক্ট কথাটা বলছিল, ততবারই ওর প্রবল ইচ্ছে হচ্ছিল লোকটার মুখে একটা জোরালো ঘুষি মারতে।

ফুয়াদ নামের লোকটা কিন্তু ওদের এই অস্বস্তি রীতিমতো উপভোগ করছিল।

ঢোকার সময়ে ওদের কোনও কার্ড সোয়াইপ, বা কি-প্যাডে পাসওয়ার্ড এন্টার করতে হয়নি। ধৃতিমান সংক্ষেপে রয়-কে বুঝিয়ে বলেছিলেন, এই দরজাগুলো শুধু ভেতর থেকে খোলে, যাতে অনুমতি ছাড়া কেউ কোনওমতেই ভেতরে ঢুকতে, বা ভেতর থেকে বেরোতে না পারে। দরজার পাশে ব্লাস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষীই শুধু পারে তার কার্ড দিয়ে এই দরজা খুলতে।

লম্বা করিডরটা সোজা এসে একটা বাঁক নিয়েছিল, যার মুখেই ছিল আর একটা দরজা। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ওদের আসার ব্যাপারটা দেখে, এবং রক্ষীটির কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে এই দ্বিতীয় দরজাটিও খুলে যায় ভেতর থেকে। একটা অপেক্ষাকৃত ছোট, কিন্তু একই রকম আকারের করিডরে এসে পড়ে ওরা, যার অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল আরও এক নিরাপত্তা রক্ষী।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই ঢিলেঢালা হলেও এই অংশে এমন বজ্রআঁটুনি নিরাপত্তা দেখে বোঝা গেছিল, যার জন্য কাজ চলছে এখানে, তিনি কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

করিডরের শেষ প্রান্তে ল্যাবের দরজাটা খুলে গেছিল তারপরেই। সহাস্যে ওদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন ডক্টর কেইন। কেইনের ছোটখাটো চেহারা আর হাসিভরা মুখটা দেখে রয়ের জমে থাকা রাগটা কমেও গেছিল। তার জায়গা নিয়েছিল নিখাদ বিস্ময়। ও বুঝতে পারে, কেইনের গলা জড়িয়ে তাঁর পিঠে লেপটে আছে একটা নীল রঙের লোমশ বল।

না, বল নয়।

কেইনের মাথার পেছন থেকে উঁকি দেওয়া বুদ্ধিদীপ্ত অথচ নরম চোখজোড়া, আর কেইনের কোমড়ে জড়িয়ে থাকা মোটাসোটা লেজটা দেখে ল্যাবে ‘তৈরি’ এই প্রাণীটিকে নিয়ে রয়ের পুষে রাখা ভাবনাগুলো ভেঙে পড়েছিল প্রশ্নোত্তর শুরু হওয়ার আগেও।

ধৃতিমান নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন। সেটা চাপা দেওয়ার জন্যই তিনি নিজস্ব ভঙ্গিতে বলে উঠেছিলেন, “যাক, নীল রঙের বাঁদর-দর্শনও হল আমার। আর কিছু বাকি রইল না তাহলে।”

“প্রফেসর! মিস্টার রয়!” রীতিমতো হইচই করে এগিয়ে এসেছিলেন কেইন, “মিট ব্লু।”

কেইনের মাথার পেছনে লুকিয়ে থেকেও জুলজুলে চোখে ওদের দেখছিল বাঁদরটা। সম্ভবত কেইনের গলার আওয়াজেই ভরসা পেল ও, আর ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিল ওদের দিকে।

রয়ের মনে হল, যেন একটা বাচ্চার হাত ধরছে ও। নরম, শুধু তেলোটা খসখসে। বৈজ্ঞানিকসুলভ নিস্পৃহ ভাব নিয়ে এই প্রাণীটিকে পরীক্ষা করা যে কতটা কঠিন হবে, সেটা ভাবতে-ভাবতে ও খুব সাবধানে বাঁদরটার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল।

