টয় – ঋজু গাঙ্গুলী

টয়

উলটোদিকের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকটির চোখজোড়া বিস্ফারিত হয়ে উঠছিল। গম্ভীর আওয়াজ তুলে তখনই থরথরিয়ে কেঁপে উঠল অডিটোরিয়ামের দেওয়াল।

চারদিকে হইচই শুরু হল। দেওয়াল জোড়া স্ক্রিনে প্রবল শব্দ তুলে চিড় ধরল। সাইরেনের আওয়াজ মাথা ধরিয়ে দিল। দর্শকদের বিনোদনের জন্য সাজানো স্টেজের ওপরে যন্ত্রপাতি উলটে পড়ল। তবে এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও রয় বোঝার চেষ্টা করছিল, ঠিক কী ঘটছে। পেছন ঘুরে ও দেখল, অডিটোরিয়ামের গা ঘেঁষে, বেগুনি-রঙা আকাশের বুকে ভেসে আছে একটা প্রকাণ্ড অ্যাকিলান স্পেসশিপ।

অ্যাকিলানরা লেসার বা ব্লাস্টার ব্যবহার করে না। বরং অ্যাস্টরয়েড বেল্টের মধ্য দিয়ে চলার সময় ওরা একটা শিল্ডের সাহায্যে আত্মরক্ষা করে। ‘নিরীহ’ জ্ঞানে নিরাপত্তা রক্ষীরা ওদের আটকায়নি। সেটা দিয়েই বাড়িটায় একটা জোরালো ধাক্কা দিয়েছে স্পেসশিপ!

রয় দেখে, শিল্ডটা আবার এগিয়ে আসছে পরের ধাক্কাটা দেওয়ার জন্য। ঘর থেকে বেরোতে চাওয়া জনস্রোতে গা ভাসিয়েও ওর অবাক ভাবটা যাচ্ছিল না। অ্যাকিলানরা মাঠে-ময়দানে ঝামেলা বাধানোর জন্য কুখ্যাত। তারা হঠাৎ এমন একটা বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক জিনিসপত্রে ভরা একজিবিশনের ওপর চড়াও হল কেন?

গ্যানিমিডের অক্ষরেখা বরাবর আকাশে ঝুলে আছে মুলান-থ্রি। এটি একটি অসম্ভব রকম ঝিমধরা স্পেস-স্টেশন। আশপাশে মাইনিং এক্সপিডিশন চালানো লোকজন ছাড়া এর নামও বিশেষ কেউ এতদিন জানতেন না। ক’দিন আগে একটা ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করতে আসা কয়েকজন বিজ্ঞানী এখানে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কারও বোধহয় জায়গাটা বড্ড পছন্দ হয়। ফলে গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া বেশ কিছু আবিষ্কার দর্শকদের সামনে তুলে ধরার জন্য মুলান-থ্রি-কেই বেছে নেওয়া হয়। তার ফল হল এই একজিবিশন।

ঘরের বাইরে এসে হাঁফ ছাড়ে রয়। ও দেখে, সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে নিরাপত্তী রক্ষীরা। হঠাৎ রয়ের খেয়াল হয়, একজিবিশন রুমেই রয়েছে প্রফেসর ধৃতিমানের সাম্প্রতিকতম আবিষ্কার। ইভেন্ট কভার করার পাশাপাশি সেটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও চেপেছে ওর ঘাড়ে। বাধ্য হয়ে, আবার স্রোতের বিরুদ্ধে প্রায় মারামারি করে ও ঘরে ঢোকে।

এইটুকু সময়েই ঘরজুড়ে দক্ষযজ্ঞ হয়ে গেছে! ছাদ থেকে ঝোলানো সুন্দর ঘুরতে-থাকা বাক্সের মধ্যে রাখা স্পেসিমেনগুলো অটুট ছিল বটে। কিন্তু তাদের চারপাশে যা কিছু ছিল প্রায় সবই ভেঙে মাটিতে গড়াচ্ছে। অসহায়ভাবে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে পরবর্তী ঘটনাক্রমের জন্য অপেক্ষা করে রয়।

স্পেসশিপের তলা থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া নমনীয় দড়ি আর হুকের সাহায্যে ঘরের মধ্যে ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে বেশ ক’জন অ্যাকিলান। একটু পরেই ঘরের দুটো দরজাই বন্ধ করে দেয় তারা।

নিজের অবস্থাটা তলিয়ে দেখে রয়। ওর সঙ্গে রয়েছে এই অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে ইস্যু হওয়া আইডেন্টিটি কার্ড, পার্স, আর কমিউনিকেটর। এগুলো দিয়ে লড়াই চালানো যায় না। অ্যাকিলানরাও ওকে নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছিল না। ওর মতো যে ক’জন দায়ে পড়ে, বা স্বেচ্ছায় ঘরে থেকে গেছিল তাদের কড়া নজরে রেখে তারা তখন অত্যন্ত দ্রুত ঘরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নিদর্শনগুলো দেখে নিচ্ছিল। রয়ের মনে হল, ওরা কিছু একটা খুঁজছে।

বিশালবপু এক অ্যাকিলান দলের অন্যদের সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দিচ্ছিল। তার একটা কথা এইসময় কানে গেল রয়ের, “টয়-টা খুঁজে বের করো শিগগিরি। বেকার ঝামেলায় না জড়িয়ে ওটা নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে আমাদের কেউ ঠেকাতে পারবে না।”

টয়!

