রক্তিম – ঋজু গাঙ্গুলী

রক্তিম

সূর্য ডুবছে। লাল রঙে ভেসে যাচ্ছে আমার শহর, আমার দুনিয়া।

বুড়োকে আমি আগে কখনও দেখিনি। লন্ডনে বোমা পড়া শুরু হওয়ার পরেই লোকটাকে তড়িঘড়ি এদেশে নিয়ে আসা হয়েছে। ওর কিছু হলে নাকি লোকের মনোবল একেবারে ভেঙে পড়বে! তাই প্রথমে সাবমেরিনে চাপিয়ে নিউ ইয়র্ক, তারপর ট্রেনে তুলে লস এঞ্জেলস। খবর পেয়েছিলাম, সান্তা মোনিকা বুলেভার্ডের কাছে একটা বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই হয়েছে বুড়োর। বাড়িটা তার বাসিন্দাদের মতোই ধূসর আর জীর্ণ। সেখানে পৌঁছে নিজের ব্যাজ দেখালাম। কাজ নিয়েই এসেছি বলা সত্ত্বেও নার্স অনেকক্ষণ ঝোলাল। অবশেষে একটা টিমটিমে আলোজ্বলা ঘরের সামনে পৌঁছোলাম। নার্স দরজায় নক্‌ করল।

ভেতর থেকে খসখসে গলায় প্রশ্ন এল, “কী চাই?”

“আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে চান।” নার্স বলল।

“চলে যেতে বলো।”

“উনি সবসময় এটাই বলেন।” নার্সের মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটল, “আপনি ভেতরে যান।”

আমি ঘরে ঢুকলাম।

ঘরটা বড়ো। পুরোনো জামাকাপড়, ওষুধ আর অসুস্থতার নিজস্ব গন্ধ ছড়িয়ে আছে তার আসবাব, জীর্ণ পর্দা, খোলা বই, মেঝে জুড়ে ছড়ানো ‘টাইমস্‌’-এ। ডেস্কে একটা ফটোফ্রেম থেকে আমার দিকে চেয়ে আছেন এক শক্ত চেহারা, মোটা গোঁফ, আর নরম চোখের ভদ্রলোক। সবকিছু ভাসিয়ে দিচ্ছে অস্তায়মান সূর্যের লাল ঢেউ।

বুড়ো একটা হুইলচেয়ারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

বেঢপ ড্রেসিং গাউনের মধ্যে চাপা পড়া শুকনো লম্বা শরীর, চওড়া কপাল, বয়সে শুকিয়ে যাওয়া পাতলা ঠোঁট, ধূসর চুল, এ-সব ছাপিয়ে নজর কাড়ছে টিকালো নাকটা। লোকে বলে ওর বয়স নাকি একশো বছরেরও বেশি। হতে পারে। তবে লোকটার মগজ এখনও…

“তুমি সিগারেট খাও?”

আমি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এগিয়ে ধরলাম। বুড়ো একটা সিগারেট বের করে প্যাকেটটা অন্যমনস্কভাবে গাউনের পকেটে ভরল। তারপর সিগারেট ধরিয়ে, তাতে একটা বড়ো টান দিয়ে প্রচুর কাশল। কাশি থামলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ধন্যবাদ। এবার যাও।”

বুড়ো আবার বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখার তাল করছিল। আমি একটু এগিয়ে বললাম, “এক মিনিট। আপনার সঙ্গে আমার একটা দরকার আছে।”

“ম্যাজিক দেখবে?” ছাদের দিকে একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বলল বুড়ো, “একটা সিগারেট খাইয়ে আমার ম্যাজিক দেখা যায় না ছোকরা।”

“আপনি পুরো প্যাকেটটা রেখে দিয়েছেন।”

বুড়ো হেসে আমার দিকে তাকাল। তবে ওইরকম হেসে দুধের দিকে তাকালে ইন্সট্যান্ট দই পাওয়া যাবে। গাউন খামচে রিবনে বাঁধা একটা চশমা বের করে নিজের নাকের ওপর চড়াল লোকটা। তারপর আমার আপাদমস্তক দেখল। চশমার পেছনে ওর চোখগুলো গাড়ির হেডলাইটের মতো দেখাল।

“তুমি একজন গোয়েন্দা।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করল বুড়ো।

“কোনও একটা বড়ো সংস্থার হয়ে কাজ কর তুমি, শ্যান্ডলার বা কন্টিনেন্টাল। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তুমি ধূমপান কর। আদতে তুমি আমেরিকান মিড-ওয়েস্টের বাসিন্দা, নেব্রাস্কা বা ওইরকম কোনও জায়গা। তুমি অবিবাহিত, তবে এই মুহূর্তে কোনও মহিলার সঙ্গে কোনও সম্পর্কে জড়িত নও। বাড়ির খাবার নয়, বরং রাস্তার অখাদ্য-কুখাদ্যই তোমার চলে। অনেকদিন তুমি নতুন একসেট জামাকাপড় কেনোনি। তোমার সঙ্গে একটা রিভলভার থাকে। সম্প্রতি কারও সঙ্গে তোমার মারামারি হয়েছে।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে পয়সা উশুল?” সেই বিষাক্ত হাসিটা আবার উড়ে এল আমার দিকে। সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে বুড়ো পেছন ফিরল।

“আমার সাহায্য দরকার।”

“কেউ কি তোমাকে বলেনি যে আমি অবসর নিয়েছি? আমার এ-সবে আর কোনও আগ্রহ নেই। তুমি যাও।”

“আমি গতকাল একজনকে গুলি করেছি।”

“সিনেমা দেখে মনে হয়, তোমার পেশার লোকজনকে প্রায়ই এসব করতে হয়।”

“আমি তিনটে গুলি করেছিলাম।”

“আমাদের ঘরের দেওয়ালে গুলি করে রানির নামের আদ্যক্ষর খোদাই করেছিলাম একবার। চেষ্টা চালিয়ে যাও। তুমিও পারবে।”

“আমি লোকটার বুকে দু’বার, আর মাথায় একবার গুলি করলাম। তারপর লোকটা উঠে দাঁড়াল, আর হেঁটে চলে গেল।”