ধৃতিমান সবিস্ময়ে বাঁদরটাকে দেখছিলেন। সম্ভবত ওঁর চোখেই প্রশ্নটা আন্দাজ করেছিলেন কেইন, তাই তিনি সোৎসাহে বলেন, “নো জেন্টলমেন, ওর গায়ের এই রং কোনও ডাই দিয়ে করা নয়। কীভাবে আমরা এই অসাধ্য সাধন করেছি সেটা ট্রেড সিক্রেট। তবে ব্লু আমাদের কাছে এমন কোনও গিনিপিগ বা ইঁদুর নয় যাকে আমরা পরীক্ষাগারে কাটাছেঁড়া করে তৈরি করেছি। আমি আপনাদের দুজনকেই অনুরোধ করব, আপনারা ব্লু-কে খুঁটিয়ে দেখুন, ওর ওপর কোনও রকম নির্যাতন বা জোর খাটানোর নজির পান কি না। আমি ততক্ষণে আমার গোপন ভাঁড়ারের সীমিত মালমশলা দিয়েই আপনাদের জন্যে কফি বানাই।”

“কিন্তু ডক্টর,” ধৃতিমানের গলার আওয়াজটা মোলায়েম হলেও জোরালো ছিল, “এই ‘ব্লু’-কে আপনি যার জন্যেই ‘বানিয়ে’ থাকুন না কেন, একটা নীল বাঁদর তাঁর কেন দরকার হল, সেটা কি কখনও জানতে চেয়েছেন?”

“নাহ্‌!” লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে উত্তর দেন কেইন, “আমি অনেক দিন আগেই জেনে গেছিলাম, কাস্টমারকে যত কম প্রশ্ন করা যায় তত ভালো।”

ততক্ষণে, সন্তর্পনে ফুয়াদের হাতে ব্লু-কে তুলে দিয়েছিল রয়। কেইন তাঁর ল্যাবে ‘কফি’ বানাতে গিয়ে পাছে কোনও বেখাপ্পা রাসায়নিক ব্যবহার করেন, তাই ও খুব খুঁটিয়ে কেইনের কাজকর্মই লক্ষ করছিল তখন। হঠাৎ ওর মনে হয়, ধৃতিমানের প্রশ্নটার উত্তর ফুয়াদ দিতে পারবে। সেই উদ্দেশে ঘুরে দাঁড়িয়েই রয় থমকে গেছিল। ওদের সবার চোখে ধরা পড়েছিল এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য।

ব্লু-কে নিজের হাতের ভাঁজে শক্ত করে ধরে ফুয়াদ ততক্ষণে দরজার বাইরে চলে গেছে। পায়ে-পায়ে ও পিছিয়ে যাচ্ছে করিডরের অন্য দিকের দরজাটার দিকে।

“ওকে ধরো কেউ!” প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছিলেন কেইন, “ও ব্লু-কে নিয়ে পালাচ্ছে!”

রক্ষীটি এই আকস্মিক ঘটনাপ্রবাহে হতচকিত হয়ে গেছিল। তাই ব্লাস্টারটা তুলতে তার একটু সময় লেগেছিল। সেই সময়টুকুর মধ্যেই ফুয়াদের হাতে উঠে এসেছিল একটা পাতলা পাত, যেটা নিঃসন্দেহে ওর গায়ের চামড়ার সঙ্গে আটকে ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত। পাতটাকে ব্লু-র গলায় চেপে ধরেছিল ফুয়াদ।

ধৃতিমান যে এই পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রেখেছেন সেটা বোঝা গেছিল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলা কথাগুলো থেকেই।

“চমৎকার প্ল্যান! এমন একটা পরিচয় আমাদের সামনে তুলে ধরা হল যাতে আমরা বিরক্ত হয়ে বেশি খুঁটিয়ে প্রশ্ন না করি। আবার ঢোকা হল আমাদের সঙ্গেই, যেহেতু নিরাপত্তা রক্ষীদের বলা হয়েছিল, এথিক্স কমিটির তরফে মোট তিন জন আসবে। সবথেকে বড় কথা, মেটাল ডিটেক্টরকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য সঙ্গে আনা হল সেরামিকের পাত। সত্যিই আঁটঘাট বেঁধে এগোনো হয়েছে, বোঝাই যাচ্ছে।”

ফুয়াদ চিৎকার করে বলে উঠেছিল, “কেউ আমার দিকে এক পা এগোনোর চেষ্টা করলে রাবাত-এর এই খেলনা আমার হাতেই শেষ হয়ে যাবে!”

রাবাত!

