প্ল্যান – ঋজু গাঙ্গুলী

প্ল্যান

চেকপয়েন্ট পার হওয়ার সময় মেয়েটাকে প্রথম দেখি। পরিবেশের সঙ্গে এক্কেবারে বেমানান বলেই মেয়েটার পূর্ব এশীয় মুখ, কুচকুচে কালো চুল, আর ক্লান্ত চোখজোড়া নজরে পড়েছিল।

মেয়েটাকে কি আগে কোথাও দেখেছি? কোথায় দেখেছি?

সেই মুহূর্তে এই নিয়ে কিছু ভাবার উপায় ছিল না। মেডিক্যাল টিম আর নিরাপত্তা রক্ষীদের মধ্যে তখন আমি হিমসিম খাচ্ছি। তাদের নজর বাঁচিয়ে নিজেকে আর হুইলচেয়ারটাকে বের করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল। কিন্তু কাকতালীয় ব্যাপারটা ভাবুন! শেল্টার-মুখী দলে গোটা দশেক গাড়ি থাকলেও মেয়েটা আর আমি একই গাড়িতে সওয়ারি হলাম।

জন্মের পর থেকেই জলের ছোঁয়া পায়নি এমন একঝাঁক লোকের সঙ্গে এক গাড়িতে যেতেও আমার কোনও অসুবিধে হত না। অথচ, মেয়েটার চুল থেকে ভেসে আসা একটা সুগন্ধ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছিল। আমার স্মৃতি বলতে যা আছে তা কিছু আলো, কিছু শব্দ, অনেক যন্ত্রণা, আর রক্তের স্রোতের সমষ্টিমাত্র। কিন্তু মেয়েটার চুল থেকে ভেসে আসা গন্ধটা সেই ধ্বংসস্তূপের আড়াল থেকে যেন কিছু অন্য রকমের কথা, কিছু অনুভূতি আমার মনে ফিরিয়ে আনছিল।

ঠিক কবে থেকে আমার এই যন্ত্রণাকাতর স্মৃতিহীন জীবন শুরু হয়েছে, সেটা মনে করতে পারি না। হাঁটুর বয়সি ছেলেমেয়েগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনটা মাঝেমধ্যে অর্থহীন মনে হয়। তবু, তার একটা মানে দেওয়ার চেষ্টা করছি বোধহয় বছর তিনেক হল। তার আগে আমি কে ছিলাম, কী করতাম, এসব কিচ্ছু মনে পড়ে না।

ভুল বললাম। মনে পড়ত না। কিন্তু মেয়েটার দিকে যতবার নজর পড়ছিল, বুকের মাঝখানটায় কেমন একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছিল।

পুরোনো কথা ভাবতে গেলেই মাথায় বড্ড যন্ত্রণা হয়। বেসের নাম-কাটা ডাক্তার বলেছিল, আমার শরীরটা এত রকমের কাঁটাছেড়ার মধ্য দিয়ে গেছে যে যন্ত্রণার স্মৃতিগুলো পেছনদিকে ঠেলতে গিয়ে আমার মগজ সবকিছুই সাফ করে দিয়েছে। তবু, মাথার দপদপানি উপেক্ষা করে আমি অতীতের কথা ভাবার চেষ্টা করছিলাম।

বালির বুকে লাফিয়ে-লাফিয়ে ছুটছিল ট্রাকটা। সামনে-পেছনে থাকা অন্য ট্রাকগুলোয় মোতায়েন রক্ষীদের সতর্ক নজরদারি থেকে বুঝতে পারছিলাম, ওরা হানাদারদের আক্রমণের আশঙ্কা করছে।

মনে-মনে হাসছিলাম আমি।

হুইল চেয়ারের ফাঁপা পাইপের মধ্যে জীবনদায়ী ওষুধ, রোলিং বলগুলোর মধ্যে লিকুইড ক্রিস্ট্যাল, আর আমার থরথরিয়ে কাঁপা হাতদুটোকে শক্ত করে বেঁধে রাখা প্লাস্টারের ভাঁজে লুকোনো টেপ, এসব মিলিয়ে আমার দাম এই মুহূর্তে এই কনভয়ের সব ক’টা গাড়ির চেয়ে বেশি। কিন্তু মরুভূমির ত্রাস ডাকাতগুলো তা জানে না। ওরা বরং চাইবে এই কনভয়ে লুটতরাজ চালিয়ে রক্ষীদের অস্ত্র, আর এই সব-হারানো মানুষগুলোর সঙ্গে থাকা শেষ পুঁজিটুকুও কেড়ে নিতে।

আমি মনে করার চেষ্টা করছিলাম, মেয়েটা আমার ঠিক কোন স্মৃতি উসকে দিচ্ছে।

একটা হাসপাতাল। সাইরেনের শব্দ। আগুনের হলকা। ভারী বুটের আওয়াজ। যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট একটা মুখে একজোড়া মায়াবী চোখ।

নাওকো!

