রান – ঋজু গাঙ্গুলী

রান

ঘরে অন্তত দশ জন থাকলেও যন্ত্রের মৃদু গুঞ্জন ছাড়া একটা শব্দও শুনতে পাচ্ছিল না রয়। হঠাৎ করেই ওর খেয়াল হল, ও নিজেও শ্বাস নিচ্ছে না। এক রকম জোর করেই নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল রয়। কিন্তু স্ক্রিন জুড়ে থাকা অপার্থিব দৃশ্যটা ওকে স্বাভাবিক হতে দিচ্ছিল না।

বিজিএনএ কোয়াড্র্যান্টকে মহাকাশযাত্রীরা দাঁতে দাঁত ঘষে ‘বোগানা’ বলেন। তারই সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকাটা দেখা যাচ্ছে স্ক্রিনে। দুটো দানব গ্রহের মাঝে ঝুলে আছে একটা গ্রহাণু। তার ওপর তখন একটু-একটু করে ফুলের পাপড়ির মতো করে খুলে যাচ্ছে প্রফেসর ধৃতিমানের স্পেস-টাইম লুপটা।

“আপনি তৈরি রয়?” ঘরের নিস্তব্ধতা চুরমার করে দিয়ে একটা চাবুকের মতো ভেসে এল জেনারেল করিমের গলাটা।

রয় বুঝতে পারল, ওর গলা শুকিয়ে গেছে। নিজের নার্ভাস অবস্থাটা অন্যদের কাছ থেকে লুকোনোর জন্য ও কষ্ট করে গালের পেশিগুলো কোঁচকাল, আর বুড়ো আঙুলটা তুলে ধরল। যে বিশেষ চেয়ারটায় ও বসেছিল তার সঙ্গে লাগানো হেলমেট আর বিশেষ ভাইজরটা এবার ওর মাথায় চেপে বসল। ভাইজরে পাশাপাশি দুটো দৃশ্য দেখতে পেল ও।

বাঁ দিকের কোণে একটা ছোট স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে উল্কাপাতে ক্ষতবিক্ষত একটা জায়গা। দুটো গ্রহের লাল-নীল-কমলা-বেগুনি আলোয় ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। কিন্তু মূল স্ক্রিন জুড়ে আছে একটা রুপোলি চাদরের মতো জিনিস, যেটা এবার খুলে যাচ্ছে।

গত বেশ কয়েক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ নিজে থেকেই রয়ের আঙুলগুলোকে চালিত করে। ও বুঝতে পারে, চাদরের মতো জিনিসটা হল সেই পর্দা, যা এতক্ষণ ধৃতিমানের লুপ থেকে ওকে আলাদা করে রেখেছিল।

না, ওকে নয়। রান-কে।

ডক্টর নোমুরার মিষ্টি গলাটা ভেসে আসে এবার ওর কানে, বেশ জোরে। রয় বুঝতে পারে, নোমুরা মাউথপিস চালু করেছেন।

“ভয় নেই রয়।” নোমুরা শান্ত গলায় বলতে থাকেন, “আপনি তো এখানেই থাকছেন, আমাদের সঙ্গে গ্যানিমিড সেন্ট্রালে। শুধু আপনার দৃষ্টি, আর কিছু ইচ্ছে-অনিচ্ছে পাড়ি দিচ্ছে বহু আলোকবর্ষ দূরের ওই উপগ্রহে। আমার রান এখন আপনার হাতে, তাই…।”

“তাই ডক্টর নোমুরা তোমার চেয়েও বেশি ভয় পাচ্ছেন।” কিছুটা নিরাসক্তি, আর কিছুটা ব্যঙ্গ মেশানো এই গলাটা যে প্রফেসর ধৃতিমানের তা বলে দিতে হয় না। পরিচিত ওই গলাটাই রয়ের ভয়টা কাটিয়ে দিল। জয়স্টিকে আলতো চাপ দিল ও।

ছোট হয়ে থাকা স্ক্রিনে ও দেখতে পাচ্ছিল, লুপ দিয়ে ও নয়, বরং বেরিয়ে আসছে অজস্র রুপোলি পাত পরপর জুড়ে সাজানো, অনেকটা পুরোনো দিনে হারিয়ে যাওয়া প্রাণী প্যাঙ্গোলিনের মতো দেখতে, কিন্তু আরও বড়, আরও লম্বা একটা প্রাণী… না!

রান!

এই মুহূর্তে মানবজাতির তৈরি করা সবচেয়ে অগ্রসর রোবো, যার কাজ হল রেকি (আর), অ্যানালাইজ (এ), অ্যাসিস্ট (এ), এবং নোটিফাই (এন)। যুদ্ধবিধ্বস্ত বা খুব বেশি বিপজ্জনক জায়গায় আটকে পড়া মানুষ ও মহাকাশযানকে খুঁজে বের করা, তাদের কী ধরনের সাহায্য লাগবে তা বোঝা, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করা, এবং সেনাবাহিনীকে পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে ওয়াকিবহাল রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে এই রোবোকে। এটাই তার প্রথম মিশন।

অবশ্য পরীক্ষা করার পক্ষে এর চেয়ে বেশি বিপজ্জনক জায়গা মহাকাশে আর বোধহয় খুঁজলেও পাওয়া যাবে না, একটা বড় শ্বাস ফেলে ভাবে রয়। কানে ভেসে আসা টুকিটাকি কথা শুনে ও বুঝতে পারে, ব্রিজের পরিবেশ স্বাভাবিক হচ্ছে।