নামটা শোনা মাত্র রয় চমকে উঠেছিল। কুইপার বেল্টে মাইনিং কন্ট্র্যাক্ট পাওয়া এই কোটি-কোটিপতি ব্যবসায়ীর নাম কে না জানে? সহকর্মীদের কাছ থেকে লোকটির সম্বন্ধে ও অনেক কথাই শুনেছে। দামি ধাতুর লোভে রাষ্ট্রপুঞ্জ এই ব্যবসায়ীটির হাতে শ্রমিকদের কার্যত দাস হয়ে যেতে দেখেও লোককথার তিন বাঁদরের নীতি মেনে চোখ-কান-মুখ সব বন্ধ করে রেখেছে।

তাহলে রাবাত-ই ফরমায়েশ দিয়ে বানিয়েছিল ব্লু-কে! কিন্তু হঠাৎ একটা নীল বাঁদরের কী প্রয়োজন হতে পারে এমন এক ব্যবসায়ীর?

তারপরেই ওর মনে পড়ে, কনফেডারেশনের সদস্য বেশ কিছু দেশে রাবাত ঘোষিত অপরাধী। আরও নানা ব্যাবসার সঙ্গে নানা দুর্লভ জীবজন্তুর চামড়া ও অন্যান্য অঙ্গ নিয়ে হওয়া বে-আইনি কারবারেও সে অংশ নেয়। ব্লু-ও তাহলে সেই ব্যাবসার জন্যই…

ব্লাস্টারটা নীচে নামিয়ে রেখে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছিল রক্ষীটি। ফুয়াদের চোখের ইশারায় নিজের কার্ডটাও বের করে দিতে বাধ্য হয়েছিল সে।

চিৎকার করে উঠেছিলেন কেইন, “ব্লু-কে নিয়ে কী করতে চাও তুমি?”

হিসহিসিয়ে উঠেছিল ফুয়াদ, “ডক্টর, অর্থের লোভে আপনারা মূল্যবোধ বিসর্জন দিলেও আমরা দিইনি। ওই শয়তানের জন্যে গর্ত খুঁড়তে গিয়ে যাতে আরও নিরপরাধ মানুষ মারা না যায়, সেজন্যেই আমাদের এই বাঁদরটাকে দরকার। বিশ্বাস করুন, ওর ক্ষতি করতে আমরাও চাই না।”

কার্ডটা নিয়ে, আর ব্লু-কে শক্ত করে ধরে দরজার কাছে পৌঁছে গেছিল ফুয়াদ। ল্যাবের দিকে মুখ ফেরানো অবস্থাতেই কার্ড সোয়াইপ করে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছিল ও।

ঠিক তখনই নিজের লোমশ লেজটা দিয়ে ফুয়াদের চোখে একটা ঝাপটা মেরেছিল ব্লু! টাল সামলাতে না পেরে পেছনে হেলে গেছিল ফুয়াদ। তৎক্ষণাৎ ওর হাতের ভাঁজ থেকে আশ্চর্য কায়দায় পিছলে বেরিয়ে এসেছিল ব্লু। বিদ্যুৎগতিতে, দুধসাদা দেওয়ালের গায়ে মিশে থাকা প্রায় অদৃশ্য হাতলগুলো ধরে ঝুল খেতে-খেতে ও এগিয়ে এসেছিল ল্যাবের দিকে।

রয়, আর রক্ষীটি, একইসঙ্গে ছুটে গেছিল ফুয়াদের দিকে। রক্ষীটি তার ব্লাস্টারটার নাগাল পেয়েও গেছিল।

ফুয়াদ নিশ্চই বুঝতে পেরেছিল, তার আর পালাবার পথ নেই। হয়তো সেজন্যেই, দর কষার জন্যে শেষ সম্বল হিসেবে, অথবা সব শেষ করে দেওয়ার জন্যে, ও একটা লম্বা ভায়াল বের করেছিল অ্যাপ্রনের ভেতর থেকে।

বিপদটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন কেইন। ব্লু-কে কোলে নিতে গিয়েও রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠেছিলেন তিনি, “ডোন্ট শুট!”