নামটা কোত্থেকে উঠে এল? জানি না, তবে ওই মুখ আর চোখজোড়া নাওকো’র।

চোখ বুঁজে মাথার ভেতরের কুয়াশাটা সাফ করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি!

নাওকো’র হাতে তোয়ালে জড়ানো একটা পুঁটলি তুলে দিচ্ছে নার্স। কিন্তু কী হল? নাওকো কাঁদছে কেন? এ তো আনন্দের কান্না নয়! ও কাঁদছে, আর ওকে কারা যেন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর… বাচ্চাটা কাঁদছে না কেন?

আর কিছু ভাবার সুযোগ পেলাম না। প্রথম গ্রেনেডটা ঠিক তখনই ফাটল আমাদের ঠিক সামনের ট্রাকটার গায়ে আছড়ে পড়ে।

সমস্ত শক্তি দিয়ে ব্রেক চাপল আমাদের গাড়ির চালক। হুইল চেয়ারের নিচের লকটা চালু করে দিয়েছিলাম বলে আমি ছিটকে পড়লাম না। কিন্তু গাড়ির অন্য সওয়ারিরা অতটা ভাগ্যবান ছিল না। পেছনের ক্যানভাসের ফাঁক দিয়ে বাইরে পড়ে গেলেন এক বৃদ্ধ। তাঁর আর্তনাদ অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হল না। আমাদের পেছনের ট্রাকটা ব্রেক চাপতে-চাপতেই তার বিশাল চাকাগুলো বৃদ্ধের শরীরটা পিষে দিল।

হয়তো অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু এই অবস্থাতেও আমার হঠাৎ একটা কথা মনে হল। গাড়িতে ওঠার পর থেকে বৃদ্ধ বলছিলেন, শেল্টারে যে স্কুলটা খোলা হয়েছে তার ছাত্রছাত্রীদের ভূগোল শেখানোর জন্য তিনি কী নতুন টেকনিক নেবেন। ততদূর পৌঁছানোর আগেই বৃদ্ধর শরীরের বিকৃত মানচিত্র আঁকা হয়ে গেল এই নরকে!

গুলি আর বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তার মধ্যেই একটা বিরাট শব্দ বুঝিয়ে দিল, সামনের ট্রাকটা শুধু উলটেই যায়নি, তার পেট্রল ট্যাংকটাও উড়েছে। এবার যদি পেছনের একটা ট্রাকও উলটে যায়, তাহলে আমাদের পক্ষে সামনে বা পেছনে যাওয়া সম্ভব হবে না।

আমাদের ট্রাকে যে রক্ষী ছিল, তার উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়। যে ইতিমধ্যেই বুঝে ফেলেছিল, গ্রেনেডগুলো কোন দিক থেকে আসছে। ড্রাইভারের উদ্দেশে গালাগাল আর মিষ্টি কথার একটা ইন্টারেস্টিং মিশেল ছুড়ে দিচ্ছিল সে। বুঝতে পারছিলাম, রক্ষীটি ট্রাকটাকে এমন ভাবে দাঁড় করাতে চাইছিল, যাতে আমরা গাড়ি থেকে নেমে গিয়েও অন্তত কিছুক্ষণ নিরাপদ থাকতে পারি।

বাকিরা দ্রুত নেমে পড়ছিল। কিন্তু… হুইলচেয়ার নিয়ে আমি কীভাবে নামব? তখনই মেয়েটা হ্যাঁচকা টানে ট্রাকের ক্যানভাসটাকে যথাস্থানে ধরে রাখা দুটো তক্তা খুলে নিল। সেগুলো ঝটপট পাশাপাশি পেতে উঁচু ট্রাক থেকে হুইলচেয়ার নিয়ে আমার নামার জন্য মোটামুটি ঢালু একটা রাস্তা বানিয়ে দিল। কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আমি হুইলচেয়ারটাকে সেই তক্তাদুটোর ওপর দিয়ে চালিয়ে গাড়ি থেকে নীচে নামালাম। আমার পেছনেই লাফিয়ে নামল মেয়েটা।

ড্রাইভার, আর আমাদের গাড়িতে থাকা রক্ষীটিকে চিৎকার করে নেমে আসতে বললাম। রক্ষীটি কর্ণপাত করল না, বরং হাত দিয়ে আমাদের দিকে ইশারা করে অন্য একটা ট্রাকের পেছনে আশ্রয় নিতে বলল।