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আস্তে-আস্তে হুইলচেয়ারটা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল বুড়ো। ডুবতে থাকা সূর্য ওর চোখে লাল রঙ ধরিয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লোকটা বলল, “বোসো।”

দেওয়ালের ধারের চেয়ারে একটা বেহালা রাখা ছিল। সেটাকে একপাশে সরিয়ে আমি বুড়োর মুখোমুখি বসলাম। খসখসে, কিন্তু স্থির, শান্ত গলায় নির্দেশ এল, “বলো।”

“পাঁচ দিন আগে এক মহিলা আমার অফিসে এলেন। তন্বী, দীর্ঘাঙ্গী, চুল সোনালি, তবে বোধহয় রঙ করা। চোখ ফোলা। দৃষ্টির মধ্যে একটা হারিয়ে যাওয়া ভাব আছে। আমি মহিলাকে উলটো দিকের চেয়ারে বসিয়ে একটা ড্রিংক অফার করলাম। মহিলা যখন হাত নাড়ছিলেন তখন আলোটা তাঁর হাতের আংটিগুলোয় ঝিলমিল করছিল। মহিলা…”

“তুমি কি এভাবেই কথা বল?” বুড়ো খিঁচিয়ে উঠল, “আমি ভেবেছিলাম, তোমাদের রহস্য গল্পের লেখকেরা এগুলো বানায়। দয়া করে কাব্য কোরো না। আমার ধৈর্য আর সময়, দুটোই কম।”

“মহিলা বললেন, তাঁর স্বামী নিখোঁজ।” আমি সংক্ষেপে বললাম, “ভদ্রলোক ব্যবসা করেন। ইউরোপ থেকে নানা জিনিস আমদানি করে এখানে সাপ্লাই করার ব্যাবসা। যুদ্ধের ফলে ব্যবসা আগেই ঝাড় খেয়েছিল। ইদানীং নাকি অবস্থা একটু ভালো হয়েছে।”

“এই মহিলা-র কোনও নাম আছে? বা তাঁর স্বামীর?”

“লান্ডো। মহিলা মোনিকা লান্ডো, আর তাঁর স্বামী মাইলস্‌ লান্ডো। লান্ডো কনসাইনমেন্টস ত্রিশের দশকে কারবার শুরু করে। ব্যবসা ভালোই চলছিল। মেরিনা ডেল রে-তে বাড়ি বানিয়ে সেখানেই থাকতেন ওঁরা।”

“নিখোঁজ হওয়ার আগে-পরে কী হয়েছিল?”

“কিছুই না। মাইলস্‌ বাড়ি ফেরেননি।”

“তুমি ভদ্রলোকের অফিস নিশ্চয় তল্লাশি করেছিলে?”

“করেছিলাম। ভিভিকা ডকস্‌-এর কাছে লান্ডো কনসাইনমেন্টস-এর সাজানো-গোছানো অফিস। থেরেসা ভিনসেনজো নামের এক বয়স্ক মহিলা ছাড়া সব কর্মচারীই ফ্রিলান্স বা পার্টটাইমার। ডায়েরি থেকে শুরু করে সব কাগজ ঘাঁটলাম। কোনও মহিলার নাম নেই। তেমন কোনও লট্‌ঘট্‌ আছে বলেও মনে হল না।”

“লট্‌ঘট্‌?”

“কিছু মনে করবেন না। আসলে মাইলস্‌-এর বয়সে পুরুষদের একটু চরিত্রদোষ দেখা যায়। মোনিকা রূপসী। তবু এই বয়সে একটু… অন্যরকম স্বাদ অনেকেই খোঁজে।”

“বুঝলাম। তারপর?”

“পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের কোনও পুরুষ যখন নিখোঁজ হয় তখন তার তিনটে কারণ থাকতে পারে। এক, কোনও মহিলার সঙ্গে তার একটা ‘কেস্‌’ হয়েছে। দুই, মদ বা জুয়ার চক্করে সে বিপদে পড়েছে। তিন, তার কোনও দুর্ঘটনা হয়েছে যার খবর এখনও কেউ পায়নি।”

“অবিশ্বাস্য!” আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল বুড়ো, “খুব অল্প করে মাথা খাটিয়েও আমি শ’খানেক কারণ বলতে পারতাম। যাইহোক, তুমি নিশ্চয় নিজের মতো করে খোঁজাখুঁজি করেছিলে।”

“অবশ্যই। কিন্তু কিচ্ছু পাইনি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা হয়নি। অফিসে লুকোনো কোনও মাদকদ্রব্য পাইনি। ভিনসেনজো বলেন, তেমন কোনও সন্দেহজনক ফোনও আসেনি। আমি তো ওখান থেকে চার ব্লক পরের বাড়িটাতেও গেছিলাম যেখানে… মহিলাঘটিত ব্যবসা হয়। কিন্তু তারাও মাইলস্‌-কে চেনে না দেখলাম। যে-ক’টা সম্ভব হাসপাতালে খুঁজলাম, কোথাও ভর্তি হননি ভদ্রলোক। মর্গেও লোকটার লাশ পাইনি। আমি পুলিশের কাছেও গেছিলাম, মাইলস্‌-এর গাড়িটার খোঁজে।”

“গাড়ি? মাইলস্‌ কি গাড়ি চালিয়ে যাতায়াত করতেন?”

“হ্যাঁ। কালো রঙের সেডান। কিন্তু ওটাও কোথাও পাওয়া যায়নি।”

“তারপর?”

“আমি একটু চিন্তায় পড়লাম। কোথাও এমন কিচ্ছু পাচ্ছিলাম না যা থেকে মনে হয় লোকটা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছে। আমি ভাবছিলাম, মহিলা নিজেই তাঁর স্বামীকে মেরে লাশ গায়েব করে দেননি তো?”

“স্বামীকে খুঁজে না পেলেই ভাবতে হবে যে তার স্ত্রী তাকে মেরেছে?” চোখ কপালে তুলল বুড়ো। “এই লাইনে এগিয়ে কিছু পেলে?”

“নাহ্‌।” আমি বললাম, “তাই আমি এটাই ভাবতে বাধ্য হলাম যে মাইলস্‌-এর ব্যবসার সঙ্গে এর কোনও যোগাযোগ থাকতে পারে।”

“যাক।” বুড়ো যে স্বস্তি পেয়েছে স্পষ্ট হল, “তুমি মগজটা ব্যবহার কর তাহলে। কিছু জানতে পারলে?”

“যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই লান্ডো কনসাইনমেন্টস ধুঁকছিল। ইউরোপ থেকে ওরা কিছু পাচ্ছিল না। এশিয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। কানাডা আর মেক্সিকো ছাড়া আর বিশেষ কোথাও ওর ব্যবসা করার রাস্তাই ছিল না। তবে চার মাস আগে একটা অন্যরকম কাজ এসেছিল।”

“অন্যরকম মানে?”

“এক নতুন ক্লায়েন্ট। তার প্রয়োজনটাও অন্যদের থেকে আলাদা। রোমানিয়া থেকে পঞ্চাশটা বাক্স নিয়ে আসতে হবে। তারপর থেকেই লান্ডো কনসাইনমেন্টস আবার ইউরোপ থেকে কাজ পেতে শুরু করে। আমি ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ঠিক ওই সময়টাতেই রোমানিয়ায় ক্ষমতা বদল হয়েছিল। ওরা অক্ষশক্তির বদলে মিত্রশক্তিতে যোগ দিয়েছিল। তারপরেই এই পঞ্চাশটা বাক্স সরানোর কাজ পায় লান্ডো। কাগজপত্র সব ঠিকই ছিল, কিন্তু আমার কেমন যেন লাগছিল। সাড়ে ছ’ফিট লম্বা, তিন ফুট চওড়া, তিন ফুট গভীর পঞ্চাশটা বাক্স। আমি… আপনার আবার কী হল?”

উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্নটা করার কারণ ছিল। আমার শেষদিকের কথাগুলো শোনার সময় বুড়োর মুখ যেভাবে বেঁকে গেছিল, মনে হচ্ছিল যেন আমি ওর গায়ে একটা মাকড়সা ছেড়ে দেওয়ার তাল করছি।

“কিছু না।” নিজের মুখটা বেশ কষ্ট করে স্বাভাবিক করল বুড়ো, “এক পুরোনো আলাপির কথা মনে পড়ে গেল। যাকগে, তুমি বলো।”

“আমি ম্যানিফেস্ট দেখলাম। বাক্সগুলো মঙ্গলবার, ৩০শে এপ্রিল এসে পৌঁছেছে।”

“ওয়ালপার্গিস নাইট।” ফিসফিস করল বুড়ো।

“সেদিনের পর মোনিকা লান্ডো তাঁর স্বামীকে আর দেখেননি।”

“তারপর?”

“নানা জায়গা ঘুরে আমি আবার লান্ডো কনসাইনমেন্টস-এ ফিরে এলাম। ভিনসেনজো চলে যাওয়ার পর আমি একাই অফিসে বসে রেকর্ড ঘাঁটছিলাম। ক্লান্ত হয়ে টেবিলে পা তুলে, চেয়ারটা পেছনে হেলিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম। গরম আর দমবন্ধ পরিবেশ। তাতেও দেখছিলাম, উলটো ফুটপাথের বেরয়েল ক্লাবের নিয়ন আলোটা জ্বলছে আর নিভছে। তার…”

সরু হাতটা দুম্‌ করে টেবিলে নামিয়ে আনল বুড়ো। তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “দেওয়ালে আছড়ে পড়া নিয়নের আলো একটা বিচিত্র নকশা তৈরি করছিল। দূরে কোথাও স্যাক্সোফোনের বিষণ্ণ সুর বাতাসে গুমরে উঠছিল। … আমিও এ-সব পড়েছি ছোকরা। দয়া করে আসল কথায় এসো!”

“আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম, ঘরে অন্য কেউ রয়েছে। মুখ তুলে দেখলাম, মাইলস্‌ লান্ডো আমার সামনে, দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিন ধরে ওর ফটো নিয়ে সারা শহরে ঘুরেছি আমি, তাই ভুল হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। লম্বা, একসময়ের সোনালি চুল এখন ধূসর দেখাচ্ছে। ভারী মুখ, তবে মোটা নয়। নিখোঁজ হওয়ার সময় যে কালো স্যুটটা পরনে ছিল, সেটাই পরা, তবে তাতে ধুলো-কাদা লেগেছে।

আমি উঠে মাইলস্‌-এর দিকে এগোলাম। ওকে কয়েকটা প্রশ্ন করে ওর বউয়ের কাছে ফেরত পাঠানো আর নিজের ফি কালেক্ট করা, এ-ছাড়া আমার মাথায় কিচ্ছু ছিল না। কিন্তু মাইলস্‌ একটা হিংস্র জানোয়ারের মতো মুখভঙ্গি করে আমার দিকে তেড়ে এল। তারপর আমার কবজি ধরে টেনে দেওয়ালের দিকে স্রেফ ছুড়ে দিল! আমি কোনওক্রমে উঠে দাঁড়াচ্ছিলাম, তখন ও আবার আমার দিকে তেড়ে এল। লোকটার চোখগুলো লাল আগুনের মতো ধক্‌ধক্‌ করছিল! আর ওর মুখ থেকে বেরোনো গন্ধ! চিড়িয়াখানায় মাংসাশী প্রাণীর খাঁচা থেকেই শুধু আমি ও-রকম পচা মাংসের গন্ধ পেয়েছি। মাইলস্‌ আমার কলারের দিকে হাত বাড়াল, কিন্তু আমি বুঝে গেছিলাম, মিষ্টি কথা শোনার লোক এ নয়। ওর গলার নীচে আমি যে ঘুসিটা মারলাম সেটা কোনও পালোয়ানকেও শুইয়ে দিত। কিন্তু ওর কিস্যু হল না।

মাইলস্‌ পোকা তাড়ানোর মতো করে এক হাতে আমাকে ঝটকা মারল। মাথা বাঁচাতে পারলেও আমার কাঁধে হাতটা এসে লাগল। তাতেই আমি ঠিকরে টেবিলের ওপাশে, চেয়ারটার ওপর এসে পড়লাম। তাতে একটা সুবিধে হল অবশ্য। চেয়ারটা পিছিয়ে দেওয়ালের দিকে সরে যাওয়ায় আমি ওর থেকে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে রিভলভারটা বের করার সুযোগ পেলাম। আমি ওকে নিশানায় এনে বললাম, শান্তভাবে হাত দুটো মাথার ওপরে তুলতে।