রান-এর চোখ দিয়ে চারপাশটা দেখতে থাকে রয়। স্ক্রিনের ডান দিকে একটা লম্বা সবুজ বার ফুটে ওঠে। তাতে জ্বলজ্বল করে অগুন্তি লাল অক্ষর ও সংখ্যা। রয় বোঝে, নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছে রান। দুই দানব গ্রহের মাঝে অসীম আকাশে ভেসে থাকা এই নামহীন উপগ্রহে কী আছে বা কী থাকতে পারে, তা দেখার, বোঝার এবং ব্রিজে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে সে।

নিজের অজান্তেই ওর স্মৃতি ওকে পিছিয়ে নিয়ে যায় কয়েক সপ্তাহ আগে, যখন এই কোয়াড্র্যান্টে লেগেই থাকা উল্কাবৃষ্টির মধ্যে পড়ে প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত, এবং পরে স্রেফ হারিয়ে যায় একটা শাটল।

দুর্ভাগা যাত্রীদের পরিবারে নিয়মমাফিক ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়াতেই ব্যাপারটা শেষ হতে পারত। সেটা হয়নি দুটো কারণে।

প্রথমত, ওই শাটলে অন্যতম যাত্রী ছিলেন এই সেক্টরের ইউনিফায়েড কমান্ডের এক কর্তাব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে ছিল বেশ কিছু জরুরি ও একান্ত গোপন তথ্য। সেগুলো যাতে অন্য কারও হাতে না পড়ে, সেজন্য শাটলটাকে খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল সেনাবাহিনী।

দ্বিতীয়ত, ওই একই শাটলে ছিলেন এক্সপ্রেস নিউজকর্পের এক স্কুপ-ফাইন্ডার এস্তেবান। শাটলটা দুর্ঘটনাগ্রস্ত হওয়ার আগে তাঁর কাছ থেকে নিউজকর্পে শেষ যে খবরটা পেয়েছিল সেটা খুব ইন্টারেস্টিং। এস্তেবান দাবি করেছিলেন, কোয়াড্র্যান্টের এই বিশেষ জায়গায় কেন হারিয়ে যায় একের-পর-এক মহাকাশযান, সেটা তিনি আন্দাজ করেছেন। সেনাবাহিনী ওই শাটলের হদিস পাওয়ার জন্য মেসেজটা চেয়ে পাঠায়। নিউজকর্প তখন খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, শাটলটা খুঁজে বের করার মিশনে তাদের একজন সাংবাদিক না থাকলে তারা কিছুই জানাবে না। অস্ত্র আর কি-বোর্ডের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই কতদিন ধরে চলত বলা মুশকিল। তবে আরও ওপর মহল থেকে হস্তক্ষেপ হয়। সেই সাংবাদিকটি কে হবে তা নিয়ে বেশ কিছুদিন চাপান-উতোর চলার পর হঠাৎ এক রাতে কোয়ার্টার থেকে রয়-কে তুলে আনে সেনাবাহিনী।

গ্যানিমিড সেন্ট্রালের ওপর সেনাবাহিনীর কম্যান্ড অ্যান্ড কনট্রোল সেন্টারে, ব্রিফিং-এর জন্য হাজির হয় রয়। সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে ‘বোগানা’ কোয়াড্র্যান্টে এই গ্রহাণুর কাছের জায়গাটা এস্তেবানের শেষ মেসেজের উৎস বলে চিহ্নিত করেছিল। জায়গাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক বললেও কম বলা হয়। ওখানে যাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হল স্পেস-টাইম লুপ। প্রফেসর ধৃতিমান মিশনে শামিল হন ওই লুপ বানানোর জন্য।

কিন্তু মিশনে নিজের ভূমিকাটা জানতে পেরে রীতিমতো দ্বিধায় পড়েছিল রয়। দারুণ আনন্দে লাফাতে ইচ্ছে হচ্ছিল ওর, কারণ এই সুযোগ এর আগে কেউ পায়নি। ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে পেটে ঢোকার অবস্থাও হচ্ছিল সেইজন্যই। তবে এই নিয়ে ও বেশি কিছু ভাবার আগেই রোবোটিক্স জগতের দিকপাল ডক্টর নোমুরার তত্ত্বাবধানে ওর ট্রেনিং শুরু হয়ে যায়।

“রয়!” ওর চটকা ভেঙে দেয় করিমের কড়া গলাটা, “আমাদের হাতে সময় খুব কম। আপনি কোন দিকে যাবেন ঠিক করেছেন?”

নিজের কানেই নিজের গলার আওয়াজটা যান্ত্রিক ঠেকে রয়ের, “আমরা এখন যেখানে আছি সেখান থেকে উত্তর-পশ্চিমে যেতে হবে। কিন্তু জেনারেল…” একটু ইতস্তত করে রয়।

“হ্যাঁ, বলুন।” করিমের আওয়াজ দরকারের চেয়ে একটু বেশিই জোরালো শোনায় ওর কানে। রয় বুঝতে পারে, প্রকাশ না করলেও করিম নিজে এখন মারাত্মক চাপের মধ্যে আছেন।

“এই গ্রহাণু খুব একটা বড় নয়। তবু গ্রিড ধরে-ধরে এই জায়গাটা খুঁজতে একদিনের বেশি লাগবে। আমাদের হাতে যা সময় আছে তাতে খুব বেশি দূর কিন্তু যাওয়া যাবে না।” থেমে-থেমে বলে রয়।

“আপনি সি মডিউলটা চালু করুন রয়।” এবার ডক্টর নোমুরার গলাটা ভেসে আসে, “তারপর উত্তর-পশ্চিমে চলুন। যে সময়টা আছে, সেটা আমার-আপনার কাছে যথেষ্ট না হলেও রান-এর পক্ষে পর্যাপ্ত।”

সি মডিউল!