নিজের আশপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করলাম।

যে ক’টা ট্রাক থেকে লোকজন নেমে আসার সুযোগ পেয়েছে, সেগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষীরা প্রাণপণে লড়ছে, কিন্তু তাদের অস্ত্র এবং লোকবল, দুইই মরুভূমির হানাদারদের তুলনায় বেশি হলেও যাত্রীদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বটা উপেক্ষা করতে পারছে না বলে তারা বিপাকে পড়েছে।

হঠাৎ দেখতে পেলাম, প্রায় উড়ে এসে আমাদের ট্রাকটার পেছনে পড়ল একটা কমলা রঙের জিনিস। কিচ্ছু না ভেবে মেয়েটাকে টেনে নিজের কোলের কাছে নিয়ে নিলাম আমি, ট্রাকটার দিকে পেছন দিয়ে।

লাল-হলুদ রঙে আর বিকট আওয়াজে ভরে গেল পৃথিবী। হুইল চেয়ারের নীচের অংশটা রিফ্লেক্সের বশেই গাড়ি থেকে নেমে লক করে দিয়েছিলাম, তা সত্বেও বিস্ফোরণের তীব্রতায় সেটা আমাদের নিয়ে কিছুটা গড়িয়ে গেল। রক্ষীটি, আর আমাদের ট্রাকের চালক বোধহয় কিছু বোঝার আগেই বাষ্পীভূত হয়ে গেছিল।

আর তখনই দেখলাম মেয়েটার আশ্চর্য খেল!

জ্বলন্ত গাড়ির পেছনদিকের একটা রড কিছুটা ভেঙে ঝুলছিল। মেয়েটা ক্যানভাসের একটা টুকরো দিয়ে সেটাকে জড়িয়ে, দু’হাতে সেটা ধরে অদ্ভুত কায়দায় ঝাঁকুনি দিল। রডটা বেরিয়ে এল। বেঁকে যাওয়া রডের সামনের দিকের নগ্ন, ধারালো ধাতব অংশটা রোদে ঝিকিয়ে উঠল।

একবার আমার দিকে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা। হয়তো অশক্ত বুড়ো মানুষটার জন্য চিন্তা হচ্ছিল ওর। আমি বুড়ো আঙুল তুলে, নিজের গোঁফ-দাড়ির ফাঁক দিয়ে মুচকি হেসে মেয়েটাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আমি ঠিক আছি। জ্বলন্ত ট্রাক, আশপাশে নারী-শিশু-বৃদ্ধদের আর্তনাদ, নিরাপত্তা রক্ষীদের তরফে কাছের আউটপোস্টে খবর পাঠিয়ে সাহায্য চাওয়ার মরিয়া চেষ্টা, এসবের মধ্যে মেয়েটাকে একটাও শব্দ না তুলে স্রেফ হারিয়ে যেতে দেখলাম আমি।

অস্বীকার করব না, আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। কোনও অচেনা-অজানা মানুষকে নিয়ে চিন্তা হওয়াটা এই পৃথিবীতে, বিশেষত আমার মতো ভাঙাচোরা বুড়োর পক্ষে হয়তো বড়ই অস্বাভাবিক, তবুও মেয়েটার জন্য আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। ঠিক তখনই দেখলাম, মেয়েটার কাঁধে যে ছোট্ট ব্যাগটা ছিল, সেটা পড়ে আছে সামনের ধুলোয়।

বুঝতে পারলাম, যখন মেয়েটাকে টেনে নিয়েছিলাম নিজের কোলের কাছে, তখনই ব্যাগটা খুলে নীচে পড়েছে। দ্রুত ব্যাগটা তুলে নিলাম। বায়োমেট্রিক লক থাকলে ব্যাগটা খুলতে পারতাম না, তবে আজকাল যুদ্ধ আর টর্চারের ফলে মানুষের অঙ্গহানি হওয়াটা এতই রুটিন ব্যাপার হয়ে গেছে যে ওই লকগুলো বিশেষ ব্যবহার হচ্ছে না। কিছুক্ষণের চেষ্টাতেই ব্যাগটা খুলে গেল। পাসপোর্টটা খুঁজে পেলাম খুব সহজেই। দেখলাম, মেয়েটা জাপানের নাগরিক। নাম সাকুরা।

চেরি ব্লসম! শব্দদুটো আপনা থেকেই মনে এসে ধাক্কা মারল।

আমি যে জাপানিজ কিছুটা জানি, সেটা বেসে কথোপকথনের সুবাদে টের পেয়েছি। তবে কীভাবে ভাষাটা আমি শিখেছি, জাপানে আমি কখনও ছিলাম কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর নিজেই কখনও খুঁজে পাইনি। সাকুরা শব্দের মানে আমি কীভাবে জানলাম, সেটাও তখনকার মতো একটা রহস্য হয়ে রইল।