লোকটা আমার কথা শোনেনি। বরং ও একটা… গর্জন করল। হ্যাঁ, সিংহ বা বাঘের নীচু, ক্ষুধার্ত গর্জন ছাড়া আর কিছুর সঙ্গে ওই আওয়াজের তুলনা করা যাবে না। মাইলস্‌-এর দাঁতগুলো বিশাল বড়ো দেখাচ্ছিল। আর চোখজোড়া দেখে মনে হচ্ছিল, যেন দু’টুকরো কয়লা জ্বলছে চোখের কোটরে। আমি সহজে ভয় পাওয়ার লোক নই, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হল, আমার ভেতরটা যেন গলে যাচ্ছে। আমার মাথা কাজ করছিল না। নিশানা স্থির করে আমি গুলি চালালাম।”

বুড়ো কোনও কথা বলেনি, শুধু শূন্যে তাকিয়ে রয়েছে। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার শুরু করলাম।

“প্রথম গুলিটা লাগল বুকের ঠিক মাঝখানে, চিবুক থেকে আট ইঞ্চি মতো নীচে। সাদা শার্টে একটা কালো গর্ত হয়ে গেল, কিন্তু কোনও রক্ত বেরোল না! মাইলস্‌ নিজেও নীচু হয়ে গর্তটা দেখছিল। ওখান থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু বেরোচ্ছিল বলে মনে হল। আমি আবার ট্রিগার টিপলাম। দু’নম্বর গুলিটা যেখানে গর্ত বানাল তার ঠিক নীচেই হৃৎপিণ্ড থাকার কথা। এবারও রক্ত বেরোল না। আমি আর ঝুঁকি নিলাম না। দু’হাতে রিভলভার ধরে মাইলস্‌-এর মাথায় গুলি করলাম।

গুলির আঘাতে মাইলস্‌ পেছনে, দেওয়ালে ছিটকে পড়ল। আমি ঘরের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, ওর মাথা ফাঁক হয়ে ভেতরের… জিনিসপত্র বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু এক ফোঁটাও রক্ত বেরোয়নি মাথা থেকে! ও গর্জন করে আবার আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি বেশ বুঝতে পারলাম, আমার গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু ভাগ্য ভালো বলতে হবে, ঠিক তখনই সাইরেনের শব্দ ভেসে এল নীচ থেকে। বেরয়েল ক্লাবের কেউ, বা কোনও নিরাপত্তা রক্ষী নিশ্চয় গুলির আওয়াজ পেয়ে পুলিশে খবর দিয়েছিল।

মাইলস্‌ আমার কাছে, খুব কাছে এসে দাঁড়াল। আমি ওর মুখ থেকে পচা মাংসের সেই অসহ্য দুর্গন্ধটা আবার পেলাম। ওই বিশাল দাঁতগুলো বের করে হাসল লোকটা। আঙুল নেড়ে আমাকে শাসন করল, যেমনটা লোকে দুষ্টু ছেলেদের করে। তারপর ঘর থেকে হেঁটে বেরিয়ে গেল।

পুলিশকে ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো অবস্থা আমার ছিল না। তাই আমি চুপচাপ বেরিয়ে, ঘরের দরজা বন্ধ করে বাড়ির পেছনের গলি দিয়ে কেটে পড়লাম। আজ সারাদিন আমি ভেবেছি, ঘটনাটার কী ব্যাখ্যা হয়, বা কার কাছে এটার মানে বোঝার জন্য সাহায্য চাওয়া যায়। আপনি ছাড়া কাউকে পাইনি।”

বুড়ো চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর ডেস্কে রাখা ফটোফ্রেমটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওইসব রঙ-চড়ানো গপ্পোগুলোয় ও যাই লিখুক না কেন, আমি কিন্তু ওকে জন বলেই ডাকতাম।”

“আমাকে কিছু বললেন?”

“না।” ঘুম থেকে ওঠার মতো মাথা তুলল বুড়ো, “অনেকদিন বাঁচলে স্মৃতির বোঝা এত বেশি হয়ে যায়… যাকগে, তোমার এই ‘অভিজ্ঞতা’ ছাড়া আমাদের হাতে কাজে নামার মতো আর কিছু আছে?”

“হ্যাঁ।” আমি পকেট হাতড়ে লেজারের কয়েকটা ছেঁড়া পাতা বের করে এগিয়ে দিই, “বাক্সগুলো এজকম্ব-এ পাঠানো হয়েছিল। ওখানে সম্প্রতি একটা পুরোনো বাড়ির দখল নিয়েছে লান্ডো কনসাইনমেন্টস। সচরাচর ওরা বাড়ি ভাড়া নেয় না, এমনকি গুদাম হিসেবেও। সে-জন্যই এটা আমার চোখে পড়েছিল।”

“তোমার সঙ্গে গাড়ি আছে নিশ্চয়? আমার কোট আর টুপিটা দাও। সময় নষ্ট করা যাবে না।”

“মানে? আপনি বেরোবেন? কিন্তু আপনি তো…”

“আমি হাঁটতে পারি। তবে ধীরে। এখন আমাকে ঝটপট তৈরি হতে সাহায্য করো।”

ব্যাপারটা সহজ ছিল না। বুড়ো কতটা টানাহ্যাঁচড়া নিতে পারবে জানি না বলে খুব সাবধানে সব করতে হচ্ছিল। প্রথমে তার পুরোনো, প্রায় গায়ের সঙ্গে লেপটে যাওয়া পোশাকটা ছাড়াতে হল। তারপর মে মাসে ক্যালিফর্নিয়ার এই গরমেও লোকটা একটা ট্যুইড স্যুট, ভেস্ট, এমনকি একটা বহু পুরোনো গ্রেটকোট চাপাল। হুইস্কি-ভর্তি একটা ফ্লাস্ক কোটের ভেতর ঢুকল। একটা লম্বা, ভারী, নকশা-কাটা আর মজবুত হ্যান্ডেলওলা লাঠি হাতে উঠল। অবশেষে মাথায় একটা দুমড়ে যাওয়া ধূসর হোমবার্গ টুপি চাপিয়ে বুড়ো সন্তুষ্ট হল। অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। বুড়ো বলে উঠল, “অলংকরণ যে ভদ্রলোক করতেন, তাঁকে ধরো। আমি এটাই পরতাম।”