ট্রেনিং-এ এই মডিউলটা চালাতে রয়ের সবচেয়ে ভালো লাগত। ও বুঝতে পারত, এক সময়ে রাস্তাঘাট কাঁপানো অথচ আজ বিলুপ্ত যে কোনও গাড়ির চেয়ে দ্রুত ছুটছে রান। মসৃণভাবে সাজানো প্লেটের পর প্লেট দিয়ে বানানো তার শরীর মুহূর্তের মধ্যে আকার নিয়ে নিয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুতগামী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম একটির।

চিতা-র!

ছেঁড়া-ছেঁড়া কিছু ভয়েস রেকর্ডিং, কিছু রিপোর্ট, কিছু অঙ্ক, আর কিছুটা সাংবাদিকের আন্দাজ। এই পুঁজি নিয়ে একটা গন্তব্য ঠিক করে মডিউল চালু করে রয়। দ্রুত সরে যেতে থাকে ওর দু’পাশের ক্ষতবিক্ষত প্রান্তর। দূরে থাকা দিগন্তটা ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসতে থাকে ওর দিকে। রয়ের মনে হয়, যেন সুদূর অতীতের কোনও এক ঘাস জমিতে চিতার মতোই বাধাবন্ধহীন হয়ে ও ছুটে চলেছে, যেখানে ঘাসের আড়ালে লাফিয়ে-লাফিয়ে ওরই মতো বেগে ছুটে পালাচ্ছে হরিণের পাল।

ওর আবার মনে পড়ে ব্রিফিং-এর সময় পই-পই করে ওকে বোঝানো কথাগুলো।

“আপনার এডিটরের মতো কেউ আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান হলে আমাদের শেষ যুদ্ধটা অমীমাংসিত থাকত না।” তীব্রতম ব্যঙ্গ, কিছুটা হতাশা, আর বেশ কিছুটা চাপা সম্ভ্রম মেশানো গলায় ওকে বলেছিলেন জেনারেল করিম, “কত ভাবে যে চাপ তৈরি করা যায়, তা ওঁর কাছ থেকেই শেখা উচিত।”

“এ-সব না বলে কাজের কথা বললে হয় না?” বিরক্ত গলায় বলেছিলেন প্রফেসর ধৃতিমান।

পারলে ব্লাস্টারটা তখনই ধৃতিমানের ওপর চালিয়ে দিতেন করিম। তখনকার মতো চোখ দিয়েই প্রফেসরকে ভস্ম করেছিলেন করিম। নোমুরা ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছিলেন রয়-কে।

“রান যে ঠিক কী-কী করতে পারে, সেটা আমরা নিজেরাও এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। চাপানো ম্যান্ডেটের বাইরেও নতুন তথ্য সংগ্রহ করার আর সেটা বিশ্লেষণ একটা প্রবণতা আছে ওর মধ্যে।” বলেছিলেন নোমুরা।

“তাই…” একটু দম নিয়ে বলেছিলেন ছোটখাটো চেহারার মিষ্টি মহিলাটি, “এই মিশনে মুহূর্তের মধ্যে কিছু-কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একজনকে আঙুল আর মস্তিষ্কের দিক দিয়ে রান-এর সঙ্গে যুক্ত রাখার দরকার পড়েছে।”

ঘরে যখন নিস্তব্ধতা ঘনিয়ে উঠেছিল তখনই রয় বুঝতে পেরেছিল, ঠিক কী ভূমিকায় এই মিশনে ও শামিল হতে চলেছে। ওর আশঙ্কাটাই সত্যি করে, গলায় মধু আর বিষ প্রায় সমভাগে মিশিয়ে বলে উঠেছিলেন করিম, “চিয়ার-আপ রয়। আপনার এডিটরের সৌজন্যে, এবং প্রফেসর ধৃতিমানের দেওয়া সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সের ভিত্তিতে, মানবজাতির ইতিহাসে আপনিই হতে চলেছেন প্রথম সিভিলিয়ান যাকে একটি গোপন অপারেশনে পাঠানো হচ্ছে, সেনাবাহিনীর সবচেয়ে দামি রোবোর সওয়ার করে।”

পেটের ভেতরটা একদম খালি হয়ে গেছিল রয়ের।

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সব সার্থক।

কড়া ট্রেনিং। মনে-মনে হলেও নিজের পরিচিত জায়গা আর মানুষদের ফেলে আসা। এই উপগ্রহে ওত পেতে থাকা কোনও অজানা বিপদের মুখোমুখি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা! এ-সব কিছু তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে অনন্ত মহাকাশের নীচে, পায়ের তলায় পাথরগুলো স্রেফ ছুঁয়ে প্রায় উড়ে চলার অনুভূতির কাছে।

স্বাধীন! এতটা স্বাধীন ও কোনওদিন হতে পারেনি।

তারাভরা আকাশের নীচে এই দৌড়, যান্ত্রিক শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে ভেসে আসা এক অদ্ভুত মসৃণ অনুভূতি, এক আদিম আহ্বানে সাড়া দিতে পেরে হওয়া উচ্ছ্বাস, এসব ছেড়ে ও বেরিয়ে আসতে চাইছিল না।

ব্রিজে একটা চেয়ারের বিচিত্রদর্শন যন্ত্রপাতির মধ্যে বন্দি হয়ে আছে ওর শরীর। কিন্তু নিউরাল লিংকের মাধ্যমে যুক্ত এই ধাতব পাত, ফাইবার অপটিক্স, অজস্র চিপ, সার্কিট, ভালভ দিয়ে গড়া যন্ত্রশরীরটা ওর কাছে বড় আপন বলে মনে হচ্ছিল।