আমাদের ওপর হামলাটা যেভাবে হয়েছিল তা থেকে হানাদারদের ব্যাপারে কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম। দলটায় অন্তত জনাবিশেক লোক আছে। সঙ্গে আছে পাঁচটা স্যান্ডরোভার, মানে বালির ওপর দিয়ে ভীষণ দ্রুত চলতে পারে এমন অল টেরেইন ভেহিকল রয়েছে। আমাদের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তা রক্ষীদের চেষ্টায় তার মধ্যে গোটা দুয়েক স্যান্ডরোভার কাত হয়েছিল। কিন্তু আহত ও অক্ষম যাত্রীদের বাঁচাতে বাধ্য হওয়ায় রক্ষীরা সম্মিলিত ভাবে পালটা আক্রমণ করতে পারছিল না।

আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, সাহায্য না এলে এই মরুভূমির বালির নীচে আরও অনেক মানুষ আর প্রাণীর মতো আমার শরীরটাও না ঢাকা পড়ে থাকে।

সাহায্য এল, তবে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত দিক থেকে। বালি আর আগুনের মধ্য দিয়ে হঠাৎ ছুটে এল একটা স্যান্ডরোভার। কিন্তু আসার পথে সেটা পিষে দিল হানাদারদের স্নাইপার আর গ্রেনেড-লঞ্চারধারীর বসার নেস্টটাকেই।

মরুদস্যুরা হতচকিত ভাবটা কাটিয়ে ওঠার আগেই গাড়িটা থেকে নেমে এল মেয়েটা।

না, ওকে এবার নাম ধরেই ডাকা উচিত।

চলন্ত গাড়ির দরজা ধরে ঝুল খেয়ে নীচে নামল সাকুরা, তবে যেভাবে আর পাঁচজন নামে সেভাবে নয়। গাড়ি থেকে পুরোপুরি নামার আগেই ওর হাতের সেই ভাঙা লোহার টুকরোটা বাতাস কেটে নেমে এল আশপাশে থাকা হানাদারদের ওপর। যোদ্ধা আর ভাড়াটে সৈন্য মিলিয়ে আমি নেহাত কম লোককে অস্ত্র চালাতে দেখিনি, কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটার হাতে একটা ভাঙা লোহাকে মৃত্যুবাহী হয়ে উঠতে দেখে সত্যিই দারুণ লাগল।

এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল আমাদের সঙ্গে থাকা রক্ষীরা। বিভ্রান্ত হানাদারদের ওপর ওরা সবাই মিলে আক্রমণ করল এবার।

কিছুক্ষণ পর দুটো স্যান্ডরোভারে চেপে অবশিষ্ট দস্যুদের পালিয়ে যেতে দেখলাম। রক্ষী ও যাত্রীদের উল্লাসের মধ্যে আমি সাকুরাকে খুঁজে পেলাম। ও বালি আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছিল। ওকে হাতছানি দিয়ে ডেকে ওর ব্যাগটা ফেরত দিলাম। অনভ্যস্ত গলায় ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ওর অনুমতি না নিয়েই ব্যাগটা খুলেছিলাম।

কোনও কথা না বলে অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সাকুরা।

অবশিষ্ট ট্রাকে ভাগাভাগি হয়ে আমরা আবার রওনা হলাম শেল্টারের দিকে। এবার আমরা আর একই ট্রাকে সওয়ারি হইনি।

কয়েক ঘণ্টার হাড়-ঝাঁকানো সফর শেষে আমরা যখন শেল্টারে পৌঁছলাম, তখন গোটা শহর ভেঙে পড়ল আমাদের দেখতে।

মরুদস্যুদের রীতিমতো পর্যুদস্ত করেছে একটা কনভয়, এই খবরটা আগুনের মতোই ছড়িয়ে গেছিল। হিরো হিসেবে প্রচুর প্রশংসা আর বিনা-পয়সার ড্রিংকস জুটছিল দলের সবার। ও-রসে বঞ্চিত হলেও আমাকে বারবার বলতে হচ্ছিল, ঠিক কী ঘটেছিল মরুভূমিতে। আমার কনট্যাক্ট তথা হ্যান্ডলার হেনরি সেই ভিড়েই ছিল। পরে নিয়মমাফিক কোড ওয়ার্ড বিনিময় করে আমরা চুপচাপ বেরিয়ে এলাম। তখন হেনরিই আমাকে জিজ্ঞেস করল, “মেয়েটার মতো কাউকে পেলে আমাদের খুব সুবিধে হত, তাই না জন?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি মাথা ঝাঁকালাম। ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত দৃশ্য আমার মাথায় ভেসে উঠল অযাচিতভাবেই।