বাইরে নার্স থাকলে আমাদের কপালে দুঃখ ছিল। কিন্তু জায়গাটা ফাঁকা। বুড়োকে হুইলচেয়ারে বসিয়েই এগোলাম। প্রায় কোলে তুলে বুড়োকে আমার গাড়ির সামনের সিটে বসালাম। হুইলচেয়ারটা ভাঁজ করে পেছনে রেখে গাড়ি ছোটালাম। গাড়িতে বসে বুড়ো বলল, “আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেই জায়গাটা সম্বন্ধে একটু ধারণা দাও তো।”

“বড়ো বাড়ি। বছর চল্লিশেক আগে তৈরি হয়েছিল। খালি পড়েছিল অনেকদিন। ভিতটা বিশাল, তাই একটা বিরাট বেসমেন্ট থাকতে পারে।”

“হুঁ।” মাথা দোলাল বুড়ো, “ওর বেসমেন্ট লাগবে।”

“কার?”

“কারও না। সামনে ওটা কি পেট্রল পাম্প? চমৎকার। ওখানে একবার দাঁড়াও তো।”

“কিন্তু ট্যাংক তো ভরাই আছে!”

“গ্যাসোলিনের একটা ক্যানিস্টার নিয়ে এসো। আমি গাড়িতেই রইলাম।”

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু তিন-তিনটে গুলি নিয়ে, রক্তশূন্য অবস্থায় একটা লোক লস এঞ্জেলস-এ কীভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে, সেটাও আমার বোধগম্য হচ্ছে না। তাই চুপচাপ আদেশ মানাই নিরাপদ বলে মনে করলাম। গাড়িটা চলতে শুরু করার পর বুড়ো মুখ খুলল।

“ভালো হত যদি আমরা সকালে বেরোতে পারতাম। কিন্তু কী আর করা যাবে? ভালো কথা, তুমি রিভলভারে আবার গুলি ভরে নিয়েছ তো? ওতে অবশ্য ওদের কিছুই হবে না, তবু যতটা তৈরি থাকা যায় আর কী।”

“যা বলবেন স্যার।”

“বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে ছোকরা? আমারও হচ্ছে। আমি সত্যিই ভেবেছিলাম সেই সাতানব্বই সালেই গল্পটা শেষ হয়ে গেছে। আমার পক্ষে ঠিক সেই সময় কন্টিনেন্টে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত সম্ভব ছিল না। লন্ডন থেকে আমি বেশিদিন দূরে থাকলেই অপরাধীরা একটু বেশি উৎসাহ পেয়ে যেত। তাই গল্পটা শেষ করা যায়নি।”

আমি এ-সব কথার মধ্যে ঢুকলাম না। শুধু বললাম, “এজকম্ব আর তিনটে ব্লক পরেই।”

“তাহলে এখানেই থামো। বাকি পথটা আমরা হেঁটে যাব।”

আমাদের পেছনে কেউ লেগে নেই এটা নিশ্চিত করার জন্য এক চক্কর দিতে হল। তারপর একটা জায়গা খুঁজে গাড়িটা পার্ক করলাম। ভ্যাপসা গরম রাত। রাস্তাটা আলোয় চকচক করছে। আমরা ধীরে-ধীরে এগোলাম। একটু পরেই বাড়িটা দেখা গেল।

“মাইলস্‌ এখানে আছে।” আমার গলাটা কি কেঁপে গেল?

“কী করে বুঝলে?”

“ওই যে। ওর গাড়িটা রয়েছে।” সেডানটার লাইসেন্স প্লেটের নম্বর আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল বলে নিশ্চিত হলাম।

“চমৎকার।” আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বুড়ো গাড়িটার দিকে দ্রুত এগিয়ে গেল। আমি ভাবিনি এই বয়সেও লোকটা এত দ্রুত হাঁটতে পারবে। “তুমি গাড়িটা অকেজো করে দিতে পারবে?”

বনেট তুলে, স্পার্ক প্লাগ খুলে গাড়িটা অচল করে দিতে আমার মিনিট পাঁচেক লাগল।

“শাবাশ!” বুড়ো যে সত্যিই খুশি হয়েছে বুঝতে পারছিলাম। “ওই বাদুড় হয়ে উড়ে যাওয়ার কথাটা স্রেফ গুলগল্প। বরং এবার ওদের পালানোর রাস্তা বন্ধ হল।”

“বাদুড়? ঠিক বুঝলাম না।”

“বাদ দাও। তুমি গাড়িটার দরজা খুলতে পারবে?”

কিছুক্ষণের চেষ্টায় আমি দরজা খুলতে পারলাম। বুড়ো গাড়ির সামনে-পেছনে তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজল, প্রথমে খালি চোখে, তারপর চশমা এঁটে। শেষে সিটগুলো ভালো করে শুঁকে বলল, “আনন্দ সংবাদ।”

“কী?”

“রক্ত নেই। তার মানে, সংক্রমণ খুব একটা ছড়ায়নি। হয়তো মাইলস্‌-ই একমাত্র শিকার। আমার পুরোনো বন্ধু ধৈর্য ধরতে জানে দেখছি। তবে সেটা এবার হয়তো…”

“কোন্‌ সংক্রমণের কথা বলছেন আপনি? আর কে আপনার বন্ধু, ঠিক করে বলুন তো! এর আগেও একবার এক ‘পুরোনো আলাপি’-র কথা বলেছিলেন। কে সে?”