ঠিক কতক্ষণ ও ছুটেছিল, রয়ের নিজেরও খেয়াল নেই। হঠাৎ ও দেখতে পেল, দিগন্তের কাছে পড়ে আছে বেশ কয়েকটা জিনিস। সাংবাদিকের নিজস্ব ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, এবং রান-এর অত্যুন্নত চোখ জিনিসগুলোকে চিনিয়ে দিল।

রয় কমিউনিকেশন চ্যানেল চালু করল, “ব্রিজ, আমরা শাটলটাকে খুঁজে পেয়েছি। আমরা এখন ওদিকেই যাচ্ছি।”

রানের ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্যটা এবার স্ক্রিন জুড়ে দেখা যায়। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষ! ওর অস্ফুট স্বগতোক্তি মিশে যায় ব্রিজ থেকে ভেসে আসা টুকরো-টাকরা আক্ষেপ, অভিশাপ আর অন্য কথার মধ্যে।

ডান দিকের সবুজ বারে ফুটে উঠছিল বহু রকমের সংখ্যা। রয় বুঝতে পারছিল, নিজস্ব যান্ত্রিক চোখে এলাকার প্রতি বর্গসেন্টিমিটার জায়গা বিশ্লেষণ করে সেই তথ্য পাঠিয়ে দিচ্ছে রান। ও সাদা চোখেই দেখছিল সামনে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ। মহাকাশযানের এই কবরখানায় অত্যাধুনিক যুদ্ধযান থেকে শুরু করে শাটল, যাত্রীবাহী স্টারলাইনার, এমনকি মালবাহী কার্গোশিপ, সবই ছিল।

এত জাহাজ এসে পড়েছে এখানে! কীভাবে? ম্যাগনেটিক অ্যানোম্যালি, মানে এখানকার চৌম্বক ক্ষেত্রের গোলমেলে আচরণ কি এর কারণ হতে পারে? কিন্তু সে-সব সামলানোর ব্যবস্থা তো রাখা হয় প্রতিটি জাহাজেই। আর তেমন ভয়ানক কোনও গোলমাল এখানে থাকলে সেটা এতদিনে জানাজানি হয়েই যেত। তাহলে এখানে কী হয়ে থাকতে পারে?

সামনেই আকাশ জুড়ে সেই সময় দেখা গেল এক আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য। আকাশের এক মাথা থেকে আরেক মাথা জুড়ে ছুটে গেল অজস্র আলোর বিন্দু। মুগ্ধ চোখে দৃশ্যটা দেখতে গিয়েও রয়ের মনে ধাক্কা মারল একটা সম্ভাবনা। দুই গ্রহের টানাপোড়েনের ফলে একেবারে হঠাৎ করেই তৈরি হওয়া এই উল্কাবৃষ্টির মাঝে পড়লে যে কোনও মহাকাশযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এই উপগ্রহের কাছে নেমে আসতে বাধ্য হবে।

একে-একে তার পরের সম্ভাব্য ঘটনাক্রম ওর মাথায় এল।

নেমে আসা যন্ত্রযান সাহায্য চেয়ে সংকেত পাঠাতে চাইবে। কিন্তু এই কোয়াড্র্যান্টে আরেক বিপদ আছে। এখানে লাগাতার চৌম্বক ঝড় চলে। তার ফলে সেই সংকেত কোথাও পৌঁছবে না। বরং সেটা প্রতিফলিত হয়ে আসবে এই গ্রহের বুকেই। তখন, সেই সংকেত অনুসরণ করে যদি এগিয়ে আসে দুর্বল ও সাময়িকভাবে অসহায় শিকারের সন্ধানে বেরোনো কোনও শ্বাপদ?

ঠিক সেই মুহূর্তেই স্থির হয়ে দাঁড়াল রান। তার লেন্সে ধরা পড়া জিনিসটা তখন রয়ের সামনেও বেশ বড় হয়ে ফুটে উঠেছে।

ফেডারেশনের সঙ্গে শেষ যুদ্ধে ব্যবহৃত মহাশক্তিধর স্পেসশিপটার ছিন্নভিন্ন শরীরটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রান। সেটা দেখে এর আগে রয় ভেবেছিল, কোনও একটা বিস্ফোরণের ফলে সেটার এই অবস্থা হয়েছে। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখে রান-এর লেন্স সত্যিটা বের করেছে। মহাকাশযানটা বিস্ফোরিত হয়নি, বরং সেটাকে টুকরো-টুকরো করে দেওয়া হয়েছে। প্রমাণ হয়ে রয়েছে তার সারা শরীর জুড়ে থাকা অজস্র কাটারের দাগ। প্রাথমিকভাবে সেগুলো দেখে পোড়া দাগ বলে মনে হলেও আসল ব্যাপারটা এখন বোঝা যাচ্ছে।

হঠাৎ করেই রয়ের নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হয়। মানুষের যে কোনও কলোনি থেকে বহু-বহু দূরের এই উপগ্রহেও কি তাহলে ঘাঁটি বানিয়েছে আকাশদস্যুর দল?

নোমুরার উত্তেজিত গলাটা শুনতে পায় রয়, “জেনারেল, আপনাদের নাকের ডগায় পাইরেটদের একটা বেস খুঁজে বের করার জন্য রান-কে পাঠাতে হল। এটা থেকে কার অকর্মণ্যতা প্রমাণ হয়?”