কথাটা রক্ষীটি হয় শুনতে পায়নি, নয় কথাটা সে সচেতনভাবে উপেক্ষা করেছিল। ফুয়াদ ভায়ালটা ছুড়ে দিয়েছিল ল্যাবের দিকে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ার বশেই রক্ষীটি ভায়ালের দিকে ফায়ার করেছিল। একটা নীল তরল ছড়িয়ে পড়েছিল ফোয়ারার মতো, কিন্তু মাটিতে পড়ার আগেই বাতাসে মিশে গেছিল সেটা।

দ্বিতীয়বার ফায়ার করার আগেই রক্ষীটি ছটফট করতে-করতে পড়ে গেছিল।

ফুয়াদ ততক্ষণে দরজার ওপাশে বাঁক নিয়ে দৌড়তে শুরু করেছিল। দরজাটাও তখনই বন্ধ হয়েছিল আপনা থেকে। রয় তখন করিডরে। ফুয়াদ ভায়ালটা ছুড়ে দেওয়ামাত্র ও থেমে গেছিল। কিন্তু ধৃতিমানের গলায় “রয়!” বলে চিৎকারটা ওর মাথায় খেলাধুলোর সময়কার স্মৃতিটা জাগিয়ে তুলেছিল। একটা মরণপণ লাফ দিয়ে ল্যাবে ঢুকেছিল রয়। দরজাটা বন্ধ হয়েছিল তৎক্ষণাৎ।

দুঃস্বপ্নটা শুরু হয়েছিল তারপরেই।

এখন

“মিস্টার রয়!” ডক্টর কেইনের গলাটা রয়ের আচ্ছন্নভাব কাটিয়ে দেয় ক্ষণিকের জন্য, “আমাদের সবার বাঁচামরা এখন আপনার হাতে। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছেন আপনি। তবে আসলে কাজ এরপরেই। এরপর আর বলার সুযোগ পাব না, তাই এখনই বলে দিচ্ছি দরজার কাছে পৌঁছনোর পর কী করতে হবে আপনাকে।

আপনি প্রথমে আমার কার্ডটা দরজার স্লটে সোয়াইপ করবেন। নিয়মমতো তারপর স্ক্যানারে আমার রেটিনা স্ক্যান হওয়ার কথা, কিন্তু অবস্থা বুঝতে পেরে মাস্টার কনট্রোল ওটাকে ওভাররাইড করেছে। তারপর দরজার একেবারে ওপর দিকে দপদপ করতে থাকা আলোর নিচের বোতামটা টিপে প্রেসার-লক রিলিজ করবেন, না হলে এই দরজা খুলতে যা সময় লাগবে, ততক্ষণে আমাদের আর…”

কথাটা শেষ করেন না কেইন।

আওয়াজ থেমে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে রয় বুঝতে পারে, ওর প্রত্যেকটা নিঃশ্বাস হাপরের মতো আওয়াজ তুলছে ওর কানেই। হেলমেটের ভেতরে লাল রঙে জ্বলা-নেভা অক্ষরগুলো হঠাৎই স্থির হয়ে গেছে “ক্রিটিক্যালি লো” ফুটিয়ে তুলে।

বড়জোর এক মিনিট শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন আছে ওর হেলমেটে।

তখন

ল্যাবের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কয়েক মুহূর্তের জন্যে রয় এবং দুই বিজ্ঞানী ভেবেছিলেন, তাঁরা নিরাপদ। ঠিক তখনই, ল্যাবের নিজস্ব স্পিকারটা সরব হয়ে উঠেছিল।

“ডক্টর কেইন! ডক্টর কেইন! আপনি কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছেন?”

উত্তর দিয়েছিলেন কেইন, “হ্যাঁ, আমরা ঠিক আছি। কিন্তু লোকটাকে কি ধরা গেছে?”

স্পিকার কিছুক্ষণ নীরব থাকাতেই রয় বুঝতে পেরেছিল, ওদের বিপদ কাটেনি। এবার ভেসে এসেছিল একটা অন্য, তুলনামূলকভাবে পালিশ-করা, ঠান্ডা গলা।

“ডক্টর কেইন, প্রফেসর ধৃতিমান, মিস্টার রয়, আমাদের তরফে আপনাদের এই মুহূর্তে উদ্ধার করায় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমাদের স্ক্যানার বলছে, করিডরের বাতাসে এমন কিছু একটা রিএজেন্ট রয়েছে, যেটা বাইরে বেরিয়ে এলে খুব বিপদ। মূল দরজার ঠিক বাইরের অংশটায় হাওয়ার চাপ বাড়াচ্ছি আমরা, যাতে দরজা খুললে ভেতর থেকে কিছু বেরোবার আগেই বাইরে থেকে ভেতরে বাতাস ঢোকে। সেই বাতাসেই অ্যারোসল হিসেবে কিছু জিনিস ঠাসা থাকবে, যা ওই রিএজেন্টকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।

কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে। ল্যাবের ঠিক সামনে ব্লাস্টার ফায়ার হয়েছে বুঝে দরজার সামনে যে নিরাপত্তা রক্ষীটির থাকার কথা, সে প্রোটোকল মাফিক প্রেসার-লক এনগেজ করে দিয়েছিল। এখন সে আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। এদিকে, দরজাটা ভেতর থেকে প্রেসার-লক রিলিজ না হওয়া অবধি খোলা যাবে না। তাই, দরজাটা আপনাদের মধ্যে কাউকে এসে, প্রেসার-লক ডিসএনগেজ করে, খুলতে হবে।”

ঘোষণাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে গেছিল সবাই। এমনকি ব্লু-ও ডক্টর কেইনের কাঁধে প্রায় লেপটে থেকে নিজের মুখটা লুকিয়ে রাখছিল, হয়তো বাতাসে জমে ওঠা টেনশনটা বুঝতে পেরেই। তারপর মাউথপিসটার কাছে মুখ নিয়ে যান ধৃতিমান।

“যে ভায়ালটা, বা ভায়ালগুলো ভেঙে গিয়ে এই অবস্থা, তাতে ঠিক কী ছিল সেটা আমি জানি না। তবে মনে হচ্ছে, এমন কিছু মিশেছে হাওয়ায় যা বাতাসের নিষ্ক্রিয় নাইট্রোজেনকে সক্রিয় করে তুলছে। করিডরের সবকিছু নিষ্ক্রিয়। কিন্তু অ্যাক্টিভ নাইট্রোজেন খোলা থাকা মুখ বা মাথার সংস্পর্শে আসামাত্র শ্বাসের সঙ্গে বেরনো কার্বন-ডাই-অক্সাইড ভেঙে নাকের কাছেই তৈরি করছে সায়ানোজেন গ্যাস।”

নিজের অজান্তেই ভয়ে শিউরে ওঠে রয়। ওই করিডরের বাতাসে এখন এমন কিছু আছে যা ওর শ্বাসকেই বিষ-বাতাসে পরিণত করতে পারে!

অধ্যাপক-সুলভ ভঙ্গিতে ধৃতিমান বলে চলেন, “কিন্তু এমন জিনিসের বিশেষত্ব হল, এটি খুব বেশিক্ষণ সক্রিয় থাকবে না। মিনিট দশেকের মধ্যেই ওই রিএজেন্ট নিজেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। তারপর আপনারা দরকার হলে বোমা ফাটিয়ে দরজা খুলুন। আমরা এই ল্যাবেই আছি, নিরাপদ।”

কিছুক্ষণ চুপ ছিল স্পিকারটা। তারপর, মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত কয়েদিকে শেষ খবর দেওয়ার মতো গলায় বলা হল পরের কথাগুলো।

“অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি প্রফেসর, আপনার কথায় কোনও ভুল না থাকলেও একটা বিশেষ জিনিস আপনি জানেন না। ব্লু-কে নিয়ে কাজের আগে ওই ল্যাবে এমন কিছু নিয়ে কাজ হয়েছিল যেটা বিশেষ ভাবে গোপনীয়। সেই গবেষণায় এমন কিছু নিয়ে কাজ হচ্ছিল, যেখানে সিকিউরিটি-ব্রিচ হলে চরম ব্যবস্থা নেওয়া নিশ্চিত করা হয়েছিল।

ল্যাবের নীচে রাখা ছিল একটা বিস্ফোরক। কোনওভাবে করিডরে ব্লাস্টার ফায়ার, এবং মূল দরজা জ্যাম হয়ে গেলে সেই বিস্ফোরক আপনা থেকেই চালু হয়ে যায়, যাতে ল্যাব এবং করিডর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সেই প্রোজেক্টটা এখন চলছে না, কিন্তু বিস্ফোরকটা, ভুলবশত, সরানো হয়নি। সেটা আছে, এবং চালু হয়ে গেছে।

তাই, পাঁচ মিনিটের মধ্যে মূল দরজাটা আপনারা কেউ খুলে না দিলে…”

বিস্ফারিত দৃষ্টিতে স্পিকারের দিকে চেয়ে ছিলেন ধৃতিমান আর কেইন। শুধু রয়ের খুব হাসি পাচ্ছিল। ওর মনে হচ্ছিল, ও একটা নাটকের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। নইলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এত কিছু দেখার, শোনার, মায় সম্ভাব্য মৃত্যু নিয়েও রকমফেরের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ কারও হয়?