একটা বিধ্বস্ত হাসপাতাল। গুলির শব্দ, নারীকণ্ঠের আর্তনাদ, ফার্মেসির দরজা ভাঙতে পেরে লুঠেরাদের উল্লাস, একটা বাচ্চার একঘেয়ে কান্না, এসবের মধ্যে আমি খুব দ্রুত এগোচ্ছি। হঠাৎ একটা দরজা খুলে আমার সামনে এসে দাঁড়াল একটা মেয়ে। মেয়েটাকে চিনতে পারলাম। নাওকো।

আমার দিকে তাকাল ও। ভোরের আকাশে লাল রংটা যেভাবে অল্প-অল্প করে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক সেভাবেই ওর মুখে ফুটে উঠল একটা অদ্ভুত অভিব্যক্তি, যাতে মিশে ছিল কিছুটা স্বস্তি, কিছুটা ভালোবাসা,…

আর কিছুটা ভয়!

তারপর…

পরের অংশটা আবার ঝাপসা। চাপ-চাপ অন্ধকার, মাঝেমধ্যে লাফিয়ে ওঠা আগুনের শিখা, কাদের যেন ফিসফিস, মেডিক্যাল স্যুট পরা একঝাঁক মানুষের নড়াচড়া…

“জন!” হেনরির ফিসফিসে আমার চটকা ভেঙে যায়, “মেয়েটা আমাদের পিছু নিয়েছে।”

একটা বুড়ো আর অশক্ত মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, হেনরির কাঁধে ভর দিয়ে হুইলচেয়ার থেকে উঠে পেছন ফিরলাম আমি। তারপর সোজা তাকালাম মেয়েটার চোখের দিকে। বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত মোচড় টের পেলাম আবার।

কে মেয়েটা? কী সম্পর্ক ওর সঙ্গে আমার? টুকরো-টুকরো যে ছবিগুলো ওকে দেখার পর থেকেই আমার মনে ভেসে উঠছে, সেগুলো কি আমাকে কিছু বলতে চাইছে?

কাজটা যথেষ্ট ঝুঁকির হচ্ছে জেনেও মন স্থির করে ফেললাম। হাতছানি দিয়ে ডাকলাম মেয়েটাকে, পাসপোর্ট অনুযায়ী যার নাম সাকুরা। মেয়েটা আমার দিকে এগিয়ে এল। হেনরির দিকে ঘুরে আমি স্পষ্ট নির্দেশ দিলাম, “জিরো বেসে চলো।”

হেনরির চোখের তারায় বিদ্রোহ ফুটে উঠল ঠিকই, তবে গত বছর তিনেক আমাকে কাছ থেকে দেখেছে বলেই বোধহয় ও আপত্তি করল না। সাকুরা আমার হুইলচেয়ারটাকে ঠেলে নিয়ে চলল হেনরির পেছনে, যেদিকে আমাদের লজঝড়ে হামভি রাখা ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়লাম শেল্টার ছেড়ে। খেতখামারের মধ্য দিয়ে আমরা চললাম সাজানো-গোছানো ক্যাপিটলের দিকে, যেখানে নানা জায়গায় ছড়ানো রয়েছে আমাদের গোপন বেসগুলো।

জিরো বেস একটা গাড়ি সারানোর দোকানের নীচে। ট্যাকটিক্সের বইপত্রে একেবারে প্রথমেই যেটা শেখানো হয়, সেই নীতি মেনেই বেসটা করা হয়েছিল শত্রুর নাকের ডগায়। এলাকার সবচেয়ে বড় মিলিটারি বেস ওখান থেকে শ’খানেক মিটারের মধ্যেই ছিল।

আমাদের গাড়িটা যখন দোকানে ঢুকে হেঁচকি তুলে থেমে গেল, তখনই আমার মাথার ভেতর অ্যালার্মটা বাজতে শুরু করল।

গাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে একেবারে রদ্দি হলেও তার ইঞ্জিনটা দারুণ শক্তিশালী। সেটাও এভাবে থেমে যাওয়ার একটাই অর্থ হতে পারে। কোনও একটা বিশেষ সিগনালের ধাক্কায় গাড়িটা অকেজো হয়েছে।

কিন্তু জিরো বেস যেহেতু আমাদের পায়ের ঠিক নীচেই ছিল, তাই আমি ওই নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনি। দোকানে যারা কাজ করছিল তাদের কৌতূহলী নজর আমাদের মেপে নিল। লুকোনো ক্যামেরায় ধরা পড়ল আমাদের সবার ছবি। আমি জানি, ফেসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যারের শ্যেনদৃষ্টি ওদের থেকে বুঝে নেবে কে বন্ধু আর কে শত্রু। ওই নিয়ে না ভেবে আমরা চুপচাপ এগোলাম।