অন্য কোনও সময় হলে করিম নির্ঘাত ফেটে পড়তেন। নয়তো চিবিয়ে-চিবিয়ে ডক্টর নোমুরাকে প্রোটোকল শেখাতে চেষ্টা করতেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তিনিও বুঝতে পারছিলেন, এখানে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। শান্ত গলায় বলেন করিম, “পাইরেট বা অন্য কেউ যদি এই মহাকাশযানগুলো থেকে পাওয়া বিভিন্ন অংশ কালোবাজারে বেচার চেষ্টা করত, তাহলে খবর আমরা না পেলেও মিডিয়া পেতই। তেমন কিছু জানা গেছে কি? তা ছাড়া, পাইরেসির ফলই যদি এটা হয়, তাহলে কোলাইডারটা নেওয়া হয়নি কেন?”

ব্যাপারটা খেয়াল করে রয়। সত্যিই তো! সব ক’টা স্পেসশিপের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা টুকরোগুলোর যে ফোটো ধরা পড়েছে রান-এর লেন্সে, সেগুলো বিশ্লেষণ করার জন্য কয়েকটা সরল কম্যান্ড দেওয়া মাত্র করিমের কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। প্রতিটি স্পেসশিপ থেকে গায়েব হয়েছে শুধুমাত্র জৈব আর অজৈব বস্তুর সংকরে বিভিন্ন প্রাণীর আদলে তৈরি করা বায়োমিমেটিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। বাকি সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যা দেখে মনে হয় যেন প্রবল হিংস্রতায় সেগুলোকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছে একঝাঁক হিংস্র…

লেন্সে নয়, কিন্তু রান-এর শরীরে থাকা অন্য একটা সেন্সরে হঠাৎ ফুটে উঠল একঝাঁক চলমান বিন্দু। দূরে, যেখানে উল্কাপাতের ফলে এই গ্রহাণুর পিঠটা উঁচুনিচু হয়ে খাদ আর টিলার চেহারা নিয়েছে, সেদিক থেকেই উঠে আসছিল বিন্দুগুলো।

অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে আসা বিন্দুগুলো একটু বড় হতেই তাদের মধ্যে জ্বলতে থাকা লাল আলোগুলো রান-এর শক্তিশালী লেন্সে ধরা পড়ল। তৎক্ষণাৎ রয়ের মাথার মধ্যে তীব্র চিৎকার করে উঠল ওর যাবতীয় অনুভূতি। ও এখনও সামনে থেকে দেখেনি কারা আসছে ওর কাছে। কিন্তু ও বুঝতে পারছে, যারা আসছে তাদের চেয়ে ভয়ংকর কিছুর সম্মুখীন ও আজ অবধি হয়নি।

ঘুম থেকে ওঠা একটা চিতার মতোই নিজেকে টানটান করে নেয় রান। তারপর ছুটতে শুরু করে সেই দিকে, যেখানে স্পেস-টাইম লুপটা খুলে রেখেছিলেন ধৃতিমান।

দৌড় শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই রান-এর বেগ বাড়তে শুরু করে। রয়ের প্রতিটি স্নায়ু ওকে বলছিল, “জোরে! আরো জোরে!” কিন্তু ব্রিজের চেয়ারে বসে দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে নিজেকে সংযত রাখছিল ও। ও জানত, এই মুহূর্তে সিস্টেম ওভারলোড হয়ে একটা ভালভ উড়ে যাওয়ার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু।

ওর পেছনে কারা আসছে সেটা রয় আন্দাজ করেছিল। করিমের দমচাপা গলায় বলা শব্দটা শুনে ও নিশ্চিত হয়। মহাকাশের আরও অনেক কিংবদন্তি আর ভয়ের গল্পের মতো এটাও তাহলে সত্যি বলেই প্রমাণিত হল।

“ডগস!” বলে উঠেছিলেন করিম, “বুনো কুকুরের পাল!”

মহাকাশের এই বায়ুহীন জলহীন পরিবেশে কুকুরের কথা শুনলে অন্য কেউ অবাক হলেও রয় অবাক হয়নি। ‘ড্রোনস অপারেটেড জিওথার্মালি’ বা ডিওজি নামক রোবো তথা ভন-নিউম্যান মেশিনদের কথা ও শুনেছিল। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়ে নাকি এদের তৈরি করেছিল কনফেডারেশন। তাদের লক্ষ্য ছিল রিপাবলিকের অত্যাধুনিক স্পেসশিপের প্রাণভোমরা, অর্থাৎ তাদের বায়োমিমেটিক কনট্রোল ছিনিয়ে নিয়ে বাতিল রোবো শরীরে তাকেই কাজে লাগিয়ে আরও ড্রোন বানানো।

শেষ যুদ্ধ চলাকালীন নাকি এই কোয়াড্র্যান্টে পরিত্যক্ত হয়েছিল এমনই একঝাঁক ড্রোন। সবাই ভেবেছিল, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে, এই নির্মম পরিবেশে তারা নিজেরাই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। কিন্তু এই পরিবেশ ছিল ওই বুনো কুকুরদের পক্ষে একেবারে আদর্শ।

যতদিন এই এলাকাটা কনফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণে ছিল, ততদিন স্পেসশিপ উধাও হলেও সে-কথা জানা যেত না। কিন্তু এবার তদন্ত করতে গিয়ে এস্তেবান বুঝতে পেরেছিলেন, ঠিক কাদের আক্রমণে হারিয়ে যাচ্ছে রিপাবলিকের একের পর এক স্পেসশিপ। ভাগ্যের ফেরে তাঁকেও শেষ অবধি এই উপগ্রহেই এসে নামতে হল! এই ড্রোনদের আক্রমণেই তাহলে শাটলটার লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম ধ্বংস হয়। সেটা হলে তাঁর ও অন্য যাত্রীদের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ছিল। কিন্তু ধ্বংসস্তূপে একটাও মৃতদেহের চিহ্ন পাওয়া যায়নি কেন?