কেইন চিৎকার করে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ধৃতিমান তাঁকে থামিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলেন, “ঠিক কী নিয়ে হতভাগারা কাজ করছিল তার কিছুটা আন্দাজ আমার আছে। আমি জানি, এই বিস্ফোরকের ব্যাপারটা ব্লাফ নয়।”

ঠিক তখনই করিডরে যাওয়ার বন্ধ দরজার ওপরে ঘড়িটার স্বাভাবিক ঘণ্টা-মিনিট-তারিখ মুছে গিয়ে ফুটে উঠেছিল ০৫-০০ সংখ্যাটা, আর তারপরেই সেটা নামতে শুরু করে শূন্যের দিকে।

এখন

“রয়! রয়! তুমি শুনতে পাচ্ছ?”

ধৃতিমানের গলাটা ওর আচ্ছন্নভাব কিছুটা কাটিয়ে দেয়।

“রয়, তুমি কি দরজাটার কাছে পৌঁছেছ? আমাদের হাতে আর একদম সময় নেই কিন্তু! রয়!!!!”

চিৎকারটা কানের মধ্য দিয়ে একটা চাবুক হয়ে আছড়ে পড়ে ওর চেতনায়। রয়ের মনে পড়ে, কলেজে এবং তারপরেও এই চিৎকার ওকে কত অসাধ্য সাধনের জন্যে দরকারি রাগ, জেদ, বা সাহস জুগিয়েছে। এবারের চিৎকারটার মধ্যে একটা অসহায়তা মিশে ছিল। প্রফেসর ধৃতিমানের গলায় এটা কখনও শুনতে পাওয়ার কথা ভাবেনি ও।

শ্বাস নিতে গিয়ে টের পায় রয়, অ্যাপ্রনের সঙ্গে প্রায় সিল করে লাগিয়ে দেওয়া এই হেলমেটের ভেতরের অক্সিজেন শেষ হয়ে গেছে, আর ওর চোখের সামনেটা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে। তবু, অন্ধের মতো নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যায় রয়, যতক্ষণ না ও প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দরজার কাছে।

নিরাপত্তা রক্ষীর মৃতদেহ কোনও রকমে ডিঙিয়ে কার্ডের স্লটের কাছে পৌঁছায় রয়। মাথা কাজ করছে না, কিন্তু যন্ত্রের মতো কার্ডটা ও সোয়াইপ করতে পারে সেই অবস্থাতেও। দরজার পাশে আলোটা সবুজ হয়ে ওঠে।

এবার শুধু লাল আলোর নীচের বোতামটা টেপা…

কিন্তু আর পারছে না ও। হেলমেটের মধ্যে কেউ কি চিৎকার করছে? করুক, সেই আওয়াজটাও একটু-একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে তো।

ওর সারা শরীর পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। মাথার ভেতরে একটা অসহ্য যন্ত্রণা দপদপ করছে। জিভ নাড়তে পারছে না ও। আর না, এবার শুধু চোখ বন্ধ করার অপেক্ষা।

আর কিছু কি করার ছিল ওর? কী করার ছিল যেন?

ও হ্যাঁ, ওই বোতামটা টিপতে হবে। কিন্তু ও তো হাত তুলতেই পারছে না। ও বসে পড়ছে একটু-একটু করে। বোতামটা কেউ কি টিপে দিতে পারবে না?

ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসতে থাকা পৃথিবীতে হঠাৎ একটা নীল ঝলক দেখে রয়। এক মুহূর্তের মধ্যে ওর মনে ভেসে উঠতে চায় একটা ভয়ের স্মৃতি। একটু আগেই নীল রঙের কী যেন একটা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বাতাসে… সেটাই কি আবার ছড়ানো হল ওর দিকে?

না তো! এ তো একটা বাঁদর। কী যেন নাম বাঁদরটার? ও হ্যাঁ, ওর নাম ব্লু। কিন্তু ব্লু কেন ছুটে আসছে ওর দিকে?