প্রফেসর ধৃতিমানের তৈরি করা টেসার‍্যাক্টটাকে এই নামেই তো ডাকছে মিডিয়া। তাহলে কি সেটাকেই নিয়ে যেতে এসেছে অ্যাকিলানরা? হঠাৎ অ্যাকিলানদের এমন একটা জিনিসের প্রতি আগ্রহ বা কৌতূহল জন্মানোর কারণটা বুঝতে চাইছিল রয়। কিন্তু বিশেষ সময় পেল না ও। একজন অ্যাকিলান চেঁচিয়ে উঠল। তার ডাক শুনে অডিটোরিয়ামের একটা বিশেষ দিকে দলটা দ্রুত জমায়েত হল।

রয় বুঝল, ওরা টয়-কে খুঁজে পেয়েছে।

স্পেস-টাইম টপোলজি নিয়ে কাজ করেন প্রফেসর ধৃতিমান। তাঁর কাজের সম্পর্কে সেনাবাহিনী আর আন্তঃনাক্ষত্র কর্পোরেশনগুলো ওয়াকিবহাল। কিন্তু তাঁর এবারের আবিষ্কারটা রুচিরা’র, অর্থাৎ ধৃতিমানের মেয়ের দারুণ ‘কিউট’ লেগেছিল। একজিবিশন কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করায় সেটাকেই প্রদর্শনীর জন্য বেছে নিয়েছিলেন ধৃতিমান। জিনিসটা দেখলে সত্যিই একটা খেলনার কথা মনে হয়। সেও আবার একেবারে ছোটদের জন্য নিরাপদ হিসেবে সার্টিফায়েড খেলনা।

বিশেষ ধরনের ক্রিস্ট্যালের সাহায্যে বানানো একটা বড় বাক্সের মধ্যে হাওয়ায় ভেসে আছে একটা অদ্ভুত জিনিস। সেটাকে এক নজরে ঘনক বলে মনে হয়, যার প্রত্যেকটা দিকের রং আলাদা। কিন্তু সময় নিয়ে ঘনকটা দেখলেই দর্শকের চোখ ছানাবড়া হয়ে যেতে বাধ্য। মাঝেমাঝেই এক-একটা দেওয়াল দর্শকের সামনে আসছিল যাদের রং সাদা বা কালো। অথচ সেরকম কোনও রং ঘনকের দেওয়ালে ছিল না। কীভাবে রঙের সংখ্যা ৬ থেকে ৮ হয়ে যাচ্ছে নিজে থেকে, সেটা বুঝতে গেলে বিশেষ ক্যামেরার সাহায্য চাই। তাতে ধরা পড়বে, আপাতভাবে সাদা বা কালো বলে মনে হলেও আসলে সেগুলোও নানা রকম রং। আমাদের দৃশ্যমান আলোর বেনিআসহকলা-র বাইরে চোখ সেগুলো সাদা বা কালো বলে দেখাচ্ছে। এইভাবে জিনিসটার বিভিন্ন দেওয়ালে মোট ২৪টা রং দর্শকদের চোখে বিশেষ ভিসর লাগিয়ে দেখানো গেছে।

জিনিসটা হলোগ্রাম নয়, বরং সত্যিই একটা ঘুরতে থাকা ঘনক। রীতিমতো ভর মেপে আর অন্য বেশ কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে এটা দেখা গেছে।

এখনও বেশির ভাগ দর্শক জিনিসটাকে একটা মজাদার খেলনা হিসেবেই দেখছেন। কিন্তু রয় জানে, আসলে বাক্সের ভেতরে মহাজাগতিক শক্তি দিয়ে ভাঁজ করা হয়েছে স্পেস-টাইম। সেখানে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার পাশাপাশি সময়ের স্রোতে ভেসে আছে একটা চতুর্মাত্রিক ঘনক বা হাইপারকিউব। বিজ্ঞানীরা একে টেসার‍্যাক্ট বলে থাকেন। টেসার‍্যাক্টটাকে কীভাবে ক্রিস্ট্যালের ওই বাক্সের মধ্যে ভরা হয়েছে, সে ব্যাপারে ধৃতিমান কিন্তু কোনও প্রশ্নের উত্তর দেননি।