উত্তরটা ভাবার সুযোগ পায় না রয়। একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় ছুটন্ত অবস্থাতেও পড়ে গিয়ে গড়িয়ে যায় রান। রয়ের গোটা পৃথিবী টলে উঠে আবার সোজা হয়। ও বুঝতে পারে, একটা ড্রোন রান-কে লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিয়েছিল। তার ধারালো কাটারটা রান-এর মসৃণ এবং প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলা শরীরটায় লেগে ঠিকরে গেলেও ধাক্কাটা রান সামলাতে পারেনি। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছোটে রান। জোরে। আরও জোরে।

“রয়!” প্রফেসর ধৃতিমানের গলাটা নিচু হলেও কথাগুলো ওর কানে প্রায় ফেটে পড়ে, “তুমি একটু তাড়াতাড়ি দৌড়ও। উল্কাবৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি লুপটা আর বেশিক্ষণ খোলা রাখতে পারব না।”

রয় দেখতে পায়, ওর স্ক্রিনের বাঁ দিকের কোণে ফুটে উঠেছে ধূমকেতুর লেজের মতো করে এগিয়ে আসা একটা বিরাট আলোর পুঞ্জ। ওর দেখা সবচেয়ে বড় উল্কাবৃষ্টি!

বিদ্যুৎচমকের মতো রয় বুঝতে পারে, এদের হাতে পরোক্ষভাবে খুন হওয়া মহাকাশযাত্রীদের কী হয়েছিল। লাইফ-সাপোর্ট ভেঙে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়। নিষ্প্রাণ, অথচ স্পেস-স্যুট পরা শরীরগুলোকে জৈব আর অজৈব জিনিসের সমন্বয়ে তৈরি জিনিস হিসেবেই দেখে এই ড্রোনগুলো। তারপর, ঠিক যেভাবে মহাকাশযান থেকে জিনিস বের করা হয়, সেভাবেই কেটে টুকরো-টুকরো করা শরীরগুলো কাজে লাগিয়ে আরও ড্রোন তৈরি করেছে এরা।

এই উল্কাবৃষ্টিতে স্পেস-প্রোবটা অচল হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সেটা হলে এই উপগ্রহে অসহায় হয়ে ওকেও এই শিকারি ড্রোনগুলোর খাদ্য হতে হবে! ওর শরীরটা হয়তো এখানে নেই। কিন্তু মনে, চেতনায়, আত্মায় তো ও এই গ্রহাণুতেই আছে!

এঁকেবেঁকে, ড্রোনগুলোকে সাধ্যমতো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করার ফাঁকেও দৌড়ের গতি বাড়ায় রান। দূর থেকেও দেখা যায়, হালকা আর মায়াবী একটা আলো তুলে ঝিলমিল করছে ধৃতিমানের লুপ। কিন্তু… লুপটা তো বন্ধ হয়ে আসছে!

একটা অদ্ভুত হতাশা ওকে গ্রাস করতে থাকে।

পেছনের ড্রোনগুলোকে তখন বেশ কিছুটা পেছনে ফেলেছে রান। তবু এটা স্পষ্ট যে লুপ দিয়ে ও আর পৌঁছতে পারবে না ব্রিজের লাগোয়া এয়ার-লকে। নিজের স্নায়ুগুলো শিথিল করে দেয় রয়। চোখ বন্ধ করে নিজের অবস্থাটা ভাবতে গিয়েই রয় টের পায়, ওর মাথাটা হালকা হয়ে যাচ্ছে।

রয় নিজেকে আবার আবিষ্কার করে ব্রিজে, চেয়ারটায় বসা অবস্থায়। ওর মাথার সেই হেলমেটটা এখন সরে গেছে, যা দিয়ে ও রান-এর সঙ্গে এতক্ষণ যুক্ত ছিল। পরিবেশের বদল হলেও একঝাঁক রক্তপাগল কুকুরের হাতে শিকার হওয়ার অনুভূতিটা তখনও রয়ের মাথায় প্রবল ছিল। হয়তো চেয়ার ছেড়ে ও দৌড় লাগাত। কিন্তু তখনই ওর নজর পড়ে স্ক্রিনের দিকে।

বন্ধ হয়ে যাওয়া লুপটার সামনে অবাক বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে ছিল রান। ওকে ফেলে রেখে রয়ের চলে যাওয়ার এই বিশ্বাসঘাতকতা যেন রান বিশ্বাস করতে পারছে না!

ধৃতিমানের দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা ঘর। মাথা নিচু করে, প্রায় অস্ফুটে বলা তাঁর কথাগুলো কারও কান এড়িয়ে গেল না।

“হাইপারস্পেশিয়াল রিলে চালু রয়েছে বলে আমরা এসব দেখতে পাচ্ছি। ইচ্ছে করলে কিছু নির্দেশ এখনও ওর কাছে পাঠানো সম্ভব। কিন্তু ওকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।”

হাঁটু মুড়ে বসে নিজেকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিল রান। তার শরীরের প্লেটগুলোর ভ্যানাডিয়াম আর টাইটেনিয়াম স্তর জুড়ে রান-কে কিছুটা বর্তুল আকার দিল, যার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ড্রোনগুলো। তবে বোঝা যাচ্ছিল, এই সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ থেকে রান-কে খুব বেশিক্ষণ বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না ওই প্লেটগুলো।