হেনরি ছিল সামনে, কারণ ওর রেটিনাল স্ক্যান আর পাসওয়ার্ড ছাড়া দরজা খুলবে না। সাকুরা আমার হুইলচেয়ারটাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল।

লিফট যে লেভেলটায় থামল, সেটাকে জিরো বেসের রিসেপশন বলা চলে। একটা ‘ফুল বডি’ মাসাজ পার্লারের বাইরের ঘরের আকারে সাজানো হয়েছে ওটাকে। পাশের ঘরে সত্যিই কয়েকজন মহিলাকে সেই ‘কাজের’ জন্য রাখা আছে লোককে দেখানোর জন্য। আসলে ওটা একটা কড়া স্ক্রিনিঙের জায়গা। যাদের রেকর্ড এবং পরিচয় সন্তোষদায়ক বলে মনে হয়, শুধু তাদেরই পরের লেভেলে পাঠানো হয়। শত্রু হিসেবে কেউ চিহ্নিত হলে তাকে ওখানেই নিকেশ করা হয়। নবাগত হিসেবে সাকুরাকে ওই স্তরের মধ্য দিয়ে যেতেই হবে।

লিফট থেকে বেরোনো মাত্র আমার মাথার ভেতর অ্যালার্মটা আরও জোরে বাজতে শুরু করল। সাধারণত ওই রিসেপশনে মাত্র একটা কম্পিউটার নিয়ে একটি রাগী মহিলার বিরক্ত মুখে বসে থাকার কথা। কিন্তু সেদিন দেখলাম, আলগাভাবে হলেও ওখানে বসে আছে তিনজন সশস্ত্র রক্ষী।

হেনরি সাকুরাকে এগিয়ে যেতে বলল সামনের দিকে। সাকুরা একটা শব্দও না করে এগিয়ে গেল। তারপর স্ক্যানারে দু’চোখ পেতে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল ও, সঙ্গে আমিও। কিছুক্ষণ পর একটা সবুজ আলো জ্বলে উঠল স্ক্যানারের ওপরে। সাকুরার বায়োমেট্রিকস আমাদের রেকর্ডে থাকা মিলিটারি এজেন্টদের সঙ্গে নয়, বরং সিভিলিয়ান হিসেবে নথিভুক্ত মানুষটির সঙ্গেই মিলেছে।

তখনই, লেভেলের সব ক’টা আলো একসঙ্গে নিভে গেল। এমার্জেন্সি লাল আলোগুলো জ্বলে উঠল প্রায় তৎক্ষণাৎ। কিন্তু সেই এক লহমার অন্ধকারেই দুয়ে-দুয়ে চার করার কাজটা আমি সেরে ফেললাম।

আজ আমার এই বেসে আসার কথা। কেন? যাতে এই বেসে আজ হাজিরা দেওয়া তিনজন এরিয়া কম্যান্ডারের হাতে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস তুলে দেওয়া যায়। অর্থাৎ, আমার সঙ্গে এই বেসের সবচেয়ে নিচু লেভেলে ঢুকতে পারলেও বিপ্লবী আন্দোলনের অন্তত তিনজন মাথাকে একসঙ্গে আক্রমণ করা যাবে।

এর সঙ্গে যোগ করা যাক আমাদের গাড়ির অচল হয়ে যাওয়াকে। ওটা হয়, যখন খুব শক্তিশালী কোনও সিগনাল এমন একটা ফ্রিকোয়েন্সিতে পাঠানো হয়, যেটা আমাদের বেসের জ্যামারকেও উপেক্ষা করে বাইরে যেতে পারে। বাড়িটার আলোগুলো নিভে গেছে। এই লেভেলে এমার্জেন্সি আলো জ্বললেও অন্য জায়গাগুলো এখন অন্ধকারে।

তাহলে কি…?