কিন্তু আপাতত, নজরদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রয় বাক্সটার দিকে এগিয়ে যায়। অ্যাকিলানদের কয়েকজন আস্তিন গুটিয়ে ওর দিকে আসছিল। মারামারি অবধারিত ভেবে ও নিজের আইডেন্টিটি কার্ডটা তুলে ধরে। লাল আর সোনালি রঙের হলোগ্রামটা ঝিকমিকিয়ে ওঠামাত্র অ্যাকিলানদের দলপতি হাত তুলে বাকিদের থামতে বলে।

“আমি ক্রেগ।” নিজের পরিচয় দিয়ে বলে দলপতি, “আর আপনি হলেন রয়। সাংবাদিক।” শেষের কথাটা রীতিমতো তিতকুটে মুখে বলা হয়। ক্রেগের মনোভাবের কারণটা রয় বোঝে।

মাত্র ক’দিন আগে আন্তর্গ্যালাকটিক ফুটবল টুর্নামেন্টে দুটো অ্যাকিলান দলের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়। মিডিয়া সেটাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ‘খবর’ বানায়। আপাতত দুটো দলই সাসপেন্ড। এমনকি সেখানকার জাতীয় দলটাও অন্যান্য জায়গায় গিয়ে খেলতে পারবে কি না তা বিচার করার জন্য একটা কমিশন বসেছে।

“একজিবিশনে এই হামলার খবরটা প্রচার হলে আর কমিশন লাগবে না।” মনে-মনে ভাবে রয়, “জনমতের ঠেলাতেই জাতীয় দলটাও সব ধরনের টুর্নামেন্ট থেকে বাতিল হয়ে যাবে।”

“মিস্টার রয়।” চিবিয়ে-চিবিয়ে বলে ক্রেগ, “আমাদের হাতে সময় খুব কম। এতক্ষণে নির্ঘাত গ্যানিমিড থেকে আর্মাডা রওনা হয়েছে মুলান-থ্রি-র দিকে। তাই আমাদের ঝটপট পালাতে হবে। কিচ্ছু চাই না আমরা, শুধু এই খেলনাটা ছাড়া।”

নিজের হাতের ব্যাটন গোছের জিনিসটা পাশের টেবিলে আছড়ায় ক্রেগ। এই মাথাগরম লোকেদের পাল্লায় পড়ে ক্রিস্ট্যালের বাক্সটা ভেঙে গেলে কী হতে পারে, তা ভেবে ঘেমে ওঠে রয়।

“আপনি এই ঘেরাটোপ খুলতে আমাদের সাহায্য করুন। তাহলে কোনওরকম ভাংচুর না করেই আমরা ভেতরের এই জিনিসটা নিয়ে চলে যেতে পারব। স্রেফ একটা খেলনা হলেও এই মুহূর্তে এটা আমাদের ভীষণ দরকার। আর যদি সাহায্য না করেন, তাহলে দয়া করে সরে দাঁড়ান। আপনারা যাই বলুন না কেন, অকারণে মারামারি করতে আমাদের ভালো লাগে না।”

ক্রেগ এবং তার সঙ্গীসাথীদের হাবভাব থেকে রয় বোঝে, ওরা মিথ্যে বলছে না। প্রফেসর ধৃতিমানের সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা করতে পারলে ভালো হত, কিন্তু সেটার কোনও সুযোগ নেই দুটো কারণে।

প্রথমত, ধৃতিমান তাঁর জিনিসপত্রের ব্যাপারে মারাত্মক গোঁয়ার। তাঁর কাছ থেকে সম্পূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন ছাড়া অন্য কিছু করার পরামর্শ পাওয়া যাবে না।

দ্বিতীয়ত, এগিয়ে আসার সময় এক ফাঁকে রয় ওর কমিউনিকেটরটা চালু করেছিল। হাতসাফাই স্টাইলে সেটা কাছের একজনের বেল্টে গুঁজে দিতে পেরেছিল ও। ওটা এখন বের করার প্রশ্নই নেই।

ক্রিস্ট্যালের বাক্সটা একটা প্লেক্সিগ্লাসের ঘেরাটোপের মধ্যে রাখা ছিল। জায়গাটা নাম্বার-লকড্‌। রুচিরার জন্মদিনটাই এক্ষেত্রে কোড হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। সংখ্যাটা ধৃতিমানের পছন্দসই মার্সেন প্রাইম নম্বরও বটে। রয় নির্দ্বিধায় ১৩১০৭১ এন্টার করে। দরজাটা খুলে যায়।