স্পেস-প্রোবের ক্যামেরা কাঁপছিল। তাতেও, ব্রিজে এসে পৌঁছনো দৃশ্যটা ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকের বুকের মধ্যে একটা মোচড় তুলেছিল। এমনকি করিম নিজের স্বাভাবিক দাপুটে গলার বদলে কিছুটা নরম সুরেই বললেন, “ডক্টর নোমুরা, আপনি দয়া করে টেক্স প্রোটোকল চালু করুন।”

টেক্স প্রোটোকল! বোবা বিস্ময়ে রয় তাকিয়েছিল ডক্টর নোমুরার দিকে। ও ভাবতে পারছিল না, রান-এর মতো এমন এক অনন্য সৃষ্টিকে এবার নির্দেশ পাঠানো হবে, যাতে সে নিজেকে ধ্বংস করে দেয়।

ডক্টর নোমুরার গাল বেয়ে নেমে আসছিল জলের ধারা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রয় ভাবল, নিজের সৃষ্টিকে চোখের সামনে ধ্বংস হতে দেখাটাই বোধহয় স্রষ্টার কাছে সবচেয়ে বড় অভিশাপ। অবশ্য এ ছাড়া উপায় কী? নইলে ওই বুনো কুকুরের পাল এই চিতাকে জীবন্ত অবস্থাতেই খেয়ে…।

“ডক্টর নোমুরা।” ধৃতিমানের শান্ত আর নৈর্ব্যক্তিক গলাটা ঘরের উত্তেজনা, উদ্বেগ, ভয়, কষ্ট, আর রাগে থিকথিক করা পরিবেশের সঙ্গে এতটাই বেমানান ছিল যে প্রত্যেকে তাঁর দিকে তাকাল।

“সেনাবাহিনীর হয়ে গোপন গবেষণা শুরু করার আগে আপনি যে লেকচারগুলো দিতেন, আমি তাদের বেশ কয়েকটা শুনেছি।” ধীর, কিছুটা অ্যাকাডেমিক ভঙ্গিতে বলে চলেন ধৃতিমান, “তাতে আপনি বলতেন, সেনসরি ওভারলোড হলে রোবো নাকি বিগড়ে যায়। আপনি বলেছিলেন, বিশেষ অবস্থায় নাকি উন্নত ধরনের রোবো-ও চাপে থাকা মানুষের মতো ডক্টর জেকিল থেকে মিস্টার হাইড হয়ে উঠতে পারে।”

নিজের পুরোনো, ধারালো গলাটা এবার ফিরিয়ে আনেন ধৃতিমান, “আপনার কি মনে হয় না ডক্টর, যে আমাদের ভদ্র ও শান্ত ডক্টর জেকিল-রূপী রান এই মুহূর্তে মিস্টার হাইড হওয়ার অবস্থায় আছে?”

হাঁ করে কিছুক্ষণ ধৃতিমানের দিকে তাকিয়ে থাকেন নোমুরা, তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন কনট্রোল প্যানেলের ওপরে। বুক ধুকপুক করতে থাকে রয়ের। ও বুঝতে পারে, শুধু ও একা নয়, গোটা ব্রিজ শ্বাস বন্ধ করে রয়েছে কোনও এক অসম্ভবের আশায়।

নোমুরার আঙুলগুলো প্যানেলের ওপর অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করার পর কতক্ষণ কেটেছিল তা রয়ের খেয়াল নেই। কিন্তু একটু পরে স্ক্রিন জুড়ে একটা রুপোলি আলোর বৃত্ত ঝলসে ওঠে।

চোখ ধাঁধিয়ে যায় রয়ের। স্ক্রিন থেকে পিছিয়ে যায় টেকনিশিয়ানরা। অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন শুধু করিম, নোমুরা, ধৃতিমান, আর রয়। দু’চোখ ভরে দৃশ্যটা দেখে ও।

রান উঠে দাঁড়িয়েছে। শুধু উঠেই দাঁড়ায়নি, তার শরীরের পাতগুলোর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে স্পেসশিপ কেটে যাত্রীকে বের করা, আর পাথর কেটে তার নমুনা সংগ্রহের জন্য রাখা সারি-সারি লেজার। সেই সব ক’টা লেজার একসঙ্গে প্রয়োগ করেছে রান ওর শরীরের ওপর কাটার নিয়ে হামলে পড়া ড্রোনগুলোর ওপর।

রুপোলি শরীরের সর্বাঙ্গ জুড়ে ফুটে ওঠা লেজারের নলগুলো কালো ফোঁটার মতো দেখাচ্ছিল বলে রয়ের মনে হচ্ছিল, ও যেন একটা সত্যিকারের চিতাকেই সামনে দেখতে পাচ্ছে। না, ভুল ভাবছে ও। চিতা নয়। এই শরীর তো শুধু দৌড়ের জন্য নয়। আগের চেয়ে ভারী, চওড়া, আর রাজকীয় এই শরীর বরং এমন কারও, যে লড়তে জানে, যে লড়তে চায়।

লেপার্ড!

ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে পড়েছিল সামনের দিকের ড্রোনগুলো। অন্যগুলো থেমে গেছিল, হয়তো লড়াইয়ের পরের ধাপটা ঠিক করার চেষ্টা করছিল। দম বন্ধ করে রয় ভাবছিল, ওরা রান-এর ওপর আবার কখন ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ওদের সেই সুযোগ দিল না রান। ওর মুখের দিকটা খুলে গেল।

রক্তরাঙা মুখের ভেতরে আত্মপ্রকাশ করল সার দিয়ে সাজানো একঝাঁক ক্রিস্ট্যাল!