তারস্বরে আওয়াজ তোলে অ্যালার্মটা। আমরা সবাই বুঝতে পারি, জিরো বেস আক্রান্ত হয়েছে।

সামনে থাকা রক্ষীরা বিপদ বুঝে বন্দুক তোলে একমাত্র অপরিচিত মানুষটির, মানে সাকুরার দিকে। মরুভূমির বালি আর ধোঁয়ার মধ্যে যেটা দেখতে পাইনি, সেটাই এবার আরও ভালো ভাবে, আরও সামনে থেকে দেখার সুযোগ পাই।

একটা ঝড়ের মতো রক্ষীদের ওপর আছড়ে পড়ে সাকুরা।

প্রথমে খালি হাতে থাকলেও কার্যত কয়েক মিনিটের মধ্যে ওর হাতে উঠে আসে দু’টো বন্দুক। অচেতন বা মৃত রক্ষীদের ওপর নজর বুলিয়ে বন্দুকগুলো আমার দিকে তাক করে একটা ইঙ্গিত করে সাকুরা। পরমুহূর্তেই অবশ্য নিজের ভুলটা বোঝে ও।

ক্যারিয়ার হিসেবে আমি এবং আমার সঙ্গে ও এই বেসে ঢুকতে পেরেছে ঠিকই। কিন্তু এর পরের লেভেলগুলোয় ওকে নিয়ে যেতে পারে শুধু হেনরি।

হেনরির দিকে বন্দুক তাক করে সাকুরা। কণ্ঠার কাছের হাড়টা লাফিয়ে ওঠে হেনরির। বুঝতে পারি, মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখা বোধহয় বেচারির জীবনে এযাবৎ ঘটেনি। তবে ওর চোখ দেখে আমি বুঝি, নিজের প্রাণের দাম ওর কাছে জিরো বেস, এবং সেখানে আজ উপস্থিত কম্যান্ডারদের জীবনের চেয়ে বেশি নয়।

সাকুরা আমার কপালে বন্দুকটা চেপে ধরে। চোখ বন্ধ করে আমি কল্পনা করি পরের দৃশ্যটা, যেখানে হয় আমার মাথাটা উড়ে গেছে, নয়তো… মুখে গরম বাতাসের ছোঁয়া লাগে তখনই। বুঝতে পারি, হেনরি’র কোড আর স্ক্যান পেয়ে খুলে গেছে এই ঘরের ওপাশে যাওয়ার ভারী দরজাটা।

হুইলচেয়ারটা ঘষটে সাকুরা আর হেনরির সঙ্গে দরজার ওপাশে পৌঁছই আমিও। সাকুরা একটু হলেও অবাক হয়েছিল। তবে আমার মতো একটা বুড়োকে নিয়ে ওর মাথা ঘামানোর কোনও কারণ ছিল না, তাই ও আপত্তি করেনি। আমি আসলে অঙ্কগুলো মেলাচ্ছিলাম।

মিলিটারি নিঃসন্দেহে আমাকে বিদ্রোহীদের ক্যারিয়ার হিসেবে চিনতে পেরেছিল। কিন্তু শুধু আমাকে নয়, ওরা চেয়েছিল আমার সূত্র ধরে এই বেসে একটা আস্ত ট্রোজান হর্স ঢুকিয়ে দিতে। তাই সাকুরার আবির্ভাব। তাই মরুভূমিতে ওই লড়াই, এবং সেখানে ওর ওই বীরাঙ্গনা অবতার ধারণ!

কিন্তু মিলিটারি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হল কীভাবে যে আমি সাকুরা’র প্রতি এতটাই দুর্বল হয়ে যাব যে ওকে নিয়ে আসব এই বেসে? হুইলচেয়ারটা চালিয়ে সাকুরা আর হেনরির সঙ্গে করিডর ধরে এগোনোর সময় এই শেষ প্রশ্নটার উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করছিলাম আমি। তখন, সাকুরার চুল থেকে সেই গন্ধটা আবার নাকে এসে ধাক্কা মারল।

ভূমিকম্পে ফাটল ধরা জমির তলা থেকে অনেক পুরোনো আর হারিয়ে যাওয়া জিনিস বেরিয়ে আসে, জানেন তো! ঠিক সেভাবেই আমার মনের গভীরে চাপা পড়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো বেরিয়ে এল।

করিডরের শেষে একটা সাদা রঙের দরজার সামনে পৌঁছেছিলাম আমরা ততক্ষণে। দরজার গায়ে লাগানো কি-প্যাডে নিজের কোডটা পাঞ্চ করল হেনরি। দরজাটা খুলে গেল।

দরজাটার ওপাশে থাকা ছোট্ট কনফারেন্স রুমে তখন তিন বিদ্রোহী কম্যান্ডারের থাকার কথা। এক ধাক্কায় হেনরিকে পাশে সরিয়ে একটা নিখুঁত কাতা, মানে অবস্থানে নিজেকে দাঁড় করিয়ে পরপর গুলি চালাল সাকুরা।

হেনরিকে একপাশে গড়িয়ে যেতে দেখে বুঝতে পারি, এবার সময় হয়েছে। তবু, নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডান দিকের দেওয়ালে লাগানো ছোট্ট স্ক্রিনটার দিকে তাকাই আমি। বাড়িটার বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশিরত সেনাবাহিনীর ছবিগুলো ফুটে উঠছিল স্ক্রিনের ছোট্ট খোপগুলোয়। এখনও অবধি যে তারা কিছুই পায়নি সেটা তাদের হাবভাবেই স্পষ্ট হয়।