ক্রেগের নেতৃত্বে অ্যাকিলানরা, আর তাদের সঙ্গে রয়-ও হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে। হাতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লাভস পরা চারজন অ্যাকিলান ক্রিস্ট্যালের বাক্সটা খুব সাবধানে তুলে ধরে মাটি থেকে। রয় সভয়ে দেখে, বাক্সের একটা দিক খুলে আসছে। ক্রেগ চিৎকার করে বাকিদের সাবধান হতে বলে। অন্যরা কেউ কিছু করার আগেই, এমনকি নিজেও ব্যাপারটা ভালো মতো না বুঝে বা ভেবে, বাক্সের ভেতরে ঝাঁপ দেয় রয়।

“তার মানে?” ধৃতিমানের ধারালো গলাটা হঠাৎ ভয়ংকর রকম জোরালো হয়ে ওঠে, “একে তো আপনারা আমার টেসার‍্যাক্টটাকে সুরক্ষিত রাখতে পারেননি। এখন আবার বলছেন যে রয়-কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?”

“আপনি দয়া করে শান্ত হোন প্রফেসর।” মুলান-থ্রি-র নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান নিজের চাকরি যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েও ভয়টাকে গলা থেকে দূরে রাখতে পারেন না, “রয় তাঁর কমিউনিকেটরটা চালু রেখেছিলেন। ঘরের কোণে চালু থাকা ক্যামেরায় আমরা ব্যাপারটা দেখতেও পেয়েছি। প্লেক্সিগ্লাসের লকটা খোলার পর…”

“কীভাবে?” কথার মধ্যেই ধৃতিমানের ঝাঁঝালো গলাটা ভেসে আসে, “লকটা তো আমি সেট করেছিলাম। আর সেটা খোলার কোড কারও জানার কথাই নয়। অবশ্য…”

“ঠিক তাই।” সোৎসাহে বলে ওঠেন নিরাপত্তা প্রধান, “রয়ের মতো বুদ্ধিমান সাংবাদিক নিশ্চয়ই কোনওভাবে বুঝে ফেলেছিলেন কোডটা কী হতে পারে, আর তাই উনি দরজাটা খুলে ফেলেন।”

“তারপর?”

“তারপর যে ঠিক কী হল, সেটা বুঝিনি। ওরা ক্রিস্ট্যালের বাক্সটা তুলে বের করে আনতে চাইছিল। তখন তার একটা দিক খুলে গেছিল।”

“কী?!?” রাগে আর উত্তেজনায় ধৃতিমানের গলাটা কাঁপতে থাকে। “দরজাটা খুলে গেছিল?”

“হ্যাঁ।” মনে-মনে নিজেকে এই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অসংখ্য অভিশাপ দিয়ে বলেন প্রধান, “খুলে গেছিল। তবে সেখান দিয়ে কিছু বেরিয়ে আসার আগেই রয় ভেতরে ঝাঁপ দেন। দরজাটাও তখনই বন্ধ হয়ে যায়।”

স্পিকারের ওপাশ থেকে অনেকক্ষণ কোনও আওয়াজ না পেয়ে ভয় পেয়ে যান প্রধান। “হ্যালো-হ্যালো!” বলে তাঁর চিৎকারের উত্তরেও কোনও কথা ভেসে আসে না। ধৃতিমান ততক্ষণে ল্যাবে ছুটেছেন।

একটা রঙিন কুয়াশার মধ্যে ছড়িয়ে ছিল রয়। একই সঙ্গে সবদিকে ও তাকাতে পারছিল, তবে যা দেখছে তার সবটার অর্থ বুঝতে পারছিল না। তারই মধ্যে হঠাৎ করে সামনে একটা জমাট বাঁধা আয়তক্ষেত্র দেখতে পায় ও। আকারটা বড্ড চেনা লাগে রয়ের। তারপরেই ও বুঝতে পারে, যেটাকে ও শূন্যে ভেসে থাকা একটা আয়তাকার জায়গা ভাবছে, সেটা আসলে একটা দরজা। ক্রিস্ট্যালের বাক্সটার দরজা!

রয় বোঝে, নিজের অস্তিত্ব টের পেলেও ও নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না।

ও কি মারা গেছে? কথাটা মনে হতেই ছোটবেলায় শোনা ভয়ংকর কিছু ভূতের গল্পের স্মৃতি আপনা থেকেই ওর মাথায় এসে ভিড় করে। তারপরেই ও দেখে, ওর সামনেই ঘুরপাক খাচ্ছে একটা অদ্ভুত চেহারার জিনিস, যার দেওয়ালগুলোয় আলাদা-আলাদা রং রয়েছে। জিনিসটাকে চিনে নিতে রয়ের অসুবিধে হয় না। ওটাই প্রফেসর ধৃতিমানের টেসার‍্যাক্ট, যা নিয়ে যেতে এসেছিল অ্যাকিলান দলটা। সব মনে পড়ে যায় ওর।

কিন্তু এখন ও মুলান-থ্রি-তে, বা নিজের চেনাজানা জগতে ফিরবে কীভাবে?

গলাটাকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে কমিউনিকেটরটাকে মুখের কাছে ধরে তখন বলছিল ক্রেগ, “আপনার টয় একদম ঠিক আছে। শুধু তার সঙ্গে বোধহয় আরও একজন চলেছে আপনার কাছে।”

ওপাশে যেই থাকুক, সে যে তারস্বরে চিৎকার করছে, সেটা ক্রেগের আশপাশে দাঁড়ানো সবাই বোঝে। ক্রেগ স্পিকারটাকে নিজের কান থেকে বেশ কিছুটা দূরত্বে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তারপর বলে, “ক্রিস্ট্যাল বক্সটার ওজন ইনডেক্স কার্ডে লেখা ওজনের তুলনায় যতটা বেড়েছে, সেটা ওই সাংবাদিক রয়ের ওজনের সমান। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে ও ওই বাক্সের মধ্যে আছে। কিন্তু কীভাবে আছে তা বুঝতে গেলে বাক্সটা খুলতে হবে, আর সেটা ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাবে।”

অন্য পক্ষের কথা এবারেও শুনতে পায় না ক্রেগের সঙ্গীরা। তবে তার উত্তরে ক্রেগের কেটে-কেটে বলা কথাগুলো তাদের জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে। কমিউনিকেটর মারফৎ সেগুলো গ্যানিমিড সেন্ট্রালের সদর দফতরেও পৌঁছে যায়।

“মিস্টার হেন্ডারসন! এই অর্থহীন খেলনাটা আপনার কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আপনি কমিশনের সামনে অভিযোগ অস্বীকার করবেন। তাতে আমাদের ফুটবল টিমের ওপর কোনও নিষেধাজ্ঞা চাপবে না। এটাই ঠিক হয়েছিল। এখন আপনি যদি পিছিয়ে আসেন, তাহলে সেটা কিন্তু কথার খেলাপ হবে।”

গ্যানিমিড সেন্ট্রাল থেকে খবরটা দ্রুত পৌঁছে যায় কাছের বেসে। গ্রহ-গ্রহান্তর হয়ে সেটা পৃথিবীতেও আসে।

রোজকার রুটিনমাফিক টেলিভাইজর চালু করে সন্ধের সিরিয়ালগুলো দেখছিল রুচিরা। এক চ্যানেল থেকে লাফিয়ে অন্যটায় যাওয়ার সময় একটা টক-শোতে হঠাৎ কয়েকটা চেনা নাম শুনে ও থমকে গেল। ধৃতিমান, মুলান-থ্রি, টেসার‍্যাক্ট, রয়! আলোচনাটা কিছুক্ষণ শুনেই ও বুঝতে পারে, এই মুহূর্তে ব্যাপারটা ধৃতিমানকে জানাতেই হবে। ল্যাবে স্বেচ্ছাবন্দি মানুষটি অন্য কিছুতে সাড়া দেন না। কিন্তু শয্যাশায়ী মেয়ের হাতের নাগালের মধ্যে থাকা অ্যালার্মটাকে তিনি উপেক্ষা করবেন না। রুচিরা সেটাই টিপে ধরে, এবং ধরেই থাকে যতক্ষণ না ধৃতিমান উশকোখুশকো চেহারায় উদয় হন।

“ক’দিন আগের ফুটবল ম্যাচে দু’দল অ্যাকিলানের মধ্যে মারামারি হয়েছিল, মনে আছে? তাদের মধ্যে পড়ে যার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সেই হল হেন্ডারসন।”

নিরাপত্তা বাহিনী এবং ফেডারেশন থেকে আসা রিপোর্টের মধ্যে এতক্ষণ ডুবে ছিলেন ধৃতিমান। তাঁর থমথমে গলা শুনে অন্য কেউ ঘাবড়ে যেত। কিন্তু রুচিরা বোঝে, এই অদ্ভুত সংকটের কোনও একটা সমাধান তিনি খুঁজে পেয়েছেন।

“হেন্ডারসন নিজে নির্ঝঞ্ঝাট খেলা-পাগল লোক। ক্রনোস ল্যাবরেটরিতে কাজ সেরে স্টেডিয়ামে পৌঁছতে ওর সেদিন দেরি হয়ে গেছিল। তাই বেচারি গ্যালারিতে ঢুকতে পারেনি। খেলার একটা মুহূর্তও যাতে ফসকে না যায়, সেজন্য সেদিন ও বসেছিল দু’দলের সমর্থকদের জন্য নির্দিষ্ট গ্যালারির মাঝের সিঁড়িতেই।

এক দলের সমর্থকদের হাতে ছিল লাল-হলুদ পতাকা, আর অন্য দলের জার্সি থেকে শুরু করে মুখ-চোখের রং ছিল সবুজ-মেরুন। এই দুটো দলের মধ্যে যেখানেই দেখা হয়, খেলা মাঠ থেকে গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়তে মোটেই সময় নেয় না।”

“এই দুটো দলের কথা যেন আগেও শুনেছি।” রুচিরা বলল, “অনেক আগে বাংলায় দুটো বড় দল ছিল। তাদের সিগনেচার কালার বোধহয় এই কম্বিনেশনই ছিল। তারাই কি এখানেও খেলছিল?”