স্তম্ভিত করিম বলেই ফেলেন, “রান-এর মুখে ব্লাস্টার লাগানো হয়েছে! কবে? আমাকে তো কেউ কিছু বলেনি!”

করিমের কথাটা শেষ হয় না। রান-এর মুখ থেকে বেরোনো একটা তীব্র লালচে ঝলক ছুটে বেরিয়ে আসে ড্রোনগুলোর দিকে। টুকরো-টুকরো হয়ে ভেঙে পড়তে থাকে ড্রোনগুলো!

“পালিয়ে যাচ্ছে!” ভাঙা গলায় বলে ওঠেন নোমুরা, “ওরা পালিয়ে যাচ্ছে।”

স্ক্রিনে তখন ফুটে উঠেছে এক অভাবনীয় দৃশ্য। ড্রোনের ঝাঁক পিছিয়ে যাচ্ছে সেই টিলা আর খাদের দিকে, যেদিক থেকে ওরা এসেছিল। তাদের দিকে ঘুরে স্থির হয়ে রয়েছে রান।

“হ্যাঁ।” শুকনো গলায় বলেন করিম, “লেজার আর ব্লাস্টারের আদর ওরা সহ্য করতে পারল না।”

কিছুক্ষণ পর, যখন চরাচর আবার শান্ত হয়ে গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া লুপের দিকে তাকায় রান। বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে রয়ের। পরমুহূর্তেই থরথর করে কেঁপে ওঠে দৃশ্যটা, আর কাঁপতেই থাকে। আর দাঁড়ায় না রান। মসৃণ ভঙ্গিতে কয়েকটা লাফ আর দৌড় দিয়ে দূরে, আরও দূরে চলে যায় মানুষের গড়া সেরা রোবো।

একটা বিরাট আলোর ঝলকের পর স্ক্রিনে সব অন্ধকার হয়ে যায়।

“স্পেস-প্রোবটা গেল।” দুঃখিত কণ্ঠে বলেন ধৃতিমান, “আমরা আর এই উপগ্রহে লুপ খুলতে পারব না।”

ঘরের পরিবেশ তখনও স্বাভাবিক হয়নি। জমে ওঠা নিস্তব্ধতা ভেঙে যায় করিমের গম্ভীর গলায়, “আপনাকে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ডক্টর নোমুরা। রান-এর শরীরে ব্লাস্টার কেন এবং কার নির্দেশে লাগানো হয়েছিল? ওকে ঠিক কী কম্যান্ড দিয়েছিলেন আপনি শেষ মুহূর্তে? রান-এর প্রোগ্রামিং করার সময় আপনি…”

একটা হাত তুলে করিমকে থামিয়ে দেন নোমুরা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বলেন, “রান-এর শরীরে ব্লাস্টার লাগানোর জন্য আমি দায়ী নই। ওকে যুদ্ধে ব্যবহার করার প্ল্যান যাঁরা করেছিলেন তাঁরাই এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। যদি…” একটু বাঁকা হেসে বলেন নোমুরা, “তাঁদের এই প্রশ্নগুলো করার সাহস আপনার হয়।”

চুপ করে থাকেন করিম। ক্লান্ত স্বরে বলে চলেন নোমুরা, “কী কম্যান্ড আমি দিয়েছিলাম তা হয়তো ড্যাশবোর্ড থেকে বের করতে পারবেন, তবে তা দিয়ে কোনও কাজ হবে না। ওগুলো ছিল শুধু আমার রান-এর জন্য।”

“রান-এর এখন কী হবে?” আর থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করে রয়।

থেমে-থেমে উত্তরটা দেন ধৃতিমান, “যে আদেশগুলো ওর মগজে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, ও সেগুলো অনুসরণ করবে। যদি এই উপগ্রহে আবার কখনও কোনও মহাকাশযান নামতে বাধ্য হয়, তাহলে ও তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করবে। ইতিমধ্যে ও তথ্য সংগ্রহ করবে, বিশ্লেষণ করবে। নিজেকে ঠিক রাখবে।”

“কিন্তু ওই…?” কথাটা শেষ না করলেও রয় কী বলতে চাইছে তা বুঝতে পারে সবাই।

এবার উত্তরটা দেন নোমুরা, “রান আত্মরক্ষা করতে সক্ষম, রয়। শুধু তাই নয়। আমার ধারণা, ড্রোনগুলোর সঙ্গে ওর লড়াই চলতেই থাকবে। ওই গ্রহাণুকে মৃত্যুফাঁদ করে তুলেছে ড্রোনগুলো। রান এটা মেনে নেবে না।”

“ওকে ফিরিয়ে আনবেন না আপনারা?” প্রশ্নটা করার সময়েই অবশ্য রয়ের মনে হয়, ও উত্তরটা জানে।

“না।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন করিম, “যে রোবো এমনভাবে লড়তে পারে, তার নিজের মতো করে, স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার আছে বলেই আমি মনে করি। আপনারা কী বলেন?”

মাথার ভেতর, বুকের ভেতর, একটা অদ্ভুত কম্পন অনুভব করে রয়। ওর মনে হয়, গ্রহ-তারায় ভরা আকাশের নীচে, নানা আলোয় রঙিন এক রুক্ষ প্রান্তরে ও ছুটে চলেছে।

ছুটেই চলেছে!

এক ও অদ্বিতীয় ময়ূখ চৌধুরীকে, কৃতজ্ঞতাসহ

প্রথম প্রকাশ: শারদীয়া ‘কিশোর ভারতী’, ২০১৭