মন খুলে হেসে উঠি আমি। আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে সাকুরা।

হুইলচেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াই আমি।

মরুভূমির ত্রাস র‍্যাটল স্নেকের চেয়েও দ্রুত আমার দিকে উঠে আসে সাকুরার হাতের বন্দুকটা। তবে সেই সময়টাও আমার কাছে যথেষ্ট ছিল, কারণ আমার আর সাকুরার মাঝের ফুট তিনেকের দূরত্বটা পার করতে আমার সেকেন্ডের ভগ্নাংশ লেগেছিল।

আমার হাতের আঙুলগুলো সাকুরার গলার কাছে একটা বিশেষ জায়গায় চাপ দেয়। অসাড় হয়ে পড়ে যায় সাকুরা।

দ্রুত হুইলচেয়ারটা খুলে ফেলতে থাকি। হেনরিও উঠে হাত লাগায়, নইলে হুইলচেয়ারটাকে একটা জোড়াতালি স্ট্রেচারে বদলে নেওয়া সহজ হত না। সিটের পেছনে লুকোনো একটা বিশেষ ধরনের মুখোশ মুখের ওপর চেপে বসিয়ে, সঙ্গে একটা মানানসই লেন্স চোখে লাগিয়ে আমি নিজেকে পালটে ফেলি। সেনাবাহিনীর সঙ্গেই যেসব প্যারামেডিক্যাল স্টাফ থাকে, তাদের উর্দি নিজেদের গায়ে চড়িয়ে নিই। স্ট্রেচারে শোয়ানো সাকুরাকে নিয়ে একটা লিফটে উঠি আমরা। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে ওপরে জমায়েত সৈন্যদের মধ্য দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে আসি।

মিলিটারি হাসপাতালের গাড়ির মতোই দেখতে আমাদের একটা গাড়ি সামনে এসে দাঁড়ায়। ক্যাপিটলের প্রাণকেন্দ্রে অপারেশন চালালে মিলিটারিকেও একটা ‘মানবিক’ মুখ তুলে ধরতেই হয়। তাই অপারেশন চলাকালীন অসুস্থ সিভিলিয়ানদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি তো থাকবেই। গাড়িতে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি আমি। তারপর মনের চোখে ছবির মতো পরপর ফুটিয়ে তুলি দৃশ্যগুলো।

আজ্ঞে হ্যাঁ, এই নাটকের সূত্রপাত হয়েছিল মরুভূমিতে একটি এশীয় চেহারার মেয়েকে দেখামাত্র। আমার স্মৃতি তখনও ফেরেনি, কিন্তু অন্য কিছু আমাকে বলেছিল… বিপদ আসছে। চেকপয়েন্টে আমাদের লোকেদের মাধ্যমেই আমার দেওয়া বিপদসংকেত জায়গামতো পৌঁছে যায়। ফলে, কনভয় শেল্টারে এসে পৌঁছবার আগেই জিরো বেস খালি হয়ে যায়। তার জায়গায় ডেকয় হিসেবে ভুলভাল নানা জিনিস প্ল্যান্ট করে দেওয়া হয়।

মিলিটারি এই কাজের জন্য যে কোনও জাপানি বংশোদ্ভূত মেয়েকেই পাঠিয়ে থাকতে পারে। সাকুরা, বা ওই নাম ব্যবহার করা মেয়েটি নিজের চুলে নাওকোর পারফিউম লাগিয়ে আজ আমার দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। সে সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটা নাও হতে পারে। আবার হতেও তো পারে। যার চলন এত দ্রুত, যে এত নিপুণভাবে যুদ্ধ করতে পারে—তার মধ্যে কিছু বিশেষত্ব থাকা কি একান্তই অস্বাভাবিক? যে মানুষটির স্মৃতি বহন করছি আমি এই ক্ষতবিক্ষত শরীরে, সে তো অপরাজেয় যোদ্ধা ছিল।

স্মৃতির ভিত্তিতেই নাকি গড়ে ওঠে মানুষের সবকিছু। তাহলে, নিজেকে ‘বাবা’ ভেবে সেই মেয়েটিকে খুঁজবার ইচ্ছে কি স্মৃতি বয়ে চলা এই আন্ডারকভার অ্যান্ড্রয়েডেরও হতে পারে না?

প্রথম প্রকাশ: ‘প্রহেলিকা’ সংকলন, নভেম্বর ২০১৭