ভ্রু কুঁচকে একটু ভেবে ধৃতিমান বলেন, “হতেও পারে। অ্যাকিলানরা বোধহয় বাংলা থেকেই এসেছিল। যাইহোক, চ্যাম্পিয়নশিপের সাঙ্ঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ছিল সেদিন। সেই খেলায় যে দল জিতবে তারাই পরের রাউন্ডে যাবে। তখন, কিছুটা খেলার গতির বিরুদ্ধেই, হঠাৎ একটা গোল হয়ে যায়। মুশকিল হল, ক্যামেরায় ধরা পড়েছে যে গোলের সময় সেই দলের এক ফরোয়ার্ড অফসাইড ছিল। যে দল গোল খেয়েছিল, তারা সেই নিয়ে খেপে যায়। অন্য দল মারাত্মক চাপের মধ্যে গোলটা দিয়ে ফেলে তার চেয়েও বেশি উত্তেজিত হয়। মাঠের মধ্যে খেলোয়াড়রা, আর গ্যালারিতে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে মারপিট বেঁধে যায় এর পরেই। ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। দুটো দলই সাসপেন্ড হয়।

কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় হেন্ডারসনের। দু’দলের মারামারিতে ও ভালো রকম চোট পায়। নিজের অসুস্থ ছেলেকে দেখানোর জন্য বানানো একটা জিনিস এই টানাহ্যাঁচড়ায় ওর কাছ থেকে হারিয়েও যায়। সাঙ্ঘাতিক রাগে হেন্ডারসন কমিশনের কাছে রিপোর্ট করে। ও বলে, দুই দলের সমর্থকেরা নাকি নিজেদের মধ্যে মারামারি করার সময় জাতিদ্বেষমূলক গালাগাল দিয়েছিল। তার বেশ কিছু তাকেও শুনতে হয়েছিল। ফেডারেশনের নিয়মে এটা মারাত্মক অপরাধ। এই দুটো দল তো বটেই, এমনকি অ্যাকিলান জাতীয় দলের অন্য কোথাও গিয়ে খেলার ওপরেই প্রশ্ন উঠেছে এখন।”

“কিন্তু বাবা,” ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা ভাবার চেষ্টা করে রুচিরা, “কী এমন জিনিস হারিয়েছে হেন্ডারসনের, যেটা না পেয়ে ও এত রেগে গেছে?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধৃতিমান বলেন, “একটা হাইপারকিউব।”

রুচিরার অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন ধৃতিমান, “ক্রনোস ল্যাবে নতুন ডেটা সিস্টেমের জন্য মডেল বানানো হচ্ছিল। তখন কিছুটা ঘটনাচক্রেই ওটা বানিয়ে ফেলে হেন্ডারসন। সবার আগে ছেলেকে দেখাবে বলে ও টেসার‍্যাক্টটা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু মাঠে জিনিসটা হারিয়ে যায়। খেলার পর দর্শকদের রীতিমতো ডাক্তারি পরীক্ষা ও পুলিশি খানাতল্লাশির পরেই ছাড়া হয়েছিল। তাদের কারও কাছে ওরকম কোনও জিনিস পুলিশ পায়নি। হেন্ডারসন বলেছে, জিনিসটা নাকি একটা ফানেলের মতো কিছুর মধ্যে পড়ে গেছিল। ওরকম কোনও ফানেল স্টেডিয়ামের কোথাও নেই।”

দুয়ে-দুয়ে চার করে নিতে অসুবিধে হয় না রুচিরার। ও বলে, “তার মানে অ্যাকিলানরা যখন হেন্ডারসনকে তার অভিযোগ ফিরিয়ে নিতে বলে, তখন সেও বিনিময়ে ছেলের জন্য আরেকটা হাইপারকিউব চেয়ে বসে। তাই…”

“তাই এই টেসার‍্যাক্টটা ওরা নিয়ে যেতে চাইছে!” কথাটা বলে হতভম্বের মতো মাথা নাড়েন ধৃতিমান, আর তারপরেই তাঁর কপালটা আবার কুঁচকে ওঠে।