রয়ের মাথার মধ্যে ঝলসে ওঠে কয়েকটা ভাবনা।

করিডরের বাতাসে বিষ, তার মধ্যে ব্লু খুব বেশি হলে কয়েক সেকেন্ড বাঁচবে। বাতাসের বিষ সরাতে গেলে দরজাটা খুলতেই হবে। ওই বোতামটা ওকে টিপতেই হবে! মরিয়া চেষ্টা করে নিজেকে মেঝে থেকে তুলে ধরে রয়। তারপর বোতামটা টিপে দেয়।

জ্ঞান হারানোর আগে রয়ের শেষ স্মৃতি ছিল, ওর মাথার পাশে প্রবল ভাবে হাত-পা ছুঁড়ছে ব্লু।

এখন

জ্ঞান ফেরার পর রয়ের প্রথমেই মনে হল, ও নিশ্চই স্বপ্ন দেখছে, কারণ ওর মাথার ঠিক ওপরেই একটা নীল রঙের সূর্য রয়েছে। তারপর ওর দৃষ্টিটা স্পষ্ট হয়। ও বুঝতে পারে, ওর মাথার কাছে বসে ওর দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে ব্লু।

“পার্মানেন্ট ড্যামেজ হয়নি, তাই ঘাবড়িও না।” ধৃতিমানের গম্ভীর গলার তলায় বয়ে চলা টেনশনের স্রোতটা রয়ের কানে ধরা পড়ে। “তুমি প্রায় দেড় মিনিট অক্সিজেন ছাড়া ছিলে, সেটাও চরম আশংকা আর অন্যান্য শারীরিক অবস্থার মধ্যে। আমাদের ভয় হচ্ছিল, তাতে তোমার মস্তিষ্কে কোনও প্রভাব পড়েছে কি না। রিপোর্ট বলছে, তেমন কিছু হয়নি।”

“কিন্তু…” যে কথাটা জ্ঞান হারানোর মুহূর্তে, এবং জ্ঞান ফিরে আসার সময় থেকেই ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল সেটাই এবার বেরিয়ে আসে, “আমি করিডরে ব্লু-কে দেখেছিলাম। ও কি সত্যিই সেখানে ছিল?”

কেইন আর ধৃতিমানের চোখাচোখি হয়। গলা খাকড়ে বলেন কেইন, “না। ব্লু আমাদের সঙ্গেই ছিল, ল্যাবের ভেতরে। সম্ভবত অক্সিজেনের অভাবে আপনার একটা বিভ্রম হয়েছিল।”

পাক্কা ষড়যন্ত্রকারীর স্টাইলে এদিক-ওদিক দেখে নেন ধৃতিমান। তারপর চোখের ইশারায় কেইনকে তিনি বোঝান যে তাঁদের কথা শোনার আর কেউ নেই। রয়ের কানের কাছে প্রায় মুখ নিয়ে কেইন কথা শুরু করেন।

“আপনি ঠিকই দেখেছিলেন রয়। আমার আর ধৃতিমানের ডাকাডাকিতে আপনি যখন আর সাড়া দিচ্ছিলেন না। তখন আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, অন্য কোনও ভাবে আপনাকে সজাগ করে তুলতেই হবে। প্রফেসর নিশ্চিত ছিলেন, অন্য কারও জন্যে না হলেও ব্লু’র মতো একটা নিষ্পাপ প্রাণীকে আপনি মরতে দেখবেন না। তাকে বাঁচানোর জন্যে আপনি সজ্ঞান-অজ্ঞান যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, দরজাটা খোলার ব্যবস্থা করবেন। তাই আমি আর প্রফেসর নিজেদের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে দরজাটা একটু ফাঁক করে ব্লু-কে আপনার কাছে যেতে বলি।

শুধু আপনারই ব্লু-কে ভালো লেগেছিল এমন নয়। ব্লু-ও আপনাকে পছন্দ করেছিল। তাই দরজা খোলা পেয়েই ও আপনার দিকে ছুটেছিল। আর ওকে দেখে আপনি ঠিক তাই করেছিলেন, যা আমরা আশা করেছিলাম।

তবে ব্লু-কে এমন একটা বাতাসে এক্সপোজ করা হয়েছিল একথা সেনাবাহিনী জানতে পারলে ওকে নিয়ে সেটাই করা হবে, যা ফুয়াদের লোকজন করতে চেয়েছিল। তাই ডাক্তাররা আপনার কাছে আসার আগেই আমরা ব্লু-কে লুকিয়ে ফেলি।”

ইতিমধ্যে বাঁদরটা তার ছোট্ট হাতে রয়ের বড় হাতটা তুলে নিয়েছিল। নিজের গলা থেকে রাগটা দূরে রাখতে পারে না রয়, “কিন্তু এমন নিষ্পাপ প্রাণীটার জীবন বিপন্ন করতে আপনাদের একটুও খারাপ লাগল না? ওকে ওই বিষ-বাতাসের মধ্যে আপনারা পাঠালেন কীভাবে?”