বুড়োর মুখে একটা ধারালো হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু কিছু বলল না। দারুণ রাগে আমি বোধহয় লোকটাকে কিছু আকথা-কুকথা বলেই ফেলেছিলাম, কিন্তু বুড়ো সেসব পাত্তা না দিয়ে বাড়িটার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আমি তালা ভাঙার যন্ত্রপাতিগুলো বের করছিলাম। আমার সঙ্গী কিন্তু দেখলাম স্রেফ হাতল ঘুরিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে একটু অধৈর্য হয়েই বুড়ো বলল, “ও কাউকে ভয় পায় না। অবশ্য আমি যে আমেরিকায় আছি সেটা ও জানে না। এটা আমাদের পক্ষে ভালো।”

করিডর অন্ধকার। বুড়ো পকেট থেকে একটা ফ্ল্যাশলাইট বের করে চারপাশে দেখল। আসবাব সবই চাদরে ঢাকা রয়েছে। তবে দরজার গায়ের নকশা, উঁচু ছাদ, ঘোরানো সিঁড়ি, এগুলো দেখা গেল। বুড়ো ইতোমধ্যে লাইটের সুইচটা খুঁজে পেয়েছে। মাথার ওপর ঝাড়বাতিটা ঝলমল করে উঠল।

“যাচ্ছেতাই রুচি।” বুড়োর গলা শুনে মনে হচ্ছিল যেন আমরা কোনও আর্ট গ্যালারিতে এসেছি, “তবে ঝাড়বাতিটা বেশ ভালো। প্রোফেসর আমাকে একবার ঠিক এইরকম একটা ঝাড়বাতি ফেলে মারার চেষ্টা করিয়েছিলেন।”

ওপর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল। আমি আমার .৪৫-টা বের করলাম। বুড়ো নির্বিকার ভঙ্গিতে মুখ তুলে সিঁড়ির ওপরদিকে তাকাল। মাইলস্‌ ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পোশাক বদলেছে বলেই হয়তো গুলির গর্তদুটো আর দেখা যাচ্ছে না। ও বোধহয় নিজের মাথাটা সেলাই করার চেষ্টা করেছিল। ব্যাপারটা সফল হয়নি, বরং কদাকার দেখাচ্ছে। ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা জান্তব দাঁতগুলো আলোয় ঝকঝক করছে। কিন্তু বুড়োর দিকে তাকিয়েই মাইলস্‌-এর লাল চোখের উপরের ভ্রূজোড়া কুঁচকে উঠল।

“মিস্টার লান্ডো।” লাঠিতে ভর দিয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেল বুড়ো, “এই অবস্থার পেছনে আপনার যে কোনও হাত নেই সেটা আমি অন্তত জানি। আপনি স্রেফ আপনার কাজটুকু করছিলেন। যে লোকটি আপনাকে কাজটা দিয়েছিল, সে এর আগেও আপনার মতো অজস্র মানুষকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। আবার কাজ শেষ হলেই পুরোনো খেলনার মতো তাদের ভেঙেচুরে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু সে-কথা থাক। এই মুহূর্তে কর্তব্য একটাই।”

আমার দিকে ঘুরে বুড়ো বলল, “লোকটাকে নিকেশ করো তো।”

একবার মনে হয়েছিল বলি, এর আগেও আমি সেই চেষ্টা করে তিনটে গুলি খরচ করেছি। তারপর ভাবলাম, কী লাভ? আমি মাইলস্‌-এর মাথা নিশানা করে পরপর তিনবার ফায়ার করলাম।

প্রথম গুলিটা মাইলস্‌-এর মাথার ওপরদিকটা ফাটিয়ে দিল। ছাতা ধরা পাউরুটির মতো কিছু ছিটকে বেরিয়ে পেছনের দেওয়ালে লাগল। দ্বিতীয় গুলিটা ওর করা সেলাইয়ের মধ্যে ঢুকল। তাতে মাথাটা সেই জায়গা দিয়েও ফাঁক হয়ে গেল। তৃতীয় গুলিটা চোয়ালের হাড় ভেঙে মুখের নীচের অংশটা বরাবরের মতো হাঁ করিয়ে দিল।

সিঁড়িতে বসে, তারপর শুয়েই পড়ল মাইলস্‌। ঘরজোড়া ধোঁয়া একটু-একটু করে সরে গেল। পুরো সময়টা আমি বুড়োর শ্বাস টানার শুকনো, ঘষা আওয়াজ পাচ্ছিলাম শুধু।

“আমরা কি…?” আমার প্রশ্নটা মাঝপথে থেমে গেল। মাইলস্‌-এর ডান হাতটা নড়ছিল। তারপর বাঁ-হাতটা। সেই অবস্থাতেই ও সিঁড়ির ব্যানিস্টার ধরে একটু-একটু করে উঠে দাঁড়াল। লোকটা… না, শরীরটার মাথার প্রায় অর্ধেক উড়ে গেছে। অবশিষ্ট অংশেই একটা ক্ষুধার্ত হাসি ফুটে উঠল। তারপর ও একটা ‘হিসসস্‌’ আওয়াজ করল মুখ দিয়ে। ও-রকম শব্দ আমি জীবনে শুনিনি।

বুড়ো আমার দিকে ঘুরে বলল, “আসছে।”

একটা বিশাল লাফ দিয়ে সিঁড়ির ওপাশ থেকে, ঘরের প্রায় অর্ধেকটা পেরিয়ে আমার ওপর এসে পড়ল মাইলস্‌। আমার রিভলভার হাত থেকে ঠিকরে গেল। সেকেন্ডের মধ্যে আমার বুকের ওপর চড়ে বসল মাইলস্‌। তারপরেই আমার গলার দিকে হিংস্রভাবে এগিয়ে এল ওর মুখটা। ওর মুখ থেকে বেরোনো সেই ভয়াবহ গন্ধ আমাকে প্রায় বেহুঁশ করে দিল। ওর মাথা থেকে আমার চোখে ফোঁটা ফোঁটা কী-সব পড়ে আমার দৃষ্টি ঝাপসা করে দিল। আমার কলারটা ছিঁড়ে ফেলার পর খোলা গলাটা দেখতে পেয়ে মাইলস্‌-এর মুখ থেকে লালা বেরোতে শুরু করল। আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে ওকে সরাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না।

তখনই, বৃষ্টির মতো একটা শব্দ পেলাম। ওই অবস্থাতেই চোখ সাফ করে দেখার চেষ্টা করলাম কী হচ্ছে। আমাদের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে বুড়ো ওর কোট থেকে বের করা হুইস্কির ফ্লাস্কটা খালি করল মাইলস্‌-এর পিঠের ওপর। তারপর সে ফাঁকা ফ্লাস্কটা ফেলে দিয়ে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাইয়ের বাক্স বের করল। একটা সিগারেট ধরাল। জ্বলন্ত দেশলাইটা ছুড়ে দিল মাইলস্‌-এর পিঠে।