“কী হল?” জানতে চায় রুচিরা।

উত্তর না দিয়ে রিপোর্টের একটা বিশেষ অংশ আবার পড়েন ধৃতিমান। রুচিরা দেখে, পালা করে তাতে ছায়া ফেলে যাচ্ছে বিস্ময়, বেশ কিছুটা স্বস্তি, আর এক বিন্দু অপরাধবোধ। উঠে দাঁড়ান ধৃতিমান। হনহনিয়ে ল্যাবের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় রুচিরার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “শ্রীমান রয়কে জায়গামতো পৌঁছে দিচ্ছি আমি। তারপর দেখা যাক, তিনি কী করতে পারেন।”

ঠিক কতক্ষণ এই কুয়াশার মধ্যে ‘নিরাকার’ হয়ে ভেসে ছিল রয়, সেটা ও জানে না। তবে একটা সময় ও দেখে, সামনের আয়তাকার জায়গাটা ফাঁকা। মানে দরজা খুলে গেছে! হাত-পায়ের অনুভূতি না থাকলেও এগিয়ে যায় রয়। তারপর নিজেকে এক ঝাঁকুনিতে দরজা দিয়ে বাইরে নিয়ে আসে। ও দেখে, একটা ফুটবল স্টেডিয়ামের ফুটতে থাকা জনসমুদ্রের মধ্যে রয়েছে ও!

রয় এও দেখে, কোনওভাবে টেসার‍্যাক্টটা ওর হাতেই ধরা রয়েছে… আবার নেইও! জিনিসটা কেমন যেন পিছলে যাওয়ার মতো করে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে যাচ্ছে!

হতবাক হয়ে স্টেডিয়ামটা দেখতে থাকে রয়। একটু-একটু করে ও বোঝে, ধৃতিমান ওকে নিয়ে এসেছেন সেই স্টেডিয়ামে যেখানে মারামারি হয়েছিল। তাহলে কি এই ম্যাচের সঙ্গে টেসার‍্যাক্ট হরণ প্রচেষ্টার কোনও সম্পর্ক আছে? রিপোর্টে পড়া কথাগুলো মনে করে এগিয়ে যায় রয়।

খেলা শুরু হয়েছে। তুফানি সমুদ্রের মতো উত্তাল হয়ে উঠেছে দুই গ্যালারি। তাদের মাঝের জায়গায় বসে আছে কেউ-কেউ। কিন্তু ওটা তো… হেন্ডারসন! রয় লোকটাকে দেখেছে ভাইজরে। লোকটা এই সাংঘাতিক ম্যাচ দেখতে বসেও এক হাত দিয়ে জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে রাখা কিছু একটাকে আগলে রাখছে মনে হচ্ছে। সেটা কী যেন ছিল…?

ঠিক তখন মাঠের প্রায় অর্ধেক জুড়ে গগনভেদী রব ওঠে, “গো..ও..ও..ল!”

সবার মতো রয়ের চোখও ঘুরে যায় বড় স্ক্রিনের দিকে। গোলের মুহূর্তটা স্লো-মোশনে দেখানো হচ্ছিল সেখানে। রয় খেলা নিয়ে এমনিতে মাতামাতি করে না। কিন্তু রক্তের টানে মাঝেমধ্যে আপনমনে একটা ভুলে যাওয়া ভাষায় সেই বিখ্যাত গানটা ও-ও গুনগুন করে। কোন গানটা? আরে ওই যে, ‘সব খেলার সেরা… তুমি ফুটবল!’ তাই অফসাইডটা দেখে গোটা মাঠের মতো ওরও রক্ত গরম হয়ে যায়।

তারপরেই দুই গ্যালারিতে বিস্ফোরণ হয়! সাংঘাতিক চাপে পলকা ফাইবার গ্লাসের ব্যারিয়ার ভেঙে দু’দিকের সমর্থকরা নেমে আসে মাঝের জায়গায়। ধাক্কাধাক্কি থেকে তখনও দূরে ছিল রয়। তাও ও দেখতে পায়, হেন্ডারসন প্রাণপণে ভিড় ঠেলে বেরোনোর চেষ্টা করছে।

ওই গোলমালের মধ্যেও রয়ের কানে আসে অজস্র মৌমাছির গুঞ্জনের মতো একটা শব্দ, যেটা আসছে ওর পেছন থেকেই। শব্দটা রয় চেনে। প্রফেসর ধৃতিমানের স্পেস-টাইম কার্ভের বুদ্বুদ তৈরি হওয়ার সময় ওই শব্দটা হয়!

মুহূর্তের মধ্যে পুরো ছবিটা ওর কাছে স্পষ্ট হয়।

হিসেবের ভুলে ধৃতিমান তাঁর স্পেস-টাইম কার্ভটা খুলে ফেলেছিলেন খেলা চলাকালীন এই স্টেডিয়ামের একটা অংশে। সেখানে সেই সময়েও কারও থাকার কথা ছিল না। কিন্তু হেন্ডারসন তখন সেখানেই ছিল। ধাক্কাধাক্কির ফলে তার হাত থেকে পড়ে যাওয়া টেসার‍্যাক্টটাই ধৃতিমানের স্পেস-টাইম বুদ্বুদে বন্দি হয়ে যায়। সেটাই শেষে শোভা পায় মুলান-থ্রি-র একজিবিশনে!