এবারো ধৃতিমান আর কেইনের মধ্যে চোখাচোখি হয়, তবে এটার মধ্যে একটা ছেলেমানুষি আনন্দ লুকিয়ে ছিল। ধৃতিমান চাপা গলায় বলেন, “মাই বয়, ডক্টর কেইন আর তাঁর টিম স্বীকার না করলেও একটা ব্যাপার আমি বুঝে ফেলেছিলাম। ব্লু’র গায়ের রংটা প্রুশিয়ান ব্লু হলেও তার নিচে ওর আদি চেহারাটার রং ছিল সোনালি। ডাই করা না হলেও মাদাগাস্কারের গোল্ডেন লেমুরের জিন-স্প্লাইসিং করে তৈরি করা হয়েছে ব্লু-কে।

এমনিতেই গোল্ডেন লেমুরের সায়ানাইড-জাতীয় জিনিস বরদাস্ত করার ক্ষমতা প্রকৃতিতে সবচেয়ে বেশি। তাই যে রিএজেন্ট দিয়ে ওর গায়ের রং প্রুশিয়ান ব্লু করা হয়েছে, সেটার সঙ্গে আজন্ম সংস্পর্শের ফলে সায়ানোজেন-এ ব্লু’র কিস্যু হত না।

কুইপার বেল্টে মাইনিং চালানোর জন্যে শ্রমিকরা যখন জমাট নাইট্রোজেন লেয়ারে খনন করে, তখন সেখান থেকে তৈরি হওয়া সায়ানোজেন অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়। কিন্তু ব্লু যে এই গ্যাসে অবধ্য, এই খবরটা ল্যাব থেকে লিক হয়ে গেছিল ফুয়াদ আর তার দলবলের কাছে। তারা বুঝতে পেরেছিল, ব্লু’র ক্লোনিং করে শ্রমিকদল তৈরি করলে রাবাতের সঙ্গে বোঝাপড়া করা যাবে।”

“তাহলে এখন…?” প্রশ্নটা অসম্পূর্ণ রেখে দিয়ে দুই বিজ্ঞানীর দিকে তাকায় রয়।

“আপনি ইন্টার্নাল বুলেটিনটার খবর এখনও জানেন না।” কৃত্রিম গাম্ভীর্য মেশানো গলায় বলেন কেইন, “ল্যাবরেটরিতে মারাত্মক দুর্ঘটনার ফলে এক আততায়ী আর দুই নিরাপত্তা রক্ষীর পাশাপাশি ব্লু-ও মারা গেছে। বিষ বাতাস সে সহ্য করতে পারেনি।”

চমকে নিজের ডান দিকে তাকিয়ে দেখে রয়, যেখানে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে কেইনকে দেখছিল ব্লু।

গম্ভীর গলায় ধৃতিমান বলেন, “কাগজ-কলমে ব্লু আর বেঁচে নেই। কিন্তু ওকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যায় সেটাই ভাবছি।”

হঠাৎ রয়ের মনে পড়ে একলা ঘরে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন গোণা একটি মানুষের কথা, নীল রং যার বড় প্রিয়। জোর গলায় রয় বলে ওঠে, “রুচিরার খুব প্রিয় রং হল নীল, প্রফেসর। আর ওর কাছে ব্লু-কে কেউ খুঁজবে না।”

চমকে ওঠেন ধৃতিমান। নতুন চোখে উনি তাকান কেইন, রয়, আর শেষে ব্লু’র দিকে। আর তারপর, যা কখনও তাঁকে কেউ করতে দেখেছে বলে রয়ের জানা নেই, সেটাই হয়। ব্লু’র দিকে দু’হাত বাড়িয়ে বলে ওঠেন ধৃতিমান, “তাহলে আমার সঙ্গেই চলো হে ব্লু। তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেলে আমার মেয়ের দিনগুলো একটু হলেও… ।”

এক লাফে ধৃতিমানের গলা জড়িয়ে ধরে ব্লু।

প্রথম প্রকাশ: ‘কল্পবিশ্ব’, মার্চ ২০১৭