একটা মশালের মতোই দপ্‌ করে জ্বলে উঠল মাইলস্‌। আমাকে ছেড়ে ছিটকে সোজা হল ও। প্রাণপণে চেষ্টা করল জ্বলন্ত জামাকাপড়গুলোকে ঝেড়ে ফেলতে। পারল না। অসহায়ভাবে বুড়োর দিকে তাকাল মাইলস্‌। বুড়ো নির্বিকারমুখে ওর দিকে তাকিয়ে সিগারেটে একের পর এক টান দিল, আর কিচ্ছু করল না।

ঘরের মাঝখানে একটা লাট্টুর মতো বেশ কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেল মাইলস্‌। ওর গায়ের পোড়া গন্ধে আমার বমি পেল। অবশেষে, নিজের ভারী লাঠিটা দিয়ে খুঁচিয়ে পুড়ে যাওয়া শরীরটাকে মেঝেতে ফেলে দিল বুড়ো। শরীরটা একটু ছটফট করল, তারপর স্থির হয়ে গেল।

“একটা চাদর দিয়ে আগুনটা নেভাও তো।” বুড়োর গলা শুনে আমার চটকা ভাঙল। চেয়ার ঢাকার একটা চাদর তুলে, সেটা দিয়ে থাবড়ে আমি আগে মাইলস্‌-এর শরীরের আগুনটা নেভালাম। তারপর যথাসাধ্য খুঁচিয়ে নিশ্চিত হলাম, এই শরীরটা আর নড়াচড়া করবে না।

“ভাগ্যিস তুমি ওকে ব্যস্ত রেখেছিলে।” বুড়ো বলল, “কিন্তু এবার আসল কাজ। আমাদের নীচে যেতে হবে। বেসমেন্টে।”

আমি রিভলভারটা তুলে হোলস্টারে ভরলাম। ফ্ল্যাশলাইট হাতে এদিক-ওদিক একটু খুঁজতেই বেসমেন্টে যাওয়ার সিঁড়িটা দেখতে পেলাম। দরজা খুলে আলোর সুইচটা টিপলাম। নীচে একটা নিবু-নিবু আলো জ্বলে উঠল।

“মাইলস্‌ লান্ডো-র মতো অনুগামী ও আরও বানিয়েছে বলে মনে হয় না। তবু, সাবধানের মার নেই। তাই তুমিই আগে নামো।”

বুড়োর কথাগুলো বোধগম্য হচ্ছিল না। তবে আমি প্রতিবাদ করে সময় নষ্ট করলাম না। সিঁড়িতে পা দেওয়ামাত্র ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হল। সাবধানে আরও কয়েক পা নামতেই বুঝতে পারলাম, অন্ধকারে ইঁদুর দৌড়োদৌড়ি করছে।

“ও এখানে আছে। আমি নিশ্চিত।” পেছন থেকে বুড়োর গলা পেলাম। বুঝলাম, সে-ও নামছে, তবে ধীরে। সিঁড়িটা আরও কয়েকটা বাঁক নিয়ে নীচে নামতেই আমি বেসমেন্টের মূল জায়গাটা দেখতে পেলাম। জায়গাটা বিশাল। তবে তা না হলে পঞ্চাশটা বাক্স ধরানো যেত না। বাক্সগুলোর আকার দেখে কফিনের কথা মনে হল। ওদের গায়ে কিছু খোদাই করা আছে বলে মনে হচ্ছিল।

আমি নেমে দাঁড়ালাম। পাইনকাঠ দিয়ে বানানো অত বাক্স দেখে মনে হচ্ছিল, আমি যেন পাইনের একটা সমুদ্র দেখছি। সেই সমুদ্রের এক কোণে মাস্তুলের মতো দাঁড়িয়ে ছিল একটা বাক্স। এর গায়েও কিছু লেখা ছিল। কাছে গিয়ে দেখলাম, বাক্সের ঢাকনার ওপর একটা চিহ্নের মতো কিছু রয়েছে। একটা দুর্গ, আর… চারটে বাদুড়? কোন্‌ পরিবার এমন ইনসিগনিয়া ব্যবহার করে?

“ওটাই ওর।” পেছন থেকে গলার আওয়াজ শুনে বুঝলাম বুড়ো আমার পেছনে এসে গেছে, “দেখা যাক, গৃহকর্তা বাড়িতে আছেন কি না।”

বুড়ো হাতের লাঠিটা দিয়ে ওই বাক্সটার দরজায় সপাটে আওয়াজ তুলে আবার পিছিয়ে এল।

দরজাটা নড়ে উঠল। তারপর সেটা একেবারে ফেটে পড়ার মতো ঠিকরে সরে গেল। পচা দুর্গন্ধভরা বাতাসের ঝাপটে আমার বমি পেল। তারপরেই মনে হল, যেন অজস্র ইঁদুরের আওয়াজ পাচ্ছি আমার চারপাশে। এদিক-ওদিক তাকিয়েও আমি কোনও ইঁদুর দেখতে পেলাম না। আমি যখন বাক্সটার দিকে ঘুরলাম, তখন বাক্স থেকে লোকটা বেরিয়ে আসছে।

লোকটা লম্বা। আমি ছ’ফুট, এ আমার চেয়েও কিছুটা লম্বা। আপাদমস্তক কালো পোশাক পরা। মৃদু আলোতেও লোকটার জুতোর পালিশ বোঝা যাচ্ছিল। লম্বাটে, শীর্ণ, কিন্তু হিংস্র মুখ। উঁচু কপাল থেকে পিছিয়ে গেছে ব্রাশ করা ঘন সাদা চুল। ধারালো নাকের ঠিক ওপরে এসে মিলেছে পুরু একজোড়া ভ্রূ। ঠোঁটের ওপরটা অদৃশ্য হয়েছে পুরুষ্টু ধূসর গোঁফের আড়ালে। নীচের ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ শ্ব-দন্ত।

লোকটার চোখজোড়া লাল, কয়লার মতো জ্বলন্ত। মাইলস্‌-এর মতো এই লোকটাকে দেখেও আমার মনে হল, আমি কোনও মানুষ নয়, বরং কোনও পশুর সান্নিধ্যে এসে পড়েছি।

লোকটা ডান হাত তুলে প্রথমে আমার উদ্দেশে একটা স্যালুট ঠুকল। খেয়াল করলাম, লোকটার আঙুলগুলো শেষ হয়েছে লম্বা, ছুঁচলো নখে। হাতের তেলোতেও যেন চুল বা লোম রয়েছে। তারপর লোকটা বুড়োর দিকে ঘুরল। মনে হল, লোকটার চোখজোড়া শুধু বড়োই হল না, তাদের পেছনের আগুনটাও যেন নতুন করে জ্বালানি পেল।

“তাহলে আবার আমাদের দেখা হল।” মাথাটা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে বলল বুড়ো।

“তুমি!” বাক্স থেকে বেরোনো লোকটা হিসিয়ে উঠল, “তুমি এখনও বেঁচে আছ?”