তাহলে ওর হাতে এখন থাকা আর না-থাকার মাঝামাঝি চরম অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছে যে জিনিসটা, সেটা কোত্থেকে এল? কারণ হেন্ডারসনের টেসার‍্যাক্টটা তো এখনও তার কাছেই আছে। প্যারাডক্সের এই গোলকধাঁধায় পথ হারাতে বসেছিল রয়। তখন ওর খেয়াল হল, ধৃতিমান ওকে এখানে নিয়ে এসেছেন ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য। কিন্তু ও একা কী করতে পারে?

দুষ্টুমি-ভরা ছোটবেলাটা ওর মাথায় হঠাৎ ঝিকিয়ে ওঠে। একটা আইডিয়া পেয়ে রয় মাঠের দিকে ছোটে।

তখন মাঝ-আকাশে ঘনিয়ে উঠেছে অন্য সমস্যা।

“কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না ক্রেগ।” অ্যাকিলানদের একজন বলে তাদের নেতাকে, “ক্রিস্ট্যালের বাক্সটা হঠাৎ করে হালকা হয়ে গেল। কোথায় গেল ওই সাংবাদিক আর খেলনাটা?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্রেগ ভাবে, সব দোষ ওই রেফারিটার!

রয় এক লাফে সিকিউরিটি ফেন্স পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। অন্যরা কেউ কিছু বোঝার আগেই বলটাকে তুলে নিয়ে বগলদাবা করল। তারপর আবার দৌড় লাগাল ভেন্টের দিকে। সেটার পাশে দাঁড়িয়ে হেন্ডারসন মুখ হাঁ করে তাকিয়েছিল। ওর সামনেই খুলে যাচ্ছিল ওর ‘ফানেল’, মানে ধৃতিমানের স্পেস-টাইম কার্ভ।

গোটা মাঠ নিজেদের বিবাদ ভুলে রয়ের পেছনে দৌড়ে ওকে প্রায় ধরেই ফেলেছিল। তখনই হেন্ডারসনের কাছে পৌঁছোল রয়। গম্ভীর মুখে হেন্ডারসনের হাত ঝাঁকাল ও। তারপর তার চেয়েও গম্ভীর মুখে নিজের হাতে ধরা টেসার‍্যাক্টটা সেই হাতেই ধরিয়ে দিল। মুখ হাঁ করে দু’হাতের দুটো টেসার‍্যাক্টের মধ্যে তুলনা করায় ব্যস্ত হল হেন্ডারসন। খুনখারাপির মুডে থাকা জনতাকে পেছনে রেখে, বলটা সঙ্গে নিয়ে ফানেলের মধ্যে আবার ঝাঁপ দিল রয়।

প্লেক্সিগ্লাসের ঘেরাটোপ খুলে রয় যখন বেরিয়ে এল তখন আশপাশে সব শান্ত। অডিটোরিয়ামে মোতায়েন নিরাপত্তা রক্ষীদের একজন তখন ভাইজরে খবর পড়ছিল।

প্রথম খবর, দুটো অ্যাকিলান দলের মধ্যে খেলা চলাকালীন অশান্তি হয়েছিল। তারপর এক সন্দেহজনক ব্যক্তি বলটা নিয়ে গায়েব হন। এর ফলে খেলাটা পরিত্যক্ত হয়েছে। এখন রি-ম্যাচ কোথায় হবে, তাই নিয়ে ঘ্যানঘ্যানানি চলছে।

দ্বিতীয় খবর, ক্রনোস ল্যাবের এক কর্মী হাইপারকিউব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু অন্য কোনও এক আবিষ্কর্তাও এই জিনিস আবিষ্কার করে থাকতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

রয়-কে চলে যেতে দেখে একটু অবাকই হয় রক্ষীটি। সাংবাদিকটি কখন এই ঘেরাটোপে ঢুকেছিল সেটাই ওর মনে পড়ছিল না। তারপরেই ওর চোখগুলো বিরাট বড় হয়ে যায়।

প্রফেসর ধৃতিমানের একজিবিট হিসেবে ক্রিস্ট্যাল বক্সের মধ্যে একটা আজব জিনিস ছিল। দর্শকরা সেটাকে টয় বলেই ডাকছিল। সেটা এখন গায়েব হয়ে গেছে। তার বদলে সেখানে ভাসমান অবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য একটা জিনিস।

মাটি আর ঘাস গায়ে লেগে থাকা একটা ফুটবল!

প্রথম প্রকাশ: ‘মায়াকানন’ বার্ষিকী, ২০১৭