“আছি। কিন্তু আপনি এখানে কী করছেন?” বুড়োর গলায় আপাত ভদ্রতার আড়ালে আমি একটা অন্যরকম সুর শুনতে পাচ্ছিলাম।

“আমি সাহায্য করতে এসেছি।”

“কী?” বুড়ো যে বিলক্ষণ অবাক হয়েছে সেটা বোঝা গেল।

কালো পোশাক পরা লোকটা আমাদের দিকে এক পা এগোল। তারপর বলল, “ওই উন্মাদ আমার দেশ, গোটা ইউরোপকে ছারখার করে দিচ্ছে। তাই আমি ঠিক করেছি, মিত্রশক্তিকে সাহায্য করব।”

“কীভাবে?”

“একটা সেনাবাহিনী বানিয়ে। আমার মতো, আমার প্রজাতির বাহিনী। তার নেতৃত্ব দেব আমি। ভেবে দেখো, আমরা যদি একসঙ্গে লড়ি তাহলে হিটলার কেন, দুনিয়ার কোনও শক্তি আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। কেমন হবে, যদি ঠান্ডা আর গরম রক্তের যৌথ অভিযানে দুনিয়াটা রক্তের সমুদ্রে ডুবে যায়?”

বুড়ো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনার মতো আর ক’জন রয়েছে এখন এ-দেশে?”

“শুধু লান্ডো।” কালো পোশাকের লোকটা বলল, “আমার আর কোনও উপায় ছিল না। তোমরা কি ওকে…?”

“হ্যাঁ।” আমার দিকে ঘুরল বুড়ো। আমি আর আদেশের অপেক্ষা করলাম না। পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে লোকটার দিকে তাক করে সেটা খালি করে দিলাম।

গুলি খেয়ে মাইলস্‌ লান্ডো অন্তত পিছিয়ে গেছিল। এই লোকটা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে গুলিগুলো স্রেফ হজম করল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমি একটা তক্তা তুলে লোকটার মাথায় মারলাম। যেকোনও মানুষের মাথা ওতে ফেটে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই লোকটার কিছুই হল না। আমি ওটা আবার নামিয়ে আনছিলাম, লোকটা এক হাত দিয়ে তক্তাটা ধরে ফেলল। তারপর অক্লেশে তক্তাসুদ্ধ আমাকে ওর কাছে টেনে নিল।

আমি লোকটার খুব কাছে এসে গিয়েছি। ওর ফাঁক হওয়া ঠোঁটের ফাঁকে একটা হিংস্র হাসি ফুটে উঠল। শুনতে পেলাম, লোকটার হাতের চাপে তক্তাটা খড়কে কাঠির মতো ভেঙে গেল। দেখতে পেলাম, দু’চোখে অনন্ত, নারকীয় খিদে নিয়ে লোকটা মুখ নামিয়ে আনছে আমার গলার দিকে। আমার মনে পড়ল, কী হয়ে গিয়েছিল মাইলস্‌ লান্ডো। পাগলের মতো আমি লোকটার সঙ্গে লড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুতেই ওর হাত ছাড়াতে পারলাম না।

ঠিক তখনই সাঁইইই… করে একটা আওয়াজ হল। তারপর আমার সর্বাঙ্গ একটা দুর্গন্ধযুক্ত তরলে ভিজে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, শরীরে চেপে বসা সেই ভয়ংকর বাঁধনটা আলগা হয়ে গেছে। দেখলাম, কালো পোশাক পরা লোকটা হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে মাটিতে। তবে ওর মাথাটা নেই। কবন্ধ শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে কালচে-লাল তরলের স্রোত। কিছুক্ষণ পর শরীরটা আর বসেও থাকতে পারল না। পড়ে গেল পেছনদিকে। রক্ত বেরিয়ে চলল, প্রথমে ধারায়, তারপর চুঁইয়ে-চুঁইয়ে।

হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, লোকটার ছিন্ন মাথা শরীর থেকে প্রায় ফুট তিনেক দূরে পড়ে আছে। রক্তলাল দু’চোখ খোলা। তাতে ফুটে উঠেছে অপার বিস্ময়। মাথা তুলে ওপরে তাকিয়ে দেখি, বুড়ো একটা ল্যাভেন্ডার লাগানো রুমাল দিয়ে হাতের গুপ্তিটা সযত্নে মুছছে। আমাকে তাকাতে দেখে বলল, “কাজের জিনিস। অষ্টাশি সালে হোয়াইটচ্যাপেলে সেই উন্মাদকে ঘায়েল করতে হয়েছিল এটা দিয়েই।”

গুপ্তিটা হাতের লাঠির মধ্যে ঢুকিয়ে বুড়ো আমাকে বলল, “আরেকটু কষ্ট করে গাড়ি থেকে গ্যাসোলিনের ক্যানিস্টারটা নিয়ে এসো দেখি। আমাদের এগুলো সব পোড়াতে হবে। তারপর দমকল ডাকতে হবে, যাতে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে না যায়। ওঠো-ওঠো! রক্তের দাগ ঢাকতে গেলে খাটতে হয় হে ছোকরা।”

_

মূল কাহিনি: বব ম্যাডিসন-এর ‘রেড সানসেট’

1 Comment
তৃষ্ণা সরকার March 9, 2026 at 1:40 am

দশ বারো লাইন পড়ার পরেই একটা নাম ই মাথায় উঁকি দিচ্ছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *